📘 মধ্যমপন্থা গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা 📄 বিচার-ফায়ছালা ও সাক্ষ্যদানে মধ্যপন্থা

📄 বিচার-ফায়ছালা ও সাক্ষ্যদানে মধ্যপন্থা


আমাদের সমাজে ও দেশে এমন অনেক বিচারক আছেন যারা ন্যায়বিচার করেন, তাঁর বুদ্ধি ও বিবেচনা অনুযায়ী ন্যায়ানুগ ফায়ছালা দিতে চেষ্টা করেন। তাঁদের জন্যই পরকালে ক্বিয়ামতের মাঠে আরশের নিচে ছায়ার ব্যবস্থা রয়েছে। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, سَبْعَةٌ يُظِلُّهُمُ اللَّهُ فِي ظِلِّهِ يَوْمَ لَا ظِلَّ إِلَّا ظِلُّهُ إِمَامٌ عَادِلُ 'আল্লাহ সাত শ্রেণীর লোককে তাঁর আরশের নিচে ছায়া দান করবেন, যে দিন তাঁর ছায়া ব্যতীত অন্য কোন ছায়া থাকবে না। তন্মধ্যে এক শ্রেণীর লোক হ'লেন ন্যায়বিচারক নেতা বা শাসক'।

ন্যায়বিচার সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলাও নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন, يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُونُوا قَوَّامِينَ بِالْقِسْطِ شُهَدَاءَ لِلَّهِ وَلَوْ عَلَى أَنْفُسِكُمْ أَوِ الْوَالِدَيْنِ وَالْأَقْرَبِينَ أَنْ يَكُنْ غَنِيًّا أَوْ فَقِيرًا فَاللَّهُ أَوْلَى بِهِمَا فَلَا تَتَّبِعُوا الْهَوَى أَنْ تَعْدِلُوْا وَإَنْ تَلْوُا أَوْ تُعْرِضُوا فَإِنَّ اللَّهَ كَانَ بِمَا تَعْمَلُونَ خَبِيرًا 'হে ঈমানদারগণ! তোমরা ন্যায়ের উপর প্রতিষ্ঠিত থাক, আল্লাহর ওয়াস্তে ন্যায়সঙ্গত সাক্ষ্য দান কর, তাতে তোমাদের নিজের বা পিতামাতার অথবা নিকটবর্তী আত্মীয়-স্বজনের যদি ক্ষতিও হয় তবুও। কেউ যদি ধনী কিংবা দরিদ্র হয়, তবে আল্লাহ তাদের শুভাকাঙ্খী তোমাদের চেয়ে বেশি। অতএব তোমরা বিচার করতে গিয়ে রিপুর কামনা-বাসনার অনুসরণ কর না। আর যদি তোমরা ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে কথা বল কিংবা পাশ কাটিয়ে যাও, তবে আল্লাহ তোমাদের যাবতীয় কাজ-কর্ম সম্পর্কে অবগত' (নিসা ৪/১৩৫)।

অন্যত্র তিনি বলেন, وَإِذَا قُلْتُمْ فَاعْدِلُوا وَلَوْ كَانَ ذَا قُرْبَى 'যখন তোমরা কথা বল, তখন সুবিচার কর। যদিও সে আত্মীয় হয়' (আন'আম ৬/১৫২)। তিনি আরো বলেন إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُ بِالْعَدْلِ وَ الْإِحْسَانِ 'নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদেরকে ন্যায়পরায়ণতা ও ইহসান করার নির্দেশ দিয়েছেন' (নাহল ১৬/৯০)। এসব আয়াত সকল প্রকার গোঁড়ামি পরিহার করে ন্যায়নীতি অবলম্বনের নির্দেশ দেয়, তেমনি সকল কাজে ইনসাফ অলম্বন কামনা করে। এতে মর্যাদাবান লোকের মর্যাদাকে তুচ্ছ করাও অন্যায়। আর ন্যায়নীতি ও ইনছাফ অপরাধ ও শত্রুতা থেকে দূরে থাকার প্রতি নির্দেশ করে। সবার প্রতি সহানুভূতিশীল, এমনকি বিরোধীদের প্রতিও সহানুভুতিশীল হওয়ার দাবী করে।

সমাজে এমন অনেক বিচারক রয়েছেন যারা পক্ষপাতমূলক ফায়ছালা দেন, কোন কোন ক্ষেত্রে তারা কোন এক পক্ষের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে রায় বা ফায়ছালা প্রদান করেন। তাদেরকে সতর্ক করে দিয়ে আল্লাহ বলেন, يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُونُوا قَوَّامِيْنَ لِلَّهِ شُهَدَاءَ بِالْقِسْطِ وَلَا يَجْرِمَنَّكُمْ شَنَآنُ قَوْমٍ عَلَى أَلا تَعْدِلُوا إِعْدِلُوا هُوَ أَقْرَبُ لِلتَّقْوَى وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ خَبِيرٌ بِمَا تَعْمَلُوْনَ 'হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহর উদ্দেশ্যে ন্যায় সাক্ষ্য দানের ব্যাপারে অবিচল থাকবে এবং কোন সম্প্রদায়ের শত্রুতার কারণে কখনও ন্যায়বিচার পরিত্যাগ করবে না, সুবিচার করবে। এটাই আল্লাহভীতির নিকটবর্তী। আল্লাহকে ভয় কর। তোমরা যা কর নিশ্চয়ই আল্লাহ সে বিষয়ে খুব জ্ঞাত' (মায়েদাহ ৫/৮)।

বিচার-ফায়ছালায় মানুষ বেশী নির্যাতনের শিকার হয়। তাই বিচার যাতে সুষ্ঠু হয় এবং মানুষও নির্যাতিত না হয়, সেজন্য রাসূল রাগান্বিত অবস্থায় বিচার করতে নিষেধ করেছেন। বরং স্বাভাবিক অবস্থায় বিচার করতে আদেশ করেছেন। তিনি বলেন, لاَ يَقْضِيَنَّ حَكَمُ بَيْنَ اثْنَيْنِ وَهُوَ غَضْبَانُ 'কোন বিচারক যেন রাগান্বিত অবস্থায় দু'পক্ষের মাঝে বিচার-ফায়ছালা না করে'। আবার তিনি সঠিক বিচারকের পুরস্কার জান্নাত এবং অন্যায় বিচারকের বাসস্থান জাহান্নাম বলে ঘোষণা করেছেন। সাথে সাথে না জেনে অজ্ঞভাবে বিচার করতেও তিনি নিষেধ করেছেন। তিনি বলেন, الْقُضَاةُ ثَلَاثَةٌ: وَاحِدٌ فِي الْجَنَّةِ وَاثْنَانِ فِي النَّارِ فَأَمَّا الَّذِي فِي الْجَنَّةِ فَرَجُلٌ عَرَفَ الْحَقَّ فَقَضَى بِهِ وَرَجُلٌ عَرَفَ الْحَقَّ فَجَارَ فِي الْحُكْمِ فَهُوَ فِي النَّارِ وَرَجُلٌ قَضَى لِلْنَّاسِ عَلَى جَهْلٍ فَهُوَ فِي النَّارِ 'বিচারক তিন প্রকারের হয়ে থাকে, তন্মধ্যে এক প্রকারের জন্য জান্নাত এবং দুই প্রকারের জন্য জাহান্নাম অবধারিত। সে বিচারক জান্নাতে প্রবেশ করবেন, যিনি সত্যটি উপলব্ধি করেছেন এবং তদনুযায়ী বিচার করেছেন। আর যে বিচারক সত্য উপলব্ধি করেও বিচারের মধ্যে অন্যায় (যুলুম) করল, সে বিচারক জাহান্নামী। অনুরূপভাবে সে বিচারকও জাহান্নামে প্রবেশ করবে যে, অজ্ঞতার সাথে মানুষের মধ্যে বিচার করল' (এবং ভুল ফায়ছালা দিল)।

সুতরাং বিচার-ফায়ছালা ও সাক্ষ্য দানের ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার করতে এবং সত্য সাক্ষ্য প্রদান করতে হবে। অবিচার ও মিথ্যাসাক্ষ্য থেকে বিরত থাকতে হবে। এক্ষেত্রে প্রভাবিত হয়ে কিংবা পক্ষপাতমূলকভাবে বিচার করা কিংবা সাক্ষ্য প্রদান করা মুমিনের বৈশিষ্ট্য বিরোধী। তাই এক্ষেত্রে ইনছাফ করাই ইসলামের দাবী।

তাছাড়া যোগ্য-দক্ষ বিচারক নিয়োগ করা রাষ্ট্রপ্রধানের কর্তব্য, যাতে দেশের জনগণ হক বিচার পায়। যেমন হাদীছে এসেছে, আলী (রাঃ) হতে বর্ণিত তিনি বলেন, (যখন) রাসূলুল্লাহ (ছাঃ), আমাকে ইয়ামানের শাসক নিযুক্ত করে পাঠালেন, তখন আমি আরয করলাম, হে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ)! আপনি আমাকে প্রেরণ করেছেন, অথচ আমি একজন যুবক, বিচার বা শাসন সম্পর্কে আমি অজ্ঞ। উত্তরে রাসূল (ছাঃ) বললেন, আল্লাহ তা'আলা তোমার অন্তরকে অচিরেই সৎপথ প্রদর্শন করবেন এবং তোমার যবানকেও সঠিক রাখবেন। অতঃপর তিনি বললেন, যখন দুই ব্যক্তি (বাদী ও বিবাদী) কোন এক ব্যাপার নিয়ে তোমার কাছে উপস্থিত হয়, তখন প্রতিপক্ষের কথাবার্তা না শোনা পর্যন্ত বাদীর পক্ষে (ডিক্রী) রায় প্রদান করবে না। কেননা প্রতিপক্ষের বর্ণনা হতে মোকদ্দমার রায় প্রদানে তোমার মদদ ও সাহায্য মিলবে। আলী (রাঃ) বলেন, (রাসূল ছাঃ-এর দো'আর পর) আমি আর কোন মোকদ্দমায় সন্দেহে পতিত হইনি।

অতএব আল্লাহভীরু, সৎ-যোগ্য বিচারক নিয়োগ দানের মাধ্যমে জনসেবায় ব্রতী হওয়া দায়িত্বশীলদের কর্তব্য। এ কর্তব্যে অবহেলা করা হলে মানুষ যুলুম-নির্যাতনের শিকার হয়। আল্লাহ আমাদেরকে এ থেকে বেঁচে থাকার তাওফীক দান করুন।

টিকাঃ
৫৫. মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত, হা/৭০১, 'ছালাত' অধ্যায়।
৫৬. মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/৩৭৩১।
৫৭. আবু দাউদ, ইবনু মাজাহ, মিশকাত হা/৩৭৩৫, সনদ ছহীহ, ইরওয়াউল গালীল হা/২৬১৪।
৫৮. আবু দাউদ হা/৩৫৮২; তিরমিযী হা/১৩৫৪ সনদ হাসান।

📘 মধ্যমপন্থা গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা 📄 আবেগ-অনুভূতির ক্ষেত্রে মধ্যপন্থা

📄 আবেগ-অনুভূতির ক্ষেত্রে মধ্যপন্থা


আবেগ, অনুভূতি, ভালবাসা-ঘৃণা, বন্ধুত্ব-শত্রুতা ইত্যাদি ক্ষেত্রে মধ্যপন্থী হওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ভালবাসায় সীমাতিক্রম করা বা শত্রুতার ক্ষেত্রে সীমালংঘন করাও ইসলামে নিষিদ্ধ। অনুরূপভাবে ঝগড়া বিবাদের ক্ষেত্রে পাপাচারে লিপ্ত হওয়াও নিষিদ্ধ, বরং এ ক্ষেত্রে মধ্যপন্থা অবলম্বনই ইসলামের শিক্ষা। আল্লাহ বলেন, 'হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহর উদ্দেশ্যে ন্যায় সাক্ষ্য দানের ব্যপারে অবিচল থাকবে এবং কোন সম্প্রদায়ের শত্রুতার কারণে কখনও ন্যায়বিচার পরিত্যাগ কর না, সুবিচার কর। এটাই আল্লাহভীতির নিকটবর্তী। আল্লাহকে ভয় কর। তোমরা যা কর নিশ্চয়ই আল্লাহ সে বিষয়ে খুব জ্ঞাত' (মায়েদাহ ৫/৮)।

হাদীছে বর্ণিত হয়েছে, আলী (রাঃ) বলেন, আমি নবী করীম (ছাঃ)-কে বলতে শুনেছি, أَحْبِبْ حَبِيبَكَ هَوْنًا مَّا عَسَى أَنْ يَكُوْنَ بَغِيْضَكَ يَوْمًا مَّا ، وَأَبْغِضُ بَغِيْضَكَ هَوْنًا مَّا، عَسَى أَنْ يَكُوْنَ حَبِيبَكَ يَوْمًا مَّا 'বন্ধুর সাথে স্বাভাবিক বন্ধুত্ব বজায় রাখ (বাড়াবাড়ি কর না), হ'তে পারে সে একদিন তোমার শত্রু হয়ে যাবে। অনুরূপভাবে শত্রুর সাথে স্বাভাবিক শত্রুতা বজায় রাখ (আধিক্য দেখিও না), হ'তে পারে সে একদিন তোমার বন্ধু হয়ে যাবে'।

কোন কোন সময় মানুষ স্বীয় বন্ধুর ভালবাসায় বিলীন হয়ে যায়, বন্ধুর ভালবাসায় মোহাবিষ্ট হয়ে পড়ে। আবার কোন সময় তার সাথে ক্রোধের আগুনে জ্বলে পুড়ে মরে। ফলে তার সাথে হিংসা, হানাহানি ও শত্রুতায় লিপ্ত হয়। এমনকি ক্রোধের কারণে ক্ষমার ফযীলত গ্রহণ করা থেকেও সে বিরত থাকে। তাই মুমিনের জন্য আবেগ, অনুভূতি ও ভালবাসার ক্ষেত্রে মধ্যপন্থা অবলম্বন আবশ্যক, যাতে সে আবেগতাড়িত হয়ে আশোভন আচরণে লিপ্ত না হয়। সুতরাং ভালবাসা, শত্রুতা, ঘৃণা ইত্যাদি ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি পরিহার করে মধ্যপন্থা অবলম্বন করতে হবে।

টিকাঃ
৫৯. তিরমিযী, হা/২০৬৫, 'সৎকাজ ও সদাচরণ' অধ্যায়; ছহীহ আদাবুল মুফরাদ, হা/১৩২১।

📘 মধ্যমপন্থা গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা 📄 রাজনৈতিক ক্ষেত্রে মধ্যপন্থা

📄 রাজনৈতিক ক্ষেত্রে মধ্যপন্থা


এক শ্রেণীর মানুষ রাজনৈতিক ক্ষেত্রে সবচেয়ে ধ্বংসাত্মক মতাদর্শ নিয়ে দেশ, জাতি ও ইসলামের মধ্যে চরম নৈরাজ্য সৃষ্টি করে থাকে। তাদের মতাদর্শ হচ্ছে-

১. হুকুমদাতা একমাত্র আল্লাহ, মানুষের হুকুম দানের অধিকার নেই। দলীল হচ্ছে আল্লাহর বাণী, إِنِ الْحُكْمُ إِلَّا لِلَّهِ 'আল্লাহ ছাড়া কারো হুকুম নেই' (ইউসুফ ১২/৪০, ৬৭)। এ আয়াতের অর্থ না বোঝার কারণে ছিফফীনের যুদ্ধে শালিস নিযুক্ত করার কারণে খারেজীরা আলী, মু'আবিয়া সহ সকল ছাহাবীকে কাফের আখ্যায়িত করে এবং আলী (রাঃ) তাদের হাতে নিহত হন। অথচ এ আয়াতের মৌলিক উদ্দেশ্য হলো, বিধানদাতা আল্লাহ তা'আলা এবং চূড়ান্ত ফায়ছালাকারীও তিনি। তাঁর সৃষ্টি হিসাবে মানুষ তাঁরই বিধান মেনে চলবে। এক্ষেত্রে কেউ প্রজাদের উপর প্রতিনিধির দায়িত্ব পালন করতে পারবে শরী'আতের নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে থেকে। রাসূলের বাণী অনুযায়ী এই প্রতিনিধি ভাল বা খারাপ হ'তে পারে।

২. আল্লাহর নাযিলকৃত বিধান অনুযায়ী যারা শাসনকার্য পরিচালনা করে না, তারা কাফের। প্রমাণ হচ্ছে আল্লাহর বাণী, وَمَنْ لَمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ فَأُوْلَئِكَ هُمُ الْكَافِرُونَ ‘আল্লাহ তা'আলার নাযিলকৃত বিধান অনুযায়ী যারা শাসনকার্য পরিচালনা করে না, তারা কাফের' (মায়েদাহ ৫/৪৪)। রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে শাসক কোন অন্যায় করলে বা তা প্রতিরোধ না করলে এবং আল্লাহ্র বিধান প্রতিষ্ঠা না করলে উক্ত আয়াতের আলোকে তারা ঐ শাসকগোষ্ঠীকে কাফের বলে গণ্য করে এবং তাদের হত্যা করা বৈধ মনে করে। অথচ পরবর্তী দু'টি আয়াতে একই ব্যাপারে দু'ধরনের বক্তব্য এসেছে। যেমন মহান আল্লাহ বলেন, وَمَنْ لَّمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنْزَلَ اللهُ فَأُولَئِكَ هُمُ الظَّالِمُوْনَ 'আল্লাহ তা'আলার নাযিলকৃত বিধান অনুযায়ী যারা শাসনকার্য পরিচালনা করে না, তারা যালেম' (মায়েদাহ ৫/৪৫)। তিনি আরো বলেন, وَمَنْ لَّمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنْزَلَ اللهُ فَأُولَئِكَ هُمُ الْفَاسِقُوْনَ. 'বিধান অনুযায়ী যারা শাসনকার্য পরিচালনা করে না, তারা ফাসেক' (মায়েদাহ ৫/৪৭)। এসব ক্ষেত্রে তারা লক্ষ্য রাখে না যে, আয়াতে বর্ণিত একই হুকুমের জন্য কাফের, যালেম ও ফাসেক কখন হবে কিংবা কার জন্য কোন হুকুম প্রযোজ্য?

প্রথম আয়াতটি (মায়েদাহ ৫/৪৪) ইউসুফ (আঃ) তাঁর কারাগারে বন্দী বন্ধুদেরকে যে দাওয়াত দিয়েছিলেন, তার বর্ণনা। তিনি পরে জেল হ'তে মুক্তি পেয়ে তৎকালীন মিসরের কুফরী হুকুমতের প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা 'আযীযে মিছরে'র অধীনে খাদ্যবিভাগের দায়িত্ব পালন করেছিলেন। সূরা মায়েদাহ্র পরবর্তী আয়াতগুলি আহলে কিতাবগণকে তাওরাত ও ইঞ্জীলের বিধান অনুযায়ী বিচার-ফায়ছালা করার জন্য বলা হয়েছে। এ আয়াতগুলি যদি সাধারণ অর্থে নেওয়া হয়, তাহ'লে প্রথম আয়াতটি 'হুকুমে তাকভীনী' বা প্রাকৃতিক বিধান অর্থে নিতে হবে, যার একচ্ছত্র মালিকানা আল্লাহ্ হাতে। এর অর্থ কখনোই রাষ্ট্রীয় বিধান নয়, যা পরিষ্কারভাবে 'হুকুমে আকুলীর' অন্তর্ভুক্ত। এটির অর্থ 'হুকমে শারঈ'ও নয়। তা যদি হ'ত তাহ'লে ইউসুফ (আঃ) নিজে নবী হয়ে এবং নিজে এই আয়াতের প্রবক্তা হয়ে তার বিরোধিতা করে কুফরী হুকুমতের অধীনে কোন দায়িত্ব পালন করতেন না। বরং হুকুমতের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে ক্ষমতা দখলের চেষ্টা করতেন। অতঃপর সূরা মায়েদাহ্র আয়াতগুলি ইসলামী রাষ্ট্রের আদালতের বিধান হিসাবে গণ্য হবে। যেন বিচারকগণ আল্লাহ্র নাযিলকৃত বিধান অনুযায়ী বিচার-ফায়ছালা করেন। অবশ্য যদি কোন বিষয়ে কুরআন ও হাদীছের স্পষ্ট দলীল না পাওয়া যায়, সে ক্ষেত্রে বিচারক ইজতেহাদের ভিত্তিতে রায় দিতে পারবেন।

আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রাঃ) সূরা মায়েদাহ ৪৪ আয়াতের فَأُولَئِكَ هُمُ الْكَافِرُوْনَ এর ব্যাখ্যায় বলেন, ليس بالكفر الذى يذهبون اليه 'এর অর্থ কুফরী নয়, যেদিকে লোকেরা গিয়েছে'। ত্বাউস বলেন, ليس بكفر ينقل عن الملة 'এর অর্থ ঐ কুফরী নয় যা তাকে ইসলামী মিল্লাত থেকে খারিজ করে দেয়'। আত্বা বলেন, এটি কুফরীর পরেই সবচেয়ে বড় পাপ' (তাফসীর ইবনু কাছীর)। এক্ষণে আয়াতগুলির মর্ম হ'ল এই যে, যদি কোন মুসলিম বিচারক আল্লাহকৃত কোন হারামকে হারাম বলে বিশ্বাস করেন, কিন্তু বাস্তবে উক্ত হারাম কর্ম সম্পাদন করেন, তাহ'লে তিনি ফাসেক ও পাপিষ্ঠ মুসলিম হিসাবে গণ্য হবেন। তার বিষয়টি আল্লাহ্র উপরে ছেড়ে দেওয়া হবে। চাইলে তিনি তাকে আযাব দিবেন, চাইলে ক্ষমা করবেন। কেননা কবীরা গুনাহগার মুসলিম 'কাফের' হয় না। তবে খারেজীদের মতে ঐ ব্যক্তি কাফের (কুরতুবী)। সে চিরস্থায়ী জাহান্নামী এবং তার রক্ত হালাল।

উপরোক্ত আয়াতগুলির বাহ্যিক অর্থের ভিত্তিতে একশ্রেণীর লোক দেশে নির্বিচারে মানুষ হত্যা করে, মনে করে যে তারা জিহাদ করছে। তাদের ধারণা অনুযায়ী তারা মরলে গাযী ও বাঁচলে শহীদ। তাদের এ ধারণা সম্পূর্ণ ভ্রান্ত। যে ছালাত আদায় করে সে যেমন কাফের নয়, তেমনি তাকে হত্যা করাও বৈধ নয়। এমর্মে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, مَنْ صَلَّي صَلَاتَنَا وَاسْتَقْبَلَ قِبْلَتَنَا وَأَكَلَ ذَيْحَتَنَا فَذَلِكَ الْمُسْلِمُ الَّذِي لَهُ ذِمَّةُ اللهِ وَذِمَّةُ রَسُولِهِ، فَلَا تَحْقِرُوا اللَّهَ فِي ذِمَّتِهِ - 'যে ব্যক্তি আমাদের মত ছালাত আদায় করে, আমাদের ক্বিবলার দিকে মুখ করে, আমাদের যবহকৃত প্রাণী ভক্ষণ করে সে মুমিন। তার ব্যাপারে আল্লাহ্ এবং তাঁর রাসূলের যিম্মা রয়েছে। সুতরাং যিম্মা পালনের ক্ষেত্রে তোমরা আল্লাহকে তুচ্ছ জ্ঞান কর না'। তেমনি ছালাত আদায়কারী কোন মুসলমানকে হত্যা করা ইসলাম বহির্ভূত। এ সম্পর্কে মহানবী (ছাঃ) আরো বলেন, أُمِرْتُ أَنْ أُقَاتِلَ النَّاسَ حَتَّى يَشْهَدُوا أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ وَأَنَّ مُحَمَّدًا رَّسُوْلُ اللَّهِ وَيُقِيمُوا الصَّلَاةَ وَيُؤْتُوا الزَّكَاةَ، فَإِذَا فَعَلُوْا ذَلِكَ عَصَمُوا مِنِّي دِمَاءَهُمْ وَأَمْوَالَهُمْ إِلَّا بِحَقِّ الْإِسْلَامِ، وَحِسَابُهُمْ عَلَى اللَّهِ 'আমি মানুষের সাথে যুদ্ধ করতে আদিষ্ট হয়েছি যতক্ষণ না তারা এ সাক্ষ্য দেয় যে, আল্লাহ ছাড়া কোন উপাস্য নেই এবং মুহাম্মাদ (ছাঃ) আল্লাহ্র রাসূল। আর যদি না তারা ছালাত কায়েম করে এবং যাকাত দেয়। কিন্তু যদি তারা এসব পালন করে তাহলে আমাদের নিকট থেকে তার জান-মাল নিরাপদে থাকবে। তবে ইসলামের হক ব্যতীত। আর তাদের হিসাব হবে আল্লাহ্র নিকটে'।

রাজনৈতিক ক্ষেত্রে আরেকটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষণীয়, তা হচ্ছে প্রত্যেকে নিজের সমর্থিত দলকে সঠিক মনে করে থাকে। এ মর্মে আল্লাহ বলেন, كُلُّ حِزْبٍ بِمَا لَدَيْهِمْ فَرِحُوْনَ 'প্রত্যেকে নিজেদের নিকট যা আছে তা নিয়েই গর্বিত' (মুমিনূন ২৩/৫৩)। এমনকি সমর্থিত দলের প্রতি মানুষ অনেক ক্ষেত্রে এতই গোঁড়া সমর্থক হয়ে পড়ে যে, দলের কোন ভুলও তার কাছে সঠিক মনে হয়। দলের যে কোন সিদ্ধান্তই তার কাছে চূড়ান্ত বলে গৃহীত হয়। কোন কোন ক্ষেত্রে তারা কুরআন-হাদীছের নির্দেশকেও উপেক্ষা করে। এসবই বাড়াবাড়ি। এগুলি পরিহার করে এক্ষেত্রেও মধ্যপন্থা অবলম্বন করতে হবে।

টিকাঃ
৬০. প্রফেসর ড. ইউসুফ আল-কারযাভী, আধুনিক যুগ: ইসলাম কৌশল ও কর্মসূচি (ঢাকা: ২০০৩), পৃ. ১২৩।
৬১. মিশকাত, হা/৩৬৬১-৬৪ ও হা/৩৬৯৪, 'ইমারত' অধ্যায়।
৬২. বুখারী, হা/৭০৫২; মুসলিম, হা/৪৭৫২; মিশকাত, হা/৩৬৭১, 'নেতৃত্ব ও পদমর্যাদা' অধ্যায়।
৬৩. বুখারী হা/৭৩৫২।
৬৪. হাকেম ২/৩১৩ পৃঃ হাদীছ ছহীহ।
৬৫. বুখারী, মিশকাত, হা/১৩ 'ঈমান' অধ্যায়।
৬৬. মুত্তাফাক্ব 'আলাইহ; মিশকাত, হা/১২, 'ঈমান' অধ্যায়।

📘 মধ্যমপন্থা গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা 📄 সামাজিক ক্ষেত্রে মধ্যপন্থা

📄 সামাজিক ক্ষেত্রে মধ্যপন্থা


সমাজের প্রতি লক্ষ্য করলে দেখা যায় যে, সেখানে পেশী শক্তির প্রাবল্য বিদ্যমান। পূর্ববর্তী সম্প্রদায়গুলো একদিকে মানবাধিকারের প্রতি কোন ভ্রূক্ষেপ করেনি; ন্যায়-অন্যায়ের তো বালাই ছিল না। নিজেদের স্বার্থের বিরুদ্ধে কাউকে যেতে দেখলে তাকে নিপীড়ন ও হত্যা করে তার সর্বস্ব লুটে নেয়াকেই বড় কৃতিত্ব মনে করা হ'ত। জনৈক ব্যক্তির চারণভূমিতে অন্যের উট প্রবেশ করে কিছু ক্ষতি সাধন করায় গোত্রে গোত্রে যুদ্ধ বেধে যায়, যা চলে শতাব্দীকালব্যাপী। এতে নিহত হয় অসংখ্য বনু আদম। নারীদের মৌলিক অধিকার প্রদান তো দূরের কথা, তাদের জীবিত থাকার অনুমতি পর্যন্ত দেয়া হতো না। কোথাও প্রচলিত ছিল শৈশবেই তাদের জীবন্ত সমাহিত করার প্রথা। অপরদিকে এরূপ নির্বোধ দয়ার্দ্রতারও প্রচলন ছিল যে, পোকা-মাকড় হত্যা করাকেও অবৈধ জ্ঞান করা হতো। জীব হত্যাকে তো দস্তুর মত মহাপাপ বলে সাব্যস্ত করা হতো। আল্লাহর হালালকৃত প্রাণীর গোশত ভক্ষণকে অন্যায় মনে করা হতো। বর্তমান বিশ্বেও কোন কোন জাতির মধ্যে এসব প্রচলন দেখা যায়।

কিন্তু মুসলিম উম্মাহ ও তাদের শরী'আতে এসব বাড়াবাড়ির অবসান ঘটানো হয়েছে। তারা মানুষের সামনে মানবাধিকারকে তুলে ধরেছে। কেবল শান্তি ও সন্ধির সময় ই নয়; বরং যুদ্ধক্ষেত্রে, জিহাদের ময়দানেও প্রাণবিনাশী শত্রুর অধিকার সংরক্ষণে সচেতনতা শিক্ষা দিয়েছে। অপরদিকে প্রত্যেক কাজের জন্য নির্ধারিত সীমা লংঘন করাকে অপরাধ সাব্যস্ত করা হয়েছে। ব্যক্তিস্বার্থ ও নিজ অধিকারের ব্যাপারে ক্ষমা, মার্জনা ও ত্যাগের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে এবং অপরের অধিকার প্রদানে যত্নবান হওয়ার নীতি শিক্ষা দিয়েছে।

সুতরাং মুমিনের সকল কাজ হবে মধ্যপন্থা অবলম্বনের মাধ্যমে। এতে যেমন কোন বাড়াবাড়ি থাকবে না, তেমনি থাকবে না সীমালংঘনও। কেননা মানব জীবনে চরমপন্থা যেমন দূষণীয় তেমনি সীমালংঘনও বর্জনীয়। মুমিনের সকল কাজ নম্রতা, ভদ্রতা ও শালীনতা বজায় রাখার মাধ্যমে সম্পন্ন হ'তে হবে, যার উদ্দেশ্য হবে আল্লাহ্র সন্তুষ্টি ও মানবকল্যাণ। যাতে মানবতার জন্য কোন অমঙ্গল ও অকল্যাণ থাকবে না। যার মাধ্যমে ইসলামের আদর্শ হবে সমুন্নত, যে আদর্শ দেখে অমুসলিমরা ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হবে। আর এটাই মুমিনের একমাত্র ব্রত হওয়া উচিত। আল্লাহ আমাদেরকে সকল কাজে মধ্যপন্থা অবলম্বনের তাওফীক দান করুন- আমীন!

ফন্ট সাইজ
15px
17px