📘 মধ্যমপন্থা গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা 📄 অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে মধ্যপন্থা

📄 অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে মধ্যপন্থা


অর্থনীতি জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এক্ষেত্রেও অন্যান্য সম্প্রদায়ের মধ্যে সীমাহীন বাড়াবাড়ি পরিলক্ষিত হয়। একদিকে রয়েছে পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থা। এতে হালাল-হারাম এবং অপরের সুখ-শান্তি ও দুঃখ-দুরবস্থা থেকে চোখ বন্ধ করে অধিক সম্পদ সঞ্চয় করাকেই সর্ববৃহৎ মানবিক সাফল্য গণ্য করা হয়। অপরদিকে রয়েছে সমাজতান্ত্রিক অর্থ ব্যবস্থা। এতে ব্যক্তি মালিকানাকেই অপরাধ সাব্যস্ত করা হয়। একটু চিন্তা করলেই বুঝা যাবে যে, উভয়বিধ অর্থব্যবস্থা হচ্ছে ধন-সম্পদের উপাসনা, ধন-ঐশ্বর্যকেই জীবনের একমাত্র লক্ষ্য ও মূল উদ্দেশ্য জ্ঞান করা এবং এরই জন্য যাবতীয় চেষ্টা-সাধনা নিয়োজিত করা।

ইসলামী শরী'আত এক্ষেত্রে মধ্যপন্থী ও ন্যায়নিষ্ঠ অর্থব্যবস্থা প্রবর্তন করেছে। ইসলামী শরী'আতে একদিকে ধন-সম্পদকে জীবনের লক্ষ্য জ্ঞান করতে নিষেধ করা হয়েছে এবং সম্মান, ইয্যত ও কোন পদমর্যাদা লাভকে এর উপর নির্ভরশীল করা হয়নি। অপরদিকে সম্পদ বণ্টনের নিষ্কলুষ নীতিমালা প্রণয়ন করে দিয়েছে যাতে কোন মানুষ জীবন ধারণের প্রয়োজনীয় উপায়-উপকরণ থেকে বঞ্চিত না থাকে এবং কেউ সমগ্র সম্পদ এককভাবে কুক্ষিগত করে না বসে। এছাড়া সম্মিলিত মালিকানাভুক্ত সম্পত্তি যৌথ ও সাধারণ ওয়াকফের আওতায় রেখেছে। ইসলামে ব্যক্তিমালিকানার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা হয়েছে। ইসলাম হালাল দ্রব্যের শ্রেষ্ঠত্ব বর্ণনা করেছে এবং তা রাখার ও ব্যবহার করার পদ্ধতি শিক্ষা দিয়েছে।

দান-খয়রাত বা খরচের ক্ষেত্রে মধ্যপন্থা অবলম্বন করা মুমিনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। কোন কোন মানুষ আছে যারা দান-ছাদাক্বা ও ব্যয় নির্বাহের ক্ষেত্রে অত্যন্ত মুক্তহস্ত। এমনকি কোন কোন সময় তারা ঋণ করেও খরচ করে। নিজের সামর্থ্যের প্রতি তাদের লক্ষ্য থাকে না। এসব কাজ থেকে আল্লাহ নিষেধ করেছেন। তিনি বলেন, وَلَا تَجْعَلْ يَدَكَ مَغْلُولَةً إِلَىٰ عُنُقِكَ وَلَا تَبْسُطْهَا كُلَّ ٱلْبَسْطِ. 'তুমি একেবারে ব্যয়কুণ্ঠ হয়ো না এবং একেবারে মুক্তহস্তও হয়ো না। তাহ'লে তুমি তিরষ্কৃত হয়ে বসে থাকবে' (ইসরা ১৭/২৯)। মুমিনের কাজ হবে কৃপণতা না করা এবং নিজের ও নিজ পরিবার-পরিজনের প্রয়োজন ও চাহিদার প্রতি যথাযথ খেয়াল রাখা। প্রতিবেশী, দুঃস্থ, অসহায়, অভাবগ্রস্তদের দান না করে কৃপণতাবশে সম্পদ কুক্ষিগত করা যেমন অপরাধ, তেমনি নিজের ও পরিবার-পরিজনের প্রয়োজনের প্রতি লক্ষ্য না রেখে সর্বস্ব দান করাও ঠিক নয়। বরং মুমিনের কাজ হবে এতদুভয়ের মধ্যবর্তী। এ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, وَالَّذِينَ إِذَا أَنْفَقُوْا لَمْ يُسْرِفُوْا وَلَمْ يَقْتَرُوا وَكَانَ بَيْنَ ذَلِكَ قَوَامًا ‘তারা যখন ব্যয় করে তখন অযথা ব্যয় করে না, কৃপণতাও করে না এবং তাদের পন্থা হয় এতদুভয়ের মধ্যবর্তী’ (ফুরক্বান ২৫/৬৮)।

অর্থাৎ নিষিদ্ধ অপচয়-অপব্যয় ও নিন্দিত ব্যয়কুণ্ঠতা-কৃপণতার মধ্যবর্তী মিতাচার-মিতব্যয়িতা এবং অর্থসম্পদ খরচের ক্ষেত্রে মধ্যপন্থা অবলম্বন করা। এটাই হচ্ছে অর্থসম্পদ ব্যয়ের ক্ষেত্রে কুরআনী বিধান। যে ব্যক্তি তা অবলম্বন করবে সে সৌভাগ্যবান হবে, মুক্তি পাবে। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিবে সে দুর্ভাগা হবে এবং ধ্বংসে নিপতিত হবে। অবশেষে সে আফসোস করবে। আয়াতে যে মধ্যবর্তী অবস্থা বুঝানো হয়েছে, তা নিম্নোক্ত ঘটনায় সুস্পষ্ট হয়েছে। উমাইয়া খলীফা আব্দুল মালেক তার মেয়ে ফাতিমাকে স্বীয় ভাতিজা ওমর ইবনু আব্দুল আযীযের সাথে বিবাহ দিয়েছিলেন। একদা তিনি তাদের সাথে সাক্ষাৎ করতে গিয়ে তাঁর মেয়েকে জিজ্ঞেস করেন, তোমাদের জীবনযাত্রা কেমন চলছে? তখন ফাতিমা উত্তর দেন, الحسنة بين سيئتين تعني بالحসنة الاعتدال في النفقة وبالسيئتين الإسراف والتقتير الذي هو التضييق في النفقة. 'দুই খারাপের মধ্যবর্তী উত্তম। তিনি উত্তম বলে ব্যয়ে মিতাচারকে বুঝিয়েছেন এবং দুই খারাপ দ্বারা অপচয় ও কৃপণতাকে বুঝিয়েছেন'। অন্য বর্ণনায় আছে, তিনি ওমর ইবনু আব্দুল আযীযকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমাদের ব্যয়ভার কিভাবে নির্বাহ হয়ে থাকে? তিনি উত্তরে বললেন, দুই খারাপের মধ্যবর্তী উত্তম পন্থায়। অতঃপর তিনি উপরোক্ত আয়াত তেলাওয়াত করেন। যেমন কবি আবু সুলায়মান আল-খাত্তাবী বলেন, ولا تغل في شيء من الأمر واقتصد ... كلا طرفي قصد الأمورِ دَميمُ 'কোন কাজে তুমি বাড়াবাড়ি কর না, মধ্যপন্থা অবলম্বন কর। কাজের ক্ষেত্রে মধ্যপন্থার উভয় দিক (অতিরঞ্জন ও সংকোচন) নিন্দনীয়'।

উপরোক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় মুফাসসিরগণ বিভিন্ন অভিমত ব্যক্ত করেছেন। যেমন-
১. আন-নুহাস বলেন, আল্লাহর আনুগত্যের পরিপন্থী কাজে খরচ করা হচ্ছে অপচয়, আল্লাহর আনুগত্যে ব্যয় না করা হচ্ছে কৃপণতা আর তাঁর আনুগত্যে খরচ করাই হচ্ছে মধ্যপন্থা।
২. ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন, 'যে ব্যক্তি লক্ষ দেরহাম সত্য-সঠিক কাজে ব্যয় করে সেটা অপব্যয় নয়। পক্ষান্তরে যে এক দেরহাম অন্যায় পথে ব্যয় করে সেটা হচ্ছে অপচয়। আর যে হকের পথে ব্যয় করা থেকে বিরত থাকে সে কৃপণতা করে'। মুজাহিদ ও ইবনু যায়েদও অনুরূপ বলেছেন।
৩. ইবনু আতিয়া বলেন, কম হোক বেশি হোক পাপের কাজে খরচ করা থেকে শরী'আত সতর্ক করেছে। অনুরূপভাবে অন্যের সম্পদ আত্মসাৎ করা থেকেও সাবধান করেছে। এসব দোষ-ত্রুটি অবশ্যই পরিত্যজ্য। আয়াতে ব্যয়ের ব্যাপারে যে আদব বর্ণিত হয়েছে তা হচ্ছে শরী'আত সম্মত তথা বৈধ কাজে এমন পরিমিত খরচ করা যাতে পরিবার-পরিজন ও অন্যের হক বিনষ্ট না হয়। কিংবা এমন কৃপণতা বা ব্যয় সংকোচন না করা যাতে পরিবার-পরিজন ক্ষুধার্ত থাকে। অর্থাৎ অতিরঞ্জিত ব্যয়কুণ্ঠতা অবলম্বন করা। এতদুভয়ের মধ্যবর্তী অবস্থা হচ্ছে উত্তম ও ন্যায়ানুগ ব্যবস্থা তথা মধ্যপন্থা।
৪. ইয়াযীদ ইবনু আবু হাবীব বলেন, (আয়াতে যাদের কথা বলা হয়েছে) তারা হচ্ছে ঐ সকল লোক যারা কেবল সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য পোশাক পরিধান করে না এবং কেবল স্বাদ আস্বাদনের জন্য আহার করে না।... তাঁরা হচ্ছেন নবী মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর ছাহাবীগণ। তাঁরা কেবল বিলাসিতা ও স্বাদ আস্বাদনের জন্য খাদ্য খেতেন না এবং শোভা বর্ধনের জন্য পোশাক পরতেন না। বরং তাঁরা ক্ষুধা নিবারণ ও আল্লাহর ইবাদতে শক্তি লাভের জন্য খাদ্য খেতেন। আর নিজেদের আব্রু ঢেকে রাখা ও ঠাণ্ডা-গরমের প্রকোপ থেকে বাঁচতে পোশাক পরিধান করতেন'।
৫. ওমর (রাঃ) স্বীয় পুত্র আছেমকে বলেন, 'হে বৎস! তুমি অর্ধ পেট খাও এবং কাপড় না ছেড়া পর্যন্ত তা ছুড়ে ফেলে দিও না। তুমি ঐ সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না, যারা আল্লাহ প্রদত্ত সবই তাদের পেট ও পীঠে রাখে। অর্থাৎ খায় ও পরিধান করে'।

অতএব খরচের ক্ষেত্রে মধ্যপন্থা অবলম্বন করা মুমিনের জন্য কর্তব্য। যেমন হাদীছে এসেছে, আবুছ ছালত (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, এক ব্যক্তি ওমর ইবনু আব্দুল আযীয (রহঃ)-এর কাছে তাকদীর (ভাগ্য) সম্পর্কে জানাতে চেয়ে পত্র লিখল। উত্তরে তিনি লিখলেন, 'আমি তোমাকে আল্লাহকে ভয় করার, তাঁর হুকুম পালনে মধ্যপন্থা অবলম্বন করার, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর আদর্শ ও সুন্নাতের অনুসরণ করার, তাঁর আদর্শ প্রতিষ্ঠা লাভের ও সংরক্ষিত হওয়ার পর বিদ'আতীদের আচার-অনুষ্ঠান ত্যাগ করার। সুন্নাতকে আঁকড়ে ধরা তোমার কর্তব্য। কেননা এ সুন্নাত তোমাদের জন্য আল্লাহর অনুমতিক্রমে রক্ষাকবয'।

আবার আল্লাহ মানুষকে খেতে ও পান করতে বলেছেন, কিন্তু অপচয় করতে নিষেধ করেছেন। তিনি বলেন, وَكُلُوْا وَاشْرَبُوْا وَلَا تُسْرِفُوْا إِنَّهُ لَا يُحِبُّ الْمُسْرِفِينَ ‘তোমরা খাও ও পান করো, অপচয় করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ অপচয়কারীকে ভালবাসেন না’ (আ'রাফ ৭/৩১)। তিনি আরো বলেন, وَلَا تُبَذِّرْ تَبْذِيرًا، إِنَّ الْمُبَذِّرِينَ كَانُوا إِخْوَانَ الشَّيَاطِينِ অপচয় কর না, নিশ্চয়ই অপব্যয়কারীরা শয়তানের ভাই' (বনু ইসরাঈল ১৭/২৬-২৭)। নবী করীম (ছাঃ)ও বলেন, كُلُوْا وَتَصَدَّقُوْا وَالْبَسُوْا فِي غَيْرِ إِسْرَافِ وَلَا مَخِيْلَةِ - ‘তোমরা খাও, দান কর, পরিধান কর অপব্যয় ও অহংকার ব্যতিরেকে'। কেননা রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) অপব্যয়ের মাধ্যমে সম্পদ বিনষ্ট করাকে আল্লাহর অসন্তোষের কারণ বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, 'আল্লাহ তা'আলা তোমাদের তিনটি কাজের উপর সন্তুষ্ট এবং তোমাদের তিনটি কাজের দ্বারা অসন্তুষ্ট হয়ে থাকেন। যে তিনটি কাজে সন্তুষ্ট হন তা হ'ল- ১. তোমরা তাঁর ইবাদত করবে, তাঁর সাথে অন্য কিছুকে শরীক করবে না, ২. তোমরা সম্মিলিতভাবে আল্লাহর রজ্জুকে মযবুতভাবে ধারণ করবে ও বিচ্ছিন্ন হবে না, ৩. যাকে আল্লাহ তোমাদের শাসক বানিয়েছেন তাঁর মঙ্গল কামনা করবে। তিনি তোমাদের যে তিনটি কাজ অপসন্দ করেন তা হ'ল। ১. বাদানুবাদ ২. অধিক যাচঞা করা ৩. সম্পদের অপচয় করা'।

উপরোক্ত হাদীছ দ্বারা প্রতীয়মান হয় যে, অপব্যয় করা হচ্ছে সম্পদ ধ্বংসের কারণ এবং অর্থ-সম্পদ ধ্বংসের ফলে আল্লাহর অসন্তোষে নিপতিত হ'তে হয়। তেমনি পার্থিব জীবনে বিলাসিতাও গ্রহণযোগ্য নয়, বরং সহজ-সরল জীবন যাপনই মুমিনের বৈশিষ্ট্য। এসম্পর্কে হাদীছে এসেছে, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) মু'আয ইবনু জাবাল (রাঃ)-কে বললেন, 'তুমি সম্পদের প্রাচুর্য ও বিলাসিতা থেকে বেঁচে থাক। কেননা আল্লাহর বান্দারা বিলাসীদের অন্তর্ভুক্ত হয় না'।

অতএব অপচয়-অপব্যয় ও বিলাসী জীবন পরিহার করে কেবল মধ্যপন্থী জীবন যাপন করাই মুমিনের কর্তব্য। আল্লাহ আমাদেরকে মধ্যপন্থী জীবন যাপন করার তাওফীকু দান করুন।

টিকাঃ
৪৯. কুরতুবী ২০/৩৬৫ পৃঃ।
৫০. কুরতুবী ২০/৩৬৫; ফাতহুল ক্বাদীর ৫/৩৮৫।
৫১. আবু দাউদ হা/৪৬১২, সনদ ছহীহ।
৫২. নাসাঈ হা/২৫১২; ইবনু মাজাহ হা/৩৬৯৫।
৫৩. মুসলিম হা/১৭১৫।
৫৪. আহমাদ, মিশকাত হা/৫২৬২, সিলসিলা ছহীহাহ হা/৭৯৪।
৫৫. মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত, হা/৭০১, 'ছালাত' অধ্যায়।

📘 মধ্যমপন্থা গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা 📄 বিচার-ফায়ছালা ও সাক্ষ্যদানে মধ্যপন্থা

📄 বিচার-ফায়ছালা ও সাক্ষ্যদানে মধ্যপন্থা


আমাদের সমাজে ও দেশে এমন অনেক বিচারক আছেন যারা ন্যায়বিচার করেন, তাঁর বুদ্ধি ও বিবেচনা অনুযায়ী ন্যায়ানুগ ফায়ছালা দিতে চেষ্টা করেন। তাঁদের জন্যই পরকালে ক্বিয়ামতের মাঠে আরশের নিচে ছায়ার ব্যবস্থা রয়েছে। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, سَبْعَةٌ يُظِلُّهُمُ اللَّهُ فِي ظِلِّهِ يَوْمَ لَا ظِلَّ إِلَّا ظِلُّهُ إِمَامٌ عَادِلُ 'আল্লাহ সাত শ্রেণীর লোককে তাঁর আরশের নিচে ছায়া দান করবেন, যে দিন তাঁর ছায়া ব্যতীত অন্য কোন ছায়া থাকবে না। তন্মধ্যে এক শ্রেণীর লোক হ'লেন ন্যায়বিচারক নেতা বা শাসক'।

ন্যায়বিচার সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলাও নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন, يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُونُوا قَوَّامِينَ بِالْقِسْطِ شُهَدَاءَ لِلَّهِ وَلَوْ عَلَى أَنْفُسِكُمْ أَوِ الْوَالِدَيْنِ وَالْأَقْرَبِينَ أَنْ يَكُنْ غَنِيًّا أَوْ فَقِيرًا فَاللَّهُ أَوْلَى بِهِمَا فَلَا تَتَّبِعُوا الْهَوَى أَنْ تَعْدِلُوْا وَإَنْ تَلْوُا أَوْ تُعْرِضُوا فَإِنَّ اللَّهَ كَانَ بِمَا تَعْمَلُونَ خَبِيرًا 'হে ঈমানদারগণ! তোমরা ন্যায়ের উপর প্রতিষ্ঠিত থাক, আল্লাহর ওয়াস্তে ন্যায়সঙ্গত সাক্ষ্য দান কর, তাতে তোমাদের নিজের বা পিতামাতার অথবা নিকটবর্তী আত্মীয়-স্বজনের যদি ক্ষতিও হয় তবুও। কেউ যদি ধনী কিংবা দরিদ্র হয়, তবে আল্লাহ তাদের শুভাকাঙ্খী তোমাদের চেয়ে বেশি। অতএব তোমরা বিচার করতে গিয়ে রিপুর কামনা-বাসনার অনুসরণ কর না। আর যদি তোমরা ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে কথা বল কিংবা পাশ কাটিয়ে যাও, তবে আল্লাহ তোমাদের যাবতীয় কাজ-কর্ম সম্পর্কে অবগত' (নিসা ৪/১৩৫)।

অন্যত্র তিনি বলেন, وَإِذَا قُلْتُمْ فَاعْدِلُوا وَلَوْ كَانَ ذَا قُرْبَى 'যখন তোমরা কথা বল, তখন সুবিচার কর। যদিও সে আত্মীয় হয়' (আন'আম ৬/১৫২)। তিনি আরো বলেন إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُ بِالْعَدْلِ وَ الْإِحْسَانِ 'নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদেরকে ন্যায়পরায়ণতা ও ইহসান করার নির্দেশ দিয়েছেন' (নাহল ১৬/৯০)। এসব আয়াত সকল প্রকার গোঁড়ামি পরিহার করে ন্যায়নীতি অবলম্বনের নির্দেশ দেয়, তেমনি সকল কাজে ইনসাফ অলম্বন কামনা করে। এতে মর্যাদাবান লোকের মর্যাদাকে তুচ্ছ করাও অন্যায়। আর ন্যায়নীতি ও ইনছাফ অপরাধ ও শত্রুতা থেকে দূরে থাকার প্রতি নির্দেশ করে। সবার প্রতি সহানুভূতিশীল, এমনকি বিরোধীদের প্রতিও সহানুভুতিশীল হওয়ার দাবী করে।

সমাজে এমন অনেক বিচারক রয়েছেন যারা পক্ষপাতমূলক ফায়ছালা দেন, কোন কোন ক্ষেত্রে তারা কোন এক পক্ষের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে রায় বা ফায়ছালা প্রদান করেন। তাদেরকে সতর্ক করে দিয়ে আল্লাহ বলেন, يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُونُوا قَوَّامِيْنَ لِلَّهِ شُهَدَاءَ بِالْقِسْطِ وَلَا يَجْرِمَنَّكُمْ شَنَآنُ قَوْমٍ عَلَى أَلا تَعْدِلُوا إِعْدِلُوا هُوَ أَقْرَبُ لِلتَّقْوَى وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ خَبِيرٌ بِمَا تَعْمَلُوْনَ 'হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহর উদ্দেশ্যে ন্যায় সাক্ষ্য দানের ব্যাপারে অবিচল থাকবে এবং কোন সম্প্রদায়ের শত্রুতার কারণে কখনও ন্যায়বিচার পরিত্যাগ করবে না, সুবিচার করবে। এটাই আল্লাহভীতির নিকটবর্তী। আল্লাহকে ভয় কর। তোমরা যা কর নিশ্চয়ই আল্লাহ সে বিষয়ে খুব জ্ঞাত' (মায়েদাহ ৫/৮)।

বিচার-ফায়ছালায় মানুষ বেশী নির্যাতনের শিকার হয়। তাই বিচার যাতে সুষ্ঠু হয় এবং মানুষও নির্যাতিত না হয়, সেজন্য রাসূল রাগান্বিত অবস্থায় বিচার করতে নিষেধ করেছেন। বরং স্বাভাবিক অবস্থায় বিচার করতে আদেশ করেছেন। তিনি বলেন, لاَ يَقْضِيَنَّ حَكَمُ بَيْنَ اثْنَيْنِ وَهُوَ غَضْبَانُ 'কোন বিচারক যেন রাগান্বিত অবস্থায় দু'পক্ষের মাঝে বিচার-ফায়ছালা না করে'। আবার তিনি সঠিক বিচারকের পুরস্কার জান্নাত এবং অন্যায় বিচারকের বাসস্থান জাহান্নাম বলে ঘোষণা করেছেন। সাথে সাথে না জেনে অজ্ঞভাবে বিচার করতেও তিনি নিষেধ করেছেন। তিনি বলেন, الْقُضَاةُ ثَلَاثَةٌ: وَاحِدٌ فِي الْجَنَّةِ وَاثْنَانِ فِي النَّارِ فَأَمَّا الَّذِي فِي الْجَنَّةِ فَرَجُلٌ عَرَفَ الْحَقَّ فَقَضَى بِهِ وَرَجُلٌ عَرَفَ الْحَقَّ فَجَارَ فِي الْحُكْمِ فَهُوَ فِي النَّارِ وَرَجُلٌ قَضَى لِلْنَّاسِ عَلَى جَهْلٍ فَهُوَ فِي النَّارِ 'বিচারক তিন প্রকারের হয়ে থাকে, তন্মধ্যে এক প্রকারের জন্য জান্নাত এবং দুই প্রকারের জন্য জাহান্নাম অবধারিত। সে বিচারক জান্নাতে প্রবেশ করবেন, যিনি সত্যটি উপলব্ধি করেছেন এবং তদনুযায়ী বিচার করেছেন। আর যে বিচারক সত্য উপলব্ধি করেও বিচারের মধ্যে অন্যায় (যুলুম) করল, সে বিচারক জাহান্নামী। অনুরূপভাবে সে বিচারকও জাহান্নামে প্রবেশ করবে যে, অজ্ঞতার সাথে মানুষের মধ্যে বিচার করল' (এবং ভুল ফায়ছালা দিল)।

সুতরাং বিচার-ফায়ছালা ও সাক্ষ্য দানের ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার করতে এবং সত্য সাক্ষ্য প্রদান করতে হবে। অবিচার ও মিথ্যাসাক্ষ্য থেকে বিরত থাকতে হবে। এক্ষেত্রে প্রভাবিত হয়ে কিংবা পক্ষপাতমূলকভাবে বিচার করা কিংবা সাক্ষ্য প্রদান করা মুমিনের বৈশিষ্ট্য বিরোধী। তাই এক্ষেত্রে ইনছাফ করাই ইসলামের দাবী।

তাছাড়া যোগ্য-দক্ষ বিচারক নিয়োগ করা রাষ্ট্রপ্রধানের কর্তব্য, যাতে দেশের জনগণ হক বিচার পায়। যেমন হাদীছে এসেছে, আলী (রাঃ) হতে বর্ণিত তিনি বলেন, (যখন) রাসূলুল্লাহ (ছাঃ), আমাকে ইয়ামানের শাসক নিযুক্ত করে পাঠালেন, তখন আমি আরয করলাম, হে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ)! আপনি আমাকে প্রেরণ করেছেন, অথচ আমি একজন যুবক, বিচার বা শাসন সম্পর্কে আমি অজ্ঞ। উত্তরে রাসূল (ছাঃ) বললেন, আল্লাহ তা'আলা তোমার অন্তরকে অচিরেই সৎপথ প্রদর্শন করবেন এবং তোমার যবানকেও সঠিক রাখবেন। অতঃপর তিনি বললেন, যখন দুই ব্যক্তি (বাদী ও বিবাদী) কোন এক ব্যাপার নিয়ে তোমার কাছে উপস্থিত হয়, তখন প্রতিপক্ষের কথাবার্তা না শোনা পর্যন্ত বাদীর পক্ষে (ডিক্রী) রায় প্রদান করবে না। কেননা প্রতিপক্ষের বর্ণনা হতে মোকদ্দমার রায় প্রদানে তোমার মদদ ও সাহায্য মিলবে। আলী (রাঃ) বলেন, (রাসূল ছাঃ-এর দো'আর পর) আমি আর কোন মোকদ্দমায় সন্দেহে পতিত হইনি।

অতএব আল্লাহভীরু, সৎ-যোগ্য বিচারক নিয়োগ দানের মাধ্যমে জনসেবায় ব্রতী হওয়া দায়িত্বশীলদের কর্তব্য। এ কর্তব্যে অবহেলা করা হলে মানুষ যুলুম-নির্যাতনের শিকার হয়। আল্লাহ আমাদেরকে এ থেকে বেঁচে থাকার তাওফীক দান করুন।

টিকাঃ
৫৫. মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত, হা/৭০১, 'ছালাত' অধ্যায়।
৫৬. মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/৩৭৩১।
৫৭. আবু দাউদ, ইবনু মাজাহ, মিশকাত হা/৩৭৩৫, সনদ ছহীহ, ইরওয়াউল গালীল হা/২৬১৪।
৫৮. আবু দাউদ হা/৩৫৮২; তিরমিযী হা/১৩৫৪ সনদ হাসান।

📘 মধ্যমপন্থা গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা 📄 আবেগ-অনুভূতির ক্ষেত্রে মধ্যপন্থা

📄 আবেগ-অনুভূতির ক্ষেত্রে মধ্যপন্থা


আবেগ, অনুভূতি, ভালবাসা-ঘৃণা, বন্ধুত্ব-শত্রুতা ইত্যাদি ক্ষেত্রে মধ্যপন্থী হওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ভালবাসায় সীমাতিক্রম করা বা শত্রুতার ক্ষেত্রে সীমালংঘন করাও ইসলামে নিষিদ্ধ। অনুরূপভাবে ঝগড়া বিবাদের ক্ষেত্রে পাপাচারে লিপ্ত হওয়াও নিষিদ্ধ, বরং এ ক্ষেত্রে মধ্যপন্থা অবলম্বনই ইসলামের শিক্ষা। আল্লাহ বলেন, 'হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহর উদ্দেশ্যে ন্যায় সাক্ষ্য দানের ব্যপারে অবিচল থাকবে এবং কোন সম্প্রদায়ের শত্রুতার কারণে কখনও ন্যায়বিচার পরিত্যাগ কর না, সুবিচার কর। এটাই আল্লাহভীতির নিকটবর্তী। আল্লাহকে ভয় কর। তোমরা যা কর নিশ্চয়ই আল্লাহ সে বিষয়ে খুব জ্ঞাত' (মায়েদাহ ৫/৮)।

হাদীছে বর্ণিত হয়েছে, আলী (রাঃ) বলেন, আমি নবী করীম (ছাঃ)-কে বলতে শুনেছি, أَحْبِبْ حَبِيبَكَ هَوْنًا مَّا عَسَى أَنْ يَكُوْنَ بَغِيْضَكَ يَوْمًا مَّا ، وَأَبْغِضُ بَغِيْضَكَ هَوْنًا مَّا، عَسَى أَنْ يَكُوْنَ حَبِيبَكَ يَوْمًا مَّا 'বন্ধুর সাথে স্বাভাবিক বন্ধুত্ব বজায় রাখ (বাড়াবাড়ি কর না), হ'তে পারে সে একদিন তোমার শত্রু হয়ে যাবে। অনুরূপভাবে শত্রুর সাথে স্বাভাবিক শত্রুতা বজায় রাখ (আধিক্য দেখিও না), হ'তে পারে সে একদিন তোমার বন্ধু হয়ে যাবে'।

কোন কোন সময় মানুষ স্বীয় বন্ধুর ভালবাসায় বিলীন হয়ে যায়, বন্ধুর ভালবাসায় মোহাবিষ্ট হয়ে পড়ে। আবার কোন সময় তার সাথে ক্রোধের আগুনে জ্বলে পুড়ে মরে। ফলে তার সাথে হিংসা, হানাহানি ও শত্রুতায় লিপ্ত হয়। এমনকি ক্রোধের কারণে ক্ষমার ফযীলত গ্রহণ করা থেকেও সে বিরত থাকে। তাই মুমিনের জন্য আবেগ, অনুভূতি ও ভালবাসার ক্ষেত্রে মধ্যপন্থা অবলম্বন আবশ্যক, যাতে সে আবেগতাড়িত হয়ে আশোভন আচরণে লিপ্ত না হয়। সুতরাং ভালবাসা, শত্রুতা, ঘৃণা ইত্যাদি ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি পরিহার করে মধ্যপন্থা অবলম্বন করতে হবে।

টিকাঃ
৫৯. তিরমিযী, হা/২০৬৫, 'সৎকাজ ও সদাচরণ' অধ্যায়; ছহীহ আদাবুল মুফরাদ, হা/১৩২১।

📘 মধ্যমপন্থা গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা 📄 রাজনৈতিক ক্ষেত্রে মধ্যপন্থা

📄 রাজনৈতিক ক্ষেত্রে মধ্যপন্থা


এক শ্রেণীর মানুষ রাজনৈতিক ক্ষেত্রে সবচেয়ে ধ্বংসাত্মক মতাদর্শ নিয়ে দেশ, জাতি ও ইসলামের মধ্যে চরম নৈরাজ্য সৃষ্টি করে থাকে। তাদের মতাদর্শ হচ্ছে-

১. হুকুমদাতা একমাত্র আল্লাহ, মানুষের হুকুম দানের অধিকার নেই। দলীল হচ্ছে আল্লাহর বাণী, إِنِ الْحُكْمُ إِلَّا لِلَّهِ 'আল্লাহ ছাড়া কারো হুকুম নেই' (ইউসুফ ১২/৪০, ৬৭)। এ আয়াতের অর্থ না বোঝার কারণে ছিফফীনের যুদ্ধে শালিস নিযুক্ত করার কারণে খারেজীরা আলী, মু'আবিয়া সহ সকল ছাহাবীকে কাফের আখ্যায়িত করে এবং আলী (রাঃ) তাদের হাতে নিহত হন। অথচ এ আয়াতের মৌলিক উদ্দেশ্য হলো, বিধানদাতা আল্লাহ তা'আলা এবং চূড়ান্ত ফায়ছালাকারীও তিনি। তাঁর সৃষ্টি হিসাবে মানুষ তাঁরই বিধান মেনে চলবে। এক্ষেত্রে কেউ প্রজাদের উপর প্রতিনিধির দায়িত্ব পালন করতে পারবে শরী'আতের নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে থেকে। রাসূলের বাণী অনুযায়ী এই প্রতিনিধি ভাল বা খারাপ হ'তে পারে।

২. আল্লাহর নাযিলকৃত বিধান অনুযায়ী যারা শাসনকার্য পরিচালনা করে না, তারা কাফের। প্রমাণ হচ্ছে আল্লাহর বাণী, وَمَنْ لَمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ فَأُوْلَئِكَ هُمُ الْكَافِرُونَ ‘আল্লাহ তা'আলার নাযিলকৃত বিধান অনুযায়ী যারা শাসনকার্য পরিচালনা করে না, তারা কাফের' (মায়েদাহ ৫/৪৪)। রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে শাসক কোন অন্যায় করলে বা তা প্রতিরোধ না করলে এবং আল্লাহ্র বিধান প্রতিষ্ঠা না করলে উক্ত আয়াতের আলোকে তারা ঐ শাসকগোষ্ঠীকে কাফের বলে গণ্য করে এবং তাদের হত্যা করা বৈধ মনে করে। অথচ পরবর্তী দু'টি আয়াতে একই ব্যাপারে দু'ধরনের বক্তব্য এসেছে। যেমন মহান আল্লাহ বলেন, وَمَنْ لَّمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنْزَلَ اللهُ فَأُولَئِكَ هُمُ الظَّالِمُوْনَ 'আল্লাহ তা'আলার নাযিলকৃত বিধান অনুযায়ী যারা শাসনকার্য পরিচালনা করে না, তারা যালেম' (মায়েদাহ ৫/৪৫)। তিনি আরো বলেন, وَمَنْ لَّمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنْزَلَ اللهُ فَأُولَئِكَ هُمُ الْفَاسِقُوْনَ. 'বিধান অনুযায়ী যারা শাসনকার্য পরিচালনা করে না, তারা ফাসেক' (মায়েদাহ ৫/৪৭)। এসব ক্ষেত্রে তারা লক্ষ্য রাখে না যে, আয়াতে বর্ণিত একই হুকুমের জন্য কাফের, যালেম ও ফাসেক কখন হবে কিংবা কার জন্য কোন হুকুম প্রযোজ্য?

প্রথম আয়াতটি (মায়েদাহ ৫/৪৪) ইউসুফ (আঃ) তাঁর কারাগারে বন্দী বন্ধুদেরকে যে দাওয়াত দিয়েছিলেন, তার বর্ণনা। তিনি পরে জেল হ'তে মুক্তি পেয়ে তৎকালীন মিসরের কুফরী হুকুমতের প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা 'আযীযে মিছরে'র অধীনে খাদ্যবিভাগের দায়িত্ব পালন করেছিলেন। সূরা মায়েদাহ্র পরবর্তী আয়াতগুলি আহলে কিতাবগণকে তাওরাত ও ইঞ্জীলের বিধান অনুযায়ী বিচার-ফায়ছালা করার জন্য বলা হয়েছে। এ আয়াতগুলি যদি সাধারণ অর্থে নেওয়া হয়, তাহ'লে প্রথম আয়াতটি 'হুকুমে তাকভীনী' বা প্রাকৃতিক বিধান অর্থে নিতে হবে, যার একচ্ছত্র মালিকানা আল্লাহ্ হাতে। এর অর্থ কখনোই রাষ্ট্রীয় বিধান নয়, যা পরিষ্কারভাবে 'হুকুমে আকুলীর' অন্তর্ভুক্ত। এটির অর্থ 'হুকমে শারঈ'ও নয়। তা যদি হ'ত তাহ'লে ইউসুফ (আঃ) নিজে নবী হয়ে এবং নিজে এই আয়াতের প্রবক্তা হয়ে তার বিরোধিতা করে কুফরী হুকুমতের অধীনে কোন দায়িত্ব পালন করতেন না। বরং হুকুমতের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে ক্ষমতা দখলের চেষ্টা করতেন। অতঃপর সূরা মায়েদাহ্র আয়াতগুলি ইসলামী রাষ্ট্রের আদালতের বিধান হিসাবে গণ্য হবে। যেন বিচারকগণ আল্লাহ্র নাযিলকৃত বিধান অনুযায়ী বিচার-ফায়ছালা করেন। অবশ্য যদি কোন বিষয়ে কুরআন ও হাদীছের স্পষ্ট দলীল না পাওয়া যায়, সে ক্ষেত্রে বিচারক ইজতেহাদের ভিত্তিতে রায় দিতে পারবেন।

আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রাঃ) সূরা মায়েদাহ ৪৪ আয়াতের فَأُولَئِكَ هُمُ الْكَافِرُوْনَ এর ব্যাখ্যায় বলেন, ليس بالكفر الذى يذهبون اليه 'এর অর্থ কুফরী নয়, যেদিকে লোকেরা গিয়েছে'। ত্বাউস বলেন, ليس بكفر ينقل عن الملة 'এর অর্থ ঐ কুফরী নয় যা তাকে ইসলামী মিল্লাত থেকে খারিজ করে দেয়'। আত্বা বলেন, এটি কুফরীর পরেই সবচেয়ে বড় পাপ' (তাফসীর ইবনু কাছীর)। এক্ষণে আয়াতগুলির মর্ম হ'ল এই যে, যদি কোন মুসলিম বিচারক আল্লাহকৃত কোন হারামকে হারাম বলে বিশ্বাস করেন, কিন্তু বাস্তবে উক্ত হারাম কর্ম সম্পাদন করেন, তাহ'লে তিনি ফাসেক ও পাপিষ্ঠ মুসলিম হিসাবে গণ্য হবেন। তার বিষয়টি আল্লাহ্র উপরে ছেড়ে দেওয়া হবে। চাইলে তিনি তাকে আযাব দিবেন, চাইলে ক্ষমা করবেন। কেননা কবীরা গুনাহগার মুসলিম 'কাফের' হয় না। তবে খারেজীদের মতে ঐ ব্যক্তি কাফের (কুরতুবী)। সে চিরস্থায়ী জাহান্নামী এবং তার রক্ত হালাল।

উপরোক্ত আয়াতগুলির বাহ্যিক অর্থের ভিত্তিতে একশ্রেণীর লোক দেশে নির্বিচারে মানুষ হত্যা করে, মনে করে যে তারা জিহাদ করছে। তাদের ধারণা অনুযায়ী তারা মরলে গাযী ও বাঁচলে শহীদ। তাদের এ ধারণা সম্পূর্ণ ভ্রান্ত। যে ছালাত আদায় করে সে যেমন কাফের নয়, তেমনি তাকে হত্যা করাও বৈধ নয়। এমর্মে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, مَنْ صَلَّي صَلَاتَنَا وَاسْتَقْبَلَ قِبْلَتَنَا وَأَكَلَ ذَيْحَتَنَا فَذَلِكَ الْمُسْلِمُ الَّذِي لَهُ ذِمَّةُ اللهِ وَذِمَّةُ রَسُولِهِ، فَلَا تَحْقِرُوا اللَّهَ فِي ذِمَّتِهِ - 'যে ব্যক্তি আমাদের মত ছালাত আদায় করে, আমাদের ক্বিবলার দিকে মুখ করে, আমাদের যবহকৃত প্রাণী ভক্ষণ করে সে মুমিন। তার ব্যাপারে আল্লাহ্ এবং তাঁর রাসূলের যিম্মা রয়েছে। সুতরাং যিম্মা পালনের ক্ষেত্রে তোমরা আল্লাহকে তুচ্ছ জ্ঞান কর না'। তেমনি ছালাত আদায়কারী কোন মুসলমানকে হত্যা করা ইসলাম বহির্ভূত। এ সম্পর্কে মহানবী (ছাঃ) আরো বলেন, أُمِرْتُ أَنْ أُقَاتِلَ النَّاسَ حَتَّى يَشْهَدُوا أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ وَأَنَّ مُحَمَّدًا رَّسُوْلُ اللَّهِ وَيُقِيمُوا الصَّلَاةَ وَيُؤْتُوا الزَّكَاةَ، فَإِذَا فَعَلُوْا ذَلِكَ عَصَمُوا مِنِّي دِمَاءَهُمْ وَأَمْوَالَهُمْ إِلَّا بِحَقِّ الْإِسْلَامِ، وَحِسَابُهُمْ عَلَى اللَّهِ 'আমি মানুষের সাথে যুদ্ধ করতে আদিষ্ট হয়েছি যতক্ষণ না তারা এ সাক্ষ্য দেয় যে, আল্লাহ ছাড়া কোন উপাস্য নেই এবং মুহাম্মাদ (ছাঃ) আল্লাহ্র রাসূল। আর যদি না তারা ছালাত কায়েম করে এবং যাকাত দেয়। কিন্তু যদি তারা এসব পালন করে তাহলে আমাদের নিকট থেকে তার জান-মাল নিরাপদে থাকবে। তবে ইসলামের হক ব্যতীত। আর তাদের হিসাব হবে আল্লাহ্র নিকটে'।

রাজনৈতিক ক্ষেত্রে আরেকটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষণীয়, তা হচ্ছে প্রত্যেকে নিজের সমর্থিত দলকে সঠিক মনে করে থাকে। এ মর্মে আল্লাহ বলেন, كُلُّ حِزْبٍ بِمَا لَدَيْهِمْ فَرِحُوْনَ 'প্রত্যেকে নিজেদের নিকট যা আছে তা নিয়েই গর্বিত' (মুমিনূন ২৩/৫৩)। এমনকি সমর্থিত দলের প্রতি মানুষ অনেক ক্ষেত্রে এতই গোঁড়া সমর্থক হয়ে পড়ে যে, দলের কোন ভুলও তার কাছে সঠিক মনে হয়। দলের যে কোন সিদ্ধান্তই তার কাছে চূড়ান্ত বলে গৃহীত হয়। কোন কোন ক্ষেত্রে তারা কুরআন-হাদীছের নির্দেশকেও উপেক্ষা করে। এসবই বাড়াবাড়ি। এগুলি পরিহার করে এক্ষেত্রেও মধ্যপন্থা অবলম্বন করতে হবে।

টিকাঃ
৬০. প্রফেসর ড. ইউসুফ আল-কারযাভী, আধুনিক যুগ: ইসলাম কৌশল ও কর্মসূচি (ঢাকা: ২০০৩), পৃ. ১২৩।
৬১. মিশকাত, হা/৩৬৬১-৬৪ ও হা/৩৬৯৪, 'ইমারত' অধ্যায়।
৬২. বুখারী, হা/৭০৫২; মুসলিম, হা/৪৭৫২; মিশকাত, হা/৩৬৭১, 'নেতৃত্ব ও পদমর্যাদা' অধ্যায়।
৬৩. বুখারী হা/৭৩৫২।
৬৪. হাকেম ২/৩১৩ পৃঃ হাদীছ ছহীহ।
৬৫. বুখারী, মিশকাত, হা/১৩ 'ঈমান' অধ্যায়।
৬৬. মুত্তাফাক্ব 'আলাইহ; মিশকাত, হা/১২, 'ঈমান' অধ্যায়।

ফন্ট সাইজ
15px
17px