📄 চরিত্র-মাধুর্যে মধ্যপন্থা
আক্বীদা-বিশ্বাস ও ইবাদতে যেমন মধ্যপন্থা অবলম্বন করতে হবে তেমনি আচার-আচরণ, চাল-চলনসহ সকল কর্মকাণ্ডে মধ্যপন্থা অবলম্বনের জন্য ইসলামে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এখানে আখলাক ও মু'আমালাত তথা চারিত্রিক ও ব্যবহারিক ক্ষেত্রে মধ্যপন্থা অবলম্বনের কয়েকটি দিক উল্লেখ করা হ'ল।-
(ক) চাল-চলনে মধ্যপন্থা : মানুষের চাল-চলনে অনেক সময় গর্ব-অহংকার প্রকাশ পায়। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন মানুষকে পৃথিবীতে অহংকারবশে চলতে নিষেধ করেছেন। তিনি বলেন, وَلَا تَمْشِ فِي الْأَرْضِ مَرَحًا إِنَّكَ لَنْ تَخْرِقَ الْأَرْضَ وَلَنْ تَبْلُغَ الْجِبَالَ طُولاً - 'পৃথিবীতে দম্ভভরে পদচারণা করো না। নিশ্চয়ই তুমি কখনোই ভূপৃষ্ঠকে বিদীর্ণ করতে পারবে না এবং উচ্চতায় কখনোই পর্বত প্রমাণ হ'তে পারবে না' (বনু ইসরাঈল ১৭/৩৭)।
পক্ষান্তরে চাল-চলনে মধ্যপন্থা অবলম্বনের নির্দেশ দিয়ে আল্লাহ বলেন, وَأَقْصِدْ فِي مَشْيِكَ وَاغْضُضْ مِنْ صَوْتِكَ إِنَّ أَنْكَرَ الْأَصْوَاتِ لَصَوْتُ الْحَمِيرِ - মধ্যপন্থা অবলম্বন কর, কণ্ঠস্বরকে নিম্নগামী রাখ। নিশ্চয়ই নিকৃষ্ট আওয়ায হচ্ছে গাধার আওয়ায' (লোকুমান ৩১/১৯)। ইবনু কাছীর (রহঃ) এ আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন, أي امش مقتصدا مشيًا ليس بالبطئ المتثبط ولا بالسريع المفرط بل عدلا و وسطًا بين بين. অর্থাৎ 'মধ্যম গতিতে চল। অতি দ্রুতও নয়, আবার নিতান্ত আস্তেও নয়, বরং শান্ত-শিষ্টভাবে মধ্যপন্থা অবলম্বন করে চলতে হবে'। চাল-চলনে মধ্যপন্থা অবলম্বনের প্রতি গুরুত্বারোপ করে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, السَّمْتُ الْحَسَنُ وَالتَّوَدَةُ وَالْاِقْتِدَصَادَ جُزْءٌ মঁন أَرْبَعٍ وَعِشْرِينَ جُزْءٌ مِّنَ النُّبُوَّةِ - চাল-চলন, ধীরস্থিরতা এবং মধ্যপন্থা অবলম্বন নবুওয়াতের চব্বিশ ভাগের একভাগ'। অন্য হাদীছে এসেছে, আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রাঃ) হ'তে বর্ণিত নবী করীম (ছাঃ) বলেন, 'সচ্চরিত্রতা, উত্তম চাল-চলন এবং মধ্যপন্থা অবলম্বন নবুওয়াতের পঁচিশ ভাগের এক ভাগ'।
(খ) কথাবার্তায় মধ্যপন্থা : কথাবার্তায় কণ্ঠস্বর স্বাভাবিক রাখার জন্যও আল্লাহ তা'আলা নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন, 'কণ্ঠস্বরকে নিম্নগামী রাখ। নিশ্চয়ই নিকৃষ্ট আওয়ায হচ্ছে গাধার আওয়ায' (লুকুমান ৩১/১৯)। এ আয়াতাংশের ব্যাখ্যায় ইবনু কাছীর (রহঃ) বলেন, أي لا تبالغ في الكلام ولا ترفع صوتك فيما لا فائدة فيه. 'কথা বার্তায় অতিরঞ্জন করো না, কণ্ঠস্বর উচ্চ করো না, যাতে কোন উপকারিতা নেই'। মুজাহিদসহ আরো অনেকে বলেন, নিশ্চয়ই আওয়াযের মধ্যে গাধার আওয়ায অত্যন্ত নিকৃষ্ট। অর্থাৎ উচ্চ কণ্ঠস্বরকে গাধার উচ্চ আওয়াযের সাথে তুলনা করা হয়েছে। আর এটা আল্লাহ্র নিকট অত্যন্ত অপসন্দনীয় ও ঘৃণিত। চিৎকার, চেঁচামেচি ও কর্কশতা পরিহার এবং বিশুদ্ধ ও নম্রভাষায় কথা বলার নির্দেশই উক্ত আয়াতের মূল প্রতিপাদ্য বিষয়। সমাজে এমন কিছু লোক আছে যারা কথা বলতে গেলেই চিৎকার করে কথা বলে। উচ্চৈঃস্বরে কথা বলাই তাদের অভ্যাস। তারা নিজেদের পরিবার-পরিজনের সাথে যেমনভাবে উচ্চৈঃস্বরে কথা বলে তেমনিভাবে আলেম-ওলামা, সমাজের গণ্যমান্য, সম্মানিত ব্যক্তিবর্গের সাথেও অনুরূপভাবে কথা বলে। আল্লাহ তা'আলা এগুলি পরিহার করার নির্দেশ দিয়ে বলেন, يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَرْفَعُوا أَصْوَاتَكُمْ فَوْقَ صَوْتِ النَّبِيِّ وَلَا تَجْهَرُوا لَهُ بِالْقَوْلِ كَجَهْرِ بَعْضِكُمْ لِبَعْضٍ أَنْ تَحْبَطَ أَعْمَالُكُمْ وَأَنْتُمْ لَا تَشْعُرُوْنَ 'হে মুমিনগণ! তোমরা নবীর কণ্ঠস্বরের উপর তোমাদের কণ্ঠস্বর উচু করো না এবং তোমরা একে অপরের সাথে যেরূপ উচ্চৈঃস্বরে কথা বল, তাঁর সাথে সেরূপ উচ্চৈঃস্বরে কথা বলো না। এতে তোমাদের কর্ম নিষ্ফল হয়ে যাবে এবং তোমরা টেরও পাবে না' (হুজুরাত ৪৯/২)। ওলামায়ে কেরাম নবীগণের উত্তরসূরী হিসাবে তাদের সাথেও বিনয় ও নম্রতার সাথে কণ্ঠস্বর নিচু রেখে কথা বলতে হবে।
রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) কথাবার্তায় অহংকার প্রকাশ ও অন্যকে তুচ্ছ করে কথা বলতে নিষেধ করেছেন। তিনি বলেন, 'ক্বিয়ামতের দিন তোমাদের মধ্য থেকে আমার নিকট সবচেয়ে প্রিয় ও সবচেয়ে নিকটে উপবিষ্ট হবে সেই ব্যক্তি, যার চরিত্র সবচেয়ে ভাল। আর ক্বিয়ামতের দিন তোমাদের মধ্য থেকে আমার নিকট সবচেয়ে ঘৃণ্য ও আমার থেকে সবচেয়ে দূরবর্তী হবে সেইসব লোক, যারা দ্বিধা সহকারে কথা বলে, কথার মাধ্যমে অহংকার প্রকাশ করে এবং যারা 'মুতাফাইহিকুন'। ছাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহ্র রাসূল (ছাঃ)! দ্বিধান্বিত বাক্যালাপকারী ও কথার মাধ্যমে অহংকার প্রকাশকারীর অর্থ তো বুঝলাম, কিন্তু 'মুতাফাইহিকূন' কারা? তিনি বললেন, অহংকারী ব্যক্তিরা'। উল্লিখিত হাদীছের কতিপয় শব্দের ব্যাখ্যায় ইমাম নববী (রহঃ) বলেন, 'আছ-ছারছারু' বলতে ঐ লোককে বুঝায়, যে অত্যধিক কৃত্রিমভাবে কথা বলে থাকে। 'আল-মুতাশাদ্দিকু' ঐ লোককে বলে, যে নিজের কথার দ্বারা অন্যের উপর নিজের প্রাধান্য ও বড়াই প্রকাশ করে এবং কথাবার্তা বলার সময় নিজের কথার বিশুদ্ধতা ও শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিপন্ন করে থাকে। 'মুতাফাইহিকুন' শব্দটি 'ফাহকুন' ধাতু থেকে নির্গত। এর অর্থ মুখ ভর্তি করা বা পূর্ণ করা। কাজেই 'আল-মুতাফাইহিকূন' বলতে ঐ লোককে বুঝায়, যে মুখ ভর্তি করে কথা বলে এবং তাতে বাড়াবাড়ি করে, চিবিয়ে চিবিয়ে কথা বলে এবং নিজের অহংকার ও আভিজাত্যের বহিঃপ্রকাশের উদ্দেশ্যে কথা বলে। সচ্চরিত্রের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে তিরমিযী (রহঃ) আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক (রহঃ)-এর ভাষায় বলেন, সচ্চরিত্র হলো হাসি-খুশি মুখ, সত্য-ন্যায়কে অবলম্বন করা এবং অন্যকে কোনরূপ কষ্ট দেয়া থেকে বেঁচে থাকা। কথাবার্তায় অশ্লীল ভাষা ব্যবহারকারীকে আল্লাহ পসন্দ করেন না। আবুদ দারদা (রাঃ) হ'তে বর্ণিত, নবী করীম (ছাঃ) বলেছেন, 'কিয়ামতের দিন মুমিনের পাল্লায় সর্বাপেক্ষা ভারী যে জিনিসটি রাখা হবে, তা হলো উত্তম চরিত্র। আর আল্লাহ তা'আলা অশ্লীলভাষী দুশ্চরিত্রকে ঘৃণা করেন'।
(গ) আচার-ব্যবহারে মধ্যপন্থা: মুসলমানদের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে তারা আচার-ব্যবহারে বিনয়ী ও নম্র হবে। আবু হুরায়রা (রাঃ) হ'তে বর্ণিত, নবী করীম (ছাঃ) বলেছেন, 'ঈমানদার হয় সরল ও ভদ্র, পক্ষান্তরে পাপী হয় ধূর্ত ও হীন চরিত্রের'। অন্য হাদীছে এসেছে, মাকহুল (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, 'ঈমানদারগণ নাকে রশি লাগানো উটের ন্যায় সরল, সহজ ও কোমল স্বভাবের হয়। যখন তাকে টানা হয়, তখন সে চলে। আর যদি তাকে পাথরের উপর বসাতে চাওয়া হয়, তাহলে সে তার উপর বসে পড়ে'।
আল্লাহ তাঁর রাসূলকে মুসলমানদের প্রতি বিনয়ী ও সদয় হওয়ার নির্দেশ দিয়ে বলেন, وَاخْفِضْ جَنَاحَكَ لِمَنِ اتَّبَعَكَ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ 'যারা তোমার অনুসরণ করে, সেসমস্ত বিশ্বাসীর প্রতি সদয় হও' (শু'আরা ২৬/২১৫)। মুমিনদের পারস্পরিক আচার-ব্যবহার সম্পর্কে আল্লাহ আরো বলেন, يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا مَنْ يَرْتَدَّ مِنْكُمْ عَنْ دِينِهِ فَسَوْفَ يَأْتِي اللَّهُ بِقَوْمٍ يُحِبُّهُمْ وَيُحِبُّونَهُ أَذِلَّةٍ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ أَعِزَّةٍ عَلَى الْكَافِرِينَ، 'হে ঈমানদারগণ! তোমাদের মধ্যে কেউ তার দ্বীন থেকে ফিরে গেলে নিশ্চয়ই আল্লাহ এমন এক সম্প্রদায় সৃষ্টি করবেন, যারা হবে আল্লাহ্ প্রিয় এবং আল্লাহ হবেন তাদের প্রিয়। তারা মুমিনদের প্রতি নম্র ও বিনয়ী হবে এবং কাফেরদের প্রতি হবে অত্যন্ত কঠোর' (মায়েদা ৫/৫৪)।
উল্লিখিত আয়াত থেকে প্রতীয়মান হয় যে, ইসলাম মানুষকে আচার-ব্যবহারে কঠোর ও রুক্ষ্ম না হয়ে কোমল ও নম্র হওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, لَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ الْجَوَّاظُ وَلَا الْجَعْظَرِيُّ ‘কঠোর ও রুক্ষ স্বভাবের ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করবে না’। আল্লাহ তা'আলা রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে লক্ষ্য করে বলেন, فَبِمَا رَحْمَةٍ مِّنَ اللَّهِ لِنْتَ لَهُمْ وَلَوْ كُنْتَ فَظًّا غَلِيظَ الْقَلْبِ لَأَنْفَضُّوا مِنْ حَوْلِكَ فَاعْفُ عَنْهُمْ وَاسْتَغْفِرْ لَهُمْ وَشَاوِرْهُمْ فِي الْأَمْرِ ‘আল্লাহ্র রহমতেই আপনি তাদের জন্য কোমল হৃদয় হয়েছেন। পক্ষান্তরে আপনি যদি রুক্ষ্ম ও কঠোর হৃদয়ের অধিকারী হতেন, তাহলে তারা আপনার কাছ থেকে দূরে চলে যেত। কাজেই আপনি তাদের ক্ষমা করে দিন ও তাদের জন্য মাগফিরাত প্রার্থনা করুন এবং তাদের সাথে বিভিন্ন কাজে পরামর্শ করুন’ (আলে ইমরান ৩/১৫৯)।
আচার-আচরণে বিনয়ী ও বিনম্র হওয়ার নির্দেশ সম্বলিত বহু হাদীছ বর্ণিত হয়েছে। নিম্নে কয়েকটি হাদীছ উপস্থাপন করা হ'ল-
১. আয়ায ইবনু হিমার (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, ‘আল্লাহ আমার নিকট অহী পাঠিয়েছেন যে, তোমরা পরস্পরের সাথে বিনয় ও নম্র আচরণ করো, এমনকি কেউ কারো উপর গৌরব করবে না এবং একজন আরেকজনের উপর বাড়াবাড়ি করবে না’।
২. আবু হুরায়রা (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, ‘দানের দ্বারা সম্পদ কমে না। বান্দার ক্ষমার গুণ দ্বারা আল্লাহ তার ইয্যত ও সম্মান বৃদ্ধি করেন। কেউ আল্লাহ্র সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে বিনয় ও নম্রতা অবলম্বন করলে আল্লাহ তার মর্যাদা বাড়িয়ে দেন’।
প্রকাশ থাকে যে, সমাজে এমন কিছু মানুষ আছে, যারা অতি কঠোর ও রুক্ষ্ম স্বভাবের এবং তারা অত্যন্ত নিষ্ঠুর ও কর্কশ ব্যবহারেরও অধিকারী। অনেকে আছে অতি নির্দয় ও অশালীন। আবার কেউ আছে অতীব শান্ত-শিষ্ট, নম্র ও বিনয়ী। এসব দোষ-ত্রুটি ছোট-বড় সবার মাঝে থাকতে পারে। মুমিনের আচার-ব্যবহার হবে অতি কোমল ও অতি কঠোরতার মধ্যবর্তী। কেননা অতি বিনয়ী হ’লে অধিকার বঞ্চিত হবে এবং কোন কোন ক্ষেত্রে অত্যাচারিত হবে। আর অতি কঠোর হ’লে মানুষ তার নিকট থেকে দূরে সরে যাবে। এজন্য মুমিনদের যথার্থ বিনয়ী-নম্র, কোমল, শান্ত-শিষ্ট ও দয়ার্দ্র হওয়া বাঞ্ছনীয়। কঠোরতা ও নিষ্ঠুরতা মুমিনের বৈশিষ্ট্য বিরোধী। আচার-ব্যবহারে বিনয়ী ও নম্র হওয়ার পাশাপাশি অহংকার, আত্মম্ভরিতা ইত্যাদি পরিহার করতে হবে। এসব মানব চরিত্রের দুষ্টক্ষত। এগুলি মানুষকে মনুষ্যত্বের স্তর থেকে পশুত্বের স্তরে নামিয়ে দেয়। এজন্য ইসলাম মানুষকে উদ্ধত ও দাম্ভিকতা পরিহার করতে নির্দেশ দিয়েছে। সাথে সাথে আল্লাহ দাম্ভিকতা পরিহারকারীদের জন্য পুরস্কারের ঘোষণা দিয়েছেন। আল্লাহ তা’আলা বলেন, تِلْكَ الدَّارُ الْآخِرَةُ نَجْعَلُهَا لِلَّذِينَ لَا يُرِيدُوْনَ عُلُوًّا فِي الْأَرْضِ وَلَا فَسَادًا وَالْعَاقِبَةُ لِلْمُتَّقِينَ ‘এটা আখেরাতের সেই আবাস, যা আমি নির্ধারণ করি তাদের জন্য, যারা এ পৃথিবীতে উদ্ধত হ’তে ও বিপর্যয় সৃষ্টি করতে চায় না। শুভ পরিণাম মুত্তাক্বীদের জন্য’ (ক্বাছাছ ২৮/৮৩)।
দাম্ভিক-অহংকারীকে আল্লাহ পসন্দ করেন না, এমর্মে তিনি বলেন, وَلَا تُصَعِّرْ حَدَّكَ لِلنَّاسِ وَلَا تَمْশِ فِي الْأَرْضِ مَرَحًا إِنَّ اللَّهَ لا يُحِبُّ كُلَّ مُخْتَالٍ فَخُورٍ - তুমি লোকদের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে কথা বলো না এবং পৃথিবীতে দম্ভভরে বিচরণ করো না। আল্লাহ কোন অহংকারী দাম্ভিককে পসন্দ করেন না' (লুকুমান ৩১/১৮)। মহান আল্লাহ অহংকারীর ভয়াবহ পরিণতি অবহিত করার জন্য কুরআন মাজীদে কারূণের ঘটনা নিম্নোক্তভাবে উল্লেখ করেছেন- কারূণ ছিল মূসার সম্প্রদায়ভুক্ত... গতকাল যারা তার মত হওয়ার বাসনা প্রকাশ করেছিল, তারা প্রত্যুষে বলতে লাগল, হায়, আল্লাহ তাঁর বান্দাদের মধ্যে যার জন্য ইচ্ছা রিযিক বর্ধিত করেন ও হ্রাস করেন। আল্লাহ আমাদের প্রতি অনুগ্রহ না করলে, আমাদেরকেও ভূগর্ভে বিলীন করে দিতেন। হায়, কাফেররা সফলকাম হবে না' (ক্বাছাছ ২৮/৭৬-৮২)। অহংকারীর পরিণতি সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, ‘যার অণু পরিমাণ অহংকার রয়েছে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না। জনৈক ছাহাবী বললেন, কোন লোক তো চায় যে, তার কাপড়টা সুন্দর হোক, জুতাটা আকর্ষণীয় হোক (এটাও কি খারাপ)? তিনি বললেন, আল্লাহ নিজে সুন্দর। তিনি সৌন্দর্য পসন্দ করেন। অহংকার হলো গর্বভরে সত্যকে অস্বীকার করা এবং মানুষকে হেয় জ্ঞান করা’। কি তোমাদেরকে জাহান্নামীদের বিষয়ে সংবাদ দিব না? তারা হলো, প্রত্যেক অহংকারী, সীমালংঘনকারী, বদবখত ও উদ্ধত লোক’।
উল্লিখিত আয়াত ও হাদীছ দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, আচার-ব্যবহারে অহংকার, দাম্ভিকতা, আত্মম্ভরিতা ইত্যাদি পরিহার করা এবং বিনয়ী ও নম্র হওয়া মুমিনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। আর আল্লাহ রাব্বুল আলামীন কোমল, তিনি কোমলতা পসন্দ করেন। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, إِنَّ اللَّهَ رَفِيقُ يُحِبُّ الرِّفْقَ فِي الْأُمُوْরِ كُلِّهِ ‘আল্লাহ কোমল ও মেহেরবান। তাই প্রতিটি কাজে তিনি কোমলতা ও মেহেরবানী পসন্দ করেন’। আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নবী করীম (ছাঃ) বলেন, স্বয়ং কোমল ও সহানুভূতিশীল। তিনি কোমলতা ও সহানুভূতিশীলতাকে ভালবাসেন। তিনি কোমলতার মাধ্যমে এমন জিনিস দান করেন, যা কঠোরতার দ্বারা দেন না। আর কোমলতা ছাড়া অন্য কিছু দ্বারা তিনি তা দেন না’। অন্যত্র রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, যে জিনিসে কোমলতা থাকে, কোমলতা সেটিকে সৌন্দর্য মণ্ডিত করে। আর যে জিনিস থেকে কোমলতা ছিনিয়ে নেয়া হয়, সেটাই দোষ-ত্রুটিযুক্ত হয়ে যায়’।
(ঘ) মানুষের সাথে সংশ্রব ও মেলামেশায় মধ্যপন্থা: মানুষের সাথে মেলামেশায় মধ্যপন্থা অবলম্বন করা আবশ্যক। কোন কোন মানুষ জনবিচ্ছিন্ন হয়ে একাকী থাকা পসন্দ করে, কারো সাথে মিশতে চায় না। ফলে লোকজনও তার সঙ্গ পরিহার করে। আবার অনেকে আছে অত্যন্ত সঙ্গপ্রিয়, আড্ডাবাজ। তারা একাকী থাকতে পারে না, মানুষের সাথে মেলামেশা ও আড্ডায় তারা অধিকাংশ সময় নষ্ট করে। এমনকি বাজারে ও ক্লাবেই তাদের সময় কাটে। সভা-সমিতি, মিটিং-মিছিল ইত্যাদিতে তারা মশগুল থাকে। নিজের জন্য ও পরিবার-পরিজনের জন্য চিন্তা করার তাদের কোন ফুরসত থাকে না। এসবই বাড়াবাড়ি। এতদুভয়ের মধ্যবর্তী অবস্থা হচ্ছে প্রয়োজনে সাধ্যমত মানুষের সাথে মেশা বা তাদের সংস্পর্শে আসা এবং বিনা প্রয়োজনে তাদের সঙ্গ পরিহার করা। যাতে একেবারে জনবিচ্ছিন্ন না হয় এবং তাদের সাথে মত্ত হয়ে স্বীয় দায়িত্ব-কর্তব্যও ভুলে না যায়। তাই এক্ষেত্রে মধ্যপন্থা অবলম্বন করা অতীব যরূরী। আর মানুষের সাথে মেলামেশার ক্ষেত্রে সৎ, শিক্ষিত, মার্জিত, ভদ্র, শালীনদের সাথে সংশ্রব রাখাই উত্তম। অসৎ, অভদ্র, অশালীন, অশিক্ষিত ও মূর্খদের সাহচর্য পরিহার করা বা তাদের থেকে দূরে থাকা আবশ্যক। কেননা আল্লাহ তা'আলা বলেন, خُذِ الْعَفْوَ وَأْمُرْ بِالْعُرْفِ وَأَعْرِضْ عَنِ الْجَاهِلِينَ. 'ক্ষমা অবলম্বন কর এবং মূর্খ লোকদের এড়িয়ে চলো' (আ'রাফ ৭/১৯৯)।
মুসলিম কার সাথে মিশবে ও সংশ্রব রাখবে এ সম্পর্কে হাদীছেও সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। আব্দুল্লাহ ইবনু মাস'ঊদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, আমি কি তোমাদের এ বিষয়ে জানাব না যে, কোন্ লোক জাহান্নামের আগুনের জন্য হারাম অথবা কার জন্য জাহান্নামের আগুন হারাম? জাহান্নামের আগুন এমন প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য হারাম, যে লোকদের নিকটে বা তাদের সাথে মিলেমিশে থাকে, যে কোমলমতি, নরম মেজায ও বিনম্র স্বভাববিশিষ্ট'। আবু মূসা (রাঃ) হ'তে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, সৎ বা উত্তম সঙ্গী এবং অসৎ বা খারাপ সঙ্গীর দৃষ্টান্ত হচ্ছে, মিশক আম্বর ওয়ালা ও হাপর ওয়ালার ন্যায়। মিশক আম্বর ওয়ালা তোমাকে কিছু দান করবে কিংবা তুমি তার কাছ থেকে কিছু ক্রয় করবে অথবা তার নিকট থেকে তুমি সুগন্ধি লাভ করবে। আর হাপর ওয়ালা তোমার বস্ত্র জ্বালিয়ে দেবে কিংবা তার নিকট থেকে তুমি দুর্গন্ধ পাবে'।
মানুষের সাথে মেলামেশার ক্ষেত্রে যেমন মুত্তাক্বী, পরহেযগার, সচ্চরিত্রবান লোকের সাথে মিশতে হবে, তেমনি তাদের দেয়া কষ্টে ধৈর্যধারণ করতে হবে। কেননা যারা মানুষের দেয়া কষ্টে ধৈর্যধারণ করে, তার জন্য অনেক ছওয়াব রয়েছে। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, 'মুমিন ব্যক্তি যে মানুষের সাথে মিশে এবং তাদের প্রদত্ত কষ্টে ধৈর্যধারণ করে, সে ঐ মুমিন ব্যক্তির চেয়ে অধিক নেকী লাভ করে, যে মানুষের সাথে মিশে না এবং তাদের দেয়া কষ্টেও ধৈর্যধারণ করে না'।
মানুষের সাথে মেলামেশা সম্পর্কে ইমাম নববী (রহঃ) বলেন, 'জেনে রাখ, জনসাধারণের উপরোল্লিখিত (সভা-সমিতি, উত্তম বৈঠক, সৎকাজের আদেশ, অসৎ কাজের নিষেধ ইত্যাদি বিষয়ে) বৈঠক ও অনুষ্ঠানাদিতে অংশগ্রহণ, মেলামেশা ও উঠাবসা করা উত্তম। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) ও অন্যান্য সকল আম্বিয়ায়ে কেরাম (আঃ), খুলাফায়ে রাশেদীন, ছাহাবায়ে কেরাম ও তাবেঈনে ইযাম প্রত্যেকের এই নীতি ও আদর্শ ছিল। পরবর্তীকালের ওলামায়ে কেরাম ও উম্মতের উৎকৃষ্ট মনীষীগণও একই আদর্শের অনুসরণ করেছেন। ইমাম শাফেঈ ও আহমাদ (রহঃ) সহ ফিকুহ শাস্ত্রের প্রসিদ্ধ ইমামগণ ও অপরাপর ইসলামী চিন্তাবিদ সকলেই সমাজবদ্ধভাবে বসবাস করা এবং সামাজিক ও সাংসারিক দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনকেই ইসলামী যিন্দেগীর সফলতার পূর্বশর্ত হিসাবে গণ্য করেছেন'।
টিকাঃ
২৬. ইবনু কাছীর, তাফসীরুল কুরআনিল আযীম, (বৈরুত: ১৯৯৬/১৪১৬ হিঃ), ৩/৪৪৭পৃ.।
২৭. তিরমিযী; মিশকাত, হা/৫০৫৯; বঙ্গানুবাদ মিশকাত, হা/৪৮৩৮, সনদ হাসান।
২৮. আবুদাউদ, হা/৪৮৭৬; মিশকাত, হা/৫০৬০; বঙ্গানুবাদ মিশকাত, হা/৪৮৩৯, সনদ হাসান।
২৯. তাফসীরুল কুরআনিল আযীম, ৩/৪৪৭পৃ.।
৩০. প্রাগুক্ত।
৩১. তিরমিযী, হা/২০১৮, সনদ ছহীহ।
৩২. রিয়াযুছ ছালেহীন, পৃ. ২৩৩।
৩৩. তিরমিযী, রিয়াযুছ ছালেহীন, পৃ. ২৩৩।
৩৪. তিরমিযী, হা/২০০৩-৪; মিশকাত হা/৫০৮১; বঙ্গানুবাদ মিশকাত হা/৪৮৫৯।
৩৫. তিরমিযী, আবুদাঊদ, হা/৪৭৯০; মিশকাত, হা/৫০৮৫; বঙ্গানুবাদ মিশকাত, হা/৪৮৬৩ 'কোমলতা, লাজুকতা ও সচ্চরিত্রতা' অনুচ্ছেদ, সনদ হাসান।
৩৬. তিরমিযী; মিশকাত, হা/৫০৮৬; বঙ্গানুবাদ মিশকাত, হা/৪৮৬৪, ছহীহাহ হা/৯৩৬।
৩৭. আবুদাউদ, হা/৪৮০১; মিশকাত হা/৫০৮০; বঙ্গানুবাদ মিশকাত হা/৪৮৫৮।
৩৮. মুসলিম, মিশকাত হা/৪৮৯৮, ‘শিষ্টাচার’ অধ্যায়; রিয়াযুছ ছালেহীন, হা/৬০২।
৩৯. মুসলিম, হা/২৫৮৮; রিয়াযুছ ছালেহীন, হা/৬০৩।
৪০. মুসলিম, হা/৯১; রিয়াযুছ ছালেহীন, হা/৬১২; আবুদাঊদ, হা/৪০৯১।
৪১. মুসলিম, হা/২৮৫৩; মিশকাত, হা/৫০৮৪; রিয়াযুছ ছালেহীন, হা/৬১৪।
৪২. বুখারী হা/৬৯২৭, মুসলিম, হা/২৫৯৩; রিয়াযুছ ছালেহীন, হা/৬৩৩।
৪৩. মুসলিম, হা/২৫৯৩; রিয়াযুছ ছালেহীন, হা/৬৩৪।
৪৪. মুসলিম, হা/২৫৯৪; রিয়াযুছ ছালেহীন, হা/৬৩৫।
৪৫. তিরমিযী, হা/২৪৮৮; মিশকাত, হা/৫০৮৪; রিয়াযুছ ছালেহীন, হা/৬৪২, সনদ ছহীহ।
৪৬. মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত, হা/৫০১০ 'শিষ্টাচার' অধ্যায়, 'আল্লাহ্ ওয়াস্তে ভালবাসা' অনুচ্ছেদ।
৪৭. ইবনু মাজাহ, হা/৪০৩২; তিরমিযী হা/২৫০৭।
৪৮. রিয়াযুছ ছালেহীন, পৃ. ২২৬।
📄 অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে মধ্যপন্থা
অর্থনীতি জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এক্ষেত্রেও অন্যান্য সম্প্রদায়ের মধ্যে সীমাহীন বাড়াবাড়ি পরিলক্ষিত হয়। একদিকে রয়েছে পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থা। এতে হালাল-হারাম এবং অপরের সুখ-শান্তি ও দুঃখ-দুরবস্থা থেকে চোখ বন্ধ করে অধিক সম্পদ সঞ্চয় করাকেই সর্ববৃহৎ মানবিক সাফল্য গণ্য করা হয়। অপরদিকে রয়েছে সমাজতান্ত্রিক অর্থ ব্যবস্থা। এতে ব্যক্তি মালিকানাকেই অপরাধ সাব্যস্ত করা হয়। একটু চিন্তা করলেই বুঝা যাবে যে, উভয়বিধ অর্থব্যবস্থা হচ্ছে ধন-সম্পদের উপাসনা, ধন-ঐশ্বর্যকেই জীবনের একমাত্র লক্ষ্য ও মূল উদ্দেশ্য জ্ঞান করা এবং এরই জন্য যাবতীয় চেষ্টা-সাধনা নিয়োজিত করা।
ইসলামী শরী'আত এক্ষেত্রে মধ্যপন্থী ও ন্যায়নিষ্ঠ অর্থব্যবস্থা প্রবর্তন করেছে। ইসলামী শরী'আতে একদিকে ধন-সম্পদকে জীবনের লক্ষ্য জ্ঞান করতে নিষেধ করা হয়েছে এবং সম্মান, ইয্যত ও কোন পদমর্যাদা লাভকে এর উপর নির্ভরশীল করা হয়নি। অপরদিকে সম্পদ বণ্টনের নিষ্কলুষ নীতিমালা প্রণয়ন করে দিয়েছে যাতে কোন মানুষ জীবন ধারণের প্রয়োজনীয় উপায়-উপকরণ থেকে বঞ্চিত না থাকে এবং কেউ সমগ্র সম্পদ এককভাবে কুক্ষিগত করে না বসে। এছাড়া সম্মিলিত মালিকানাভুক্ত সম্পত্তি যৌথ ও সাধারণ ওয়াকফের আওতায় রেখেছে। ইসলামে ব্যক্তিমালিকানার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা হয়েছে। ইসলাম হালাল দ্রব্যের শ্রেষ্ঠত্ব বর্ণনা করেছে এবং তা রাখার ও ব্যবহার করার পদ্ধতি শিক্ষা দিয়েছে।
দান-খয়রাত বা খরচের ক্ষেত্রে মধ্যপন্থা অবলম্বন করা মুমিনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। কোন কোন মানুষ আছে যারা দান-ছাদাক্বা ও ব্যয় নির্বাহের ক্ষেত্রে অত্যন্ত মুক্তহস্ত। এমনকি কোন কোন সময় তারা ঋণ করেও খরচ করে। নিজের সামর্থ্যের প্রতি তাদের লক্ষ্য থাকে না। এসব কাজ থেকে আল্লাহ নিষেধ করেছেন। তিনি বলেন, وَلَا تَجْعَلْ يَدَكَ مَغْلُولَةً إِلَىٰ عُنُقِكَ وَلَا تَبْسُطْهَا كُلَّ ٱلْبَسْطِ. 'তুমি একেবারে ব্যয়কুণ্ঠ হয়ো না এবং একেবারে মুক্তহস্তও হয়ো না। তাহ'লে তুমি তিরষ্কৃত হয়ে বসে থাকবে' (ইসরা ১৭/২৯)। মুমিনের কাজ হবে কৃপণতা না করা এবং নিজের ও নিজ পরিবার-পরিজনের প্রয়োজন ও চাহিদার প্রতি যথাযথ খেয়াল রাখা। প্রতিবেশী, দুঃস্থ, অসহায়, অভাবগ্রস্তদের দান না করে কৃপণতাবশে সম্পদ কুক্ষিগত করা যেমন অপরাধ, তেমনি নিজের ও পরিবার-পরিজনের প্রয়োজনের প্রতি লক্ষ্য না রেখে সর্বস্ব দান করাও ঠিক নয়। বরং মুমিনের কাজ হবে এতদুভয়ের মধ্যবর্তী। এ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, وَالَّذِينَ إِذَا أَنْفَقُوْا لَمْ يُسْرِفُوْا وَلَمْ يَقْتَرُوا وَكَانَ بَيْنَ ذَلِكَ قَوَامًا ‘তারা যখন ব্যয় করে তখন অযথা ব্যয় করে না, কৃপণতাও করে না এবং তাদের পন্থা হয় এতদুভয়ের মধ্যবর্তী’ (ফুরক্বান ২৫/৬৮)।
অর্থাৎ নিষিদ্ধ অপচয়-অপব্যয় ও নিন্দিত ব্যয়কুণ্ঠতা-কৃপণতার মধ্যবর্তী মিতাচার-মিতব্যয়িতা এবং অর্থসম্পদ খরচের ক্ষেত্রে মধ্যপন্থা অবলম্বন করা। এটাই হচ্ছে অর্থসম্পদ ব্যয়ের ক্ষেত্রে কুরআনী বিধান। যে ব্যক্তি তা অবলম্বন করবে সে সৌভাগ্যবান হবে, মুক্তি পাবে। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিবে সে দুর্ভাগা হবে এবং ধ্বংসে নিপতিত হবে। অবশেষে সে আফসোস করবে। আয়াতে যে মধ্যবর্তী অবস্থা বুঝানো হয়েছে, তা নিম্নোক্ত ঘটনায় সুস্পষ্ট হয়েছে। উমাইয়া খলীফা আব্দুল মালেক তার মেয়ে ফাতিমাকে স্বীয় ভাতিজা ওমর ইবনু আব্দুল আযীযের সাথে বিবাহ দিয়েছিলেন। একদা তিনি তাদের সাথে সাক্ষাৎ করতে গিয়ে তাঁর মেয়েকে জিজ্ঞেস করেন, তোমাদের জীবনযাত্রা কেমন চলছে? তখন ফাতিমা উত্তর দেন, الحسنة بين سيئتين تعني بالحসنة الاعتدال في النفقة وبالسيئتين الإسراف والتقتير الذي هو التضييق في النفقة. 'দুই খারাপের মধ্যবর্তী উত্তম। তিনি উত্তম বলে ব্যয়ে মিতাচারকে বুঝিয়েছেন এবং দুই খারাপ দ্বারা অপচয় ও কৃপণতাকে বুঝিয়েছেন'। অন্য বর্ণনায় আছে, তিনি ওমর ইবনু আব্দুল আযীযকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমাদের ব্যয়ভার কিভাবে নির্বাহ হয়ে থাকে? তিনি উত্তরে বললেন, দুই খারাপের মধ্যবর্তী উত্তম পন্থায়। অতঃপর তিনি উপরোক্ত আয়াত তেলাওয়াত করেন। যেমন কবি আবু সুলায়মান আল-খাত্তাবী বলেন, ولا تغل في شيء من الأمر واقتصد ... كلا طرفي قصد الأمورِ دَميمُ 'কোন কাজে তুমি বাড়াবাড়ি কর না, মধ্যপন্থা অবলম্বন কর। কাজের ক্ষেত্রে মধ্যপন্থার উভয় দিক (অতিরঞ্জন ও সংকোচন) নিন্দনীয়'।
উপরোক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় মুফাসসিরগণ বিভিন্ন অভিমত ব্যক্ত করেছেন। যেমন-
১. আন-নুহাস বলেন, আল্লাহর আনুগত্যের পরিপন্থী কাজে খরচ করা হচ্ছে অপচয়, আল্লাহর আনুগত্যে ব্যয় না করা হচ্ছে কৃপণতা আর তাঁর আনুগত্যে খরচ করাই হচ্ছে মধ্যপন্থা।
২. ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন, 'যে ব্যক্তি লক্ষ দেরহাম সত্য-সঠিক কাজে ব্যয় করে সেটা অপব্যয় নয়। পক্ষান্তরে যে এক দেরহাম অন্যায় পথে ব্যয় করে সেটা হচ্ছে অপচয়। আর যে হকের পথে ব্যয় করা থেকে বিরত থাকে সে কৃপণতা করে'। মুজাহিদ ও ইবনু যায়েদও অনুরূপ বলেছেন।
৩. ইবনু আতিয়া বলেন, কম হোক বেশি হোক পাপের কাজে খরচ করা থেকে শরী'আত সতর্ক করেছে। অনুরূপভাবে অন্যের সম্পদ আত্মসাৎ করা থেকেও সাবধান করেছে। এসব দোষ-ত্রুটি অবশ্যই পরিত্যজ্য। আয়াতে ব্যয়ের ব্যাপারে যে আদব বর্ণিত হয়েছে তা হচ্ছে শরী'আত সম্মত তথা বৈধ কাজে এমন পরিমিত খরচ করা যাতে পরিবার-পরিজন ও অন্যের হক বিনষ্ট না হয়। কিংবা এমন কৃপণতা বা ব্যয় সংকোচন না করা যাতে পরিবার-পরিজন ক্ষুধার্ত থাকে। অর্থাৎ অতিরঞ্জিত ব্যয়কুণ্ঠতা অবলম্বন করা। এতদুভয়ের মধ্যবর্তী অবস্থা হচ্ছে উত্তম ও ন্যায়ানুগ ব্যবস্থা তথা মধ্যপন্থা।
৪. ইয়াযীদ ইবনু আবু হাবীব বলেন, (আয়াতে যাদের কথা বলা হয়েছে) তারা হচ্ছে ঐ সকল লোক যারা কেবল সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য পোশাক পরিধান করে না এবং কেবল স্বাদ আস্বাদনের জন্য আহার করে না।... তাঁরা হচ্ছেন নবী মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর ছাহাবীগণ। তাঁরা কেবল বিলাসিতা ও স্বাদ আস্বাদনের জন্য খাদ্য খেতেন না এবং শোভা বর্ধনের জন্য পোশাক পরতেন না। বরং তাঁরা ক্ষুধা নিবারণ ও আল্লাহর ইবাদতে শক্তি লাভের জন্য খাদ্য খেতেন। আর নিজেদের আব্রু ঢেকে রাখা ও ঠাণ্ডা-গরমের প্রকোপ থেকে বাঁচতে পোশাক পরিধান করতেন'।
৫. ওমর (রাঃ) স্বীয় পুত্র আছেমকে বলেন, 'হে বৎস! তুমি অর্ধ পেট খাও এবং কাপড় না ছেড়া পর্যন্ত তা ছুড়ে ফেলে দিও না। তুমি ঐ সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না, যারা আল্লাহ প্রদত্ত সবই তাদের পেট ও পীঠে রাখে। অর্থাৎ খায় ও পরিধান করে'।
অতএব খরচের ক্ষেত্রে মধ্যপন্থা অবলম্বন করা মুমিনের জন্য কর্তব্য। যেমন হাদীছে এসেছে, আবুছ ছালত (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, এক ব্যক্তি ওমর ইবনু আব্দুল আযীয (রহঃ)-এর কাছে তাকদীর (ভাগ্য) সম্পর্কে জানাতে চেয়ে পত্র লিখল। উত্তরে তিনি লিখলেন, 'আমি তোমাকে আল্লাহকে ভয় করার, তাঁর হুকুম পালনে মধ্যপন্থা অবলম্বন করার, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর আদর্শ ও সুন্নাতের অনুসরণ করার, তাঁর আদর্শ প্রতিষ্ঠা লাভের ও সংরক্ষিত হওয়ার পর বিদ'আতীদের আচার-অনুষ্ঠান ত্যাগ করার। সুন্নাতকে আঁকড়ে ধরা তোমার কর্তব্য। কেননা এ সুন্নাত তোমাদের জন্য আল্লাহর অনুমতিক্রমে রক্ষাকবয'।
আবার আল্লাহ মানুষকে খেতে ও পান করতে বলেছেন, কিন্তু অপচয় করতে নিষেধ করেছেন। তিনি বলেন, وَكُلُوْا وَاشْرَبُوْا وَلَا تُسْرِفُوْا إِنَّهُ لَا يُحِبُّ الْمُسْرِفِينَ ‘তোমরা খাও ও পান করো, অপচয় করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ অপচয়কারীকে ভালবাসেন না’ (আ'রাফ ৭/৩১)। তিনি আরো বলেন, وَلَا تُبَذِّرْ تَبْذِيرًا، إِنَّ الْمُبَذِّرِينَ كَانُوا إِخْوَانَ الشَّيَاطِينِ অপচয় কর না, নিশ্চয়ই অপব্যয়কারীরা শয়তানের ভাই' (বনু ইসরাঈল ১৭/২৬-২৭)। নবী করীম (ছাঃ)ও বলেন, كُلُوْا وَتَصَدَّقُوْا وَالْبَسُوْا فِي غَيْرِ إِسْرَافِ وَلَا مَخِيْلَةِ - ‘তোমরা খাও, দান কর, পরিধান কর অপব্যয় ও অহংকার ব্যতিরেকে'। কেননা রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) অপব্যয়ের মাধ্যমে সম্পদ বিনষ্ট করাকে আল্লাহর অসন্তোষের কারণ বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, 'আল্লাহ তা'আলা তোমাদের তিনটি কাজের উপর সন্তুষ্ট এবং তোমাদের তিনটি কাজের দ্বারা অসন্তুষ্ট হয়ে থাকেন। যে তিনটি কাজে সন্তুষ্ট হন তা হ'ল- ১. তোমরা তাঁর ইবাদত করবে, তাঁর সাথে অন্য কিছুকে শরীক করবে না, ২. তোমরা সম্মিলিতভাবে আল্লাহর রজ্জুকে মযবুতভাবে ধারণ করবে ও বিচ্ছিন্ন হবে না, ৩. যাকে আল্লাহ তোমাদের শাসক বানিয়েছেন তাঁর মঙ্গল কামনা করবে। তিনি তোমাদের যে তিনটি কাজ অপসন্দ করেন তা হ'ল। ১. বাদানুবাদ ২. অধিক যাচঞা করা ৩. সম্পদের অপচয় করা'।
উপরোক্ত হাদীছ দ্বারা প্রতীয়মান হয় যে, অপব্যয় করা হচ্ছে সম্পদ ধ্বংসের কারণ এবং অর্থ-সম্পদ ধ্বংসের ফলে আল্লাহর অসন্তোষে নিপতিত হ'তে হয়। তেমনি পার্থিব জীবনে বিলাসিতাও গ্রহণযোগ্য নয়, বরং সহজ-সরল জীবন যাপনই মুমিনের বৈশিষ্ট্য। এসম্পর্কে হাদীছে এসেছে, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) মু'আয ইবনু জাবাল (রাঃ)-কে বললেন, 'তুমি সম্পদের প্রাচুর্য ও বিলাসিতা থেকে বেঁচে থাক। কেননা আল্লাহর বান্দারা বিলাসীদের অন্তর্ভুক্ত হয় না'।
অতএব অপচয়-অপব্যয় ও বিলাসী জীবন পরিহার করে কেবল মধ্যপন্থী জীবন যাপন করাই মুমিনের কর্তব্য। আল্লাহ আমাদেরকে মধ্যপন্থী জীবন যাপন করার তাওফীকু দান করুন।
টিকাঃ
৪৯. কুরতুবী ২০/৩৬৫ পৃঃ।
৫০. কুরতুবী ২০/৩৬৫; ফাতহুল ক্বাদীর ৫/৩৮৫।
৫১. আবু দাউদ হা/৪৬১২, সনদ ছহীহ।
৫২. নাসাঈ হা/২৫১২; ইবনু মাজাহ হা/৩৬৯৫।
৫৩. মুসলিম হা/১৭১৫।
৫৪. আহমাদ, মিশকাত হা/৫২৬২, সিলসিলা ছহীহাহ হা/৭৯৪।
৫৫. মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত, হা/৭০১, 'ছালাত' অধ্যায়।
📄 বিচার-ফায়ছালা ও সাক্ষ্যদানে মধ্যপন্থা
আমাদের সমাজে ও দেশে এমন অনেক বিচারক আছেন যারা ন্যায়বিচার করেন, তাঁর বুদ্ধি ও বিবেচনা অনুযায়ী ন্যায়ানুগ ফায়ছালা দিতে চেষ্টা করেন। তাঁদের জন্যই পরকালে ক্বিয়ামতের মাঠে আরশের নিচে ছায়ার ব্যবস্থা রয়েছে। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, سَبْعَةٌ يُظِلُّهُمُ اللَّهُ فِي ظِلِّهِ يَوْمَ لَا ظِلَّ إِلَّا ظِلُّهُ إِمَامٌ عَادِلُ 'আল্লাহ সাত শ্রেণীর লোককে তাঁর আরশের নিচে ছায়া দান করবেন, যে দিন তাঁর ছায়া ব্যতীত অন্য কোন ছায়া থাকবে না। তন্মধ্যে এক শ্রেণীর লোক হ'লেন ন্যায়বিচারক নেতা বা শাসক'।
ন্যায়বিচার সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলাও নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন, يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُونُوا قَوَّامِينَ بِالْقِسْطِ شُهَدَاءَ لِلَّهِ وَلَوْ عَلَى أَنْفُسِكُمْ أَوِ الْوَالِدَيْنِ وَالْأَقْرَبِينَ أَنْ يَكُنْ غَنِيًّا أَوْ فَقِيرًا فَاللَّهُ أَوْلَى بِهِمَا فَلَا تَتَّبِعُوا الْهَوَى أَنْ تَعْدِلُوْا وَإَنْ تَلْوُا أَوْ تُعْرِضُوا فَإِنَّ اللَّهَ كَانَ بِمَا تَعْمَلُونَ خَبِيرًا 'হে ঈমানদারগণ! তোমরা ন্যায়ের উপর প্রতিষ্ঠিত থাক, আল্লাহর ওয়াস্তে ন্যায়সঙ্গত সাক্ষ্য দান কর, তাতে তোমাদের নিজের বা পিতামাতার অথবা নিকটবর্তী আত্মীয়-স্বজনের যদি ক্ষতিও হয় তবুও। কেউ যদি ধনী কিংবা দরিদ্র হয়, তবে আল্লাহ তাদের শুভাকাঙ্খী তোমাদের চেয়ে বেশি। অতএব তোমরা বিচার করতে গিয়ে রিপুর কামনা-বাসনার অনুসরণ কর না। আর যদি তোমরা ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে কথা বল কিংবা পাশ কাটিয়ে যাও, তবে আল্লাহ তোমাদের যাবতীয় কাজ-কর্ম সম্পর্কে অবগত' (নিসা ৪/১৩৫)।
অন্যত্র তিনি বলেন, وَإِذَا قُلْتُمْ فَاعْدِلُوا وَلَوْ كَانَ ذَا قُرْبَى 'যখন তোমরা কথা বল, তখন সুবিচার কর। যদিও সে আত্মীয় হয়' (আন'আম ৬/১৫২)। তিনি আরো বলেন إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُ بِالْعَدْلِ وَ الْإِحْسَانِ 'নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদেরকে ন্যায়পরায়ণতা ও ইহসান করার নির্দেশ দিয়েছেন' (নাহল ১৬/৯০)। এসব আয়াত সকল প্রকার গোঁড়ামি পরিহার করে ন্যায়নীতি অবলম্বনের নির্দেশ দেয়, তেমনি সকল কাজে ইনসাফ অলম্বন কামনা করে। এতে মর্যাদাবান লোকের মর্যাদাকে তুচ্ছ করাও অন্যায়। আর ন্যায়নীতি ও ইনছাফ অপরাধ ও শত্রুতা থেকে দূরে থাকার প্রতি নির্দেশ করে। সবার প্রতি সহানুভূতিশীল, এমনকি বিরোধীদের প্রতিও সহানুভুতিশীল হওয়ার দাবী করে।
সমাজে এমন অনেক বিচারক রয়েছেন যারা পক্ষপাতমূলক ফায়ছালা দেন, কোন কোন ক্ষেত্রে তারা কোন এক পক্ষের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে রায় বা ফায়ছালা প্রদান করেন। তাদেরকে সতর্ক করে দিয়ে আল্লাহ বলেন, يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُونُوا قَوَّامِيْنَ لِلَّهِ شُهَدَاءَ بِالْقِسْطِ وَلَا يَجْرِمَنَّكُمْ شَنَآنُ قَوْমٍ عَلَى أَلا تَعْدِلُوا إِعْدِلُوا هُوَ أَقْرَبُ لِلتَّقْوَى وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ خَبِيرٌ بِمَا تَعْمَلُوْনَ 'হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহর উদ্দেশ্যে ন্যায় সাক্ষ্য দানের ব্যাপারে অবিচল থাকবে এবং কোন সম্প্রদায়ের শত্রুতার কারণে কখনও ন্যায়বিচার পরিত্যাগ করবে না, সুবিচার করবে। এটাই আল্লাহভীতির নিকটবর্তী। আল্লাহকে ভয় কর। তোমরা যা কর নিশ্চয়ই আল্লাহ সে বিষয়ে খুব জ্ঞাত' (মায়েদাহ ৫/৮)।
বিচার-ফায়ছালায় মানুষ বেশী নির্যাতনের শিকার হয়। তাই বিচার যাতে সুষ্ঠু হয় এবং মানুষও নির্যাতিত না হয়, সেজন্য রাসূল রাগান্বিত অবস্থায় বিচার করতে নিষেধ করেছেন। বরং স্বাভাবিক অবস্থায় বিচার করতে আদেশ করেছেন। তিনি বলেন, لاَ يَقْضِيَنَّ حَكَمُ بَيْنَ اثْنَيْنِ وَهُوَ غَضْبَانُ 'কোন বিচারক যেন রাগান্বিত অবস্থায় দু'পক্ষের মাঝে বিচার-ফায়ছালা না করে'। আবার তিনি সঠিক বিচারকের পুরস্কার জান্নাত এবং অন্যায় বিচারকের বাসস্থান জাহান্নাম বলে ঘোষণা করেছেন। সাথে সাথে না জেনে অজ্ঞভাবে বিচার করতেও তিনি নিষেধ করেছেন। তিনি বলেন, الْقُضَاةُ ثَلَاثَةٌ: وَاحِدٌ فِي الْجَنَّةِ وَاثْنَانِ فِي النَّارِ فَأَمَّا الَّذِي فِي الْجَنَّةِ فَرَجُلٌ عَرَفَ الْحَقَّ فَقَضَى بِهِ وَرَجُلٌ عَرَفَ الْحَقَّ فَجَارَ فِي الْحُكْمِ فَهُوَ فِي النَّارِ وَرَجُلٌ قَضَى لِلْنَّاسِ عَلَى جَهْلٍ فَهُوَ فِي النَّارِ 'বিচারক তিন প্রকারের হয়ে থাকে, তন্মধ্যে এক প্রকারের জন্য জান্নাত এবং দুই প্রকারের জন্য জাহান্নাম অবধারিত। সে বিচারক জান্নাতে প্রবেশ করবেন, যিনি সত্যটি উপলব্ধি করেছেন এবং তদনুযায়ী বিচার করেছেন। আর যে বিচারক সত্য উপলব্ধি করেও বিচারের মধ্যে অন্যায় (যুলুম) করল, সে বিচারক জাহান্নামী। অনুরূপভাবে সে বিচারকও জাহান্নামে প্রবেশ করবে যে, অজ্ঞতার সাথে মানুষের মধ্যে বিচার করল' (এবং ভুল ফায়ছালা দিল)।
সুতরাং বিচার-ফায়ছালা ও সাক্ষ্য দানের ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার করতে এবং সত্য সাক্ষ্য প্রদান করতে হবে। অবিচার ও মিথ্যাসাক্ষ্য থেকে বিরত থাকতে হবে। এক্ষেত্রে প্রভাবিত হয়ে কিংবা পক্ষপাতমূলকভাবে বিচার করা কিংবা সাক্ষ্য প্রদান করা মুমিনের বৈশিষ্ট্য বিরোধী। তাই এক্ষেত্রে ইনছাফ করাই ইসলামের দাবী।
তাছাড়া যোগ্য-দক্ষ বিচারক নিয়োগ করা রাষ্ট্রপ্রধানের কর্তব্য, যাতে দেশের জনগণ হক বিচার পায়। যেমন হাদীছে এসেছে, আলী (রাঃ) হতে বর্ণিত তিনি বলেন, (যখন) রাসূলুল্লাহ (ছাঃ), আমাকে ইয়ামানের শাসক নিযুক্ত করে পাঠালেন, তখন আমি আরয করলাম, হে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ)! আপনি আমাকে প্রেরণ করেছেন, অথচ আমি একজন যুবক, বিচার বা শাসন সম্পর্কে আমি অজ্ঞ। উত্তরে রাসূল (ছাঃ) বললেন, আল্লাহ তা'আলা তোমার অন্তরকে অচিরেই সৎপথ প্রদর্শন করবেন এবং তোমার যবানকেও সঠিক রাখবেন। অতঃপর তিনি বললেন, যখন দুই ব্যক্তি (বাদী ও বিবাদী) কোন এক ব্যাপার নিয়ে তোমার কাছে উপস্থিত হয়, তখন প্রতিপক্ষের কথাবার্তা না শোনা পর্যন্ত বাদীর পক্ষে (ডিক্রী) রায় প্রদান করবে না। কেননা প্রতিপক্ষের বর্ণনা হতে মোকদ্দমার রায় প্রদানে তোমার মদদ ও সাহায্য মিলবে। আলী (রাঃ) বলেন, (রাসূল ছাঃ-এর দো'আর পর) আমি আর কোন মোকদ্দমায় সন্দেহে পতিত হইনি।
অতএব আল্লাহভীরু, সৎ-যোগ্য বিচারক নিয়োগ দানের মাধ্যমে জনসেবায় ব্রতী হওয়া দায়িত্বশীলদের কর্তব্য। এ কর্তব্যে অবহেলা করা হলে মানুষ যুলুম-নির্যাতনের শিকার হয়। আল্লাহ আমাদেরকে এ থেকে বেঁচে থাকার তাওফীক দান করুন।
টিকাঃ
৫৫. মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত, হা/৭০১, 'ছালাত' অধ্যায়।
৫৬. মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/৩৭৩১।
৫৭. আবু দাউদ, ইবনু মাজাহ, মিশকাত হা/৩৭৩৫, সনদ ছহীহ, ইরওয়াউল গালীল হা/২৬১৪।
৫৮. আবু দাউদ হা/৩৫৮২; তিরমিযী হা/১৩৫৪ সনদ হাসান।
📄 আবেগ-অনুভূতির ক্ষেত্রে মধ্যপন্থা
আবেগ, অনুভূতি, ভালবাসা-ঘৃণা, বন্ধুত্ব-শত্রুতা ইত্যাদি ক্ষেত্রে মধ্যপন্থী হওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ভালবাসায় সীমাতিক্রম করা বা শত্রুতার ক্ষেত্রে সীমালংঘন করাও ইসলামে নিষিদ্ধ। অনুরূপভাবে ঝগড়া বিবাদের ক্ষেত্রে পাপাচারে লিপ্ত হওয়াও নিষিদ্ধ, বরং এ ক্ষেত্রে মধ্যপন্থা অবলম্বনই ইসলামের শিক্ষা। আল্লাহ বলেন, 'হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহর উদ্দেশ্যে ন্যায় সাক্ষ্য দানের ব্যপারে অবিচল থাকবে এবং কোন সম্প্রদায়ের শত্রুতার কারণে কখনও ন্যায়বিচার পরিত্যাগ কর না, সুবিচার কর। এটাই আল্লাহভীতির নিকটবর্তী। আল্লাহকে ভয় কর। তোমরা যা কর নিশ্চয়ই আল্লাহ সে বিষয়ে খুব জ্ঞাত' (মায়েদাহ ৫/৮)।
হাদীছে বর্ণিত হয়েছে, আলী (রাঃ) বলেন, আমি নবী করীম (ছাঃ)-কে বলতে শুনেছি, أَحْبِبْ حَبِيبَكَ هَوْنًا مَّا عَسَى أَنْ يَكُوْنَ بَغِيْضَكَ يَوْمًا مَّا ، وَأَبْغِضُ بَغِيْضَكَ هَوْنًا مَّا، عَسَى أَنْ يَكُوْنَ حَبِيبَكَ يَوْمًا مَّا 'বন্ধুর সাথে স্বাভাবিক বন্ধুত্ব বজায় রাখ (বাড়াবাড়ি কর না), হ'তে পারে সে একদিন তোমার শত্রু হয়ে যাবে। অনুরূপভাবে শত্রুর সাথে স্বাভাবিক শত্রুতা বজায় রাখ (আধিক্য দেখিও না), হ'তে পারে সে একদিন তোমার বন্ধু হয়ে যাবে'।
কোন কোন সময় মানুষ স্বীয় বন্ধুর ভালবাসায় বিলীন হয়ে যায়, বন্ধুর ভালবাসায় মোহাবিষ্ট হয়ে পড়ে। আবার কোন সময় তার সাথে ক্রোধের আগুনে জ্বলে পুড়ে মরে। ফলে তার সাথে হিংসা, হানাহানি ও শত্রুতায় লিপ্ত হয়। এমনকি ক্রোধের কারণে ক্ষমার ফযীলত গ্রহণ করা থেকেও সে বিরত থাকে। তাই মুমিনের জন্য আবেগ, অনুভূতি ও ভালবাসার ক্ষেত্রে মধ্যপন্থা অবলম্বন আবশ্যক, যাতে সে আবেগতাড়িত হয়ে আশোভন আচরণে লিপ্ত না হয়। সুতরাং ভালবাসা, শত্রুতা, ঘৃণা ইত্যাদি ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি পরিহার করে মধ্যপন্থা অবলম্বন করতে হবে।
টিকাঃ
৫৯. তিরমিযী, হা/২০৬৫, 'সৎকাজ ও সদাচরণ' অধ্যায়; ছহীহ আদাবুল মুফরাদ, হা/১৩২১।