📘 মধ্যমপন্থা গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা 📄 আক্বীদার ক্ষেত্রে মধ্যপন্থা

📄 আক্বীদার ক্ষেত্রে মধ্যপন্থা


আক্বীদার ক্ষেত্রে মুসলিম জাতি বিশেষত আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আত মধ্যপন্থা অবলম্বনকারী। জাহমিয়ারা আল্লাহ্ গুণবাচক নাম অস্বীকার করে, আবার মুশাববিহারা আল্লাহ্ ঐসব নামের সাথে সাদৃশ্য দাড় করায়। মু'তাযিলারা আল্লাহকে কর্মের স্রষ্টা স্বীকার করে না, কাদারিয়ারা আবার আল্লাহকে কর্মের স্রষ্টা বানিয়ে মানুষকে নিষ্পাপ বলে এবং মানুষের পাপের কারণে আল্লাহকেই দায়ী করতে চায়। তেমনি পরকালীন শাস্তির ক্ষেত্রে মুরজিয়া ও কাদারিয়ারা পরস্পর বিরোধী অবস্থানে অটল। একদিকে কাদারিয়ারা বান্দার কর্মের উপর নির্ভর করে তাকদীরকে অস্বীকার করে। অন্যদিকে জাবারিয়ারা তাকদীরের উপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। ফলে তাদের কাছে কর্ম গুরুত্বহীন। অনুরূপভাবে ঈমানের ব্যাপারে খারেজী ও মু'তাযিলা এবং মুরজিয়া ও জাহমিয়ারা বাড়াবাড়ি করে থাকে। রাফেযী ও খারেজীরা ছাহাবায়ে কেরামের ব্যাপারে ভ্রান্ত আক্বীদা পোষণ করে। এসবই বাড়াবাড়ি। আক্বীদার ক্ষেত্রে এসব বাড়াবাড়ি পরিহার করে মধ্যপন্থা অবলম্বন করতে হবে এবং এক্ষেত্রে পবিত্র কুরআন ও ছহীহ হাদীছে বর্ণিত আক্বীদা পোষণ করতে হবে। আক্বীদার ক্ষেত্রে এসব বাড়াবাড়ি সম্পর্কে দৃষ্টান্ত স্বরূপ কয়েকটি হাদীছ এখানে উপস্থাপন করা হলো।-

আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) সম্পদ বণ্টন করছিলেন, এমন সময় আব্দুল্লাহ ইবনু যিল খুওয়াইছিরা এসে বলল, হে আল্লাহ্র রাসূল! ন্যায়বিচার করুন। তখন তিনি বললেন, তোমার ধ্বংস হোক, আমি ইনছাফ না করলে, কে ইনছাফ করবে? তখন ওমর (রাঃ) বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমাকে অনুমতি দিন আমি তার গর্দান উড়িয়ে দিই। তিনি বললেন, তাকে ছেড়ে দাও। কেননা তার অনেক সাথী আছে, যাদের ছালাতের তুলনায় তোমাদের ছালাতকে এবং তাদের ছিয়ামের তুলনায় তোমাদের ছিয়ামকে তুচ্ছ মনে করবে। তারা দ্বীন থেকে এমনভাবে বের হয়ে যাবে যেমনভাবে তীর ধনুক থেকে বের হয়ে যায়। তার কপালের সামনের দিকে এবং তার হাটুর দিকে তাকানো হলো, সেখানে কোন চিহ্ন পাওয়া গেল না। জ্ঞান ও রক্ত অগ্রগামী হয়ে গেছে। তাদের নিদর্শন হচ্ছে তাদের দুই হাতের এক হাত অথবা দুই স্তনের একটি মেয়েদের স্তনের মত। অথবা তিনি বলেছেন, বোঝার মত দোদুল্যমান। মানুষের বিচ্ছিন্ন হওয়ার সময় আলী (রাঃ) তাদের বের করে দিয়েছিলেন। আবু সাঈদ (রাঃ) বলেন, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আমি এটা রাসূলকে বলতে শুনেছি এবং আমি আরো সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আলী তাদের হত্যা করার সময় আমি তার সাথে ছিলাম। তাদের একজনকে আনা হলো রাসূল যে বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করেছেন তা দেখে। তাদের সম্পর্কেই এই আয়াত নাযিল হয়েছে وَمِنْهُمْ مَّنْ يَلْمِزُكَ فِي الصَّদَقَاتِ 'তাদের মধ্যে এমন লোকও রয়েছে যারা ছাদাক্বা বণ্টনে আপনাকে দোষারোপ করে' (তওবা ৯/৫৮)।

ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন, যখন খারেজীরা মুসলমানদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে আলাদাভাবে বসবাস করতে লাগল, তখন আমি আলী (রাঃ)-কে বললাম, হে আমীরুল মুমিনীন! ছালাত একটু দেরী করে পড়ুন, আমি ঐ সম্প্রদায়ের নিকট গিয়ে তাদের সাথে কথা বলব। তিনি বললেন, আমি তোমার ব্যাপারে তাদের প্রতি আশংকা করছি (যেন তারা তোমার উপর আক্রমণ না করে)। আমি বললাম, ইনশাআল্লাহ এটা কখনো হবে না। অতঃপর আমি সাধ্যমত উত্তম ইয়েমেনী পোশাক পরিধান করে তাদের নিকটে গেলাম। তারা দুপুরের প্রখর রোদ্রের সময় বিশ্রাম করছিল। আমি এমন এক সম্প্রদায়ের নিকটে গেলাম, যাদের থেকে অধিক ইজতেহাদকারী সম্প্রদায় আমি দেখিনি। তাদের হাত উটের কুঁজের মত শক্ত। তাদের মুখমণ্ডলে সিজদার চিহ্ন লেগে আছে। আমি তাদের নিকটে গেলাম। তারা বলল, হে ইবনু আব্বাস! তোমাকে স্বাগত জানাচ্ছি। তাদের মধ্যে কেউ কেউ বলল, তোমরা তাঁর সাথে আলোচনা কর না। কেউ কেউ বলল, আমরা অবশ্যই তাঁর সাথে আলোচনা করব। ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন, আমি তাদেরকে বললাম, আমার নিকট এই সংবাদ পৌঁছেছে যে, তোমরা রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর চাচাত ভাই ও তাঁর জামাতার সাথে বিদ্বেষ ও শত্রুতা পোষণ করছ, যিনি রাসূলের ছাহাবায়ে কেরামের মধ্যে সর্বপ্রথম তাঁর প্রতি ঈমান এনেছেন। তারা বলল, তাঁর প্রতি আমাদের শত্রুতার কারণ তিনটি। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, সেগুলি কি? তারা বলল, প্রথমতঃ তিনি আল্লাহ্ দ্বীনের ব্যাপারে মানুষকে শালিস নিযুক্ত করেছেন, অথচ আল্লাহ বলেন, إِنِ الْحُكْمُ إِلَّا لِلَّهِ 'আল্লাহ ব্যতীত কারো হুকুম চলে না' (আন'আম ৬/৫৭)। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, এরপর কি? তারা বলল, তিনি যুদ্ধ করেছেন, কিন্তু তাদের (পরাজিতদের) বন্দী করেননি, তাদের সম্পদ গণীমত হিসাবে গ্রহণ করেননি। যদি তারা কাফের হয়, তাহলে তাদের ধন-সম্পদ হস্তগত করা বৈধ হবে। আর যদি তারা মুমিন হয় তাহলে তাদের রক্ত প্রবাহিত করা তাঁর উপর হারাম। তিনি বলেন, এরপর কি? তারা বলল, তিনি (আলী) 'আমীরুল মুমিনীন' বা খলীফার পদ থেকে স্বীয় নাম মুছে দিয়েছেন বা নিজেই দূরে সরে গেছেন।

ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন, আমি যদি তোমাদের নিকট আল্লাহ্র কিতাব (থেকে দলীল) পাঠ করে শুনাই এবং রাসূলের হাদীছ তোমাদের নিকট বর্ণনা করি, যা তোমরা অস্বীকার করতে পারবে না, তাহলে কি তোমরা (তোমাদের দাবী থেকে) ফিরে আসবে? তারা বলল, হ্যাঁ। ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন, 'তোমাদের প্রথম অভিযোগ হচ্ছে, আল্লাহ্ দ্বীনের ব্যাপারে তিনি মানুষকে শালিস নিযুক্ত করেছেন'। কিন্তু আল্লাহও মানুষকে শালিস নিযুক্ত করেছেন। এ ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলা বলেন, يَا أَيُّهَا الَّذِيْنَ أَمَنُوا لَا تَقْتُلُوا الصَّيْدَ وَأَنْتُمْ حُرُمٌ وَمَنْ قَتَلَهُ مِنْكُمْ مُّتَعَمِّدًا فَجَزَاء مِثْلُ مَا قَتَلَ مِنَ النَّعَمِ يَحْكُمُ بِهِ ذَوَا عَدْلٍ مِّنْكُمْ 'হে মুমিনগণ! তোমরা ইহরাম অবস্থায় শিকার বধ করো না। তোমাদের মধ্যে যে জেনে শুনে শিকার বধ করবে, তার উপর বিনিময় ওয়াজিব হবে, যা সমান হবে ঐ জন্তুর, যাকে সে বধ করেছে। তোমাদের মধ্যকার দু'জন নির্ভরযোগ্য ব্যক্তি এর ফায়ছালা করবে' (মায়েদাহ ৫/৯৫)। وَإِنْ خِفْتُمْ شِقَاقَ بَيْنِهِمَا فَابْعَثُوا حَكَمًا مِّنْ أَهْلِهِ وَحَكَمًا مِّنْ أَهْلِهَا ‘যদি তাদের মধ্যে সম্পর্কচ্ছেদ হওয়ার মত পরিস্থিতির আশঙ্কা কর, তবে স্বামীর পরিবার থেকে একজন এবং স্ত্রীর পরিবার থেকে একজন শালিস নিযুক্ত করবে’ (নিসা ৪/৩৫)। আমি তোমাদেরকে আল্লাহ্র শপথ করে বলছি, মানুষের রক্ত, জীবন, তাদের পরস্পরের মধ্যে সংশোধনের ক্ষেত্রে মানুষ শালিস নিযুক্ত হওয়ার অধিক হকদার, নাকি সিকি দেরহাম মূল্যের খরগোশের ক্ষেত্রে শালিস নিযুক্ত হওয়ার বেশী হকদার? তারা বলল, হে আল্লাহ! তুমি তাদের রক্ত হিফাযত কর এবং তাদের পারস্পরিক সম্পর্ক ঠিক রাখ। ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন, আমি কি (কুরআন-হাদীছ থেকে) দলীল উপস্থাপন করতে পেরেছি? তারা বলল, হ্যাঁ।

তোমাদের অপর অভিযোগ হচ্ছে, 'আলী (রাঃ) আয়েশার সাথে যুদ্ধ করেছেন, অথচ তিনি তাঁকে আটক করেননি এবং তাঁর সম্পদকে গণীমত হিসাবে গ্রহণ করেননি'। তোমরা কি তোমাদের মাতাকে বন্দী করবেন? কিংবা অন্যের সাথে যে আচরণ বৈধ মনে কর, তাঁর সাথেও কি অনুরূপ আচরণ সমীচীন মনে করবেন? তাহলে তো তোমরা কুফরীতে নিমজ্জিত হবে। আর যদি তোমরা ধারণা করে থাক যে, আয়েশা (রাঃ) তোমাদের মাতা নন, তাহলে কুফরী করা হবে এবং তোমরা ইসলাম থেকে বহিষ্কৃত হবে। কেননা আল্লাহ বলেন, النَّبِيُّ أَوْلَى بِالْمُؤْمِنِينَ مِنْ أَنْفُسِهِمْ وَأَزْوَاجُهُمْ أُمَّهَاتُهُمْ 'নবী মুমিনদের নিকট তাদের নিজেদের অপেক্ষা অধিক ঘনিষ্ঠ এবং তাঁর স্ত্রীগণ তাদের মাতা' (আহযাব ৩৩/৫)। সুতরাং তোমরা গোমরাহীর মধ্যে পুনরায় প্রবিষ্ট হবে কি-না নিজেরাই ঠিক কর। আমি কি দলীল উপস্থাপন করতে পেরেছি? তারা বলল, হ্যাঁ।

তোমাদের আরেকটি অভিযোগ হচ্ছে, 'আলী (রাঃ) আমীরুল মুমিনীন বা খিলাফতের দায়িত্ব থেকে নিজেকে অপসারণ করেছেন'। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) হুদায়বিয়ার সন্ধির দিন কুরাইশদেরকে ডাকলেন পরস্পরের মধ্যে এক লিখিত চুক্তি সম্পাদনের জন্য। অতঃপর তিনি বললেন, লেখ যে, এ ব্যাপারে মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) ফায়ছালা দিয়েছেন। কুরাইশরা বলল, আল্লাহ্র কসম! যদি আমরা জানতাম যে, তুমি আল্লাহ্র রাসূল, তাহলে আমরা তোমাকে বায়তুল্লায় প্রবেশে বাধা দিতাম না, তোমার সাথে যুদ্ধেও লিপ্ত হ'তাম না। বরং তুমি লেখ, মুহাম্মাদ বিন আব্দুল্লাহ। তখন আল্লাহ্র রাসূল (ছাঃ) বললেন, আল্লাহ্র কসম! আমি অবশ্যই আল্লাহ্র রাসূল, যদিও তোমরা আমাকে অস্বীকার কর বা আমার প্রতি মিথ্যারোপ কর। হে আলী! তুমি লেখ মুহাম্মাদ ইবনু আব্দুল্লাহ। আর রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) আলী (রাঃ)-এর চেয়ে শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব। আমি কি দলীল উপস্থাপন করতে পারলাম? তারা বলল, হ্যাঁ। অতঃপর তাদের মধ্য থেকে ১২,০০০ লোক ফিরে আসল এবং চার হাযার অবশিষ্ট থাকল। অতঃপর তাদেরকে হত্যা করা হ'ল।

উপরোক্ত হাদীছ দু'টি প্রমাণ করে আক্বীদার ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি মানুষকে কুফরীতে নিপতিত করে। ফলে মানুষের যাবতীয় সৎ আমল বাতিল হয়ে যায়, মুসলিম মিল্লাত থেকে বহিষ্কৃত হয়, জাহান্নাম তাদের জন্য অবধারিত হয়ে যায়। সুতরাং মানুষের আক্বীদা পরিশুদ্ধ হওয়া অত্যাবশ্যক। এজন্য প্রয়োজন দ্বীন সম্পর্কে সঠিক ইলম হাছিল করা। অস্পষ্ট বিষয়ে স্বচ্ছ ধারণা লাভের জন্য হক্বপন্থী বিজ্ঞ আলেমের শরণাপন্ন হয়ে দলীল ভিত্তিক আলোচনার মাধ্যমে সংশয়-সন্দেহ দূরীভূত করতে হবে এবং অজ্ঞাত বিষয় জেনে নিতে হবে। এ মর্মে মহান আল্লাহ বলেন, فَاسْأَلُوا أَهْلَ الذِّكْرِ إِنْ كُنتُمْ لَا تَعْلَمُوْনَ بِالْبَيِّنَاتِ وَالزُّبُرِ ‘অজ্ঞাত বিষয় দলীল-প্রমাণ সহকারে জেনে নাও’ (নাহল ১৬/৪৩-৪৪)।

পূর্ববর্তী সম্প্রদায়গুলোকে দেখা যায়, একদিকে তারা নবী-রাসূলগণকে আল্লাহর পুত্র ভেবে তাদের উপাসনা শুরু করেছে। যেমন ইহুদীরা ওযায়েরকে আল্লাহর পুত্র এবং খ্রীষ্টানরা ঈসাকে আল্লাহর পুত্র বলে আখ্যায়িত করছে। আল্লাহ বলেন, وَقَالَتِ الْيَهُودُ عُزَيْرُ ابْنُ اللَّهِ وَقَالَتِ النَّصَارَى الْمَسِيحُ ابْنُ اللَّهِ ذَلِكَ قَوْلُهُمْ بِأَفْوَاهِهِمْ ‘ইহুদীরা বলে, ওযায়ের আল্লাহ্ পুত্র এবং খ্রীষ্টানরা বলে মাসীহ (ঈসা) আল্লাহ্ পুত্র। এটা তাদের মুখের কথা মাত্র’ (তওবা ৯/৩০)। অপরদিকে ঐসব সম্প্রদায়ের অনেকে নবীগণের মুজিযা বা অলৌকিকত্ব দেখেও তাদের প্রতি ঈমান আনেনি। এমনকি তাঁদের প্রতি নির্যাতন চালিয়েছে, কোন কোন ক্ষেত্রে নবীদেরকে হত্যাও করেছে। আবার কেউ কেউ ঈমান আনলেও নবীর নির্দেশ মেনে চলেনি। যেমন মূসা (আঃ) বনী ইসরাঈলকে ন্যায়যুদ্ধে আহ্বান জানালে তাঁর অনুসারীরা বলে, فَاذْهَبْ أَنْتَ وَرَبُّكَ فَقَاتِلَاَ إِنَّا هাহুনায়া قاعِدُونَ 'তুমি এবং তোমার প্রভু যাও এবং যুদ্ধ করো, আমরা এখানে বসে থাকলাম' (মায়েদাহ ২৪)। তাদের অবস্থা সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, أُولَئِكَ قَوْمٌ إِذَا مَاتَ فِيهِمُ الْعَبْدُ الصَّالِحُ أَوِ الرَّجُلُ الصَّالِحُ بَنَوْا عَلَى قَبْرِهِ مَسْجِدًا ، وَصَوَّرُوا فِيهِ تِلْكَ الصُّوَرَ ، أُولَئِكَ شِرَارُ الْخَلْقِ عِنْدَ اللَّهِ - 'তাদের অবস্থা ছিল এমন যে, কোন সৎ লোক মারা গেলে তারা তার কবরের উপরে মসজিদ বানাতো। আর তার ভিতরে ঐ লোকের মূর্তি তৈরী করে রাখতো। ক্বিয়ামতের দিন তারাই আল্লাহ্র নিকটে সর্বনিকৃষ্ট সৃষ্টজীব বলে পরিগণিত হবে'।

পক্ষান্তরে মুসলিম উম্মাহর অবস্থা অনুরূপ নয়। তারা একদিকে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর প্রতি এমন আনুগত্য ও মহব্বত পোষণ করে যে, এর জন্য জান-মাল, সন্তান-সন্ততি, ইয্যত-আব্রু সবকিছু বিসর্জন দিতেও কুণ্ঠিত হয় না। অপরদিকে রাসূলকে তারা রাসূল এবং আল্লাহকে আল্লাহ্ই মনে করে। এতসব পরাকাষ্ঠা ও শ্রেষ্ঠত্ব সত্ত্বেও রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে তারা আল্লাহ্র বান্দা ও রাসূল বলেই বিশ্বাস করে ও স্বীকার করে। তাঁর প্রশংসা ও গুণকীর্তন করতে গিয়েও তারা একটা সীমার ভেতরে থাকে, সীমালংঘন করে না। এটাই তাদের বৈশিষ্ট্য।

টিকাঃ
১০. ড. আলী ইবনু আব্দুল আযীয আশ-শিবল, ওয়াসতিয়া আহলিস সুন্নাহ ওয়াল জামা'আত ওয়া আছারুহা ফী 'ইলাজিল গুলু, আল-ফুরক্বান (কুয়েত: ২০০৯), ৪৩৭তম সংখ্যা, পৃ. ১২।
১১. বুখারী হা/৬৯৩৩, আহমাদ হা/১১৫৫৪।
১২. তাবারানী, আহমাদ, মাজমাউয যাওয়ায়েদ, ৬/২৩৯পৃ. হা/১০৪৫০; আব্দুর রাযযাক, মুছান্নাফ, ১০/১৫৮পৃ.; ইমাম শাত্বেবী, আল-ই'তেছাম, (বৈরুত : দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, ১৪১৫ হি./১৯৯৫ খ্রী.), ২/৪০৬-৪০৭ পৃ.।

📘 মধ্যমপন্থা গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা 📄 ইবাদতে মধ্যপন্থা

📄 ইবাদতে মধ্যপন্থা


কোন কোন মানুষ অত্যধিক পরহেযগারিতা অর্জন করতে গিয়ে অধিক ইবাদত করতে প্রবৃত্ত হয়। অনেক সময় সাধ্যাতীত কাজ করার চেষ্টা করে। অথচ ইসলাম এটা সমর্থন করে না। যেমন আল্লাহ বলেন, أَتَّقُوا اللَّهِ مَا اسْتَطেকْتُمْ 'তোমরা সাধ্যমত আল্লাহকে ভয় কর' (তাগাবুন ৬৪/১৬)। সুতরাং সাধ্যের বাইরে কোন কাজ করার চেষ্টা করাও অনুচিত। কেননা আল্লাহ মানুষের উপর তার সাধ্যের বাইরে কোন বিধান চাপিয়ে দেন না। তিনি বলেন, لَا يُكَلِّفُ اللَّهُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا 'আল্লাহ কাউকে তার সাধ্যাতীত কোন কাজের ভার দেন না' (বাক্বারাহ ২/২৮৬)। অতএব অতিরঞ্জিত কোন কিছু না করে কুরআন-হাদীছে যতটুকু করার নির্দেশ রয়েছে ততটুকুই করতে হবে। তার অতিরিক্ত করাই বাড়াবাড়ি, যাকে বিদ'আত বলেও অভিহিত করা যায়। বাড়াবাড়ি পরিহার করে সাধ্যমত আমল করার প্রতি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর নির্দেশ হ'ল, عَلَيْكُمْ بِمَا تُطِيقُوْনَ، فَوَاللَّهِ لَا يَمِلُّ اللَّهُ حَتَّى تَمِلُّوْا وَكَانَ أَحَبُّ الدِّيْنِ إِلَى اللَّهِ مَا دَاوَمَ عَلَيْهِ صَاحِبُهُ 'আমল করতে থাক, যা করা তোমার পক্ষে সম্ভব। কারণ যতক্ষণ না তোমরা ক্লান্ত হবে ততক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহর প্রতিদানও বন্ধ হবে না। আল্লাহ্র কাছে সর্বাধিক প্রিয় আমল হ'ল যা আমলকারী স্থায়ীভাবে'। অন্য বর্ণনায় এসেছে, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, أَحَبُّ الْأَعْمَالِ إِلَى الله أَدْوَمُهَا وَإِنْ قَلَّ 'আল্লাহর নিকট প্রিয়তর আমল হচ্ছে যা অবিরতভাবে করা হয়ে থাকে, যদিও তা কম হয়'।

আর আমল ততক্ষণ পর্যন্ত করতে হবে যতক্ষণ তা স্বাচ্ছন্দ্যে করা যায়। যেমন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, خُذُوا مِنَ الْأَعْمَالِ مَا تُطِيْقُوْনَ فَإِنَّ اللَّهَ لَا يَمَلُّ حَتَّى تَمَلُّوا 'তোমরা কাজ সে পরিমাণ গ্রহণ করবে, যে পরিমাণ তোমরা (সর্বদা) করতে সমর্থ হও। কেননা আল্লাহ কখনও ছওয়াব দানে বিরক্তি বোধ করেন না, যাবৎ না তোমরা বিরক্ত হও'। অন্যত্র রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, لِيُصَلِّ أَحَدُكُمْ نَشَاطَهُ وَإِذَا فَتَرَ فَلْيَقْعُدْ 'তোমাদের কেউ যেন আপন মনের প্রফুল্লতা পর্যন্ত ছালাত পড়ে। যখন শ্রান্তি বোধ করবে, তখন যেন বসে যায়'।

রাতের নফল ছালাত আদায়ের ক্ষেত্রেও যতক্ষণ তন্দ্রাচ্ছন্ন না হয়, ততক্ষণ ছালাত আদায় করতে হবে। তন্দ্রা বা ঘুম এসে গেলে ঘুমিয়ে নিতে হবে। এ মর্মে হাদীছে এসেছে, عَنْ عَائِشَةَ قَالَتْ: قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: إِذَا نَعَسَ أَحَدُكُمْ وَهُوَ يُصَلِّي فَلْيَرْقُدْ حَتَّى يَذْهَبَ عَنْهُ النَّوْمُ فَإِنَّ أَحَدُكُمْ إِذَا صَلَّى وَهُوَ نَاعِسٌ لَا يَدْرِي لَعَلَّه يَسْتَغْفِرُ فَيَسُبُّ نَفْسَهُ আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, 'যখন তোমাদের কেউ ছালাত পড়ার সময় তন্দ্রাভিভূত হয়, তখন সে যেন শুয়ে পড়ে, যতক্ষণ না তার নিদ্রা দূর হয়। কেননা তোমাদের কেউ যখন তন্দ্রাবস্থায় ছালাত পড়ে, তখন সে বলতে পারে না যে, সে কি বলছে? হয়তো সে আল্লাহর নিকট ক্ষমা চাইতে গিয়ে নিজেকে গালি দিয়ে বসে'।

মানুষের শারীরিক শক্তি-সামর্থ্য অনুযায়ী ইবাদত করতে হবে। যেমন ছালাতের ক্ষেত্রে দাঁড়িয়ে না পারলে বসে আদায় করবে, বসে সক্ষম না হলে শুয়ে আদায় করবে। কিন্তু এক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি গ্রহণযোগ্য নয়। যেমন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَائِمًا فَإِنْ لَمْ تَسْتَطِعْ فَقَاعِدًا فَإِنْ لَمْ تَسْتَطِعْ فَعَلَى جَنْبِ - 'দাঁড়িয়ে ছালাত আদায় করবে। যদি তাতে অসমর্থ হও বসে পড়বে। যদি তাতেও অসমর্থ হও তবে পার্শ্বের উপর শুয়ে ছালাত পড়বে'।

সর্বোপরি ইবাদত তথা ছালাতকে প্রশান্তি লাভের উপায় হিসাবে গ্রহণ করাই শ্রেয়। এখানে বাড়াবাড়ি করা সমীচীন নয়। যেমন হাদীছে এসেছে, عَن سالم بن أبي الْجَعْدِ قَالَ : قَالَ رَجُلٌ مِنْ خُزَاعَةَ : لَيْتَنِي صَلَّيْتُ فَاسْتَرَحْتُ فَكَأَنَّهُمْ عَابُوا ذَلِكَ عَلَيْهِ فَقَالَ : سَمِعْتُ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: أَقِمِ الصَّلَاةَ يَا بِلَالُ أَرِحْنَا بِهَا - সালেম ইবনু আবিল জা'দ (রহঃ) হ'তে বর্ণিত, একদা খুযা'আহ গোত্রের এক ব্যক্তি বলল, যদি আমি ছালাত আদায় করতে পারতাম, শান্তি লাভ করতাম! সালেম বলেন, শ্রোতাগণ যেন তার উক্তিকে দূষণীয় মনে করল। (এটা দেখে) সে বলল, আমি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেছেন, হে বেলাল! ছালাতের আযান দাও এবং এর দ্বারা আমাকে শান্তি দান কর'।

আর ইবাদতে বাড়াবাড়ি করা নাছারাদের বৈশিষ্ট্য। এমনকি তারা ইবাদতে বাড়াবাড়ি করতে করতে বৈরাগ্যবাদ বা সন্ন্যাসবাদের উদ্ভব ঘটায়। বনে-জঙ্গলে, পর্বতের গুহায় জীবন-যাপন করা চালু করে। এসব মানবিক প্রবৃত্তি বিরুদ্ধ। এসব মানুষের জন্য দুঃসাধ্যও বটে। তাই ইসলামে এসব নিষিদ্ধ। কারণ মানুষ সাধ্যাতীত আমল করতে গিয়ে এক সময় সে আমলহীন হয়ে পড়ে। এজন্য ইসলাম মধ্যপন্থা অবলম্বনের নির্দেশ দিয়েছে। সাথে সাথে আল্লাহ মানুষের প্রতি কঠিন কোন বিধান আরোপ করেননি। বরং সহজ বিধান আরোপ করেছেন। আল্লাহ বলেন, يُرِيدُ اللَّهُ بِكُمُ الْيُسْرَ وَلَا يُرِيدُ بِكُمُ الْعُسْرَ 'আল্লাহ তোমাদের প্রতি সহজ করতে চান, কঠোরতা আরোপ করতে চান না' (বাক্বারাহ ২/১৮৫)।

ইবাদতে মধ্যপন্থা অবলম্বনের ক্ষেত্রে নিম্নোক্ত হাদীছটি বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য। عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ قَالَ جَاءَ ثَلَاثَةُ رَهْطٍ إِلَي بُيُوتِ أَزْوَاجِ النَّبِيِّ يَسْأَلُوْنَ عَنْ عِبَادَةِ النَّبِيِّ. فَلَمَّا أُخْبِرُوا كَأَنَّهُمْ تَقَالُوْهَا . فَقَالُوْا وَأَيْنَ নَحْنُ مِنَ النَّبِيِّ قَدْ غَفَرَ اللَّهُ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ وَمَا تَأَخَّرَ . قَالَ أَحَدُهُمْ أَمَا أَنَا فَإِنِّي أُصَلِّي اللَّيْلَ أَبَدًا. وَقَالَ آخَرُ أَنَا أَصُوْمُ الدَّهْرَ وَلَا أُفْطِرُ. وَقَالَ آخَرُ أَنَا أَعْتَزِلُ النِّسَاءَ فَلَا أَتَزَوَّجُ أَبَدًا. فَجَاءَ رَسُوْلُ اللَّهِ فَقَالَ أَنْتُمُ الَّذِينَ قُلْتُمْ كَذَا وَكَذَا؟ أَمَا وَاللَّهِ إِنِّي لَأَخْشَاكُمْ لِلَّهِ وَأَتْقَاكُمْ لَهُ وَلَكِنِّي أَصُوْمُ وَأُفْطِرُ وَأُصَلِّي وَأَرْقُدُ، وَأَتَزَوَّجُ النِّسَاءَ، فَمَنْ رَغِبَ عَنْ سُنَّتِي فَلَيْسَ مِنِّي. আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) বর্ণনা করেন, তিন ব্যক্তি রাসূলের স্ত্রীগণের নিকটে এসে তাঁর ইবাদত সম্পর্কে জানতে চাইল। তাদেরকে যখন ঐ সম্পর্কে বলা হলো, তারা যেন তা কম মনে করল। তখন তারা বলল, রাসূলের আমলের তুলনায় আমরা কোথায় পড়ে আছি? অথচ আল্লাহ তাঁর পূর্বাপর সকল গোনাহ ক্ষমা করে দিয়েছেন। তখন তাদের একজন বলল, আমি সর্বদা সারারাত ছালাত আদায় করব। আরেকজন বলল, আমি সারা বছর ছিয়াম পালন করব, কোন দিন ছাড়ব না। অন্যজন বলল, আমি নারীসঙ্গ ত্যাগ করব, কোন দিন বিবাহ করব না। ইতিমধ্যে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এসে বললেন, তোমরা এরূপ এরূপ বলেছ? আল্লাহ্র কসম! আমি তোমাদের চেয়ে আল্লাহকে অধিক ভয় করি। তথাপি আমি ছিয়াম পালন করি, ছেড়েও দেই, আমি ছালাত আদায় করি এবং ঘুমাই। আমি বিবাহও করেছি। সুতরাং যে আমার সুন্নাতকে পরিত্যাগ করবে সে আমার দলভুক্ত নয়'।

আবদুল্লাহ ইবনু আমর ইবাদত-বন্দেগীতে এমন মশগুল থাকতেন যে, তার স্ত্রীর প্রতি কর্তব্যও উপেক্ষিত হচ্ছিল। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) একথা জানতে পেরে বললেন, أَلَمْ أُخْبِرُ أَنَّكَ تَصُوْمُ النَّهَارَ وَتَقُوْمُ اللَّيْلَ فَقُلْتُ بَلَى يَا رَسُولَ اللَّهِ قَالَ فَلَا تَفْعَلْ، صُمْ وَافْطِرْ وَنِمْ وَقُمْ، فَإِنَّ لِجِسْمِكَ عَلَيْكَ حَقًّا وَإِنَّ لِعَيْنِكَ عَلَيْكَ حَقًّا وَإِنَّ لِزَوْجِكَ عَلَيْكَ حَقًّا وَإِنَّ لِزَوْرِكَ عَلَيْكَ حَقًّا. 'হে আবদুল্লাহ! আমি কি শুনিনি যে, তুমি সারাদিন ছিয়াম পালন কর এবং সারা রাত ছালাত আদায় কর? আব্দুল্লাহ বললেন, হ্যাঁ, হে আল্লাহ্র রাসূল! মহানবী (ছাঃ) বললেন, এরূপ কর না। তুমি ছিয়াম রাখবে আবার বিরতিও দিবে। ছালাত আদায় করবে আবার ঘুমাবেও। কেননা তোমার উপর তোমার শরীরের হক আছে, তোমার উপর তোমার চোখের হক রয়েছে, তেমনি তোমার উপর তোমার স্ত্রীর দাবী আছে এবং তোমার উপর অতিথিরও হক আছে'।

এ মর্মে প্রখ্যাত ছাহাবী সালমান ফারসী ও তাঁর একান্ত বন্ধু আবুদ দারদার মধ্যকার ঘটনাটিও প্রণিধানযোগ্য। আবু জুহাইফাহ ওয়াহাব ইবনু আবদুল্লাহ (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) সালমান ফারসী ও আবুদ দারদার মধ্যে ভ্রাতৃত্ব বন্ধন কায়েম করে দিয়েছিলেন। একদা সালমান (রাঃ) আবু দারদার বাড়িতে বেড়াতে গেলেন। দেখলেন আবুদ দারদার স্ত্রী উম্মু দারদা জীর্ণবসন পরিহিতা। তিনি এর কারণ জিজ্ঞেস করলে উম্মু দারদা বললেন, আপনার ভাই আবুদ দারদার দুনিয়াবী কোন কিছুর প্রয়োজন নেই। ইতিমধ্যে আবুদ দারদা এসে সালমান (রাঃ)-এর জন্য কিছু খাবার তৈরী করে নিয়ে আসলেন। সালমান (রাঃ) তার সাথে আবুদ দারদাকে খেতে বললেন। তিনি বললেন, আমি ছিয়াম রেখেছি। তখন সালমান (রাঃ) বললেন, 'তুমি না খেলে আমিও খাব না'। সুতরাং আবুদ দারদাও সালমানের সাথে খেলেন। রাতে আবুদ দারদা ছালাতের জন্য উঠলে সালমান (রাঃ) তাকে ঘুমাতে যেতে বললেন। তিনি ঘুমাতে গেলেন। রাতের শেষ প্রান্তে সালমান (রাঃ) আবুদ দারদাকে বললেন, এখন ওঠো। তখন দু'জনে ছালাত আদায় করলেন। পরে সালমান (রাঃ) আবুদ দারদাকে বললেন, তোমার উপর তোমার প্রভুর হক আছে, তোমার উপর তোমার আত্মার হক আছে, তোমার উপর পরিবারেরও হক আছে। সুতরাং প্রত্যেককে তার ন্যায্য অধিকার দাও। অতঃপর নবী করীম (ছাঃ)-এর নিকটে এসে বিষয়টি উল্লেখ করলেন। তখন তিনি বললেন, সালমান সত্য বলেছে।

অপর একটি হাদীছে এসেছে, আনাস (রাঃ) হ'তে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী করীম (ছাঃ) একদা মসজিদে প্রবেশ করে দু'টি খুঁটির সাথে একটি রশি বাঁধা দেখতে পেলেন। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, এ রশি কিসের? ছাহাবায়ে কেরাম বললেন, এটা যয়নাবের রশি, যখন ঘুমে তার চোখ আচ্ছন্ন হয়ে আসে কিংবা ছালাতে অলসতা আসে, তখন তিনি নিজেকে এ দড়ি দ্বারা বেঁধে রাখেন। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তখন বললেন, ওটা খুলে ফেল। তোমাদের সাধ্যমত, সামর্থ্যানুযায়ী ছালাত আদায় করা উচিত। অতএব কারো যদি ঘুমে চোখ বুজে আসে, সে যেন ঘুমায়'। ইবাদতের ক্ষেত্রে এসব কঠোরতার বিরুদ্ধে রাসূলের ঘোষণা- لَا تُشدِّدُوا عَلَى أَنْفُسِكُمْ، فَإِنَّمَا هَلَكَ مَنْ كَانَ قِبَلَكُمْ بِتَشْدِيدِهِمْ عَلَى أَنْفُسِهِمْ، وَسَتَجِدُونَ بَقَايَاهُمْ فِي الصَّوَامِعِ وَالدِّيَارَاتِ ‘তোমরা নিজেদের নফসের উপরে কঠোরতা আরোপ করো না। পূর্ববর্তী উম্মত নিজেদের উপর কঠোরতা আরোপ করায় ধ্বংসে নিপতিত হয়েছে। নিশ্চয়ই তোমরা তাদের নিদর্শনাসমূহ মন্দির-উপাসনালয় সমূহে দেখতে পাবে’।

পূর্ববর্তী সম্প্রদায় সমূহ আমল ও ইবাদতের ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি করেছে। একদিকে তারা শরী'আতের বিধি-বিধানকে স্বল্পমূল্যে বিক্রি করে দিয়েছে, ঘুষ-উৎকোচ নিয়ে আসমানী গ্রন্থকে পরিবর্তন করেছে কিংবা মিথ্যা ফৎওয়া দিয়েছে, বাহানা ও অপকৌশলের মাধ্যমে ধর্মীয় বিধান পরিবর্তন করেছে এবং ইবাদত থেকে গাঁ বাঁচিয়ে চলেছে। অন্যদিকে তাদের উপাসনালয়গুলোতে এমন লোকের উপস্থিতিও লক্ষ্য করা যায়, যারা সংসারধর্ম ত্যাগ করে বৈরাগ্য অবলম্বন করেছে। এমনকি তারা আল্লাহ প্রদত্ত হালাল নে'আমত ভোগ করা থেকেও নিজেদেরকে বিরত রাখে এবং কষ্ট সহ্য করাকেই ছাওয়াব বা পুণ্যকর্ম ও ইবাদত মনে করে।

কিন্তু উম্মতে মুহাম্মাদী একদিকে বৈরাগ্যকে মানবতার প্রতি যুলুম বলে মনে করে। অপরদিকে আল্লাহ ও রাসূলের বিধি-বিধান তথা ইসলামের জন্য প্রয়োজনে জীবন বিসর্জন দিতেও কুণ্ঠিত হয় না। তারা রোম ও পারস্য সাম্রাজ্যের সিংহাসনের অধিপতি হয়েও বিশ্বকে দেখিয়ে দিয়েছে যে, ধর্ম ও রাজনীতির মধ্যে কোন বিরোধ নেই এবং ধর্ম কেবল মসজিদের চার দেয়ালের অভ্যন্তরে আবদ্ধ থাকার জন্য আসেনি। বরং হাট-বাজার, মাঠ-ঘাট, অফিস-আদালত ও সচিবালয় সহ সর্বত্র এর প্রভাব ও নির্দেশনা পরিব্যাপ্ত। তাই মুসলিম খলীফাগণ বাদশাহীর মাঝে ফকীরী এবং ফকীরীর মাঝে বাদশাহী করার দৃষ্টান্ত স্থাপন করে জাতিকে শিক্ষা দিয়ে গেছেন।

টিকাঃ
১৩. বুখারী, 'ছালাত' অধ্যায় হা/৪২৬; মুসলিম, 'মসজিদ সমূহ' অধ্যায়, হা/৫২৮।
১৪. বুখারী হা/৪৩, মুসলিম হা/৭৮৫, আবুদাউদ, নাসাঈ, হা/৫০৩৫; ইবনু মাজাহ, হা/৪২৩৮।
১৫. মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/১২৪২।
১৬. মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/১২৪৩।
১৭. মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/১২৪৪।
১৮. মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/১২৪৫
১৯. বুখারী, মিশকাত হা/১২৪৮।
২০. আবু দাউদ, মিশকাত হা/১২৫৩।
২১. বুখারী, মুসলিম; মিশকাত, হা/১৪৫, 'ঈমান' অধ্যায়।
২২. বুখারী হা/১৯৭৫, ইমাম আবু যাকারিয়া ইয়াহইয়া ইবনু শারফ আন-নববী, রিয়াযুছ ছালেহীন, হা/১৫০, 'ইবাদতে মধ্যপন্থা অবলম্বন' অনুচ্ছেদ।
২৩. বুখারী হা/১৯৬৮, রিয়াযুছ ছালেহীন, হা/১৪৯, 'ইবাদতে মধ্যপন্থা অবলম্বন' অনুচ্ছেদ।
২৪. মুত্তাফাক্ব আলাইহ, আবুদাউদ, হা/১৩১২, 'ছালাতে তন্দ্রা' অনুচ্ছেদ।
২৫. বায়হাক্বী, শু'আবুল ঈমান, সিলসিলা ছহীহাহ হা/৩১২৪।

📘 মধ্যমপন্থা গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা 📄 চরিত্র-মাধুর্যে মধ্যপন্থা

📄 চরিত্র-মাধুর্যে মধ্যপন্থা


আক্বীদা-বিশ্বাস ও ইবাদতে যেমন মধ্যপন্থা অবলম্বন করতে হবে তেমনি আচার-আচরণ, চাল-চলনসহ সকল কর্মকাণ্ডে মধ্যপন্থা অবলম্বনের জন্য ইসলামে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এখানে আখলাক ও মু'আমালাত তথা চারিত্রিক ও ব্যবহারিক ক্ষেত্রে মধ্যপন্থা অবলম্বনের কয়েকটি দিক উল্লেখ করা হ'ল।-

(ক) চাল-চলনে মধ্যপন্থা : মানুষের চাল-চলনে অনেক সময় গর্ব-অহংকার প্রকাশ পায়। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন মানুষকে পৃথিবীতে অহংকারবশে চলতে নিষেধ করেছেন। তিনি বলেন, وَلَا تَمْشِ فِي الْأَرْضِ مَرَحًا إِنَّكَ لَنْ تَخْرِقَ الْأَرْضَ وَلَنْ تَبْلُغَ الْجِبَالَ طُولاً - 'পৃথিবীতে দম্ভভরে পদচারণা করো না। নিশ্চয়ই তুমি কখনোই ভূপৃষ্ঠকে বিদীর্ণ করতে পারবে না এবং উচ্চতায় কখনোই পর্বত প্রমাণ হ'তে পারবে না' (বনু ইসরাঈল ১৭/৩৭)।

পক্ষান্তরে চাল-চলনে মধ্যপন্থা অবলম্বনের নির্দেশ দিয়ে আল্লাহ বলেন, وَأَقْصِدْ فِي مَشْيِكَ وَاغْضُضْ مِنْ صَوْتِكَ إِنَّ أَنْكَرَ الْأَصْوَاتِ لَصَوْتُ الْحَمِيرِ - মধ্যপন্থা অবলম্বন কর, কণ্ঠস্বরকে নিম্নগামী রাখ। নিশ্চয়ই নিকৃষ্ট আওয়ায হচ্ছে গাধার আওয়ায' (লোকুমান ৩১/১৯)। ইবনু কাছীর (রহঃ) এ আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন, أي امش مقتصدا مشيًا ليس بالبطئ المتثبط ولا بالسريع المفرط بل عدلا و وسطًا بين بين. অর্থাৎ 'মধ্যম গতিতে চল। অতি দ্রুতও নয়, আবার নিতান্ত আস্তেও নয়, বরং শান্ত-শিষ্টভাবে মধ্যপন্থা অবলম্বন করে চলতে হবে'। চাল-চলনে মধ্যপন্থা অবলম্বনের প্রতি গুরুত্বারোপ করে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, السَّمْتُ الْحَسَنُ وَالتَّوَدَةُ وَالْاِقْتِدَصَادَ جُزْءٌ মঁন أَرْبَعٍ وَعِشْرِينَ جُزْءٌ مِّنَ النُّبُوَّةِ - চাল-চলন, ধীরস্থিরতা এবং মধ্যপন্থা অবলম্বন নবুওয়াতের চব্বিশ ভাগের একভাগ'। অন্য হাদীছে এসেছে, আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রাঃ) হ'তে বর্ণিত নবী করীম (ছাঃ) বলেন, 'সচ্চরিত্রতা, উত্তম চাল-চলন এবং মধ্যপন্থা অবলম্বন নবুওয়াতের পঁচিশ ভাগের এক ভাগ'।

(খ) কথাবার্তায় মধ্যপন্থা : কথাবার্তায় কণ্ঠস্বর স্বাভাবিক রাখার জন্যও আল্লাহ তা'আলা নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন, 'কণ্ঠস্বরকে নিম্নগামী রাখ। নিশ্চয়ই নিকৃষ্ট আওয়ায হচ্ছে গাধার আওয়ায' (লুকুমান ৩১/১৯)। এ আয়াতাংশের ব্যাখ্যায় ইবনু কাছীর (রহঃ) বলেন, أي لا تبالغ في الكلام ولا ترفع صوتك فيما لا فائدة فيه. 'কথা বার্তায় অতিরঞ্জন করো না, কণ্ঠস্বর উচ্চ করো না, যাতে কোন উপকারিতা নেই'। মুজাহিদসহ আরো অনেকে বলেন, নিশ্চয়ই আওয়াযের মধ্যে গাধার আওয়ায অত্যন্ত নিকৃষ্ট। অর্থাৎ উচ্চ কণ্ঠস্বরকে গাধার উচ্চ আওয়াযের সাথে তুলনা করা হয়েছে। আর এটা আল্লাহ্র নিকট অত্যন্ত অপসন্দনীয় ও ঘৃণিত। চিৎকার, চেঁচামেচি ও কর্কশতা পরিহার এবং বিশুদ্ধ ও নম্রভাষায় কথা বলার নির্দেশই উক্ত আয়াতের মূল প্রতিপাদ্য বিষয়। সমাজে এমন কিছু লোক আছে যারা কথা বলতে গেলেই চিৎকার করে কথা বলে। উচ্চৈঃস্বরে কথা বলাই তাদের অভ্যাস। তারা নিজেদের পরিবার-পরিজনের সাথে যেমনভাবে উচ্চৈঃস্বরে কথা বলে তেমনিভাবে আলেম-ওলামা, সমাজের গণ্যমান্য, সম্মানিত ব্যক্তিবর্গের সাথেও অনুরূপভাবে কথা বলে। আল্লাহ তা'আলা এগুলি পরিহার করার নির্দেশ দিয়ে বলেন, يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَرْفَعُوا أَصْوَاتَكُمْ فَوْقَ صَوْتِ النَّبِيِّ وَلَا تَجْهَرُوا لَهُ بِالْقَوْلِ كَجَهْرِ بَعْضِكُمْ لِبَعْضٍ أَنْ تَحْبَطَ أَعْمَالُكُمْ وَأَنْتُمْ لَا تَشْعُرُوْنَ 'হে মুমিনগণ! তোমরা নবীর কণ্ঠস্বরের উপর তোমাদের কণ্ঠস্বর উচু করো না এবং তোমরা একে অপরের সাথে যেরূপ উচ্চৈঃস্বরে কথা বল, তাঁর সাথে সেরূপ উচ্চৈঃস্বরে কথা বলো না। এতে তোমাদের কর্ম নিষ্ফল হয়ে যাবে এবং তোমরা টেরও পাবে না' (হুজুরাত ৪৯/২)। ওলামায়ে কেরাম নবীগণের উত্তরসূরী হিসাবে তাদের সাথেও বিনয় ও নম্রতার সাথে কণ্ঠস্বর নিচু রেখে কথা বলতে হবে।

রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) কথাবার্তায় অহংকার প্রকাশ ও অন্যকে তুচ্ছ করে কথা বলতে নিষেধ করেছেন। তিনি বলেন, 'ক্বিয়ামতের দিন তোমাদের মধ্য থেকে আমার নিকট সবচেয়ে প্রিয় ও সবচেয়ে নিকটে উপবিষ্ট হবে সেই ব্যক্তি, যার চরিত্র সবচেয়ে ভাল। আর ক্বিয়ামতের দিন তোমাদের মধ্য থেকে আমার নিকট সবচেয়ে ঘৃণ্য ও আমার থেকে সবচেয়ে দূরবর্তী হবে সেইসব লোক, যারা দ্বিধা সহকারে কথা বলে, কথার মাধ্যমে অহংকার প্রকাশ করে এবং যারা 'মুতাফাইহিকুন'। ছাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহ্র রাসূল (ছাঃ)! দ্বিধান্বিত বাক্যালাপকারী ও কথার মাধ্যমে অহংকার প্রকাশকারীর অর্থ তো বুঝলাম, কিন্তু 'মুতাফাইহিকূন' কারা? তিনি বললেন, অহংকারী ব্যক্তিরা'। উল্লিখিত হাদীছের কতিপয় শব্দের ব্যাখ্যায় ইমাম নববী (রহঃ) বলেন, 'আছ-ছারছারু' বলতে ঐ লোককে বুঝায়, যে অত্যধিক কৃত্রিমভাবে কথা বলে থাকে। 'আল-মুতাশাদ্দিকু' ঐ লোককে বলে, যে নিজের কথার দ্বারা অন্যের উপর নিজের প্রাধান্য ও বড়াই প্রকাশ করে এবং কথাবার্তা বলার সময় নিজের কথার বিশুদ্ধতা ও শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিপন্ন করে থাকে। 'মুতাফাইহিকুন' শব্দটি 'ফাহকুন' ধাতু থেকে নির্গত। এর অর্থ মুখ ভর্তি করা বা পূর্ণ করা। কাজেই 'আল-মুতাফাইহিকূন' বলতে ঐ লোককে বুঝায়, যে মুখ ভর্তি করে কথা বলে এবং তাতে বাড়াবাড়ি করে, চিবিয়ে চিবিয়ে কথা বলে এবং নিজের অহংকার ও আভিজাত্যের বহিঃপ্রকাশের উদ্দেশ্যে কথা বলে। সচ্চরিত্রের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে তিরমিযী (রহঃ) আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক (রহঃ)-এর ভাষায় বলেন, সচ্চরিত্র হলো হাসি-খুশি মুখ, সত্য-ন্যায়কে অবলম্বন করা এবং অন্যকে কোনরূপ কষ্ট দেয়া থেকে বেঁচে থাকা। কথাবার্তায় অশ্লীল ভাষা ব্যবহারকারীকে আল্লাহ পসন্দ করেন না। আবুদ দারদা (রাঃ) হ'তে বর্ণিত, নবী করীম (ছাঃ) বলেছেন, 'কিয়ামতের দিন মুমিনের পাল্লায় সর্বাপেক্ষা ভারী যে জিনিসটি রাখা হবে, তা হলো উত্তম চরিত্র। আর আল্লাহ তা'আলা অশ্লীলভাষী দুশ্চরিত্রকে ঘৃণা করেন'।

(গ) আচার-ব্যবহারে মধ্যপন্থা: মুসলমানদের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে তারা আচার-ব্যবহারে বিনয়ী ও নম্র হবে। আবু হুরায়রা (রাঃ) হ'তে বর্ণিত, নবী করীম (ছাঃ) বলেছেন, 'ঈমানদার হয় সরল ও ভদ্র, পক্ষান্তরে পাপী হয় ধূর্ত ও হীন চরিত্রের'। অন্য হাদীছে এসেছে, মাকহুল (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, 'ঈমানদারগণ নাকে রশি লাগানো উটের ন্যায় সরল, সহজ ও কোমল স্বভাবের হয়। যখন তাকে টানা হয়, তখন সে চলে। আর যদি তাকে পাথরের উপর বসাতে চাওয়া হয়, তাহলে সে তার উপর বসে পড়ে'।

আল্লাহ তাঁর রাসূলকে মুসলমানদের প্রতি বিনয়ী ও সদয় হওয়ার নির্দেশ দিয়ে বলেন, وَاخْفِضْ جَنَاحَكَ لِمَنِ اتَّبَعَكَ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ 'যারা তোমার অনুসরণ করে, সেসমস্ত বিশ্বাসীর প্রতি সদয় হও' (শু'আরা ২৬/২১৫)। মুমিনদের পারস্পরিক আচার-ব্যবহার সম্পর্কে আল্লাহ আরো বলেন, يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا مَنْ يَرْتَدَّ مِنْكُمْ عَنْ دِينِهِ فَسَوْفَ يَأْتِي اللَّهُ بِقَوْمٍ يُحِبُّهُمْ وَيُحِبُّونَهُ أَذِلَّةٍ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ أَعِزَّةٍ عَلَى الْكَافِرِينَ، 'হে ঈমানদারগণ! তোমাদের মধ্যে কেউ তার দ্বীন থেকে ফিরে গেলে নিশ্চয়ই আল্লাহ এমন এক সম্প্রদায় সৃষ্টি করবেন, যারা হবে আল্লাহ্ প্রিয় এবং আল্লাহ হবেন তাদের প্রিয়। তারা মুমিনদের প্রতি নম্র ও বিনয়ী হবে এবং কাফেরদের প্রতি হবে অত্যন্ত কঠোর' (মায়েদা ৫/৫৪)।

উল্লিখিত আয়াত থেকে প্রতীয়মান হয় যে, ইসলাম মানুষকে আচার-ব্যবহারে কঠোর ও রুক্ষ্ম না হয়ে কোমল ও নম্র হওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, لَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ الْجَوَّاظُ وَلَا الْجَعْظَرِيُّ ‘কঠোর ও রুক্ষ স্বভাবের ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করবে না’। আল্লাহ তা'আলা রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে লক্ষ্য করে বলেন, فَبِمَا رَحْمَةٍ مِّنَ اللَّهِ لِنْتَ لَهُمْ وَلَوْ كُنْتَ فَظًّا غَلِيظَ الْقَلْبِ لَأَنْفَضُّوا مِنْ حَوْلِكَ فَاعْفُ عَنْهُمْ وَاسْتَغْفِرْ لَهُمْ وَشَاوِرْهُمْ فِي الْأَمْرِ ‘আল্লাহ্র রহমতেই আপনি তাদের জন্য কোমল হৃদয় হয়েছেন। পক্ষান্তরে আপনি যদি রুক্ষ্ম ও কঠোর হৃদয়ের অধিকারী হতেন, তাহলে তারা আপনার কাছ থেকে দূরে চলে যেত। কাজেই আপনি তাদের ক্ষমা করে দিন ও তাদের জন্য মাগফিরাত প্রার্থনা করুন এবং তাদের সাথে বিভিন্ন কাজে পরামর্শ করুন’ (আলে ইমরান ৩/১৫৯)।

আচার-আচরণে বিনয়ী ও বিনম্র হওয়ার নির্দেশ সম্বলিত বহু হাদীছ বর্ণিত হয়েছে। নিম্নে কয়েকটি হাদীছ উপস্থাপন করা হ'ল-
১. আয়ায ইবনু হিমার (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, ‘আল্লাহ আমার নিকট অহী পাঠিয়েছেন যে, তোমরা পরস্পরের সাথে বিনয় ও নম্র আচরণ করো, এমনকি কেউ কারো উপর গৌরব করবে না এবং একজন আরেকজনের উপর বাড়াবাড়ি করবে না’।
২. আবু হুরায়রা (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, ‘দানের দ্বারা সম্পদ কমে না। বান্দার ক্ষমার গুণ দ্বারা আল্লাহ তার ইয্যত ও সম্মান বৃদ্ধি করেন। কেউ আল্লাহ্র সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে বিনয় ও নম্রতা অবলম্বন করলে আল্লাহ তার মর্যাদা বাড়িয়ে দেন’।

প্রকাশ থাকে যে, সমাজে এমন কিছু মানুষ আছে, যারা অতি কঠোর ও রুক্ষ্ম স্বভাবের এবং তারা অত্যন্ত নিষ্ঠুর ও কর্কশ ব্যবহারেরও অধিকারী। অনেকে আছে অতি নির্দয় ও অশালীন। আবার কেউ আছে অতীব শান্ত-শিষ্ট, নম্র ও বিনয়ী। এসব দোষ-ত্রুটি ছোট-বড় সবার মাঝে থাকতে পারে। মুমিনের আচার-ব্যবহার হবে অতি কোমল ও অতি কঠোরতার মধ্যবর্তী। কেননা অতি বিনয়ী হ’লে অধিকার বঞ্চিত হবে এবং কোন কোন ক্ষেত্রে অত্যাচারিত হবে। আর অতি কঠোর হ’লে মানুষ তার নিকট থেকে দূরে সরে যাবে। এজন্য মুমিনদের যথার্থ বিনয়ী-নম্র, কোমল, শান্ত-শিষ্ট ও দয়ার্দ্র হওয়া বাঞ্ছনীয়। কঠোরতা ও নিষ্ঠুরতা মুমিনের বৈশিষ্ট্য বিরোধী। আচার-ব্যবহারে বিনয়ী ও নম্র হওয়ার পাশাপাশি অহংকার, আত্মম্ভরিতা ইত্যাদি পরিহার করতে হবে। এসব মানব চরিত্রের দুষ্টক্ষত। এগুলি মানুষকে মনুষ্যত্বের স্তর থেকে পশুত্বের স্তরে নামিয়ে দেয়। এজন্য ইসলাম মানুষকে উদ্ধত ও দাম্ভিকতা পরিহার করতে নির্দেশ দিয়েছে। সাথে সাথে আল্লাহ দাম্ভিকতা পরিহারকারীদের জন্য পুরস্কারের ঘোষণা দিয়েছেন। আল্লাহ তা’আলা বলেন, تِلْكَ الدَّارُ الْآخِرَةُ نَجْعَلُهَا لِلَّذِينَ لَا يُرِيدُوْনَ عُلُوًّا فِي الْأَرْضِ وَلَا فَسَادًا وَالْعَاقِبَةُ لِلْمُتَّقِينَ ‘এটা আখেরাতের সেই আবাস, যা আমি নির্ধারণ করি তাদের জন্য, যারা এ পৃথিবীতে উদ্ধত হ’তে ও বিপর্যয় সৃষ্টি করতে চায় না। শুভ পরিণাম মুত্তাক্বীদের জন্য’ (ক্বাছাছ ২৮/৮৩)।

দাম্ভিক-অহংকারীকে আল্লাহ পসন্দ করেন না, এমর্মে তিনি বলেন, وَلَا تُصَعِّرْ حَدَّكَ لِلنَّاسِ وَلَا تَمْশِ فِي الْأَرْضِ مَرَحًا إِنَّ اللَّهَ لا يُحِبُّ كُلَّ مُخْتَالٍ فَخُورٍ - তুমি লোকদের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে কথা বলো না এবং পৃথিবীতে দম্ভভরে বিচরণ করো না। আল্লাহ কোন অহংকারী দাম্ভিককে পসন্দ করেন না' (লুকুমান ৩১/১৮)। মহান আল্লাহ অহংকারীর ভয়াবহ পরিণতি অবহিত করার জন্য কুরআন মাজীদে কারূণের ঘটনা নিম্নোক্তভাবে উল্লেখ করেছেন- কারূণ ছিল মূসার সম্প্রদায়ভুক্ত... গতকাল যারা তার মত হওয়ার বাসনা প্রকাশ করেছিল, তারা প্রত্যুষে বলতে লাগল, হায়, আল্লাহ তাঁর বান্দাদের মধ্যে যার জন্য ইচ্ছা রিযিক বর্ধিত করেন ও হ্রাস করেন। আল্লাহ আমাদের প্রতি অনুগ্রহ না করলে, আমাদেরকেও ভূগর্ভে বিলীন করে দিতেন। হায়, কাফেররা সফলকাম হবে না' (ক্বাছাছ ২৮/৭৬-৮২)। অহংকারীর পরিণতি সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, ‘যার অণু পরিমাণ অহংকার রয়েছে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না। জনৈক ছাহাবী বললেন, কোন লোক তো চায় যে, তার কাপড়টা সুন্দর হোক, জুতাটা আকর্ষণীয় হোক (এটাও কি খারাপ)? তিনি বললেন, আল্লাহ নিজে সুন্দর। তিনি সৌন্দর্য পসন্দ করেন। অহংকার হলো গর্বভরে সত্যকে অস্বীকার করা এবং মানুষকে হেয় জ্ঞান করা’। কি তোমাদেরকে জাহান্নামীদের বিষয়ে সংবাদ দিব না? তারা হলো, প্রত্যেক অহংকারী, সীমালংঘনকারী, বদবখত ও উদ্ধত লোক’।

উল্লিখিত আয়াত ও হাদীছ দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, আচার-ব্যবহারে অহংকার, দাম্ভিকতা, আত্মম্ভরিতা ইত্যাদি পরিহার করা এবং বিনয়ী ও নম্র হওয়া মুমিনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। আর আল্লাহ রাব্বুল আলামীন কোমল, তিনি কোমলতা পসন্দ করেন। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, إِنَّ اللَّهَ رَفِيقُ يُحِبُّ الرِّفْقَ فِي الْأُمُوْরِ كُلِّهِ ‘আল্লাহ কোমল ও মেহেরবান। তাই প্রতিটি কাজে তিনি কোমলতা ও মেহেরবানী পসন্দ করেন’। আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নবী করীম (ছাঃ) বলেন, স্বয়ং কোমল ও সহানুভূতিশীল। তিনি কোমলতা ও সহানুভূতিশীলতাকে ভালবাসেন। তিনি কোমলতার মাধ্যমে এমন জিনিস দান করেন, যা কঠোরতার দ্বারা দেন না। আর কোমলতা ছাড়া অন্য কিছু দ্বারা তিনি তা দেন না’। অন্যত্র রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, যে জিনিসে কোমলতা থাকে, কোমলতা সেটিকে সৌন্দর্য মণ্ডিত করে। আর যে জিনিস থেকে কোমলতা ছিনিয়ে নেয়া হয়, সেটাই দোষ-ত্রুটিযুক্ত হয়ে যায়’।

(ঘ) মানুষের সাথে সংশ্রব ও মেলামেশায় মধ্যপন্থা: মানুষের সাথে মেলামেশায় মধ্যপন্থা অবলম্বন করা আবশ্যক। কোন কোন মানুষ জনবিচ্ছিন্ন হয়ে একাকী থাকা পসন্দ করে, কারো সাথে মিশতে চায় না। ফলে লোকজনও তার সঙ্গ পরিহার করে। আবার অনেকে আছে অত্যন্ত সঙ্গপ্রিয়, আড্ডাবাজ। তারা একাকী থাকতে পারে না, মানুষের সাথে মেলামেশা ও আড্ডায় তারা অধিকাংশ সময় নষ্ট করে। এমনকি বাজারে ও ক্লাবেই তাদের সময় কাটে। সভা-সমিতি, মিটিং-মিছিল ইত্যাদিতে তারা মশগুল থাকে। নিজের জন্য ও পরিবার-পরিজনের জন্য চিন্তা করার তাদের কোন ফুরসত থাকে না। এসবই বাড়াবাড়ি। এতদুভয়ের মধ্যবর্তী অবস্থা হচ্ছে প্রয়োজনে সাধ্যমত মানুষের সাথে মেশা বা তাদের সংস্পর্শে আসা এবং বিনা প্রয়োজনে তাদের সঙ্গ পরিহার করা। যাতে একেবারে জনবিচ্ছিন্ন না হয় এবং তাদের সাথে মত্ত হয়ে স্বীয় দায়িত্ব-কর্তব্যও ভুলে না যায়। তাই এক্ষেত্রে মধ্যপন্থা অবলম্বন করা অতীব যরূরী। আর মানুষের সাথে মেলামেশার ক্ষেত্রে সৎ, শিক্ষিত, মার্জিত, ভদ্র, শালীনদের সাথে সংশ্রব রাখাই উত্তম। অসৎ, অভদ্র, অশালীন, অশিক্ষিত ও মূর্খদের সাহচর্য পরিহার করা বা তাদের থেকে দূরে থাকা আবশ্যক। কেননা আল্লাহ তা'আলা বলেন, خُذِ الْعَفْوَ وَأْمُرْ بِالْعُرْفِ وَأَعْرِضْ عَنِ الْجَاهِلِينَ. 'ক্ষমা অবলম্বন কর এবং মূর্খ লোকদের এড়িয়ে চলো' (আ'রাফ ৭/১৯৯)।

মুসলিম কার সাথে মিশবে ও সংশ্রব রাখবে এ সম্পর্কে হাদীছেও সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। আব্দুল্লাহ ইবনু মাস'ঊদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, আমি কি তোমাদের এ বিষয়ে জানাব না যে, কোন্ লোক জাহান্নামের আগুনের জন্য হারাম অথবা কার জন্য জাহান্নামের আগুন হারাম? জাহান্নামের আগুন এমন প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য হারাম, যে লোকদের নিকটে বা তাদের সাথে মিলেমিশে থাকে, যে কোমলমতি, নরম মেজায ও বিনম্র স্বভাববিশিষ্ট'। আবু মূসা (রাঃ) হ'তে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, সৎ বা উত্তম সঙ্গী এবং অসৎ বা খারাপ সঙ্গীর দৃষ্টান্ত হচ্ছে, মিশক আম্বর ওয়ালা ও হাপর ওয়ালার ন্যায়। মিশক আম্বর ওয়ালা তোমাকে কিছু দান করবে কিংবা তুমি তার কাছ থেকে কিছু ক্রয় করবে অথবা তার নিকট থেকে তুমি সুগন্ধি লাভ করবে। আর হাপর ওয়ালা তোমার বস্ত্র জ্বালিয়ে দেবে কিংবা তার নিকট থেকে তুমি দুর্গন্ধ পাবে'।

মানুষের সাথে মেলামেশার ক্ষেত্রে যেমন মুত্তাক্বী, পরহেযগার, সচ্চরিত্রবান লোকের সাথে মিশতে হবে, তেমনি তাদের দেয়া কষ্টে ধৈর্যধারণ করতে হবে। কেননা যারা মানুষের দেয়া কষ্টে ধৈর্যধারণ করে, তার জন্য অনেক ছওয়াব রয়েছে। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, 'মুমিন ব্যক্তি যে মানুষের সাথে মিশে এবং তাদের প্রদত্ত কষ্টে ধৈর্যধারণ করে, সে ঐ মুমিন ব্যক্তির চেয়ে অধিক নেকী লাভ করে, যে মানুষের সাথে মিশে না এবং তাদের দেয়া কষ্টেও ধৈর্যধারণ করে না'।

মানুষের সাথে মেলামেশা সম্পর্কে ইমাম নববী (রহঃ) বলেন, 'জেনে রাখ, জনসাধারণের উপরোল্লিখিত (সভা-সমিতি, উত্তম বৈঠক, সৎকাজের আদেশ, অসৎ কাজের নিষেধ ইত্যাদি বিষয়ে) বৈঠক ও অনুষ্ঠানাদিতে অংশগ্রহণ, মেলামেশা ও উঠাবসা করা উত্তম। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) ও অন্যান্য সকল আম্বিয়ায়ে কেরাম (আঃ), খুলাফায়ে রাশেদীন, ছাহাবায়ে কেরাম ও তাবেঈনে ইযাম প্রত্যেকের এই নীতি ও আদর্শ ছিল। পরবর্তীকালের ওলামায়ে কেরাম ও উম্মতের উৎকৃষ্ট মনীষীগণও একই আদর্শের অনুসরণ করেছেন। ইমাম শাফেঈ ও আহমাদ (রহঃ) সহ ফিকুহ শাস্ত্রের প্রসিদ্ধ ইমামগণ ও অপরাপর ইসলামী চিন্তাবিদ সকলেই সমাজবদ্ধভাবে বসবাস করা এবং সামাজিক ও সাংসারিক দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনকেই ইসলামী যিন্দেগীর সফলতার পূর্বশর্ত হিসাবে গণ্য করেছেন'।

টিকাঃ
২৬. ইবনু কাছীর, তাফসীরুল কুরআনিল আযীম, (বৈরুত: ১৯৯৬/১৪১৬ হিঃ), ৩/৪৪৭পৃ.।
২৭. তিরমিযী; মিশকাত, হা/৫০৫৯; বঙ্গানুবাদ মিশকাত, হা/৪৮৩৮, সনদ হাসান।
২৮. আবুদাউদ, হা/৪৮৭৬; মিশকাত, হা/৫০৬০; বঙ্গানুবাদ মিশকাত, হা/৪৮৩৯, সনদ হাসান।
২৯. তাফসীরুল কুরআনিল আযীম, ৩/৪৪৭পৃ.।
৩০. প্রাগুক্ত।
৩১. তিরমিযী, হা/২০১৮, সনদ ছহীহ।
৩২. রিয়াযুছ ছালেহীন, পৃ. ২৩৩।
৩৩. তিরমিযী, রিয়াযুছ ছালেহীন, পৃ. ২৩৩।
৩৪. তিরমিযী, হা/২০০৩-৪; মিশকাত হা/৫০৮১; বঙ্গানুবাদ মিশকাত হা/৪৮৫৯।
৩৫. তিরমিযী, আবুদাঊদ, হা/৪৭৯০; মিশকাত, হা/৫০৮৫; বঙ্গানুবাদ মিশকাত, হা/৪৮৬৩ 'কোমলতা, লাজুকতা ও সচ্চরিত্রতা' অনুচ্ছেদ, সনদ হাসান।
৩৬. তিরমিযী; মিশকাত, হা/৫০৮৬; বঙ্গানুবাদ মিশকাত, হা/৪৮৬৪, ছহীহাহ হা/৯৩৬।
৩৭. আবুদাউদ, হা/৪৮০১; মিশকাত হা/৫০৮০; বঙ্গানুবাদ মিশকাত হা/৪৮৫৮।
৩৮. মুসলিম, মিশকাত হা/৪৮৯৮, ‘শিষ্টাচার’ অধ্যায়; রিয়াযুছ ছালেহীন, হা/৬০২।
৩৯. মুসলিম, হা/২৫৮৮; রিয়াযুছ ছালেহীন, হা/৬০৩।
৪০. মুসলিম, হা/৯১; রিয়াযুছ ছালেহীন, হা/৬১২; আবুদাঊদ, হা/৪০৯১।
৪১. মুসলিম, হা/২৮৫৩; মিশকাত, হা/৫০৮৪; রিয়াযুছ ছালেহীন, হা/৬১৪।
৪২. বুখারী হা/৬৯২৭, মুসলিম, হা/২৫৯৩; রিয়াযুছ ছালেহীন, হা/৬৩৩।
৪৩. মুসলিম, হা/২৫৯৩; রিয়াযুছ ছালেহীন, হা/৬৩৪।
৪৪. মুসলিম, হা/২৫৯৪; রিয়াযুছ ছালেহীন, হা/৬৩৫।
৪৫. তিরমিযী, হা/২৪৮৮; মিশকাত, হা/৫০৮৪; রিয়াযুছ ছালেহীন, হা/৬৪২, সনদ ছহীহ।
৪৬. মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত, হা/৫০১০ 'শিষ্টাচার' অধ্যায়, 'আল্লাহ্ ওয়াস্তে ভালবাসা' অনুচ্ছেদ।
৪৭. ইবনু মাজাহ, হা/৪০৩২; তিরমিযী হা/২৫০৭।
৪৮. রিয়াযুছ ছালেহীন, পৃ. ২২৬।

📘 মধ্যমপন্থা গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা 📄 অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে মধ্যপন্থা

📄 অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে মধ্যপন্থা


অর্থনীতি জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এক্ষেত্রেও অন্যান্য সম্প্রদায়ের মধ্যে সীমাহীন বাড়াবাড়ি পরিলক্ষিত হয়। একদিকে রয়েছে পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থা। এতে হালাল-হারাম এবং অপরের সুখ-শান্তি ও দুঃখ-দুরবস্থা থেকে চোখ বন্ধ করে অধিক সম্পদ সঞ্চয় করাকেই সর্ববৃহৎ মানবিক সাফল্য গণ্য করা হয়। অপরদিকে রয়েছে সমাজতান্ত্রিক অর্থ ব্যবস্থা। এতে ব্যক্তি মালিকানাকেই অপরাধ সাব্যস্ত করা হয়। একটু চিন্তা করলেই বুঝা যাবে যে, উভয়বিধ অর্থব্যবস্থা হচ্ছে ধন-সম্পদের উপাসনা, ধন-ঐশ্বর্যকেই জীবনের একমাত্র লক্ষ্য ও মূল উদ্দেশ্য জ্ঞান করা এবং এরই জন্য যাবতীয় চেষ্টা-সাধনা নিয়োজিত করা।

ইসলামী শরী'আত এক্ষেত্রে মধ্যপন্থী ও ন্যায়নিষ্ঠ অর্থব্যবস্থা প্রবর্তন করেছে। ইসলামী শরী'আতে একদিকে ধন-সম্পদকে জীবনের লক্ষ্য জ্ঞান করতে নিষেধ করা হয়েছে এবং সম্মান, ইয্যত ও কোন পদমর্যাদা লাভকে এর উপর নির্ভরশীল করা হয়নি। অপরদিকে সম্পদ বণ্টনের নিষ্কলুষ নীতিমালা প্রণয়ন করে দিয়েছে যাতে কোন মানুষ জীবন ধারণের প্রয়োজনীয় উপায়-উপকরণ থেকে বঞ্চিত না থাকে এবং কেউ সমগ্র সম্পদ এককভাবে কুক্ষিগত করে না বসে। এছাড়া সম্মিলিত মালিকানাভুক্ত সম্পত্তি যৌথ ও সাধারণ ওয়াকফের আওতায় রেখেছে। ইসলামে ব্যক্তিমালিকানার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা হয়েছে। ইসলাম হালাল দ্রব্যের শ্রেষ্ঠত্ব বর্ণনা করেছে এবং তা রাখার ও ব্যবহার করার পদ্ধতি শিক্ষা দিয়েছে।

দান-খয়রাত বা খরচের ক্ষেত্রে মধ্যপন্থা অবলম্বন করা মুমিনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। কোন কোন মানুষ আছে যারা দান-ছাদাক্বা ও ব্যয় নির্বাহের ক্ষেত্রে অত্যন্ত মুক্তহস্ত। এমনকি কোন কোন সময় তারা ঋণ করেও খরচ করে। নিজের সামর্থ্যের প্রতি তাদের লক্ষ্য থাকে না। এসব কাজ থেকে আল্লাহ নিষেধ করেছেন। তিনি বলেন, وَلَا تَجْعَلْ يَدَكَ مَغْلُولَةً إِلَىٰ عُنُقِكَ وَلَا تَبْسُطْهَا كُلَّ ٱلْبَسْطِ. 'তুমি একেবারে ব্যয়কুণ্ঠ হয়ো না এবং একেবারে মুক্তহস্তও হয়ো না। তাহ'লে তুমি তিরষ্কৃত হয়ে বসে থাকবে' (ইসরা ১৭/২৯)। মুমিনের কাজ হবে কৃপণতা না করা এবং নিজের ও নিজ পরিবার-পরিজনের প্রয়োজন ও চাহিদার প্রতি যথাযথ খেয়াল রাখা। প্রতিবেশী, দুঃস্থ, অসহায়, অভাবগ্রস্তদের দান না করে কৃপণতাবশে সম্পদ কুক্ষিগত করা যেমন অপরাধ, তেমনি নিজের ও পরিবার-পরিজনের প্রয়োজনের প্রতি লক্ষ্য না রেখে সর্বস্ব দান করাও ঠিক নয়। বরং মুমিনের কাজ হবে এতদুভয়ের মধ্যবর্তী। এ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, وَالَّذِينَ إِذَا أَنْفَقُوْا لَمْ يُسْرِفُوْا وَلَمْ يَقْتَرُوا وَكَانَ بَيْنَ ذَلِكَ قَوَامًا ‘তারা যখন ব্যয় করে তখন অযথা ব্যয় করে না, কৃপণতাও করে না এবং তাদের পন্থা হয় এতদুভয়ের মধ্যবর্তী’ (ফুরক্বান ২৫/৬৮)।

অর্থাৎ নিষিদ্ধ অপচয়-অপব্যয় ও নিন্দিত ব্যয়কুণ্ঠতা-কৃপণতার মধ্যবর্তী মিতাচার-মিতব্যয়িতা এবং অর্থসম্পদ খরচের ক্ষেত্রে মধ্যপন্থা অবলম্বন করা। এটাই হচ্ছে অর্থসম্পদ ব্যয়ের ক্ষেত্রে কুরআনী বিধান। যে ব্যক্তি তা অবলম্বন করবে সে সৌভাগ্যবান হবে, মুক্তি পাবে। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিবে সে দুর্ভাগা হবে এবং ধ্বংসে নিপতিত হবে। অবশেষে সে আফসোস করবে। আয়াতে যে মধ্যবর্তী অবস্থা বুঝানো হয়েছে, তা নিম্নোক্ত ঘটনায় সুস্পষ্ট হয়েছে। উমাইয়া খলীফা আব্দুল মালেক তার মেয়ে ফাতিমাকে স্বীয় ভাতিজা ওমর ইবনু আব্দুল আযীযের সাথে বিবাহ দিয়েছিলেন। একদা তিনি তাদের সাথে সাক্ষাৎ করতে গিয়ে তাঁর মেয়েকে জিজ্ঞেস করেন, তোমাদের জীবনযাত্রা কেমন চলছে? তখন ফাতিমা উত্তর দেন, الحسنة بين سيئتين تعني بالحসنة الاعتدال في النفقة وبالسيئتين الإسراف والتقتير الذي هو التضييق في النفقة. 'দুই খারাপের মধ্যবর্তী উত্তম। তিনি উত্তম বলে ব্যয়ে মিতাচারকে বুঝিয়েছেন এবং দুই খারাপ দ্বারা অপচয় ও কৃপণতাকে বুঝিয়েছেন'। অন্য বর্ণনায় আছে, তিনি ওমর ইবনু আব্দুল আযীযকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমাদের ব্যয়ভার কিভাবে নির্বাহ হয়ে থাকে? তিনি উত্তরে বললেন, দুই খারাপের মধ্যবর্তী উত্তম পন্থায়। অতঃপর তিনি উপরোক্ত আয়াত তেলাওয়াত করেন। যেমন কবি আবু সুলায়মান আল-খাত্তাবী বলেন, ولا تغل في شيء من الأمر واقتصد ... كلا طرفي قصد الأمورِ دَميمُ 'কোন কাজে তুমি বাড়াবাড়ি কর না, মধ্যপন্থা অবলম্বন কর। কাজের ক্ষেত্রে মধ্যপন্থার উভয় দিক (অতিরঞ্জন ও সংকোচন) নিন্দনীয়'।

উপরোক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় মুফাসসিরগণ বিভিন্ন অভিমত ব্যক্ত করেছেন। যেমন-
১. আন-নুহাস বলেন, আল্লাহর আনুগত্যের পরিপন্থী কাজে খরচ করা হচ্ছে অপচয়, আল্লাহর আনুগত্যে ব্যয় না করা হচ্ছে কৃপণতা আর তাঁর আনুগত্যে খরচ করাই হচ্ছে মধ্যপন্থা।
২. ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন, 'যে ব্যক্তি লক্ষ দেরহাম সত্য-সঠিক কাজে ব্যয় করে সেটা অপব্যয় নয়। পক্ষান্তরে যে এক দেরহাম অন্যায় পথে ব্যয় করে সেটা হচ্ছে অপচয়। আর যে হকের পথে ব্যয় করা থেকে বিরত থাকে সে কৃপণতা করে'। মুজাহিদ ও ইবনু যায়েদও অনুরূপ বলেছেন।
৩. ইবনু আতিয়া বলেন, কম হোক বেশি হোক পাপের কাজে খরচ করা থেকে শরী'আত সতর্ক করেছে। অনুরূপভাবে অন্যের সম্পদ আত্মসাৎ করা থেকেও সাবধান করেছে। এসব দোষ-ত্রুটি অবশ্যই পরিত্যজ্য। আয়াতে ব্যয়ের ব্যাপারে যে আদব বর্ণিত হয়েছে তা হচ্ছে শরী'আত সম্মত তথা বৈধ কাজে এমন পরিমিত খরচ করা যাতে পরিবার-পরিজন ও অন্যের হক বিনষ্ট না হয়। কিংবা এমন কৃপণতা বা ব্যয় সংকোচন না করা যাতে পরিবার-পরিজন ক্ষুধার্ত থাকে। অর্থাৎ অতিরঞ্জিত ব্যয়কুণ্ঠতা অবলম্বন করা। এতদুভয়ের মধ্যবর্তী অবস্থা হচ্ছে উত্তম ও ন্যায়ানুগ ব্যবস্থা তথা মধ্যপন্থা।
৪. ইয়াযীদ ইবনু আবু হাবীব বলেন, (আয়াতে যাদের কথা বলা হয়েছে) তারা হচ্ছে ঐ সকল লোক যারা কেবল সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য পোশাক পরিধান করে না এবং কেবল স্বাদ আস্বাদনের জন্য আহার করে না।... তাঁরা হচ্ছেন নবী মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর ছাহাবীগণ। তাঁরা কেবল বিলাসিতা ও স্বাদ আস্বাদনের জন্য খাদ্য খেতেন না এবং শোভা বর্ধনের জন্য পোশাক পরতেন না। বরং তাঁরা ক্ষুধা নিবারণ ও আল্লাহর ইবাদতে শক্তি লাভের জন্য খাদ্য খেতেন। আর নিজেদের আব্রু ঢেকে রাখা ও ঠাণ্ডা-গরমের প্রকোপ থেকে বাঁচতে পোশাক পরিধান করতেন'।
৫. ওমর (রাঃ) স্বীয় পুত্র আছেমকে বলেন, 'হে বৎস! তুমি অর্ধ পেট খাও এবং কাপড় না ছেড়া পর্যন্ত তা ছুড়ে ফেলে দিও না। তুমি ঐ সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না, যারা আল্লাহ প্রদত্ত সবই তাদের পেট ও পীঠে রাখে। অর্থাৎ খায় ও পরিধান করে'।

অতএব খরচের ক্ষেত্রে মধ্যপন্থা অবলম্বন করা মুমিনের জন্য কর্তব্য। যেমন হাদীছে এসেছে, আবুছ ছালত (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, এক ব্যক্তি ওমর ইবনু আব্দুল আযীয (রহঃ)-এর কাছে তাকদীর (ভাগ্য) সম্পর্কে জানাতে চেয়ে পত্র লিখল। উত্তরে তিনি লিখলেন, 'আমি তোমাকে আল্লাহকে ভয় করার, তাঁর হুকুম পালনে মধ্যপন্থা অবলম্বন করার, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর আদর্শ ও সুন্নাতের অনুসরণ করার, তাঁর আদর্শ প্রতিষ্ঠা লাভের ও সংরক্ষিত হওয়ার পর বিদ'আতীদের আচার-অনুষ্ঠান ত্যাগ করার। সুন্নাতকে আঁকড়ে ধরা তোমার কর্তব্য। কেননা এ সুন্নাত তোমাদের জন্য আল্লাহর অনুমতিক্রমে রক্ষাকবয'।

আবার আল্লাহ মানুষকে খেতে ও পান করতে বলেছেন, কিন্তু অপচয় করতে নিষেধ করেছেন। তিনি বলেন, وَكُلُوْا وَاشْرَبُوْا وَلَا تُسْرِفُوْا إِنَّهُ لَا يُحِبُّ الْمُسْرِفِينَ ‘তোমরা খাও ও পান করো, অপচয় করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ অপচয়কারীকে ভালবাসেন না’ (আ'রাফ ৭/৩১)। তিনি আরো বলেন, وَلَا تُبَذِّرْ تَبْذِيرًا، إِنَّ الْمُبَذِّرِينَ كَانُوا إِخْوَانَ الشَّيَاطِينِ অপচয় কর না, নিশ্চয়ই অপব্যয়কারীরা শয়তানের ভাই' (বনু ইসরাঈল ১৭/২৬-২৭)। নবী করীম (ছাঃ)ও বলেন, كُلُوْا وَتَصَدَّقُوْا وَالْبَسُوْا فِي غَيْرِ إِسْرَافِ وَلَا مَخِيْلَةِ - ‘তোমরা খাও, দান কর, পরিধান কর অপব্যয় ও অহংকার ব্যতিরেকে'। কেননা রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) অপব্যয়ের মাধ্যমে সম্পদ বিনষ্ট করাকে আল্লাহর অসন্তোষের কারণ বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, 'আল্লাহ তা'আলা তোমাদের তিনটি কাজের উপর সন্তুষ্ট এবং তোমাদের তিনটি কাজের দ্বারা অসন্তুষ্ট হয়ে থাকেন। যে তিনটি কাজে সন্তুষ্ট হন তা হ'ল- ১. তোমরা তাঁর ইবাদত করবে, তাঁর সাথে অন্য কিছুকে শরীক করবে না, ২. তোমরা সম্মিলিতভাবে আল্লাহর রজ্জুকে মযবুতভাবে ধারণ করবে ও বিচ্ছিন্ন হবে না, ৩. যাকে আল্লাহ তোমাদের শাসক বানিয়েছেন তাঁর মঙ্গল কামনা করবে। তিনি তোমাদের যে তিনটি কাজ অপসন্দ করেন তা হ'ল। ১. বাদানুবাদ ২. অধিক যাচঞা করা ৩. সম্পদের অপচয় করা'।

উপরোক্ত হাদীছ দ্বারা প্রতীয়মান হয় যে, অপব্যয় করা হচ্ছে সম্পদ ধ্বংসের কারণ এবং অর্থ-সম্পদ ধ্বংসের ফলে আল্লাহর অসন্তোষে নিপতিত হ'তে হয়। তেমনি পার্থিব জীবনে বিলাসিতাও গ্রহণযোগ্য নয়, বরং সহজ-সরল জীবন যাপনই মুমিনের বৈশিষ্ট্য। এসম্পর্কে হাদীছে এসেছে, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) মু'আয ইবনু জাবাল (রাঃ)-কে বললেন, 'তুমি সম্পদের প্রাচুর্য ও বিলাসিতা থেকে বেঁচে থাক। কেননা আল্লাহর বান্দারা বিলাসীদের অন্তর্ভুক্ত হয় না'।

অতএব অপচয়-অপব্যয় ও বিলাসী জীবন পরিহার করে কেবল মধ্যপন্থী জীবন যাপন করাই মুমিনের কর্তব্য। আল্লাহ আমাদেরকে মধ্যপন্থী জীবন যাপন করার তাওফীকু দান করুন।

টিকাঃ
৪৯. কুরতুবী ২০/৩৬৫ পৃঃ।
৫০. কুরতুবী ২০/৩৬৫; ফাতহুল ক্বাদীর ৫/৩৮৫।
৫১. আবু দাউদ হা/৪৬১২, সনদ ছহীহ।
৫২. নাসাঈ হা/২৫১২; ইবনু মাজাহ হা/৩৬৯৫।
৫৩. মুসলিম হা/১৭১৫।
৫৪. আহমাদ, মিশকাত হা/৫২৬২, সিলসিলা ছহীহাহ হা/৭৯৪।
৫৫. মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত, হা/৭০১, 'ছালাত' অধ্যায়।

ফন্ট সাইজ
15px
17px