📄 প্রকাশকের আরয
ইসলাম একটি ভারসাম্যপূর্ণ জীবনব্যবস্থা। এর বৈশিষ্ট্য হচ্ছে মধ্যপন্থা, মিতাচার, সংযমশীলতা, সরলতা, সহজীকরণ ইত্যাদি। ইসলামে বাড়াবাড়ির কোন স্থান নেই। ইসলাম মুসলমানকে সকল কর্মকাণ্ডে মধ্যপন্থা অবলম্বনের নির্দেশ দিয়েছে। তেমনি আল্লাহ রাব্বুল আলামীনও মুসলিম জাতিকে মধ্যপন্থী জাতি হিসাবে অভিহিত করেছেন। মহান আল্লাহ বলেন, وَكَذَالِكَ جَعَلْنَاكُمْ أُمَّةً وَسَطًا لِّتَكُوْنُ شُهَدَاءَ عَلَى النَّاسِ ‘অনুরূপভাবে আমরা তোমাদেরকে মধ্যবর্তী জাতি করেছি, যাতে তোমরা মানুষের উপর সাক্ষী হও’ (বাক্বারাহ ২/১৪৩)।
উপরোক্ত বিষয়টি জাতির সামনে পরিষ্কারভাবে তুলে ধরার জন্য আল্লাহ্র অশেষ রহমতে ‘মধ্যপন্থা: গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা’ বইটি প্রকাশিত হ’ল। ফালিল্লাহিল হামদ। মাসিক আত-তাহরীক-এর সহকারী সম্পাদক ড. মুহাম্মাদ কাবীরুল ইসলাম বইটি সাবলীল ভাষায় প্রণয়ন করেছেন। এতে কুরআন-হাদীছের আলোকে তথ্যবহুল আলোচনা পেশ করা হয়েছে। সহজ শব্দের সংযোজন ও সরল বাক্যের ব্যবহারে বইটি সকলের জন্য সহজবোধ্য করে লিখিত হয়েছে। বইটির মাধ্যমে ইসলামের প্রকৃত স্বরূপ পাঠকের নিকট স্পষ্ট হ’লেই আমাদের শ্রম স্বার্থক হবে বলে মনে করব। আল্লাহ বিজ্ঞ লেখক ও সংশ্লিষ্ট সকলকে উত্তম জাযা দান করুন!
সচেতন পাঠক সমাজের গঠনমূলক পরামর্শ পরবর্তী সংস্করণে সাদরে গৃহীত হবে ইনশাআল্লাহ। আল্লাহ আমাদের সহায় হৌন-আমীন!
-প্রকাশক
📄 মধ্যপন্থার পরিচয়
মধ্যপন্থা অর্থ হচ্ছে দুইটি বিপরীত মত, উপায় বা ভাবের মধ্যবর্তী মত, উপায় বা ভাব, নরমপন্থা। মধ্যপন্থার ইংরেজী প্রতিশব্দ Moderateness, Moderatism. বলা হয়েছে, Having or showing opinions, especially about politics, that are not extreme. 'মতামত ব্যক্ত করা বিশেষত রাজনীতি সম্পর্কে। তবে সেটা চরমপন্থী নয়।' মধ্যপন্থার আরবী প্রতিশব্দ হচ্ছে القصد، والإقتصاد والتوسط، الوسط প্রভৃতি। القصد-এর ব্যাখ্যায় মোল্লা আলী ক্বারী (রহঃ) বলেন, الإقتصاد و التوسط بين الافراط والتفريط في العمل (أي عمل النوافل). (নফল)-এর ক্ষেত্রে হ্রাস-বৃদ্ধি বা অতিরঞ্জন ও সংকোচনের মধ্যবর্তী অবস্থা। هو سلوك الطريق المعتدلة والتوسط بين الإفراط والتفريط. وأصل القصد الاستقامة في الطريق. বাড়াবাড়ি ও শৈথিল্যের মধ্যবর্তী হওয়া। আর মধ্যপন্থার মূল হচ্ছে সোজা পথে চলা। যেমন আল্লাহ বলেন, وَعَلَى اللهِ قَصْدُ السَّبِيلِ وَمِنْهَا جَائِرٌ 'সরল পথ আল্লাহ পর্যন্ত পৌঁছে এবং পথগুলোর মধ্যে কিছু বক্র পথও রয়েছে' (নাহল ১৬/৯)। অর্থাৎ আল্লাহ্র নিকটেই রয়েছে সরল-সোজা রাস্তার বর্ণনা। অতঃপর القصد শব্দটিকে বিভিন্ন কাজে মধ্যপন্থা অবলম্বন অর্থে ব্যবহার করা হয়েছে। যেমন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, القصد القصد 'তোমরা মধ্যবর্তী রাস্তা অবলম্বন কর, তোমরা মধ্যবর্তী রাস্তা অবলম্বন কর'। অন্য বর্ণনায় এসেছে .أيها الناس عليكم القصد، عليكم القصد 'হে লোক সকল! তোমরা মধ্যপন্থা অবলম্বন কর, তোমরা মধ্যপন্থা অবলম্বন কর'। অন্যত্র বলা হয়েছে, كانت خطبته قصدًا 'রাসূলের খুৎবা ছিল মধ্যম মানের'।
আরবী ভাষায় الوسط শব্দের কয়েকটি অর্থ হ'তে পারে। যথা- প্রথমতঃ العدالة অর্থ- ন্যায়বিচার, ইনছাফ, ন্যায়পরায়ণতা ইত্যাদি। যেমন হাদীছে এসেছে, عَنْ أَبِي سَعِيدِ الْخُدْرِيِّ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ : قَالَ رَسُوْلُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: يُدْعَى نُوْحُ عَلَيْهِ السَّلَامُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ : فَيُقَالُ لَهُ هَلْ بَلَّغْتَ؟ فَيَقُولُ نَعَمْ! فَيُدْعَى قَوْمُهُ فَيُقَالُ لَهُمْ هَلْ بَلْغَكُمْ؟ فَيَقُولُونَ : مَا أَتَانَا مِنْ نَذِيرٍ أَوْ مَا أَتَانَا مِنْ أَحَدٍ قَالَ: فَيُقَالُ لِنُوْحٍ: مَنْ يَشْهَدُ لَكَ؟ فَيَقُولُ: مُحَمَّدٌ وَأُمَّتُهُ ، قَالَ فَذَلِكَ قَوْلُهُ: وَكَذَلِكَ جَعَلْنَاكُمْ أُمَّةً وَسَطًا، قَالَ الْوَسْطُ : الْعَدْلُ، قَالَ: فَيُدْعُوْنَ، فَيَشْহَدُوْنَ لَهُ بِالْبَلاغ، قَالَ: ثُمَّ أَشْهَدُ عَلَيْكُمْ আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) হ'তে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, 'ক্বিয়ামতের দিন নূহ (আঃ)-কে ডেকে বলা হবে, তুমি কি (তাওহীদের) দাওয়াত পৌ্ঁছিয়েছিলে? তিনি বলবেন, হ্যাঁ, আমি দাওয়াত দিয়েছি। তখন তাঁর সম্প্রদায়কে ডেকে জিজ্ঞেস করা হবে, নূহ কি তোমাদেরকে দাওয়াত দিয়েছে? তখন তারা বলবে, আমাদের নিকট কোন সতর্ককারী বা ভীতি প্রদর্শনকারী আসেনি। কিংবা তারা বলবে, আমাদের নিকট কেউ আসেনি। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, তখন নূহ (আঃ)-কে জিজ্ঞেস করা হবে, তোমার স্বপক্ষে কে সাক্ষী দিবে? তিনি বলবেন, মুহাম্মাদ (ছাঃ) ও তাঁর উম্মত। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, এটাই আল্লাহ্ বাণী وَكَذَالِكَ جَعَلْنَاكُمْ أُمَّةً وَسَطًا (অনুরূপভাবে আমি তোমাদেরকে মধ্যপন্থী জাতি করেছি)-এর তাৎপর্য। রাবী বলেন, الوسط অর্থ العدل ন্যায়পরায়ণতা। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, তখন উম্মতে মুহাম্মাদীটিকে ডাকা হবে এবং তারা হবে নূহ (আঃ)-এর নবুওয়াতের ও দাওয়াতের সাক্ষী। রাসূল (ছাঃ) বলেন, অতঃপর আমি তোমাদের সত্যায়ন করব'।
দ্বিতীয়তঃ الخيرية অর্থ- উত্তম, শ্রেষ্ঠ, কল্যাণকামী, হিতৈষী, উপকারী ইত্যাদি। وَكَذَالِكَ جَعَلْنَاكُمْ أُمَّةً وَسَطًا এ আয়াতের ব্যাখ্যায় আল্লামা ইবনু কাছীর (রহঃ) বলেন, 'নিশ্চয়ই আমি তোমাদেরকে ইবরাহীম (আঃ)-এর কিবলার দিকে ফিরিয়ে দিয়েছি এবং ওটাকেই তোমাদের জন্য (কিবলা) মনোনীত করেছি। যাতে আমি তোমাদেরকে সকল জাতির মধ্যে শ্রেষ্ঠ করতে পারি, যেন তোমরা কিয়ামতের দিন সকল উম্মতের উপর সাক্ষী হ'তে পার। কেননা সমস্ত উম্মত তোমাদের উচ্চ মর্যাদার কথা অকপটে স্বীকার করে। এখানে الوسط অর্থ উত্তম, শ্রেষ্ঠ ইত্যাদি। যেমন কুরাইশদেরকে বংশ ও অঞ্চলের দিক দিয়ে আরবের মধ্যে শ্রেষ্ঠ বলা হয়, তেমনি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)ও তাঁর সম্প্রদায়ের মধ্যে বংশের দিক দিয়ে শ্রেষ্ঠ ও সম্ভ্রান্ত। এখান থেকে 'ছালাতুল ওসত্বা' তথা 'উত্তম ছালাত' নামকরণ করা হয়েছে। আর এটা হলো আছরের ছালাত। যা কুতুবুস সিত্তাহ ও অন্যান্য গ্রন্থে বর্ণিত হাদীছ দ্বারা প্রমাণিত'।
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন উম্মতে মুহাম্মাদীকে যেমন মধ্যপন্থী ও শ্রেষ্ঠ জাতি হিসাবে প্রেরণ করেছেন, তেমনি তাদেরকে পরিপূর্ণ শরী'আত, অধিকতর সঠিক ও যথোপযুক্ত কর্মপন্থা এবং সুস্পষ্ট ধর্মীয় মতাদর্শ দিয়ে বিশেষিত করেছেন। আল্লাহ বলেন, هُوَ اجْتَبَاكُمْ وَمَا جَعَلَ عَلَيْكُمْ فِي الدِّيْنِ مِنْ حَرَجٍ مِلَّةَ أَبِيكُمْ إِبْرَاهِيمَ هُوَ سَمَّاكُمُ الْمُسْلِمِينَ مِنْ قَبْلُ وَفِي هَذَا لِيَكُوْنَ الرَّسُوْلُ شَهِيدًا عَلَيْكُمْ وَتَكُونُوا شُهَدَاءَ عَلَى ،النَّاسِ 'তিনি তোমাদেরকে পসন্দ করেছেন এবং ধর্মের ব্যাপারে তোমাদের উপর কোন সংকীর্ণতা রাখেননি। তোমরা তোমাদের পিতা ইবরাহীমের ধর্মে কায়েম থাক, তিনিই তোমাদের নাম মুসলমান রেখেছেন পূর্বেও এবং এই কুরআনেও। যাতে রাসূল তোমাদের জন্য সাক্ষ্যদাতা হন এবং তোমরা সাক্ষ্যদাতা হও মানব মণ্ডলীর জন্য' (হজ্জ ২২/৭৮)।
তৃতীয়তঃ التوسط অর্থ মধ্যবর্তী হওয়া, মধ্যস্থতা করা, মধ্যপন্থী হওয়া ইত্যাদি। আল্লামা ইবনু জারীর (রহঃ) বলেন, 'আমি মনে করি الوسط বলতে এখানে এমন স্থানকে বুঝানো হয়েছে যার দু'টি দিক বা পার্শ্ব রয়েছে। অর্থাৎ মধ্যবর্তী স্থান। যেমন ঘরের মধ্যস্থল। আমি আরো মনে করি আল্লাহ তাদেরকে মধ্যবর্তী জাতি বলে বিশেষিত করেছেন এজন্য যে, তারা দ্বীনের মধ্যে মধ্যপন্থী। তারা নাছারাদের মত দ্বীনের মধ্যে বাড়াবাড়ি করে না। যেমনভাবে তারা সন্ন্যাসব্রতের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করে। তেমনি তারা ঈসা (আঃ)-কে আল্লাহ্ পুত্র বলে বাড়াবাড়ি করে। আবার উম্মতে মুহাম্মাদী দ্বীনের মধ্যে সংকোচনও করে না, যেভাবে ইহুদীরা করেছিল। তারা আল্লাহ্ কিতাবকে পরিবর্তন করেছিল এবং তাদের নবীদের হত্যা করেছিল, আল্লাহ্র প্রতি মিথ্যারোপ করেছিল এবং তাঁর সাথে কুফরী করেছিল। বরং উম্মাতে মুহাম্মাদী মধ্যবর্তী ও মধ্যপন্থী জাতি। এজন্য আল্লাহ তাদেরকে এই গুণে গুণান্বিত করেছেন। কেননা আল্লাহ্র নিকট মধ্যপন্থী কর্ম পসন্দনীয়'।
প্রকৃতপক্ষে এই উম্মতের মধ্যে উক্ত তিনটি গুণেরই সমাবেশ ঘটেছে। অর্থাৎ পরকালে সাক্ষ্যদানের ক্ষেত্রে এই উম্মত হবে অন্যান্য উম্মতের চেয়ে ন্যায়পরায়ণ। তেমনি পৃথিবীতে আগত অন্যান্য সকল উম্মতের চেয়ে উম্মতে মুহাম্মাদী শ্রেষ্ঠ এবং তারা অন্যান্য উম্মতের সীমালংঘন, বাড়াবাড়ি ও শিথিলতার মধ্যবর্তী। অর্থাৎ এরা শরী'আত পালনের ক্ষেত্রে যেমন নাছারাদের মত বাড়াবাড়ি করে না, তেমনি ইহুদীদের মত শরী'আতের বিধি-বিধান যথাযথ পালন না করে শৈথিল্য প্রদর্শন করে না; বরং এ উম্মত হচ্ছে মধ্যপন্থী। শুধু তাই নয়, ভৌগলিক দিক দিয়ে বিবেচনা করলেও ইসলামের আবির্ভাব যে দেশে, সেটি পৃথিবীর মধ্যস্থলে অবস্থিত। যেখান থেকে পৃথিবীর সর্বত্র ইসলামের বিস্তৃতি ঘটেছে।
আবার মুসলিম উম্মাহ আরেকটি দিক দিয়ে মধ্যপন্থী। সেটা হচ্ছে তারা নির্ভেজালভাবে ইসলামী বিধান মানার যেমন চেষ্টা করে, তেমনি তাদের ধর্মগ্রন্থ পবিত্র কুরআনও খাঁটি, অবিমিশ্র ও নিরেট। বিশেষ করে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আত ইসলামকে খালেছভাবে আঁকড়ে ধরে থাকার এবং বিশুদ্ধ আমল করার চেষ্টা করে। তারা ইহুদী-নাছারাদের ন্যায় নিজেদের ইচ্ছামত এতে কিছু সংযোজন বা বিয়োজন করে না। বরং ইসলামের আদেশ-নিষেধকে যথাযথভাবে মেনে চলতে সচেষ্ট। এজন্য অন্যান্য জাতির মধ্যে মুসলিম জাতিকে মধ্যপন্থী জাতি বলা হয়েছে।
মুসলিম জাতি যেমন মধ্যপন্থী তেমনি তাদের আক্বীদা, আমল, আচার-আচরণ, চাল-চলন সবকিছু বাড়াবাড়ি ও শৈথিল্যের মধ্যবর্তী হওয়া আবশ্যক। অর্থাৎ এসব ক্ষেত্রে তারা মধ্যপন্থা অবলম্বন করবে। আমরা এখানে পার্থিব জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে মধ্যপন্থা অবলম্বনের গুরুত্ব আলোচনার প্রয়াস পাব ইনশাআল্লাহ।
টিকাঃ
১. শৈলেন্দ্র বিশ্বাস সংকলিত সংসদ বাঙ্গালা অভিধান (কলিকাতা: ১৯৯৮ খ্রী.), পৃ. ৫৫৬।
২. A S Hornby, Oxford Advanced Lerner's Dictionary (New York: 2002-2003), P. 855.
৩. আলী ইবনু সুলতান মুহাম্মাদ আল-ক্বারী, মিরকাতুল মাফাতীহ (ঢাকা তা.বি.), ৩/১৫৩পৃ.।
৪. বুখারী হা/৬৪৬৩, ছহীহুল জামে হা/৯৩৬০; সিলসিলা ছহীহাহ হা/২৬০২।
৫. ইবনু মাজাহ হা/৪২৪১, সনদ ছহীহ।
৬. সিলসিলা ছহীহাহ হা/৪৭৪-এর আলোচনা দ্রঃ; ওবায়দুল্লাহ মুবারকপুরী, মির'আতুল মাফাতীহ, ৪র্থ খণ্ড (বেনারস, ভারত: ১৪১৫হি./১৯৯৫ খ্রী.), পৃ. ২৩৮।
৭. বুখারী, হা/৭৩৪৯, হা/৪৪৮৭; ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বল, আল-মুসনাদ ৩/৩২ পৃ.।
৮. হাফেয ইমাদুদ্দীন ইবনু কাছীর, তাফসীরুল কুরআনিল আযীম, ১/১৯১পৃ.।
৯. ইবনু জারীর আত-তাবারী, তাফসীরে তাবারী, ২/৬পৃ.।
📄 আক্বীদার ক্ষেত্রে মধ্যপন্থা
আক্বীদার ক্ষেত্রে মুসলিম জাতি বিশেষত আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আত মধ্যপন্থা অবলম্বনকারী। জাহমিয়ারা আল্লাহ্ গুণবাচক নাম অস্বীকার করে, আবার মুশাববিহারা আল্লাহ্ ঐসব নামের সাথে সাদৃশ্য দাড় করায়। মু'তাযিলারা আল্লাহকে কর্মের স্রষ্টা স্বীকার করে না, কাদারিয়ারা আবার আল্লাহকে কর্মের স্রষ্টা বানিয়ে মানুষকে নিষ্পাপ বলে এবং মানুষের পাপের কারণে আল্লাহকেই দায়ী করতে চায়। তেমনি পরকালীন শাস্তির ক্ষেত্রে মুরজিয়া ও কাদারিয়ারা পরস্পর বিরোধী অবস্থানে অটল। একদিকে কাদারিয়ারা বান্দার কর্মের উপর নির্ভর করে তাকদীরকে অস্বীকার করে। অন্যদিকে জাবারিয়ারা তাকদীরের উপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। ফলে তাদের কাছে কর্ম গুরুত্বহীন। অনুরূপভাবে ঈমানের ব্যাপারে খারেজী ও মু'তাযিলা এবং মুরজিয়া ও জাহমিয়ারা বাড়াবাড়ি করে থাকে। রাফেযী ও খারেজীরা ছাহাবায়ে কেরামের ব্যাপারে ভ্রান্ত আক্বীদা পোষণ করে। এসবই বাড়াবাড়ি। আক্বীদার ক্ষেত্রে এসব বাড়াবাড়ি পরিহার করে মধ্যপন্থা অবলম্বন করতে হবে এবং এক্ষেত্রে পবিত্র কুরআন ও ছহীহ হাদীছে বর্ণিত আক্বীদা পোষণ করতে হবে। আক্বীদার ক্ষেত্রে এসব বাড়াবাড়ি সম্পর্কে দৃষ্টান্ত স্বরূপ কয়েকটি হাদীছ এখানে উপস্থাপন করা হলো।-
আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) সম্পদ বণ্টন করছিলেন, এমন সময় আব্দুল্লাহ ইবনু যিল খুওয়াইছিরা এসে বলল, হে আল্লাহ্র রাসূল! ন্যায়বিচার করুন। তখন তিনি বললেন, তোমার ধ্বংস হোক, আমি ইনছাফ না করলে, কে ইনছাফ করবে? তখন ওমর (রাঃ) বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমাকে অনুমতি দিন আমি তার গর্দান উড়িয়ে দিই। তিনি বললেন, তাকে ছেড়ে দাও। কেননা তার অনেক সাথী আছে, যাদের ছালাতের তুলনায় তোমাদের ছালাতকে এবং তাদের ছিয়ামের তুলনায় তোমাদের ছিয়ামকে তুচ্ছ মনে করবে। তারা দ্বীন থেকে এমনভাবে বের হয়ে যাবে যেমনভাবে তীর ধনুক থেকে বের হয়ে যায়। তার কপালের সামনের দিকে এবং তার হাটুর দিকে তাকানো হলো, সেখানে কোন চিহ্ন পাওয়া গেল না। জ্ঞান ও রক্ত অগ্রগামী হয়ে গেছে। তাদের নিদর্শন হচ্ছে তাদের দুই হাতের এক হাত অথবা দুই স্তনের একটি মেয়েদের স্তনের মত। অথবা তিনি বলেছেন, বোঝার মত দোদুল্যমান। মানুষের বিচ্ছিন্ন হওয়ার সময় আলী (রাঃ) তাদের বের করে দিয়েছিলেন। আবু সাঈদ (রাঃ) বলেন, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আমি এটা রাসূলকে বলতে শুনেছি এবং আমি আরো সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আলী তাদের হত্যা করার সময় আমি তার সাথে ছিলাম। তাদের একজনকে আনা হলো রাসূল যে বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করেছেন তা দেখে। তাদের সম্পর্কেই এই আয়াত নাযিল হয়েছে وَمِنْهُمْ مَّنْ يَلْمِزُكَ فِي الصَّদَقَاتِ 'তাদের মধ্যে এমন লোকও রয়েছে যারা ছাদাক্বা বণ্টনে আপনাকে দোষারোপ করে' (তওবা ৯/৫৮)।
ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন, যখন খারেজীরা মুসলমানদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে আলাদাভাবে বসবাস করতে লাগল, তখন আমি আলী (রাঃ)-কে বললাম, হে আমীরুল মুমিনীন! ছালাত একটু দেরী করে পড়ুন, আমি ঐ সম্প্রদায়ের নিকট গিয়ে তাদের সাথে কথা বলব। তিনি বললেন, আমি তোমার ব্যাপারে তাদের প্রতি আশংকা করছি (যেন তারা তোমার উপর আক্রমণ না করে)। আমি বললাম, ইনশাআল্লাহ এটা কখনো হবে না। অতঃপর আমি সাধ্যমত উত্তম ইয়েমেনী পোশাক পরিধান করে তাদের নিকটে গেলাম। তারা দুপুরের প্রখর রোদ্রের সময় বিশ্রাম করছিল। আমি এমন এক সম্প্রদায়ের নিকটে গেলাম, যাদের থেকে অধিক ইজতেহাদকারী সম্প্রদায় আমি দেখিনি। তাদের হাত উটের কুঁজের মত শক্ত। তাদের মুখমণ্ডলে সিজদার চিহ্ন লেগে আছে। আমি তাদের নিকটে গেলাম। তারা বলল, হে ইবনু আব্বাস! তোমাকে স্বাগত জানাচ্ছি। তাদের মধ্যে কেউ কেউ বলল, তোমরা তাঁর সাথে আলোচনা কর না। কেউ কেউ বলল, আমরা অবশ্যই তাঁর সাথে আলোচনা করব। ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন, আমি তাদেরকে বললাম, আমার নিকট এই সংবাদ পৌঁছেছে যে, তোমরা রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর চাচাত ভাই ও তাঁর জামাতার সাথে বিদ্বেষ ও শত্রুতা পোষণ করছ, যিনি রাসূলের ছাহাবায়ে কেরামের মধ্যে সর্বপ্রথম তাঁর প্রতি ঈমান এনেছেন। তারা বলল, তাঁর প্রতি আমাদের শত্রুতার কারণ তিনটি। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, সেগুলি কি? তারা বলল, প্রথমতঃ তিনি আল্লাহ্ দ্বীনের ব্যাপারে মানুষকে শালিস নিযুক্ত করেছেন, অথচ আল্লাহ বলেন, إِنِ الْحُكْمُ إِلَّا لِلَّهِ 'আল্লাহ ব্যতীত কারো হুকুম চলে না' (আন'আম ৬/৫৭)। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, এরপর কি? তারা বলল, তিনি যুদ্ধ করেছেন, কিন্তু তাদের (পরাজিতদের) বন্দী করেননি, তাদের সম্পদ গণীমত হিসাবে গ্রহণ করেননি। যদি তারা কাফের হয়, তাহলে তাদের ধন-সম্পদ হস্তগত করা বৈধ হবে। আর যদি তারা মুমিন হয় তাহলে তাদের রক্ত প্রবাহিত করা তাঁর উপর হারাম। তিনি বলেন, এরপর কি? তারা বলল, তিনি (আলী) 'আমীরুল মুমিনীন' বা খলীফার পদ থেকে স্বীয় নাম মুছে দিয়েছেন বা নিজেই দূরে সরে গেছেন।
ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন, আমি যদি তোমাদের নিকট আল্লাহ্র কিতাব (থেকে দলীল) পাঠ করে শুনাই এবং রাসূলের হাদীছ তোমাদের নিকট বর্ণনা করি, যা তোমরা অস্বীকার করতে পারবে না, তাহলে কি তোমরা (তোমাদের দাবী থেকে) ফিরে আসবে? তারা বলল, হ্যাঁ। ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন, 'তোমাদের প্রথম অভিযোগ হচ্ছে, আল্লাহ্ দ্বীনের ব্যাপারে তিনি মানুষকে শালিস নিযুক্ত করেছেন'। কিন্তু আল্লাহও মানুষকে শালিস নিযুক্ত করেছেন। এ ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলা বলেন, يَا أَيُّهَا الَّذِيْنَ أَمَنُوا لَا تَقْتُلُوا الصَّيْدَ وَأَنْتُمْ حُرُمٌ وَمَنْ قَتَلَهُ مِنْكُمْ مُّتَعَمِّدًا فَجَزَاء مِثْلُ مَا قَتَلَ مِنَ النَّعَمِ يَحْكُمُ بِهِ ذَوَا عَدْلٍ مِّنْكُمْ 'হে মুমিনগণ! তোমরা ইহরাম অবস্থায় শিকার বধ করো না। তোমাদের মধ্যে যে জেনে শুনে শিকার বধ করবে, তার উপর বিনিময় ওয়াজিব হবে, যা সমান হবে ঐ জন্তুর, যাকে সে বধ করেছে। তোমাদের মধ্যকার দু'জন নির্ভরযোগ্য ব্যক্তি এর ফায়ছালা করবে' (মায়েদাহ ৫/৯৫)। وَإِنْ خِفْتُمْ شِقَاقَ بَيْنِهِمَا فَابْعَثُوا حَكَمًا مِّنْ أَهْلِهِ وَحَكَمًا مِّنْ أَهْلِهَا ‘যদি তাদের মধ্যে সম্পর্কচ্ছেদ হওয়ার মত পরিস্থিতির আশঙ্কা কর, তবে স্বামীর পরিবার থেকে একজন এবং স্ত্রীর পরিবার থেকে একজন শালিস নিযুক্ত করবে’ (নিসা ৪/৩৫)। আমি তোমাদেরকে আল্লাহ্র শপথ করে বলছি, মানুষের রক্ত, জীবন, তাদের পরস্পরের মধ্যে সংশোধনের ক্ষেত্রে মানুষ শালিস নিযুক্ত হওয়ার অধিক হকদার, নাকি সিকি দেরহাম মূল্যের খরগোশের ক্ষেত্রে শালিস নিযুক্ত হওয়ার বেশী হকদার? তারা বলল, হে আল্লাহ! তুমি তাদের রক্ত হিফাযত কর এবং তাদের পারস্পরিক সম্পর্ক ঠিক রাখ। ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন, আমি কি (কুরআন-হাদীছ থেকে) দলীল উপস্থাপন করতে পেরেছি? তারা বলল, হ্যাঁ।
তোমাদের অপর অভিযোগ হচ্ছে, 'আলী (রাঃ) আয়েশার সাথে যুদ্ধ করেছেন, অথচ তিনি তাঁকে আটক করেননি এবং তাঁর সম্পদকে গণীমত হিসাবে গ্রহণ করেননি'। তোমরা কি তোমাদের মাতাকে বন্দী করবেন? কিংবা অন্যের সাথে যে আচরণ বৈধ মনে কর, তাঁর সাথেও কি অনুরূপ আচরণ সমীচীন মনে করবেন? তাহলে তো তোমরা কুফরীতে নিমজ্জিত হবে। আর যদি তোমরা ধারণা করে থাক যে, আয়েশা (রাঃ) তোমাদের মাতা নন, তাহলে কুফরী করা হবে এবং তোমরা ইসলাম থেকে বহিষ্কৃত হবে। কেননা আল্লাহ বলেন, النَّبِيُّ أَوْلَى بِالْمُؤْمِنِينَ مِنْ أَنْفُسِهِمْ وَأَزْوَاجُهُمْ أُمَّهَاتُهُمْ 'নবী মুমিনদের নিকট তাদের নিজেদের অপেক্ষা অধিক ঘনিষ্ঠ এবং তাঁর স্ত্রীগণ তাদের মাতা' (আহযাব ৩৩/৫)। সুতরাং তোমরা গোমরাহীর মধ্যে পুনরায় প্রবিষ্ট হবে কি-না নিজেরাই ঠিক কর। আমি কি দলীল উপস্থাপন করতে পেরেছি? তারা বলল, হ্যাঁ।
তোমাদের আরেকটি অভিযোগ হচ্ছে, 'আলী (রাঃ) আমীরুল মুমিনীন বা খিলাফতের দায়িত্ব থেকে নিজেকে অপসারণ করেছেন'। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) হুদায়বিয়ার সন্ধির দিন কুরাইশদেরকে ডাকলেন পরস্পরের মধ্যে এক লিখিত চুক্তি সম্পাদনের জন্য। অতঃপর তিনি বললেন, লেখ যে, এ ব্যাপারে মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) ফায়ছালা দিয়েছেন। কুরাইশরা বলল, আল্লাহ্র কসম! যদি আমরা জানতাম যে, তুমি আল্লাহ্র রাসূল, তাহলে আমরা তোমাকে বায়তুল্লায় প্রবেশে বাধা দিতাম না, তোমার সাথে যুদ্ধেও লিপ্ত হ'তাম না। বরং তুমি লেখ, মুহাম্মাদ বিন আব্দুল্লাহ। তখন আল্লাহ্র রাসূল (ছাঃ) বললেন, আল্লাহ্র কসম! আমি অবশ্যই আল্লাহ্র রাসূল, যদিও তোমরা আমাকে অস্বীকার কর বা আমার প্রতি মিথ্যারোপ কর। হে আলী! তুমি লেখ মুহাম্মাদ ইবনু আব্দুল্লাহ। আর রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) আলী (রাঃ)-এর চেয়ে শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব। আমি কি দলীল উপস্থাপন করতে পারলাম? তারা বলল, হ্যাঁ। অতঃপর তাদের মধ্য থেকে ১২,০০০ লোক ফিরে আসল এবং চার হাযার অবশিষ্ট থাকল। অতঃপর তাদেরকে হত্যা করা হ'ল।
উপরোক্ত হাদীছ দু'টি প্রমাণ করে আক্বীদার ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি মানুষকে কুফরীতে নিপতিত করে। ফলে মানুষের যাবতীয় সৎ আমল বাতিল হয়ে যায়, মুসলিম মিল্লাত থেকে বহিষ্কৃত হয়, জাহান্নাম তাদের জন্য অবধারিত হয়ে যায়। সুতরাং মানুষের আক্বীদা পরিশুদ্ধ হওয়া অত্যাবশ্যক। এজন্য প্রয়োজন দ্বীন সম্পর্কে সঠিক ইলম হাছিল করা। অস্পষ্ট বিষয়ে স্বচ্ছ ধারণা লাভের জন্য হক্বপন্থী বিজ্ঞ আলেমের শরণাপন্ন হয়ে দলীল ভিত্তিক আলোচনার মাধ্যমে সংশয়-সন্দেহ দূরীভূত করতে হবে এবং অজ্ঞাত বিষয় জেনে নিতে হবে। এ মর্মে মহান আল্লাহ বলেন, فَاسْأَلُوا أَهْلَ الذِّكْرِ إِنْ كُنتُمْ لَا تَعْلَمُوْনَ بِالْبَيِّنَاتِ وَالزُّبُرِ ‘অজ্ঞাত বিষয় দলীল-প্রমাণ সহকারে জেনে নাও’ (নাহল ১৬/৪৩-৪৪)।
পূর্ববর্তী সম্প্রদায়গুলোকে দেখা যায়, একদিকে তারা নবী-রাসূলগণকে আল্লাহর পুত্র ভেবে তাদের উপাসনা শুরু করেছে। যেমন ইহুদীরা ওযায়েরকে আল্লাহর পুত্র এবং খ্রীষ্টানরা ঈসাকে আল্লাহর পুত্র বলে আখ্যায়িত করছে। আল্লাহ বলেন, وَقَالَتِ الْيَهُودُ عُزَيْرُ ابْنُ اللَّهِ وَقَالَتِ النَّصَارَى الْمَسِيحُ ابْنُ اللَّهِ ذَلِكَ قَوْلُهُمْ بِأَفْوَاهِهِمْ ‘ইহুদীরা বলে, ওযায়ের আল্লাহ্ পুত্র এবং খ্রীষ্টানরা বলে মাসীহ (ঈসা) আল্লাহ্ পুত্র। এটা তাদের মুখের কথা মাত্র’ (তওবা ৯/৩০)। অপরদিকে ঐসব সম্প্রদায়ের অনেকে নবীগণের মুজিযা বা অলৌকিকত্ব দেখেও তাদের প্রতি ঈমান আনেনি। এমনকি তাঁদের প্রতি নির্যাতন চালিয়েছে, কোন কোন ক্ষেত্রে নবীদেরকে হত্যাও করেছে। আবার কেউ কেউ ঈমান আনলেও নবীর নির্দেশ মেনে চলেনি। যেমন মূসা (আঃ) বনী ইসরাঈলকে ন্যায়যুদ্ধে আহ্বান জানালে তাঁর অনুসারীরা বলে, فَاذْهَبْ أَنْتَ وَرَبُّكَ فَقَاتِلَاَ إِنَّا هাহুনায়া قاعِدُونَ 'তুমি এবং তোমার প্রভু যাও এবং যুদ্ধ করো, আমরা এখানে বসে থাকলাম' (মায়েদাহ ২৪)। তাদের অবস্থা সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, أُولَئِكَ قَوْمٌ إِذَا مَاتَ فِيهِمُ الْعَبْدُ الصَّالِحُ أَوِ الرَّجُلُ الصَّالِحُ بَنَوْا عَلَى قَبْرِهِ مَسْجِدًا ، وَصَوَّرُوا فِيهِ تِلْكَ الصُّوَرَ ، أُولَئِكَ شِرَارُ الْخَلْقِ عِنْدَ اللَّهِ - 'তাদের অবস্থা ছিল এমন যে, কোন সৎ লোক মারা গেলে তারা তার কবরের উপরে মসজিদ বানাতো। আর তার ভিতরে ঐ লোকের মূর্তি তৈরী করে রাখতো। ক্বিয়ামতের দিন তারাই আল্লাহ্র নিকটে সর্বনিকৃষ্ট সৃষ্টজীব বলে পরিগণিত হবে'।
পক্ষান্তরে মুসলিম উম্মাহর অবস্থা অনুরূপ নয়। তারা একদিকে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর প্রতি এমন আনুগত্য ও মহব্বত পোষণ করে যে, এর জন্য জান-মাল, সন্তান-সন্ততি, ইয্যত-আব্রু সবকিছু বিসর্জন দিতেও কুণ্ঠিত হয় না। অপরদিকে রাসূলকে তারা রাসূল এবং আল্লাহকে আল্লাহ্ই মনে করে। এতসব পরাকাষ্ঠা ও শ্রেষ্ঠত্ব সত্ত্বেও রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে তারা আল্লাহ্র বান্দা ও রাসূল বলেই বিশ্বাস করে ও স্বীকার করে। তাঁর প্রশংসা ও গুণকীর্তন করতে গিয়েও তারা একটা সীমার ভেতরে থাকে, সীমালংঘন করে না। এটাই তাদের বৈশিষ্ট্য।
টিকাঃ
১০. ড. আলী ইবনু আব্দুল আযীয আশ-শিবল, ওয়াসতিয়া আহলিস সুন্নাহ ওয়াল জামা'আত ওয়া আছারুহা ফী 'ইলাজিল গুলু, আল-ফুরক্বান (কুয়েত: ২০০৯), ৪৩৭তম সংখ্যা, পৃ. ১২।
১১. বুখারী হা/৬৯৩৩, আহমাদ হা/১১৫৫৪।
১২. তাবারানী, আহমাদ, মাজমাউয যাওয়ায়েদ, ৬/২৩৯পৃ. হা/১০৪৫০; আব্দুর রাযযাক, মুছান্নাফ, ১০/১৫৮পৃ.; ইমাম শাত্বেবী, আল-ই'তেছাম, (বৈরুত : দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, ১৪১৫ হি./১৯৯৫ খ্রী.), ২/৪০৬-৪০৭ পৃ.।
📄 ইবাদতে মধ্যপন্থা
কোন কোন মানুষ অত্যধিক পরহেযগারিতা অর্জন করতে গিয়ে অধিক ইবাদত করতে প্রবৃত্ত হয়। অনেক সময় সাধ্যাতীত কাজ করার চেষ্টা করে। অথচ ইসলাম এটা সমর্থন করে না। যেমন আল্লাহ বলেন, أَتَّقُوا اللَّهِ مَا اسْتَطেকْتُمْ 'তোমরা সাধ্যমত আল্লাহকে ভয় কর' (তাগাবুন ৬৪/১৬)। সুতরাং সাধ্যের বাইরে কোন কাজ করার চেষ্টা করাও অনুচিত। কেননা আল্লাহ মানুষের উপর তার সাধ্যের বাইরে কোন বিধান চাপিয়ে দেন না। তিনি বলেন, لَا يُكَلِّفُ اللَّهُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا 'আল্লাহ কাউকে তার সাধ্যাতীত কোন কাজের ভার দেন না' (বাক্বারাহ ২/২৮৬)। অতএব অতিরঞ্জিত কোন কিছু না করে কুরআন-হাদীছে যতটুকু করার নির্দেশ রয়েছে ততটুকুই করতে হবে। তার অতিরিক্ত করাই বাড়াবাড়ি, যাকে বিদ'আত বলেও অভিহিত করা যায়। বাড়াবাড়ি পরিহার করে সাধ্যমত আমল করার প্রতি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর নির্দেশ হ'ল, عَلَيْكُمْ بِمَا تُطِيقُوْনَ، فَوَاللَّهِ لَا يَمِلُّ اللَّهُ حَتَّى تَمِلُّوْا وَكَانَ أَحَبُّ الدِّيْنِ إِلَى اللَّهِ مَا دَاوَمَ عَلَيْهِ صَاحِبُهُ 'আমল করতে থাক, যা করা তোমার পক্ষে সম্ভব। কারণ যতক্ষণ না তোমরা ক্লান্ত হবে ততক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহর প্রতিদানও বন্ধ হবে না। আল্লাহ্র কাছে সর্বাধিক প্রিয় আমল হ'ল যা আমলকারী স্থায়ীভাবে'। অন্য বর্ণনায় এসেছে, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, أَحَبُّ الْأَعْمَالِ إِلَى الله أَدْوَمُهَا وَإِنْ قَلَّ 'আল্লাহর নিকট প্রিয়তর আমল হচ্ছে যা অবিরতভাবে করা হয়ে থাকে, যদিও তা কম হয়'।
আর আমল ততক্ষণ পর্যন্ত করতে হবে যতক্ষণ তা স্বাচ্ছন্দ্যে করা যায়। যেমন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, خُذُوا مِنَ الْأَعْمَالِ مَا تُطِيْقُوْনَ فَإِنَّ اللَّهَ لَا يَمَلُّ حَتَّى تَمَلُّوا 'তোমরা কাজ সে পরিমাণ গ্রহণ করবে, যে পরিমাণ তোমরা (সর্বদা) করতে সমর্থ হও। কেননা আল্লাহ কখনও ছওয়াব দানে বিরক্তি বোধ করেন না, যাবৎ না তোমরা বিরক্ত হও'। অন্যত্র রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, لِيُصَلِّ أَحَدُكُمْ نَشَاطَهُ وَإِذَا فَتَرَ فَلْيَقْعُدْ 'তোমাদের কেউ যেন আপন মনের প্রফুল্লতা পর্যন্ত ছালাত পড়ে। যখন শ্রান্তি বোধ করবে, তখন যেন বসে যায়'।
রাতের নফল ছালাত আদায়ের ক্ষেত্রেও যতক্ষণ তন্দ্রাচ্ছন্ন না হয়, ততক্ষণ ছালাত আদায় করতে হবে। তন্দ্রা বা ঘুম এসে গেলে ঘুমিয়ে নিতে হবে। এ মর্মে হাদীছে এসেছে, عَنْ عَائِشَةَ قَالَتْ: قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: إِذَا نَعَسَ أَحَدُكُمْ وَهُوَ يُصَلِّي فَلْيَرْقُدْ حَتَّى يَذْهَبَ عَنْهُ النَّوْمُ فَإِنَّ أَحَدُكُمْ إِذَا صَلَّى وَهُوَ نَاعِسٌ لَا يَدْرِي لَعَلَّه يَسْتَغْفِرُ فَيَسُبُّ نَفْسَهُ আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, 'যখন তোমাদের কেউ ছালাত পড়ার সময় তন্দ্রাভিভূত হয়, তখন সে যেন শুয়ে পড়ে, যতক্ষণ না তার নিদ্রা দূর হয়। কেননা তোমাদের কেউ যখন তন্দ্রাবস্থায় ছালাত পড়ে, তখন সে বলতে পারে না যে, সে কি বলছে? হয়তো সে আল্লাহর নিকট ক্ষমা চাইতে গিয়ে নিজেকে গালি দিয়ে বসে'।
মানুষের শারীরিক শক্তি-সামর্থ্য অনুযায়ী ইবাদত করতে হবে। যেমন ছালাতের ক্ষেত্রে দাঁড়িয়ে না পারলে বসে আদায় করবে, বসে সক্ষম না হলে শুয়ে আদায় করবে। কিন্তু এক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি গ্রহণযোগ্য নয়। যেমন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَائِمًا فَإِنْ لَمْ تَسْتَطِعْ فَقَاعِدًا فَإِنْ لَمْ تَسْتَطِعْ فَعَلَى جَنْبِ - 'দাঁড়িয়ে ছালাত আদায় করবে। যদি তাতে অসমর্থ হও বসে পড়বে। যদি তাতেও অসমর্থ হও তবে পার্শ্বের উপর শুয়ে ছালাত পড়বে'।
সর্বোপরি ইবাদত তথা ছালাতকে প্রশান্তি লাভের উপায় হিসাবে গ্রহণ করাই শ্রেয়। এখানে বাড়াবাড়ি করা সমীচীন নয়। যেমন হাদীছে এসেছে, عَن سالم بن أبي الْجَعْدِ قَالَ : قَالَ رَجُلٌ مِنْ خُزَاعَةَ : لَيْتَنِي صَلَّيْتُ فَاسْتَرَحْتُ فَكَأَنَّهُمْ عَابُوا ذَلِكَ عَلَيْهِ فَقَالَ : سَمِعْتُ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: أَقِمِ الصَّلَاةَ يَا بِلَالُ أَرِحْنَا بِهَا - সালেম ইবনু আবিল জা'দ (রহঃ) হ'তে বর্ণিত, একদা খুযা'আহ গোত্রের এক ব্যক্তি বলল, যদি আমি ছালাত আদায় করতে পারতাম, শান্তি লাভ করতাম! সালেম বলেন, শ্রোতাগণ যেন তার উক্তিকে দূষণীয় মনে করল। (এটা দেখে) সে বলল, আমি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেছেন, হে বেলাল! ছালাতের আযান দাও এবং এর দ্বারা আমাকে শান্তি দান কর'।
আর ইবাদতে বাড়াবাড়ি করা নাছারাদের বৈশিষ্ট্য। এমনকি তারা ইবাদতে বাড়াবাড়ি করতে করতে বৈরাগ্যবাদ বা সন্ন্যাসবাদের উদ্ভব ঘটায়। বনে-জঙ্গলে, পর্বতের গুহায় জীবন-যাপন করা চালু করে। এসব মানবিক প্রবৃত্তি বিরুদ্ধ। এসব মানুষের জন্য দুঃসাধ্যও বটে। তাই ইসলামে এসব নিষিদ্ধ। কারণ মানুষ সাধ্যাতীত আমল করতে গিয়ে এক সময় সে আমলহীন হয়ে পড়ে। এজন্য ইসলাম মধ্যপন্থা অবলম্বনের নির্দেশ দিয়েছে। সাথে সাথে আল্লাহ মানুষের প্রতি কঠিন কোন বিধান আরোপ করেননি। বরং সহজ বিধান আরোপ করেছেন। আল্লাহ বলেন, يُرِيدُ اللَّهُ بِكُمُ الْيُسْرَ وَلَا يُرِيدُ بِكُمُ الْعُسْرَ 'আল্লাহ তোমাদের প্রতি সহজ করতে চান, কঠোরতা আরোপ করতে চান না' (বাক্বারাহ ২/১৮৫)।
ইবাদতে মধ্যপন্থা অবলম্বনের ক্ষেত্রে নিম্নোক্ত হাদীছটি বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য। عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ قَالَ جَاءَ ثَلَاثَةُ رَهْطٍ إِلَي بُيُوتِ أَزْوَاجِ النَّبِيِّ يَسْأَلُوْنَ عَنْ عِبَادَةِ النَّبِيِّ. فَلَمَّا أُخْبِرُوا كَأَنَّهُمْ تَقَالُوْهَا . فَقَالُوْا وَأَيْنَ নَحْنُ مِنَ النَّبِيِّ قَدْ غَفَرَ اللَّهُ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ وَمَا تَأَخَّرَ . قَالَ أَحَدُهُمْ أَمَا أَنَا فَإِنِّي أُصَلِّي اللَّيْلَ أَبَدًا. وَقَالَ آخَرُ أَنَا أَصُوْمُ الدَّهْرَ وَلَا أُفْطِرُ. وَقَالَ آخَرُ أَنَا أَعْتَزِلُ النِّسَاءَ فَلَا أَتَزَوَّجُ أَبَدًا. فَجَاءَ رَسُوْلُ اللَّهِ فَقَالَ أَنْتُمُ الَّذِينَ قُلْتُمْ كَذَا وَكَذَا؟ أَمَا وَاللَّهِ إِنِّي لَأَخْشَاكُمْ لِلَّهِ وَأَتْقَاكُمْ لَهُ وَلَكِنِّي أَصُوْمُ وَأُفْطِرُ وَأُصَلِّي وَأَرْقُدُ، وَأَتَزَوَّجُ النِّسَاءَ، فَمَنْ رَغِبَ عَنْ سُنَّتِي فَلَيْسَ مِنِّي. আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) বর্ণনা করেন, তিন ব্যক্তি রাসূলের স্ত্রীগণের নিকটে এসে তাঁর ইবাদত সম্পর্কে জানতে চাইল। তাদেরকে যখন ঐ সম্পর্কে বলা হলো, তারা যেন তা কম মনে করল। তখন তারা বলল, রাসূলের আমলের তুলনায় আমরা কোথায় পড়ে আছি? অথচ আল্লাহ তাঁর পূর্বাপর সকল গোনাহ ক্ষমা করে দিয়েছেন। তখন তাদের একজন বলল, আমি সর্বদা সারারাত ছালাত আদায় করব। আরেকজন বলল, আমি সারা বছর ছিয়াম পালন করব, কোন দিন ছাড়ব না। অন্যজন বলল, আমি নারীসঙ্গ ত্যাগ করব, কোন দিন বিবাহ করব না। ইতিমধ্যে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এসে বললেন, তোমরা এরূপ এরূপ বলেছ? আল্লাহ্র কসম! আমি তোমাদের চেয়ে আল্লাহকে অধিক ভয় করি। তথাপি আমি ছিয়াম পালন করি, ছেড়েও দেই, আমি ছালাত আদায় করি এবং ঘুমাই। আমি বিবাহও করেছি। সুতরাং যে আমার সুন্নাতকে পরিত্যাগ করবে সে আমার দলভুক্ত নয়'।
আবদুল্লাহ ইবনু আমর ইবাদত-বন্দেগীতে এমন মশগুল থাকতেন যে, তার স্ত্রীর প্রতি কর্তব্যও উপেক্ষিত হচ্ছিল। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) একথা জানতে পেরে বললেন, أَلَمْ أُخْبِرُ أَنَّكَ تَصُوْمُ النَّهَارَ وَتَقُوْمُ اللَّيْلَ فَقُلْتُ بَلَى يَا رَسُولَ اللَّهِ قَالَ فَلَا تَفْعَلْ، صُمْ وَافْطِرْ وَنِمْ وَقُمْ، فَإِنَّ لِجِسْمِكَ عَلَيْكَ حَقًّا وَإِنَّ لِعَيْنِكَ عَلَيْكَ حَقًّا وَإِنَّ لِزَوْجِكَ عَلَيْكَ حَقًّا وَإِنَّ لِزَوْرِكَ عَلَيْكَ حَقًّا. 'হে আবদুল্লাহ! আমি কি শুনিনি যে, তুমি সারাদিন ছিয়াম পালন কর এবং সারা রাত ছালাত আদায় কর? আব্দুল্লাহ বললেন, হ্যাঁ, হে আল্লাহ্র রাসূল! মহানবী (ছাঃ) বললেন, এরূপ কর না। তুমি ছিয়াম রাখবে আবার বিরতিও দিবে। ছালাত আদায় করবে আবার ঘুমাবেও। কেননা তোমার উপর তোমার শরীরের হক আছে, তোমার উপর তোমার চোখের হক রয়েছে, তেমনি তোমার উপর তোমার স্ত্রীর দাবী আছে এবং তোমার উপর অতিথিরও হক আছে'।
এ মর্মে প্রখ্যাত ছাহাবী সালমান ফারসী ও তাঁর একান্ত বন্ধু আবুদ দারদার মধ্যকার ঘটনাটিও প্রণিধানযোগ্য। আবু জুহাইফাহ ওয়াহাব ইবনু আবদুল্লাহ (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) সালমান ফারসী ও আবুদ দারদার মধ্যে ভ্রাতৃত্ব বন্ধন কায়েম করে দিয়েছিলেন। একদা সালমান (রাঃ) আবু দারদার বাড়িতে বেড়াতে গেলেন। দেখলেন আবুদ দারদার স্ত্রী উম্মু দারদা জীর্ণবসন পরিহিতা। তিনি এর কারণ জিজ্ঞেস করলে উম্মু দারদা বললেন, আপনার ভাই আবুদ দারদার দুনিয়াবী কোন কিছুর প্রয়োজন নেই। ইতিমধ্যে আবুদ দারদা এসে সালমান (রাঃ)-এর জন্য কিছু খাবার তৈরী করে নিয়ে আসলেন। সালমান (রাঃ) তার সাথে আবুদ দারদাকে খেতে বললেন। তিনি বললেন, আমি ছিয়াম রেখেছি। তখন সালমান (রাঃ) বললেন, 'তুমি না খেলে আমিও খাব না'। সুতরাং আবুদ দারদাও সালমানের সাথে খেলেন। রাতে আবুদ দারদা ছালাতের জন্য উঠলে সালমান (রাঃ) তাকে ঘুমাতে যেতে বললেন। তিনি ঘুমাতে গেলেন। রাতের শেষ প্রান্তে সালমান (রাঃ) আবুদ দারদাকে বললেন, এখন ওঠো। তখন দু'জনে ছালাত আদায় করলেন। পরে সালমান (রাঃ) আবুদ দারদাকে বললেন, তোমার উপর তোমার প্রভুর হক আছে, তোমার উপর তোমার আত্মার হক আছে, তোমার উপর পরিবারেরও হক আছে। সুতরাং প্রত্যেককে তার ন্যায্য অধিকার দাও। অতঃপর নবী করীম (ছাঃ)-এর নিকটে এসে বিষয়টি উল্লেখ করলেন। তখন তিনি বললেন, সালমান সত্য বলেছে।
অপর একটি হাদীছে এসেছে, আনাস (রাঃ) হ'তে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী করীম (ছাঃ) একদা মসজিদে প্রবেশ করে দু'টি খুঁটির সাথে একটি রশি বাঁধা দেখতে পেলেন। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, এ রশি কিসের? ছাহাবায়ে কেরাম বললেন, এটা যয়নাবের রশি, যখন ঘুমে তার চোখ আচ্ছন্ন হয়ে আসে কিংবা ছালাতে অলসতা আসে, তখন তিনি নিজেকে এ দড়ি দ্বারা বেঁধে রাখেন। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তখন বললেন, ওটা খুলে ফেল। তোমাদের সাধ্যমত, সামর্থ্যানুযায়ী ছালাত আদায় করা উচিত। অতএব কারো যদি ঘুমে চোখ বুজে আসে, সে যেন ঘুমায়'। ইবাদতের ক্ষেত্রে এসব কঠোরতার বিরুদ্ধে রাসূলের ঘোষণা- لَا تُشدِّدُوا عَلَى أَنْفُسِكُمْ، فَإِنَّمَا هَلَكَ مَنْ كَانَ قِبَلَكُمْ بِتَشْدِيدِهِمْ عَلَى أَنْفُسِهِمْ، وَسَتَجِدُونَ بَقَايَاهُمْ فِي الصَّوَامِعِ وَالدِّيَارَاتِ ‘তোমরা নিজেদের নফসের উপরে কঠোরতা আরোপ করো না। পূর্ববর্তী উম্মত নিজেদের উপর কঠোরতা আরোপ করায় ধ্বংসে নিপতিত হয়েছে। নিশ্চয়ই তোমরা তাদের নিদর্শনাসমূহ মন্দির-উপাসনালয় সমূহে দেখতে পাবে’।
পূর্ববর্তী সম্প্রদায় সমূহ আমল ও ইবাদতের ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি করেছে। একদিকে তারা শরী'আতের বিধি-বিধানকে স্বল্পমূল্যে বিক্রি করে দিয়েছে, ঘুষ-উৎকোচ নিয়ে আসমানী গ্রন্থকে পরিবর্তন করেছে কিংবা মিথ্যা ফৎওয়া দিয়েছে, বাহানা ও অপকৌশলের মাধ্যমে ধর্মীয় বিধান পরিবর্তন করেছে এবং ইবাদত থেকে গাঁ বাঁচিয়ে চলেছে। অন্যদিকে তাদের উপাসনালয়গুলোতে এমন লোকের উপস্থিতিও লক্ষ্য করা যায়, যারা সংসারধর্ম ত্যাগ করে বৈরাগ্য অবলম্বন করেছে। এমনকি তারা আল্লাহ প্রদত্ত হালাল নে'আমত ভোগ করা থেকেও নিজেদেরকে বিরত রাখে এবং কষ্ট সহ্য করাকেই ছাওয়াব বা পুণ্যকর্ম ও ইবাদত মনে করে।
কিন্তু উম্মতে মুহাম্মাদী একদিকে বৈরাগ্যকে মানবতার প্রতি যুলুম বলে মনে করে। অপরদিকে আল্লাহ ও রাসূলের বিধি-বিধান তথা ইসলামের জন্য প্রয়োজনে জীবন বিসর্জন দিতেও কুণ্ঠিত হয় না। তারা রোম ও পারস্য সাম্রাজ্যের সিংহাসনের অধিপতি হয়েও বিশ্বকে দেখিয়ে দিয়েছে যে, ধর্ম ও রাজনীতির মধ্যে কোন বিরোধ নেই এবং ধর্ম কেবল মসজিদের চার দেয়ালের অভ্যন্তরে আবদ্ধ থাকার জন্য আসেনি। বরং হাট-বাজার, মাঠ-ঘাট, অফিস-আদালত ও সচিবালয় সহ সর্বত্র এর প্রভাব ও নির্দেশনা পরিব্যাপ্ত। তাই মুসলিম খলীফাগণ বাদশাহীর মাঝে ফকীরী এবং ফকীরীর মাঝে বাদশাহী করার দৃষ্টান্ত স্থাপন করে জাতিকে শিক্ষা দিয়ে গেছেন।
টিকাঃ
১৩. বুখারী, 'ছালাত' অধ্যায় হা/৪২৬; মুসলিম, 'মসজিদ সমূহ' অধ্যায়, হা/৫২৮।
১৪. বুখারী হা/৪৩, মুসলিম হা/৭৮৫, আবুদাউদ, নাসাঈ, হা/৫০৩৫; ইবনু মাজাহ, হা/৪২৩৮।
১৫. মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/১২৪২।
১৬. মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/১২৪৩।
১৭. মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/১২৪৪।
১৮. মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/১২৪৫
১৯. বুখারী, মিশকাত হা/১২৪৮।
২০. আবু দাউদ, মিশকাত হা/১২৫৩।
২১. বুখারী, মুসলিম; মিশকাত, হা/১৪৫, 'ঈমান' অধ্যায়।
২২. বুখারী হা/১৯৭৫, ইমাম আবু যাকারিয়া ইয়াহইয়া ইবনু শারফ আন-নববী, রিয়াযুছ ছালেহীন, হা/১৫০, 'ইবাদতে মধ্যপন্থা অবলম্বন' অনুচ্ছেদ।
২৩. বুখারী হা/১৯৬৮, রিয়াযুছ ছালেহীন, হা/১৪৯, 'ইবাদতে মধ্যপন্থা অবলম্বন' অনুচ্ছেদ।
২৪. মুত্তাফাক্ব আলাইহ, আবুদাউদ, হা/১৩১২, 'ছালাতে তন্দ্রা' অনুচ্ছেদ।
২৫. বায়হাক্বী, শু'আবুল ঈমান, সিলসিলা ছহীহাহ হা/৩১২৪।