📘 মৃত্যুর পরে অনন্ত জীবন > 📄 জান্নাতের পরিমীমা ও জীবন যাপন

📄 জান্নাতের পরিমীমা ও জীবন যাপন


আরবী ভাষায় জান্নাত বলা হয় বাগানকে। এর বহুবচন আসে جَنّات এবং جِنان (বাগানসমূহ)। এ জান্নাতের পরিসীমা কতটুকু? তার যথাযথ পরিসীমা সুনির্দিষ্ট করে বলা শুধু কষ্টকরই নয় বরং অসম্ভবও বটে। কুরআন মাজীদে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন:
فَلَا تَعْلَمُ نَفْسٌ مَّا أُخْفِي لَهُم مِنْ قُرَّةٍ أَعْيُنٍ جَزَاءً بِمَا كَانُوا يَعْمَلُونَ
অর্থ: "কেউই জানে না তার জন্য নয়ন প্রীতিকর কি লুকায়িত রাখা হয়েছে, তাদের কৃতকর্মের পুরস্কার স্বরূপ।" (সূরা সাজদা: ১৭)
কুরআন ও হাদীস চর্চা করার পর যাকিছু বুঝা যায় তার সারমর্ম হলো এই যে, জান্নাত আল্লাহ প্রদত্ত এমন এক রাজ্য হবে যা আমাদের এ পৃথিবীর তুলনায় কোনো অতিরঞ্জন ব্যতীতই বলা যেতে পারে যে, আমাদের এ পৃথিবীর তুলনায় বহুগুণ বেশি প্রশস্ত হবে। জান্নাতের বিশাল আয়তনের কোনো ছোট একটি অংশই আমাদের পৃথিবীর সমান হবে। জান্নাতে সর্বশেষ প্রবেশকারী সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন যে, যখন আল্লাহর পক্ষ থেকে তাকে জান্নাতে প্রবেশের অনুমতি দেয়া হবে, তখন সে আরয করবে হে আল্লাহ! এখন তো সব জায়গা পরিপূর্ণ হয়ে গেছে, আমার জন্য আর কি বাকী আছে? আল্লাহ বলবেন: যদি তোমাকে পৃথিবীর কোনো সর্ববৃহৎ বাদশার রাজত্বের সমান স্থান দেয়া হয় তাতে কি তুমি খুশী হবে? তখন বান্দা বলবে হ্যাঁ হে আল্লাহ! কেন হব না? আল্লাহ তখন বলবেন যাও জান্নাতে তোমার জন্য পৃথিবীর সর্ববৃহৎ রাজ্যের সমান এবং এর চেয়ে অধিক আরো দশগুণ স্থান দেয়া হলো। (মুসলিম)
জান্নাতে সর্বশেষ প্রবেশকারীকে এতটুকু স্থান দেয়ার পরও জান্নাতে এতস্থান বাকী থেকে যাবে যে, তা পরিপূর্ণ করার জন্য আল্লাহ অন্য এক মাখলুক সৃষ্টি করবেন। (মুসলিম)
জান্নাতের স্তরসমূহের কথা বর্ণনা করতে গিয়ে রাসূলূল্লাহ ﷺ বলেন: তার শত স্তর আছে। আর প্রত্যেক স্তরের মাঝে আকাশ ও পৃথিবী সম দূরত্ব রয়েছে। (তিরমিযী)
জান্নাতের ছায়াবান বৃক্ষসমূহের কথা বর্ণনা করতে গিয়ে রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন: যে, একটি বৃক্ষের ছায়া এত লম্বা হবে যে, কোনো অশ্বারোহী শত বছর পর্যন্ত তার ছায়ায় চলার পরও সে ছায়া শেষ হবে না। (বুখারী)
সূরা দাহারের ২০নং আয়াতে আল্লাহ্ ইরশাদ করেন: জান্নাতের যেদিকেই তোমরা তাকাও না কেন নিআমত আর নিআমতই তোমাদের চোখে পড়বে। আর এক বিশাল রাজ্যের আসবাবপত্র তোমাদের চোখে পড়বে। দুনিয়াতে কোনো ব্যক্তি যত ফকীরই হোকনা কেন যখন সে তার সৎ আমল নিয়ে জান্নাতে প্রবেশ করবে, তখন সে সেখানে এমন অবস্থায় থাকবে, যেন সে বৃহৎ কোনো রাজ্যের বাদশাহ্। (তাফহীমুল কুরআন খ. ৬, পৃ. ২০০)
উল্লিখিত আয়াত ও হাদীসের আলোকে এ অনুমান করা কষ্টকর নয় যে, জান্নাতের সীমারেখা নির্ধারণ করা তো দূরের কথা এমনকি ঐ সম্পর্কে চিন্তা করাও মানুষের জন্য সম্ভব নয়।
জান্নাতে মানুষ কি ধরণের জীবন যাপন করবে? জান্নাতীদের ব্যক্তিগত গুণাগুণ কি হবে? তাদের পারিবারিক জীবন কেমন হবে? তাদের খানা-পিনা, থাকা কেমন হবে, যদিও এ ব্যাপারেও সুনির্দিষ্ট করে বলা সম্ভব নয়, এরপরও কুরআন ও হাদীস থেকে যা স্পষ্টভাবে প্রমাণিত তার আলোকে জান্নাতী জিন্দেগীর কোনো কোনো অংশের বিস্তারিত বর্ণনা নিম্নরূপ:
১. শারিরীকি গুণাগুণ: জান্নাতীদের চেহারা আলোকময় হবে। চক্ষুদ্বয় লাজুক হবে। মাথার চুল ব্যতীত শরীরের আর কোথাও কোনো চুল থাকবে না। এমন কি দাড়ী-গোফও থাকবে না। বয়স ৩০-৩৩ বছরের মাঝামাঝি হবে। উচ্চতা মোটামুটি ৯ ফিটের মত হবে। জান্নাতবাসী সর্বপ্রকার নাপাকী থেকে পবিত্র থাকবে, এমন কি থুথু এবং নাকের পানিও আসবে না। ঘাম হবে কিন্তু তা মেশক আম্বরের ন্যায় সুঘ্রাণ যুক্ত থাকবে। জান্নাতবাসীগণ সর্বদা আরাম আয়েশ ও হাশি খুশি থাকবে। কারো কখনো চিন্তা, ব্যাথা, বিরক্ত ও ক্লান্ত বোধ থাকবে না। জান্নাতবাসীগণ সর্বদা সুস্থ থাকবে। তারা কখনো অশুস্থ, বৃদ্ধ, মৃত্যু হবে না। জান্নাতী মহিলাদের যে গুণাবলীর কথা কুরআনের বার বার এসেছে তা হলো এই যে, জান্নাতী রমণী অত্যন্ত লজ্জাশীল হবে, দৃষ্টি নিম্নমুখী থাকবে। সৌন্দর্যে তারা মুক্তা ও প্রবালকেও হার মানাবে। নবী বলেন: জান্নাতী রমণীগণ যদি ক্ষণিকের জন্যও পৃথিবীতে দৃষ্টিপাত করে তাহলে পূর্ব পশ্চিমের মাঝে যা কিছু আছে সব কিছুকে আলোকময় করে তুলবে এবং পূর্ব পশ্চিমের মাঝে যত খালী জায়গা আছে তা সুগন্ধিময় করে তুলবে। (বুখারী)
২. পারিবারিক জীবন: জান্নাতে কোনো ব্যক্তি একাকী থাকবে না। প্রত্যেকেরই দু'জন করে স্ত্রী থাকবে, আর এ দু'স্ত্রী আদম সন্তানদের মধ্য থেকে হবে। (ইবনে কাসীর)
পৃথিবীর এ মহিলাদেরকে জান্নাতে প্রবেশ করানোর পূর্বে আল্লাহ তাদেরকে আরেকবার নতুন করে সৃষ্টি করবেন। আর তখন তাদেরকে ঐ সৌন্দর্য প্রদান করবেন যা জান্নাতে বিদ্যমান হুরদেরকে দেয়া হয়েছে। এ নারীদেরকে নতুন করে সৃষ্টি করার পর তাদেরকে কোনো জ্বিন ও ইনসান স্পর্শও করে নি। তারা তাদের স্বামীদের সম বয়সী ও লাজুক, পর্দাশীল, অত্যন্ত স্বামী ভক্ত হবে। জান্নাতীরা তাদের সুযোগ মত স্বীয় স্ত্রীগণের সথে ঘন শীতল ছায়ায় প্রবাহমান নদীর তীরে সোনা-চান্দী ও মুক্তার নির্মিত আসনসমূহে বসে আনন্দময় গল্পে মেতে উঠবে। খানা-পিনার জন্য মহিলাদের কষ্ট করতে হবে না। বরং তারা যা কিছু চাইবে মুক্তার ন্যায় সুন্দর ও বুদ্ধিমান খাদেম তা তাদের সামনে সাথে সাথে পেশ করবে। একই খান্দানের নিকট আত্মীয়গণ যেমন: পিতা-মাতা, দাদা-দাদী, নানা-নানী, ছেলে-মেয়ে, নাতী-নাতনী, ইত্যাদি যদি জান্নাতে স্তরের দিক থেকে একে অপর থেকে দূরবর্তীতে থাকে তবে আল্লাহ স্বীয় অনুগ্রহে তাদেরকে পরস্পরের নিকটবর্তী করে দিবেন। (সুবহানাল্লাহী বিহামদিহি ওয়া সুবহানাল্লাহিল আযীম)
৩. খানা-পিনা: জান্নাতে প্রবেশ করার পর জান্নাত বাসীগণকে সর্বপ্রথম মাছের কলিজা দিয়ে আপ্যায়ন করানো হবে। এরপর গরুর গোশত দিয়ে আপ্যায়ন করানো হবে। আর পানীয় হিসেবে প্রথমে দেয়া হবে, 'সাল সাবীল' নামক ঝর্ণার পানি। যা আদার স্বাদ মিশ্রিত হবে। সর্বপ্রকার সুস্বাদু ফল যেমন আঙ্গুর, আনার, খেজুর, কলা ইত্যাদির কথা বিশেষভাবে কুরআনে উল্লেখ রয়েছে, এরপরও আরো থাকবে সর্বপ্রকার সুস্বাদু ও সুগন্ধিময় পানীয় যেমন: দুধ, মধু, কাউসারের পানি, আদা বা কাফুরের স্বাদ মিশ্রিত পানি। বিশেষভাবে উল্লেখ্য হলো জান্নাতীদের সম্মানার্থে সোনা, চান্দী ও কাঁচের তৈরী পাত্রসমূহ সরবরাহ করা হবে। খানা-পিনার স্বাদ কখনো নষ্ট হবে না। বরং সর্বক্ষণই তরু-তাজা নতুন নতুন খানা-পিনা থেকে কোনো প্রকার গন্ধ, ঝাল, ঠাণ্ডা বা খারাপ নেশাদার হবে না। জান্নাতী নিজে যদি কোনো গাছের ফল খেতে চায় তাহলে স্বয়ং ঐ ফল তার হাতের নাগালে চলে আসবে। কোনো পাখীর গোশত খেতে চাইলে তখনই প্রস্তুত করে তার সামনে পেশ করা হবে। জান্নাতের এ সমস্ত নিআমত চিরস্থায়ী হবে। তাতে কখনো কোনো কমতি দেখা দিবে না। আর কখনো শেষও হবে না। না তা কোনো বিশেষ মৌসুমের সাথে সম্পৃক্ত থাকবে। আরো বড় বিষয় হলো এই যে, এ নিআমত সমূহ পাওয়ার জন্য জান্নাতীকে কারো কাছ থেকে কোনো অনুমতি নিতে হবে না। যে জান্নাতী যখন চাইবে যে পরিমাণে চাইবে স্বাধীনভাবে সে তা হাসিল করতে পারবে। আর আল্লাহর এ বাণীরও এ অর্থই:
لَّمَقْطُوعَةٍ وَلَا مَمْنُوعَةٍ
অর্থঃ “জান্নাতের নিয়ামতসমূহের ধারাবাহিকতা কখনো ছিন্ন হবে না আর না তা নিষিদ্ধ হবে।” (সূরা ওয়াকিয়াঃ ৩৩)
৪. বসবাসঃ জান্নাতে প্রত্যেক দম্পতির জন্য পৃথক ও প্রশস্ত রাজ্য থাকবে যার ঘরসমূহ নির্মিত সোনা-চাঁদীর ইট এবং উন্নতমানের সুগন্ধি দিয়ে। ঘরের পাথরসমূহ হবে মুক্তা ও ইয়াকুতের, আর তার মাটি হবে জাফরানের (তিরমিযী)। প্রত্যেক জান্নাতীকে তার স্তর অনুযায়ী দু’টি করে প্রশস্ত বাগান দান করা হবে। উভয় বাগান স্বর্ণ নির্মিত হবে, যার প্রতিটি জিনিস স্বর্ণের হবে। সমস্ত আসবাবপত্র স্বর্ণের হবে, গাছ-পালা স্বর্ণের হবে। আসনসমূহ স্বর্ণের হবে। প্লেটসমূহ স্বর্ণের হবে। এমনকি চিরুনীসমূহও স্বর্ণের হবে। সাধারণ নেককারগণকেও দু’টি প্রশস্ত বাগান প্রদান করা হবে। কিন্তু তাদের বাগান হবে চাঁদি নির্মিত। অর্থাৎ তার সব কিছু চাঁদির হবে। ঐ বাগানসমূহে সুউচ্চ বালাখানা সমূহ থাকবে। সেখানে সবুজ রেশমের কার্পেটে মূল্যবান আসনসমূহ থাকবে। প্রতিটি ঘর এত প্রশস্ত হবে যে, তার এক একটি থামার প্রশস্ত হবে ৬০ মাইল। জান্নাতের নদীসমূহের মধ্যে প্রত্যেক নদীর একটি ছোট শাখা প্রত্যেক ঘরে প্রবাহমান থাকবে। ঘরের বিভিন্ন স্থানে আঙ্গুর খানিক থাকা থাকবে যার মধ্য থেকে চন্দনের যাদুময় সুঘ্রাণ এসে সমস্ত বাড়ীর ফাঁকা জায়গা সমূহকে সুগন্ধিময় করে দিবে। এ ধরনের ঘর, ঝীমা, নদী, ঝর্ণাঝরা, সম্পন্ন পরিবেশে জান্নাতীরা জীবন যাপন করবে।
৫. পোশাকঃ জান্নাতীদেরকে বর্তমান রেশমের চেয়ে কয়েকগুণ মূল্যবান রেশম দেয়া হবে। যার ব্যবহার থেকে পৃথিবীতে তাদেরকে নিষেধ করা হয়েছিল। রেশম ব্যতীত আরো বিভিন্ন ধরনের মূল্যবান চাক-চিক্যমান পোশাক, যার মধ্যে সুন্দুস, ইস্তেবরাক, ইতলাস (বিভিন্ন প্রকার রেশমের নাম) উল্লেখ হয়েছে। এ সুযোগও থাকবে যে, জান্নাতে মহিলারা ব্যতীত পুরুষরাও সোনা-চাঁদির অলঙ্কার ব্যবহার করবে। উল্লেখ্য যে, জান্নাতে ব্যবহৃত স্বর্ণ পৃথিবীর স্বর্ণের চেয়ে বহুগুণ উন্নত হবে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: যদি একজন জান্নাতী পুরুষ তার অলঙ্কারসমূহ সহ পৃথিবীতে উকি দেয় তাহলে তার অলঙ্কারের চমক সূর্যের আলোকে এমনভাবে ঢেকে দিবে যেমন সূর্যের আলো তারকার আলোকে ঢেকে দেয়। (তিরমিযী)
সোনা-চাঁদি ব্যতীত আরো অন্যান্য প্রকার মুক্তা ও প্রবালের অলঙ্কারও জান্নাতীদেরকে পরানো হবে। জান্নাতী মহিলাদেরকে এত সুন্দর ও হালকা পোশাক পরানো হবে যে, কোনো কোনো সময় সতর আবরিত করে পোশাক পরিধান করা সত্ত্বেও তার পায়ের গোছার মজ্জা পর্যন্ত দেখা যাবে। (বুখারী)
মহিলাদের সাধারণ পোশাকও এত মূল্যবান হবে যে মাথার উড়নাও পৃথিবী এবং পৃথিবীতে যা কিছু আছে তার চেয়েও মূল্যবান হবে। (বুখারী) জান্নাতীদের পোশাক কখনো পুরান হবে না। কিন্তু তারা তাদের ইচ্ছামত যখন খুশী তখন তা পরিবর্তন করতে পারবে।
هَذَا مَا تُوعَدُونَ لِكُلِّ أَوَّابٍ حَفِيظٌ
অর্থ: "এরই প্রতিশ্রুতি তোমাদেরকে দেয়া হয়েছিল, প্রত্যেক আল্লাহভীরু ও হেফাযত কারীর জন্য।" (সূরা ক্বাফ: ৩২)
* আল্লাহর সন্তুষ্টি: জান্নাতে উল্লেখিত সমস্ত নিআমতের চেয়ে সবচেয়ে বড় নিআমত হবে, স্বীয় স্রষ্টা, মালিক, রিযিক দাতার সন্তুষ্টি। যার উল্লেখ কুরআন মাজীদের বহু জায়গায় করা হয়েছে,
لِلَّذِينَ اتَّقَوْا عِنْدَ رَبِّهِمْ جَنَّاتٌ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ خَالِدِينَ فِيهَا وَأَزْوَاجٌ مُطَهَّرَةٌ وَرِضْوَانٌ مِنَ اللَّهِ
অর্থ: "যারা আল্লাহভীরু তাদের জন্য তাদের প্রতিপালকের নিকট জান্নাত রয়েছে, যার নিম্নে স্রোতম্বিনীসমূহ প্রবাহিত, তন্মধ্যে তারা সদা অবস্থান করবে এবং সেখানে পবিত্র সহধর্মিনীগণ এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি রয়েছে।" (সূরা আলে ইমরান: ১৫) আরো এরশাদ হয়েছে:
وَعَدَ اللهُ الْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَاتِ جَنَّاتٍ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ خَالِدِينَ فِيهَا وَمَسَاكِنَ طَيِّبَةً فِي جَنَّاتِ عَدْنٍ وَرِضْوَانٌ مِّنَ اللَّهِ أَكْبَرُ
অর্থ: "আল্লাহ মু'মিন পুরুষ ও মু'মিন নারীদেরকে এমন উদ্যানসমূহের ওয়াদা দিয়েছেন যার নিম্নদেশে বইতে থাকবে নহরসমূহ। যে (উদ্যান) গুলোর মধ্যে তারা অনন্তকাল থাকবে, আরো (ওয়াদা দিয়েছেন) ঐ উত্তম বাসস্থান সমূহের যা চিরস্থায়ী উদ্যানসমূহে অবস্থিত হবে। আর আল্লাহর সন্তুষ্টি হচ্ছে সর্বাপেক্ষা বড় নিআমত। আর এটা হচ্ছে অতি বড় সফলতা।" (সূরা তাওবা: ৭২)
সূরা তাওবার আয়াতে আল্লাহ নিজেই স্পষ্ট করেছেন যে, জান্নাতের সমস্ত নিআমত সমূহের মধ্যে আল্লাহর সন্তুষ্টি সবচেয়ে বড় নিআমত। উল্লিখিত আয়াতের তাফসীরে রাসূলুল্লাহ বলেন: আল্লাহ জান্নাতীদেরকে লক্ষ্য করে বলবেন: হে জান্নাতীরা! জান্নাতীরা বলবে হে আমাদের রব। আপনার নিকট আমরা উপস্থিত আছি। আর আপনার অনুসরণের মধ্যে রয়েছে সার্বিক কল্যাণ। আল্লাহ আবার বলবেন: এখন কি তোমরা সন্তুষ্ট হয়েছেন? জান্নাতীরা বলবে হে আমাদের প্রভু! আমরা কেন সন্তুষ্ট হবনা। তুমি আমাদেরকে এমন এমন নিআমত দান করেছো যা তোমার সৃষ্টি জীবের মধ্যে কাউকে দাওনি। আল্লাহ বলবেন আমি কি তোমাদেরকে ঐ নিআমত দিব না, যা এ সমস্ত নিআমত থেকে উত্তম? জান্নাতীরা বলবে হে আমাদের প্রভু সেটা কোন্ নিআমত যা এ সমস্ত নিআমত থেকেও উত্তম? আল্লাহ বলবে: আমি তোমাদেরকে আমার সন্তুষ্টির মাধ্যমে সম্মানিত করবো। আজ থেকে আর কখনো আমি তোমাদের প্রতি অসন্তুষ্ট হবো না। (বুখারী, মুসলিম)
তাদের কতইনা সৌভাগ্য যারা আল্লাহর সন্তুষ্টি হাসিল করবে এবং তাঁর রাগ থেকে মুক্তি পাবে। আর ঐ সমস্ত লোকদের কতইনা দূর্ভাগ্য যারা আল্লাহর সন্তুষ্টি থেকে মাহরুম হবে আর তাঁর গজবের হকদার হবে।
(আল্লাহ সমস্ত মসুলমানদেরকে দুনিয়া ও আখেরাতে তাঁর অনুগ্রহের মাধ্যমে স্বীয় সন্তুষ্টির মাধ্যমে সম্মানিত করুন এবং তাঁর অসন্তুষ্টি থেকে মুক্তি দিন আমীন)। আল্লাহর সাক্ষাৎ: অন্যান্য মাসলা মাসায়েলের ন্যায় আল্লাহর সাক্ষাৎ এ বিষয়েও মুসলমানরা অতিরিক্ত ও কমতির দিক থেকে বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়েছে। একদল তো মোরাকাবা ও মোশাহাদার মাধ্যমে দুনিয়াতেই আল্লাহর সাক্ষাতের দাবী করেছে। আবার কোনো কোনো দল কুরআনের আয়াত:
لَّا تُدْرِكُهُ الْأَبْصَارُ وَهُوَ يُدْرِكُ الْأَبْصَارَ
অর্থ: "তাঁকে কোনো দৃষ্টি পরিবেষ্টন করতে পারে না আর তিনি সকল দৃষ্টি পরিবেষ্টন কারী। (সূরা আনআম: ১০৩)
অনেকে এ আয়াতের আলোকে পরকালে আল্লাহর সাক্ষাৎকে অস্বীকার করেছে। কিতাব ও সুন্নাত থেকে প্রমাণিত আকীদা এই যে, যে কোনো মানুষের জন্য, চাই সে নবীই হোক না কেন, এ পৃথিবীতে আল্লাহর সাক্ষাৎ সম্ভব নয়। কুরআন মাজীদে মূসা (আ)-এর ঘটনা অত্যন্ত পরিষ্কার করে বর্ণনা করা হয়েছে, যখন তিনি ফেরাউনের হাত থেকে মুক্তি পাওয়ার পর বনী ইসরাঈলকে সাথে নিয়ে সীনা নামক দ্বীপে পৌঁছলেন তখন আল্লাহ তাকে তুর পাহাড়ে ডাকলেন। আর সেখানে চল্লিশ দিন অবস্থান করার পর, তাকে তাওরাত দান করলেন। তখন মূসা (আ) আল্লাহর দিদারের আগ্রহ করলো, তাই তিনি আরয করলেন:
رَبِّ أَرِنِي أَنظُرْ إِلَيْكَ
অর্থ:"হে আমার প্রভু! আমাকে অনুমতি দাও যেন আমি তোমাকে দেখতে পাই।" আল্লাহ উত্তরে বললেন: হে মূসা! তুমি আমাকে কখনো দেখতে পাবে না। তবে তুমি সামনের পাহাড়ের দিকে তাকাও যদি তা স্বস্থানে স্থির থাকতে পারে, তা হলে তখন তুমিও আমাকে দেখতে পাবে। অতপর তার প্রতিপালক যখন পাহাড়ের ওপর আলোক সম্পাৎ করলেন, তখন তা পাহাড়কে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিল। আর মূসা (আ) সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়ে গেল, যখন তার চেতনা ফিরে আসল, তখন সে বলল আপনি মহিমাময়, আপনি পবিত্র সত্তা, আমি তওবা করছি। আমিই সর্বপ্রথম (গায়েবের প্রতি) ঈমান আনলাম। (বিস্তারিত দেখুন সূরা আরাফ: ১৪৩)
এ ঘটনা থেকে একথা স্পষ্ট হয় যে, দুনিয়াতে আল্লাহর দীদার সম্ভবই না। মেরাজের ঘটনা সম্পর্কে রাসূলূল্লাহ -এর ব্যাপারে আয়েশা (রা) এর বর্ণনাও এ আকীদার কথাই প্রমাণ করে, তিনি বলেন, যে ব্যক্তি বলে মুহাম্মদ স্বীয় রবের সাথে সাক্ষাৎ করেছে সে মিথ্যুক। (বুখারী ও মুসলিম)
এ দুনিয়ায় যখন নবীগণ আল্লাহকে দেখতে পারে নি, তাহলে উম্মতের কোনো ব্যক্তির এ দাবী করা যে, সে আল্লাহর সাক্ষাৎ লাভ করেছে তা মিথ্যা ব্যতীত আর কি হতে পারে? পরকালে আল্লাহর সাক্ষাৎ কুরআন ও সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। আল্লাহর বাণী:
لِلَّذِينَ أَحْسَنُوا الْحُسْنَى وَزِيَادَةٌ
অর্থ: "নেককারদের জন্য উত্তম প্রতিদান ব্যতীতও আরো প্রতিদান থাকবে।" (সূরা ইউনুস: ২৬)
এ আয়াতের তাফসীরে সুহাইব রূমী (রা) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন রাসূলুল্লাহ এ আয়াত পাঠ করেছেন এবং বলেছেন: যখন জান্নাতীরা জান্নাতে এবং জাহান্নামীরা জাহান্নামে চলে যাবে তখন এক আহ্বানকারী আহ্বান করবে হে জান্নাতীরা! আল্লাহ তোমাদের সাথে এক ওয়াদা করেছিলেন, তিনি আজ তা পূর্ণ করতে চান। তারা বলবে সে কোনো ওয়াদা? আল্লাহ তাঁর স্বীয় দয়ায় আমাদের আমলসমূহ মিযানে ভারী করে দেন নি? আল্লাহ আমাদেরকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দিয়ে জান্নাতে প্রবেশ করান নি? তখন পর্দা উঠে যাবে এবং জান্নাতবাসী আল্লাহর সাথে সাক্ষাত করবে। সুহাইব বলেন: আল্লাহর কসম! আল্লাহকে দেখার চেয়ে জান্নাতবাসীদের জন্য আনন্দদায়ক এবং চোখের শান্তি দায়ক আর কিছুই থাকবে না। (মুসলিম) অন্যত্র আল্লাহ ইরশাদ করেন:
وُجُوهٌ يَوْمَئِذٍ نَاضِرَةٌ إِلَى رَبِّهَا نَاظِرَةٌ
অর্থ: "সেদিন কোন কোন মুখ মণ্ডল উজ্জ্বল হবে, তারা তাদের প্রতিপালকের দিকে তাকিয়ে থাকবে।" (সূরা কিয়ামাহ: ২২-২৩)
এ আয়াতে জান্নাতীগণ আল্লাহর দিকে তাকানোর কথা স্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে, জাবীর বিন আবদুল্লাহ (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা নবী-এর নিকট উপস্থিত ছিলাম তিনি ১৪ তারিখের চাঁদের দিকে তাকিয়ে বললেন: জান্নাতে তোমরা তোমাদের রবকে এমনভাবে দেখবে যেমনভাবে এ চাঁদকে দেখছ। সেদিন আল্লাহকে দেখতে তোমাদের কোনো কষ্ট হবে না। (বুখারী)
অতএব ঐ লোকেরাও পথভ্রষ্ট হয়েছে যারা দাবী করে যে, তারা এ পৃথিবীতে আল্লাহকে দেখেছে এবং তারাও ধোঁকায় পড়েছে যারা মনে করে যে, কিয়ামতের দিনও আল্লাহকে দেখা যাবে না। সঠিক আকীদা হলো এই যে, দুনিয়াতে আল্লাহর দীদার অসম্ভব, তবে অবশ্যই পরকালে জান্নাতীরা আল্লাহকে দেখতে পাবে। যা হবে অত্যন্ত বড় নিআমত যার মাধ্যমে বাকী সমস্ত নিআমত পূর্ণতা লাভ করবে।
জান্নাতে প্রবেশকারী মানুষ: উল্লেখিত শিরোনামে এ গ্রন্থে একটি অধ্যায় সামিল করা হলো। যেখানে কতিপয় গুণে গুনান্বিত ব্যক্তিকে জান্নাতে প্রবেশের সু সংবাদ দেয়া হয়েছে। এ বিষয়ে দু'টি জিনিস স্পষ্ট করা প্রয়োজন মনে করছি। প্রথমত: এ অধ্যায়ে আলোচিত গুণাবলীর উদ্দেশ্যও মোটেও এ নয় যে, এগুলো ব্যতীত আর এমন কোনো গুণাবলী নেই যে, যা মানুষকে জান্নাতে নিয়ে যাবে। এ অধ্যায়ে আমরা শুধু ঐ সমস্ত হাদীসমূহ বাছাই করেছি যেখানে রাসূলুল্লাহ স্পষ্টভাবে সে জান্নাতে প্রবেশ করেছে।" এবং "তার জন্য জান্নাত ওয়াজিব হয়ে গেছে" ইত্যাদি শব্দ ব্যবহার করেছেন, যাতে করে কোনো সন্দেহ বা অপব্যাখ্যার অবকাশ না থাকে।
দ্বিতীয়ত: যে সমস্ত গুণাবলীর কারণে রাসূলুল্লাহ জান্নাতে প্রবেশ করার সুসংবাদ দিয়েছেন তা থেকে এ অর্থ বুঝা মোটেও ঠিক হবে না যে, যে ব্যক্তি উল্লেখিত গুণাবলীর কোনো একটিতে গুণান্বিত হবে সে সরাসরি জান্নাতে চলে যাবে। একথা স্মরণ রাখতে হবে যে, ইসলামের বিধি-বিধানসমূহ একটি অপরটির সাথে এমনভাবে সম্পর্কিত যে একটি থেকে অপরটিকে পৃথক করা সম্ভব নয়। যে কোনো ব্যক্তির ইসলামের রুকনসমূহের যতই আমল থাকুকনা কেন, সে যদি পিতা-মাতার অবাধ্য হয়, তাহলে তাকে এ কবীরা গুনাহর শাস্তি ভোগ করার জন্য জাহান্নামে যেতে হবে। তবে যদি সে তাওবা করে, আর আল্লাহ তাঁর বিশেষ রহমতে তাকে ক্ষমা করে দেন, তা হবে আলাদা বিষয়। অতএব এ অধ্যায়ের উল্লিখিত হাদীস সমূহের সঠিক অর্থ হবে এই যে, যে ব্যক্তি তাওহীদের ওপর বিশ্বাসী হয়ে, ইসলামের রুকনসমূহ পালন করার জন্য পরিপূর্ণভাবে চেষ্টা করে, মানুষের হক আদায় করার ব্যাপারে কোনো প্রকার অলসতা দেখায় না, কবীরা গুনাহ থেকে বাঁচার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করে, এমন ব্যক্তির মধ্যে যদি উল্লেখিত গুণাবলীর মধ্য থেকে কোনো একটি বা তার অধিক গুণ থাকে, তাহলে আল্লাহ তার স্বীয় দয়া ও অনুগ্রহের মাধ্যমে নাজানা পাপসমূহ ক্ষমা করে প্রথমেই তাকে জান্নাতে দিবেন এবং তাকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করবেন। এর আরেকটি অর্থ এও হতে পারে যে, যাদের মধ্যে উল্লেখিত গুণাবলীর মধ্য থেকে কোনো একটি থাকবে, যদিও সে কোনো কবীরা গুনাহর কারণে জাহান্নামে যায়ও শেষ পর্যন্ত আল্লাহ তাকে তার ঐ গুণে গুণান্বিত হওয়ার কারণে জাহান্নাম থেকে বের করে অবশ্যই জান্নাতে দিবেন। যেমন এক হাদীসে রাসূলুল্লাহ ﷺ এরশাদ করেছেন, কোনো এক সময় ঐ ব্যক্তিকেও জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেয়া হবে যে একনিষ্ঠভাবে লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলেছে, আর তার অন্তরে শুধু সরিষা পরিমাণ ভাল আছে। (মুসলিম)
(এ ব্যাপারে আল্লাহই ভাল জানেন)।

📘 মৃত্যুর পরে অনন্ত জীবন > 📄 প্রাথমিকভাবে জান্নাত থেকে বঞ্চিত মানুষ

📄 প্রাথমিকভাবে জান্নাত থেকে বঞ্চিত মানুষ


এ গ্রন্থে "জান্নাত থেকে প্রাথমিকভাবে বঞ্চিত থাকা মানুষ" নামক অধ্যায়টি শামিল করা হলো, এখানে ঐ সমস্ত কবীরা গুনাহর কথা আলোচনা করা হবে, যার কারণে মুসলমান স্বীয় পাপের শাস্তি ভোগ করার জন্য প্রথমে জাহান্নামে যাবে। এরপর জান্নাতে প্রবেশ করবে। এ অধ্যায়েও সমস্ত কবীরা গুনাহর কথা আলোচনা করা হয় নি, যা জাহান্নামে যাওয়ার কারণ হবে, বরং শুধু ঐ সমস্ত হাদীসসমূহ বাছাই করা হয়েছে যেখানে রাসূলূল্লাহ ﷺ স্পষ্টভাবে "ঐ ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করবে না" বা "আল্লাহ তার ওপর জান্নাত হারাম করেছেন।" ইত্যাদি শব্দ ব্যবহার করেছেন। যাতে করে কোনো কথা বলার বা অপব্যাখ্যার অবকাশ না থাকে।
একথা স্মরণ থাকা দরকার যে, সগীরা গুনাহ কোনো সৎকাজের মাধ্যমে (তাওবা ব্যতীতই) আল্লাহ স্বীয় দয়ায় ক্ষমা করে দেন। কিন্তু কবীরা গুনাহ তাওবা ব্যতীত ক্ষমা করা হয় না। আর কবীরা গুনাহর শাস্তি হলো জাহান্নাম। প্রত্যেক কবীরা গুনাহর শাস্তিও গুনাহ হিসেবে পৃথক পৃথক। যেমন হাদীসে বর্ণিত হয়েছে যে, কোনো কোনো ব্যক্তিকে জাহান্নামের আগুন টাখনু পর্যন্ত স্পর্শ করবে। আবার কোনো কোনো ব্যক্তির কোমর পর্যন্ত স্পর্শ করবে এবং কোনো কোনো ব্যক্তির গর্দান পর্যন্ত স্পর্শ করবে। (মুসলিম)
অন্য এক হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, কোনো কোনো লোকের সমস্ত শরীরেই আগুন স্পর্শ করবে, তবে সেজদার স্থানটুকু আগুনের স্পর্শ থেকে মুক্ত থাকবে। (ইবনে মাজাহ)
কবীরা গুনাহ শাস্তি ভোগ করার পর আল্লাহ সমস্ত কালিমা পড়া মুসলমানকে জাহান্নাম থেকে বের করে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন।
ঈমানদারগণের একথা ভুলে যাওয়া ঠিক হবে না যে, জাহান্নামে কিছুক্ষণ থাকাতো দূরের কথা বরং তার মাঝে এক পলক থাকাই মানুষকে দুনিয়ার সমস্ত নিআমত, আরাম আয়েশের কথা ভুলিয়ে দেয়ার জন্য যথেষ্ট হবে। তাই প্রত্যেক মুসলমানের অনুভূতিগতভাবে এ চেষ্টা চালাতে হবে যে, জাহান্নাম থেকে সে বেঁচে থাকে এবং প্রথমবারে জান্নাতে প্রবেশ কারীদের অন্তর্ভুক্ত থাকে। এ জন্য দু'টি বিষয় গুরুত্বের সাথে দেখা দরকার।
প্রথমত: কবীরা গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার জন্য যতদূর সম্ভব চেষ্টা করা, আর যদি কখনো অনিচ্ছা সত্ত্বে কবীরা গুনাহ হয়ে যায়, তাহলে দ্রুত আল্লাহর নিকট তাওবা করে ভবিষ্যতে তা থেকে বেঁচে থাকার জন্য দৃঢ় মনোভাব রাখা।
দ্বিতীয়ত: এমন আমল অধিকহারে করা যার ফলে আল্লাহ স্বয়ং কবীরা গুনাহ সমূহ ক্ষমা করে দিবেন। যেমন নবী -এর বাণী: "যে ব্যক্তি প্রত্যেক নামাযের পর ৩৩ বার সুবহানাল্লাহ, ৩৩ বার আলহামদুলিল্লাহ, ৩৩ বার আল্লাহু আকবার বলার পর, একবার লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু, ওয়াহদাহু লা শারীকা লাহু, লাহুল মুলকু, ওয়াহুল হামদু, ওয়ালহুয়া আলা কুল্লি সায়ি‍্যন কাদীর, বলে আল্লাহ তার সমস্ত সগীরা গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দেন যদিও তার গুনাহ সমুদ্রের ফেনা তুল্য হয়।" (মুসলিম)
অন্য এক হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, যে ব্যক্তি বাজারে প্রবেশ করার পূর্বে লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু, ওয়াহদাহু লা শারীকা লাহু, লাহুল মুলku, ওয়ালাহুল হামদু, ওয়া ইউহয়ী ওয়াইউমি, ওয়াহুয়া হাইয়ুত্যুন লাইয়ামুতু, বিয়াদিহিল খাইর, ওয়াহুয়া আলা কুল্লি শায়ি‍্যন কাদীর। অর্থ: আল্লাহ ব্যতীত অন্য কোনো ইলাহ নেই, তিনি এক তাঁর কোনো শরীক নেই, তাঁর জন্যই সমস্ত বাদশাহী, তাঁর জন্যই সমস্ত প্রশংসা, তিনি জীবন ও মৃত্যু দেন, তিনি চিরঞ্জীব, মৃত্যুবরণ করবেন না, তাঁর হাতেই সমস্ত কল্যাণ, তিনি সর্ব বিষয়ের ওপর শক্তিমান। এ দুআ পাঠ করবে তার আমলনামায় আল্লাহ দশ লক্ষ নেকী লিখে দিবেন এবং দশ লক্ষ গুনাহ ক্ষমা করে দিবেন এবং দশ লক্ষ মর্যাদা বৃদ্ধি করে দিবেন। (তিরমিযী)
দরূদের ফযীলত সম্পর্কে নবী এরশাদ করেছেন: যে ব্যক্তি আমার ওপর একবার দরূদ পাঠ করে আল্লাহ তার ওপর দশবার রহমত বর্ষণ করেন। তার দশটি গুনাহ ক্ষমা করেন। তার একটি মর্যাদা বৃদ্ধি করেন। তাই বেশি বেশি করে সিজদা করো। (অর্থাৎ বেশি বেশি করে নফল নামায আদায় কর) (ইবনে মাজাহ)
কবীরা গুনাহ থেকে পরিপূর্ণরূপে বেঁচে থাকা এবং নিয়মিত তাওবা করা এবং সগীরা গুনাহসমূহকে ক্ষমাকারী আমলসমূহ ধারাবাহিক ভাবে বেশি বেশি করে করার পরও আল্লাহর দয়া ও অনুগ্রহের আশা রাখা যে, তিনি আমাকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করবেন এবং প্রথম সুযোগেই আমাকে জান্নাতে প্রবেশকারীদের অন্তর্ভুক্ত করবেন। নিশ্চয়ই তিনি তাওবা কবুলকারী এবং অত্যন্ত দয়াময়।

📘 মৃত্যুর পরে অনন্ত জীবন > 📄 একটি বাতিল আক্বীদার অপনোদন

📄 একটি বাতিল আক্বীদার অপনোদন


কোনো কোনো লোক এ বিশ্বাস রাখে যে, বুযুরগানে দ্বীন এবং ওলীগণ যেহেতু আল্লাহর নিকট বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ এবং আল্লাহর প্রিয়, তাই তাদের মাধ্যম বা ওসীলা করা বা তাদের হাতে হাত রাখলে আমরাও তাদের সাথে সরাসরি জান্নাতে চলে যাব। তাদের এ আক্বীদার পক্ষে তারা বড় বড় অফিসারদের উদাহরণও পেশ করে থাকে, যেমন কেউ কোনো মন্ত্রী মা গভর্ণরের নিকট যেতে হলে তাকে ঐ মন্ত্রী বা গভর্ণরের কোনো ঘনিষ্ঠ লোকের সুপারিশ লাগবে। এভাবে আল্লাহর নিকট তার ক্ষমা পেতে হলেও কোনো না কোনো ওসীলা বা মাধ্যম লাগবেই। কোনো কোনো বুযুর্গ নিজেরা এ দাবী করে থাকে যে, আমাদের সাথে মিশে সে সরাসরি জান্নাতে চলে যাবে। আর এজন্য ঐ ধরনের দুনিয়াবী উদাহরণসমূহ পেশ করা হয়ে থাকে। যেমন ইনজিনের পিছনের গাড়ির সাথে সংযোজিত ডাব্বাও ঐ স্থানেই পৌঁছবে যেখানে ইনজিন পৌছে ইত্যাদি। কোনো নবী বা কোনো ওলীর বা কোনো সৎ লোকের সাথে সুসম্পর্ক থাকাই কি জান্নাতে যাওয়ার জন্য যথেষ্ট? আসুন এ প্রশ্নের উত্তর কিতাব ও সুন্নাতের আলোকে খুঁজে দেখি।
কুরআন মাজীদে একথার প্রতি বারবার ইঙ্গিত করা হয়েছে যে, কিয়ামতের দিন সমস্ত মানুষ একাকী আল্লাহর নিকট হিসাব দেয়ার জন্য উপস্থিত হবে। কারো সাথে কোনো ধন-সম্পদ থাকবে না, না থাকবে কোনো সন্তান-সন্ততি, না কোনো নবী বা ওলী বা হযরত। আল্লাহর বাণী:
وَنَرِثُهُ مَا يَقُولُ وَيَأْتِينَا فَرْداً
অর্থ: "সে এ বিষয়ে কথা বলে, তা থাকবে আমার অধিকারে এবং সে আমার নিকট আসবে একা।” (সূরা মারইয়াম: ৮০)
অন্যত্র আল্লাহ বলেন:
وَكُلُّهُمْ آتِيْهِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ فَرْداً
অর্থ: "এবং কিয়ামতের দিন তাদের সকলেই তাঁর নিকট আসবে একাকী অবস্থায়।" (সূরা মারইয়াম: ৯৫)
অন্যত্র আল্লাহ বলেন:
وَلَقَدْ جِئْتُمُونَا فُرَادَى كَمَا خَلَقْنَاكُمْ أَوَّلَ مَرَّةٍ وَتَرَكْتُمْ مَّا خَزَلْنَاكُمْ وَرَاءَ ظُهُورِكُمْ وَمَا نَرَى مَعَكُمْ شُفَعَاءَكُمُ الَّذِينَ زَعَمْتُمْ أَنَّهُمْ فِيكُمْ شُرَكَاءُ لَقَد تَقَطَّعَ بَيْنَكُمْ وَضَلَّ عَنْكُم مَّا كُنْتُمْ تَزْعُمُونَ
অর্থ: "আর তোমরা আমার নিকট এককভাবে এসেছো, যেভাবে প্রথম আমি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছিলাম, আর যা কিছু আমি তোমাদেরকে দিয়েছিলাম তা তোমরা নিজেদের পশ্চাতেই ছেড়ে এসেছো, আর আমি তো তোমাদের সাথে তোমাদের সে সুপারিশ কারীদেরকে দেখছি না। যাদের সম্বন্ধে তোমরা দাবী করতে যে, তাদেরকে তোমাদের কাজ-কর্মে (আমার সাথে) শরিক করতে। বাস্ত বিকই তোমাদের পরস্পরের সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে, আর তোমরা যা কিছু ধারণা করতে তা সবই আজ তোমাদের নিকট থেকে উধাও হয়ে গেছে। (সূরা আনআম: ৯৪)
উক্ত আয়াতে আল্লাহ অত্যন্ত স্পষ্ট করে তিনটি জিনিস বর্ণনা করেছেন:
১. কিয়ামতের দিন সমস্ত মানুষ হিসাব দেয়ার জন্য আল্লাহর নিকট একাকী উপস্থিত হবে।
২. কিয়ামতের দিন বুযুর্গ, ওলী, পীর, ফকীরের ওপর ভরসা কারীদেরকে হেয়ো করা হবে এ বলে যে, দেখ আজ তারা কোথাও তোমাদের দৃষ্টি গোচরও হচ্ছে না।
৩. স্বীয় বুযুর্গ, ওলী, পীরের ভক্তরা তাদের সাথে যোগাযোগের জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করবে কিন্তু তাদের আগ্রহ থাকা সত্ত্বেও তারা তাদের বুযুর্গ, ওলী, পীরের সাথে কোনো প্রকার যোগাযোগ স্থাপন করতে পারবে না।
এ আক্বীদাকে স্পষ্ট করার জন্য কুরআনে আল্লাহ কিছু উদাহরণ পেশ করেছেন:
ضَرَبَ اللَّهُ مَثَلًا لِلَّذِينَ كَفَرُوا امْرَأَةَ نُوحٍ وَامْرَأَةَ لُوطٍ كَانَتَا تَحْتَ عَبْدَيْنِ مِنْ عِبَادِنَا صَالِحَيْنِ فَخَانَتَاهُمَا فَلَمْ يُغْنِيَا عَنْهُمَا مِنَ اللَّهِ شَيْئًا وَقِيلَ ادْخُلَا النَّارَ مَعَ الدَّاخِلِينَ
অর্থ: "আল্লাহ কাফিরদের জন্য নূহ (আ) ও লূত (আ)-এর স্ত্রীদের দৃষ্টান্ত পেশ করেছেন, তারা ছিল আমার বান্দাদের মধ্যে দুই সৎকর্মপরায়ণ বান্দার অধীন। কিন্তু তারা তাদের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল, ফলে নূহ (আ) ও লূত (আ) তাদেরকে আল্লাহর শাস্তি থেকে রক্ষা করতে পারলো না এবং তাদেরকে বলা হলো জাহান্নামে প্রবেশকারীদের সাথে তোমরাও তাতে প্রবেশ করো।" (সূরা তাহরীম: ১০)
এ আয়াতে আল্লাহ এ আক্বীদা স্পষ্ট করেছেন যে, কিয়ামতের দিন কোনো নবীর সাথে সম্পর্ক থাকা বা তার সাথে চলা-ফিরা করাই জান্নাতে জাওয়ার জন্য যথেষ্ট নয়। নবী স্বীয় কন্যা ফাতেমা (রা) কে সম্বোধন করে উপদেশ দিয়েছেন যে,
يَا فَاطِمَةُ، أَنْقِذِي نَفْسِكِ مِنَ النَّارِ ، فَإِنِّي لَا أَمْلِكُ لَكُمْ مِنَ اللَّهِ شَيْئًا
অর্থ: "হে ফাতেমা! তুমি তোমাকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করো। কেননা আল্লাহর নিকট আমি তোমাদের জন্য কিছুই করতে পারবো না। (মুসলিম)
রাসূলুল্লাহ ইবরাহীম (আ)-এর পিতা আযর সম্পর্কে বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন: কিয়ামতের দিন ইবরাহীম (আ) তাঁর পিতা আযরকে এমন অবস্থায় দেখতে পাবে যে তার মুখ কাল, আবর্জনাময় হয়ে আছে, ইবরাহীম (আ) বলবে: আমি কি তোমাকে দুনিয়াতে বলি নাই যে, আমার নাফরমানী করবে না? তাঁর পিতা বলবে: ঠিক আছে আজ আর আমি তোমার নাফরমানী করবো না। ইবরাহীম আল্লাহর নিকট দরখাস্ত করবে যে, হে আমার প্রভু! তুমি আমাকে ওয়াদা দিয়েছিলে যে, কিয়ামতের দিন আমাকে অপমানিত করবে না। কিন্তু এর চেয়ে বড় অপমান আর কি হতে পারে যে আমার পিতা আজ তোমার রহমত থেকে বঞ্চিত। আল্লাহ বলবেন: আমি কাফিরদের জন্য জান্নাত হারাম করেছি। অতপর আল্লাহ ইবরাহীম (আ) কে সম্বোধন করে বলবেন: ইবরাহীম! দেখ তোমার উভয় পায়ের নিচে কি? ইবরাহীম (আ) তাকিয়ে দেখবেন ময়লা আবর্জনা মিশ্রিত একটি প্রাণী ফেরেশতাগণ তাকে পদাঘাত করে জাহান্নামে নিক্ষেপ করছে। (বুখারী)
ময়লা আবর্জনায় মিশ্রিত প্রাণী মূলত তা হবে ইবরাহীম (আ)-এর পিতা আযর। একটি প্রাণীর আকৃতিতে তাকে জাহান্নামে এজন্য নিক্ষেপ করা হবে যাতে তাঁর পিতাকে মানুষের আকৃতিতে দেখে মায়ায় না পড়ে যান। কিন্তু আল্লাহর বিধান স্ব স্থানে স্থির থাকবে। যতক্ষণ পর্যন্ত মানুষ সঠিক আক্বীদা তাওহীদ এবং সৎ আমলের ওপর না থাকবে ততক্ষণ কোনো নবী, ওলী, বা আল্লাহর নেক বান্দার সাথে সু সম্পর্ক থাকা, বা প্রিয় হওয়া, কাউকে না জাহান্নাম থেকে বাঁচাতে পারবে, আর না জান্নাতে প্রবেশ করাতে পারবে।
এ সম্পর্কে এখানে দু'টি বিষয় স্পষ্ট করা দরকার মনে করছি:
প্রথমত: কিয়ামতের দিন নবী, সৎলোক, এবং শহীদগণ সুপারিশ করবে তা সম্পূর্ণ সত্য এবং কিতাব ও সুন্নাতের মাধ্যমে প্রমাণিত। কিন্তু সে সুপারিশ আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং তাঁর অনুমতি ক্রমে হবে। কোনো নবী, ওলী বা কোনো শহীদ তার স্ব ইচ্ছায় আল্লাহর নিকট সুপারিশ করার সাহস দেখাতে পারবে না। আর এ সুপারিশও হবে একমাত্র ঐ ব্যক্তির জন্য যার ব্যাপারে সুপারিশ করার জন্য আল্লাহ অনুমতি দিবেন।
আল্লাহর বাণী:
مَنْ ذَا الَّذِي يَشْفَعُ عِنْدَهُ إِلَّا بِإِذْنِهِ
অর্থা: "(আল্লাহর) অনুমতি ব্যতীত কে তাঁর নিকট সুপারিশ করবে।" (সূরা বাক্বারা: ২৫৫)
দ্বিতীয়ত: আল্লাহর ওলী কে? কিয়ামতের দিন কাকে সুপারিশের অনুমতি দেয়া হবে, আর কাকে তা দেয়া হবে না, তা একমাত্র আল্লাহই ভাল জানেন। কোনো ব্যক্তি এ দাবী করতে পারবে না যে, ওমুক ব্যক্তি আল্লাহর ওলী তাই সে অবশ্যই সুপারিশের অনুমতি পাবে। না কোনো ব্যক্তি নিজের ব্যাপারে এ দাবী করতে পারবে যে, আমাকে আল্লাহ অবশ্যই সুপারিশের অনুমতি দিবেন। আমি ওমুক ওমুকের জন্য সুপারিশ করবো। কোনো জীবিত বা মৃত ব্যক্তিকে লোকেরা আল্লাহর ওলী বলা বাস্তবেই সে আল্লাহর ওলী বা প্রিয় হওয়ার জন্য যথেষ্ট নয়। অসম্ভব নয় যে, যে মৃত ব্যক্তিকে লোকেরা ওলী মনে করে, তার ওসীলা ধরতে তার কবরে নযর-নিয়াজ পেশ করতেছে, সে ব্যক্তি নিজেই কোনো গুনাহর কারণে আল্লাহর আযাব ভোগ করতেছে। রাসূলুল্লাহ -এর সামনে কোনো এক ব্যক্তিকে শহীদ বলা হলো, তখন তিনি বললেন: কখনো না। গনীমতের মাল থেকে একটি চাদর চুরি করার কারণে আমি তাকে জাহান্নামে দেখেছি। (তিরমিযী)
সারকথা হলো এই যে, ওলী ও বুযর্গদের ওসীলা ধরে বা তাদের সাথে সুসম্পর্ক থাকার কারণে জান্নাতে চলে যাওয়ার আক্বীদা সম্পূর্ণই একটি ভ্রান্তি এবং শয়তানের চক্রান্ত। যে ব্যক্তি আসলেই জান্নাত কামনা করে তার উচিত খালেসভাবে তাওহীদ ও সঠিক আক্বীদা অনুযায়ী আমল করা।
আল্লাহর বাণী:
فَمَنْ كَانَ يَرْجُو لِقَاءَ رَبِّهِ فَلْيَعْمَلْ عَمَلاً صَالِحاً وَلَا يُشْرِكْ بِعِبَادَةِ رَبِّهِ أَحَدًا
অর্থা: "সুতরাং যে তার প্রতিপালকের সাক্ষাৎ কামনা করে, সে যেন সৎকর্ম করে ও তার প্রতিপালকের ইবাদতে কাউকে শরীক না করে।" (সূরা কাহাফ: ১১০)
আর জান্নাতে যাওয়ার সঠিক রাস্তা এটাই।

📘 মৃত্যুর পরে অনন্ত জীবন > 📄 মু'মিনরা হুশিয়ার

📄 মু'মিনরা হুশিয়ার


আল্লাহ আদম (আ) কে সৃষ্টি করার পর ফেরেশতাগণকে হুকুম দিয়েছেন যে, আদমকে সেজদা করো। ইবলীস ব্যতীত সবাই তাকে সেজদা করেছিল। আল্লাহ ইবলীসকে জিজ্ঞেস করলেন: আমার নির্দেশ সত্ত্বেও কে তোমাকে সেজদা দিতে বাধা দিল। ইবলীস বললো: আমি আদমের চাইতে উত্তম, তাকে তুমি মাটি দিয়ে সৃষ্টি করেছেন, আর আমাকে আগুন দিয়ে। আল্লাহ বললেন: তোমার অধিকার নেই যে, তুমি এখানে অহংকার করো, তুমি এখান থেকে বের হও। নিশ্চয় তুমি লাঞ্ছিত ও অপমানিত। ইবলিস আবার বললো: আমাকে কিয়ামত পর্যন্ত সুযোগ দিন। আল্লাহ বললেন: তোমাকে সুযোগ দেয়া হলো। তখন ইবলীস এ ঘোষণা দিল যে, হে আল্লাহ! যেভাবে তুমি আমাকে (সেজদার নির্দেশ দিয়ে) পথভ্রষ্ট করেছো, এমনিভাবে আমিও মানুষকে সঠিক রাস্তা থেকে পথ ভ্রষ্ট করার জন্য তাদের পিছনে লেগে থাকবো। সামনে পিছনে ডানে বামে সকল দিক থেকে তাদেরকে ঘিরে রাখবো, আর তাদের অধিকাংশকেই তুমি অকৃতজ্ঞ পাবে।
আল্লাহ বললেন: তুমি এখান থেকে লাঞ্ছিত ও পদদলিত হয়ে বের হয়ে যাও, আর জেনে রাখ যে, মানুষের মধ্য থেকে যারা তোমার কথা মানবে তুমি সহ তাদেরকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবো। অতপর আল্লাহ আদম (আ) কে লক্ষ্য করে বললেন: তুমি এবং তোমার স্ত্রী এ জান্নাতে বসবাস করো। সেখান থেকে যা খুশি তা খাও, কিন্তু ঐ বৃক্ষের নিকটবর্তী হইও না। অন্যথায় তুমি যালিমদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে। হিংসা ও প্রতিরোধ প্রত্যাসী ইবলীস আদম (আ)-এর নিকট এসে বললো: তোমার রব তো তোমাকে ঐ বৃক্ষ থেকে বারণ করেছে এজন্য যে, তুমি যেন ঐ বৃক্ষের নিকট গিয়ে ফেরেশতা না বনে যাও বা চিরস্থায়ীভাবে জান্নাতের অধিবাসী না হয়ে যাও। এবং সাথে সাথে ইবলীস কসম খেয়ে দৃঢ় বিশ্বাস করাল যে, আমি তোমার কল্যাণকামী এবং তোমার বন্ধু। এভাবে ইবলীস আদম ও তাঁর স্ত্রীকে ধোকায় ফেলার ব্যাপারে সফল হয়ে গেল, যার ফলে আদম (আ) ও হাওয়া (আ) বড় নিআমত জান্নাত থেকে বঞ্চিত হয়ে গেল। তখন আল্লাহ আদম ও হাওয়াকে পৃথিবীতে থাকার নির্দেশ দিলেন। তাদেরকে কিছু নির্দেশ ও বিধি-বিধান দিয়ে তাদেরকে সতর্ক করে দিলেন যে, হে আদম সন্তান। আর যেন এমন না হয় যে, শয়তান আবার তোমাদেরকে এভাবে ফেতনায় ফেলে, যেভাবে সে তোমাদের পিতা-মাতাকে ফেতনায় ফেলে জান্নাত থেকে বের করেছিল এবং তাদের পোশাক তাদের শরীর থেকে খুলে দিয়েছিল। যেন তাদের লজ্জাস্থান একে অপরের সামনে খুলে যায়। (বিস্তারিত দেখুন সূরা আরাফ)।
আল্লাহ কুরআনের বিভিন্ন স্থানে বিভিন্নভাবে, আদম সন্তানদেরকে বার বার সতর্ক করেছেন যে, হে আদম সন্তান! শয়তান তোমাদের স্পষ্ট শত্রু। তার চক্রান্তে পড় না। তাহলে তোমরা ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে।
কিছু আয়াতের উদ্ধৃতি:
১. হে লোকেরা! শয়তানের অনুসরণ করো না, সে তোমাদের স্পষ্ট দুশমন। (সূরা বাক্বারা: ২০৮)
২. শয়তান মানুষকে ওয়াদা দেয়, তাদেরকে আশার আলো দেখায়, কিন্তু স্মরণ রাখ শয়তানের সমস্ত ওয়াদা চক্রান্ত ব্যতীত আর কিছুই নয়।
৩. (লোকেরা)! সুতরাং পার্থিব জীবন যেন তোমাদেরকে কিছুতেই প্রতারিত না করে এবং সে শয়তান যেন তোমাদেরকে কিছুতেই আল্লাহ সম্পর্কে প্রবঞ্চিত না করে। (সূরা লুকমান: ৩৩)
আল্লাহর স্পষ্ট সতর্কতা সত্ত্বেও মানুষ কতইনা সহজভাবে শয়তানের চক্রান্তে পড়ে নিজেকে জান্নাত থেকে বঞ্চিত করেছে। এর অনুমান প্রত্যেক মানুষ তার বাস্তব জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে নিয়ে চিন্তা করলে নিজেই তা বুঝতে পারবে।
দুনিয়ার এ সংক্ষিপ্ত জীবনের তুলনায় পরকালের দীর্ঘজীবনকে রাসূলুল্লাহ এভাবে বুঝিয়েছেন যে, যদি কোনো ব্যক্তি তার হাতের আঙ্গুলকে কোনো সমুদ্রের মধ্যে রেখে আবার তুলে নেয় তাহলে তার আঙ্গুলের সাথে যে সামান্য পানি লেগেছে এটা দুনিয়ার জীবনের ন্যায়, আর বিশাল সমুদ্র পরকালের জীবনের ন্যায়। (মুসলিম)
যদি এ উদাহরণকে আমরা গাণিতিকভাবে বুঝতে চাই, তাহলে এভাবে তা বুঝা যেতে পারে যে, রাসূলুল্লাহ -এর বর্ণনা অনুযায়ী, উম্মতে মুহাম্মদীর বয়স ষাট ও সত্তর বছরের মাঝামাঝি। এ বাণী অনুযায়ী দুনিয়াতে মানুষের জীবন বেশি থেকে বেশি হলে সত্তর বছর ধরা যায়। দুনিয়ার গণনার সর্বশেষ সংখ্যার দশগুণকে, পরকালের জীবনের সাথে অনুমান করে উভয়ের তুলনা করলে, দুনিয়ার সত্তর বছর জীবন যাপনকারী ব্যক্তি, দুনিয়ার প্রতি মিনিটের বিনিময়ে, পরকালে এক কোটি তের লক্ষ চব্বিশ হাজার নয়শত বছর জীবন যাপন করবে। চাই সে জান্নাতের অফুরন্ত নিআমতের মধ্যে থাকুক আর জাহান্নামের কঠিন শাস্তি তে থাকুক।
উল্লেখ্য: দুনিয়া ও আখেরাতের এ পরিসংখ্যানও একান্তই আনুমানিক বাস্তবিক নয়। চিন্তা করুন আমরা কি আমাদের সার্বিক প্রচেষ্টা এক মিনিটের জীবনকে সুন্দর ও কারুকার্যময় করার জন্য ব্যয় করবো, না এক কোটি তের লক্ষ চব্বিশ হাজার নয়শত বছরের জীবনকে সুন্দর ও কারুকার্যময় করার জন্য ব্যয় করবো কিন্তু ইবলীস শুধু এক সেকেন্ডের জীবনকে আমাদের জন্য এত চিত্তাকর্ষক করে দিয়েছে যে, এর ফলে আমরা কোটি বছর দীর্ঘ চিরস্থায়ী নিআমতসমূহ থেকে আমরা গাফেল হয়ে আছি, আর এক সেকেন্ডের সংক্ষিপ্ত জীবনের রং তামাশায় পিনপতন হীন নিমগ্ন হয়ে আছি, এ শয়তানের ধোঁকায় ও চক্রান্তে পরকালে জান্নাত থেকে বঞ্চিত হতে যাচ্ছি। দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী জীবনে নিমগ্ন থাকা, আর পরকালের দীর্ঘজীবনের কথা ভুলে যাওয়ার চিত্র কদমে কদমে আমাদের সামনে ফুটে উঠে। রাসূলুল্লাহ বলেন: "ফজর নামাযের দু'রাকআত (সুন্নাত) দুনিয়া ও এর মাঝে যাকিছু আছে তা থেকে উত্তম।” (তিরমিযী)
চিন্তা করুন "দুনিয়া ও এর মাঝে যাকিছু আছে" এতে আমেরিকা, আফ্রিকা, ইউরোপ, এশিয়া এবং বাকী সমস্ত রাষ্ট্রের সম্পদ অন্তর্ভুক্ত আছে। পৃথিবীর অনুদ্ঘাটিত সম্পদও এর অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু এ দু'রাকআত সুন্নাত আদায়ের জন্য কতজন মুসলমান ফজরের আযানের সাথে সাথে উঠে? অথচ দুনিয়া কামানোর উদ্দেশ্যে কত মুসলমান ফজরের আযানের আগে উঠে যায়। কত ব্যবসায়ী এমন আছে যে, তার ব্যবসার জন্য সারা রাত জাগ্রত থাকে, কত কৃষক এমন আছে যে, সে তার যমীনে কাজ করার জন্য সারা রাত কষ্ট করে। কত ছাত্র এমন আছে যে, সুন্দর ভবিষ্যতের আশায় সারা রাত পড়াশুনার মাঝে কাটায়। কিন্তু ফজরের নামাযের দু'রাকআত (সুন্নাত) পড়ার ভাগ্য কজনের হয়? দুনিয়ার লোভ ও আশা-আকাঙ্খা আমাদেরকে পরকালের চিরস্থায়ী নিআমতে ভরপুর জান্নাত থেকে বঞ্চিত করতেছে।
রাসূলূল্লাহ বলেন: "দানের মাধ্যমে সম্পদ কমে না।" (মুসলিম)
অর্থাৎ: প্রকাশ্যভাবে সম্পদ কমা সত্ত্বেও আল্লাহ তাতে এত বরকত দেন যে, সামান্য দান হওয়া সত্ত্বেও এর মাধ্যমে আল্লাহ বহু মানুষের প্রয়োজন মিটিয়ে দেন। কিন্তু শয়তান বাহ্যিক পরিমাণ গুণে আমাদেরকে দেখায় যে, হাজার টাকা থেকে যদি একশত টাকা দান করা হয় তাহলে নয়শত টাকা থাকবে এতে সম্পদ বাড়বে কি করে বরং কমবে। তোমার ঘরের প্রয়োজনীয়তা, ছেলে মেয়েদের লেখাপড়া, চিকিৎসা, অন্যান্য নিত্য প্রয়োজনীয়তার এত বিশাল চার্ট তুমি কিভাবে পূরণ করবে। মানুষ তখন তার ঘনিষ্ট কল্যাণকামীর সামনে চলে আসে, অথচ এ ইবলীস আদম সন্তানকে জান্নাত থেকে বঞ্চিত করার পাথেয় যোগাচ্ছে।
আল্লাহর বাণী "আমি সুদের মাধ্যমে সম্পদ কমিয়ে দেই।" (সূরা বাক্বারা: ২৭৬)
নবী বলেন: যেকোনভাবে অর্জিত হারাম সম্পদে লালিত শরীর সর্বপ্রথম জাহান্নামের আগুনে জ্বলবে। (ত্বাবারানী)।
ঐ আগুন যার এক মুহূর্ত দুনিয়ার সমস্ত নিআমত ও আরাম আয়েশকে ভুলিয়ে দেয়ার জন্য যথেষ্ট। আগুনের পোশাক, আগুনের উড়না, আগুনের বিছানা, আগুনের ছাদ, আগুনের ছাতা, পান করার জন্য গরম পানি, খাওয়ার জন্য বিষাক্ত কাঁটাদার খাদ্য, আগুনে সৃষ্ট সাপ ও বিচ্ছু কিন্তু সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি, আরামদায়ক জীবন, সন্তানদের ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে শিক্ষা, একে অপরের তুলনায় বড় হওয়া, পার্থিব মর্যাদা ও সম্মান লাভ করা, মিথ্যা আমিত্ব, মিথ্যা সম্মান, মিথ্যা শান্তি প্রতিষ্ঠার ধারণাকে অভিশপ্ত ইবলীস এতো চিত্তাকর্ষক করেছে যার ফলে রাসূলূল্লাহ -এর সতর্কবাণী পরাজিত, আর ইবলীসের চক্রান্ত বিজয়ী হয়েছে।
(লা-হাওলা ওয়ালাকুয়‍্যাতা ইল্লাহ বিল্লাহ।)
আল্লাহর বাণী: أَلَا بِذِكْرِ اللَّهِ تَطْمَئِنُّ الْقُلُوبُ
অর্থ: "অবশ্যই আল্লাহর যিকিরের মাধ্যমে আত্মা তৃপ্তি লাভ করে।" (সূরা রা'দ: ২৮)
আল্লাহর এ স্পষ্ট বাণী সত্ত্বেও অভিশপ্ত ইবলীশ মানুষকে বিভিন্ন প্রকার শান্তি লাভের চক্রান্তে ফেলে রেখেছে, কাউকে স্বীয় পীর সাহেবের কবরে মান্নত মানার মধ্যে শান্তি মনে হয়, আবার কারো স্বীয় পীরের কদম বুসীতে তৃপ্তি হাসিল হয়। কারো মদ পানে শান্তি লাগে, কারো অন্য মহিলার কণ্ঠ শোনা, গান-বাজনা শোনার মধ্যে তৃপ্তি মনে হয়। কারো সোনা-চান্দ ও সম্পদের পাহাড় গড়ার মধ্যে শান্তি মনে হয়, কারো সরকারী উচ্চ পদ লাভে শান্তি মনে হয়, কারো সাংসদ ও মন্ত্রী হওয়ায় বা উপদেষ্টা হওয়ায় শান্তি মনে হয়। চিন্তা করুন আদম সন্তানের কত মানুষ এমন হবে যে, আল্লাহর স্মরণে আত্মতৃপ্তি লাভ করতে আগ্রহী, আর কত লোক এমন যে অভিশপ্ত ইবলীসের চক্রান্তে পড়ে আছে, আর এই হলো ঐ বাস্তব অবস্থা যা থেকে আল্লাহ আমাদেরকে আগেই সতর্ক করেছেন।
وَزَيَّنَ لَهُمُ الشَّيْطَانُ أَعْمَالَهُمْ فَصَدَّهُمْ عَنِ السَّبِيلِ وَكَانُوا مُسْتَبْصِرِينَ
অর্থ: "শয়তান তাদের কাজকে তাদের দৃষ্টিতে শোভন করেছিল এবং তাদেরকে সৎ পথ অবলম্বনে বাধা দিয়েছিল, যদিও তারা ছিল বিচক্ষণ।" (সূরা আনকাবুত: ৩৮)
দুনিয়া হাসিলের জন্য সমস্ত মানষ এ নীতির ওপর দৃঢ় বিশ্বাস রাখে যে, যতক্ষণ পর্যন্ত কেউ পরিশ্রমী না হবে ততক্ষণ পর্যন্ত ঘরে বসে থেকে কেউ আরাম দায়ক জীবন যাপন করতে পারবে না। কৃষক ফসল লাভের জন্য রাত-দিন মাঠে কাজ করে, ব্যবসায়ী লাভবান হওয়ার জন্য রাত-দিন দোকানে বসে থাকে। চাকুরীজীবী বেতন লাভের জন্য মাসভর ডিউটি করতে থাকে, শ্রমিক পয়সা লাভের জন্য সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কঠিন পরিশ্রম করতে থাকে, ছাত্র পরীক্ষায় পাস করার জন্য বছর ব্যাপী লিখা-পড়া করতে থাকে। মানব জীবনে এ ধরনের পরিশ্রম করা এতো স্বাভাবিক ব্যাপার যে, এ ব্যাপারে কেউ কাউকে সবক দেয়ারও প্রয়োজন হয় না। কিন্তু দ্বীনের ব্যাপারে শয়তানের ধোঁকা ও চক্রান্ত পরিলক্ষিত হয় যে, মুসলমানদের বহু সংখ্যক লোক এমন আছে যারা মনে করে আমাদের জান্নাত ও জাহান্নামে যাওয়া আল্লাহ আগেই লিখে রেখেছেন, তাহলে আমল করার আর কি প্রয়োজন। আবার কোনো লোক এ চক্রান্তে পড়ে আছে যে, যখন আল্লাহ চাইবেন তখন নামায পড়ব। বা আপনি আমাদের জন্য দুআ করুন যেন আল্লাহ আমাদেরকে নামায পড়ার তাওফীক দেন। আবার কোনো কোনো লোক এ ধোকায় পড়ে আছে যে, আল্লাহ অত্যন্ত দয়ালু তিনি সবকিছু ক্ষমা করে দিবেন। দুনিয়ার ব্যাপারে কঠোর পরিশ্রম এবং ধারাবাহিক প্রচেষ্টা আর দ্বীনের ব্যাপারে ভাগ্য ও আল্লাহর দয়ার দোহাই দিয়ে আমল ত্যাগ করা অভিশপ্ত শয়তানের ঐ ধোঁকা ও চক্রান্ত যে ব্যাপারে কুরআনুল কারীমে স্পষ্ট এরশাদ হয়েছে,
لَئِنْ أَخَّرْتَنِ إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ لَأَحْتَنِكَنَّ ذُرِّيَّتَهُ إِلَّا قَلِيلاً
অর্থাৎ: "যদি কিয়ামতের দিন পর্যন্ত তুমি আমাকে অবকাশ দাও তাহলে আমি অল্প কয়েকজন ব্যতীত তার বংশধরদের সমূলে নষ্ট করে ফেলবো”। (সূরা বনী ইসরাঈল: ৬২)
নবী এরশাদ করেন, যাকে মুসলমানদের দায়িত্বশীল করা হলো অথচ সে তা যথোপোযুক্তভাবে আদায় করলো না সে জান্নাতের সুঘ্রাণও পাবে না। (বুখারী ও মুসলিম)
রাসূলুল্লাহ-এর এ বাণীর ফলে সালফে সালেহীনগণ সবসময় সরকারী দায় দায়িত্ব থেকে দূরে থাকতেন। আর যদি কাউকে এ দায়িত্ব পালন করতে হতো তাহলে সে আল্লাহ ভীতি, দ্বীনদারী ও আমানতদারীর উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত কায়েম করেছেন।
ওমর ফারুক (রা)-এর যুগে হিমস শহরের গভর্নর ইয়াজ বিন গনম (রা) মৃত্যু বরণ করেন, তখন ওমর ফারুক (রা) সাঈদ বিন আমের (রা) কে হিমস শহরের গভর্নর নিযুক্ত করেন। তাতে সাঈদ অপারগতা প্রকাশ করলেন, তখন ওমর জোর করেই তাকে দায়িত্ব দিলেন। গভর্নর থাকাকালে অল্পতুষ্টি ও দুনিয়া বিমুখতায় সাঈদের অবস্থা ছিল এই যে, মাসিক বেতন পাওয়ার পর স্বীয় পরিবারের খরচের পয়সা রেখে বাকী ফকীর ও মিসকীনদের মাঝে বন্টন করে দিতেন। স্ত্রী জিজ্ঞেস করত যে আপনি বাকী পয়সা কোথায় খরচ করেন? উত্তরে তিনি বলতেন আমি তা ঋণ দিয়ে দেই। একদা ওমর ফারুক (রা) হিমসে আসলেন এবং দায়িত্বশীলদেরকে বললেন যে, এখানকার গরীব লোকদের লিষ্ট তৈরী কর, যাতে তাদের চাকুরীর ব্যবস্থা করা যায়। তাঁর নির্দেশক্রমে লিষ্ট তৈরী করা হলো, আর লিষ্টের প্রথমেই সাঈদ বিন আমের (রা)-এর নাম ছিল, ওমর (রা) জিজ্ঞেস করলেন কে এ সাঈদ? লোকেরা বলল: আমাদের গভর্ণর। তার সংসারের খরচ মিটিয়ে যা থাকে সে তা গরীব দুঃখীদের মাঝে বণ্টন করে দেয়। একথা শুনে ওমর (রা) আশ্চর্য হলেন এবং এক হাজার দীনারের একটি ব্যাগ সাঈদ (রা) এর নিকট এ নির্দেশ নামা দিয়ে পাঠালেন যে, এ টাকা নিজের ব্যক্তিগত প্রয়োজনে খরচ করো। দূত ব্যাগটি নিয়ে তাঁকে দিল, আর অনিচ্ছাসত্ত্বেই তিনি বলে ফেললেন: ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। স্ত্রী শুনে জিজ্ঞেস করল কি হয়েছে, আমীরুল মু'মিনীন ইন্তেকাল করেছেন নাকি? তিনি বললেন: না এর চেয়েও বড় ঘটনা ঘটেছে। স্ত্রী জিজ্ঞেস করল: কি কিয়ামতের কোনো আলামত দেখা দিয়েছে? তিনি বললেন: না এর চেয়েও বড় ঘটনা ঘটেছে, স্ত্রী খুব গভীরভাবে জিজ্ঞেস করল: বলুন তো মূল ঘটনাটি কি? সাঈদ (রা) বললেন: দুনিয়া ফেতনা সহ আমার ঘরে প্রবেশ করেছে: স্ত্রী বলল: চিন্তিত হবেন না বরং তার কোনো সমাধান দেখুন। গভর্ণর ব্যাগটি একদিকে রেখে নামাযে দাড়িয়ে গেলেন সারা রাত আল্লাহর নিকট কান্নাকাটি করলেন, সকাল বেলা দেখতে পেল ইসলামী সেনাদল ঘরের সামনে দিয়ে অতিক্রম করছে, তখন তিনি ব্যাগটি হাতে নিয়ে সমস্ত টাকা সৈন্যদের মাঝে বণ্টন করে দিলেন।
হুযাইফা বিন ইয়ামান (রা)-কে মাদায়েনের গভর্ণর করে পাঠানো হলো, মাদায়েনবাসীকে একত্র করে আমীরুল মু'মিনীন ওমর (রা)-এর দেয়া ফরমান পড়ে শোনালেন। হে দেশবাসী! হুযাইফা বিন ইয়ামান (রা)-কে তোমাদের আমীর নিযুক্ত করা হলো। তার নির্দেশ শোন এবং তার অনুসরণ করো। আর সে যা কিছু তোমাদের নিকট চায় তোমরা তা তাকে দাও। ফরমান পাঠ শেষ হলে, লোকেরা জিজ্ঞেস করলো আপনার কি কি প্রয়োজন তা আমাদেরকে বলুন আমরা আপনার জন্য তা ব্যবস্থা করছি। হুযাইফা বলল: আমি যতদিন এখানে থাকবো ততদিন দু'বেলা খাবার আর আমার গাধার জন্য তার আহার। এর চেয়ে বেশি কিছু আমি তোমাদের নিকট চাই না।
সরকারী উচ্চপদ থেকে পশ্চাদপসরণের যে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত ইমাম আবু হানিফা (রা) কায়েম করেছেন, ইসলামের ইতিহাস কিয়ামত পর্যন্ত তা স্মরণ করবে। আব্বাসীয় খলিফা আবু জা'ফর মানসূর তাকে ডেকে প্রধান বিচারক হিসেবে নিয়োগ দিতে চাইলেন। তখন তিনি বললেন: বিচারক এমন দুঃসাহসী হওয়া দরকার যে, বাদশা ও তার সন্তান এবং সিপাহসালারদের বিরুদ্ধেও বিচার করতে পারবে। আর আমার মধ্যে এ হিম্মত নেই। একথা শুনে বাদশা তাকে জেলে পাঠিয়ে দিল। সেখানে তাকে বেত্রাঘাতও করা হয়েছিল কিন্তু তবুও তিনি এ পদ গ্রহণ করেন নি। এমন কি জেলেই তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। এ ছিল ঐ বিশাল ব্যক্তিত্ব যারা জান্নাত ও জাহান্নামের ওপর দৃঢ় বিশ্বাস রাখতো, যার ফলে ইবলীসের কোনো চক্রান্ত তাদের পা স্পর্শ করতে পারে নি। বর্তমান সমাজের দিকে দৃষ্টি দিয়ে দেখুন যে, ইবলীস আদম সন্তানের জন্য সরকারী উচ্চপদ ও দায়িত্ব লাভের জন্য এত হন্য করে তুলেছে যে, এ ময়দানে অজ্ঞ মুর্খরা তো আছেই, বহু জ্ঞানী ব্যক্তিবর্গও ইবলীসের এ চক্রান্তে পড়ে আছে। ইসলাম, গণতন্ত্র, রাজতন্ত্র, এবং জনসেবা করা সরকারী উচ্চপদ ব্যতীত কি সম্ভব নয়? চিন্তা করুন ঐ উজ্জ্বল দৃষ্টান্তের আলোকে যে, ইবলীস আদম সন্তানকে জান্নাত থেকে বঞ্চিত করার জন্য কি কি ব্যবস্থা করে রেখেছে। এ পদ ও দায়িত্ব লাভের জন্য মিথ্যা নির্বাচন, ধোঁকাবাজি, চক্রান্ত, মিথ্যা অঙ্গিকার, ঝগড়া-বিবাদ, গালী-গালাজ, মিথ্যা অপবাদ, অভিসম্পাত, মানুষকে অনুগত বাধ্য রাখা, সাধারণ সমর্থনের বেঁচা-কেনা, ভ্রান্তি, এমনকি হত্যা ও লুটপাটের মত কবীরা গুনাহ পর্যন্ত ইবলীস মানুষের জন্য অত্যন্ত সহজ ও আরামদায়ক করে তুলেছে, আর এ মানুষ ইবলীসদের চক্রান্তে পড়ে জান্নাত থেকে বঞ্চিত হওয়ার দূর্ভাগ্যকে অন্ধভাবে মেনে নিচ্ছে।
কুরআন মাজীদে আল্লাহর এরশাদ:
إِنَّ الَّذِينَ يُحِبُّونَ أَن تَشِيعَ الْفَاحِشَةُ فِي الَّذِينَ آمَنُوا لَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ وَاللَّهُ يَعْلَمُ وَأَنْتُمْ لَا تَعْلَمُونَ
অর্থ: "যারা মু'মিনদের মধ্যে অশ্লীতার প্রসার কামনা করে তাদের জন্য আছে দুনিয়া ও আখিরাতে মর্মন্তুদ শাস্তি।" (সূরা নূর: ১৯)
ইবলীস বে-হায়া ও অশ্লীল কাজ-কর্মকে আদম সন্তানের জন্য এত মনপুত করে তুলেছে যে, আল্লাহর এ স্পষ্ট সতর্কতার পরও ইবলীসের চক্রান্তে লিপ্ত আদম সন্তান বিভিন্নভাবে বে-হায়া ও অশ্লীলতা বিস্তারে নিমগ্ন আছে।
বিভিন্ন প্রচার মাধ্যম সুন্দর সুন্দর নামে অত্যন্ত সু-বিন্নস্ত ভাবে, সরকারী বে-সরকারী অফিস আদালত, সিনেমা, টিভি, রেডিও, দৈনিক, বিভিন্ন দৈনিকের বিশেষ কোড়পত্র, সাপ্তাহিক, দৈনিক, মাসিক, অত্যন্ত আনন্দ ও গৌরবের সাথে রাত দিন ভরে ইবলীসের অনুসরণে মহাব্যস্ত আছে, অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌছেছে যে, কিছু কিছু সৎ কাজের আদেশ ও অন্যায় কাজে বাধা দেয়ার পবিত্র দায়িত্বে নিয়োজিত সাপ্তাহিক, দৈনিক এবং মাসিকও প্রতিষ্ঠান চালানোর মিথ্যা অজুহাতে, মনভোলা ভাব নিয়ে বিনা বাক্য ব্যয়ে, কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ইবলীসের বে-হায়াপনাকে বিস্তারের খেদমত আনজাম দিচ্ছে। আর তারা আল্লাহর আযাবের সতর্ক বাণীকে পিছনে ফেলে এবং শয়তানের মনোলোভা সুন্দর দলীল, আশা, আকাঙ্খায় নিমগ্ন আছে, যা তাদেরকে জান্নাত থেকে বঞ্চিত কারী এবং জাহান্নামের হকদার কারী।
অতএব হে মরদে মু'মিন হুশিয়ার! এ দুনিয়া সরাসরি ধোঁকা ও চক্রান্তের স্থান। আল্লাহর বাণী:
وَمَا الْحَيَاةُ الدُّنْيَا إِلَّا مَتَاعُ الْغُرُورِ
অর্থ: "আর পার্থিব জীবন প্রতারণার সম্পদ ব্যতীত আর কিছুই নয়।” (সূরা আলে ইমরান: ১৮৫)
এখানের আসল রূপ সেটা নয় যা বাহ্যত দেখা যাচ্ছে। দুনিয়ার জীবন যাপন এ রঙমহলের পর্দার অন্তরাল অত্যন্ত তিক্ততা ও দুর্দশা এবং পরীক্ষা রয়েছে। দুনিয়ার নায্য নিআমত ও মান-সম্মান নামক পর্দার পিছন অত্যন্ত লাঞ্ছনাময় এবং লজ্জাস্কর। রাসূলুল্লাহ -এর এ বাণী "দুনিয়ার মিষ্টতা পরকালের তিক্ততা, আর দুনিয়ার তিক্ততা পরকালের মিষ্টতা।” (ত্বাবারানী ও আহমদ)
যাকাতহীন সোনা-চাঁদীর স্তুপ সোনা-চাঁদী নয় বরং জলন্ত আগুন, সুদ, ঘুষ, জুয়া, চুরি, ডাকাতি, অন্যান্য হারাম মাধ্যম সমূহের অর্জিত সম্পদ সম্পদ নয় বরং আগুনের সাপ ও বিচ্ছু, মিথ্যা, চাল-চক্রান্তের মাধ্যমে অর্জিত পদমর্যাদা, সম্মান, গৌরব হবে আগুনের জিঞ্জির। বে-হায়াপনার মাধ্যমে বিস্তার কৃত ব্যবসা ব্যবসা নয় বরং কঠিন আযাব।
হে বনী আদম হুশিয়ার! এ দুনিয়া একটি ক্ষণস্থায়ী ঠিকানা মাত্র, যেখানে তোমাকে পরীক্ষা করা উদ্দেশ্য, তোমার মূল আবাস জান্নাত। যে দিকে তোমাকে খুব দ্রুত যেতে হবে। তোমার চীরস্থায়ী শত্রু অভিশপ্ত ইবলীস, চায় যেভাবে তোমার পিতা-মাতা আদম ও হাওয়াকে ধোঁকা ও চক্রান্তের মাধ্যমে জান্নাত থেকে বের করেছে, এমনিভাবে তোমাকেও দুনিয়ার চাল চক্রান্তে ফেলে জান্নাত থেকে বঞ্চিত করতে। মানুষের প্রতি তার উন্মুক্ত চ্যালেঞ্জ:
رَبِّ بِمَا أَغْوَيْتَنِي لَأُزَيِّنَنَّ لَهُمْ فِي الْأَرْضِ وَلَأُغْوِيَنَّهُمْ أَجْمَعِينَ
অর্থ: “হে আমার প্রতিপালক! আপনি যে আমাকে বিপদগামী করলেন, তজ্জন্য আমি পৃথিবীতে মানুষের নিকট পাপ কর্মকে অবশ্যই শোভনীয় করে তুলবো এবং আমি তাদের সকলকেই বিপথগামী করেই ছাড়বো।" (সূরা হিজর: ৩৯)
অতএব হে মরদে মু'মিন হুশিয়ার! খবরদার! অভিশপ্ত শয়তানের সমস্ত ওয়াদা মিথ্যা এবং বাতিল, তার ধোঁকায় কখনো পড়বে না। যেই তার ধোঁকায় পড়বে তাকে সে তার সাথে জাহান্নামে নিয়ে যাবে:
أَلَّا ذَلِكَ هُوَ الْخُسْرَانُ الْمُبِينُ
অর্থ: "স্মরণ রেখ এটা স্পষ্ট ক্ষতি।" (সূরা যুমার: ১৫)

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00