📘 মৃত্যুর পরে অনন্ত জীবন > 📄 জান্নাত সম্পর্কে কুরআনের ভাষ্য

📄 জান্নাত সম্পর্কে কুরআনের ভাষ্য


আল্লাহ তা'আলা কুরআন মাজীদের বিভিন্ন স্থানে জান্নাত সম্পর্কে বিস্তারিত বর্ণনা করতে গিয়ে পানি, দুধ, মদের ঝর্ণার কথা বর্ণনা করেছেন, এমনিভাবে বিভিন্ন ফল-মূল, বাগান, ঘন ছায়া, ঠাণ্ডা, পাখীর গোশত, মূল্যবান আসন, হুরেইন, বালাখানার কথা বর্ণনা করেছেন। পার্থিব দিক থেকে এ সমস্ত বিষয়সমূহ, জীবন যাপনের উপাদান বলে মনে করা হয়, তাই কোনো কোনো নাস্তিক ও বে-দ্বীন সাহিত্যিক, কবি, ইত্যাদি জান্নাতকে অত্যন্ত সাধারণ কিছু হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছে, যেন জান্নাত এমন এক আবাস স্থল যে, যেখানে প্রবেশ করা মাত্রই পৃথিবীর একমাত্র আল্লাহ ভীরু ও সংযমের সাথে জীবন যাপন কারী মুত্তাকী ব্যক্তি তার তাকওয়ার পোশাক খুলে ফেলে দিয়ে আনন্দময় অনুষ্ঠানে নিমগ্ন থাকবে। বিবাহ ও বাদ্য যন্ত্রের প্রতিধ্বনি বুলন্দ হবে। আর হুরদের ভিড়ে জান্নাতবাসীদের অন্তর শান্ত থাকবে। নৃত্যশালা তার আশেকদের ভীড়ে ভরপুর থাকবে। আর সুরাবাহীদের পদধ্বনিতে তা থাকবে আবাদময়।
মূলত জান্নাত কি এ ধরনেরই এক আবাস স্থল? আসুন জান্নাত নির্মাণকারী এবং জান্নাত সম্পর্কে ওয়াকিফহালের কাছ থেকে তা জানা যাক যে, জান্নাত কেমন? আল্লাহ কুরআন মাজীদে এরশাদ করেন যে, "জান্নাতীরা যখন জান্নাতে প্রবেশ করবে তখন তাদেরকে অভ্যার্থনা জ্ঞাপনকারী ফেরেশতা "আসসালামু আলাইকুম" বলে তাদেরকে অভ্যর্থনা জানাবে। "আপনারা অত্যন্ত ভাল থাকুন" বলে তাদেরকে স্বাগতম জানাবে। যা শ্রবণে জান্নাতীরা "আলহামদু লিল্লাহ" বলে আল্লাহর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবে। (সূরা যুমার: ৭৩-৭৩)
"জান্নাত বাসীগণ প্রতি নিঃশ্বাসে আল্লাহর তাসবীহ (সুবহানাল্লাহ) এবং প্রশংসা (আলহামদু লিল্লাহ) বলবে। যখন একে অপরের সাথে সাক্ষাত করবে তখন আসসালামু আলাইকুম বলবে। পরস্পরের কথাবার্তা শেষে (আলহামদুলিল্লাহি রাব্বিল আলামীন বলবে)" (সূরা ইউনুস: ২৫)
জান্নাতের হুরেরা নিঃসন্দেহে জান্নাতীদের জন্য তৃপ্তীদায়ক বিষয় হবে কিন্তু তারা লম্পট স্বভাব, বে-পরদা, বে-হায়া হবে না। না অন্য পুরুষের চোখে চোখ রাখবে, বরং যথেষ্ট লজ্জাবোধের অধিকারীনী, চরিত্রবান, পর্দাশীল হবে। যাদেরকে ইতিপূর্বে কোনো পুরুষ দেখেও নাই আর স্পর্শও করে নাই। শুধু স্বীয় স্বামী ভক্ত হবে। (সূরা রহমান: ২২-২৩, ৩৫-৩৭, সূরা বাকারা: ২৫)
কুরআন মাজীদের উল্লেখিত নির্দেশসমূহের আলোকে একথা বুঝতে কষ্টকর নয় যে নিঃসন্দেহে জান্নাত জীবন যাপনের আবাসস্থল, কিন্তু ঐ জীবন যাপনের কল্পনা তাকওয়া, সৎ আমল, পবিত্রতার মাপকাঠির সাথে সম্পৃক্ত যার দাবী আল্লাহ তাঁর বান্দাদের নিকট দুনিয়াতে করেছেন। যা তারা তাদের সর্বাঙ্ক সাধনার পরও যথাপোযুক্ত ভাবে হাসিল করতে পারে নি। আর আল্লাহর এ বান্দারা যখন জান্নাতে প্রবেশ করবে তখন আল্লাহ স্বীয় দয়া ও অনুগ্রহের মাধ্যমে তাদেরকে তাকওয়া, সৎ আমল, পবিত্রতার ঐ মাপকাঠি পর্যন্ত পৌঁছিয়ে দিবেন, যার দাবী তিনি তাদের নিকট দুনিয়াতে করেছিলেন। জান্নাতের এ অবস্থার কথা স্মরণে রাখুন আর চিন্তা করুন যে, কোনো এমন মুসলমান আছে, যে জান্নাতে প্রবেশ করার পর হুর, বালাখানা, খানা-পিনা ইত্যাদির পূর্বে তার ওপর বেশী অনুগ্রহ পরায়ন, পৃথিবীবাসীর নিকট পথপ্রদর্শক রূপে আগত, গুনাহগারদের জন্য সুপারিশকারী, রাহমাতুললীল আলামীন, ইমামুল আম্বিয়া, মুত্তাকীনদের সরদারের চেহারা মোবারক একবার দেখার জন্য উদগ্রীব থাকবে না? শত কোটি নয়, অসংখ্য পবিত্র আত্মা যার মধ্যে থাকবে নবীগণ, সৎ লোক, শহীদগণ, নেক্কার, উলামা, মুফতীও নবী আলাইবি-এর সালাহার যিয়ারতের অপেক্ষায় থাকবে। কোনো এমন জান্নাতী হবে, যে তার অন্তর ইসলামের বৃক্ষকে সতেজ রাখতে স্বীয় শরীরের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়েছে এমন জান্নাতের সুসংবাদ প্রাপ্ত দশজন সাহাবী, বদর ও উহুদের শহীদগণ, রাসূলের হাতে বৃক্ষের নীচে বাইয়াত গ্রহণ কারীগণ সহ অন্যান্য সাহাবাগণকে এক নযর দেখার জন্য আগ্রহী হবে না। তাবেয়ী, তাবে তাবেয়ী, তাদের পরে কিয়ামত পর্যন্ত দ্বীনের স্বার্থে জান, মাল, ইজ্জত, আবরু, ঘর-বাড়ী, কুরবান কারী কত অসংখ্য সোনার মানুষ ছিল, যাদের সাথে সাক্ষাৎ বা যাদের মজলিশে অংশগ্রহণের আগ্রহ প্রত্যেক মুসলমানের অন্তরেই থাকবে। সর্বোপরি এ সমস্ত নিআমতের চেয়ে বড় নিআমত হবে আল্লাহর সাক্ষাৎ, যার জন্য সমস্ত মু'মিন অপেক্ষমান থাকবে। নিঃসন্দেহে হুর, বালাখানা, খানা-পিনা, জান্নাতের নিআমত সমূহের মধ্যে এক প্রকার নিআমত বটে, কিন্তু তাহবে জান্নাতের জীবনের একটি অংশ মাত্র, এটাই পরিপূর্ণ জান্নাতী জীবন নয়। জান্নাতের পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন পরিবেশে জান্নাত বাসীদের জন্য হুর, বালাখানা ব্যতীত তাদের মনপুত আরো অনেক ব্যবস্থাপনা থাকবে। যার মাধ্যমে প্রত্যেকে তার ইচ্ছামত নিজেকে ব্যস্ত রাখবে। দ্বীন ও মিল্লাত থেকে বিমুখ, কুরআন ও হাদীস সম্পর্কে অজ্ঞ "পণ্ডিতবর্গ” কি করে জানবে যে জান্নাতে আল্লাহ জান্নাতবাসীদের জন্য তাদের নয়নাভিরাম মনের আত্মতৃপ্তীদায়ক হুর ও বালাখানা ব্যতীত আরো কত কি নিআমতের ব্যবস্থা করে রেখেছেন?

📘 মৃত্যুর পরে অনন্ত জীবন > 📄 জান্নাত সম্পর্কে হাদীসের উদ্ধৃতি

📄 জান্নাত সম্পর্কে হাদীসের উদ্ধৃতি


১. জান্নাতে রোগ, বার্ধক্য, মৃত্যু হবে না। (মুসলিম)
২. যদি কোনো জান্নাতী তার অলঙ্কার সহ একবার পৃথিবীর দিকে উঁকি দেয় তাহলে সূর্যের আলোকে এমনভাবে আড়াল করে দিবে যেমন সূর্যের আলো তারকার আলোকে আড়াল করে দেয়। (তিরমিযী)
৩. যদি জান্নাতের হুরেরা পৃথিবীর দিকে একবার উঁকি দেয় তাহলে পূর্ব-পশ্চিমের মাঝে যাকিছু আছে তা আলোকিত হয়ে যাবে। আর সমস্ত পৃথিবীকে সুগন্ধিময় করে দিবে। (বুখারী)
৪. জান্নাতের বালাখানাসমূহ সোনা ও চাঁদির ইট দিয়ে নির্মিত। সিমেন্ট, বালি মেশক আম্বারের সুগন্ধি যুক্ত। তার পাথরসমূহ হবে মতি ও ইয়াকুতের, আর তার মাটি হবে জাফরানের। (তিরমিযী)
৫. জান্নাতে শত স্তর আছে আর প্রত্যেক স্তরের মাঝে আকাশ ও যমীন সম দূরত্ব। (তিরমিযী)
৬. জান্নাতের ফলসমূহের একটি গুচ্ছ আকাশ ও জমীনের সমস্ত সৃষ্টিজীব খেলেও শেষ হবে না। (আহমদ)
৭. জান্নাতের একটি বৃক্ষের ছায়া এত লম্বা হবে যে, তার ছায়ায় এক অশ্বারোহী শত বছর পর্যন্ত চলেও তার শেষ প্রান্তে পৌঁছতে পারবে না। (বুখারী)
৮. জান্নাতে ধনুক সম স্থান সমস্ত পৃথিবী এবং পৃথিবীর সমস্ত নিআমত থেকেও মূল্যবান। (বুখারী)
৯. হাওযে কাওসারে সোনা-চাঁদির পেয়ালা থাকবে যার সংখ্যা আকাশের তারকা সম হবে। (মুসলিম)

📘 মৃত্যুর পরে অনন্ত জীবন > 📄 জান্নাত, জাহান্নাম এবং যুক্তির পূজা

📄 জান্নাত, জাহান্নাম এবং যুক্তির পূজা


দ্বীনের মূল ভিত্তি ওহীর জ্ঞানের ওপর। তাই ওহীর জ্ঞানের অনুসরণ সর্বদাই মানুষের জন্য মুক্তি ও পরিত্রাণের মাধ্যম। ওহীর জ্ঞানের মোকাবেলায় যুক্তির পূজা করা সর্বদাই পথভ্রষ্টতা ও ক্ষতিগ্রস্ততার মাধ্যম। আম্বিয়া কেরামের দাওয়াতে সাড়া দিয়ে যারা ওহীর নির্দেশাবলী মোতাবেক গায়েবের প্রতি ঈমান এনেছে এবং মৃত্যু ও পরকাল অর্থাৎ: হাশর, হিসাব, কিতাব, জান্নাত, জাহান্নাম, ইত্যাদি প্রতি ঈমান এনেছে, সে সফলকাম হয়েছে। পক্ষান্তরে যারা এ নির্দেশাবলীকে মুক্তির আলোকে যাঁচাই করেছে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কুরআন মাজীদের বিভিন্ন স্থানে আল্লাহ কাফিরদের যুক্তির কথা পেশ করেছেন যে, তারা বলে মৃত্যুর পর জীবিত হওয়া অসম্ভব। তাই কাফিররা নবীগণকে শুধু মিথ্যা প্রতিপন্নই করেনি বরং তাদেরকে ঠাট্টা-বিদ্রূপও করেছে। এ সম্পর্কে কুরআন মাজীদের কিছু উদ্ধৃতি :
১. أَإِذَا مِتْنَا وَكُنَّا تُرَاباً أَ ذَلِكَ رَجْعٌ بَعِيدٌ .
অর্থ: "আমাদের মৃত্যু হলে এবং আমরা মাটি হয়ে গেলে (আমরা কি পুনরুজ্জীবিত হব) সে প্রত্যাবর্তন তো সুদূর পরাহত।" (সূরা কা'ফ: ৩)
২. وَقَالَ الَّذِينَ كَفَرُوا هَلْ نَدُلُّكُمْ عَلَى رَجُلٍ يُنَبِّئُكُمْ إِذَا مُزِّقْتُمْ كُلَّ مُمَزَّقٍ إِنَّكُمْ لَفِي خَلْقٍ جَدِيدٍ - أَفْتَرَى عَلَى اللهِ كَذِباً أَمْ بِهِ جِنَّةٌ بَلِ الَّذِينَ لَا يُؤْمِنُونَ بِالْآخِرَةِ فِي الْعَذَابِ وَالضَّلَالِ الْبَعِيدِ
অর্থ: কাফিররা বলে: আমরা কি তোমাদেরকে এমন ব্যক্তির সন্ধান দিব যে, তোমাদেরকে বলে: তোমাদের দেহ সম্পূর্ণ ছিন্নভিন্ন হয়ে পড়লেও তোমরা নতুন সৃষ্টিরূপে উত্থিত হবে। সে কি আল্লাহ সম্পর্কে মিথ্যা উদ্ভাবন করে, অথবা সে কি উম্মাদ? বস্তুত যারা আখেরাতে বিশ্বাস করে না তারা আযাবে ও ঘোর ভ্রান্তিতে রয়েছে।" (সূরা সাবা: ৭-৮)
৩. وَقَالُوا إِن هَذَا إِلَّا سِحْرٌ مُّبِينٌ . أَإِذَا مِتْنَا وَكُنَّا تُرَاباً وَعِظَاماً أَإِنَّا لَمَبْعُوثُونَ - أَوَ آبَاؤُنَا الْأَوَّلُونَ - قُلْ نَعَمْ وَأَنتُمْ دَاخِرُونَ
অর্থ: "এবং তারা বলে এটাতো সুস্পষ্ট যাদু ব্যতীত আর কিছুই নয়। আমরা যখন মরে যাব এবং মাটি ও হাড্ডিতে পরিণত হবো তখনও কি আমাদেরকে পুনরুত্থিত করা হবে? এবং আমাদের পূর্ব পুরুষদেরকেও? বল: হ্যাঁ এবং তোমরা হবে লাঞ্ছিত”। (সূরা সাফ্ফাত: ১৫-১৮)
৪. وَقَالَ الَّذِينَ كَفَرُوا أَإِذَا كُنَّا تُرَاباً وَآبَاؤُنَا أَإِنَّا لَمُخْرَجُونَ - لَقَدْ وُعِدْنَا هَذَا نَحْنُ وَآبَاؤُنَا مِنْ قَبْلُ إِنْ هَذَا إِلَّا أَسَاطِيرُ الْأَوَّلِينَ
অর্থ: "কাফিররা বলে আমরা ও আমাদের প্রিয় পুরুষরা মৃত্তিকায় পরিণত হয়ে গেলেও কি আমাদেরকে পুনরুত্থিত করা হবে? এ বিষয়ে তো আমাদেরকে এবং পূর্বে আমাদের পূর্ব পুরুষদেরকেও ভীতি প্রদর্শন করা হয়েছিলো। এটা তো পূর্ববর্তী উপকথা ব্যতীত আর কিছুই নয়”। (সূরা নামল: ৬৭-৬৮)
৫. أَيَعِدُكُمْ أَنَّكُمْ إِذَا مِثْمُ وَكُنْتُمْ تُرَاباً وَعِظَاماً أَنَّكُمْ مُّخْرَجُونَ - هَيْهَاتَ هَيْهَاتَ لِمَا تُوعَدُونَ
অর্থ: "সে কি তোমাদেরকে এ প্রতিশ্রুতিই দেয় যে, তোমাদের মৃত্যু হলে এবং তোমরা মাটি ও হাড্ডিতে পরিণত হলেও তোমাদেরকে পুনরুত্থিত করা হবে? অসম্ভব, তোমাদেরকে সে বিষয়ে প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে তা অসম্ভব”?। (সূরা মু'মিনূন: ৩৫-৩৬)
আল্লাহর পক্ষ থেকে ওহীকৃত শিক্ষাকে, যুক্তির আলোকে যাঁচাইকারী পণ্ডিত বর্গ সর্বকালেই যথেষ্ট পরিমাণে ছিল, কিন্তু অতীতকালে যারা ওহীর শিক্ষাকে মিথ্যায় প্রতিপন্ন করতো তারা মুসলমান হতো না। কিন্তু বর্তমান কালে যারা ওহীর শিক্ষাকে যুক্তির আলোকে যাচাই করে ওহীর শিক্ষাকে মিথ্যা পতিপন্ন করে, তারা ঐ সমস্ত লোক যারা প্রকাশ্যে ইসলাম গ্রহণ করেছে এবং মুসলমান বলে দাবী করে। হিজরী দ্বিতীয় শতাব্দীর শুরুতে জাহাম বিন সাফওয়ান গ্রীস দর্শনে প্রতিক্রিয়াশীল হয়ে, আল্লাহর সত্তা, তাঁর গুণাবলী এবং ভাগ্য সম্পর্কে ওহীর শিক্ষাকে পরিবর্তন করে আরো অনেক লোককে সে তার সাথে পথভ্রষ্ট করেছে, যা পরবর্তীতে জাহমিয়া সম্প্রদায় নামে আখ্যায়িত হয়েছে, এমনিভাবে মোতাযিলা সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠাতা ওয়াসেল বিন আতাও ওহীর জ্ঞান বাদ দিয়ে যুক্তিকে মানদণ্ড করে পথভ্রষ্ট হয়েছে এবং বহু লোককে পথভ্রষ্ট করেছে, যাদেরকে মোতাযিলা ফেরকা বলা হয়।' হিযর, চতুর্থ শতাব্দীর মাঝামাঝি ওহীর শিক্ষার বিরুদ্ধে যুক্তির পূজারী সূফীরা বাগদাদে এক সংগঠন প্রতিষ্ঠা করলো যার নামকরণ করা হয়েছিলো, 'ইখওয়ানুসসফা' যাদের নিকট সমস্ত ধর্মীয় পরিভাষাসমূহ নবুওয়াত, রিসালাত, মালাইকা, সালাত, যাকাত, সিয়াম, হজ্জ, আখেরাত, জান্নাত, জাহান্নাম, ইত্যাদির দুটি করে অর্থ। একটি জাহেরী অপরটি বাতেনী। জাহেরী অর্থ ঐটি যা ইসলামী শরীয়তে আল্লাহর পক্ষ থেকে নাযিলকৃত ওহী মোতাবেক। আর বাতেনী ঐটি যা সূফীদের নিজস্ব যুক্তি প্রসূত। সূফীদের নিকট জাহেরী অর্থের ওপর আমলকারী মুসলমানরা জাহেলদের অন্তর্ভুক্ত, আর বাতেনী অর্থের ওপর আমলকারী মুসলমান জ্ঞানীদের অন্তর্ভুক্ত। ওহীর শিক্ষাকে পরিবর্তনকারী বাতেনী সংগঠনের এ ফিতনা আজও পৃথিবীর সকল দেশে কোনোনা কোনো সূরাতে আছেই। নিকট অতীতের স্যার সায়্যেদ আহমদ খানের উদাহরণ আমাদের সামনে আছে যে, ১৮৬৮-১৮৭০ ইং পর্যন্ত ইংলিস্থানে থেকে ফিরে এসে প্রাচ্যের সাইন্স, উন্নতি, টেকনোলজী, দেখে এতটা প্রতিক্রিয়াশীল হয়েছিল যে, আলীগড়ে এম. এ, ও, কলেজ প্রতিষ্ঠা করেছিল, আর এর লক্ষ্য উদ্দেশ্যের মধ্যে এ কথা লিখা ছিল যে, দর্শন আমাদের ডান হাত, নেচারাল সাইন্স আমাদের বাম হাত, আর লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ তাজ, যা আমাদের মাথায় থাকবে। কলেজের উদ্বোধন করিয়েছিল লর্ড লিটনের মাধ্যমে। আর কলেজের সংবিধানে একথা লিখা ছিল যে, এ কলেজের প্রিন্সিপাল সর্বদা কোনো ইউরোপীয়ান হবে। প্রাচ্যের সাইন্স ও টেকনোলজীতে প্রতিক্রিয়াশীল সাইয়্যেদ সাহেব যখন কুরআন মাজীদের তাফসীর লিখা শুরু করলেন, তখন তিনি নবীগণের মোজেজাসমূহকে যুক্তির আলোকে যাচাই করতে লাগলেন এবং সমস্ত মোজেজা সমূহকে এক এক করে অস্বীকার করতে লাগলেন। স্ব-শরীরে উপস্থিত না থাকা ফেরেশতাদেরকে অস্বীকার করতে লাগল। জান্নাত, কবরের আযাব, কিয়ামতের আলামত, যেমন: দাব্বাতুল আরয (মাটি ফেটে প্রাণীর আগমন) ঈসা (আ) এর আগমন, সূর্য পূর্বদিক থেকে উঠা, ইত্যাদি অস্বীকার করতে লাগলো। জান্নাত, জাহান্নামের অস্ত ীত্ব অস্বীকার করলো। আর ওহীর শিক্ষা থেকে দূরে সরে শুধু সে নিজেই পথভ্রষ্ট হয় নি বরং তার পিছনে যুক্তির পূজারীদের এমন একদল রেখে গেছে, যারা সর্বদাই উম্মতকে নাস্তিকতার বিষবাষ্প ছড়িয়ে দেয়ার গুরু দায়িত্ব পালন করছে।
আমাদের একথা স্বীকার করতে কোনো দিধা নেই যে, পৃথিবীতে জান্নাত ও জাহান্নামের বাস্তব অবস্থা সম্পর্কে সবিস্তারিত বুঝা আসলেই অসম্ভব। যুক্তির আলোকে তা পরিপূর্ণভাবে যাচাই করা যাবে না। কিন্তু প্রশ্ন হলো যে, কোনো জিনিষ যুক্তিতে না ধরাই কি তা অস্বীকার করার জন্য যথেষ্ঠ? আসুন বিজ্ঞান ও যুক্তির আলোকেই এ প্রশ্নের উত্তর খোঁজা যাক।
সর্বশেষ বিজ্ঞানের আবিস্কার অনুযায়ী:
১. আমাদের পৃথিবী সর্বদা ঘুরছে, একভাবে নয় বরং দু'ভাবে। প্রথমত নিজের চতুপার্শ্বে দ্বিতীয়ত, সূর্যের চতুর্পার্শ্বে।
২. সূর্য স্থির যা শুধু তার চতুপার্শ্বে ঘুরছে।
৩. পৃথিবী থেকে সূর্যের দূরত্ব ৯ কোটি ৩০ লক্ষ মাইল।
৪. সূর্যের দেহ পৃথিবীর মোকাবেলায় ৩ লক্ষ ৩৭ হাজার গুণ বেশি।
৫. আমাদের সৌর জগৎ থেকে ৪শ কোটি কি.মি. দূরত্বে আরো একটি সূর্য আছে, যা আমাদের নিকট ছোট একটি আলোকরশ্মি বলে মনে হয়। তার নাম আলফাদেনতুরস (Alfagentaurisa) 1
৬. আমাদের সৌর জগৎ এর বাহিরে অন্য একটি তারকার নাম কালব আকরাব (Atntares) তার ব্যাস ২৮ কোটি ৩০ লক্ষ মাইল প্রায়।
চিন্তা করুন বাস্তবেই কি আমাদের অনুভূতি হচ্ছে যে, পৃথিবী আমাদের চতুর্পার্শ্বে ঘুরছে? বাহ্যত পৃথিবী পরিপূর্ণভাবে স্থির আছে, আর তার সামান্য কম্পন পৃথিবীবাসীকে তছনছ করে দেয়ার জন্য যথেষ্ট। অথচ বলা হচ্ছে যে পৃথিবী দু'ভাবে ঘুরে বলে বিশ্বাস কর?
বাস্তবেই কি সূর্য আমাদের নিটক স্থির বলে মনে হয়? প্রত্যেক মানুষ স্ব চোখে প্রত্যক্ষ করছে যে, সূর্য পূর্ব দিক থেকে উদিত হয়ে আস্তে আস্তে চলতে চলতে পশ্চিমে গিয়ে অস্ত যাচ্ছে।
বাস্তবেই কি সূর্য পৃথিবীর তুলনায় ৩ লক্ষ ৩৭ হাজার গুণ বড় বলে মনে হয়। বরং প্রত্যেক ব্যক্তিই দেখতে পায় যে, সূর্য নয় বা দশ মিটারের একটি আলোকরশ্মি। মানবিক জ্ঞান কি একথা বিশ্বাস করে যে, আমাদের এ সৌর জগৎ এর বাহিরে, কোটি কি. মি. দূরে আরো একটি সূর্য আছে, যা আমাদের এ পৃথিবী ও সূর্যের তুলনায় লক্ষ গুণ বড়? এ সমস্ত কথা শুধু বাস্তব দেখা বিরোধিই নয় বরং বিবেক সম্মতও নয়। কিন্তু এতদসত্ত্বেও আমরা তা শুধু এ জন্যই বিশ্বাস করি যে, বিজ্ঞানীগণ তাদের গবেষণার মাধ্যমে এসমস্ত তথ্য দিয়ে থাকে। এর পরিষ্কার ও স্পষ্ট ব্যাখ্যা ছিল এই যে, কোনো জিনিষ বিবেক সম্মত না হওয়ায় তা অস্বীকার করা সম্পূর্ণ ভুল। এমনিভাবে জান্নাত ও জাহান্নামের অস্তিত্ব এবং তার বিস্তারিত অবস্থা মানবিক জ্ঞান সম্মত না হওয়ায় তা অস্বীকার করা সম্পূর্ণই ভ্রান্তি, ভুল দর্শন, যা শুধু শয়তানী চক্রান্ত মাত্র। নিউটন ও আইনষ্টাইন এর সূত্র সমূহ যদি বুঝে না আসে তাহলে আমরা তখন শুধু আমাদের স্বল্প জ্ঞান এবং কমবুদ্ধির কথাই স্বীকার করিনা বরং উল্টা তাদের জ্ঞান বুদ্ধির প্রশংসায় পঞ্চমুখও হই। অথচ আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের পক্ষ থেকে আসা বিষয়সমূহ যুক্তি সম্মত না হলে তখন শুধু তা অস্বীকার করি না বরং উল্টো সেটা খণ্ডন ও করি। এর অর্থ এছাড়া আর কি হতে পারে যে, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের কথার উপর আমাদের এতটুকু ঈমানও নেই যতটা ঈমান আইনস্টাইন ও নিউটনের গবেষণার ওপর আছে। বাস্ত বতা হলো এই যে, জান্নাত ও জাহান্নামের অস্তিত্ব এবং এ ব্যাপারে বর্ণিত গুণাবলি পরিপূর্ণ রূপে মানার একমাত্র দলিল হলো এই যে, “গায়েবের প্রতি বিশ্বাস” যাকে আল্লাহ কুরআন মাজীদের মানুষের হিদায়াতের জন্য প্রথম শর্ত হিসেবে উল্লেখ করেছেন। আল্লাহর বাণী-
ذٰلِكَ الْكِتٰبُ لَا رَيْبَۛ فِيْهِۛ هُدًى لِّلْمُتَّقِيْنَۙ۝
الَّذِيْنَ يُؤْمِنُوْنَ بِالْغَيْبِ وَيُقِيْمُوْنَ الصَّلٰوةَ وَمِمَّا رَزَقْنٰهُمْ يُنْفِقُوْنَ۝
অর্থঃ “এটা ঐ গ্রন্থ যার মধ্যে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। মুত্তাকীদের জন্য এটা হিদায়াত। যারা গায়েবের প্রতি বিশ্বাস করে, নামায প্রতিষ্ঠা করে এবং আমি তাদেরকে যে উপজীবিকা প্রদান করেছি তা থেকে তারা দান করে থাকে। (সূরা বাক্বারা: ২-৩)
এর স্পষ্ট অর্থ হলো এই যে, গায়েবের প্রতি যার ঈমান যত মজবুত হবে, জান্নাত ও জাহান্নামের প্রতি তার বিশ্বাসও ততো মজবুত হবে। আর গায়েবের প্রতি যার ঈমান যত দুর্বল হবে, জান্নাত ও জাহান্নামের প্রতি তার বিশ্বাসও ততো দুর্বল হবে।
অতএব যার বিবেক জান্নাত ও জাহান্নামের অস্তিত্ব মেনে নিতে প্রস্তুত নয় তার উচিত বিবেকের চিন্তা না করে ঈমানের চিন্তা করা। ঈমানদারগণের আমল অত্যন্ত স্পষ্ট। যাদের সম্পর্কে স্বয়ং আল্লাহ বলেছেন:
رَبَّنَا إِنَّنَا سَمِعْنَا مُنَادِيًا يُّنَادِىْ لِلْاِيْمَانِ اَنْ اٰمِنُوْا بِرَبِّكُمْ فَاٰمَنَّا
অর্থঃ “হে আমাদের প্রভু! নিশ্চয়ই আমরা এক আহ্বানকারীকে আহ্বান করতে শুনেছিলাম যে, তোমার স্বীয় প্রতিপালকের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করো, তাতেই আমরা বিশ্বাস স্থাপন করেছি। (সূরা আলে ইমরান: ৩:১৯৩)

টিকাঃ
১ উল্লেখ্য, জাহমিয়া এবং মো'তাযিলা উভয়ে আল্লাহর গুণাবলী যার বর্ণনা কুরআনে স্পষ্ট ভাবে এসেছে, যেমন, আল্লাহর হাত, পা, চেহারা, পায়ের গোছা ইত্যাদিকে অস্বীকার করেছে, এমনিভাবে সমস্ত আয়াত ও হাদীসের অপব্যাখ্যা করেছে, আর তাকদীরের ব্যাপারে জাহমিয়াদের আকীদা হল মানুষ বাধ্য। আর সমস্ত হাদীস ও আয়াত যেখানে মানুষকে আমল করার কথা বলা হয়েছে, তারা তার বিভিন্নভাবে অপব্যাখ্যা করেছে, মোতাযিলারা তাকদীরের ব্যাপারে মানুষ স্বইচ্ছাধীন বলে বিশ্বাস করে।)

📘 মৃত্যুর পরে অনন্ত জীবন > 📄 জান্নাতের পরিমীমা ও জীবন যাপন

📄 জান্নাতের পরিমীমা ও জীবন যাপন


আরবী ভাষায় জান্নাত বলা হয় বাগানকে। এর বহুবচন আসে جَنّات এবং جِنان (বাগানসমূহ)। এ জান্নাতের পরিসীমা কতটুকু? তার যথাযথ পরিসীমা সুনির্দিষ্ট করে বলা শুধু কষ্টকরই নয় বরং অসম্ভবও বটে। কুরআন মাজীদে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন:
فَلَا تَعْلَمُ نَفْسٌ مَّا أُخْفِي لَهُم مِنْ قُرَّةٍ أَعْيُنٍ جَزَاءً بِمَا كَانُوا يَعْمَلُونَ
অর্থ: "কেউই জানে না তার জন্য নয়ন প্রীতিকর কি লুকায়িত রাখা হয়েছে, তাদের কৃতকর্মের পুরস্কার স্বরূপ।" (সূরা সাজদা: ১৭)
কুরআন ও হাদীস চর্চা করার পর যাকিছু বুঝা যায় তার সারমর্ম হলো এই যে, জান্নাত আল্লাহ প্রদত্ত এমন এক রাজ্য হবে যা আমাদের এ পৃথিবীর তুলনায় কোনো অতিরঞ্জন ব্যতীতই বলা যেতে পারে যে, আমাদের এ পৃথিবীর তুলনায় বহুগুণ বেশি প্রশস্ত হবে। জান্নাতের বিশাল আয়তনের কোনো ছোট একটি অংশই আমাদের পৃথিবীর সমান হবে। জান্নাতে সর্বশেষ প্রবেশকারী সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন যে, যখন আল্লাহর পক্ষ থেকে তাকে জান্নাতে প্রবেশের অনুমতি দেয়া হবে, তখন সে আরয করবে হে আল্লাহ! এখন তো সব জায়গা পরিপূর্ণ হয়ে গেছে, আমার জন্য আর কি বাকী আছে? আল্লাহ বলবেন: যদি তোমাকে পৃথিবীর কোনো সর্ববৃহৎ বাদশার রাজত্বের সমান স্থান দেয়া হয় তাতে কি তুমি খুশী হবে? তখন বান্দা বলবে হ্যাঁ হে আল্লাহ! কেন হব না? আল্লাহ তখন বলবেন যাও জান্নাতে তোমার জন্য পৃথিবীর সর্ববৃহৎ রাজ্যের সমান এবং এর চেয়ে অধিক আরো দশগুণ স্থান দেয়া হলো। (মুসলিম)
জান্নাতে সর্বশেষ প্রবেশকারীকে এতটুকু স্থান দেয়ার পরও জান্নাতে এতস্থান বাকী থেকে যাবে যে, তা পরিপূর্ণ করার জন্য আল্লাহ অন্য এক মাখলুক সৃষ্টি করবেন। (মুসলিম)
জান্নাতের স্তরসমূহের কথা বর্ণনা করতে গিয়ে রাসূলূল্লাহ ﷺ বলেন: তার শত স্তর আছে। আর প্রত্যেক স্তরের মাঝে আকাশ ও পৃথিবী সম দূরত্ব রয়েছে। (তিরমিযী)
জান্নাতের ছায়াবান বৃক্ষসমূহের কথা বর্ণনা করতে গিয়ে রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন: যে, একটি বৃক্ষের ছায়া এত লম্বা হবে যে, কোনো অশ্বারোহী শত বছর পর্যন্ত তার ছায়ায় চলার পরও সে ছায়া শেষ হবে না। (বুখারী)
সূরা দাহারের ২০নং আয়াতে আল্লাহ্ ইরশাদ করেন: জান্নাতের যেদিকেই তোমরা তাকাও না কেন নিআমত আর নিআমতই তোমাদের চোখে পড়বে। আর এক বিশাল রাজ্যের আসবাবপত্র তোমাদের চোখে পড়বে। দুনিয়াতে কোনো ব্যক্তি যত ফকীরই হোকনা কেন যখন সে তার সৎ আমল নিয়ে জান্নাতে প্রবেশ করবে, তখন সে সেখানে এমন অবস্থায় থাকবে, যেন সে বৃহৎ কোনো রাজ্যের বাদশাহ্। (তাফহীমুল কুরআন খ. ৬, পৃ. ২০০)
উল্লিখিত আয়াত ও হাদীসের আলোকে এ অনুমান করা কষ্টকর নয় যে, জান্নাতের সীমারেখা নির্ধারণ করা তো দূরের কথা এমনকি ঐ সম্পর্কে চিন্তা করাও মানুষের জন্য সম্ভব নয়।
জান্নাতে মানুষ কি ধরণের জীবন যাপন করবে? জান্নাতীদের ব্যক্তিগত গুণাগুণ কি হবে? তাদের পারিবারিক জীবন কেমন হবে? তাদের খানা-পিনা, থাকা কেমন হবে, যদিও এ ব্যাপারেও সুনির্দিষ্ট করে বলা সম্ভব নয়, এরপরও কুরআন ও হাদীস থেকে যা স্পষ্টভাবে প্রমাণিত তার আলোকে জান্নাতী জিন্দেগীর কোনো কোনো অংশের বিস্তারিত বর্ণনা নিম্নরূপ:
১. শারিরীকি গুণাগুণ: জান্নাতীদের চেহারা আলোকময় হবে। চক্ষুদ্বয় লাজুক হবে। মাথার চুল ব্যতীত শরীরের আর কোথাও কোনো চুল থাকবে না। এমন কি দাড়ী-গোফও থাকবে না। বয়স ৩০-৩৩ বছরের মাঝামাঝি হবে। উচ্চতা মোটামুটি ৯ ফিটের মত হবে। জান্নাতবাসী সর্বপ্রকার নাপাকী থেকে পবিত্র থাকবে, এমন কি থুথু এবং নাকের পানিও আসবে না। ঘাম হবে কিন্তু তা মেশক আম্বরের ন্যায় সুঘ্রাণ যুক্ত থাকবে। জান্নাতবাসীগণ সর্বদা আরাম আয়েশ ও হাশি খুশি থাকবে। কারো কখনো চিন্তা, ব্যাথা, বিরক্ত ও ক্লান্ত বোধ থাকবে না। জান্নাতবাসীগণ সর্বদা সুস্থ থাকবে। তারা কখনো অশুস্থ, বৃদ্ধ, মৃত্যু হবে না। জান্নাতী মহিলাদের যে গুণাবলীর কথা কুরআনের বার বার এসেছে তা হলো এই যে, জান্নাতী রমণী অত্যন্ত লজ্জাশীল হবে, দৃষ্টি নিম্নমুখী থাকবে। সৌন্দর্যে তারা মুক্তা ও প্রবালকেও হার মানাবে। নবী বলেন: জান্নাতী রমণীগণ যদি ক্ষণিকের জন্যও পৃথিবীতে দৃষ্টিপাত করে তাহলে পূর্ব পশ্চিমের মাঝে যা কিছু আছে সব কিছুকে আলোকময় করে তুলবে এবং পূর্ব পশ্চিমের মাঝে যত খালী জায়গা আছে তা সুগন্ধিময় করে তুলবে। (বুখারী)
২. পারিবারিক জীবন: জান্নাতে কোনো ব্যক্তি একাকী থাকবে না। প্রত্যেকেরই দু'জন করে স্ত্রী থাকবে, আর এ দু'স্ত্রী আদম সন্তানদের মধ্য থেকে হবে। (ইবনে কাসীর)
পৃথিবীর এ মহিলাদেরকে জান্নাতে প্রবেশ করানোর পূর্বে আল্লাহ তাদেরকে আরেকবার নতুন করে সৃষ্টি করবেন। আর তখন তাদেরকে ঐ সৌন্দর্য প্রদান করবেন যা জান্নাতে বিদ্যমান হুরদেরকে দেয়া হয়েছে। এ নারীদেরকে নতুন করে সৃষ্টি করার পর তাদেরকে কোনো জ্বিন ও ইনসান স্পর্শও করে নি। তারা তাদের স্বামীদের সম বয়সী ও লাজুক, পর্দাশীল, অত্যন্ত স্বামী ভক্ত হবে। জান্নাতীরা তাদের সুযোগ মত স্বীয় স্ত্রীগণের সথে ঘন শীতল ছায়ায় প্রবাহমান নদীর তীরে সোনা-চান্দী ও মুক্তার নির্মিত আসনসমূহে বসে আনন্দময় গল্পে মেতে উঠবে। খানা-পিনার জন্য মহিলাদের কষ্ট করতে হবে না। বরং তারা যা কিছু চাইবে মুক্তার ন্যায় সুন্দর ও বুদ্ধিমান খাদেম তা তাদের সামনে সাথে সাথে পেশ করবে। একই খান্দানের নিকট আত্মীয়গণ যেমন: পিতা-মাতা, দাদা-দাদী, নানা-নানী, ছেলে-মেয়ে, নাতী-নাতনী, ইত্যাদি যদি জান্নাতে স্তরের দিক থেকে একে অপর থেকে দূরবর্তীতে থাকে তবে আল্লাহ স্বীয় অনুগ্রহে তাদেরকে পরস্পরের নিকটবর্তী করে দিবেন। (সুবহানাল্লাহী বিহামদিহি ওয়া সুবহানাল্লাহিল আযীম)
৩. খানা-পিনা: জান্নাতে প্রবেশ করার পর জান্নাত বাসীগণকে সর্বপ্রথম মাছের কলিজা দিয়ে আপ্যায়ন করানো হবে। এরপর গরুর গোশত দিয়ে আপ্যায়ন করানো হবে। আর পানীয় হিসেবে প্রথমে দেয়া হবে, 'সাল সাবীল' নামক ঝর্ণার পানি। যা আদার স্বাদ মিশ্রিত হবে। সর্বপ্রকার সুস্বাদু ফল যেমন আঙ্গুর, আনার, খেজুর, কলা ইত্যাদির কথা বিশেষভাবে কুরআনে উল্লেখ রয়েছে, এরপরও আরো থাকবে সর্বপ্রকার সুস্বাদু ও সুগন্ধিময় পানীয় যেমন: দুধ, মধু, কাউসারের পানি, আদা বা কাফুরের স্বাদ মিশ্রিত পানি। বিশেষভাবে উল্লেখ্য হলো জান্নাতীদের সম্মানার্থে সোনা, চান্দী ও কাঁচের তৈরী পাত্রসমূহ সরবরাহ করা হবে। খানা-পিনার স্বাদ কখনো নষ্ট হবে না। বরং সর্বক্ষণই তরু-তাজা নতুন নতুন খানা-পিনা থেকে কোনো প্রকার গন্ধ, ঝাল, ঠাণ্ডা বা খারাপ নেশাদার হবে না। জান্নাতী নিজে যদি কোনো গাছের ফল খেতে চায় তাহলে স্বয়ং ঐ ফল তার হাতের নাগালে চলে আসবে। কোনো পাখীর গোশত খেতে চাইলে তখনই প্রস্তুত করে তার সামনে পেশ করা হবে। জান্নাতের এ সমস্ত নিআমত চিরস্থায়ী হবে। তাতে কখনো কোনো কমতি দেখা দিবে না। আর কখনো শেষও হবে না। না তা কোনো বিশেষ মৌসুমের সাথে সম্পৃক্ত থাকবে। আরো বড় বিষয় হলো এই যে, এ নিআমত সমূহ পাওয়ার জন্য জান্নাতীকে কারো কাছ থেকে কোনো অনুমতি নিতে হবে না। যে জান্নাতী যখন চাইবে যে পরিমাণে চাইবে স্বাধীনভাবে সে তা হাসিল করতে পারবে। আর আল্লাহর এ বাণীরও এ অর্থই:
لَّمَقْطُوعَةٍ وَلَا مَمْنُوعَةٍ
অর্থঃ “জান্নাতের নিয়ামতসমূহের ধারাবাহিকতা কখনো ছিন্ন হবে না আর না তা নিষিদ্ধ হবে।” (সূরা ওয়াকিয়াঃ ৩৩)
৪. বসবাসঃ জান্নাতে প্রত্যেক দম্পতির জন্য পৃথক ও প্রশস্ত রাজ্য থাকবে যার ঘরসমূহ নির্মিত সোনা-চাঁদীর ইট এবং উন্নতমানের সুগন্ধি দিয়ে। ঘরের পাথরসমূহ হবে মুক্তা ও ইয়াকুতের, আর তার মাটি হবে জাফরানের (তিরমিযী)। প্রত্যেক জান্নাতীকে তার স্তর অনুযায়ী দু’টি করে প্রশস্ত বাগান দান করা হবে। উভয় বাগান স্বর্ণ নির্মিত হবে, যার প্রতিটি জিনিস স্বর্ণের হবে। সমস্ত আসবাবপত্র স্বর্ণের হবে, গাছ-পালা স্বর্ণের হবে। আসনসমূহ স্বর্ণের হবে। প্লেটসমূহ স্বর্ণের হবে। এমনকি চিরুনীসমূহও স্বর্ণের হবে। সাধারণ নেককারগণকেও দু’টি প্রশস্ত বাগান প্রদান করা হবে। কিন্তু তাদের বাগান হবে চাঁদি নির্মিত। অর্থাৎ তার সব কিছু চাঁদির হবে। ঐ বাগানসমূহে সুউচ্চ বালাখানা সমূহ থাকবে। সেখানে সবুজ রেশমের কার্পেটে মূল্যবান আসনসমূহ থাকবে। প্রতিটি ঘর এত প্রশস্ত হবে যে, তার এক একটি থামার প্রশস্ত হবে ৬০ মাইল। জান্নাতের নদীসমূহের মধ্যে প্রত্যেক নদীর একটি ছোট শাখা প্রত্যেক ঘরে প্রবাহমান থাকবে। ঘরের বিভিন্ন স্থানে আঙ্গুর খানিক থাকা থাকবে যার মধ্য থেকে চন্দনের যাদুময় সুঘ্রাণ এসে সমস্ত বাড়ীর ফাঁকা জায়গা সমূহকে সুগন্ধিময় করে দিবে। এ ধরনের ঘর, ঝীমা, নদী, ঝর্ণাঝরা, সম্পন্ন পরিবেশে জান্নাতীরা জীবন যাপন করবে।
৫. পোশাকঃ জান্নাতীদেরকে বর্তমান রেশমের চেয়ে কয়েকগুণ মূল্যবান রেশম দেয়া হবে। যার ব্যবহার থেকে পৃথিবীতে তাদেরকে নিষেধ করা হয়েছিল। রেশম ব্যতীত আরো বিভিন্ন ধরনের মূল্যবান চাক-চিক্যমান পোশাক, যার মধ্যে সুন্দুস, ইস্তেবরাক, ইতলাস (বিভিন্ন প্রকার রেশমের নাম) উল্লেখ হয়েছে। এ সুযোগও থাকবে যে, জান্নাতে মহিলারা ব্যতীত পুরুষরাও সোনা-চাঁদির অলঙ্কার ব্যবহার করবে। উল্লেখ্য যে, জান্নাতে ব্যবহৃত স্বর্ণ পৃথিবীর স্বর্ণের চেয়ে বহুগুণ উন্নত হবে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: যদি একজন জান্নাতী পুরুষ তার অলঙ্কারসমূহ সহ পৃথিবীতে উকি দেয় তাহলে তার অলঙ্কারের চমক সূর্যের আলোকে এমনভাবে ঢেকে দিবে যেমন সূর্যের আলো তারকার আলোকে ঢেকে দেয়। (তিরমিযী)
সোনা-চাঁদি ব্যতীত আরো অন্যান্য প্রকার মুক্তা ও প্রবালের অলঙ্কারও জান্নাতীদেরকে পরানো হবে। জান্নাতী মহিলাদেরকে এত সুন্দর ও হালকা পোশাক পরানো হবে যে, কোনো কোনো সময় সতর আবরিত করে পোশাক পরিধান করা সত্ত্বেও তার পায়ের গোছার মজ্জা পর্যন্ত দেখা যাবে। (বুখারী)
মহিলাদের সাধারণ পোশাকও এত মূল্যবান হবে যে মাথার উড়নাও পৃথিবী এবং পৃথিবীতে যা কিছু আছে তার চেয়েও মূল্যবান হবে। (বুখারী) জান্নাতীদের পোশাক কখনো পুরান হবে না। কিন্তু তারা তাদের ইচ্ছামত যখন খুশী তখন তা পরিবর্তন করতে পারবে।
هَذَا مَا تُوعَدُونَ لِكُلِّ أَوَّابٍ حَفِيظٌ
অর্থ: "এরই প্রতিশ্রুতি তোমাদেরকে দেয়া হয়েছিল, প্রত্যেক আল্লাহভীরু ও হেফাযত কারীর জন্য।" (সূরা ক্বাফ: ৩২)
* আল্লাহর সন্তুষ্টি: জান্নাতে উল্লেখিত সমস্ত নিআমতের চেয়ে সবচেয়ে বড় নিআমত হবে, স্বীয় স্রষ্টা, মালিক, রিযিক দাতার সন্তুষ্টি। যার উল্লেখ কুরআন মাজীদের বহু জায়গায় করা হয়েছে,
لِلَّذِينَ اتَّقَوْا عِنْدَ رَبِّهِمْ جَنَّاتٌ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ خَالِدِينَ فِيهَا وَأَزْوَاجٌ مُطَهَّرَةٌ وَرِضْوَانٌ مِنَ اللَّهِ
অর্থ: "যারা আল্লাহভীরু তাদের জন্য তাদের প্রতিপালকের নিকট জান্নাত রয়েছে, যার নিম্নে স্রোতম্বিনীসমূহ প্রবাহিত, তন্মধ্যে তারা সদা অবস্থান করবে এবং সেখানে পবিত্র সহধর্মিনীগণ এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি রয়েছে।" (সূরা আলে ইমরান: ১৫) আরো এরশাদ হয়েছে:
وَعَدَ اللهُ الْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَاتِ جَنَّاتٍ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ خَالِدِينَ فِيهَا وَمَسَاكِنَ طَيِّبَةً فِي جَنَّاتِ عَدْنٍ وَرِضْوَانٌ مِّنَ اللَّهِ أَكْبَرُ
অর্থ: "আল্লাহ মু'মিন পুরুষ ও মু'মিন নারীদেরকে এমন উদ্যানসমূহের ওয়াদা দিয়েছেন যার নিম্নদেশে বইতে থাকবে নহরসমূহ। যে (উদ্যান) গুলোর মধ্যে তারা অনন্তকাল থাকবে, আরো (ওয়াদা দিয়েছেন) ঐ উত্তম বাসস্থান সমূহের যা চিরস্থায়ী উদ্যানসমূহে অবস্থিত হবে। আর আল্লাহর সন্তুষ্টি হচ্ছে সর্বাপেক্ষা বড় নিআমত। আর এটা হচ্ছে অতি বড় সফলতা।" (সূরা তাওবা: ৭২)
সূরা তাওবার আয়াতে আল্লাহ নিজেই স্পষ্ট করেছেন যে, জান্নাতের সমস্ত নিআমত সমূহের মধ্যে আল্লাহর সন্তুষ্টি সবচেয়ে বড় নিআমত। উল্লিখিত আয়াতের তাফসীরে রাসূলুল্লাহ বলেন: আল্লাহ জান্নাতীদেরকে লক্ষ্য করে বলবেন: হে জান্নাতীরা! জান্নাতীরা বলবে হে আমাদের রব। আপনার নিকট আমরা উপস্থিত আছি। আর আপনার অনুসরণের মধ্যে রয়েছে সার্বিক কল্যাণ। আল্লাহ আবার বলবেন: এখন কি তোমরা সন্তুষ্ট হয়েছেন? জান্নাতীরা বলবে হে আমাদের প্রভু! আমরা কেন সন্তুষ্ট হবনা। তুমি আমাদেরকে এমন এমন নিআমত দান করেছো যা তোমার সৃষ্টি জীবের মধ্যে কাউকে দাওনি। আল্লাহ বলবেন আমি কি তোমাদেরকে ঐ নিআমত দিব না, যা এ সমস্ত নিআমত থেকে উত্তম? জান্নাতীরা বলবে হে আমাদের প্রভু সেটা কোন্ নিআমত যা এ সমস্ত নিআমত থেকেও উত্তম? আল্লাহ বলবে: আমি তোমাদেরকে আমার সন্তুষ্টির মাধ্যমে সম্মানিত করবো। আজ থেকে আর কখনো আমি তোমাদের প্রতি অসন্তুষ্ট হবো না। (বুখারী, মুসলিম)
তাদের কতইনা সৌভাগ্য যারা আল্লাহর সন্তুষ্টি হাসিল করবে এবং তাঁর রাগ থেকে মুক্তি পাবে। আর ঐ সমস্ত লোকদের কতইনা দূর্ভাগ্য যারা আল্লাহর সন্তুষ্টি থেকে মাহরুম হবে আর তাঁর গজবের হকদার হবে।
(আল্লাহ সমস্ত মসুলমানদেরকে দুনিয়া ও আখেরাতে তাঁর অনুগ্রহের মাধ্যমে স্বীয় সন্তুষ্টির মাধ্যমে সম্মানিত করুন এবং তাঁর অসন্তুষ্টি থেকে মুক্তি দিন আমীন)। আল্লাহর সাক্ষাৎ: অন্যান্য মাসলা মাসায়েলের ন্যায় আল্লাহর সাক্ষাৎ এ বিষয়েও মুসলমানরা অতিরিক্ত ও কমতির দিক থেকে বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়েছে। একদল তো মোরাকাবা ও মোশাহাদার মাধ্যমে দুনিয়াতেই আল্লাহর সাক্ষাতের দাবী করেছে। আবার কোনো কোনো দল কুরআনের আয়াত:
لَّا تُدْرِكُهُ الْأَبْصَارُ وَهُوَ يُدْرِكُ الْأَبْصَارَ
অর্থ: "তাঁকে কোনো দৃষ্টি পরিবেষ্টন করতে পারে না আর তিনি সকল দৃষ্টি পরিবেষ্টন কারী। (সূরা আনআম: ১০৩)
অনেকে এ আয়াতের আলোকে পরকালে আল্লাহর সাক্ষাৎকে অস্বীকার করেছে। কিতাব ও সুন্নাত থেকে প্রমাণিত আকীদা এই যে, যে কোনো মানুষের জন্য, চাই সে নবীই হোক না কেন, এ পৃথিবীতে আল্লাহর সাক্ষাৎ সম্ভব নয়। কুরআন মাজীদে মূসা (আ)-এর ঘটনা অত্যন্ত পরিষ্কার করে বর্ণনা করা হয়েছে, যখন তিনি ফেরাউনের হাত থেকে মুক্তি পাওয়ার পর বনী ইসরাঈলকে সাথে নিয়ে সীনা নামক দ্বীপে পৌঁছলেন তখন আল্লাহ তাকে তুর পাহাড়ে ডাকলেন। আর সেখানে চল্লিশ দিন অবস্থান করার পর, তাকে তাওরাত দান করলেন। তখন মূসা (আ) আল্লাহর দিদারের আগ্রহ করলো, তাই তিনি আরয করলেন:
رَبِّ أَرِنِي أَنظُرْ إِلَيْكَ
অর্থ:"হে আমার প্রভু! আমাকে অনুমতি দাও যেন আমি তোমাকে দেখতে পাই।" আল্লাহ উত্তরে বললেন: হে মূসা! তুমি আমাকে কখনো দেখতে পাবে না। তবে তুমি সামনের পাহাড়ের দিকে তাকাও যদি তা স্বস্থানে স্থির থাকতে পারে, তা হলে তখন তুমিও আমাকে দেখতে পাবে। অতপর তার প্রতিপালক যখন পাহাড়ের ওপর আলোক সম্পাৎ করলেন, তখন তা পাহাড়কে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিল। আর মূসা (আ) সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়ে গেল, যখন তার চেতনা ফিরে আসল, তখন সে বলল আপনি মহিমাময়, আপনি পবিত্র সত্তা, আমি তওবা করছি। আমিই সর্বপ্রথম (গায়েবের প্রতি) ঈমান আনলাম। (বিস্তারিত দেখুন সূরা আরাফ: ১৪৩)
এ ঘটনা থেকে একথা স্পষ্ট হয় যে, দুনিয়াতে আল্লাহর দীদার সম্ভবই না। মেরাজের ঘটনা সম্পর্কে রাসূলূল্লাহ -এর ব্যাপারে আয়েশা (রা) এর বর্ণনাও এ আকীদার কথাই প্রমাণ করে, তিনি বলেন, যে ব্যক্তি বলে মুহাম্মদ স্বীয় রবের সাথে সাক্ষাৎ করেছে সে মিথ্যুক। (বুখারী ও মুসলিম)
এ দুনিয়ায় যখন নবীগণ আল্লাহকে দেখতে পারে নি, তাহলে উম্মতের কোনো ব্যক্তির এ দাবী করা যে, সে আল্লাহর সাক্ষাৎ লাভ করেছে তা মিথ্যা ব্যতীত আর কি হতে পারে? পরকালে আল্লাহর সাক্ষাৎ কুরআন ও সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। আল্লাহর বাণী:
لِلَّذِينَ أَحْسَنُوا الْحُسْنَى وَزِيَادَةٌ
অর্থ: "নেককারদের জন্য উত্তম প্রতিদান ব্যতীতও আরো প্রতিদান থাকবে।" (সূরা ইউনুস: ২৬)
এ আয়াতের তাফসীরে সুহাইব রূমী (রা) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন রাসূলুল্লাহ এ আয়াত পাঠ করেছেন এবং বলেছেন: যখন জান্নাতীরা জান্নাতে এবং জাহান্নামীরা জাহান্নামে চলে যাবে তখন এক আহ্বানকারী আহ্বান করবে হে জান্নাতীরা! আল্লাহ তোমাদের সাথে এক ওয়াদা করেছিলেন, তিনি আজ তা পূর্ণ করতে চান। তারা বলবে সে কোনো ওয়াদা? আল্লাহ তাঁর স্বীয় দয়ায় আমাদের আমলসমূহ মিযানে ভারী করে দেন নি? আল্লাহ আমাদেরকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দিয়ে জান্নাতে প্রবেশ করান নি? তখন পর্দা উঠে যাবে এবং জান্নাতবাসী আল্লাহর সাথে সাক্ষাত করবে। সুহাইব বলেন: আল্লাহর কসম! আল্লাহকে দেখার চেয়ে জান্নাতবাসীদের জন্য আনন্দদায়ক এবং চোখের শান্তি দায়ক আর কিছুই থাকবে না। (মুসলিম) অন্যত্র আল্লাহ ইরশাদ করেন:
وُجُوهٌ يَوْمَئِذٍ نَاضِرَةٌ إِلَى رَبِّهَا نَاظِرَةٌ
অর্থ: "সেদিন কোন কোন মুখ মণ্ডল উজ্জ্বল হবে, তারা তাদের প্রতিপালকের দিকে তাকিয়ে থাকবে।" (সূরা কিয়ামাহ: ২২-২৩)
এ আয়াতে জান্নাতীগণ আল্লাহর দিকে তাকানোর কথা স্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে, জাবীর বিন আবদুল্লাহ (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা নবী-এর নিকট উপস্থিত ছিলাম তিনি ১৪ তারিখের চাঁদের দিকে তাকিয়ে বললেন: জান্নাতে তোমরা তোমাদের রবকে এমনভাবে দেখবে যেমনভাবে এ চাঁদকে দেখছ। সেদিন আল্লাহকে দেখতে তোমাদের কোনো কষ্ট হবে না। (বুখারী)
অতএব ঐ লোকেরাও পথভ্রষ্ট হয়েছে যারা দাবী করে যে, তারা এ পৃথিবীতে আল্লাহকে দেখেছে এবং তারাও ধোঁকায় পড়েছে যারা মনে করে যে, কিয়ামতের দিনও আল্লাহকে দেখা যাবে না। সঠিক আকীদা হলো এই যে, দুনিয়াতে আল্লাহর দীদার অসম্ভব, তবে অবশ্যই পরকালে জান্নাতীরা আল্লাহকে দেখতে পাবে। যা হবে অত্যন্ত বড় নিআমত যার মাধ্যমে বাকী সমস্ত নিআমত পূর্ণতা লাভ করবে।
জান্নাতে প্রবেশকারী মানুষ: উল্লেখিত শিরোনামে এ গ্রন্থে একটি অধ্যায় সামিল করা হলো। যেখানে কতিপয় গুণে গুনান্বিত ব্যক্তিকে জান্নাতে প্রবেশের সু সংবাদ দেয়া হয়েছে। এ বিষয়ে দু'টি জিনিস স্পষ্ট করা প্রয়োজন মনে করছি। প্রথমত: এ অধ্যায়ে আলোচিত গুণাবলীর উদ্দেশ্যও মোটেও এ নয় যে, এগুলো ব্যতীত আর এমন কোনো গুণাবলী নেই যে, যা মানুষকে জান্নাতে নিয়ে যাবে। এ অধ্যায়ে আমরা শুধু ঐ সমস্ত হাদীসমূহ বাছাই করেছি যেখানে রাসূলুল্লাহ স্পষ্টভাবে সে জান্নাতে প্রবেশ করেছে।" এবং "তার জন্য জান্নাত ওয়াজিব হয়ে গেছে" ইত্যাদি শব্দ ব্যবহার করেছেন, যাতে করে কোনো সন্দেহ বা অপব্যাখ্যার অবকাশ না থাকে।
দ্বিতীয়ত: যে সমস্ত গুণাবলীর কারণে রাসূলুল্লাহ জান্নাতে প্রবেশ করার সুসংবাদ দিয়েছেন তা থেকে এ অর্থ বুঝা মোটেও ঠিক হবে না যে, যে ব্যক্তি উল্লেখিত গুণাবলীর কোনো একটিতে গুণান্বিত হবে সে সরাসরি জান্নাতে চলে যাবে। একথা স্মরণ রাখতে হবে যে, ইসলামের বিধি-বিধানসমূহ একটি অপরটির সাথে এমনভাবে সম্পর্কিত যে একটি থেকে অপরটিকে পৃথক করা সম্ভব নয়। যে কোনো ব্যক্তির ইসলামের রুকনসমূহের যতই আমল থাকুকনা কেন, সে যদি পিতা-মাতার অবাধ্য হয়, তাহলে তাকে এ কবীরা গুনাহর শাস্তি ভোগ করার জন্য জাহান্নামে যেতে হবে। তবে যদি সে তাওবা করে, আর আল্লাহ তাঁর বিশেষ রহমতে তাকে ক্ষমা করে দেন, তা হবে আলাদা বিষয়। অতএব এ অধ্যায়ের উল্লিখিত হাদীস সমূহের সঠিক অর্থ হবে এই যে, যে ব্যক্তি তাওহীদের ওপর বিশ্বাসী হয়ে, ইসলামের রুকনসমূহ পালন করার জন্য পরিপূর্ণভাবে চেষ্টা করে, মানুষের হক আদায় করার ব্যাপারে কোনো প্রকার অলসতা দেখায় না, কবীরা গুনাহ থেকে বাঁচার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করে, এমন ব্যক্তির মধ্যে যদি উল্লেখিত গুণাবলীর মধ্য থেকে কোনো একটি বা তার অধিক গুণ থাকে, তাহলে আল্লাহ তার স্বীয় দয়া ও অনুগ্রহের মাধ্যমে নাজানা পাপসমূহ ক্ষমা করে প্রথমেই তাকে জান্নাতে দিবেন এবং তাকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করবেন। এর আরেকটি অর্থ এও হতে পারে যে, যাদের মধ্যে উল্লেখিত গুণাবলীর মধ্য থেকে কোনো একটি থাকবে, যদিও সে কোনো কবীরা গুনাহর কারণে জাহান্নামে যায়ও শেষ পর্যন্ত আল্লাহ তাকে তার ঐ গুণে গুণান্বিত হওয়ার কারণে জাহান্নাম থেকে বের করে অবশ্যই জান্নাতে দিবেন। যেমন এক হাদীসে রাসূলুল্লাহ ﷺ এরশাদ করেছেন, কোনো এক সময় ঐ ব্যক্তিকেও জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেয়া হবে যে একনিষ্ঠভাবে লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলেছে, আর তার অন্তরে শুধু সরিষা পরিমাণ ভাল আছে। (মুসলিম)
(এ ব্যাপারে আল্লাহই ভাল জানেন)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00