📄 কিতাবুল জান্নাতের লক্ষ্য উদ্দেশ্য
কুরআন কারীমে আল্লাহ মানুষের হিদায়াতের জন্য বেশ কিছু অতীত জাতির পরিণতির কথা বর্ণনা করেছেন। কোথাও নবীগণের মোজেযার কথা বর্ণনা করেছেন, কোথাও মানুষের সৃষ্টি ও তার মৃত্যুর কথা বর্ণনা করেছেন, কোথাও পৃথিবী ও তার মধ্যস্থিত বিদ্যমান বিষয়সমূহের কথা বর্ণনা করেছেন, কোথাও সাধারণ উদাহরণের মাধ্যমে বুঝিয়েছেন, কোথাও সৎ আমলের প্রতি উৎসাহিত করার জন্য জান্নাত ও তার নিআমত সমূহের উল্লেখ করা হয়েছে, আবার কোথাও খারাপ আমলের কু-পরিণতি থেকে ভিতি প্রদর্শনের জন্য, জাহান্নামের আগুন ও তার বিভিন্ন প্রকার আযাবের বর্ণনা করা হয়েছে। স্বীয় মানসিকতা ও অভ্যাস অনুযায়ী, প্রত্যেক মানুষ কুরআনের এ পবিত্র আয়াতসমূহ থেকে দিকনির্দেশনা নিয়ে থাকে। জান্নাতের নিআমতসমূহ সম্পর্কে বিস্তারিত জানার পর আর এমন কোনো মুসলমান থাকতে পারে যে, তা হাসিলের জন্য উদগ্রীব হবে না? বাস্তবতা তো এই যে ব্যক্তি জান্নাতের প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস রাখে তার জন্য জান্নাতের বিনিময়ে দুনিয়ার বড় বড় পরীক্ষা বড় বড় ত্যাগ স্বীকারও কিছু নয়। বেলাল, খাব্বাব বিন আরাত, আবু যার গিফারী (রা) ইয়াসের, সুমাইয়্যা, হুবাইব বিন যায়েদ, খুবাইব বিন আদী, সালমান ফারেসী, আবু জান্দাল (রা) ইমাম আহমদ বিন হাম্বল, ইমাম মালেক (রহ) মত অসংখ্য সালফে সালেহীন এর ঘটনা আমাদের ইতিহাসে উজ্জল হয়ে আছে।
জান্নাতের আকাঙ্খা যেখানে মানুষকে বড় বড় পরীক্ষা ও ত্যাগ স্বীকার করাকে তুচ্ছ করে দেয় তা সৎ আমলের উৎসাহ আরো বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। কিছু উদাহরণ নিম্নে পেশ করা হলো।
সায়িদ বিন মুসায়্যিব সম্পর্কে এক খাদেম বর্ণনা করেছে যে, চল্লিশ বছরের মাঝে এমন কখনো হয় নি যে, নামাযের আযান হয়ে গেছে অথচ তিনি মসজিদে উপস্থিত ছিলেন না।
আবু তালহা তার বাগানে নামায পড়তে ছিলেন হটাৎ করে বাগানের সবুজ বৃক্ষ ও ফুল এবং ফলের প্রতি দৃষ্টি পড়লো, আর নামাযের রাকআতে তার ভুল হয়ে গেল, সাথে সাথে তিনি রাসূলুল্লাহ -এর নিকট গিয়ে ঘটনা বর্ণনা করলেন এবং বললেন হে আল্লাহ রাসূল! যে জিনিষ আমার নামাযে ভুল করিয়েছে আমি তা আল্লাহর রাস্তায় সাদকা করে দিব। আপনি তা যেভাবে খুশী সে ভাবে ব্যবহার করুন।
ওয়াকী বিন জাররাহ (রা) বলেন: আ'মাস (র) সত্তর বছরের মধ্যে কখনো কোনো নামাযে তাকবীরে উলা ছুটে নি।
মাইমুন বিন মেহরান (র) একদা মসজিদে এসে দেখলেন জামাআত শেষ হয়ে গেছে, অনিচ্ছা সত্ত্বেও তার মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসল যে, ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। আর বলতে লাগলেন জামাআতের সাথে নামায আদায় করা আমার নিকট ইরাকের রাষ্ট্রনায়ক হওয়া থেকেও উত্তম।
আবদুল্লাহ বিন যুবাইর (রা) নামাযে (নফল) দাড়িয়ে এক রাকআতে বাক্বারা, আলে ইমরান, নিসা, মায়েদাহ শেষ করেছেন।
আবদুল্লাহ বিন ওয়াহাব বর্ণনা করেন যে আমি সুফিয়ান সাওরীকে হারামে মাগরিবের নামাযের পর সেজদা করতে দেখেছি আর ইশার আযান হয়ে গেছে তখনো তিনি সেজদায়ই ছিলেন।
ইতিহাসের পৃষ্ঠায় এ ধরনের ঘটনা অগণিত। যা পাঠান্তে সাধারণত মানুষ আশ্চার্যান্বিত হয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো এই যে, যে ব্যক্তি জান্নাতের নিআমত সম্পর্কে অবগত আছে তার জন্য সর্বপ্রকার গুনাহ থেকে বিরত থাকা এবং সর্বপ্রকার মওয়াবের কাজ করা অত্যন্ত সহজ।
"কিতাবুল জান্নাত" লিখার পিছনেও মূল উদ্দেশ্য মূলত এই যে, মানুষের মধ্যে যেন জান্নাত লাভের জযবা পয়দা হয় এবং জান্নাত লাভের আশায় কবীরা গুনাহ থেকে বিরত থাকা ও নেক আমল বেশি বেশি করে করার উৎসাহ সৃষ্টি হয়।
এ পুস্তক পাঠান্তে এক বা দু'জন মুসলমান ও যদি তার আমলকে পরিবর্তন করতে পারে তাহলে ইনশাআল্লাহ এ পুস্তক রচনার উদ্দেশ্য পূরণ হবে।
প্রিয় পাঠক! "তাফহিমুস সুন্না সিরিজ” লিখতে গিয়ে তালাক ও বিবাহ নামক গ্রন্থদ্বয় লিখার পর ফিতান সম্পর্কে লিখব, যেখানে কিয়ামত, দাজ্জাল, ঈসা (আ)- এর আগমন সম্পর্কে লিখা হবে। এর পর সিঙ্গায় ফুঁ, হাশর-নাশর, শাফা'আত, জান্নাত, জাহান্নাম সম্পর্কে পর্যায়ক্রমে লিখব। কিন্তু দাওয়াতের ক্ষেত্রে উৎসাহ উদ্দীপনা প্রদানের ক্ষেত্রে গুরুত্বের কথা বিবেচনা করে কোনো কোনো শুভাকাঙ্খির এ আগ্রহ ছিল যে, জান্নাত ও জাহান্নাম সম্পর্কে আগে লিখা। তাই এ দু'টি বিষয় আগে লিখা হলো। এর পর ইনশাআল্লাহ ফিতান সম্পর্কে লিখা হবে। ওমা তাওফিকী ইল্লাহ বিল্লাহ ওয়া আলাইহি তাওয়াক্কালতু ওয়া ইলাইহি উনীব।
এ গ্রন্থে ব্যবহৃত হাদীসের শুদ্ধতা পূর্বের ন্যায় শায়িখ নাসির উদ্দীন আলবানী (র) বিশ্লেষণ অনুযায়ী উল্লেখ করা হয়েছে। রেফারেন্সের ক্ষেত্রে আমি উক্ত লিখকের দেয়া নাম্বার ব্যবহার করেছি। যেমন: (২/১০৫৯) অর্থাৎ দ্বিতীয় খণ্ড হাদীস নং ১০৫৯।
এ গ্রন্থের সমস্ত সুন্দর দিকসমূহ আল্লাহর অনুগ্রহ ও দয়ার ফল। আর ভুলভ্রান্তি সমূহ আমার নিজের ভুল ক্রমে হয়েছে। হাদীস গ্রন্থে হাদীসসমূহের বিন্যাস, অধ্যায় রচনা, ব্যাখ্যা, অনুবাদে যদি কোনো প্রকার ছোট বা বড় ভুল হয়ে থাকে, তাহলে তার জন্য আমি আল্লাহর নিকট তাওবা করছি, আর তাঁর অশেষ দয়া ও অনুগ্রহের আশা নিয়ে এ প্রার্থনা করছি যে, তিনি দুনিয়া ও আখেরাতে আমার গুনাহর দীর্ঘসূচীকে স্বীয় রহমত দ্বারা ঢেকে দিবেন।
নিশ্চয়ই তিনি অত্যন্ত মুক্ত হস্তের অধিকারী, অনুগ্রহ কারী, বাদশা, দয়াময়, করুণাময়, রহমকারী।
সর্বশেষে আমি ঐ সমস্ত বন্ধুদের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি এ গ্রন্থ প্রস্তুতে, প্রকাশনায় কোনো না কোনোভাবে আমাকে সহযোগিতা করেছে, আল্লাহ তাদের প্রত্যেককে দুনিয়ার ফেতনা থেকে রক্ষা করুন, তাদেরকে স্বীয় হেফাযতে রাখেন, আর পরকালে আমাদের সকলকে স্বীয় দয়ায় ক্ষমা করে নিআমতে ভরপুর জান্নাতে প্রবেশ করান। আমীন!
হে আল্লাহ! তুমি তা আমাদের পক্ষ থেকে কবুল করো। নিশ্চয়ই তুমি শ্রবণকারী মহাজ্ঞানী।
মুহাম্মদ ইকবাল কীলানী (আফাল্লাহু আনহু) ২৪ রবিউল আওউয়াল ১৪২০ হিঃ ৮ জুলাই ১৯৯৯ইং।
📄 জান্নাত সম্পর্কে কুরআনের ভাষ্য
আল্লাহ তা'আলা কুরআন মাজীদের বিভিন্ন স্থানে জান্নাত সম্পর্কে বিস্তারিত বর্ণনা করতে গিয়ে পানি, দুধ, মদের ঝর্ণার কথা বর্ণনা করেছেন, এমনিভাবে বিভিন্ন ফল-মূল, বাগান, ঘন ছায়া, ঠাণ্ডা, পাখীর গোশত, মূল্যবান আসন, হুরেইন, বালাখানার কথা বর্ণনা করেছেন। পার্থিব দিক থেকে এ সমস্ত বিষয়সমূহ, জীবন যাপনের উপাদান বলে মনে করা হয়, তাই কোনো কোনো নাস্তিক ও বে-দ্বীন সাহিত্যিক, কবি, ইত্যাদি জান্নাতকে অত্যন্ত সাধারণ কিছু হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছে, যেন জান্নাত এমন এক আবাস স্থল যে, যেখানে প্রবেশ করা মাত্রই পৃথিবীর একমাত্র আল্লাহ ভীরু ও সংযমের সাথে জীবন যাপন কারী মুত্তাকী ব্যক্তি তার তাকওয়ার পোশাক খুলে ফেলে দিয়ে আনন্দময় অনুষ্ঠানে নিমগ্ন থাকবে। বিবাহ ও বাদ্য যন্ত্রের প্রতিধ্বনি বুলন্দ হবে। আর হুরদের ভিড়ে জান্নাতবাসীদের অন্তর শান্ত থাকবে। নৃত্যশালা তার আশেকদের ভীড়ে ভরপুর থাকবে। আর সুরাবাহীদের পদধ্বনিতে তা থাকবে আবাদময়।
মূলত জান্নাত কি এ ধরনেরই এক আবাস স্থল? আসুন জান্নাত নির্মাণকারী এবং জান্নাত সম্পর্কে ওয়াকিফহালের কাছ থেকে তা জানা যাক যে, জান্নাত কেমন? আল্লাহ কুরআন মাজীদে এরশাদ করেন যে, "জান্নাতীরা যখন জান্নাতে প্রবেশ করবে তখন তাদেরকে অভ্যার্থনা জ্ঞাপনকারী ফেরেশতা "আসসালামু আলাইকুম" বলে তাদেরকে অভ্যর্থনা জানাবে। "আপনারা অত্যন্ত ভাল থাকুন" বলে তাদেরকে স্বাগতম জানাবে। যা শ্রবণে জান্নাতীরা "আলহামদু লিল্লাহ" বলে আল্লাহর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবে। (সূরা যুমার: ৭৩-৭৩)
"জান্নাত বাসীগণ প্রতি নিঃশ্বাসে আল্লাহর তাসবীহ (সুবহানাল্লাহ) এবং প্রশংসা (আলহামদু লিল্লাহ) বলবে। যখন একে অপরের সাথে সাক্ষাত করবে তখন আসসালামু আলাইকুম বলবে। পরস্পরের কথাবার্তা শেষে (আলহামদুলিল্লাহি রাব্বিল আলামীন বলবে)" (সূরা ইউনুস: ২৫)
জান্নাতের হুরেরা নিঃসন্দেহে জান্নাতীদের জন্য তৃপ্তীদায়ক বিষয় হবে কিন্তু তারা লম্পট স্বভাব, বে-পরদা, বে-হায়া হবে না। না অন্য পুরুষের চোখে চোখ রাখবে, বরং যথেষ্ট লজ্জাবোধের অধিকারীনী, চরিত্রবান, পর্দাশীল হবে। যাদেরকে ইতিপূর্বে কোনো পুরুষ দেখেও নাই আর স্পর্শও করে নাই। শুধু স্বীয় স্বামী ভক্ত হবে। (সূরা রহমান: ২২-২৩, ৩৫-৩৭, সূরা বাকারা: ২৫)
কুরআন মাজীদের উল্লেখিত নির্দেশসমূহের আলোকে একথা বুঝতে কষ্টকর নয় যে নিঃসন্দেহে জান্নাত জীবন যাপনের আবাসস্থল, কিন্তু ঐ জীবন যাপনের কল্পনা তাকওয়া, সৎ আমল, পবিত্রতার মাপকাঠির সাথে সম্পৃক্ত যার দাবী আল্লাহ তাঁর বান্দাদের নিকট দুনিয়াতে করেছেন। যা তারা তাদের সর্বাঙ্ক সাধনার পরও যথাপোযুক্ত ভাবে হাসিল করতে পারে নি। আর আল্লাহর এ বান্দারা যখন জান্নাতে প্রবেশ করবে তখন আল্লাহ স্বীয় দয়া ও অনুগ্রহের মাধ্যমে তাদেরকে তাকওয়া, সৎ আমল, পবিত্রতার ঐ মাপকাঠি পর্যন্ত পৌঁছিয়ে দিবেন, যার দাবী তিনি তাদের নিকট দুনিয়াতে করেছিলেন। জান্নাতের এ অবস্থার কথা স্মরণে রাখুন আর চিন্তা করুন যে, কোনো এমন মুসলমান আছে, যে জান্নাতে প্রবেশ করার পর হুর, বালাখানা, খানা-পিনা ইত্যাদির পূর্বে তার ওপর বেশী অনুগ্রহ পরায়ন, পৃথিবীবাসীর নিকট পথপ্রদর্শক রূপে আগত, গুনাহগারদের জন্য সুপারিশকারী, রাহমাতুললীল আলামীন, ইমামুল আম্বিয়া, মুত্তাকীনদের সরদারের চেহারা মোবারক একবার দেখার জন্য উদগ্রীব থাকবে না? শত কোটি নয়, অসংখ্য পবিত্র আত্মা যার মধ্যে থাকবে নবীগণ, সৎ লোক, শহীদগণ, নেক্কার, উলামা, মুফতীও নবী আলাইবি-এর সালাহার যিয়ারতের অপেক্ষায় থাকবে। কোনো এমন জান্নাতী হবে, যে তার অন্তর ইসলামের বৃক্ষকে সতেজ রাখতে স্বীয় শরীরের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়েছে এমন জান্নাতের সুসংবাদ প্রাপ্ত দশজন সাহাবী, বদর ও উহুদের শহীদগণ, রাসূলের হাতে বৃক্ষের নীচে বাইয়াত গ্রহণ কারীগণ সহ অন্যান্য সাহাবাগণকে এক নযর দেখার জন্য আগ্রহী হবে না। তাবেয়ী, তাবে তাবেয়ী, তাদের পরে কিয়ামত পর্যন্ত দ্বীনের স্বার্থে জান, মাল, ইজ্জত, আবরু, ঘর-বাড়ী, কুরবান কারী কত অসংখ্য সোনার মানুষ ছিল, যাদের সাথে সাক্ষাৎ বা যাদের মজলিশে অংশগ্রহণের আগ্রহ প্রত্যেক মুসলমানের অন্তরেই থাকবে। সর্বোপরি এ সমস্ত নিআমতের চেয়ে বড় নিআমত হবে আল্লাহর সাক্ষাৎ, যার জন্য সমস্ত মু'মিন অপেক্ষমান থাকবে। নিঃসন্দেহে হুর, বালাখানা, খানা-পিনা, জান্নাতের নিআমত সমূহের মধ্যে এক প্রকার নিআমত বটে, কিন্তু তাহবে জান্নাতের জীবনের একটি অংশ মাত্র, এটাই পরিপূর্ণ জান্নাতী জীবন নয়। জান্নাতের পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন পরিবেশে জান্নাত বাসীদের জন্য হুর, বালাখানা ব্যতীত তাদের মনপুত আরো অনেক ব্যবস্থাপনা থাকবে। যার মাধ্যমে প্রত্যেকে তার ইচ্ছামত নিজেকে ব্যস্ত রাখবে। দ্বীন ও মিল্লাত থেকে বিমুখ, কুরআন ও হাদীস সম্পর্কে অজ্ঞ "পণ্ডিতবর্গ” কি করে জানবে যে জান্নাতে আল্লাহ জান্নাতবাসীদের জন্য তাদের নয়নাভিরাম মনের আত্মতৃপ্তীদায়ক হুর ও বালাখানা ব্যতীত আরো কত কি নিআমতের ব্যবস্থা করে রেখেছেন?
📄 জান্নাত সম্পর্কে হাদীসের উদ্ধৃতি
১. জান্নাতে রোগ, বার্ধক্য, মৃত্যু হবে না। (মুসলিম)
২. যদি কোনো জান্নাতী তার অলঙ্কার সহ একবার পৃথিবীর দিকে উঁকি দেয় তাহলে সূর্যের আলোকে এমনভাবে আড়াল করে দিবে যেমন সূর্যের আলো তারকার আলোকে আড়াল করে দেয়। (তিরমিযী)
৩. যদি জান্নাতের হুরেরা পৃথিবীর দিকে একবার উঁকি দেয় তাহলে পূর্ব-পশ্চিমের মাঝে যাকিছু আছে তা আলোকিত হয়ে যাবে। আর সমস্ত পৃথিবীকে সুগন্ধিময় করে দিবে। (বুখারী)
৪. জান্নাতের বালাখানাসমূহ সোনা ও চাঁদির ইট দিয়ে নির্মিত। সিমেন্ট, বালি মেশক আম্বারের সুগন্ধি যুক্ত। তার পাথরসমূহ হবে মতি ও ইয়াকুতের, আর তার মাটি হবে জাফরানের। (তিরমিযী)
৫. জান্নাতে শত স্তর আছে আর প্রত্যেক স্তরের মাঝে আকাশ ও যমীন সম দূরত্ব। (তিরমিযী)
৬. জান্নাতের ফলসমূহের একটি গুচ্ছ আকাশ ও জমীনের সমস্ত সৃষ্টিজীব খেলেও শেষ হবে না। (আহমদ)
৭. জান্নাতের একটি বৃক্ষের ছায়া এত লম্বা হবে যে, তার ছায়ায় এক অশ্বারোহী শত বছর পর্যন্ত চলেও তার শেষ প্রান্তে পৌঁছতে পারবে না। (বুখারী)
৮. জান্নাতে ধনুক সম স্থান সমস্ত পৃথিবী এবং পৃথিবীর সমস্ত নিআমত থেকেও মূল্যবান। (বুখারী)
৯. হাওযে কাওসারে সোনা-চাঁদির পেয়ালা থাকবে যার সংখ্যা আকাশের তারকা সম হবে। (মুসলিম)
📄 জান্নাত, জাহান্নাম এবং যুক্তির পূজা
দ্বীনের মূল ভিত্তি ওহীর জ্ঞানের ওপর। তাই ওহীর জ্ঞানের অনুসরণ সর্বদাই মানুষের জন্য মুক্তি ও পরিত্রাণের মাধ্যম। ওহীর জ্ঞানের মোকাবেলায় যুক্তির পূজা করা সর্বদাই পথভ্রষ্টতা ও ক্ষতিগ্রস্ততার মাধ্যম। আম্বিয়া কেরামের দাওয়াতে সাড়া দিয়ে যারা ওহীর নির্দেশাবলী মোতাবেক গায়েবের প্রতি ঈমান এনেছে এবং মৃত্যু ও পরকাল অর্থাৎ: হাশর, হিসাব, কিতাব, জান্নাত, জাহান্নাম, ইত্যাদি প্রতি ঈমান এনেছে, সে সফলকাম হয়েছে। পক্ষান্তরে যারা এ নির্দেশাবলীকে মুক্তির আলোকে যাঁচাই করেছে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কুরআন মাজীদের বিভিন্ন স্থানে আল্লাহ কাফিরদের যুক্তির কথা পেশ করেছেন যে, তারা বলে মৃত্যুর পর জীবিত হওয়া অসম্ভব। তাই কাফিররা নবীগণকে শুধু মিথ্যা প্রতিপন্নই করেনি বরং তাদেরকে ঠাট্টা-বিদ্রূপও করেছে। এ সম্পর্কে কুরআন মাজীদের কিছু উদ্ধৃতি :
১. أَإِذَا مِتْنَا وَكُنَّا تُرَاباً أَ ذَلِكَ رَجْعٌ بَعِيدٌ .
অর্থ: "আমাদের মৃত্যু হলে এবং আমরা মাটি হয়ে গেলে (আমরা কি পুনরুজ্জীবিত হব) সে প্রত্যাবর্তন তো সুদূর পরাহত।" (সূরা কা'ফ: ৩)
২. وَقَالَ الَّذِينَ كَفَرُوا هَلْ نَدُلُّكُمْ عَلَى رَجُلٍ يُنَبِّئُكُمْ إِذَا مُزِّقْتُمْ كُلَّ مُمَزَّقٍ إِنَّكُمْ لَفِي خَلْقٍ جَدِيدٍ - أَفْتَرَى عَلَى اللهِ كَذِباً أَمْ بِهِ جِنَّةٌ بَلِ الَّذِينَ لَا يُؤْمِنُونَ بِالْآخِرَةِ فِي الْعَذَابِ وَالضَّلَالِ الْبَعِيدِ
অর্থ: কাফিররা বলে: আমরা কি তোমাদেরকে এমন ব্যক্তির সন্ধান দিব যে, তোমাদেরকে বলে: তোমাদের দেহ সম্পূর্ণ ছিন্নভিন্ন হয়ে পড়লেও তোমরা নতুন সৃষ্টিরূপে উত্থিত হবে। সে কি আল্লাহ সম্পর্কে মিথ্যা উদ্ভাবন করে, অথবা সে কি উম্মাদ? বস্তুত যারা আখেরাতে বিশ্বাস করে না তারা আযাবে ও ঘোর ভ্রান্তিতে রয়েছে।" (সূরা সাবা: ৭-৮)
৩. وَقَالُوا إِن هَذَا إِلَّا سِحْرٌ مُّبِينٌ . أَإِذَا مِتْنَا وَكُنَّا تُرَاباً وَعِظَاماً أَإِنَّا لَمَبْعُوثُونَ - أَوَ آبَاؤُنَا الْأَوَّلُونَ - قُلْ نَعَمْ وَأَنتُمْ دَاخِرُونَ
অর্থ: "এবং তারা বলে এটাতো সুস্পষ্ট যাদু ব্যতীত আর কিছুই নয়। আমরা যখন মরে যাব এবং মাটি ও হাড্ডিতে পরিণত হবো তখনও কি আমাদেরকে পুনরুত্থিত করা হবে? এবং আমাদের পূর্ব পুরুষদেরকেও? বল: হ্যাঁ এবং তোমরা হবে লাঞ্ছিত”। (সূরা সাফ্ফাত: ১৫-১৮)
৪. وَقَالَ الَّذِينَ كَفَرُوا أَإِذَا كُنَّا تُرَاباً وَآبَاؤُنَا أَإِنَّا لَمُخْرَجُونَ - لَقَدْ وُعِدْنَا هَذَا نَحْنُ وَآبَاؤُنَا مِنْ قَبْلُ إِنْ هَذَا إِلَّا أَسَاطِيرُ الْأَوَّلِينَ
অর্থ: "কাফিররা বলে আমরা ও আমাদের প্রিয় পুরুষরা মৃত্তিকায় পরিণত হয়ে গেলেও কি আমাদেরকে পুনরুত্থিত করা হবে? এ বিষয়ে তো আমাদেরকে এবং পূর্বে আমাদের পূর্ব পুরুষদেরকেও ভীতি প্রদর্শন করা হয়েছিলো। এটা তো পূর্ববর্তী উপকথা ব্যতীত আর কিছুই নয়”। (সূরা নামল: ৬৭-৬৮)
৫. أَيَعِدُكُمْ أَنَّكُمْ إِذَا مِثْمُ وَكُنْتُمْ تُرَاباً وَعِظَاماً أَنَّكُمْ مُّخْرَجُونَ - هَيْهَاتَ هَيْهَاتَ لِمَا تُوعَدُونَ
অর্থ: "সে কি তোমাদেরকে এ প্রতিশ্রুতিই দেয় যে, তোমাদের মৃত্যু হলে এবং তোমরা মাটি ও হাড্ডিতে পরিণত হলেও তোমাদেরকে পুনরুত্থিত করা হবে? অসম্ভব, তোমাদেরকে সে বিষয়ে প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে তা অসম্ভব”?। (সূরা মু'মিনূন: ৩৫-৩৬)
আল্লাহর পক্ষ থেকে ওহীকৃত শিক্ষাকে, যুক্তির আলোকে যাঁচাইকারী পণ্ডিত বর্গ সর্বকালেই যথেষ্ট পরিমাণে ছিল, কিন্তু অতীতকালে যারা ওহীর শিক্ষাকে মিথ্যায় প্রতিপন্ন করতো তারা মুসলমান হতো না। কিন্তু বর্তমান কালে যারা ওহীর শিক্ষাকে যুক্তির আলোকে যাচাই করে ওহীর শিক্ষাকে মিথ্যা পতিপন্ন করে, তারা ঐ সমস্ত লোক যারা প্রকাশ্যে ইসলাম গ্রহণ করেছে এবং মুসলমান বলে দাবী করে। হিজরী দ্বিতীয় শতাব্দীর শুরুতে জাহাম বিন সাফওয়ান গ্রীস দর্শনে প্রতিক্রিয়াশীল হয়ে, আল্লাহর সত্তা, তাঁর গুণাবলী এবং ভাগ্য সম্পর্কে ওহীর শিক্ষাকে পরিবর্তন করে আরো অনেক লোককে সে তার সাথে পথভ্রষ্ট করেছে, যা পরবর্তীতে জাহমিয়া সম্প্রদায় নামে আখ্যায়িত হয়েছে, এমনিভাবে মোতাযিলা সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠাতা ওয়াসেল বিন আতাও ওহীর জ্ঞান বাদ দিয়ে যুক্তিকে মানদণ্ড করে পথভ্রষ্ট হয়েছে এবং বহু লোককে পথভ্রষ্ট করেছে, যাদেরকে মোতাযিলা ফেরকা বলা হয়।' হিযর, চতুর্থ শতাব্দীর মাঝামাঝি ওহীর শিক্ষার বিরুদ্ধে যুক্তির পূজারী সূফীরা বাগদাদে এক সংগঠন প্রতিষ্ঠা করলো যার নামকরণ করা হয়েছিলো, 'ইখওয়ানুসসফা' যাদের নিকট সমস্ত ধর্মীয় পরিভাষাসমূহ নবুওয়াত, রিসালাত, মালাইকা, সালাত, যাকাত, সিয়াম, হজ্জ, আখেরাত, জান্নাত, জাহান্নাম, ইত্যাদির দুটি করে অর্থ। একটি জাহেরী অপরটি বাতেনী। জাহেরী অর্থ ঐটি যা ইসলামী শরীয়তে আল্লাহর পক্ষ থেকে নাযিলকৃত ওহী মোতাবেক। আর বাতেনী ঐটি যা সূফীদের নিজস্ব যুক্তি প্রসূত। সূফীদের নিকট জাহেরী অর্থের ওপর আমলকারী মুসলমানরা জাহেলদের অন্তর্ভুক্ত, আর বাতেনী অর্থের ওপর আমলকারী মুসলমান জ্ঞানীদের অন্তর্ভুক্ত। ওহীর শিক্ষাকে পরিবর্তনকারী বাতেনী সংগঠনের এ ফিতনা আজও পৃথিবীর সকল দেশে কোনোনা কোনো সূরাতে আছেই। নিকট অতীতের স্যার সায়্যেদ আহমদ খানের উদাহরণ আমাদের সামনে আছে যে, ১৮৬৮-১৮৭০ ইং পর্যন্ত ইংলিস্থানে থেকে ফিরে এসে প্রাচ্যের সাইন্স, উন্নতি, টেকনোলজী, দেখে এতটা প্রতিক্রিয়াশীল হয়েছিল যে, আলীগড়ে এম. এ, ও, কলেজ প্রতিষ্ঠা করেছিল, আর এর লক্ষ্য উদ্দেশ্যের মধ্যে এ কথা লিখা ছিল যে, দর্শন আমাদের ডান হাত, নেচারাল সাইন্স আমাদের বাম হাত, আর লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ তাজ, যা আমাদের মাথায় থাকবে। কলেজের উদ্বোধন করিয়েছিল লর্ড লিটনের মাধ্যমে। আর কলেজের সংবিধানে একথা লিখা ছিল যে, এ কলেজের প্রিন্সিপাল সর্বদা কোনো ইউরোপীয়ান হবে। প্রাচ্যের সাইন্স ও টেকনোলজীতে প্রতিক্রিয়াশীল সাইয়্যেদ সাহেব যখন কুরআন মাজীদের তাফসীর লিখা শুরু করলেন, তখন তিনি নবীগণের মোজেজাসমূহকে যুক্তির আলোকে যাচাই করতে লাগলেন এবং সমস্ত মোজেজা সমূহকে এক এক করে অস্বীকার করতে লাগলেন। স্ব-শরীরে উপস্থিত না থাকা ফেরেশতাদেরকে অস্বীকার করতে লাগল। জান্নাত, কবরের আযাব, কিয়ামতের আলামত, যেমন: দাব্বাতুল আরয (মাটি ফেটে প্রাণীর আগমন) ঈসা (আ) এর আগমন, সূর্য পূর্বদিক থেকে উঠা, ইত্যাদি অস্বীকার করতে লাগলো। জান্নাত, জাহান্নামের অস্ত ীত্ব অস্বীকার করলো। আর ওহীর শিক্ষা থেকে দূরে সরে শুধু সে নিজেই পথভ্রষ্ট হয় নি বরং তার পিছনে যুক্তির পূজারীদের এমন একদল রেখে গেছে, যারা সর্বদাই উম্মতকে নাস্তিকতার বিষবাষ্প ছড়িয়ে দেয়ার গুরু দায়িত্ব পালন করছে।
আমাদের একথা স্বীকার করতে কোনো দিধা নেই যে, পৃথিবীতে জান্নাত ও জাহান্নামের বাস্তব অবস্থা সম্পর্কে সবিস্তারিত বুঝা আসলেই অসম্ভব। যুক্তির আলোকে তা পরিপূর্ণভাবে যাচাই করা যাবে না। কিন্তু প্রশ্ন হলো যে, কোনো জিনিষ যুক্তিতে না ধরাই কি তা অস্বীকার করার জন্য যথেষ্ঠ? আসুন বিজ্ঞান ও যুক্তির আলোকেই এ প্রশ্নের উত্তর খোঁজা যাক।
সর্বশেষ বিজ্ঞানের আবিস্কার অনুযায়ী:
১. আমাদের পৃথিবী সর্বদা ঘুরছে, একভাবে নয় বরং দু'ভাবে। প্রথমত নিজের চতুপার্শ্বে দ্বিতীয়ত, সূর্যের চতুর্পার্শ্বে।
২. সূর্য স্থির যা শুধু তার চতুপার্শ্বে ঘুরছে।
৩. পৃথিবী থেকে সূর্যের দূরত্ব ৯ কোটি ৩০ লক্ষ মাইল।
৪. সূর্যের দেহ পৃথিবীর মোকাবেলায় ৩ লক্ষ ৩৭ হাজার গুণ বেশি।
৫. আমাদের সৌর জগৎ থেকে ৪শ কোটি কি.মি. দূরত্বে আরো একটি সূর্য আছে, যা আমাদের নিকট ছোট একটি আলোকরশ্মি বলে মনে হয়। তার নাম আলফাদেনতুরস (Alfagentaurisa) 1
৬. আমাদের সৌর জগৎ এর বাহিরে অন্য একটি তারকার নাম কালব আকরাব (Atntares) তার ব্যাস ২৮ কোটি ৩০ লক্ষ মাইল প্রায়।
চিন্তা করুন বাস্তবেই কি আমাদের অনুভূতি হচ্ছে যে, পৃথিবী আমাদের চতুর্পার্শ্বে ঘুরছে? বাহ্যত পৃথিবী পরিপূর্ণভাবে স্থির আছে, আর তার সামান্য কম্পন পৃথিবীবাসীকে তছনছ করে দেয়ার জন্য যথেষ্ট। অথচ বলা হচ্ছে যে পৃথিবী দু'ভাবে ঘুরে বলে বিশ্বাস কর?
বাস্তবেই কি সূর্য আমাদের নিটক স্থির বলে মনে হয়? প্রত্যেক মানুষ স্ব চোখে প্রত্যক্ষ করছে যে, সূর্য পূর্ব দিক থেকে উদিত হয়ে আস্তে আস্তে চলতে চলতে পশ্চিমে গিয়ে অস্ত যাচ্ছে।
বাস্তবেই কি সূর্য পৃথিবীর তুলনায় ৩ লক্ষ ৩৭ হাজার গুণ বড় বলে মনে হয়। বরং প্রত্যেক ব্যক্তিই দেখতে পায় যে, সূর্য নয় বা দশ মিটারের একটি আলোকরশ্মি। মানবিক জ্ঞান কি একথা বিশ্বাস করে যে, আমাদের এ সৌর জগৎ এর বাহিরে, কোটি কি. মি. দূরে আরো একটি সূর্য আছে, যা আমাদের এ পৃথিবী ও সূর্যের তুলনায় লক্ষ গুণ বড়? এ সমস্ত কথা শুধু বাস্তব দেখা বিরোধিই নয় বরং বিবেক সম্মতও নয়। কিন্তু এতদসত্ত্বেও আমরা তা শুধু এ জন্যই বিশ্বাস করি যে, বিজ্ঞানীগণ তাদের গবেষণার মাধ্যমে এসমস্ত তথ্য দিয়ে থাকে। এর পরিষ্কার ও স্পষ্ট ব্যাখ্যা ছিল এই যে, কোনো জিনিষ বিবেক সম্মত না হওয়ায় তা অস্বীকার করা সম্পূর্ণ ভুল। এমনিভাবে জান্নাত ও জাহান্নামের অস্তিত্ব এবং তার বিস্তারিত অবস্থা মানবিক জ্ঞান সম্মত না হওয়ায় তা অস্বীকার করা সম্পূর্ণই ভ্রান্তি, ভুল দর্শন, যা শুধু শয়তানী চক্রান্ত মাত্র। নিউটন ও আইনষ্টাইন এর সূত্র সমূহ যদি বুঝে না আসে তাহলে আমরা তখন শুধু আমাদের স্বল্প জ্ঞান এবং কমবুদ্ধির কথাই স্বীকার করিনা বরং উল্টা তাদের জ্ঞান বুদ্ধির প্রশংসায় পঞ্চমুখও হই। অথচ আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের পক্ষ থেকে আসা বিষয়সমূহ যুক্তি সম্মত না হলে তখন শুধু তা অস্বীকার করি না বরং উল্টো সেটা খণ্ডন ও করি। এর অর্থ এছাড়া আর কি হতে পারে যে, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের কথার উপর আমাদের এতটুকু ঈমানও নেই যতটা ঈমান আইনস্টাইন ও নিউটনের গবেষণার ওপর আছে। বাস্ত বতা হলো এই যে, জান্নাত ও জাহান্নামের অস্তিত্ব এবং এ ব্যাপারে বর্ণিত গুণাবলি পরিপূর্ণ রূপে মানার একমাত্র দলিল হলো এই যে, “গায়েবের প্রতি বিশ্বাস” যাকে আল্লাহ কুরআন মাজীদের মানুষের হিদায়াতের জন্য প্রথম শর্ত হিসেবে উল্লেখ করেছেন। আল্লাহর বাণী-
ذٰلِكَ الْكِتٰبُ لَا رَيْبَۛ فِيْهِۛ هُدًى لِّلْمُتَّقِيْنَۙ
الَّذِيْنَ يُؤْمِنُوْنَ بِالْغَيْبِ وَيُقِيْمُوْنَ الصَّلٰوةَ وَمِمَّا رَزَقْنٰهُمْ يُنْفِقُوْنَ
অর্থঃ “এটা ঐ গ্রন্থ যার মধ্যে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। মুত্তাকীদের জন্য এটা হিদায়াত। যারা গায়েবের প্রতি বিশ্বাস করে, নামায প্রতিষ্ঠা করে এবং আমি তাদেরকে যে উপজীবিকা প্রদান করেছি তা থেকে তারা দান করে থাকে। (সূরা বাক্বারা: ২-৩)
এর স্পষ্ট অর্থ হলো এই যে, গায়েবের প্রতি যার ঈমান যত মজবুত হবে, জান্নাত ও জাহান্নামের প্রতি তার বিশ্বাসও ততো মজবুত হবে। আর গায়েবের প্রতি যার ঈমান যত দুর্বল হবে, জান্নাত ও জাহান্নামের প্রতি তার বিশ্বাসও ততো দুর্বল হবে।
অতএব যার বিবেক জান্নাত ও জাহান্নামের অস্তিত্ব মেনে নিতে প্রস্তুত নয় তার উচিত বিবেকের চিন্তা না করে ঈমানের চিন্তা করা। ঈমানদারগণের আমল অত্যন্ত স্পষ্ট। যাদের সম্পর্কে স্বয়ং আল্লাহ বলেছেন:
رَبَّنَا إِنَّنَا سَمِعْنَا مُنَادِيًا يُّنَادِىْ لِلْاِيْمَانِ اَنْ اٰمِنُوْا بِرَبِّكُمْ فَاٰمَنَّا
অর্থঃ “হে আমাদের প্রভু! নিশ্চয়ই আমরা এক আহ্বানকারীকে আহ্বান করতে শুনেছিলাম যে, তোমার স্বীয় প্রতিপালকের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করো, তাতেই আমরা বিশ্বাস স্থাপন করেছি। (সূরা আলে ইমরান: ৩:১৯৩)
টিকাঃ
১ উল্লেখ্য, জাহমিয়া এবং মো'তাযিলা উভয়ে আল্লাহর গুণাবলী যার বর্ণনা কুরআনে স্পষ্ট ভাবে এসেছে, যেমন, আল্লাহর হাত, পা, চেহারা, পায়ের গোছা ইত্যাদিকে অস্বীকার করেছে, এমনিভাবে সমস্ত আয়াত ও হাদীসের অপব্যাখ্যা করেছে, আর তাকদীরের ব্যাপারে জাহমিয়াদের আকীদা হল মানুষ বাধ্য। আর সমস্ত হাদীস ও আয়াত যেখানে মানুষকে আমল করার কথা বলা হয়েছে, তারা তার বিভিন্নভাবে অপব্যাখ্যা করেছে, মোতাযিলারা তাকদীরের ব্যাপারে মানুষ স্বইচ্ছাধীন বলে বিশ্বাস করে।)