📘 মৃত্যুর পরে অনন্ত জীবন > 📄 সুপারিশের শর্ত

📄 সুপারিশের শর্ত


উপরে আমরা সুপারিশ সম্পর্কে যে আলোচনা করেছি যে কিয়ামত দিবসের ভয়াবহতা ও দুঃখ কষ্ট লাঘবের জন্য অনেকেই আল্লাহর কাছে সুপারিশ করার সুযোগ লাভ করবেন। তবে এ ক্ষেত্রে কিছু শর্ত রয়েছে। শর্তগুলো হল:
১. সুপারিশ আল্লাহর কাছে যে কেউ করতে পারবে না। সুপারিশকারীকে অবশ্যই আল্লাহ তা'আলার অনুমতি প্রাপ্ত হতে হবে। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন:
مَنْ ذَا الَّذِي يَشْفَعُ عِنْدَهُ إِلَّا بِإِذْنِهِ .
"কে আছে এমন, যে আল্লাহর কাছে তার অনুমতি ছাড়া সুপারিশ করবে?"১৭০ অর্থাৎ আল্লাহর কাছে তার অনুমতি বিহীন কেউ কোন সুপারিশ করতে পারবে না। কাজেই কোন মুমিন ব্যতীত কোন কাফের মুশরিক আল্লাহর কাছে কোন ধরণের সুপারিশ করার সুযোগ পাবে না। ২. যার জন্য সুপারিশ করা হবে সে এমন হতে হবে যার জন্য সুপারিশ করার আল্লাহর অনুমতি আছে। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তা'আলা বলেন:
وَلَا يَشْفَعُونَ إِلَّا لِمَنِ ارْتَضَى.
"কেবল সেই সব লোকদের জন্য সুপারিশ করা হবে যাদের ব্যাপারে আল্লাহর সম্মতি আছে। "১৭১ আল্লাহ তা'আলা আরও বলেন:
وَكَمْ مِنْ مَلَكَ فِي السَّمَاوَاتِ لَا تُغْنِي شَفَاعَتُهُمْ شَيْئًا إِلَّا مِنْ بَعْدِ أَنْ يَأْذَنَ اللَّهُ لِمَنْ يَشَاءُ وَيَرْضَى .
"আসমানে অনেক ফেরেস্তা রয়েছেন তাদের সুপারিশ কোন ফলপ্রসু হয়না যতক্ষণ না যার জন্য ইচ্ছা ও যাকে পছন্দ করেন অনুমতি দেন। "১৭২
কাজেই আল্লাহর অনুমতি বিহীন কেউ কারো জন্য সুপারিশ করতে পারবে না।
৩. যার জন্য সুপারিশ করা হবে তাকে অবশ্যই মুমিন হতে হবে। কোন অমুমিন কাফের মুশরিকের জন্য কেউ কখনও সুপারিশ করতে পারবে না। সুপারিশ করার অনুমতিও পাবে না। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
إِنَّ الَّذِينَ كَفَرُوا مِنْ أَهْلِ الْكِتَابِ وَالْمُشْرِكِينَ فِي نَارِ جَهَنَّمَ خَالِدِينَ فِيهَا أُوْلَئِكَ هُمْ شَرُّ الْبَرِيَّةِ .
"আহলে কিতাব ও মুশরিকদের মধ্যে যারা কুফরী করে তারা জাহান্নামবাসী হবে তাতে চিরস্থায়ী হবে। তারাই হলো নিকৃষ্টতম জীব।”১৭৩
আলোচ্য আয়াতে সুপারিশের কথা না থাকলেও বুঝা যায় যে, যেহেতু তারা চিরস্থায়ীভাবে জাহান্নামী হবে বলে এখানে ঘোষণা দেয়া হয়েছে। তাই এখান থেকে বুঝা যায় যে, তারা কোন সুপারিশ লাভ করবেনা। কোন সুপারিশ তাদের কোন কাজেও আসবে না। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
فَمَا تَنْفَعُهُمْ شَفَاعَةُ الشَّافِعِينَ .
"সুপারিশকারীদের কোন সুপারিশ তাদের কোন কাজে আসবে না। "১৭৪
ইতিপূর্বে আমরা আলোচনা করেছি যে, রাসূলুল্লাহ্ সা. তার চাচা আবু তালিবের জন্য সুপারিশ করবেন, আমরা একটা হাদীসও এ মর্মে উল্লেখ করেছি যে রাসূলুল্লাহ্ সা. এর সুপারিশের কারণে তার শাস্তি জাহান্নামে কমিয়ে দেয়া হবে। তিনি ইসলাম গ্রহণ করেননি, কাফিরই ছিলেন, এটা কি করে সম্ভব?
এ প্রশ্নের জবাবে বলা যায় যে, আবু তালিব ইসলাম গ্রহণ না করা সত্ত্বেও তার জন্য মহানবী (সা.) এর সুপারিশ করণের ব্যপারটি মহানবী (সা.) এর জন্য আল্লাহর পক্ষ হতে দেয়া একটা বিশেষত্ব। কাজেই তা একটা ব্যতিক্রম ধর্মী ব্যপার। আর আমরা যা বলেছি তা কাফেরদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।
কিছু কিছু মনিষীর মতে রাসূলুল্লাহ্ সা.-এর চাচা আবু তালিবের জন্য সুপারিশ করা হবে তাকে জাহান্নাম হতে বের করার জন্য নয়, তা হবে জাহান্নামে শাস্তি হালকা করে দেয়ার জন্য কিংবা কমিয়ে দেয়ার জন্য। কাজেই উভয় বক্তব্যে কোন বিরোধ নেই। কেননা কাফেরদেরকে জাহান্নাম থেকে বের করার জন্যই কেউ সুপারিশ করতে পারবে না। আর কেউ করলে এর দ্বারা তাদের ন্যূনতম উপকারও হবে না।
এ প্রসঙ্গে ইমাম বাইহাকীর অভিমত হল, কাফেরদের জন্য সুপারিশ করা যাবে না একথাটা আমরা নির্ভরযোগ্য দলিলের ভিত্তিতে বলছি। এবং সে দলিলগুলো প্রমাণ করে সাধারণ কাফেরদের জন্য কেউ সুপারিশ করতে পারবে না। অন্য দিকে অপর কোন কাফেরদের জন্য যদি বিশেষ কেউ সুপারিশ করতে পারবেন এবং করবেন এমন কথা নির্ভরযোগ্য দলিল দ্বারা প্রমাণ হয় তাহলে তা আমাদেরকে গ্রহণ করতে হবে। আর এতদ্ উভয় কথার মধ্যে কোন বিরোধ পরিলক্ষিত মনে করা যাবে না। কোন নিষিদ্ধ হল সাধারণ, আর অনুমতি হল ব্যতিক্রম। ১৭৫
কেবল সেই লোকই আল্লাহর অনুমতি দেয়া লোকের জন্য সুপারিশ করতে পারবেন। কাজেই এ থেকে প্রমাণিত হল যে, সুপারিশের প্রকৃত মালিক আল্লাহ তাই আল্লাহ তা'আলা বলেন:
قُلْ لِلَّهِ الشَّفَاعَةُ جَمِيعًا
"বল, সমস্ত সুপারিশ তো কেবল আল্লাহর জন্য নিদিষ্ট।" (সূরা যুমার, ৪৪।)
সুতরাং সুপারিশ চাইতে হলে তা একমাত্র আল্লাহর কাছেই চাইতে হবে। কাজেই যারাই কিয়ামত দিবসে মহানবী (সা.)-এর সুপারিশ পেতে চায় তাদেরকে নিম্নোক্ত কাজগুলো করতে হবে।
১. এখলাছ বা নিষ্ঠার সাথে ইবাদত করতে হবে। কাজেই আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে ইবাদতে শরীক করা যাবে না। ইবাদত একমাত্র আল্লাহ তা'আলার সন্তুষ্টি লাভের উদ্দিশ্যে করতে হবে। এ প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ্ সা. বলেন: যে ব্যক্তি নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সাথে বলবে লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ, সে ব্যক্তিই আমার সুপারিশ লাভের জন্য বেশী উপযোগী।” (বুখারী, ৬০৮৫)
আল্লাহর কাছে রাসূলুল্লাহ্ সা.-এর জন্য অসিলা বেশী করে কামনা করতে হবে এবং বেশী বেশী মহানবী (সা.)-এর জন্য দোয়া করতে হবে। কারণ মহানবী (সা.) বলেন: কারণ অসিলা হল জান্নাতের একটা বিশেষ স্তর। আল্লাহ কেবল একজন বান্দাহ তার উপযোগী বিবেচিত হবে। আশা করি আমিই তার উপযোগী হবো। যে আল্লাহর কাছে আমার জন্য অসিলা চাইবে তার জন্য (আমার) সুপারিশ বৈধ হবে।" (মুসলিম, ৫৭৭, তিরমিযি, ৩৫৪৭, নাসায়ী, ৬৭১, আবু দাউদ, ৪৩৯।)

টিকাঃ
১৭০ সূরা বাকারা: ২৫৫।
১৭১ সূরা আল আম্বিয়া, ২৮।
১৭২ সূরা নাজম, ২৬।
১৭৩ সূরা আল বাইয়্যেনাহ: ৬।
১৭৪ সূরা ৪৮।
১৭৫ ইবনে হাজর আসকালানী, ফাহুলবারী, খঃ ১১, পৃ-৪৩১।

📘 মৃত্যুর পরে অনন্ত জীবন > 📄 মানুষের চিরস্থায়ী বাসস্থান জান্নাত অথবা জাহান্নাম

📄 মানুষের চিরস্থায়ী বাসস্থান জান্নাত অথবা জাহান্নাম


দুনিয়া আমলের জগত আর আখিরাত প্রতিদানের জগত। বারযাখী জিন্দেগিতে ও কিয়ামতের মাঠে বিচ্ছিন্ন হবে না। যেমন দুইজন ফেরেশতা মৃতকে তার কবরে প্রশ্ন করবে, সমস্ত মখলুককে সিজদার জন্য আহ্বান করা হবে কিয়ামতের দিনে, পাগলদের এবং দুই জন নবী-রসূল প্রেরণের মাঝে যারা মারা গেছে তাদের পরীক্ষা। অতপর বান্দার আমল ও ঈমান অনুপাতে আল্লাহ তা'য়ালা তাদের মাঝে ফয়সালা করবেন। একদল হবে জান্নাতী আর অপর দল হবে জাহান্নামী। আল্লাহ্ তা'আলা বলেন:
وَكَذَلِكَ أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ قُرْآنًا عَرَبِيًّا لِتُنْذِرَ أُمَّ الْقُرَى وَمَنْ حَوْلَهَا وَتُنْذِرَ يَوْمَ الْجَمْعِ لَا رَيْبَ فِيهِ فَرِيقٌ فِي الْجَنَّةِ وَفَرِيقٌ فِي السَّعِيرِ.
"এমনিভাবে আমি আপনার প্রতি আরবি ভাষায় কুরআন নাজিল করেছি, যাতে আপনি মক্কা ও তার আশ-পাশের লোকদের সতর্ক করেন এবং সতর্ক করেন সমাবেশের দিন সম্পর্কে, যাকে কোন সন্দেহ নেই। একদল জান্নাতে এবং একদল জাহান্নামে প্রবেশ করবে।"১৭৬
অপর এক আয়াতে আল্লাহ্ তা'আলা বলেন:
الْمُلْكُ يَوْمَئِذٍ لِلَّهِ يَحْكُمُ بَيْنَهُمْ فَالَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ فِي جَنَّاتِ النَّعِيمِ ، وَالَّذِينَ كَفَرُوا وَكَذَّبُوا بِآيَاتِنَا فَأُوْلَئِكَ لَهُمْ عَذَابٌ مُهِينٌ .
"রাজত্ব সেদিন আল্লাহরই; তিনিই তাদের বিচার করবেন। অতএব, যারা বিশ্বাস স্থাপন করে এবং সৎকর্ম সম্পাদন করে তারা নিয়ামতপূর্ণ কাননে থাকবে। আর যারা কুফরি করে এবং আমার আয়াতসমূহকে মিথ্যা বলে তাদের জন্যে লাঞ্ছনাকর শাস্তি রয়েছে।” (হাজ; ৫৬-৫৭।)
কিয়ামতের দিন মানুষ বিভক্ত হয়ে পড়বে। সেদিন যারা সৎকাজের অংশীদারী হবে তারা জান্নাতে যাবে। আর যারা অসৎকাজের ভাগীদার তারা জাহান্নামে যাবে।

টিকাঃ
১৭৬. সূরা শূরা: ৭।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00