📘 মৃত্যুর পরে অনন্ত জীবন > 📄 দ্বিতীয় বার পুনর্জীবন লাভ

📄 দ্বিতীয় বার পুনর্জীবন লাভ


আমরা ইতিপূর্বে আলোচনা করেছি যে দ্বিতীয় বারের মত শিংগায় ফুৎকার দেয়ার পর দ্বিতীয় বার সমস্ত প্রাণি জগত জীবন লাভ করবে। অর্থাৎ সমস্ত প্রাণি জাতি তাদের দেহ ও আত্মা পুনরায় ফিরে পাবে এবং কবর থেকে সকলের পুনরুত্থান হবে। এবং এ পুনরুত্থানটি হবে মানবাঙ্গের "আজবুযয যানব" নামক একটা অস্তি থেকে, যা আল্লাহর হুকুমে বাকি থাকবে। তা আধুনিক বৈজ্ঞানিকদের কথা মত ডি.এন.এ-ও হতে পারে। এ প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ্ সা. বলেছেন: মানুষের সবকিছু বিলীন হয়ে যাবে। তবে তার আজবুয যানব নামক জিনিসটি বিলীন হবে না। সেখান থেকেই সৃষ্টি জাতির পুনরুত্থান হবে।"৮৯

আবু ইয়ালা ও হাকেমের এক বর্ণনায় আছে, রাসূলুল্লাহ্ সা.-কে জিজ্ঞেস করা হলো, 'আজবুষ যাবন' জিনিটি কি? তিনি বললেন সেটা শর্ষে পরিমাণের একটা জিনিস।"৯০

এ জিনিস থেকেই সমস্ত মানব জাতিকে পুনরুত্থান করা হবে। যেমন পূর্বোক্ত হাদীসে আছে। এ প্রসঙ্গে ইবনে আকীল বলেন: এতে আল্লাহ্ তা'আলা একটা গোপন রহস্য রয়েছে। সে রহস্যের বলেন: এতে আল্লাহ ছাড়া আর কেউ জানেন না। কারণ যিনি অনস্তিত্ত্ব থেকে অস্তিত্ত্ব দান করতে পারেন তিনি কোন কিছু থেকে পুনরুত্থান করার প্রয়োজন পড়ে না।"৯১

দ্বিতীয় বার বস্তুগত জীবন লাভের দিকে ইঙ্গিত করে আল্লাহ্ তা'আলা বলেন:

وَاسْتَمِعُ يَوْمَ يُنَادِ الْمُنَادِي مِنْ مَكَانٍ قَرِيبٍ يَوْمَ يَسْمَعُونَ الصَّيْحَةَ بِالْحَقِّ ذَلِكَ يَوْمُ الْخُرُوجِ . إِنَّا نَحْنُ نُحْيِي وَنُمِيتُ وَإِلَيْنَا الْمَصِيرُ . يَوْمَ تَشَقَّقُ الْأَرْضُ عَنْهُمْ سِرَاعًا ذَلِكَ حَشْرٌ عَلَيْنَا يَسِيرٌ.

"যে দিন তারা সত্য সত্যি বিকট শব্দ শুনতে পাবে সেদিনটি হবে (কবর হতে) বের হবার দিন। আমি জীবন দান করি মৃত্যু সেটাই এবং সকলের প্রত্যাবর্তন আমারই দিকে। যেদিন পৃথিবী বিদীর্ণ হবে এবং মানুষ বের হয়ে আসবে ত্রস্ত ব্যাস্ত হয়ে এই সমবেত সমাবেশ করণ আমার জন্য সহজ।"৯২ আল্লাহ্ তা'আলা আরও বলেন:

أَيَحْسَبُ الْإِنْسَانُ أَلَنْ نَجْمَعَ عِظَامَهُ . بَلَى قَادِرِينَ عَلَى أَنْ نُسَوِّيَ بَنَانَهُ.

"মানুষরা কি মনে করে আমরা তাদের অস্থিসমূহ একত্রিত করতে পারব না? হ্যাঁ, আমি তাদের অস্থিসমূহের অগ্রভাগ পর্যন্ত পূর্ণ বিন্যস্ত করতে সক্ষম।"৯৩ আল্লাহ্ তা'আলা আরও বলেন:

وَنُفِخَ فِي الصُّورِ فَإِذَا هُمْ مِنَ الْأَجْدَاثِ إِلَى رَبِّهِمْ يَنسِلُونَ . قَالُوا يَا وَيْلَنَا مَنْ بَعَثَنَا مِنْ مَرْ قَدِنَا هُذَا مَا وَعَدَ الرَّحْمَانُ وَصَدَقَ الْمُرْسَلُونَ . إِنْ كَانَتْ إِلَّا صَيْحَةً وَاحِدَةً فَإِذَا هُمْ جَمِيعٌ لَدَيْنَا مُحْضَرُونَ .

"আর যখন শিংগায় ফুৎকার দেয়া হবে তখন তারা সকলে তাদের কবর থেকে তাদের প্রভুর দিকে ছুটে আসবে। তারা বলবে হায় দুর্ভোগ কে আমাদেরকে নিদ্রাস্থল হতে উঠিয়েছে? এতে সেই যা দয়াময় মেহেরবান ওয়াদা করেছিল। আর রাসূল সত্য বলেছিল। তা ছিল এক মহা চিৎকার তখন সকলেই আমার কাছে উপস্থিত হবে।"৯৪ আল্লাহ্ তা'আলা আরও বলেন:

قُلْ هُوَ الَّذِي ذَرَأَكُمْ فِي الْأَرْضِ وَإِلَيْهِ تُحْشَرُونَ .

"বল তিনিই পৃথিবীতে তোমাদেরকে ছড়াইয়ে দিয়েছেন। এবং তার নিকট তোমাদেরকে সমবেত করা হবে।"৯৫ আল্লাহ্ তা'আলা আরও বলেন:

ثُمَّ إِنَّكُمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ تُبْعَثُونَ .

"অতপর তোমরা কিয়ামত দিবসে পুনরোথিত হবে।"৯৬

টিকাঃ
৮৯ বুখারী, হাদীস নং- ৪৪৪০; মুসলিম, হাদীস নং- ৫২৫৩।
৯০ হাকেম, ও আবু ইয়ালা।
৯১ ইবনে হাজর আসকালানী, ফাতহুল বারী, খ.৮, পৃঃ ৫৫২।
৯২ সূরা কাফ: ৪২-৪৪।
৯৩ সূরা কিয়ামা: ৩-৪।
৯৪ সূরা ইয়াসিন, ৫১-৫৩।
৯৫ সূরা মূলক: ২৪।
৯৬ সূরা মুমেনুন: ১৬।

📘 মৃত্যুর পরে অনন্ত জীবন > 📄 বিচারের জন্য সমস্ত সৃষ্টি জগতকে একত্রিকরণ

📄 বিচারের জন্য সমস্ত সৃষ্টি জগতকে একত্রিকরণ


বিচারের জন্য সমস্ত সৃষ্টি জগতকে কিয়ামত দিবসে একত্রিত করণ বুঝাবার জন্য পবিত্র কুরআনে হাশর শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। পবিত্র কুরআন এবং সহীহ হাদীসে সমস্ত সৃষ্টি জগতকে এ দুনিয়ার কৃত কর্মের বিচার ফায়সালা করার জন্য একত্রিত করা মর্মে অনেক বিবরণ এসেছে। আমরা এখানে তার কিছু বিবরণ পেশ করছি।
১। মানুষ জ্বিন ফেরেশতা পশু পাখী ইত্যাদিকে বিচারের জন্য একত্রিত করণ প্রসঙ্গে:
মানুষ ও জ্বিন জাতিকে তো এজন্যই একত্রিত করা হবে যে তারা মুকাল্লাফ বা আল্লাহর আদেশ নিষেধ পালনের দায়িত্ব প্রাপ্ত ও কর্তব্য অর্পিত। সুতরাং এই দুনিয়ার কৃত কর্মের জন্য তাদেরকে একত্রিত করে হিসাব নিকাশ নেয়া হবে এবং বিচার ফায়সালা করা হবে। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্ তা'আলা বলেন:
يَا مَعْشَرَ الْجِنِّ وَالْإِنسِ أَلَمْ يَأْتِكُمْ رُسُلٌ مِنْكُمْ يَقُضُّونَ عَلَيْكُمْ آيَاتِي وَيُنْذِرُونَكُمْ لِقَاءَ يَوْمِكُمْ هَذَا قَالُوا شَهِدْنَا عَلَى أَنْفُسِنَا وَغَرَّتْهُمُ الْحَيَاةُ الدُّنْيَا وَشَهِدُوا عَلَى أَنْفُسِهِمْ أَنَّهُمْ كَانُوا كَافِرِينَ
"হে জ্বিন ও মানুষের দল তোমাদের কাছে কি আমার রাসূলগণ আসেননি তোমার কাছে আমার আয়াত পৌছাবার জন্য এবং তোমদেরকে আজকের দিনকে সতর্ক করার জন্য। তারা বলবে আমরা আমাদের নিজেদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিচ্ছি। দুনিয়ার জীবন তাদেরকে প্রতারনায় ফেলেছে। এবং তারা তাদের নিজেদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিবে যে তারা অস্বীকারকারী ছিল।"৯৭
আর ফেরেস্তাদের হাশর হবে তাদের মধ্যে আল্লাহর ফায়সালা বিধান এবং আল্লাহ্ তা'আলা কর্তৃক তাদের জন্য নির্ধারিত দায়িত্ব পালনের জন্য। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্ তা'আলা আরও বলেন:
تَعْرُجُ الْمَلَائِكَةُ وَالرُّوحُ إِلَيْهِ فِي يَوْمٍ كَانَ مِقْدَارُهُ خَمْسِينَ أَلْفَ سَنَةٍ.
"ফেরেস্তা এবং রূহ আল্লাহর দিকে উর্ধ্বগামী হবে এমন এক দিন যা হবে পার্থিব জীবনের পঞ্চাশ হাজার বছরের সমান।"৯৮ আল্লাহ্ তা'আলা আরও বলেন:
يَوْمَ يَقُومُ الرُّوحُ وَالْمَلَائِكَةُ صَفًّا لَا يَتَكَلَّمُونَ إِلَّا مَنْ أَذِنَ لَهُ الرَّحْمَانُ وَقَالَ صَوَابًا.
"সেদিন রূহ (জিব্রাঈল) ও ফেরেস্তারা সারিবদ্ধভাবে দণ্ডায়মান হবে দয়ালু আল্লাহ যাকে অনুমতি দিবেন তিনি ছাড়া আর কেউ কথা বলবে না। এবং সত্য কথা বলবে।"৯৯ আল্লাহ্ তা'আলা আরও বলেন:
نَارًا وَقُودُهَا النَّاسُ وَالْحِجَارَةُ عَلَيْهَا مَلَائِكَةٌ غِلَاظٌ شِدَادٌ لَا يَعْصُونَ اللَّهَ مَا أَمَرَهُمْ وَيَفْعَلُونَ مَا يُؤْمَرُونَ .
"এমন আগুন হতে যার ইন্ধন হবে মানুষ ও পাথর। যাতে নিয়োজিত আছে নির্মম হৃদয়ের কঠোর স্বভাবের ফেরেস্তাগণ। যারা আল্লাহর আদেশ অমান্য করে না। এবং যা আদেশ করা হয় তা পালন করে।"১০০ এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্ তা'আলা বলেন:
وَتَرَى الْمَلَائِكَةَ حَافِينَ مِنْ حَوْلِ الْعَرْشِ يُسَبِّحُونَ بِحَمْدِ رَبِّهِمْ وَقُضِيَ بَيْنَهُمْ بِالْحَقِّ .
"আর যেদিন আপনি দেখতে পাবেন আরশের চার পাশে বেষ্টনকারী ফেরেস্তাদেরকে তারা তাদের প্রতিপালকের তাছবীহ পড়ছে। আর তাদের মধ্যে ন্যায়নীতি অনুযায়ী ফায়সালা করা হবে।"১০১ আর পশু পাখির হাশর হবে তাদের মধ্যে যেসব পশুপাখি অন্যপশু পাখির প্রতি এ পৃথিবীতে থাকতে কোন প্রকারের জুলুম করেছিল সে জুলুমের প্রতিশোধ গ্রহনের জন্য। আবু হুরাইরার (রা.) মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ্ সা. থেকে বর্ণিত এক হাদীসে রাসূলুল্লাহ্ সা. বলেন: কিয়ামত দিবসে প্রত্যেক হক ও অধিকার প্রাপককে তার হক পাইয়ে দেয়া হবে। এমনকি শিংহীন ছাগল থেকে শিং বিশিষ্ট ছাগল থেকে তার আঘাতের প্রতিশোধ নেয়া হবে। ১০২ এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্ তা'আলা বলেন:
وَمَا مِنْ دَابَّةٍ فِي الْأَرْضِ وَلَا طَائِرٍ يَطِيرُ بِجَنَاحَيْهِ إِلَّا أُمَمٌ أَمْثَالُكُمْ مَا فَرَّطْنَا فِي الْكِتَابِ مِنْ شَيْءٍ ثُمَّ إِلَى رَبِّهِمْ يُحْشَرُونَ.
"ভূপৃষ্ঠে বিচরণশীল এমন জীব নেই অথবা নিজ ডানার সাহায্যে এমন কোন পাখি উড়ে না যা তোমাদের মত একটি উম্মত নয়। কিতাবে কোন কিছুই আমি বাদ দিইনি। অতপর স্বীয় প্রতিপালকের দিকে তাদের সকলকে জমায়েত করা হবে।"১০৩
২। মানুষের নগ্ন পা নগ্ন দেহ এবং খত্নাবিহীন অবস্থায় হাশর হবে যেসব প্রথমে জন্ম গ্রহণ করেছিল এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্ তা'আলা বলেন:
كَمَا بَدَأْنَا أَوَّلَ خَلْقٍ نُعِيدُهُ وَعْدًا عَلَيْنَا إِنَّا كُنَّا فَاعِلِينَ .
"যেভাবে আমি সৃষ্টির সূচনা করেছিলাম সেভাবেই পুনরায় সৃষ্টি করব। প্রতিশ্রুতি পালন আমার কর্তব্য। আমি অবশ্যই তা পালন করব।"১০৪ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন রাসূলুল্লাহ্ সা. বলেন: তোমাদের আল্লাহর কাছে নগ্ন পায়ে নগ্ন দেহে এবং খৎনাবিহীন অবস্থায় জমায়েত (হাশর) করা হবে। যেভাবে সৃষ্টির সূচনা করেছিলাম সেভাবেই পূনরায় সৃষ্টি করব। আমরা তা অবশ্যই করব।”১০৫
৩। ভিন্ন ভিন্ন দলে মানুষের হাশর হবে কিয়ামত দিবসের ভয়াবহতার কারণে মানুষজনের ভিন্ন ভিন্ন দলে হাশর হবে। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্ তা'আলা বলেন:
يَوْمَئِذٍ يَصْدُرُ النَّاسُ أَشْتَاتًا لِيُرَوْا أَعْمَالَهُمْ .
"সেদিন মানুষ ভিন্ন ভিন্ন দলে বের হবে। তাদেরকে তাদের কৃতকর্ম দেখানো হবে। "১০৬
৪। কাফেরদের অন্ধ বোবা ও বহরাবস্থায় হাশর হবে পবিত্র কুরআনে এ প্রসঙ্গে বলা হয়েছে:
وَنَحْشُرُهُمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ عَلَى وُجُوهِهِمْ عُمْيًا وَبُكْما وَصُمَّا مَأْوَاهُمْ جَهَنَّمُ كُلَّمَا خَبَتْ زِدْنَاهُمْ سَعِيرًا . ذَلِكَ جَزَاؤُهُمْ بِأَنَّهُمْ كَفَرُوا بِآيَاتِنَا وَقَالُوا أَئِذَا كُنَّا عِظَامًا وَرُفَاتًا أَئِنَا لَمَبْعُوثُونَ خَلْقًا جَدِيدًا .
"কিয়ামতের দিন আমি তাদের (কাফের)-কে সমবেত করব তাদের মুখের উপর ভর দিয়ে চলাবস্থায়। অন্ধ মুক ও বধির করে। তাদের আবাসস্থল হবে জাহান্নাম। যখনই তা স্তিমিত হবে আমি তখনই তাদের জন্য অগ্নিশিখা বৃদ্ধি করে দিব। এটাই তাদের প্রতিফল। এজনই যে তারা আমার আয়াত সমূহ অস্বীকার করেছে। এবং বলেছে আমাদের অস্তিসমূহ চূর্ণ বিচূর্ণ হলেও কি আমরা নতুন সৃষ্টি রূপে পুনরোত্থিত হবো?”১০৭
এ প্রসঙ্গে আনাছ ইবনে মালেক (রা.) থেকে বর্ণিত এক হাদীসে আছে, বলা হল হে আল্লাহর রাসূল! মানুষকে কি করে মুখমণ্ডলের উপর ভয় করে হাশর (সমবেত) করা হবে? রাসূলুল্লাহ্ সা. উত্তরে বললেন: যিনি তাদের পায়ের উপর হাটাতে সক্ষম তিনি তাদেরকে মুখমণ্ডলের উপর ভর দিয়ে চলাতেও সক্ষম। "১০৮
অপর এক হাদীসে আছে মানুষকে তিনটি দরে বিভক্ত করে হাশr বা সমবেত করা হবে। এক দল থাকবে আরোহী ভরা পেটে পোশাক পরিধান করাবস্থায়। অপর এক দল পথচারী ও দ্রুতগামী অবস্থায়। আর এক দলের সাথে থাকবে ফেরেস্তারা তারা তাদেরকে হাকিয়ে মুখমণ্ডলের উপর ভর করে হাটিয়ে নিয়ে যাবে জাহান্নামের দিকে। "১০৯
৫। আপরাধীদের হাশর হবে নীল চোখ বিশিষ্ট অবস্থায় নীল চোখ বলতে আরবীতে বুঝানো হয় ভীতসন্ত্রস্ততার কারণে চোখে শর্ষেফুল দেখা তথা কিছু দেখতে না পাওয়া অবস্থাকে। কাফেরদের এরূপ অবস্থায় হাশর হওয়া এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্ তা'আলা বলেন:
وَنَحْشُرُ الْمُجْرِمِينَ يَوْمَئِذٍ زُرْقًا .
"সেদিন আমি অপরাধীদের নীলচক্ষু অবস্থায় সমবেত করব। "১১০
৬। অবস্থান স্থলের দিকে এস্ত-ব্যস্ত হয়ে সমবেত হবে সকল মানুষ কিয়ামতের দিন কবর থেকে উঠে ব্যাস্ত হয়ে সমবেত হবে। আল্লাহ্ তা'আলা বলেন:
يَوْمَ تَشَقَّقُ الْأَرْضُ عَنْهُمْ سِرَاعًا ذَلِكَ حَشْرٌ عَلَيْنَا يَسِيرُ .
"যে দিন পৃথিবী বিদীর্ণ হবে এবং মানুষ বের হয়ে আসবে ব্যাস্ত হয়ে, এভাবে সমবেতকরণ আমার জন্য সহজ।”১১১
ইবনে কাসীর এ আয়াতের তাফসীর প্রসঙ্গে বলেন: তা হবে এভাবে যে, আল্লাহ্ তা'আলা আসমান হতে বৃষ্টি বর্ষণ করাবেন সে বৃষ্টির ফলে সমস্ত মানুষের দেহ তাদের কবর থেকে পূর্ণ অস্তিত্ব লাভ করবে যেভাবে পানির কারণে মাটিতে বীজের উদগমন হয়। আর যখন দেহ পূর্ণতা লাভ করবে তখন আল্লাহ্ তা'আলা ইস্রাফিলকে আদেশ করবেন শিংগায় ফুৎকার দিতে। তখন ফুৎকার দেয়া হবে। আর যখন তাতে ফুৎকার দেয়া হবে তখন সমস্ত রূহ আসমান জমিনের মধ্যে ঘুরতে থাকবে। তখন আল্লাহ্ তা'আলা বলবেন। আমার ইজ্জত ও মর্যাদার কসম! প্রত্যেক রূহ যেন নিজেদের পূর্বের দেহে ফিরে যায়। তখন সকল রূহ ফিরে যাবে তার দেহে। বিষ যেমন দেহের মধ্যে তেমনি ছড়িয়ে পড়ে রূহ ও তার মধ্যে ছড়িয়ে পড়বে। তখন মাটি তাদের উপর থেকে বিদীর্ণ করা হবে। তখন তারা অবস্থান স্থলের দিকে ত্রস্ত-ব্যাস্ত হয়ে আল্লাহ আদেশ পালনার্থে ছুটতে থাকবে। ১১২
৭। ভিক্ষুকদের অবস্থা আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ্ সা. বলেছেন: মানুষ লোকদের কাছে হাত পাততে থাকবে (ভিক্ষা করতে থাকবে) অবশেষে কিয়ামত দিবসে সে এমন অবস্থায় আসবে যে তার মুখমণ্ডলে কোন গোস্ত থাকবে না। "১১৩
৮। এক স্ত্রীর প্রতি যারা বেশী ধাবিত হয় তাদের অবস্থা যার একাধিক স্ত্রী আছে সে যদি তার কোন স্ত্রীর প্রতি বেশী ধাবিত হয় তাদের মধ্যে সুবিচার ও ইনসাফ করে কোন এক স্ত্রীর প্রতি ঝুকে পড়ে তাকে সুযোগ সুবিধা বেশী দেয় তাহলে তার অবস্থা হবে নিম্নরূপ। আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ্ সা. বলেছেন, যার দুজন স্ত্রী আছে সে যদি দুজনের একজনের প্রতি ধাবিত হয় অন্যজনকে অবজ্ঞা করে কিয়ামত দিবসে সে এমন অবস্থায় উপস্থিত হবে যে তার (শরীরের) একদিক ঝুকে থাকবে।”১১৪
সমস্ত উপস্থিত জনজণ তা দেখতে পাবে। তাদের এ অবস্থার উদ্দেশ্য শাস্তির পরিমাণ বৃদ্ধি করা ও অন্যদের সামনে লজ্জিত করা।
৯। হত্যকারী ও হত্যাকৃত ব্যক্তির অবস্থা আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন : কিয়ামত দিবসে হত্যাকৃত ব্যক্তি এক হাতে হত্যাকারীকে ধরে আর অপর হাতে তার নিজের মাথা নিয়ে উপস্থিত হবে। অতপর সে বলবে হে আমার প্রভু! আপনি একে জিজ্ঞেস করুন সে আমাকে কেন হত্যা করে ছিল? রাসূলুল্লাহ্ সা. বলেন সে তখন বলবে আমি তাকে হত্যা করেছিলাম অমুকের ইজ্জত রক্ষার জন্য। রাসূলুল্লাহ্ সা. বলেন: কিন্তু সে তার (বোঝা বহন করবেনা। তিনি বলেন: অতপর জাহান্নামে সত্তর বছর পর্যন্ত নিক্ষেপ করা হবে। "১১৫
১০। কোন মুসলমানের হত্যায় সহযোগীর অবস্থা আবু হুরাইরা হতে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ্ সা. বলেছেন, যে ব্যক্তি কোন মুসলমানকে হত্যার কাজে সহযোগিতা করে এমন কি অর্ধ শব্দ দ্বারাও সে কিয়ামত দিবসে আসবে তখন তার দুচোখের মধ্যে লিখা থাকবে আব্দুল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ।"১১৬
১১। যাকাত আদায় না কারীর অবস্থা আবু হুরাইরা (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন রাসূলুল্লাহ্ সা. বলেছেন, যাকে আল্লাহ্ তা'আলা সম্পদ দান করেছেন কিন্তু সে তার যাকাত দিল না। তার জন্য কিয়ামত দিবসে দুটি দাত যুক্ত বিষধর সাপ ছেড়ে দেয়া হবে। এ সাপ দু'টি কিয়ামতের দিন তার গলায় বেড়ির মত পেচিয়ে থাকবে। অতপর তার উভয় চোয়ালে জড়িয়ে বলবে, আমি তোমার সম্পদ, আমি তোমার সঞ্চিত অর্থ। তারপর রাসূল (সা.) নিম্ন লিখিত আয়াতটি তেলাওয়াত করলেন:
وَلَا يَحْسَبَنَّ الَّذِينَ يَبْخَلُونَ بِمَا آتَاهُمُ اللَّهُ مِنْ فَضْلِهِ هُوَ خَيْرًا لَهُمْ بَلْ هُوَ شَرٌّ لَهُمْ سَيُطَوَّقُونَ مَا بَخِلُوا بِهِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ
"এবং আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে যা তোমাদের দিয়েছেন তাতে যারা কৃপণতা করে তাদের জন্য তা মঙ্গল এটা যেন তারা কিছুতেই মনে না করে। এটা তাদের জন্য অমঙ্গল জনক। এতে যদি তারা কৃপণতা করবে কিয়ামতের দিন তা তাদের গলার বেড়ি হবে।"১১৭
১২। আমীর-ওমরাদের অবস্থা আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ্ সা. বলেছেন, যে ব্যক্তি ধৈর্যসহ এমন কোন শপথ! করল যার দ্বারা অপর কোন মুসলমানের সম্পদ কেড়ে নিল। সে কিয়ামত দিবসে আল্লাহর সাথে এমনাবস্থায় সাক্ষাৎ করবে যে আল্লাহ্ তা'আলা তখন তার উপর ক্রদ্ধ থাকবে না।"১১৮
এছাড়াও আরও অনেক মানুষ কিয়ামত দিবসে বিভিন্ন অবস্থায় উপস্থিত হবে, এ ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ্ সা. যা যা বলেছেন তা সবই আমরা বিশ্বাস করি যদি তা সঠিক ও সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হয়।

টিকাঃ
৯৭ সূরা আনআম: ১৩০।
৯৮ সূরা মাআরিজ: ৪।
৯৯ সূরা নাবা, ৩৮।
১০০ সূরা তাহরীম: ৬।
১০১ সূরা আয যুমার, ৭৫।
১০২ মুসলিম, ৪৬৭৯; তিরমিযি, ২৩৪৪; আহমদ, ৭৬৫৫।
১০৩ সূরা আনআম, ৩৮।
১০৪ সূরা আম্বিয়া, ১০৪।
১০৫ বুখারী, ৪৪৪০; মুসলিম, ৫২৫৩।
১০৬ সূরা যিলযাল, ৬।
১০৭ সূরা বনী ইস্রাঈল, ৯৭-৯৮।
১০৮ বুখারী, ৬০৪২; মুসলিম, ৫০২০; আহমদ, ১২২৪৭।
১০৯ আহমদ, ২০৪৮৩; নাসায়ী, ২০৫৯।
১১০ সূরা ত্বাহা, ১০২।
১১১ সূরা কাফ: ৪৪।
১১২ মুহাম্মদ আলী সাবুনী, মুখতাছর তাফসীর ইবনে কাসীর, খঃ৩, পৃ-৩৭৯।
১১৩ বুখারী, ১৩৮১, মুসলিম, ১৭২৫।
১১৪ আহমদ, ৯৭০৯; নাসায়ী, ৩৯৯১; তিরমিযি, ১০৬০; হাকেম হাদীসটি সহীহ বলে মন্তব্য করে।
১১৫ নাসায়ী, ৩৯৩২।
১১৬ ইবনে মাজাহ, ২৬১০।
১১৭ বুখারী, ১৩১৫; আয়াতটি সূরা আলে এমরানের ১৮০।
১১৮ মুসলিম, ১৯৭।

📘 মৃত্যুর পরে অনন্ত জীবন > 📄 হাশরের ময়দানের ভয়াবহ অবস্থা

📄 হাশরের ময়দানের ভয়াবহ অবস্থা


কুরআন ও বিভিন্ন হাদীস থেকে জানা যায় যে, হাশরের ময়দান হবে সমতল ভূমি। সেখানে কোন পাহাড় কোন উপশাখা কিংবা নদ-নদী থাকবে না। কোন নীচু ভূমি কিংবা টিলাও থাকবে না। আল্লাহ্ তা'আলা বলেন:
وَيَسْأَلُونَكَ عَنِ الْجِبَالِ فَقُلْ يَنْسِفُهَا رَبِّي نَسْفًا . فَيَذَرُهَا قَاعًا صَفْصَفًا . لَا تَرَى فِيهَا عِوَجًا وَلَا أَمْتًا
"তারা তোমাকে পর্বত সমূহ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে। বল আমার প্রতিপালক তার সমূলে উৎপাটন করে বিক্ষিপ্ত করে দিবেন। অতপর তিনি তাকে মসৃন সমতল ময়দানে পরিণত করবেন। যাতে তুমি বক্রতা ও উচ্চতা দেখতে পাবেনা।"১১৯ আল্লাহ্ তা'আলা আরও বলেন:
وَيَوْمَ نُسَيِّرُ الْجِبَالَ وَتَرَى الْأَرْضَ بَارِزَةً وَحَشَرْنَاهُمْ فَلَمْ نُغَادِرُ مِنْهُمْ أَحَدًا .
"স্মরণ কর সেদিনের কথা যেদিন পর্বত মালাকে সঞ্চালিত করব। এবং তুমি পৃথিবীকে দেখবে উন্মুক্ত প্রান্তর, সেদিন তাদের সকলকে আমি সমবেত করব। এবং তাদের কাউকে অব্যাহতি দিবনা।"১২০
হাদীস শরীফে আছে কিয়ামত দিবসে মানুষকে এক শুভ্র ঘাম পানিহীন পরিচ্ছন্ন সাদা ময়দার বুটির মত ভূমির উপর সমবেত করা হবে যেখানে কারো কোন চিহ্ন থাকবে না।"১২১

টিকাঃ
১১৯ সূরা ত্বাহাদীস নং- ১০৪-১০৭।
১২০ সূরা কাহফ, ৪৭।
১২১ বুখারী, ৬০৪০, মুসলিম, ৪৯৯৮।

📘 মৃত্যুর পরে অনন্ত জীবন > 📄 হাওযে কাউছারে অবতরণ

📄 হাওযে কাউছারে অবতরণ


'হাউযে কাউছার' জান্নাতের একটি প্রস্রবন বা ঝর্ণাধারা। হাউযে কাউছারের অমীয় পানি উম্মতে মুহাম্মদীকে বিশেষ মর্যাদা স্বরূপ পান করানো হবে। আল্লাহ্ তা'আলা নবী (সা.)-কেএ নহর দান করে তার উম্মত ও তাঁকে মর্যাদা দান করেছিলেন। এই হাওয সম্পর্কে হাদীস শরীফে বলা হয়েছে, আমার হাওয দীর্ঘতায় ঈলা থেকে ইয়ামানে সানায়া পর্যন্ত হবে। আর তাতে পান পাত্র থাকবে আকাশের নক্ষত্রের সমপরিমাণ।”১২২
আমরা এ হাওযের কথা বিশ্বাস করি কারণ তার সম্পর্কে বর্ণিত হাদীসের সনদ মুতাওয়াতির পর্যায়ের। এবং তা প্রায় ত্রিশের অধিক সাহাবী থেকে বর্ণিত হয়েছে। অপর এক হাদীসে আছে, প্রত্যেক নবীর জন্য নির্দিষ্ট 'হাওয' থাকবে। আমাদের নবীর হাওয হবে সব চেয়ে বড় সব চেয়ে উত্তম এবং তা থেকে পানকারীর সংখ্যা হবে সর্বাধিক। "১২৩
অপর এক হাদীসে আছে, প্রত্যেক নবীর জন্য নির্ধারিত হাওয আছে। তারা অহংকার করতে থাকবে কোনটা পানকারীর সংখ্যা তা নিয়ে আর আমি আশা করি আমার হাওযে পানকারীর সংখ্যা সর্বাধিক হবে। "১২৪
আমলনামা ওযনের মীযান ও খাওযের মধ্যে কোনটার অবস্থান আগে সে ব্যপারে আলেমদের মধ্যে মতভেদ আছে। কারো কারো মতে মীযান আগে। আবুল হাসান রহ. বলেন: সত্য কথা হল হাওযই আগে। আর কুরতুবী বলেন: যুক্তির দাবীও তাই। কারণ মানুষ কবর থেকে পিপাসার্থ অবস্থায় উঠে আসবে যেমনটি আমরা আগেই বলেছি। সুতরাং পিপাসার্থ মানুষের পিপাসা নিবারণের জন্য হাওযের অবস্থান আগে হবে মীযান ও পুলসিরাতের এটাই স্বাভাবিক। ১২৫
হাওয কাউছার হাশর ময়দানে সিরাতের আগে হওয়া যুক্তি সঙ্গত। কারণ কিছু মানুষকে হাওয কাউছারের পানি পান করতে দেয়া হবে না তারা পরে মুরতাদ হয়ে গিয়েছিল বলে। এ সব লোকেরা তো পুলসিরাত পার হতে পারার কথা নয়। ১২৬
এক হাদীসে আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ সা. বলেছেন, আমি তোমাদেরকে হাওয কাউছারে দ্রুত অতিক্রম করব। যে ব্যক্তি আমার পাশ দিয়ে যাবে সে তা থেকে পান করবে। আর যে পান করবে সে কখনও পিপাসিত হবে না। আমার কাছে কিছু মানুষ পান করবার জন্য আসবে। আমি তাদেরকে তারাও আমাকে চিনবে। অতপর তাদের ও আমার মধ্যে পর্দা নেমে আসবে। তখন আমি বলব ওরা তো আমার উম্মত। তখন বলা হবে আপনি জানেন না তারা আপনার পর কি বিদআত সৃষ্টি করেছে। তখন আমি বলব দূরে সরিয়ে দাও দূরে সরিয়ে দাও ঐসব লোকদেরকে যারা আমার পর (দ্বীনে) বিকৃতি সাধন করেছে। "১২৭

টিকাঃ
১২২ বুখারী, ৬০৯৪; মুসলিম, ৪২৫৮; তিরমিযি, ২৩৬৬।
১২৩ ইবনে মাজাহ, কিছু কিছু মুহাদ্দিস এ হাদীস দুর্বল বলেছেন।
১২৪ তিরমিযি, ২৩৬৭।
১২৫ ইবনুল ইজ্জ, শারহুল আকীদা আত ত্বাহাবিয়া, পৃ-৮২৮।
১২৬ প্রাগুক্ত, পৃ-২৭৯।
১২৭ বুখারী, ৬০৯৭।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00