📄 কবরের আযাব সত্য
আমরা কবরের নেয়ামত অথবা শাস্তি বলতে বারযাখের নেয়ামত অথবা শাস্তি বুঝি। সন্দেহ নেই যে বারযাখী জীবনটা আল্লাহ্ তা'আলার শান্তি কিংবা নেয়ামতের মাধ্যমে প্রতিদান দানের একটা স্তর। এ স্তরের প্রাথমিক পযায়ে মানুষের দেহ পঁচে গেলে তখন দেহ হতে রূহ আলাদা হয়ে যায়। কবরের নেয়ামত কিংবা আযাবের কথা পবিত্র কুরআন ও সহীহ হাদীস দ্বারা প্রামাণিত। এ প্রসঙ্গে পবিত্র কুরআনে বলা হয়:
وَحَاقَ بِآلِ فِرْعَوْنَ سُوءُ الْعَذَابِ النَّارُ يُعْرَضُونَ عَلَيْهَا غُدُوًّا وَعَشِيًّا وَيَوْمَ تَقُومُ السَّاعَةُ أَدْخِلُوا آلَ فِرْعَوْنَ أَشَدَّ الْعَذَابِ.
"সকাল সন্ধায় তাদেরকে আগুনের সামনে পেশ করা হয় এবং যে দিন কিয়ামত সংঘটিত হবে সেদিন আদেশ করা হবে ফির'আউন গোত্রকে কঠিনতর আযাবে দাখিল কর।"৫০
ইবনে কাসীর বলেন: এ আয়াতটি আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের বারযাখী জীবনে কবরের আযাব প্রমাণ করার একটি বড় ভিত্তি। সেই ভিত্তিটি হলো সকাল সন্ধ্যা তাদেরকে আগুনের সামনে পেশ করা হয়। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্ তা'আলা আরও বলেন:
فَذَرْهُمْ حَتَّى يُلَا قُوا يَوْمَهُمُ الَّذِي فِيهِ يُصْعَقُونَ . يَوْمَ لَا يُغْنِي عَنْهُمْ كَيْدُهُمْ شَيْئًا وَلَا هُمْ يُنصَرُونَ . وَإِنَّ لِلَّذِينَ ظَلَمُوا عَذَابًا دُونَ ذَلِكَ وَلَكِنَّ أَكْثَرَهُمْ لَا يَعْلَمُونَ
"তাদেরকে ছেড়ে দিন সে দিন পর্যন্ত যেদিন তাদের উপর বজ্রাঘাত পতিত হবে। সেদিন তাদের চক্রান্ত তাদের কোন উপরকারে আসবে না এবং তারা সাহায্য প্রাপ্তও হবে না। জালেমদের জন্য এছাড়াও আরও আযাব রয়েছে কিন্তু তাদের অধিকাংশই তা জানে না।"৫১
উপরোক্ত আয়াত গুলোতে জালেমদের জন্য এ ছাড়াও আরও অযাব রয়েছে কিন্তু তাদের অধিকাংশই তা জানেনা। এই বক্তব্যে বর্ণিত শান্তি ও আযাব দুনিয়াতেও হতে পারে। তাদেরকে হত্যা ইত্যাদির মাধ্যমে। আবার তা বারযাখেও হতে পারে। তবে এ আযাব বারযাখে হওয়াটাই যুক্তি সঙ্গত। কারণ তাদের অনেকেই দুনিয়াতে কোন শাস্তি না পেয়েই মারা যান। অথবা আয়াতের তাৎপর্য এর চেয়েও সাধারণ। ৫২
আল্লাহ্ তা'আলা আরও বলেন:
أَمْ حَسِبَ الَّذِينَ اجْتَرَحُوا السَّيِّئَاتِ أَنْ نَجْعَلَهُمْ كَالَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ سَوَاءٌ مَحْيَاهُمْ وَمَمَاتُهُمْ سَاءَ مَا يَحْكُمُونَ .
"যারা অপকর্ম করেছে তারা কি মনে করে যে, আমি তাদেরকে মুমিনদের মত ও সৎকর্মশীলদের মত করব? তাদের জীবন কাল ও মৃত্যু পরবর্তীকাল সমান হবে? তাদের এ ধারণা খুবই মন্দ। "৫৩
এ আয়াত থেকে জানা যায় যে, অপকর্মকারী এবং সৎকর্মশীল মুমিনের অবস্থান কখনও সমান হতে পারে না। তা জীবন কালেও না মৃত্যুর পরবর্তী জীবনেও না। এখানে 'মামাত' বলতে মৃত্যু পরবর্তী কাল বা বারযাখী জীবনের কথা বুঝানো হয়েছে। বারযাখী জীবনে যদি উভয়ে সমান না হয় তাহলে অবশ্যই অপকর্ম কারীরা শাস্তি বা আযাব ভোগ করবে। আর সৎকর্মশীল মুমিন না কবরে নেয়ামত ভোগ করবে। ৫৪
আর কবর আযাব প্রসঙ্গে সহীহ হাদীস সংখ্যা অনেক। আমরা এখানে পাঠকদের কয়েকটি উপস্থাপন করছি। ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত যে, তিনি বলেন রাসূলুল্লাহ্ সা. দুটি কবরের পাশ দিয়ে একবার যাচ্ছিলেন। তখন তিনি বললেন এ কবর দুটি অধিবাসীদের উপর আযাব হচ্ছে। বড় কোন করণে আযাব হচ্ছে না। তাদের দুজনের একজন পেশাব করার পর সঠিকভাবে পবিত্রতা অর্জন করতো না। আর অপরজন চোগলখুরী করে বেড়াত। অপর খেজুর গাছের কাচা ডাল নিয়ে তা দুভাগে বিভক্ত করে অতপর প্রত্যেক কবরের উপর একটাংশ গেড়ে দিলেন। সাহাবারা বললেন হে আল্লাহর রাসূল! আপনি এরূপ কেন করলেন? তখন তিনি বললেন আশা করা যায় যতক্ষণ পর্যন্ত ডাল দুটি শুকাবেনা ততক্ষণ পর্যন্ত তাদের শাস্তি কম হবে। ৫৫
আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত এক ইহুদী মহিলা তার কাছে এসে বলল: আল্লাহ আপনাকে কবর আযাব থেকে মুক্ত রাখুন। তখন আয়শা (রা.) রাসূলুল্লাহ্ সা. কে কবর আযাব সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করলেন। তখন মহানবী (সা.) বললেন হ্যাঁ, কবর আযাব সত্য। আয়েশা (রা.) বললেন এর পর আমি মহা নবী (সা.) কে কোন সালাত আদায় করার পর কবর আযাব থেকে আল্লাহর পানাহ না চাইতে দেখিনি। ৫৬
এ জাতীয় হাদীসের সংখ্যা অনেক। মৃত ব্যক্তি তার বারযাখী জীবনে কবরে থাক বা অন্য কোথাও, তার রূহ ইল্লিঈনে (উর্ধ্ব জগৎ) থাক বা সিজ্জিনে (নিম্নজগতে) থাক সে হয়তবা নেয়ামত লাভ করবে। অথবা আযাবের সম্মুখীন হবে। আর কিয়ামতের পর পুনরুত্থান না হওয়া পর্যন্ত মৃত মানুষের কবরের সাথে তার রূহের একটা সম্পর্ক থাকবে।
মানুষের শরীর হতে রুহ বা আত্মাকে যখন ছিনিয়ে নেয়া হয় তখন সে রহমতে ফেরেস্তা কিংবা আযাবের ফিরিস্তা দ্বারা সুখভোগ বা শাস্তি ভোগ করতে থাকে। কুরআন এবং হাদীসে এ কথা বলা হয়েছে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ্ তা'আলা বলেন:
وَلَوْ تَرَى إِذْ يَتَوَفَّى الَّذِينَ كَفَرُوا الْمَلَائِكَةُ يَضْرِبُونَ وُجُوهَهُمْ وَأَدْبَارَهُمْ وَذُوقُوا عَذَابَ الْحَرِيقِ .
"আর যদি তুমি দেখ যখন ফেরেস্তারা কাফেরদের রূহ কবজ করে প্রহার করে তাদের মুখে এবং তাদের পশ্চাৎদেশে বলে জ্বলন্ত আযাবের স্বাদ গ্রহণ কর।"৫৭ উপরোক্ত আয়াতে একথা স্পষ্ট যে, এ শাস্তি কাফেরদেরকে তাদের রূহ কবজ করার সময় ফেরেস্তারা দিয়ে থাকেন। আর মুত্তাকী মুমিনদের রূহ কবজ করার সময় কি অবস্থা হয় এ প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ্ সা. বলেন: যখন মুমিন বান্দা দুনিয়া ছেড়ে আখিরাতের দিকে এগিয়ে যান তখন তার প্রতি আসমান থেকে শ্বেত মুখমণ্ডল বিশিষ্ট কিছু ফেরেস্তা অবর্তীণ হন। যাদের মুখমণ্ডল যেন জ্বলন্ত সূর্য। তাদের সাথে থাকে জান্নাতী কাফন। এবং জান্নাতী সুগন্ধ দ্রব্য। অবশেষে তার চোখে যতটুকু দেখা যায় এতটুকুর মধ্যেই বসে যায়। তখন মালিকুল মাউত আসেন। এসেই তার মাথার পাশে বসে যান। তারপর বলেন : হে পবিত্র রূহ! আল্লাহর মাগফিরাত/ক্ষমার এবং সন্তুষ্টির দিকে বের হয়ে আসুন। তিনি বলেন: তখন রূহ বের হয়ে আসে যেমন করে কলসির মুখ হতে পানির ফোটা বের হয়ে আসেন তেমনি। ৫৮
আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের আকীদানুযায়ী কবরের আযাব সত্য। বিভিন্ন হাদীস দ্বারা প্রমাণিত, নেককার মুমিনগণ যেমন কবরের মধ্যে কিয়ামত পর্যন্ত আরাম-আয়েশে থাকবে, তেমনি কাফির, মুনাফিক ও বদকাররা কবরের মধ্যে আযাব ভোগ করতে থাকবে। একবার আয়েশা রা.-এর নিকট এক ইহুদী মহিলা আসল। মহিলাটি তার সামনে কবর আযাবের আলোচনা করে বলল:
أَعَادَكَ اللَّهُ مِنْ عَذَابِ الْقَبْرِ.
'আল্লাহ্ আপনাকে কবর আযাব থেকে হিফাজত করুন। ১৫৯ আয়েশা রা. রাসূলুল্লাহ্ সা.-কে এ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন:
نَعَمْ عَذَابُ الْقَبْرِ حَقٌّ.
'হ্যাঁ কবরের আযাব সত্য।১৬০
অতপর আয়েশা সিদ্দীকা রা. বলেন: যখনই রাসূলুল্লাহ্ সা. নামায আদায় করেছেন, তখনই কবর আযাব থেকে মুক্তির দু'আ করেছেন। ৬১
খলিফাতুল মুসলিমীন উসমান রা. যখন কোন কবরের নিকট দাঁড়াতেন তখন এত অধিক পরিমাণ কাঁদতেন যে, চোখের পানিতে তার দাড়ি ভিজে যেত। এ সম্পর্কে তাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল যে, আপনি জান্নাত-জাহান্নামের আলোচনায় এত অধিক পরিমাণে কাঁদেন না, কিন্তু কবর দেখে আপনার এত বেশি কান্নাকাটি করার কারণ কী? উসমান রা. উত্তরে বললেন: রাসূলুল্লাহ্ সা. বলেছেন: নিশ্চয়ই কবর আখিরাতের প্রথম ঘাটি। যদি এ ঘাটি থেকে নাজাত পাও, তাহলে অবশিষ্ট ঘাটিগুলো পার হওয়া আরও বেশি সহজ। আর যদি এ ঘাটি থেকে বাঁচতে না পার, তাহলে অবশিষ্ট ঘাটিগুলো অতিক্রম করা আরও কঠিন হয়ে যাবে। ৬২
অপর এক হাদীসের বর্ণনায় এসেছে, আবূ সাঈদ আল-খুদুরী রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ্ সা. বলেছেন: অবশ্যই কবরের মধ্যে কাফিরের জন্য নিরানব্বইটা অজগর সাপ নিয়োজিত করে দেয়া হবে। আর সেগুলো কিয়ামত পর্যন্ত তাকে অবিরতভাবে দংশন করতে থাকবে। এ অজগর এত বিষাক্ত যে, যদি একটি অজগর পৃথিবীতে শ্বাস ফেলে, তাহলে যমিনে শাক-সবজি উৎপন্ন হবে না। অর্থাৎ সাপগুলোর বিষক্রিয়া এত মারাত্মক হবে যে, সেখান থেকে একটি অজগরও যদি পৃথিবীতে একবার শ্বাস ফেলে তাহলে তার বিষক্রিয়ায়, জমিনের একটি ঘাসও আর উৎপাদন করার যোগ্যতা থাকবে না। ৬৩
এ প্রসঙ্গে অপর এক হাদীসের বর্ণনায় এসেছে, বাররা ইব্ন আযিব রা. হতে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ্ সা. বলেছেন: মুনকার ও নাকীর ফেরেস্তার প্রশ্নের জওয়াবে কাফির ও পাপীরা যখন উত্তর দেয়, হায়! হায়! আমি জানি না, তখন আসমান থেকে একজন ঘোষণাকারী আওয়াজ দিয়ে বলেন: "এ ব্যক্তি মিথ্যা বলছে। তার পায়ের নীচে আগুন জ্বালিয়ে দাও। তাকে আগুনের পোশাক পরিয়ে দাও এবং তার জন্য জাহান্নামের একটি দরজা খুলে দাও। তখন জাহান্নামের তাপ ও লু হাওয়া আ. তার কবরে আসতে থাকে। তার কবরকে এমন সংকীর্ণ করে দেয়া হয় যে, তার এক পাশ্বের পাঁজর অপর পার্শ্বে চলে যায়।
অতপর তাকে আযাব দেয়ার জন্য এমন একজন ফেরেস্তাকে নিযুক্ত করা হয়, যে চোখে দেখে না, কানে শোনে না। তার নিকট লোহার গদা থাকবে। সেই গদা দিয়ে পাহাড়ে আঘাত করা হলে পাহাড় মাটির সাথে মিশে যাবে। যখন একবার গদা মারা হয়, তখন মানুষ ও জ্বিন ব্যতীত পৃথিবীর সকল প্রাণি সেই আওয়াজ শুনতে পায়। কেবল এক বারের আঘাতেই সে মাটিতে পরিণত হয়ে যায়। পুনরায় তার শরীরে রূহ ফিরিয়ে দেয়া হয়। এরপর পুনরায় তাকে আঘাত করা হয়। এভাবে কিয়ামত পর্যন্ত তার কবরে এরকম কঠিন ও যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি দেয়া হবে। ৬৪
অপর এক হাদীসের বর্ণনায় এসেছে, গদার আঘাতের কারণে মৃত ব্যক্তি এমন জোরে চিৎকার দিবে যে, মানুষ ও জ্বিন ব্যতীত আশে-পাশের সকল কিছুই সে চিৎকার শুনতে পায়। ৬৫
এ প্রসঙ্গে আল্লামা আশিক ইলাহী বুলন্দ শাহরী রহ. বলেন: মানুষকে কবর আযাব না দেখানো এবং মুর্দারের চিৎকার না শুনানোর অনেকগুলো কারণ বিদ্যমান। যেমন:
প্রথম কারণ হলো, এমনটা করা হলে গায়েবের প্রতি ঈমান আনার বিষয়টির কোন মূল্য থাকে না। এগুলো দেখার পর সকলেই মেনে নেবে এবং ঈমানদার হয়ে যাবে কিন্তু আল্লাহর নিকট চোখে দেখা বিষয়ের প্রতি ঈমান আনা গ্রহণযোগ্য নয়। এ কারণেই মৃত্যুর সময় ঈমান আনা গ্রহণযোগ্য নয়।
দ্বিতীয় কারণ হলো, মানুষ তা সহ্য করতে পারবে না। যদি তারা কবর আযাবের অবস্থা নিজেদের কানে শুনতে পায় কিংবা চোখে দেখতে পায়, তাহলে সহ্য করতে না পেরে বেহুঁশ হয়ে পড়বে।
অপর এক বর্ণনায় এসেছে, আবূ সাঈদ আল-খুদুরী রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ্ সা. বলেছেন: লোকেরা যখন নাফরমান মুর্দাকে নিয়ে কবরের দিকে রওয়ানা হয়, তখন মুর্দা বলতে থাকে, হায় আমার সর্বনাশ! তোমরা আমাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছ? মুর্দারের সেই বিলাপধ্বনি মানুষ ছাড়া সকলেই শুনতে পায়। মানুষ যদি সেই আওয়াজ শুনতে পেত, তাহলে বেহুঁশ হয়ে যেত। ৬৬
কিন্তু আল্লাহ্ তা'আলা তাঁর রসূল মুহাম্মদুর রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বারযাখের বিভিন্ন অবস্থা জানানোর সাথে সাথে দেখিয়েও দিয়েছেন। কেননা, তার মাঝে তা বরদাশত করার মতো ক্ষমতা বিদ্যমান ছিল। তাই দেখা যায়, জাহান্নামের ভয়াবহ দৃশ্য অবলোকন করার পর তার হাসি-কান্না, কথা-বার্তা, সাহাবীদের সাথে ওঠা-বসা পানাহারে কোন পার্থক্য প্রকাশ পায়নি।
কবরের আযাব সম্পর্কিত আরেকটি হাদীসের মাধ্যমে জানা যায় যে, যায়িদ ইব্ন সাবিত রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: একবার নবী করীম সা. খচ্চরে চড়ে বনু নাজ্জার গোত্রের বাগিচার দিকে যাচ্ছিলেন। আমরাও তখন তার সাথে ছিলাম। হঠাৎ খচ্চরটি এমনভাবে চমকে উঠল যে, রাসূলুল্লাহ্ সা. খচ্চরের পিঠ থেকে পড়ে যাওয়ার উপক্রম হলেন। সেখানে পাঁচটি কিংবা ছয়টি কবর ছিল। রাসূলুল্লাহ্ সা. জিজ্ঞেস করলেন: এ কবরবাসীদের পরিচয় কারও কি জানা আছে? এক ব্যক্তি বলল: আমি জানি হে আল্লাহর রাসূল! তিনি জিজ্ঞেস করলেন: তারা কবে মারা গেছে? সে বলল: জাহিলী যুগে মারা গেছে। তখন রাসূলুল্লাহ্ সা. বললেন: মানুষকে কবরে আযাব দেয়া হচ্ছে। আমার যদি এ আশঙ্কা না হতো যে, তোমরা মৃতদেহ দাফন করা পরিত্যাগ করবে, তাহলে আমি অবশ্যই আল্লাহর নিকট দু'আ করতাম, যেন আমার ন্যায় তোমাদেরকেও কবরের কিছু আযাব শোনানো হয়। ৬৭
অপর এক বর্ণনা মতে জানা যায় যে, আব্দুল্লাহ্ ইব্ন আব্বাস রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: একবার নবী সা. দু'টি কবরের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় বললেন: এ কবর দু'টিতে আযাব হচ্ছে। তবে বড় কোন অপরাধের কারণে তাদের আযাব দেয়া হচ্ছে না। বরং এমন সাধারণ বিষয়ের জন্য আযাব হচ্ছে, যা থেকে তারা একটু চেষ্টা করলেই বাঁচতে পারতো। অতপর রাসূলুল্লাহ্ সা. উভয়ের গুনাহের বিবরণ দিয়ে বললেন: তাদের একজন পেশাব করার সময় পর্দা করতো না। (অন্য বর্ণনায় এসেছে, সে পেশাবের ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন করতো না।) আর দ্বিতীয়জন চোগলখুরী করতো। অর্থাৎ একের কথা অপরের কাছে বলে বেড়াতো। এরপর রাসূলুল্লাহ্ সা. একটি তাজা ডাল চেয়ে নিলেন। ডালটির মাঝখানে চিরে দু'টুকরো করে দুই কবরে গেড়ে দিলেন। সাহাবাগণ আরজ করলেন: হে আল্লাহর রাসূল! আপনি এমন কেন করলেন? রাসূলুল্লাহ্ সা. বললেন: হয়তো ডাল শুকিয়ে যাওয়ার পূর্ব পর্যন্ত তাদের আযাব হালকা করা হবে। ৬৮
হাদীসের অপর এক বর্ণনায় এসেছে, আবূ হুরাইরা রা. হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ্ সা. বলেছেন: মৃতব্যক্তিকে কবরে রাখার পর তার কাছে কালো বর্ণের ও নীল চোখ বিশিষ্ট দুইজন ফেরেস্তা আসেন। তাদের একজনকে মুনকার ও অপরজনকে নকীর বলা হয়। তারা মৃত ব্যক্তিকে জিজ্ঞেস করে : তোমার রব কে? তোমার দ্বীন কী? তোমার নবী কে? অথবা রাসূলুল্লাহ্ সা.-কে দেখিয়ে বলা হবে এ ব্যক্তি সম্পর্কে তোমার ধারণা কী? মৃত ব্যক্তি মু'মিন হলে সঠিক উত্তর দিবে। ফলে তার জন্য কবর জান্নাতের বাগানে পরিণত হয়। আর যদি মৃত ব্যক্তি নাফরমান ও মুনাফিক হয়, তাহলে সে মুনকার ও নাকীরের প্রশ্নের জবাবে বলে লোকদের যা বলতে শুনেছি আমিও তাই বলেছি। তার জবাব শুনে ফেরেস্তাদ্বয় বলেন: আমরা ভাল করেই জানতাম যে তুমি এ ধরনের জবাব দেবে। অতপর যমিনকে বলা হয় : এ ব্যক্তিকে চাপ দাও। ফলে জমিন তাকে এমনভাবে চাপ দেয় যে, একদিকের পাঁজর অপর দিকে চলে যায়। কিয়ামত পর্যন্ত সে উক্ত আযাবে অবস্থান করতে থাকবে।
এ প্রসঙ্গে হাদীসের এক বর্ণনায় এসেছে, একবার রাসূলুল্লাহ্ সা. উমর রা.কে বলেছিলেন: উমর! মানুষ যখন তোমাকে কবরে রেখে মাটি দিয়ে চলে আসবে এবং তোমার নিকট কবরের পরীক্ষক ফেরেস্তাগণ এসে উপস্থিত হবে, তখন তোমার কী অবস্থা হবে? তাদের আওয়াজ বজ্রের মত হবে। চোখ হবে দৃষ্টিশক্তি হরণকারী বিদ্যুতের ন্যায়। তাদের অবস্থা তোমাকে প্রকম্পিত করবে এবং তারা তোমার সাথে বিচারকের ন্যায় কথাবার্তা বলবে, তখন তোমার কী অবস্থা হবে? উমর রা. আরজ করলেন : হে আল্লাহর রাসূল! তখন কি আমার জ্ঞান ঠিক থাকবে? রাসূলুল্লাহ্ সা. বললেন : হ্যাঁ, আজ তোমার জ্ঞান যে অবস্থায় আছে, সেদিনও একই অবস্থায় থাকবে। রাসূলুল্লাহ্ সা.-এর উত্তর শুনে উমর রা. বললেন : তাহলে পরিস্থিতি সামলে নিতে পারব ইনশাআল্লাহ।৭০
হাদীসের অপর এক বর্ণনা থেকে জানা যায় যে, বাররা ইব্ন আযিব রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: আমরা একবার রাসূলুল্লাহ্ সা.-এর সাথে এক আনসারীর জানাযা নিয়ে কবরস্থানে গিয়েছিলাম। যাওয়ার পর দেখি তখনও কবর তৈরি হয়নি। ফলে রাসূলুল্লাহ্ সা. বসে পড়লেন, আমরাও নিশ্চুপ হয়ে বসে পড়লাম। যেন আমাদের মাথার উপর পাখী বসে আছে। রাসূলুল্লাহ্ সা.-এর হাতে এক খন্ড শলাকা ছিল। তা দ্বারা তিনি মাটিতে আঁচড় কাটছিলেন। যেমন গভীর চিন্তায় মগ্ন ব্যক্তি করে থাকে। কিছুক্ষণ পর রাসূলুল্লাহ সা. মাথা তুলে বললেন : তোমরা আল্লাহর কাছে কবর আযাব থেকে মুক্তি চাও। দুবার কিংবা তিনবার এ কথা তিনি উচ্চারণ করলেন। অতপর বললেন: যখন কাফির ও নাফরমানের মৃত্যুর সময় আসে, তখন আকাশ থেকে কালো চেহারা বিশিষ্ট একদল ফেরেস্তা চট নিয়ে তার কাছে আস। ৭১
হাদীসের অন্য এক বর্ণনা হতে জানা যায় যে,
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ : إِنَّ الْبَيْتَ يَصِيرُ إِلَى الْقَبْرِ ، فَيَجْلِسُ الرَّجُلُ الصَّالِحُ فِي قَبْرِهِ غَيْرَ فَزَعَ وَلَا مَشْعُونِ. ثُمَّ يُقَالُ لَهُ فِيمَ كُنْتَ ؟ فَيَقُولُ كُنْتُ فِي الْإِسْلَامِ. فَيُقَالُ لَهُ مَا هَذَا الرَّجُلُ؟ فَيَقُولُ مُحَمَّدٌ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَ سَلَّمَ جَاءَنَا بِالْبَيِّنَاتِ مِنْ عِنْدِ اللهِ فَصَدَّقْنَاهُ . فَيُقَالُ لَهُ هَلْ رَأَيْتَ الله ؟ فَيَقُولُ مَا يَنْبَغِي لِأَحَدٍ أَنْ يَرَى اللهَ فَيُفَرِّجُ لَهُ فَرَجَةً قَبْلَ النار . فَيَنْظُرُ إِلَيْهَا يَحْطِمُ بَعْضُهَا بَعْضًا. فَيُقَالُ لَهُ انْظُرُ إِلَى مَا وقَاكَ اللهُ ثُمَّ يُفَرِّجُ لَهُ قَبْلَ الْجَنَّةِ . فَيَنْظُرُ إِلَى زَهْرَتِهَا وَمَا فِيهَا. فَيُقَالُ لَهُ هُذَا مَقْعَدُكَ . وَيُقَالُ لَهُ عَلَى الْيَقِينِ كُنْتُ . وَعَلَيْهِ مُتَّ . وَعَلَيْهِ تُبْعَثُ إِنْ شَاءَ اللهُ. وَيَجْلِسُ الرَّجُلُ السُّوءِ فِي قَبْرِهِ فَزَعَا مَشعُوفًا . فَيُقَالُ لَهُ فِيمَ كُنْتَ ؟ فَيَقُولُ لَا أَدْرِي . فَيُقَالُ لَهُ مَا هَذَا الرَّجُلُ ؟ فَيَقُولُ سَمِعْتُ النَّاسَ يَقُولُونَ قَوْلًا فَقُلْتُهُ . فَيُفَرِّجُ لَهُ قَبْلَ الْجَنَّةِ . فَيَنْظُرُ إِلَى زَهْرَتِهَا وَمَا فِيهَا . فَيُقَالُ لَهُ انْظُرُ إِلَى مَا صَرَّفَ اللهُ عَنْكَ . ثُمَّ يُفَرِّجُ لَهُ فَرْجَةً قَبْلَ النَّارِ فَيَنْظُرُ إِلَيْهَا . يَحْطِمُ بَعْضُهَا بَعْضًا . فَيُقَالُ لَهُ هُذَا مَقْعَدُكَ . عَلَى الشَّاكِ كُنتُ . وَعَلَيْهِ مُتَ . وَعَلَيْهِ تُبْعَثُ إِنْ شَاءَ اللَّهُ تَعَالَى.
"আবূ হুরাইরা রা. হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ্ সা. বলেছেন: নিঃসন্দেহে (মুমিন) মৃত ব্যক্তি কবরে পৌঁছার পর নির্ভয়ে ও নিশ্চিন্তে বসে থাকে। তখন তাকে প্রশ্ন করা হয়: তুমি কোন ধর্মের অনুসারী? সে উত্তরা দেয়: আমি ইসলামের অনুসারী ছিলাম। আবার প্রশ্ন করা হয় তোমার আকীদা মতে ইনি কে? সে উত্তর দেয় ইনি রাসূলুল্লাহ্ সা.। তিনি আল্লাহর পক্ষ থেকে স্পষ্ট মোজেযা নিয়ে আমাদের 'কাছে এসেছিলেন এবং আমরা তাকে সত্য বলে স্বীকার করেছিলাম। তারপর তাকে প্রশ্ন করা হয় : তুমি কি কখনো আল্লাহকে দেখেছ? সে উত্তর দেয় (দুনিয়াতে) কারও পক্ষেই আল্লাহ্ তা'আলাকে দেখা সম্ভব নয়। আমি কী করে দেখব? অতপর তার দিকে জাহান্নামের একটি জানালা খুলে দেয়া হয়। সেই জানালা দিয়ে সে দেখতে পায় জাহান্নামের জ্বলন্ত কয়লাগুলো একটি আরেকটিকে গ্রাস করছে। তখন এই জাহান্নামের ভয়াবহ দৃশ্য দেখার পর তাকে বলা হবে, চিন্তা কর, আল্লাহ্ তা'আলা তোমাকে কত বড় বিপদ থেকে রক্ষা করেছেন। অতপর জান্নাতের একটি জানালা তার দিকে খুলে দেয়া হয়। সেই জানালা দিয়ে সে জান্নাতের সৌন্দর্য ও অন্যান্য নিয়ামতসমূহ দেখতে পায়। তখন তাকে বলা হয়, এটা হল তোমার ঠিকানা। দুনিয়াতে তুমি ঈমানদার ছিলে ঈমানের সাথে তুমি কিয়ামতের দিন কবর থেকে উঠবে। অতপর রাসূলুল্লাহ্ সা. বলেন: নাফরমান ব্যক্তি অত্যন্ত ভীত শঙ্কিত হয়ে তার কবরে উঠে বসে, আর তখন তাকে জিজ্ঞেস করা হয়: তুমি দুনিয়ায় কোন ধর্মের উপর ছিলে? সে উত্তরে বলে : আমার জানা নেই। পুনরায় তাকে (রাসূলুল্লাহ্ সা.-কে দেখিয়ে) জিজ্ঞেস করা হয়: ঐ ব্যক্তি কে? সে উত্তর দেয় : তার সম্পর্কে অন্যান্য লোক যা বলেছে, আমিও তাই বলেছি। অতপর জান্নাতের দিক থেকে তার সামনে একটি জানালা খুলে দেয়া হয়। ফলে উক্ত জানালা দিয়ে সে জান্নাতের সুন্দর সুন্দর ও নয়নাভিরাম দৃশ্যসমূহ দেখতে পায়। তখন তাকে বলা হয় : চিন্তা করো, তুমি আল্লাহর নাফরমানি করার কারণে আল্লাহ্ তা'আলা তোমাকে কেমন নিয়ামত থেকে বঞ্চিত করেছেন। এরপর তার সামনে জাহান্নামের দিক থেকে একটি জানালা খুলে দেয়া হয়, আর সে দেখতে পায় যে, জাহান্নামের জ্বলন্ত অঙ্গারগুলো কীভাবে একে অপরকে গ্রাস করছে। অতপর তাকে বলা হয়, এটাই হলো তোমার ঠিকানা। দুনিয়াতে থাকার সময় তুমি পরকালের প্রতি সন্দেহ নিয়ে জীবিত ছিলে, সন্দেহ অবস্থায়ই তোমার মৃত্যু হয়েছে, আর কিয়ামতের দিন সেই সন্দেহ নিয়েই তুমি কবর থেকে উঠবে।"৭২
এ প্রসঙ্গে মুহাম্মদ ইব্ন্ন সুবহ (রা.) বলেন: মুর্দাকে কবরে রাখার পর যদি তার উপর আযাব ও গযব শুরু হয়, তাহলে তার প্রতিবেশী মুর্দার বলে: হে ব্যক্তি আমরা যারা তোমার প্রতিবেশী ছিলাম, তোমার আগেই বিদায় হয়ে এসেছি। আমাদের এ বিদায়ের মাঝে তোমার জন্য চিন্তা ভাবনা বা শিক্ষা গ্রহণের কি কিছু ছিল না? তুমি কি দেখনি আমাদের সমস্ত আমল বন্ধ হয়ে গেছে। তোমার অগ্রবর্তীরা যেসব ভুল করেছিল, কেন তুমি সে সব ভুল থেকে মুক্ত হওয়ার বিন্দুমাত্র চেষ্টা করলে না? তাহলে তো আজ তোমার এ অবস্থা হতো না। এমনকি জগতের প্রত্যেক মাটি খণ্ড তাকে বলবে: হে দুনিয়ার বাহ্যিক রূপে বিভ্রান্ত ব্যক্তি! কেন তুমি তোমার ঐসব আপনজনদেরকে দেখে শিক্ষাগ্রহণ করলে না? যারা তোমার পূর্বে আমার অনুরূপ ধোঁকার শিকার হয়ে অবশেষে কবরের পেটে সোপর্দ হয়েছে? তুমি স্বচক্ষে দেখছিলে, বন্ধু-বান্ধবরা তাকে খাটে তুলে এমন এক ঠিকানার দিকে নিয়ে চলছে, যেখানে যাওয়া একান্ত অবধারিত ছিল। ৭৩ হাদীসের অপর এক বর্ণনায় এসেছে, বাররা ইন্ন আযিব রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেছেন: একদা আমরা রাসূলুল্লাহ সা.-এর সাথে জনৈক আনসারীর জানাযায় শরীফ হয়েছিলাম। রাসূলুল্লাহ সা. মাথা ঝুকিয়ে তার কবরের পাশে বসে পড়েন। অতপর তিনি তিন বার বললেন: اللهم إني أعوذُ بِكَ مِنْ عَذَابِ الْقَبْرِ . "হে আল্লাহ্! আমি আপনার নিকট কবর আযাব হতে আশ্রয় প্রার্থনা করছি।"৭৪ এ দীর্ঘ হাদীসের শেষাংশে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ্ সা. বলেছেন: যখন কাফির, মুশরিক ও নাফরমানদের দুনিয়া ছেড়ে পরকালের দিকে যাত্রা করার সময় হয়, তখন তার নিকট একদল কঠিন প্রাণ, কঠোর আচরণকারী ফেরেস্তা অবতীর্ণ হয়। তাদের সাথে থাকে আগুন ও গন্ধকের পোশাক। তাকে তারা ঘিরে ফেলে। যখন তার রূহ বের হয়ে যায়, তখন আসমান জমিনের সকল ফেরেস্তা তার উপর লানত করতে থাকে এবং আসমানের দরজাসমূহ বন্ধ করে দেয়া হয়। প্রতিটি দরজাই কামনা করে, যেন এ রূহকে সে দিক দিয়ে ঢুকানো না হয়। তার রূহ নিয়ে যখন উর্ধ্বে গমন করা হয় তখন তা ছুঁড়ে ফেলে দেয়া হয়। ফেরেস্তাদের পক্ষ হতে বলা হয় : হে আল্লাহ্! আপনার অমুক বান্দাকে কোন আসমান, কোন জমিনই গ্রহণ করল না। তখন আল্লাহ্ পাক বলবেন: তাকে নিয়ে দেখাও আমি তার জন্য কী কী আযাবের ব্যবস্থা করে রেখেছি। কারণ, আমি তাকে ওয়াদা দিয়েছি, এ মাটি থেকেই তোমাদের সৃষ্টি করেছি। পুনরায় এ মাটিতেই তোমাদেরকে নিয়ে যাব।" যখন তাকে কবরস্থ করা হয়, তখন সে প্রত্যাবর্তনকারীদের পদধ্বনি শুনতে পায়। এমতাবস্থায়ই খুবই ভীষণ বীভৎস চেহারা বিশিষ্ট দু'জন ফেরেস্তা এসে তাকে প্রশ্ন করে হে ব্যক্তি! তোমার রব কে? তোমার দ্বীন কী? তোমার নবী কে? তখন জবাবে সে বলবে: لَا أَدْرِي "আমি তো কিছুই জানি না। তাকে বলা হবে : তোমার জানার দরকারও নেই। অতপর কাল-কুৎসিৎ চেহারা বিশিষ্ট, দুর্গন্ধময় দেহবিশিষ্ট ও বিশ্রী পোশাক পরিহিত জনৈক আগন্তুক এসে বলবে: হে আল্লাহর নাফরমান বান্দা, তুমি যন্ত্রণাদায়ক চিরস্থায়ী আযাবের সুসংবাদ গ্রহণ করো। তখন ঐ কাফির, মুশরিক, নাফরমান ব্যক্তি বলবে আল্লাহ্ পাক যেন তোমাকেই আযাব ও গযবের সুসংবাদ দান করেন। অতপর নাফরমান ব্যক্তি তাকে প্রশ্ন করবে: আচ্চা বল দেখি তুমি কে? সে বলবে: আমিই তোমার বদ আমল। আল্লাহ পাকের কসম, আল্লাহ্ তা'আলার অবাধ্যতায় তুমি ছিলে দ্রুতগামী আর আনুগত্যে ছিলে শ্লথগতি সম্পন্ন। অতএব আল্লাহ্ পাক যেন তোমাক জঘন্যতম বদলা দান করেন। অতপর তার জন্য এমন এক ফেরেস্তা নিযুক্ত করা হবে, যে হবে অন্ধ, বধির, বোবা। তার হাতে থাকবে একটি লোহার গদা। সমগ্র জিন-ইনসান মিলেও যদি সে গদাটি উঠাতে চেষ্টা করে তাহলেও তা উঠানো তাদের জন্য সম্ভব হবে না। এর দ্বারা যদি কোন পাহাড়ের উপর আঘাত করা হয়, তাহলে পাহাড়ের মাটি ধুলা হয়ে যাবে। সেই গাদা দিয়ে উক্ত ব্যক্তিকে মারা হলে এত জোরে আওয়াজ করবে, যার আওয়াজ জিন-ইনসান ব্যতীত সবাই শুনতে পাবে। অতপর জনৈকি ঘোষণাকারী ঘোষণা করবে ওর জন্য দু'টি আগুনের তক্তা বিছিয়ে দাও। দোযখের দিকে একটি দরজা খুলে দাও। ফলে আগুনের দু'টি তক্তা বিছিয়ে দোযখের দিকে একটি দরজা খুলে দেয়া হবে।
আবূ হুরাইরা রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন রাসূল সা. বলেছেন: তোমরা কি জান, এ আয়াত কোন বিষয়ের প্রতি অবতীর্ণ হয়েছে? فَإِنَّ مَعِيشَةً ضَنكًا
জবাবে সাহাবীগণ আরজ করলেন এ ব্যাপারে মহান আল্লাহ্ ও তার রাসূলুল্লাহ্ সা.-ই অধিক জ্ঞাত। তখন রাসূলুল্লাহ্ সা. বলেন: এ আয়াত কাফিরদের কবর আযাব সম্পর্কে অবতীর্ণ হয়েছে। কাফিরদের উপর ৯৯ টি বিষধর সাপ লেলিয়ে দেয়া হবে। তোমরা কি বলতে পারো কি রকম হবে সে বিষধর সাপগুলো? জেনে রাখ, প্রতিটি সাপ হবে সাত মাথা বিশিষ্ট। এ ধরনের ৯৯ টি সাপ কিয়ামত পর্যন্ত তাকে দংশন করে ক্ষত-বিক্ষত করতে থাকবে। তার দেহের ভিতর বিষাক্ত ও জ্বালাময় নিঃশ্বাস ছাড়তে থাকবে।
কবরের আযাবের বর্ণনা সম্পর্কে আরো অনেক হাদীস রয়েছে। এ প্রসঙ্গে একটি দীর্ঘ হাদীসে রাসূল সা. বলেছেন: আল্লাহ্ তা'আলা আজরাঈলকে নির্দেশ দেন আমার অমুক দুশমনের নিকট যাও। তাকে আমার নিকট নিয়ে আস। তাকে আমি অনেক নিয়ামতরাজি দিয়ে আমি পরীক্ষা করেছি কিন্তু তার প্রতিদান হিসেবে সে আমার নাফরমানী ছাড়া আর কিছুই করেনি। আজরাঈল আ. আল্লাহ্ তা'আলার হুকুম পেয়ে ঐ নাফরমানের নিকট এমন এক বিকট চেহারা নিয়ে উপস্থিত হবে যে, এ বিকট চেহারাই তার শাস্তির জন্য যথেষ্ট। আজরাঈলের সাথে পাঁচশত ফেরেস্তা থাকে। মালাকুল মউত ভয়নক মূর্তিতে বার চক্ষু বিশিষ্ট চেহারায় জাহান্নামের আগুণের তৈরি কণ্টকময় লোহার গুর্জ হাতে করে উপস্থিত হয়। মালাকুল মউত এসেই তার উপর কোড়া মারতে থাকেন। যার কাটাসমূহ মুর্দারের প্রতি শিরায় শিরায় প্রবেশ করে। সাথে থাকা অন্যান্য পাঁচশত ফেরেস্তা ও নিতম্বে কোড়া মারতে থাকে, যার ফলে মুর্দা বেহুশ হয়ে যায়। অতপর ফেরেস্তারা তামার টুকরা এবং জাহান্নামের অঙ্গারগুলি তার থুতনীর নীচে রেখে দেয়, মালাকুল মউত বলেন: হে অভিশপ্ত রূহ! বের হও এবং জাহান্নামের দিকে চলো। অতপর তার রূহ যখন শরীর হতে বের হবে তখন সে শরীরকে বলবে আল্লাহ্ তা'আলা তোমাকে শান্তি দান করুন। তুমি নিজেও ধ্বংস হয়েছ এবং আমাকেও ধ্বংস করেছ। শরীর রূহকে এ কথা বলেই সম্বোধন করবে। আর যমিনের ঐ অংশ যেখানে সে গুনাহের কাজ করতো তাকে লানত করতে থাকবে। ওদিকে শয়তানের লশকরসমূহ দৌড় দিয়ে এসে শয়তানকে সুসংবাদ জানাবে যে, এক ব্যক্তিকে জাহান্নাম পর্যন্ত পৌছে দিয়েছি।
অতপর যখন তাকে কবরে রাখা হবে তখন কবর তার জন্য এত সংকীর্ণ হয়ে যাবে যে, তার পাঁজরের হাড়গুলি একে অন্যের ভিতর ঢুকে যাবে। তারপর তার নিকট ভয়ঙ্কর মূর্তিতে মুনকার-নাকীর হাজির হয়ে তাকে জিজ্ঞেস করবে, তোমার রব কে? তোমার দ্বীন কী? তোমার নবী কে? প্রত্যেক প্রশ্নের উত্তরে সে বলবে: আমি জানি না। উত্তর শুনে ফেরেস্তাগণ গুর্জ দ্বারা তাকে ভীষণভাবে আঘাত করতে শুরু করবে। আঘাতের প্রচণ্ডতা এমন হবে যে, গুর্জের ফুলকিসমূহ কবরে ছড়িয়ে পড়বে। অতপর তাকে বলা হবে যে, উপরের দিকে দেখ। উপরের দিকে চেয়ে সে জান্নাতের দরজার দিকে তাকিয়ে সেখানকার বাগান ও সৌন্দয দেখতে পাবে। তখন ফেরেস্তাগণ তাকে বলবেন : খোদার দুশমন! আল্লাহর ইবাদত করলে এটা তোমার জন্য চিরস্থায়ী ঠিকানা হতো। এরপর রাসূল সা. বলেন : ঐ সত্তার শপথ, যার হাতে আমার প্রাণ, এ কথা শুনে সে এত বেশী কষ্ট পাবে যে, সেইরূপ আর কখনো হয়নি। অতপর জাহান্নামের দরজা খোলা হবে।
ফেরেস্তাগণ বলবেন : হে আল্লাহর দুশমন! এটাই তো তোর চিরস্থায়ী আবাসস্থল। কেননা তুই আল্লাহর নাফরমানি করেছিলি। এরপর জাহান্নাম হতে ৭৭ টি দরজা তার কবরের দিকে খুলে দেয়া হবে যেখান থেকে কিয়ামত পর্যন্ত গরম বাতাস ও ধোয়া তার কবরে আসতে থাকবে। ৭৮
অপর এক হাদীসের বর্ণনায় এসেছে, প্রসিদ্ধ সাহাবী আনাস ইবন মালিক রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেছেন: যমিন প্রতিদিন কয়েকটি কথা ঘোষণা দিয়ে থাকে। যেমন:
১. হে আদম সন্তান! তুমি আমার পিঠের উপর দৌড়ে চলছো, মনে রেখ, তোমাকে কিন্তু আমার পেটের ভেতরই আসতে হবে।
২. তুমি আমার উপর থেকে হারাম খেয়ে চলছো, মনে রেখো, তোমাকে আমার পেটের ভেতর পোকা-মাকড় ভক্ষণ করবে।
৩. তুমি আমার উপর থেকে আল্লাহর নাফরমানি করছো, মনে রেখ, তোমাকে আমার পেটের ভেতর তার শাস্তিভোগ করতে হবে।
৪. তুমি আমার পিঠের উপরে চলাচলের পর হাসছো, মনে রেখ, আমার পেটের ভেতর তোমাকে কান্নাকাটি করে কাটাতে হবে।
৫. আমার উপরে থেকে তুমি অহংকার ও দাম্ভিকতা প্রকাশ করছো, স্মরণ রেখ, আমার পেটের ভেতর তুমি অপমানিত হবে।
৬. আমার উপর তুমি হারাম মাল জমা করছো, মনে রেখ, আমার ভেতর তুমি গলে যাবে।
৭. আমার পিঠের উপর প্রফুল্ল মনে চলছো, মনে রেখ, আমার ভেতর তুমি অন্ধকারে থাকবে।
৮. আমার উপরিভাগে তুমি তোমার দলবল নিয়ে চলাফেরা করছো কিন্তু আমার ভেতর তুমি একাকী থাকবে।
৯. হে আদম সন্তান! আমার উপর তুমি আনন্দে বিভোর কিন্তু আমার ভেতর দুঃখিত এবং চিন্তান্বিত থাকবে।
হাদীসের অপর এক বর্ণনায় এসেছে, হোবায়রিশ ইবন রিবাব রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: একবার আমি জাহফাহর রাস্তায় আছয়া নামক স্থানের নিকট দিয়ে পথ চলছিলাম। আমি দেখলাম আগুনে জ্বলন্ত এক ব্যক্তি একটি কবর থেকে বের হলো। তার গর্দানে লোহার জিঞ্জির, সে আমার নিকট পানি চাইল। ইতিমধ্যে ঐ কবর থেকে অন্য একজন ব্যক্তি বের হলো সে বলল : এ কাফিরকে পানি দিও না। অতপর সে প্রথমোক্ত ব্যক্তিকে ধরে ফেরত নিয়ে গেল। হোবায়রিশ রা. এর বর্ণনা যে, ঐ ঘটনা দেখে আমার উটনী ভয়ে আমার হাত থেকে ফসকে যাওয়ার উপক্রম হলো। আমি সেখানে অবস্থান করে মাগরিব ও ইশার নামায পড়ে উটনীতে আরোহন করে মদীনায় আসলাম। উমর রা.-এর নিকট এ ঘটনা বর্ণনা করলাম। এটি শ্রবণ করে তিনি বললেন: হে হোবায়রিশ! তুমি তো সত্যবাদিতায় বিখ্যাত কিন্তু তুমি তো এমন একটি সংবাদ প্রদান করেছ যার তথ্য উদ্ঘাটনের খুবই আবশ্যকতা দেখা দিয়েছে। সুতরাং উমর রা. ঐ স্থানের আশে পাশের বয়স্ক লোকদেরকে আহ্বান করলেন। যারা অন্ধকার যুগের অবস্থা সম্পর্কে পর্যাপ্ত পরিমাণে অবগত। ঐ সমস্ত প্রাচীন লোকদের সম্মুখে হোবায়রিশ রা.-কে উপস্থিত করে এ পূর্ণ ঘটনাটি ব্যক্ত করলে তারা এ ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বলল: আমিরুল মুমিনীন ঐ কবরস্থ ব্যক্তিটি বনু গাফ্ফারের এবং অন্ধকার যুগে মৃত্যুবরণকারী ব্যক্তি। সে মেহমানের কোন হক আদায় করতো না।৮০
প্রখ্যাত ঐতিহাসিক ইব্ন আসাকীর রহ. হতে বর্ণিত, সাদকাহ ইব্ন ইয়াজিদ রহ. বলেন: ত্রিপলির এক উচ্চস্থানে পাশাপাশি তিনটি কবর দেখতে পেলাম:
প্রথম কবরের উপর লেখা ছিল: যে ব্যক্তি এ কথা বিশ্বাস করে যে, মৃত্যু অনিবার্য সত্য এবং আমার করতলগত দেশ ও রাষ্ট্র অতি শীঘ্রই আমর নিকট হতে কেড়ে নেয়া হবে ও আমাকে একদিন কবরে দাফন করা হবে মৃত্যু ও পরকালের ভয়ে দুনিয়ার জীবনে সে কখনো শান্তি লাভ করতে পারে না।
দ্বিতীয় কবরের গায়ে লেখা ছিল : যে ব্যক্তি এ কথা জানে যে, হাশরের ময়দানে মহান আল্লাহর সামনে জবাবদিহি করতে হবে এবং সবাইকে কর্মফল ভোগ করতে হবে, সে তার জীবদ্দশায় কিছুতেই সুখ ভোগ করতে পারে না।
তৃতীয় কবরের গায়ে লেখা ছিল: যে ব্যক্তি এ কথা জানে যে, কবর আমাদের যৌবনকে মাটির সাথে মিশিয়ে দেবে এবং দেহের সমস্ত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে খন্ড-বিখন্ড করে খেয়ে ফেলবে, স্বীয় জীবনে সে কখনো আরাম উপভোগ করতে পারবে না।
তিনটি কবরের পাশাপাশি অবস্থান এবং সেই অভূতপূর্ব 'কবর লিপি' দেখে আমি অত্যন্ত বিস্মিত হলাম। অতপর পার্শ্ববর্তী এক গ্রামে গিয়ে জনৈক বৃদ্ধের কাছে ঐ কবর সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করলাম। বৃদ্ধ জানালো: উক্ত কবরবাসীরা ছিল তিন ভাই। তাদের প্রথমজন ছিল বাদশাহের সেনাপতি। দ্বিতীয়জন ছিল একজন ধনাঢ্য বণিক। আর তৃতীয়জন ছিল দরবেশ। দরবেশ দিবারাত্র সব সময় ইবাদত বন্দেগীতে মশগুল থাকতো। দরবেশের মৃত্যুকালে তার ভ্রতৃদ্বয় এতে তাকে বলল : তোমার যদি কোন অসীয়ত থাকে তাহলে তা বলতে পারো। দরবেশ বলল: আমার নিকট কোন ধন-সম্পদ নেই এবং আমার কোন ঋণও নেই। তাই অসীয়ত করারও তেমন কিছুই নেই। তবে আমি তোমাদেরকে এ বিষয়ে অসীয়ত করে যাচ্ছি যে, আমার মৃত্যুর পর তোমরা আমাকে ত্রিপলির উঁচু টিলায় দাফন করবে এবং আমার কবরের গায়ে এ কথাগুলো লিখে দিবে। "যে ব্যক্তি এ কথা জানে যে, হাশরের ময়দানে মহান আল্লাহর সামনে জবাবদিহি করতে হবে এবং সবাইকে কর্মফল ভোগ করতে হবে, সে তার জীবদ্দশায় কিছুতেই সুখ ভোগ করতে পারে না।" অতপর ক্রমান্বয়ে তিনদিন আমার কবর যিয়ারত করবে। ফলে তোমরা আমার কবর হতে সদুপদেশ অর্জন করতে পারবে। দরবেশের মৃত্যু হলে তাকে যথাস্থানে সমাহিত করতঃ কবরের গায়ে তার আদিষ্ট কথাগুলো যথারীতি লিখে দেয়া হলো। এরপর তার জীবিত দুই ভাই একাধারে তিনদিন পর্যন্ত তার কবর যিয়ারত করল। তৃতীয় দিবসে সেনাপতি কবর যিয়ারত করে ফেরার পথে সে কবরের ভেতর থেকে দেয়াল ধ্বসে পড়ার মত এক বিকট আওয়াজ শুনতে পেলো। ফলে ভয়ে জড়োসড়ো হয়ে কাঁপতে কাঁপতে দ্রুত তার গৃহের দিকে প্রত্যাবর্তন করলো। রাতে তার সেই মৃত ভাইকে স্বপ্নে দেখে সে জিজ্ঞেস করল: আজ আমি তোমার কবর যিয়ারতকালে কবর হতে যে বিকট শব্দ ভেসে আসছিল সেটা কীসের আওয়াজ? সে জবাবে বলল: জনৈক আযাবের ফেরেস্তা এসে তখন আমাকে ধমকিয়ে জিজ্ঞেস করছিল: একদা এক উৎপীড়িত ব্যক্তি এসে যখন তোমার কাছে সাহায্য প্রার্থনা করছিল তখন তুমি তাকে সাহায্য করনি কেন? এ কথা বলে সে এক মজবুত ও ভারী লোহার মুগুর দ্বারা বেদম প্রহার করছিলো। তুমি কবর যিয়ারতকালে ফেরেস্তাকর্তৃক আমাকে মুগুর দ্বারা পিটানোর সেই ভয়ঙ্কর শব্দই ভেসে আসছিল।
এ স্বপ্ন দেখার পর সেনাপতি সকাল বেলা তার অপর ভাই এবং নিকটতমবন্ধু বান্ধবকে ডেকে এনে বলল: আমি আর তোমাদের মাঝে থাকতে চাই না। বাদশাহের অধীনে চাকুরী করারও কোন প্রয়োজন নেই। এ কথা বলে সে সকল প্রকার আরাম আয়েশ পরিত্যাগ করল এবং পার্থিব ধন-সম্পদ সবকিছু বিসর্জন দিয়ে এক নির্জন জঙ্গলে গিয়ে ঠাঁই নিল। সে সেখানে ইবাদত-বন্দেগী করতে থাকল। তার ইন্তিকালের সময় তার ব্যবসায়ী ভাই এসে তাকে বলল তোমার কোন অসীয়ত থাকলে বলতে পার। দরবেশের ন্যায় সেও বলল আমার কোন ধন-সম্পদ নেই। তবে আমার মৃত্যুর পর আমার কবরের গায়ে তুমি এই কথাটি লিখে দিবে: "যে ব্যক্তি এ কথা বিশ্বাস করে যে, মৃত্যু অনিবার্য সত্য এবং আমার করতলগত দেশ ও রাষ্ট্র অতি শীঘ্রই আমার নিকট হতে কেড়ে নেয়া হবে ও আমাকে একদিন কবরে দাফন করা হবে মৃত্যু ও পরকালের ভয়ে দুনিয়ার জীবনে সে কখনো শান্তি লাভ করতে পারে না।" অতপর ক্রমান্বয়ে তিনদিন আমার কবর যিয়ারত করবে। সেনাপতির মৃত্যুর পর তার কবরে উল্লিখিত কথাগুলো লিখে দেয়া হল। বণিক যে ভাই ছিল সে একাধারে তিনদিন এসে তার কবর যিয়ারত করল। শেষদিন কবর যিয়ারত করে চলে যাওয়ার সময় সে সেনাপতির কবরে একটি ভয়ঙ্কর শব্দ শুনতে পেল। সেনাপতির কবর থেকে এ ভীতিপ্রদ আওয়াজ ভেসে আসতে শুনে সে ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে কাঁপতে কাঁপতে তার বাড়িতে ফিরে গেল। রাতের বেলায় সে সেনাপতিকে স্বপ্নে দেখে সে জিজ্ঞেস করলো : তুমি কেমন আছ? সেনাপতি জবাব দিল, ভালই আছি, তাওবা করায় আমার গোনাহ মাফ হয়ে গেছে। ফলে এখন আমি সুখেই আছি। সে তাকে আবারো বলল: দরবেশ ভাই কেমন আছে? সেনাপতি বলল: তিনি নেককারদের সঙ্গে বেহেস্তের উচুস্থানে সমাসীন রয়েছে। বণিক এবার নিজের কথা জিজ্ঞেস করে বলল: আচ্ছা তাহলে আমার অবস্থা কী হবে? সেনাপতি জবাব দিল : প্রত্যেককেই নিজের কর্মফল ভোগ করতে হবে। তুমি অবসর সময়কে মূল্যবান মনে করো এবং নেক আমল দ্বারা পরকালের পাথেয় সংগ্রহ করো।
পরদিন সকাল বেলা বণিকও দুনিয়ার সম্পর্ক ত্যাগ করলো। সে তার যাবতীয় ধন-সম্পদ গরীব দুঃখী মানুষকে দান করে দিয়ে আল্লাহ্ তা'আলার ইবাদতে মশগুল হল। বণিকের মৃত্যুকালে তার ছেলে এসে বলল : হে আমার পিতা! আপনি কিছু অসীয়ত করে যান। বণিক বলল : আমার তো কোন ধন-সম্পদ নেই, যার জন্য আমি তোমাকে অসীয়ত করতে পারি। তবে আমার মৃত্যুর পর আমার কবরের গায়ে "যে ব্যক্তি এ কথা জানে যে, কবর আমাদের যৌবনকে মাটির সাথে মিশিয়ে দেবে এবং দেহের সমস্ত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে খন্ড-বিখন্ড করে খেয়ে ফেলবে, স্বীয় জীবনে সে কখনো আরাম উপভোগ করতে পারবে না।"-এ কথাটি লিখে দিবে। আর অতি শীঘ্রই তোমাকেও কবরে যেতে হবে। তাই দুনিয়াদারদের মতো নিশ্চিন্ত থেকো না। তোমাকে অবশ্যই কবর গৃহে আসতে হবে। তুমি অতিসত্তর প্রস্তুত হও। শীঘ্রই প্রস্তুত হও। অতি শীঘ্রই প্রস্তুত হও। ৮১
টিকাঃ
৭২. ইব্ন আসাকির, তারীখুদ্ দামেশ্ক, ২৪, পৃ. ৩২৮।
৭৩. ইমাম আল-গাজ্জালী, মুকাশাফাতুল কুলুব, ১খ., পৃ. ৩৭০।
৭৪. বুখারী, আস-সহীহ, ১খ., পৃ. ৪৪৮।
৭৫. সূরা ত্বহা, ৫৫।
৭৮. ইবন আবীদ দুনিয়া; ফাজায়েলে সাদাকাত, ২খ., পৃ. ২৭৬।
৭৯. ইমাম আল-গাজ্জালী, দাকায়িকূল আখবার।
৮০. ইবন আবিদ দুনিয়া।
৮১. ইবন আসাকীর, নূরুস্সুদূর ফী শারহিল কুনূর।
📄 পরকালীন জীবন
আমরা পরকাল বিশ্বাস বলতে বুঝাতে চাই এ জীবন এবং মহাবিশ্ব পুরোপুরী ধ্বংস হয়ে যাবার পর প্রাণি জগতের আবার পুনরুত্থান হবে। সেই পুনরুত্থানের পরের জীবনকেই আমরা পরকাল জীবন বলি।
ইসলাম যে তিন জিনিসের বিশ্বাসের প্রতি স্ব বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে থাকেন সেই তিনটি বিষয়ের তৃতীয় বিষয়টি হল পরকাল বিশ্বাস। বিষয় তিনটি হল তাওহীদ, রিসালাত ও আখিরাত। আখিরাত মানে সেই পুনরুত্থানের পরের জীবন এবং সে জীবনে সংঘটিত হওয়া সব কিছু। অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলা এ মহাবিশ্বের সব কিছু ধ্বংস করে দেয়ার পর প্রাণি জগতকে পুনরায় তাদের কবর তথা বরযাখী জীবন থেকে জীবিত করে তুলবেন। সেই জীবনটি বস্তুগত জীবন। তাদেরকে পুনরুত্থানের পর সকলকে একস্থানে উপস্থিত করানো হবে। এ এক স্থানে উপস্থিত করানোকে বলা হয় হাশর। অতপর সেখানে দুনিয়ার জীবনের সব কিছুর হিসাব নিকাশ করা হবে। তাদের পার্থিব জীবনে কৃত সমস্ত কর্মের ওজন করা হবে। অতপর তাদেরকে জান্নাতে প্রেরণ করা হবে কিংবা জাহান্নামে। জান্নাতীরা জান্নাতে চিরস্থায়ীভাবে বসবাস করবেন। আর জাহান্নামীদের মধ্যে যারা মুমিন ছিল তাদেরকে তাদের অপরাধ অনুযায়ী শাস্তি দানের পর ধীরে ধীরে মুক্তি দিয়ে জান্নাতে প্রেরণ করা হবে। এসবের প্রতি বিশ্বাসকেই পরকাল বিশ্বাস বলা হয়। আর এ বিশ্বাস মুমিনদের জন্য একান্ত জরুরী। এ বিশ্বাস ছাড়া কেউ মুমিন হতে পারবে না। কারণ এ বিশ্বাস ইসলামী আকীদার অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। আল্লাহর অস্তিত্বে বিশ্বাসের চেয়ে এ বিশ্বাস কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। এ কারণেই আল্লাহ তা'আলা পবিত্র কুরআনে তার অস্তিত্বে বিশ্বাসের কথা বলার সাথে সাথে পরকাল বিশ্বাসের কথাও আলোচনা করেছেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
لَيْسَ الْبِرَّ أَنْ تُوَلُّوا وُجُوهَكُمْ قِبَلَ الْمَشْرِقِ وَالْمَغْرِبِ وَلَكِنَّ الْبِرَّ مَنْ آمَنَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ وَالْمَلَائِكَةِ وَالْكِتَابِ وَالنَّبِيِّينَ
"পূর্ব ও পশ্চিম দিকে তোমাদের মুখ ফিরানোতে কোন কল্যাণ বা পুণ্য নেই। কিন্তু পুণ্য আছে কেউ আল্লাহ, পরকাল ফেরেস্তাগণ, সমস্ত কিতাব এবং নবীগণের প্রতি ঈমান আনয়ন করলে।"৮২
সুরতাং পরকাল বিশ্বাস ছাড়া কারো ঈমান পরিপূর্ণ হতে পারে না বরং পরকাল বিশ্বাস হলো আল্লাহ তাওহীদ ও রিসালাতে বিশ্বাসের পর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। একারণেই যারা পরকালে বিশ্বাসী নয় তারা বিভ্রান্ত ও গোমরাহ। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا آمِنُوا بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ وَالْكِتَابِ الَّذِي نَزَّلَ عَلَى رَسُولِهِ وَالْكِتَابِ الَّذِي أَنزَلَ مِنْ قَبْلُ وَمَنْ يَكْفُرْ بِاللَّهِ وَمَلَائِكَتِهِ وَكُتُبِهِ وَرُسُلِهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ فَقَدْ ضَلَّ ضَلَالًا بَعِيدًا
“হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহ ও তার রাসূল, তিনি যে কিতাব তার রাসূলের প্রতি অবর্তীণ করেছেন তাতে এবং যে কিতাব তিনি পূর্বে অবতীর্ণ করেছেন তাতে ঈমান আন। এবং কেউ তার ফেরেস্তা এবং পরকাল অস্বীকার করলে সে ভীষণ ভাবে ভ্রষ্ট হয়ে পড়বে।"৮৩
যখন পরকাল বিশ্বাস আবশ্যক ও ওয়াজিব প্রমাণিত হল, একথাও জানা গেল যে, আল কুরআন এবং প্রতি বিশেষের গুরুত্ব আরোপ করেছে এবং বহু স্থানে সে প্রসঙ্গে আলোচনা করেছে তার থেকে একথা প্রমাণিত হল যে, পরকাল অস্বীকার সুস্পষ্ট কুফরী। এ কারণেই পরকাল অস্বীকার করার জন্য আল্লাহ তা'আলা কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা রেখেছেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
وَمَنْ يَكْفُرْ بِاللَّهِ وَمَلَائِكَتِهِ وَكُتُبِهِ وَرُسُلِهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ فَقَدْ ضَلَّ ضَلَالًا بَعِيدًا.
"যে আল্লাহ তার ফিরশতা, তার রাসূলগণ এবং পরকাল অস্বীকার করে সে বিরাট বিভ্রান্ত।"৮৪ আল্লাহ তা'আলা আরও বলেন:
بَلْ كَذَّبُوا بِالسَّاعَةِ وَأَعْتَدْنَا لِمَنْ كَذَّبَ بِالسَّاعَةِ سَعِيرًا .
"বরং তারা পরকাল অস্বীকার করে আর যারা পরকাল (কিয়ামত) অস্বীকার করে তাদের জন্য আমরা জাহান্নাম প্রস্তুত রেখেছি।"৮৫ আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন:
زَعَمَ الَّذِينَ كَفَرُوا أَنْ لَنْ يُبْعَثُوا قُلْ بَلَى وَرَبِّي لَتُبْعَثُنَّ ثُمَّ لَتُنَبَّؤُنَ بِمَا عَمِلْتُمْ وَذَلِكَ عَلَى اللَّهِ يَسِيرُ .
"কাফেররা মনে করা তাদের পুনরুত্থান করা হবে না। হাঁ, তোমার রবের নামে শপথ তাদের অবশ্যই পুনরুত্থান করা হবে। অতপর তোমরা যা করেছো সে সম্পর্কে অবগত করা হবে। তা আল্লাহর জন্য খুবই সহজ ব্যাপার।"৮৬ আল্লাহ তা'আলা আরও বলেন:
وَقَالَ الَّذِينَ كَفَرُوا لَا تَأْتِينَا السَّاعَةُ قُلْ بَلَى وَرَبِّي لَتَأْتِيَنَّكُمْ
"কাফেররা বলে কিয়ামত সংঘটিত হবে না। বল হাঁ আমার রবের শপথ অবশ্যই তা তোমাদের জন্য আসবে।"৮৭ আল্লাহ তা'আলা আরও বলেন:
وَمَنْ يَهْدِ اللَّهُ فَهُوَ الْمُهْتَدِي وَمَنْ يُضْلِلْ فَلَنْ تَجِدَ لَهُمْ أَوْلِيَاءَ مِنْ دُونِهِ وَنَحْشُرُهُمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ عَلَى وُجُوهِهِمْ عُمْيًا وَبُكُمًا وَصُمًّا مَأْوَاهُمْ جَهَنَّمُ كُلَّمَا خَبَتْ زِدْنَاهُمْ سَعِيرًا . ذَلِكَ جَزَاؤُهُمْ بِأَنَّهُمْ كَفَرُوا بِآيَاتِنَا وَقَالُوا أَئِذَا كُنَّا عِظَامًا وَرُفَاتًا أَئِنَا لَمَبْعُوثُونَ خَلْقًا جَدِيدًا.
"আল্লাহ যাদের পথ নির্দেশ করেন তারা পথ প্রাপ্ত। আর তিনি যাদের পথ ভ্রষ্ট করেন তুমি তাকে ব্যতীত অন্য কাউকে তাদের অভিভাবক হিসেবে পাবে না। কিয়ামতের দিন আমি তাদেরকে সমবেত করব তাদের মুখের উপর ভর দেয়া অবস্থায়। অন্ধ মুক ও বধির করে। আর তাদের অবস্থান হবে জাহান্নামে। যখনই তা স্তিমিত হবে আমি তাদের জন্য আগুনের শিখা বৃদ্ধি করে দিব। এটা তাদের প্রতিদান স্বরূপ। কারণ তারা আমার নির্দশন সমূহ অস্বীকার করেছে, আর বলেছে যখন আমরা অস্থিতে পরিণত হয়ে চূর্ন বিচূর্ন হয়ে যাব আমরা কি আবার নব সৃষ্টি হিসেবে পুনরোত্থিত হবো।"৮৮
টিকাঃ
৮২ সূরা বাকারা: ১৭৭।
৮৩ সূলা নিসা, ১৩৬।
৮৪ সূরা নিসা, ১৩৬।
৮৫ সূরা আল ফোরকান, ১১।
৮৬ সূরা তাগাবুন, ৭।
৮৭ সূরা নাবা, ৩।
৮৮ সূরা বনী ঈসরাঈল, ৯৬-৯৭।
📄 দ্বিতীয় বার পুনর্জীবন লাভ
আমরা ইতিপূর্বে আলোচনা করেছি যে দ্বিতীয় বারের মত শিংগায় ফুৎকার দেয়ার পর দ্বিতীয় বার সমস্ত প্রাণি জগত জীবন লাভ করবে। অর্থাৎ সমস্ত প্রাণি জাতি তাদের দেহ ও আত্মা পুনরায় ফিরে পাবে এবং কবর থেকে সকলের পুনরুত্থান হবে। এবং এ পুনরুত্থানটি হবে মানবাঙ্গের "আজবুযয যানব" নামক একটা অস্তি থেকে, যা আল্লাহর হুকুমে বাকি থাকবে। তা আধুনিক বৈজ্ঞানিকদের কথা মত ডি.এন.এ-ও হতে পারে। এ প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ্ সা. বলেছেন: মানুষের সবকিছু বিলীন হয়ে যাবে। তবে তার আজবুয যানব নামক জিনিসটি বিলীন হবে না। সেখান থেকেই সৃষ্টি জাতির পুনরুত্থান হবে।"৮৯
আবু ইয়ালা ও হাকেমের এক বর্ণনায় আছে, রাসূলুল্লাহ্ সা.-কে জিজ্ঞেস করা হলো, 'আজবুষ যাবন' জিনিটি কি? তিনি বললেন সেটা শর্ষে পরিমাণের একটা জিনিস।"৯০
এ জিনিস থেকেই সমস্ত মানব জাতিকে পুনরুত্থান করা হবে। যেমন পূর্বোক্ত হাদীসে আছে। এ প্রসঙ্গে ইবনে আকীল বলেন: এতে আল্লাহ্ তা'আলা একটা গোপন রহস্য রয়েছে। সে রহস্যের বলেন: এতে আল্লাহ ছাড়া আর কেউ জানেন না। কারণ যিনি অনস্তিত্ত্ব থেকে অস্তিত্ত্ব দান করতে পারেন তিনি কোন কিছু থেকে পুনরুত্থান করার প্রয়োজন পড়ে না।"৯১
দ্বিতীয় বার বস্তুগত জীবন লাভের দিকে ইঙ্গিত করে আল্লাহ্ তা'আলা বলেন:
وَاسْتَمِعُ يَوْمَ يُنَادِ الْمُنَادِي مِنْ مَكَانٍ قَرِيبٍ يَوْمَ يَسْمَعُونَ الصَّيْحَةَ بِالْحَقِّ ذَلِكَ يَوْمُ الْخُرُوجِ . إِنَّا نَحْنُ نُحْيِي وَنُمِيتُ وَإِلَيْنَا الْمَصِيرُ . يَوْمَ تَشَقَّقُ الْأَرْضُ عَنْهُمْ سِرَاعًا ذَلِكَ حَشْرٌ عَلَيْنَا يَسِيرٌ.
"যে দিন তারা সত্য সত্যি বিকট শব্দ শুনতে পাবে সেদিনটি হবে (কবর হতে) বের হবার দিন। আমি জীবন দান করি মৃত্যু সেটাই এবং সকলের প্রত্যাবর্তন আমারই দিকে। যেদিন পৃথিবী বিদীর্ণ হবে এবং মানুষ বের হয়ে আসবে ত্রস্ত ব্যাস্ত হয়ে এই সমবেত সমাবেশ করণ আমার জন্য সহজ।"৯২ আল্লাহ্ তা'আলা আরও বলেন:
أَيَحْسَبُ الْإِنْسَانُ أَلَنْ نَجْمَعَ عِظَامَهُ . بَلَى قَادِرِينَ عَلَى أَنْ نُسَوِّيَ بَنَانَهُ.
"মানুষরা কি মনে করে আমরা তাদের অস্থিসমূহ একত্রিত করতে পারব না? হ্যাঁ, আমি তাদের অস্থিসমূহের অগ্রভাগ পর্যন্ত পূর্ণ বিন্যস্ত করতে সক্ষম।"৯৩ আল্লাহ্ তা'আলা আরও বলেন:
وَنُفِخَ فِي الصُّورِ فَإِذَا هُمْ مِنَ الْأَجْدَاثِ إِلَى رَبِّهِمْ يَنسِلُونَ . قَالُوا يَا وَيْلَنَا مَنْ بَعَثَنَا مِنْ مَرْ قَدِنَا هُذَا مَا وَعَدَ الرَّحْمَانُ وَصَدَقَ الْمُرْسَلُونَ . إِنْ كَانَتْ إِلَّا صَيْحَةً وَاحِدَةً فَإِذَا هُمْ جَمِيعٌ لَدَيْنَا مُحْضَرُونَ .
"আর যখন শিংগায় ফুৎকার দেয়া হবে তখন তারা সকলে তাদের কবর থেকে তাদের প্রভুর দিকে ছুটে আসবে। তারা বলবে হায় দুর্ভোগ কে আমাদেরকে নিদ্রাস্থল হতে উঠিয়েছে? এতে সেই যা দয়াময় মেহেরবান ওয়াদা করেছিল। আর রাসূল সত্য বলেছিল। তা ছিল এক মহা চিৎকার তখন সকলেই আমার কাছে উপস্থিত হবে।"৯৪ আল্লাহ্ তা'আলা আরও বলেন:
قُلْ هُوَ الَّذِي ذَرَأَكُمْ فِي الْأَرْضِ وَإِلَيْهِ تُحْشَرُونَ .
"বল তিনিই পৃথিবীতে তোমাদেরকে ছড়াইয়ে দিয়েছেন। এবং তার নিকট তোমাদেরকে সমবেত করা হবে।"৯৫ আল্লাহ্ তা'আলা আরও বলেন:
ثُمَّ إِنَّكُمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ تُبْعَثُونَ .
"অতপর তোমরা কিয়ামত দিবসে পুনরোথিত হবে।"৯৬
টিকাঃ
৮৯ বুখারী, হাদীস নং- ৪৪৪০; মুসলিম, হাদীস নং- ৫২৫৩।
৯০ হাকেম, ও আবু ইয়ালা।
৯১ ইবনে হাজর আসকালানী, ফাতহুল বারী, খ.৮, পৃঃ ৫৫২।
৯২ সূরা কাফ: ৪২-৪৪।
৯৩ সূরা কিয়ামা: ৩-৪।
৯৪ সূরা ইয়াসিন, ৫১-৫৩।
৯৫ সূরা মূলক: ২৪।
৯৬ সূরা মুমেনুন: ১৬।
📄 বিচারের জন্য সমস্ত সৃষ্টি জগতকে একত্রিকরণ
বিচারের জন্য সমস্ত সৃষ্টি জগতকে কিয়ামত দিবসে একত্রিত করণ বুঝাবার জন্য পবিত্র কুরআনে হাশর শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। পবিত্র কুরআন এবং সহীহ হাদীসে সমস্ত সৃষ্টি জগতকে এ দুনিয়ার কৃত কর্মের বিচার ফায়সালা করার জন্য একত্রিত করা মর্মে অনেক বিবরণ এসেছে। আমরা এখানে তার কিছু বিবরণ পেশ করছি।
১। মানুষ জ্বিন ফেরেশতা পশু পাখী ইত্যাদিকে বিচারের জন্য একত্রিত করণ প্রসঙ্গে:
মানুষ ও জ্বিন জাতিকে তো এজন্যই একত্রিত করা হবে যে তারা মুকাল্লাফ বা আল্লাহর আদেশ নিষেধ পালনের দায়িত্ব প্রাপ্ত ও কর্তব্য অর্পিত। সুতরাং এই দুনিয়ার কৃত কর্মের জন্য তাদেরকে একত্রিত করে হিসাব নিকাশ নেয়া হবে এবং বিচার ফায়সালা করা হবে। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্ তা'আলা বলেন:
يَا مَعْشَرَ الْجِنِّ وَالْإِنسِ أَلَمْ يَأْتِكُمْ رُسُلٌ مِنْكُمْ يَقُضُّونَ عَلَيْكُمْ آيَاتِي وَيُنْذِرُونَكُمْ لِقَاءَ يَوْمِكُمْ هَذَا قَالُوا شَهِدْنَا عَلَى أَنْفُسِنَا وَغَرَّتْهُمُ الْحَيَاةُ الدُّنْيَا وَشَهِدُوا عَلَى أَنْفُسِهِمْ أَنَّهُمْ كَانُوا كَافِرِينَ
"হে জ্বিন ও মানুষের দল তোমাদের কাছে কি আমার রাসূলগণ আসেননি তোমার কাছে আমার আয়াত পৌছাবার জন্য এবং তোমদেরকে আজকের দিনকে সতর্ক করার জন্য। তারা বলবে আমরা আমাদের নিজেদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিচ্ছি। দুনিয়ার জীবন তাদেরকে প্রতারনায় ফেলেছে। এবং তারা তাদের নিজেদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিবে যে তারা অস্বীকারকারী ছিল।"৯৭
আর ফেরেস্তাদের হাশর হবে তাদের মধ্যে আল্লাহর ফায়সালা বিধান এবং আল্লাহ্ তা'আলা কর্তৃক তাদের জন্য নির্ধারিত দায়িত্ব পালনের জন্য। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্ তা'আলা আরও বলেন:
تَعْرُجُ الْمَلَائِكَةُ وَالرُّوحُ إِلَيْهِ فِي يَوْمٍ كَانَ مِقْدَارُهُ خَمْسِينَ أَلْفَ سَنَةٍ.
"ফেরেস্তা এবং রূহ আল্লাহর দিকে উর্ধ্বগামী হবে এমন এক দিন যা হবে পার্থিব জীবনের পঞ্চাশ হাজার বছরের সমান।"৯৮ আল্লাহ্ তা'আলা আরও বলেন:
يَوْمَ يَقُومُ الرُّوحُ وَالْمَلَائِكَةُ صَفًّا لَا يَتَكَلَّمُونَ إِلَّا مَنْ أَذِنَ لَهُ الرَّحْمَانُ وَقَالَ صَوَابًا.
"সেদিন রূহ (জিব্রাঈল) ও ফেরেস্তারা সারিবদ্ধভাবে দণ্ডায়মান হবে দয়ালু আল্লাহ যাকে অনুমতি দিবেন তিনি ছাড়া আর কেউ কথা বলবে না। এবং সত্য কথা বলবে।"৯৯ আল্লাহ্ তা'আলা আরও বলেন:
نَارًا وَقُودُهَا النَّاسُ وَالْحِجَارَةُ عَلَيْهَا مَلَائِكَةٌ غِلَاظٌ شِدَادٌ لَا يَعْصُونَ اللَّهَ مَا أَمَرَهُمْ وَيَفْعَلُونَ مَا يُؤْمَرُونَ .
"এমন আগুন হতে যার ইন্ধন হবে মানুষ ও পাথর। যাতে নিয়োজিত আছে নির্মম হৃদয়ের কঠোর স্বভাবের ফেরেস্তাগণ। যারা আল্লাহর আদেশ অমান্য করে না। এবং যা আদেশ করা হয় তা পালন করে।"১০০ এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্ তা'আলা বলেন:
وَتَرَى الْمَلَائِكَةَ حَافِينَ مِنْ حَوْلِ الْعَرْشِ يُسَبِّحُونَ بِحَمْدِ رَبِّهِمْ وَقُضِيَ بَيْنَهُمْ بِالْحَقِّ .
"আর যেদিন আপনি দেখতে পাবেন আরশের চার পাশে বেষ্টনকারী ফেরেস্তাদেরকে তারা তাদের প্রতিপালকের তাছবীহ পড়ছে। আর তাদের মধ্যে ন্যায়নীতি অনুযায়ী ফায়সালা করা হবে।"১০১ আর পশু পাখির হাশর হবে তাদের মধ্যে যেসব পশুপাখি অন্যপশু পাখির প্রতি এ পৃথিবীতে থাকতে কোন প্রকারের জুলুম করেছিল সে জুলুমের প্রতিশোধ গ্রহনের জন্য। আবু হুরাইরার (রা.) মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ্ সা. থেকে বর্ণিত এক হাদীসে রাসূলুল্লাহ্ সা. বলেন: কিয়ামত দিবসে প্রত্যেক হক ও অধিকার প্রাপককে তার হক পাইয়ে দেয়া হবে। এমনকি শিংহীন ছাগল থেকে শিং বিশিষ্ট ছাগল থেকে তার আঘাতের প্রতিশোধ নেয়া হবে। ১০২ এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্ তা'আলা বলেন:
وَمَا مِنْ دَابَّةٍ فِي الْأَرْضِ وَلَا طَائِرٍ يَطِيرُ بِجَنَاحَيْهِ إِلَّا أُمَمٌ أَمْثَالُكُمْ مَا فَرَّطْنَا فِي الْكِتَابِ مِنْ شَيْءٍ ثُمَّ إِلَى رَبِّهِمْ يُحْشَرُونَ.
"ভূপৃষ্ঠে বিচরণশীল এমন জীব নেই অথবা নিজ ডানার সাহায্যে এমন কোন পাখি উড়ে না যা তোমাদের মত একটি উম্মত নয়। কিতাবে কোন কিছুই আমি বাদ দিইনি। অতপর স্বীয় প্রতিপালকের দিকে তাদের সকলকে জমায়েত করা হবে।"১০৩
২। মানুষের নগ্ন পা নগ্ন দেহ এবং খত্নাবিহীন অবস্থায় হাশর হবে যেসব প্রথমে জন্ম গ্রহণ করেছিল এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্ তা'আলা বলেন:
كَمَا بَدَأْنَا أَوَّلَ خَلْقٍ نُعِيدُهُ وَعْدًا عَلَيْنَا إِنَّا كُنَّا فَاعِلِينَ .
"যেভাবে আমি সৃষ্টির সূচনা করেছিলাম সেভাবেই পুনরায় সৃষ্টি করব। প্রতিশ্রুতি পালন আমার কর্তব্য। আমি অবশ্যই তা পালন করব।"১০৪ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন রাসূলুল্লাহ্ সা. বলেন: তোমাদের আল্লাহর কাছে নগ্ন পায়ে নগ্ন দেহে এবং খৎনাবিহীন অবস্থায় জমায়েত (হাশর) করা হবে। যেভাবে সৃষ্টির সূচনা করেছিলাম সেভাবেই পূনরায় সৃষ্টি করব। আমরা তা অবশ্যই করব।”১০৫
৩। ভিন্ন ভিন্ন দলে মানুষের হাশর হবে কিয়ামত দিবসের ভয়াবহতার কারণে মানুষজনের ভিন্ন ভিন্ন দলে হাশর হবে। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্ তা'আলা বলেন:
يَوْمَئِذٍ يَصْدُرُ النَّاسُ أَشْتَاتًا لِيُرَوْا أَعْمَالَهُمْ .
"সেদিন মানুষ ভিন্ন ভিন্ন দলে বের হবে। তাদেরকে তাদের কৃতকর্ম দেখানো হবে। "১০৬
৪। কাফেরদের অন্ধ বোবা ও বহরাবস্থায় হাশর হবে পবিত্র কুরআনে এ প্রসঙ্গে বলা হয়েছে:
وَنَحْشُرُهُمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ عَلَى وُجُوهِهِمْ عُمْيًا وَبُكْما وَصُمَّا مَأْوَاهُمْ جَهَنَّمُ كُلَّمَا خَبَتْ زِدْنَاهُمْ سَعِيرًا . ذَلِكَ جَزَاؤُهُمْ بِأَنَّهُمْ كَفَرُوا بِآيَاتِنَا وَقَالُوا أَئِذَا كُنَّا عِظَامًا وَرُفَاتًا أَئِنَا لَمَبْعُوثُونَ خَلْقًا جَدِيدًا .
"কিয়ামতের দিন আমি তাদের (কাফের)-কে সমবেত করব তাদের মুখের উপর ভর দিয়ে চলাবস্থায়। অন্ধ মুক ও বধির করে। তাদের আবাসস্থল হবে জাহান্নাম। যখনই তা স্তিমিত হবে আমি তখনই তাদের জন্য অগ্নিশিখা বৃদ্ধি করে দিব। এটাই তাদের প্রতিফল। এজনই যে তারা আমার আয়াত সমূহ অস্বীকার করেছে। এবং বলেছে আমাদের অস্তিসমূহ চূর্ণ বিচূর্ণ হলেও কি আমরা নতুন সৃষ্টি রূপে পুনরোত্থিত হবো?”১০৭
এ প্রসঙ্গে আনাছ ইবনে মালেক (রা.) থেকে বর্ণিত এক হাদীসে আছে, বলা হল হে আল্লাহর রাসূল! মানুষকে কি করে মুখমণ্ডলের উপর ভয় করে হাশর (সমবেত) করা হবে? রাসূলুল্লাহ্ সা. উত্তরে বললেন: যিনি তাদের পায়ের উপর হাটাতে সক্ষম তিনি তাদেরকে মুখমণ্ডলের উপর ভর দিয়ে চলাতেও সক্ষম। "১০৮
অপর এক হাদীসে আছে মানুষকে তিনটি দরে বিভক্ত করে হাশr বা সমবেত করা হবে। এক দল থাকবে আরোহী ভরা পেটে পোশাক পরিধান করাবস্থায়। অপর এক দল পথচারী ও দ্রুতগামী অবস্থায়। আর এক দলের সাথে থাকবে ফেরেস্তারা তারা তাদেরকে হাকিয়ে মুখমণ্ডলের উপর ভর করে হাটিয়ে নিয়ে যাবে জাহান্নামের দিকে। "১০৯
৫। আপরাধীদের হাশর হবে নীল চোখ বিশিষ্ট অবস্থায় নীল চোখ বলতে আরবীতে বুঝানো হয় ভীতসন্ত্রস্ততার কারণে চোখে শর্ষেফুল দেখা তথা কিছু দেখতে না পাওয়া অবস্থাকে। কাফেরদের এরূপ অবস্থায় হাশর হওয়া এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্ তা'আলা বলেন:
وَنَحْشُرُ الْمُجْرِمِينَ يَوْمَئِذٍ زُرْقًا .
"সেদিন আমি অপরাধীদের নীলচক্ষু অবস্থায় সমবেত করব। "১১০
৬। অবস্থান স্থলের দিকে এস্ত-ব্যস্ত হয়ে সমবেত হবে সকল মানুষ কিয়ামতের দিন কবর থেকে উঠে ব্যাস্ত হয়ে সমবেত হবে। আল্লাহ্ তা'আলা বলেন:
يَوْمَ تَشَقَّقُ الْأَرْضُ عَنْهُمْ سِرَاعًا ذَلِكَ حَشْرٌ عَلَيْنَا يَسِيرُ .
"যে দিন পৃথিবী বিদীর্ণ হবে এবং মানুষ বের হয়ে আসবে ব্যাস্ত হয়ে, এভাবে সমবেতকরণ আমার জন্য সহজ।”১১১
ইবনে কাসীর এ আয়াতের তাফসীর প্রসঙ্গে বলেন: তা হবে এভাবে যে, আল্লাহ্ তা'আলা আসমান হতে বৃষ্টি বর্ষণ করাবেন সে বৃষ্টির ফলে সমস্ত মানুষের দেহ তাদের কবর থেকে পূর্ণ অস্তিত্ব লাভ করবে যেভাবে পানির কারণে মাটিতে বীজের উদগমন হয়। আর যখন দেহ পূর্ণতা লাভ করবে তখন আল্লাহ্ তা'আলা ইস্রাফিলকে আদেশ করবেন শিংগায় ফুৎকার দিতে। তখন ফুৎকার দেয়া হবে। আর যখন তাতে ফুৎকার দেয়া হবে তখন সমস্ত রূহ আসমান জমিনের মধ্যে ঘুরতে থাকবে। তখন আল্লাহ্ তা'আলা বলবেন। আমার ইজ্জত ও মর্যাদার কসম! প্রত্যেক রূহ যেন নিজেদের পূর্বের দেহে ফিরে যায়। তখন সকল রূহ ফিরে যাবে তার দেহে। বিষ যেমন দেহের মধ্যে তেমনি ছড়িয়ে পড়ে রূহ ও তার মধ্যে ছড়িয়ে পড়বে। তখন মাটি তাদের উপর থেকে বিদীর্ণ করা হবে। তখন তারা অবস্থান স্থলের দিকে ত্রস্ত-ব্যাস্ত হয়ে আল্লাহ আদেশ পালনার্থে ছুটতে থাকবে। ১১২
৭। ভিক্ষুকদের অবস্থা আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ্ সা. বলেছেন: মানুষ লোকদের কাছে হাত পাততে থাকবে (ভিক্ষা করতে থাকবে) অবশেষে কিয়ামত দিবসে সে এমন অবস্থায় আসবে যে তার মুখমণ্ডলে কোন গোস্ত থাকবে না। "১১৩
৮। এক স্ত্রীর প্রতি যারা বেশী ধাবিত হয় তাদের অবস্থা যার একাধিক স্ত্রী আছে সে যদি তার কোন স্ত্রীর প্রতি বেশী ধাবিত হয় তাদের মধ্যে সুবিচার ও ইনসাফ করে কোন এক স্ত্রীর প্রতি ঝুকে পড়ে তাকে সুযোগ সুবিধা বেশী দেয় তাহলে তার অবস্থা হবে নিম্নরূপ। আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ্ সা. বলেছেন, যার দুজন স্ত্রী আছে সে যদি দুজনের একজনের প্রতি ধাবিত হয় অন্যজনকে অবজ্ঞা করে কিয়ামত দিবসে সে এমন অবস্থায় উপস্থিত হবে যে তার (শরীরের) একদিক ঝুকে থাকবে।”১১৪
সমস্ত উপস্থিত জনজণ তা দেখতে পাবে। তাদের এ অবস্থার উদ্দেশ্য শাস্তির পরিমাণ বৃদ্ধি করা ও অন্যদের সামনে লজ্জিত করা।
৯। হত্যকারী ও হত্যাকৃত ব্যক্তির অবস্থা আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন : কিয়ামত দিবসে হত্যাকৃত ব্যক্তি এক হাতে হত্যাকারীকে ধরে আর অপর হাতে তার নিজের মাথা নিয়ে উপস্থিত হবে। অতপর সে বলবে হে আমার প্রভু! আপনি একে জিজ্ঞেস করুন সে আমাকে কেন হত্যা করে ছিল? রাসূলুল্লাহ্ সা. বলেন সে তখন বলবে আমি তাকে হত্যা করেছিলাম অমুকের ইজ্জত রক্ষার জন্য। রাসূলুল্লাহ্ সা. বলেন: কিন্তু সে তার (বোঝা বহন করবেনা। তিনি বলেন: অতপর জাহান্নামে সত্তর বছর পর্যন্ত নিক্ষেপ করা হবে। "১১৫
১০। কোন মুসলমানের হত্যায় সহযোগীর অবস্থা আবু হুরাইরা হতে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ্ সা. বলেছেন, যে ব্যক্তি কোন মুসলমানকে হত্যার কাজে সহযোগিতা করে এমন কি অর্ধ শব্দ দ্বারাও সে কিয়ামত দিবসে আসবে তখন তার দুচোখের মধ্যে লিখা থাকবে আব্দুল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ।"১১৬
১১। যাকাত আদায় না কারীর অবস্থা আবু হুরাইরা (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন রাসূলুল্লাহ্ সা. বলেছেন, যাকে আল্লাহ্ তা'আলা সম্পদ দান করেছেন কিন্তু সে তার যাকাত দিল না। তার জন্য কিয়ামত দিবসে দুটি দাত যুক্ত বিষধর সাপ ছেড়ে দেয়া হবে। এ সাপ দু'টি কিয়ামতের দিন তার গলায় বেড়ির মত পেচিয়ে থাকবে। অতপর তার উভয় চোয়ালে জড়িয়ে বলবে, আমি তোমার সম্পদ, আমি তোমার সঞ্চিত অর্থ। তারপর রাসূল (সা.) নিম্ন লিখিত আয়াতটি তেলাওয়াত করলেন:
وَلَا يَحْسَبَنَّ الَّذِينَ يَبْخَلُونَ بِمَا آتَاهُمُ اللَّهُ مِنْ فَضْلِهِ هُوَ خَيْرًا لَهُمْ بَلْ هُوَ شَرٌّ لَهُمْ سَيُطَوَّقُونَ مَا بَخِلُوا بِهِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ
"এবং আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে যা তোমাদের দিয়েছেন তাতে যারা কৃপণতা করে তাদের জন্য তা মঙ্গল এটা যেন তারা কিছুতেই মনে না করে। এটা তাদের জন্য অমঙ্গল জনক। এতে যদি তারা কৃপণতা করবে কিয়ামতের দিন তা তাদের গলার বেড়ি হবে।"১১৭
১২। আমীর-ওমরাদের অবস্থা আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ্ সা. বলেছেন, যে ব্যক্তি ধৈর্যসহ এমন কোন শপথ! করল যার দ্বারা অপর কোন মুসলমানের সম্পদ কেড়ে নিল। সে কিয়ামত দিবসে আল্লাহর সাথে এমনাবস্থায় সাক্ষাৎ করবে যে আল্লাহ্ তা'আলা তখন তার উপর ক্রদ্ধ থাকবে না।"১১৮
এছাড়াও আরও অনেক মানুষ কিয়ামত দিবসে বিভিন্ন অবস্থায় উপস্থিত হবে, এ ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ্ সা. যা যা বলেছেন তা সবই আমরা বিশ্বাস করি যদি তা সঠিক ও সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হয়।
টিকাঃ
৯৭ সূরা আনআম: ১৩০।
৯৮ সূরা মাআরিজ: ৪।
৯৯ সূরা নাবা, ৩৮।
১০০ সূরা তাহরীম: ৬।
১০১ সূরা আয যুমার, ৭৫।
১০২ মুসলিম, ৪৬৭৯; তিরমিযি, ২৩৪৪; আহমদ, ৭৬৫৫।
১০৩ সূরা আনআম, ৩৮।
১০৪ সূরা আম্বিয়া, ১০৪।
১০৫ বুখারী, ৪৪৪০; মুসলিম, ৫২৫৩।
১০৬ সূরা যিলযাল, ৬।
১০৭ সূরা বনী ইস্রাঈল, ৯৭-৯৮।
১০৮ বুখারী, ৬০৪২; মুসলিম, ৫০২০; আহমদ, ১২২৪৭।
১০৯ আহমদ, ২০৪৮৩; নাসায়ী, ২০৫৯।
১১০ সূরা ত্বাহা, ১০২।
১১১ সূরা কাফ: ৪৪।
১১২ মুহাম্মদ আলী সাবুনী, মুখতাছর তাফসীর ইবনে কাসীর, খঃ৩, পৃ-৩৭৯।
১১৩ বুখারী, ১৩৮১, মুসলিম, ১৭২৫।
১১৪ আহমদ, ৯৭০৯; নাসায়ী, ৩৯৯১; তিরমিযি, ১০৬০; হাকেম হাদীসটি সহীহ বলে মন্তব্য করে।
১১৫ নাসায়ী, ৩৯৩২।
১১৬ ইবনে মাজাহ, ২৬১০।
১১৭ বুখারী, ১৩১৫; আয়াতটি সূরা আলে এমরানের ১৮০।
১১৮ মুসলিম, ১৯৭।