📘 মৃত্যুর পরে অনন্ত জীবন > 📄 মৃত্যুকালে শয়তানের ধোঁকা থেকে আত্মরক্ষার উপায়

📄 মৃত্যুকালে শয়তানের ধোঁকা থেকে আত্মরক্ষার উপায়


মৃত্যুকালে শয়তানের ধোঁকা থেকে নিরাপদ থাকা এবং দ্বীনের উপর ইস্তিকামাত থাকার জন্য রাসূলুল্লাহ্ সা.-এর হাদীস ও কুর'আনের আয়াত থেকে কিছু উপায় জানা যায়। যেমন:
প্রথম উপায়: ঈমান গ্রহণের উপর অটল থাকা।
দ্বিতীয় উপায়: ঈমানের উপর ইস্তিকামাত থাকা। এ দু'টো উপায় উপরে আলোচিত আয়াত দ্বারা প্রমাণিত।
তৃতীয় উপায়: গোসল ফরয অবস্থায় গোসল করতে দেরি হলে কমপক্ষে সাথে সাথে অযু করে নেয়া। তাও সম্ভব না হলে তায়াম্মুম করে নিবে।
চতুর্থ উপায়: স্বীয় আত্মা, পোশাক ও ঘরকে এরকম বস্তু থেকে পবিত্র রাখা, যার কারণে রহমতের ফেরেস্তা ঘরে ঢুকে না। যেমন: ফটো, কুকুর, গোসল ফরযকারী মানুষ, ঐ সকল অলংকার যাতে আওয়াজ হয় ইত্যাদি। ৩৫
পঞ্চম উপায়: পিতা-মাতার কথা মান্য করা। হাদীসে আছে, এক ব্যক্তি মহানবী সা.-এর খিদমতে হাযির হয় আরজ করল : হে আল্লাহর রাসূল সা.! আমাদের এলাকায় একটি ছেলে মৃত্যুমুখে পতিত, তাকে কালেমা পড়তে বলা হলে সে পড়তে পারে না। রাসূলুল্লাহ্ সা. বললেন : সে পূর্ব থেকেই কি তা বড়তে অভ্যস্ত নয়? লোকেরা আরজ করল : হে আল্লাহর নবী। সে আগে সব সময় কালেমা পড়তে পারতো কিন্তু এখন পারছে না। তখন ছেলেটির পাশে রাসূলুল্লাহ্ সা. নিজেই তাশরীফ আনলেন এবং তাকে তালকীন করলেন। কিন্তু সে বলল: কালেমা পড়ার মত কোন শক্তি আমার নেই। মহানবী সা. বললেন: কেন? সে বলল: আমি আমার মায়ের কথা শুনতাম না। এরপর রাসূলুল্লাহ্ সা. তার মায়ের নিকট থেকে তার ভুল-ত্রুটি ক্ষমা করালেন, তারপর তার মুখ খুলে গেল এবং কালেমা তাইয়্যেবা পড়ে দুনিয়া থেকে চির বিদায় নিয়ে চলে গেলেন।
ষষ্ঠ উপায়: মৃত্যুর সময় অন্যান্য লোকদের মৃত্যু শয্যায় শায়িত ব্যক্তিকে কালেমা তালকীন করানো।

টিকাঃ
৩৫. মাশারেকুল আনওয়ার, পৃ. ১০।

📘 মৃত্যুর পরে অনন্ত জীবন > 📄 মৃত্যুর পূর্বে মাটি ও কবরের ঘোষণা

📄 মৃত্যুর পূর্বে মাটি ও কবরের ঘোষণা


আনাস রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: যমীন প্রতিদিন আদম সন্তানকে বলে: হে আদম সন্তান! তুমি আমার পৃষ্ঠের উপর স্বাধীনভাবে ঘুরা ফেরা করছ। তোমার মৃত্যুর পর যখন সবাই তোমাকে আমার উদরের সংকীর্ণ অন্ধকারময় স্থানে রেখে চলে যাবে, তখন তোমার কী দুদর্শা হবে? তখন তোমার আগের সে স্বাধীনতা আর থাকবে না। আমি তোমার মৃত্তিকা-শয়নগৃহ এত সংকীর্ণ ও অন্ধকারাচ্ছন্ন করে দিব যে, একদিক ফিরলে আর অন্য দিকে ফিরার ইচ্ছা থাকবে না। ভয়ে জড়সড় হয়ে কাঁদতে থাকবে।
যমীন আরো বলে: হে মানুষ! তুমি আমার পিঠের উপরে থেকে অন্যায়ভাবে ধন-সম্পত্তি, টাকা-পয়সা উপার্জন করে সে হারাম খাদ্য খেয়ে তোমার দেহ মোটা-তাজা করছ। জেনে রেখ, মৃত্যুর পর তোমার এ প্রিয় মোটা-তাজা সুখের শরীর কোন রকমেই মোটা-তাজা থাকবে না কীট-পতঙ্গের আহার্যে পরিণত হবে। সবই কীট-পতঙ্গে খেয়ে ধ্বংস করে ফেলবে।
মাটি আরো বলে: হে মানব! আমার পিঠের উপর বসবাস করে কত যে পাপের কাজ করেছ এবং অপরকেও পাপের কাজে প্রেরণা দান করেছ। মৃত্যুর পর কবরে তার প্রকৃত শান্তি পাবে। এমনি করে আমার পিঠে হাসি-তামাশা, আমোদ-প্রমোদ ও উল্লাস করে বেড়াচ্ছ, অযথা সময় নষ্ট করছ, এর প্রতিদান একদিন অন্ধকারময় কবরে অনুভব করতে হবে। আজ আমার পিঠের উপরে থেকে আনন্দে দিন কাটাচ্ছে। মৃত্যুর পর আমার মাঝে এসে এর প্রতিফল হাড়ে হাড়ে ভোগ করবে। এভাবে মাটি আরো বলে: হে আদম সন্তান! আমার এ উন্মুক্ত পিঠে আলোকময় খোলা ময়দানে বিচরণ করছ, কিন্তু মৃত্যুর পর এমন সংকীর্ণ অন্ধকারময় স্থানে বাস করতে হবে যেখানে মুক্ত বায়ু বইবে না। আলো বলতে কিছুই পাওয়া যাবে না, সেথায় তুমি কিছুই দেখতে পাবে না। তুমি নশ্বর পৃথিবীতে বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন নিয়ে মহানন্দে প্রশস্ত মাঠে ও খোলা বাতাসে ভ্রমণ করছ, কিন্তু মৃত্যুর পর সাথীহীন কবরে একা বসবাস করতে হবে। বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন বলতে সেখানে কেউ থাকবে না। ৩৭

টিকাঃ
৩৭. হাকিম, আল-মুসতাদরাক আলাস-সহীহাইন, ১খ., পৃ. ৯৩।

📘 মৃত্যুর পরে অনন্ত জীবন > 📄 মুমূর্ষ ব্যক্তির সাথে ফেরেশতাদের কথোপকথন

📄 মুমূর্ষ ব্যক্তির সাথে ফেরেশতাদের কথোপকথন


হাদীসের নির্ভরযোগ্য সূত্রের মাধ্যমে জানা যায় যে, যখন মানুষের অন্তিমকাল হাজির হয় এবং রূহ বের হওয়ার সময় ঘনিয়ে আসে, তখন চারজন ফেরেস্তা তার কাছে হাজির হয়। সর্বপ্রথম এক ফেরেস্তা উপস্থিত হয়ে বলেন : আস্সালামু আলাইকুম! হে অমুক! আমি তোমার আহার সংগ্রহের কাজে নিযুক্ত ছিলাম। কিন্তু এখন পৃথিবীর পূর্ব থেকে পশ্চিম প্রান্ত পর্যন্ত অন্বেষণ করেও তোমার জন্য এক দানা খাদ্য সংগ্রহ করতে পারলাম না। সুতরাং বুঝলাম, তোমার মৃত্যু ঘনিয়ে এসেছে, হয়তো এখনই তোমার মৃত্যু হতে পারে। অতপর দ্বিতীয় ফেরেস্তা এসে সালাম করে বলবেন: হে আল্লাহর বান্দাহ! আমি তোমার পানীয় সংগ্রহের জন্য নিয়োজিত ছিলাম কিন্তু এখন তোমার জন্য পৃথিবীর সর্বত্র ভ্রমণ করেও এক ফোঁটা পানি সংগ্রহ করতে পারলাম না। সুতরাং আমি বিদায় হলাম। এরপর তৃতীয় ফেরেস্তা এসে সালাম করে বলবেন : হে আল্লাহর বান্দা! আমি তোমার পদদ্বয়ের তত্ত্বাবধানে নিযুক্ত ছিলাম কিন্তু পৃথিবীর সর্বত্র খোঁজ করেও তোমার একটি মাত্র পদক্ষেপের স্থান পেলাম না। তাই আমি বিদায় নিচ্ছি। চতুর্থ ফেরেস্তা এসে সালাম করে বলবেন : হে আল্লাহর বান্দা! আমি তোমার শ্বাস- প্রশ্বাস চালু রাখার কাজে নিয়োজিত ছিলাম কিন্তু আজ পৃথিবীর এমন কোন স্থান খুঁজে পেলাম না যেখানে গিয়ে তুমি মাত্র এক পলকের জন্য শ্বাস-প্রশ্বাস গ্রহণ করতে পার। সুতরাং আমি চলে যাচ্ছি। এরপর কিরামান-কাতিবীন ফেরেস্তা এসে সালাম করে বলবেন : হে আল্লাহর বান্দা! আমরা তোমার পাপ-পূণ্য লেখার কাজে নিয়োজিত ছিলাম কিন্তু এখন দুনিয়ার সব স্থান খোঁজ করেও আর কোন পাপ-পূণ্য খুঁজে পেলাম না। সুতরাং আমরা চলে যাচ্ছি। এ বলে তাঁরা এক টুকরা কালো লিপি বের করে দিয়ে বলবেন : হে আল্লাহর বান্দাহ! এর দিকে লক্ষ্য কর। সে দিকে লক্ষ্য করার সাথে সাথে তার সর্বাঙ্গে ঘর্মস্রোত প্রবাহিত হবে এবং কেউ যেন ঐ লিপি পড়তে না পারে সে জন্য সে ডানেবামে বার বার দেখতে থাকবে। এরপর তারা চলে যাবেন। তখনই মালাকুল মউত আজরাঈল আ. তার ডান পাশে রহমতের ফেরেস্তা এবং বাম পাশে আযাবের ফেরেস্তা নিয়ে হাজির হবেন। তাদের মধ্যে কেউ বা আত্মাকে খুব জোরে টানাটানি করবেন, আবার কেউ অতি শান্তির সাথে আত্মা বের করে নিবেন। কন্ঠ পর্যন্ত আত্মা পৌঁছলে স্বয়ং আজরাঈল আ. তা কবজ করেন।

টিকাঃ
৩৮. ইত্তিহাফুল খাইরাতুল মাহরা, ২খ., পৃ. ৪৪২, হাদীস নং-১৮৫২।

📘 মৃত্যুর পরে অনন্ত জীবন > 📄 মৃত্যুর সময় মুমিনের অবস্থা

📄 মৃত্যুর সময় মুমিনের অবস্থা


হাদীসের এক বর্ণনায় এসেছে, রাসূলুল্লাহ্ সা. বলেছেন: যে সময় কোন লোকের শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে পরলোক যাত্রা করার সময় নিকটবর্তী হয়ে থাকে, সে সময় আসমান হতে সূর্যের মত আলোকজ্জ্বল চেহারা বিশিষ্ট একদল ফেরেস্তা বেহেস্তী কাফন ও সুগন্ধি সাথে নিয়ে যমীনে অবতীর্ণ হয়ে মৃত্যুপথযাত্রীর দৃষ্টি সীমার মধ্যে উপবিষ্ট হয়ে অপেক্ষা করতে থাকে। অতপর মালাকুল মউত তার মস্তকের পাশে বসে বলতে থাকে, হে পবিত্র আত্মা! আল্লাহ্ তা'আলার রহমত ও সন্তুষ্টির জন্য অতি শীঘ্র বাইরে চলে আস। তখন ঐ ব্যক্তির আত্মা স্বেচ্ছায় বের হয়ে থাকে এবং তার মুখ হতে পানির ফোটা পড়তে থাকে। তারপর তারা ঐ ব্যক্তির আত্মাকে উক্ত বেহেস্তী কাফনের ভিতরে লেপটিয়ে রাখেন। আর তখন তা হতে বেহেস্তী মেশকের সুঘ্রাণ বের হতে থাকে। তারপর ফেরেস্তাগণ যখন আত্মাকে নিয়ে আসমানে গমন করতে থাকে, তখন আসমানের ফেরেস্তাগণ বলতে থাকে: এত উৎকৃষ্ট সুবাস কোথা থেকে বের হচ্ছে। এর উত্তরে ফেরেস্তাগণ বলে: অমুকের পুত্র অমুকের রূহ তহতে এ সুবাস বের হচ্ছে। তখন উক্ত ফেরেশতামন্ডলী তাকে উত্তম নামে সম্বোধন করে থাকে। যখন ফেরেস্তাগণ আত্মা সহকারে প্রথম আকাশের শেষ সীমায় পৌছে যায়, তখনই সপ্তাকাশের সকল দরজাসূহ এর শুভাগমনে খুলে যায় এবং প্রতিটি আসমানের কতক ফেরেস্তা তার সম্বর্ধনার উদ্দেশ্যে সামনে এগিয়ে যায়। এ প্রকারে সপ্তম আসমানে আরোহন করা মাত্রই আল্লাহ্ তা'আলার পক্ষ থেকে উচ্চঃস্বরে বলা হয়ে থাকে: হে ফেরেশতামন্ডলী! তার আমলনামা ইল্লীয়ি‍্যন নামক স্থানে জমা রেখে দাও এবং উক্ত ব্যক্তির রূহকে তার দেহের সাথে মিলিয়ে দাও। যেহেতু তাকে মাটি হতেই সৃষ্টি করেছি এবং তাকে এ মাটিতেই ফিরিয়ে নেব এবং এ মাটি হতেই তাকে পুনরুত্থান করব। এ সম্পর্কে আল্লাহ্ তা'আলা বলেন:
مِنْهَا خَلَقْنَاكُمْ وَفِيهَا نُعِيدُكُمْ وَمِنْهَا نُخْرِجُكُمْ تَارَةً أُخْرَى. ৩১ "আমি তোমাদেরকে এ মাটি দিয়ে সৃষ্টি করেছি, দ্বিতীয়বার এ মাটির ভিতরেই তোমাকে ফিরে যেতে হবে এবং সর্বশেষ এ মাটির মধ্য থেকেই তোমাদেরকে পুনরুত্থান করিয়ে হাশরের ময়দানে হাযির করব।"৩৯
এরপর আল্লাহ্ তা'আলার আদেশ অনুযায়ী ফেরেস্তাগণ উক্ত আত্মাকে কবরে অবস্থিত তার দেহের সাথে মিশে দেয়। তারপর মুনকার-নকীর ফেশোদ্বয় তথায় আগমন করে মৃত ব্যক্তির নিকট জিজ্ঞেস করবে: হে আল্লাহর বান্দা! আপনি বলুন তো আপনার প্রতিপালক কে? আপনার নবী কে? এবং আপনার ধর্মের নাম কী? অতপর রাসূলুল্লাহ্ সা.-এর দিকে ইঙ্গিত করতঃ বলবে যে, হে আল্লাহর বান্দাহ এ মহাপুরুষ সম্পর্কে আপনার ধারণা কী? তখন মুমিন বান্দা সকল প্রশ্নের সঠিকভাবে উত্তর দিবে।
তখন আল্লাহ্ তা'আলা অতি নিকট হতে উচ্চঃস্বরে ইরশাদ করবেন: হে ফেরেস্তাদ্বয়! আমার মু'মিন বান্দা সঠিক ও সত্য কথা বলেছে। সুতরাং তাকে বেহেস্তী পোশাক পরিয়ে দাও এবং বেহেস্তী বিছানা বিছিয়ে দাও, যাতে তার কবরের মধ্যে বেহেস্তী সুগন্ধি আসতে পারে। আর তার চোখের দৃষ্টি সীমা পর্যন্ত তার কবরকে প্রশস্ত করে দাও। ৪০
আতা খোরাসানী রহ. বলেন যে বান্দা যমীনের কোন জায়গায় সিজদা করে, সে জায়গা কিয়ামতের দিন তার পক্ষে সাক্ষ্য দিবে। ইব্‌ন আব্বাস রা. বলেন: কেউ তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন:
فَمَا بَكَتْ عَلَيْهِمُ السَّمَاءُ وَالْأَرْضُ 'তাদের জন্য আসমান ও যমীন কাঁদেনি, এ আয়াতের অর্থ কী? তিনি জবাব দিলেন: হ্যাঁ, আসমান যমীন কাঁদে, যত মাখলুক আছে সবার জন্যই। আসমানের দু'টি দরজা আছে। এক দরজা দিয়ে মানুষের রিযিক দেয়া হয়। আর অপর দরজা দিয়ে তার সৎকর্ম উপরে চলে যায়। অতএব, মু'মিন যখন ইন্তিকাল করে, তখন তার জন্য নির্ধারিত আসমানের উভয় দরজা বন্ধ হয়ে যায় এবং তার জন্য ক্রন্দন করতে থাকে। এমনকি যে যমীনে সে নামায পড়ত সে যমীন তার নামাযের স্থান না দেখে এবং আল্লাহর যিকির শুনতে না পেয়ে তার জন্য কাঁদতে থাকে। যেহেতু ফিরআউনের জাতির এমন কোন ভাল কাজ ছিল না, যা আসমানে যাবে, তাই এ দরজা তাদের জন্য কাঁদেনি। ৪১

টিকাঃ
৩৯. সূরা ত্বা-হা, ৫৫।
৪০. বুখারী, আস-সহীহ, ৩খ., পৃ. ১৩৫০, হাদীস নং-৩৪৯০।
৪১. ইব্‌ন জারীর আত-তাবারী, জামিউল বয়ান ফী তা'বীলিল কুর'আন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00