📄 মৃত্যুর সময় শয়তানের মোকাবিলায় ফেরেশতাদের সাহায্য-সহযোগিতা
মানুষ অসহায় দুর্বল আবার দীর্ঘ দিনের অসুস্থতার কারণে শিরা-উপশিরা পর্যন্ত ক্ষত-বিক্ষত, আগে থেকেই বোধশূন্য ও বিবেচনাহীন এর উপর আত্মা কবজ ও মৃত্যুর তীব্র কষ্ট এ ভয়ানক অবস্থায় দুশমনের দল হামলা করে, আবার দুশমনের দলও দুশমনের বেশে নয়; বরং পিতা-মাতা, বন্ধু-বান্ধব ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের বেশধারণ করে পরামর্শ দেয়, এসকল অবস্থা চিন্তা করলে মনে হয়, কোন মানুষই এ সংকটময় মুহূর্তে ঈমানের উপর অটল থাকতে পারবে না। কিন্তু প্রবাদে আছে, 'দুশমন চেহ কুনাদ চু মেহেরবা বাশাদ দোস্ত'। যখন বন্ধু মেহরবান হয় দুশমন তখন কী করবে? মৃত্যুকালীন মুহূর্তটা যেমন অত্যন্ত ভয়ানক ও বিপদসংকুল দৃশ্যে পরিপূর্ণ, তেমনি পরম দয়াময় আল্লাহ্ তা'আলার ঐ সময় মানুষের সাহায্য-সহানুভূতির জন্য যথেষ্ট ব্যবস্থাও প্রস্তুত করে রেখেছেন। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ্ ঘোষণা করেন:
إِنَّ الَّذِينَ قَالُوا رَبُّنَا اللَّهُ ثُمَّ اسْتَقَامُوا تَتَنَزَّلُ عَلَيْهِمُ الْمَلَائِكَةُ أَلَّا تَخَافُوا وَلَا تَحْزَنُوا وَأَبْشِرُوا بِالْجَنَّةِ الَّتِي كُنْتُمْ تُوعَدُونَ . نَحْنُ أَوْلِيَاؤُكُمْ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَفِي الْآخِرَةِ وَلَكُمْ فِيهَا مَا تَشْتَهِي أَنْفُسُكُمْ وَلَكُمْ فِيهَا مَا تَدَّعُونَ . نُزُلًا مِنْ غَفُورٍ رَحِيمٍ.
"যারা বলে, 'আমাদের প্রতিপালক আল্লাহ্', অতপর অবিচলিত থাকে, তাদের নিকট অবতীর্ণ হয় ফেরেস্তা এবং বলে, 'তোমরা ভীত হইও না, চিন্তিত হইও না এবং তোমাদেরকে যে জান্নাতের প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল তার জন্য আনন্দিত হও। 'আমরাই তোমাদের বন্ধু দুনিয়ার জীবনে ও আখিরাতে। সেখানে তোমাদের জন্য রয়েছে যা কিছু তোমাদের মন চায় এবং সেখানে তোমাদের জন্য রয়েছে যা তোমরা ফরমায়েশ কর।' এটা ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু আল্লাহর পক্ষ হইতে আপ্যায়ন।"৩১
আলোচ্য আয়াতসমূহের তাফসীরে সাহাবায়েকিরাম ও তাবেঈনদের থেকে ইস্তিকামত-এর একাধিক অর্থ করা হয়েছে। তবে সেসব তাফসীরের সবগুলোর সারকথা একই। আর এ প্রসঙ্গে আবু বকর সিদ্দীক রা. বলেছেন: ইস্তিকামাতের ব্যাখ্যা হলো ঈমান ও তাওহীদের উপর অটল এবং অবিচল থাকা। আর শিরক ও কুফরীতে লিপ্ত না হওয়া। ৩২
উল্লিখিত আয়াতের মালাইকা শব্দের একাধিক তাফসীর রয়েছে। কারো কারো মতে, ফেরেস্তাগণ মৃত্যুর সময় মুমূর্ষু ব্যক্তির সাহায্যের জন্য নাযিল হবেন। কারো কারো মতে, কবরে অবতীর্ণ হবেন। আবার কারো মতে, হাশরের ময়দানে উপস্থিত হবেন। কিন্তু ইব্ন কাছীর রহ. সাহাবী ইব্ন আসলাম রা. থেকে বর্ণনা করে বলেন: ফেরেস্তাগণ তাদেরকে মৃত্যুর সময় কবরে এবং যে সময় হাশরের ময়দানে পুনরুত্থিত হবে, সুসংবাদ প্রদান করবে। উল্লেখ্য যে, এ মর্মে যত তাফসীর বর্ণিত উল্লিখিত তাফসীর সবগুলোর সমষ্টি এবং প্রকৃতপক্ষে এটাই বেশি নির্ভরশীল। ৩৩
অপর একটি প্রসিদ্ধ তাফসীরগ্রন্থে এসেছে, ফেরেস্তাগণ মৃত্যুমুখে পতিত ব্যক্তিকে সকল প্রকার সাহায্য করবেন। এ সময় ইহকাল ও পরকাল সম্পর্কীয় যত প্রকার চিন্তাভাবনার সম্মুখীন হোক না কেন, ফেরেস্তাগণ তার সাহায্যে সহযোগিতায় এগিয়ে আসবেন, তার সকল প্রকার চিন্তা দূর করে দিবেন এবং সকল প্রকার ভয়-ভীতি ও কষ্ট থেকে তাকে উদ্ধার করবেন। ৩৪
টিকাঃ
৩১. সূরা হা-মীম আস-সাজদা, ৩০-৩২।
৩২. ইব্ন কাছীর, তাফসীরুল কুর'আনিল আজীম, ৭খ., পৃ. ২৩৬।
৩৩. ইব্ন কাছীর, তাফসীরুল কুর'আনিল আজীম, ৭খ., পৃ. ২৩৭।
৩৪. শিহাবুদ্দীন আলুসী, তাফসীরু রূহুল মা'আনী, ১৪ খ., পৃ ১০৭।
📄 মৃত্যুকালে শয়তানের ধোঁকা থেকে আত্মরক্ষার উপায়
মৃত্যুকালে শয়তানের ধোঁকা থেকে নিরাপদ থাকা এবং দ্বীনের উপর ইস্তিকামাত থাকার জন্য রাসূলুল্লাহ্ সা.-এর হাদীস ও কুর'আনের আয়াত থেকে কিছু উপায় জানা যায়। যেমন:
প্রথম উপায়: ঈমান গ্রহণের উপর অটল থাকা।
দ্বিতীয় উপায়: ঈমানের উপর ইস্তিকামাত থাকা। এ দু'টো উপায় উপরে আলোচিত আয়াত দ্বারা প্রমাণিত।
তৃতীয় উপায়: গোসল ফরয অবস্থায় গোসল করতে দেরি হলে কমপক্ষে সাথে সাথে অযু করে নেয়া। তাও সম্ভব না হলে তায়াম্মুম করে নিবে।
চতুর্থ উপায়: স্বীয় আত্মা, পোশাক ও ঘরকে এরকম বস্তু থেকে পবিত্র রাখা, যার কারণে রহমতের ফেরেস্তা ঘরে ঢুকে না। যেমন: ফটো, কুকুর, গোসল ফরযকারী মানুষ, ঐ সকল অলংকার যাতে আওয়াজ হয় ইত্যাদি। ৩৫
পঞ্চম উপায়: পিতা-মাতার কথা মান্য করা। হাদীসে আছে, এক ব্যক্তি মহানবী সা.-এর খিদমতে হাযির হয় আরজ করল : হে আল্লাহর রাসূল সা.! আমাদের এলাকায় একটি ছেলে মৃত্যুমুখে পতিত, তাকে কালেমা পড়তে বলা হলে সে পড়তে পারে না। রাসূলুল্লাহ্ সা. বললেন : সে পূর্ব থেকেই কি তা বড়তে অভ্যস্ত নয়? লোকেরা আরজ করল : হে আল্লাহর নবী। সে আগে সব সময় কালেমা পড়তে পারতো কিন্তু এখন পারছে না। তখন ছেলেটির পাশে রাসূলুল্লাহ্ সা. নিজেই তাশরীফ আনলেন এবং তাকে তালকীন করলেন। কিন্তু সে বলল: কালেমা পড়ার মত কোন শক্তি আমার নেই। মহানবী সা. বললেন: কেন? সে বলল: আমি আমার মায়ের কথা শুনতাম না। এরপর রাসূলুল্লাহ্ সা. তার মায়ের নিকট থেকে তার ভুল-ত্রুটি ক্ষমা করালেন, তারপর তার মুখ খুলে গেল এবং কালেমা তাইয়্যেবা পড়ে দুনিয়া থেকে চির বিদায় নিয়ে চলে গেলেন।
ষষ্ঠ উপায়: মৃত্যুর সময় অন্যান্য লোকদের মৃত্যু শয্যায় শায়িত ব্যক্তিকে কালেমা তালকীন করানো।
টিকাঃ
৩৫. মাশারেকুল আনওয়ার, পৃ. ১০।
📄 মৃত্যুর পূর্বে মাটি ও কবরের ঘোষণা
আনাস রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: যমীন প্রতিদিন আদম সন্তানকে বলে: হে আদম সন্তান! তুমি আমার পৃষ্ঠের উপর স্বাধীনভাবে ঘুরা ফেরা করছ। তোমার মৃত্যুর পর যখন সবাই তোমাকে আমার উদরের সংকীর্ণ অন্ধকারময় স্থানে রেখে চলে যাবে, তখন তোমার কী দুদর্শা হবে? তখন তোমার আগের সে স্বাধীনতা আর থাকবে না। আমি তোমার মৃত্তিকা-শয়নগৃহ এত সংকীর্ণ ও অন্ধকারাচ্ছন্ন করে দিব যে, একদিক ফিরলে আর অন্য দিকে ফিরার ইচ্ছা থাকবে না। ভয়ে জড়সড় হয়ে কাঁদতে থাকবে।
যমীন আরো বলে: হে মানুষ! তুমি আমার পিঠের উপরে থেকে অন্যায়ভাবে ধন-সম্পত্তি, টাকা-পয়সা উপার্জন করে সে হারাম খাদ্য খেয়ে তোমার দেহ মোটা-তাজা করছ। জেনে রেখ, মৃত্যুর পর তোমার এ প্রিয় মোটা-তাজা সুখের শরীর কোন রকমেই মোটা-তাজা থাকবে না কীট-পতঙ্গের আহার্যে পরিণত হবে। সবই কীট-পতঙ্গে খেয়ে ধ্বংস করে ফেলবে।
মাটি আরো বলে: হে মানব! আমার পিঠের উপর বসবাস করে কত যে পাপের কাজ করেছ এবং অপরকেও পাপের কাজে প্রেরণা দান করেছ। মৃত্যুর পর কবরে তার প্রকৃত শান্তি পাবে। এমনি করে আমার পিঠে হাসি-তামাশা, আমোদ-প্রমোদ ও উল্লাস করে বেড়াচ্ছ, অযথা সময় নষ্ট করছ, এর প্রতিদান একদিন অন্ধকারময় কবরে অনুভব করতে হবে। আজ আমার পিঠের উপরে থেকে আনন্দে দিন কাটাচ্ছে। মৃত্যুর পর আমার মাঝে এসে এর প্রতিফল হাড়ে হাড়ে ভোগ করবে। এভাবে মাটি আরো বলে: হে আদম সন্তান! আমার এ উন্মুক্ত পিঠে আলোকময় খোলা ময়দানে বিচরণ করছ, কিন্তু মৃত্যুর পর এমন সংকীর্ণ অন্ধকারময় স্থানে বাস করতে হবে যেখানে মুক্ত বায়ু বইবে না। আলো বলতে কিছুই পাওয়া যাবে না, সেথায় তুমি কিছুই দেখতে পাবে না। তুমি নশ্বর পৃথিবীতে বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন নিয়ে মহানন্দে প্রশস্ত মাঠে ও খোলা বাতাসে ভ্রমণ করছ, কিন্তু মৃত্যুর পর সাথীহীন কবরে একা বসবাস করতে হবে। বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন বলতে সেখানে কেউ থাকবে না। ৩৭
টিকাঃ
৩৭. হাকিম, আল-মুসতাদরাক আলাস-সহীহাইন, ১খ., পৃ. ৯৩।
📄 মুমূর্ষ ব্যক্তির সাথে ফেরেশতাদের কথোপকথন
হাদীসের নির্ভরযোগ্য সূত্রের মাধ্যমে জানা যায় যে, যখন মানুষের অন্তিমকাল হাজির হয় এবং রূহ বের হওয়ার সময় ঘনিয়ে আসে, তখন চারজন ফেরেস্তা তার কাছে হাজির হয়। সর্বপ্রথম এক ফেরেস্তা উপস্থিত হয়ে বলেন : আস্সালামু আলাইকুম! হে অমুক! আমি তোমার আহার সংগ্রহের কাজে নিযুক্ত ছিলাম। কিন্তু এখন পৃথিবীর পূর্ব থেকে পশ্চিম প্রান্ত পর্যন্ত অন্বেষণ করেও তোমার জন্য এক দানা খাদ্য সংগ্রহ করতে পারলাম না। সুতরাং বুঝলাম, তোমার মৃত্যু ঘনিয়ে এসেছে, হয়তো এখনই তোমার মৃত্যু হতে পারে। অতপর দ্বিতীয় ফেরেস্তা এসে সালাম করে বলবেন: হে আল্লাহর বান্দাহ! আমি তোমার পানীয় সংগ্রহের জন্য নিয়োজিত ছিলাম কিন্তু এখন তোমার জন্য পৃথিবীর সর্বত্র ভ্রমণ করেও এক ফোঁটা পানি সংগ্রহ করতে পারলাম না। সুতরাং আমি বিদায় হলাম। এরপর তৃতীয় ফেরেস্তা এসে সালাম করে বলবেন : হে আল্লাহর বান্দা! আমি তোমার পদদ্বয়ের তত্ত্বাবধানে নিযুক্ত ছিলাম কিন্তু পৃথিবীর সর্বত্র খোঁজ করেও তোমার একটি মাত্র পদক্ষেপের স্থান পেলাম না। তাই আমি বিদায় নিচ্ছি। চতুর্থ ফেরেস্তা এসে সালাম করে বলবেন : হে আল্লাহর বান্দা! আমি তোমার শ্বাস- প্রশ্বাস চালু রাখার কাজে নিয়োজিত ছিলাম কিন্তু আজ পৃথিবীর এমন কোন স্থান খুঁজে পেলাম না যেখানে গিয়ে তুমি মাত্র এক পলকের জন্য শ্বাস-প্রশ্বাস গ্রহণ করতে পার। সুতরাং আমি চলে যাচ্ছি। এরপর কিরামান-কাতিবীন ফেরেস্তা এসে সালাম করে বলবেন : হে আল্লাহর বান্দা! আমরা তোমার পাপ-পূণ্য লেখার কাজে নিয়োজিত ছিলাম কিন্তু এখন দুনিয়ার সব স্থান খোঁজ করেও আর কোন পাপ-পূণ্য খুঁজে পেলাম না। সুতরাং আমরা চলে যাচ্ছি। এ বলে তাঁরা এক টুকরা কালো লিপি বের করে দিয়ে বলবেন : হে আল্লাহর বান্দাহ! এর দিকে লক্ষ্য কর। সে দিকে লক্ষ্য করার সাথে সাথে তার সর্বাঙ্গে ঘর্মস্রোত প্রবাহিত হবে এবং কেউ যেন ঐ লিপি পড়তে না পারে সে জন্য সে ডানেবামে বার বার দেখতে থাকবে। এরপর তারা চলে যাবেন। তখনই মালাকুল মউত আজরাঈল আ. তার ডান পাশে রহমতের ফেরেস্তা এবং বাম পাশে আযাবের ফেরেস্তা নিয়ে হাজির হবেন। তাদের মধ্যে কেউ বা আত্মাকে খুব জোরে টানাটানি করবেন, আবার কেউ অতি শান্তির সাথে আত্মা বের করে নিবেন। কন্ঠ পর্যন্ত আত্মা পৌঁছলে স্বয়ং আজরাঈল আ. তা কবজ করেন।
টিকাঃ
৩৮. ইত্তিহাফুল খাইরাতুল মাহরা, ২খ., পৃ. ৪৪২, হাদীস নং-১৮৫২।