📄 মৃত্যুর যন্ত্রণা
এ প্রসঙ্গে আল্লামা ইমাম সুয়ূতী রহ. বলেন: যখন আজরাঈল আ. আসবে তখন ৫০০ ফেরেস্তা তাকে চাপ দিয়ে ধরবে। মুমিন হলে ৫০০ রহমতের ফেরেস্তা আসবে। আর মৃত্যুর যন্ত্রণা শুরু হবে পায়ের বৃদ্ধা আঙ্গুল থেকে। এমনকি তা কণ্ঠনালী পর্যন্ত চলে আসবে। ১৯
হাদীসের এক বর্ণনায় এসেছে, মূসা আ.-এর ইন্তিকালের পর এক লোক তাকে স্বপ্নে দেখে বলল: হে আল্লাহর নবী! আপনি কী মৃত্যুর যন্ত্রণায় কষ্ট পেয়েছেন? উত্তরে মূসা আ. বললেন: আমার মৃত্যুর সময় মনে হলো কতকগুলো বিষাক্ত কাটা আমার কলিজার মধ্যে ঢুকায়ে সমস্ত রগের মধ্যে পেঁচিয়ে সমস্ত লোক একত্রিত হয়ে টান দিলে যেমন কষ্ট হয় তার চেয়ে মৃত্যুর যন্ত্রণা আমার কাছে আরো অধিক বেশি কষ্টের মনে হয়েছে।২০
আব্দুল্লাহ্ ইবন মাসউদ রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন; রাসূলুল্লাহ্ সা. বলেছেন: তোমরা বনী ইসরাঈল থেকে ঘটনাবলী বর্ণনা কর। এতে কোন ক্ষতি নেই। কেননা, তাদের মাঝে বহু বিস্ময়কর ঘটনা আছে। অতপর তিনি একটি ঘটনা বলতে শুরু করলেন: নবী ইসরাঈলের কিছু লোক একবার হাঁটতে হাঁটতে এক কবরস্থানে এসে পৌছল। তারা তারা তখন-বলল এসো আমরা নামায পড়ে আমাদের রবের নিকট দু'আ করি। যেন তিনি আমাদের সামনে কোন মৃত ব্যক্তিকে জীবিত করে দেন। আর সে আমাদের নিকট মৃত্যু সম্পর্কে কিছু বলে। তারপর তারা নামায পড়ল এবং দু'আ করল। ইতোমধ্যে একটি কবর থেকে এক ব্যক্তি মাথা তুলে বলল: হে লোকেরা! তোমরা কী চাও? নব্বই বছর আগে আমি মৃত্যুবরণ করেছি। এখনো মৃত্যু যন্ত্রণা আমার থেকে দূর হয়ে যায়নি। এখনো আমি তা অনুভব করি। সুতরাং তোমরা আল্লাহর নিকট দু'আ কর, যেন আমি (দুনিয়াতে) যে অবস্থায় ছিলাম, সে অবস্থায় তিনি আমাকে ফিরিয়ে নেন। আর সেই ব্যক্তির কপালে সিজদার দাগ ছিল। ২১
অপর এক বর্ণনায় এসেছে, ঈসা আ. একবার এক কবরের নিকট যেয়ে বললেন: تُم بِإِذْنِ اللَّهِ مَنْ أَنْتَ؟ وَمَا إِسْمُكَ؟ "আল্লাহর নির্দেশে জীবিত হও। (যখন লোকটি আল্লাহর নির্দেশে জীবিত হলো, তখন তিনি তাকে জিজ্ঞেস করলেন) তুমি কে? তোমার নাম কী? তখন লোকটি বলল: আমার নাম সাম ইন্ন নূহ। তখন ঈসা আ. তাঁকে কয়েকটি প্রশ্ন করেছিলেন। তন্মধ্যে একটি হলো, তিনি তাঁকে বললেন: আপনি কি আবারও কবরে থাকতে চান, না দুনিয়াতে থাকতে চান? তিনি বললেন: হে আল্লাহর নবী ঈসা আ.! আমি যদি এ দুনিয়ায় আবার থেকে যাই তাহলে কী আগের মৃত্যুর সময় আজরাঈল যেমন আমার রূহ কবজ করেছে তেমন আবদারও রুহ কবজ করবে? তখন ঈসা আ. বললেন: আপনি আল্লাহর পয়গম্বর। আপনি কেন আজরাইলকে এত ভয় করেন? জবাবে সাম ইব্ন নূহ আ. বললেন : আপনার সাথে তো আর আজরাইলের দেখা হয়নি এ জন্য এ মন্তব্য করছেন। হে আল্লাহর নবী ঈসা আ.! আজ থেকে ৮০০০ বছর পূর্বে আজরাইল আমার রুহ কবজ করেছিল কিন্তু আমি আজও আমার মৃত্যুর যন্ত্রনাকে ভুলতে পারিনি। ২২
আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন আল্লাহর নিকট পৃথিবীর অন্যান্য সকল নবীদের থেকে অধিক প্রিয়। হাদীসের বিশুদ্ধ বর্ণনা মতে, আমাদের প্রিয়নবীর রুহ যেদিন কবজ করা হয় সেদিন জিবরাঈল আ.-এর সাথে আরেকজন ফেরেশতা রাসূলুল্লাহ সা.-এর নিকট আগমন করেন যার নাম হলো মালাকুল মউত আজরাইল আ.! জিবরাঈল আ. রাসূলুল্লাহ সা.-এর হুজরা মুবারকের দরজায় দাঁড়িয়ে রাসূলুল্লাহ সা.-এর নিকট অনুমতি নেয়ার পর তাঁকে বলেন : আল্লাহর নবী আজ আমি আপনার নিকট একজন নতুন ফেরেশতা সাথে নিয়ে এসেছি যে ইতিপূর্বে আপনার কাছে আর কোন দিন আসেনি। তার নাম হলো মালাকুল মউত আজরাইল আ.! আজরাইল আ.-কে অনুমতি দেয়ার পর রাসূলুল্লাহ সা.-কে তিনি বললেন : হে আল্লাহর রাসূল! আমি পৃথিবীতে ইতিপূর্বে সকল প্রাণীর রুহ কবজ করেছি কিন্তু কারো নিকট কোন প্রকার অনুমতি প্রার্থনা করিনি। শুধু আমি আপনার নিকট আপনার রুহ কবজ করার জন্য অনুমতি প্রার্থনা করছি।
রাসূলুল্লাহ সা. বললেন : যদি না দেই; তখন আজরাইল আ. বললেন : তাহলে আমাকে ফিরে যেতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। তখন জিবরাঈল আ. বললেন : হে আল্লাহর রাসূল সা. অথচ আল্লাহ্ আপনার দীদারের অপেক্ষা করছেন। এরপর রাসূলুল্লাহ সা. তাঁকে রুহ কবজের অনুমতি দিলেন। ফাতেমা রা. তখন রাসূলুল্লাহ সা.-এর কাছে অবস্থান করছিলেন। তিনি বলেন : আমি দেখলাম, মৃত্যুর যন্ত্রণার কারণে রাসূলুল্লাহ সা.-এর হাত মুবারক একবার গুটিয়ে আসছে আরেকবার মেলে যাচ্ছে। এসময় তিনি একটি চাদর দ্বারা আবৃত ছিলেন। এরপর আমি চাদরটি উঠিয়ে দেখি রাসূলুল্লাহ সা.-এর সমস্ত শরীরের প্রত্যেকটি লোমকূপের গোড়া থেকে ঘাম নির্গত হচ্ছে। আজরাইল আ. যখন রাসূলুল্লাহ সা.-এর রুহ কবজ করার জন্য রাসূলুল্লাহ সা.-এর বুকের উপর হাত রাখলেন, তখন রাসূলুল্লাহ সা. বললেন : হে আজরাইল! তুমি তো আমার বুকে হাত রেখেছ বলে মনে হচ্ছে না আমার বুকে ওহুদ পাহাড় চেপে ধরেছ। ২৩
টিকাঃ
১৯. আস-সুয়ূতী, নূরুস সুদূর ফী আহওয়ালির কবর।
২০. জালালুদ্দীন আস-সুযুতী, জামিউল আহাদীস, ৭খ., পৃ. ৩৮১।
২১. আহমাদ, কিতাবুয যুহুদ, পৃ. ২৩।
২২. ইব্ন আসাকির, তারীখুদ্ দামেশ্ক, ২৪, পৃ. ৩২৮।
২৩. আবুল ফারাজ আব্দুর রহমান, জামিউল উলূম ওয়াল হিকুম, ১৪, পৃ. ৩৭০।
📄 বে-ঈমানদারের রূহ কবজ
বে-ঈমানদারদের মৃত্যুর সময় আজরাঈল তার আসল চেহারায় আবির্ভূত হন। সে সময় ঐ মুমূর্ষু ব্যক্তির চোখের দৃষ্টি যতদূর পর্যন্ত যায়, সে শুধু উক্তরূপ ফেরেস্তাকেই দেখতে পায়। উক্ত ফেরেস্তা খারাপ লোকের রূহ কবজ করার জন্য একটি চাটাই নিয়ে আসে। কিছুক্ষণ পরেই মালাকুল মউত আজরাঈল আ. তার মাথার দিকে বসে বলে : হে বদবখত আত্মা! আল্লাহ্ তা'আলার অসন্তুষ্টির দিকে তাড়াতাড়ি বের হয়ে আস। ঐ ব্যক্তির আত্মাটি এ ঘোষণা শোনার পর শরীরের বিভিন্ন স্থানে পলায়ন করার চেষ্টা-প্রচেষ্টা করতে থাকবে।
তখন মালাকুল মউত বেঈমানের শরীর হতে আত্মাকে এমনভাবে টেনে হিছড়ে বের করবে যেমনভাবে কোন গরম লোহার শিক ভিজা তুলার মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়ে পুনরায় টেনে বের করলে তার সাথে জড়িয়ে হাতে তুলা বের হয়ে থাকে। অতপর যমদূত ঐ বেঈমানের আত্মাটিকে হাতে তুলে নেয়। মুহূর্তের মধ্যে অন্যান্য তাঁর হাত হতে খারাপ আত্মাকে নিজেদের হাতে নিয়ে চাটাইয়ের মধ্যে রেখে মোড়িয়ে ফেলে।
কোন কোন বর্ণনায় এসেছে যে, তারা জাহান্নাম থেকে সবচেয়ে নিকৃষ্ট একটি নেকড়া নিয়ে আসবে।
উক্ত চাটাইয়ের মধ্য হতে গলিত লাশের দুর্গন্ধের মত ভীষণ দুর্গন্ধ বের হতে থাকে। অতপর ফেরেস্তাগণ চাটাইতে মোড়ান লাশ বহন করে আসমানের পানে চলতে থাকে। তারা যখন যে ফেরেস্তাদের নিকট দিয়ে যেতে থাকবে, তখন তারা জিজ্ঞেস করবে : এ বদবখত আত্মাটি কার? তখন আত্মাবহনকারী ফেরেস্তাগণ তার ও তার পিতার কদর্য নামদ্বয় উচ্চারণ করে বলবে : এটি অমুকের পুত্র অমুকের আত্মা।
এভাবে আত্মা বহনকারী ফেরেস্তাগণ যখন প্রথম আসমানের দরজার নিকট পৌঁছবে এবং দরজা উন্মুক্ত করার জন্য চেষ্টা করবে; কিন্তু আসমানের দরজা খোলা হবে না। অতপর আসমান হতে আল্লাহ্ তা'আলা বলবেন : হে ফেরেস্তারা! এর নাম সিজ্জীনে তালিকভুক্ত কর।
📄 মৃত্যুর সময় শয়তানের চক্রান্ত
হাদীসের বর্ণনা হতে জানা যায় যে, রাসূলুল্লাহ্ সা. বলেছেন: বান্দার অন্তিমকালে মৃত্যু যন্ত্রণা চলার সময় ইবলিস শয়তান উপস্থিত হয়ে উক্ত ব্যক্তির বাম পার্শ্বে উপবিষ্ট হয়ে বলে যে, হে আদম সন্তান! তুমি যদি এ কঠিন মৃত্যু কষ্ট হতে মুক্তি চাও তাহলে একাধিক সৃষ্টিকারীর অস্তিত্ব গ্রহণ কর অর্থাৎ শিরক কর।
শয়তানের ধোঁকায় পড়ে এহেন কঠিন সময় ঈমান বাঁচানো খুবই কষ্টসাধ্য ব্যাপার। এ প্রসঙ্গে ইমাম আল-গাজ্জালী রহ. বলেন: মৃত্যুর সংকটময় মুহূর্তে শয়তানের ধোঁকায় অনেক বান্দার ঈমান নষ্ট হওয়ার আশংকা রয়েছে। ইবলিস শয়তানের উক্তরূপ ধোঁকা ও চক্রান্ত হতে আল্লাহর বী-রাসূলগণ ব্যতীত কারো পক্ষে ঈমানের সাথে মৃত্যুবরণ করা খুবই কঠিন ব্যাপার। ২৪
একদা এক লোক ইমাম আজম আবূ হানীফা (রহ.)-এর দরবারে হাজির হয়ে জানতে চেয়েছিলেন: কোন আমলের দ্বারা ঈমান নষ্ট হওয়ার আশংকা অধিক। উত্তরে ইমাম আজম রহ. বললেন: তিনটি বিশেষ কারণে মৃত্যুকালে ঈমান নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা অধিক। যেমন:
১. ঈমানের শোকর আদায় না করলে। অর্থাৎ ঈমান গ্রহণের পরে তার জন্য আল্লাহ্ তা'আলার দরবারে কৃতজ্ঞতা স্বীকার না করাই হলো ঈমানের শোকর আদায় না করার শামিল।
২. জীবনের সর্বশেষ মুহূর্তকে ভয় না করলে। অর্থাৎ অস্থায়ী দুনিয়ার লোভের বশবর্তী হয়ে আল্লাহ্ তা'আলাকে অন্তকরণ হতে উঠিয়ে দেয়া। ঈমানের আসল উদ্দেশ্য হচ্ছে আল্লাহ্ তা'আলাকে ভয় করা।
৩. আল্লাহ্ তা'আলার সৃষ্টি জীবসমূহের প্রতি জুলুম বা অত্যাচার করা। অর্থাৎ আল্লাহ্ তা'আলার সৃষ্টিজীবসমূহের ভাল-মন্দের মালিক স্বয়ং তিনিই। বান্দা অন্য কোন বান্দার প্রতি জুলুম অত্যাচার করলে তারা জুলুমকারীকে অভিশাপ দিয়ে থাকে এবং এজন্যই মৃত্যুকালে জালিমের ঈমান শয়তানের চক্রান্তে নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
অপর একটি নির্ভরযোগ্য তথ্যের মাধ্যমে জানা যায় যে, মানুষের শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগের সময় তার হৃদপিণ্ডের ব্যাথায় এবং পানির পিপাসায় অত্যাধিক কাতর ও অস্থির হয়ে থাকে। এ দুরাবস্থার সুযোগ নিয়ে ইবলিস শয়তান ধোঁকা দেয়ার কাজে তৎপর হয়ে থাকে। এ সময় ইবলিস অতি শীতল এক গ্লাস পানি হাতে নিয়ে মৃত্যুপথ যাত্রীর সামনে এসে হাজির হয়ে গ্লাসটি ঘুরিয়ে ফিরিয়ে তাকে দেখিয়ে থাকে। তা দেখে মৃত্যুবরণকারী লোকটি ইblisকে বলে: তুমি আমাকে একটি পানি পান করাও। উত্তরে ইবলিস বলে: তুমি যদি স্বীকার কর যে, বিশ্বের কোন মালিক নেই, তাহলে আমি তোমাকে পানি পান করাতে পারি। ২৫
এ জন্য রাসূলুল্লাহ্ সা. বলেছেন: যে মুসলমান মৃত্যু শয্যায় শায়িত তার কাছে থেকে তাকে কালেমা তালকীন কর এবং তাকে বেহেশতের সুসংবাদ দাও। কেননা, ঐ কঠিন সময়ে বড় বড় জ্ঞানী পুরুষ-মহিলা হতবুদ্ধি কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে যায়। আর ঐ সময় শয়তান সুযোগ বুঝে মানুষের খুব কাছাকাছি অবস্থান করে। ২৬
প্রখ্যাত আলিম ও আল্লাহর ওলী হাসান বসরী (রহ.) বর্ণনা করেন: যখন আল্লাহ্ তা'আলা আদম ও হাওয়া আ. আ.-কে পৃথিবীতে প্রেরণ করেন, সাথে সাথে শয়তানও উৎসব পালন করার জন্য পৃথিবীতে অবতরণ করে এবং বলতে থাকে: যখন আমি মনুষের পিতা-মাতাকে ধোঁকা দিয়ে ফেলেছি, তাদের সন্তান তো তাদের থেকেও দুর্বল সুতরাং তাদেরকে প্রলুব্ধ করা কোন কষ্টের কাজ নয়। ইবলিসের এ ধারণা সম্পর্কে মহান আল্লাহ্ ঘোষণা করেছেন:
وَلَقَدْ صَدَّقَ عَلَيْهِمْ إِبْلِيسُ ظَنَّهُ فَاتَّبَعُوهُ إِلَّا فَرِيقًا مِنَ الْمُؤْمِنِينَ.
"আর তাদের উপর ইবলিস তার অনুমান সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করল। পরে তাদের মধ্যে মুমিনদের একটি দল ব্যতীত সকলেই তার পথ অনুসরণ করল।" ২৭
এ প্রেক্ষিতে ইবলিস বলল: আমিও যতক্ষণ পর্যন্ত মানুষের আত্মা বাকী থাকে, ততক্ষণ পর্যন্ত তাদের থেকে আলাদা হব না। তাদেরকে মিথ্যা অঙ্গীকার ও আশা আকাঙ্ক্ষা দিয়ে ধোঁকা দিতে থাকব।
এ প্রসঙ্গে হাদীসের এক বর্ণনায় এসেছে, আল্লাহ তা'আলা বলেন: আমার ইজ্জত ও জালালের কসম, আমিও মানুষের তাওবাহ কবুল করা বন্ধ করব না, যতক্ষণ সে মৃত্যুর নিকটবর্তী পৌঁছে। সে যখন আমাকে ডাকবে আমি তার ফরিয়াদ কবুল করব। যখন আমার কাছে চাইবে আমি তাকে তা দিব। যখন আমার নিকট গোনাহ মাফের প্রার্থনা করবে আমি তাকে ক্ষমা করব। ২৮
এ প্রসঙ্গে ইমাম আল-গাজ্জালী রহ. বলেন: মানুষের মুমূর্ষু অবস্থায় যে সময় আত্মা কবজের কষ্টে বড় বড় জ্ঞানী ব্যক্তির জ্ঞানও অচল হয়ে যায়, তখন মানুষের সবচেয়ে বড় দুশমন শয়তান শিষ্যদেরকে নিয়ে মুমূর্ষু ব্যক্তির কাছে পৌঁছে। এ সকল শয়তান মুমূর্ষু ব্যক্তির বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন, শুভাকাঙ্ক্ষী এবং সৎ, নিষ্ঠাবান লোকদের আকৃতিতে এসে তাকে বলতে থাকে, আমরা তোমার আগে মৃত্যুবরণ করেছি, মৃত্যুর উত্থান-পতন সম্পর্কে তোমার চেয়ে আমরা বেশি অবগত। এখন তোমার মৃত্যুর পালা এসেছে, আমরা তোমার শুভাকাঙ্ক্ষী সুহৃদ হিসেবে পরামর্শ দিচ্ছি: তুমি ইয়াহুদী ধর্ম গ্রহণ কর, সেটিই উৎকৃষ্ট ধর্ম। যদি মুমূর্ষু ব্যক্তি তাদের কথা না মানে, তখন অপর এক শয়তানের দল অন্যান্য বন্ধু-বান্ধব ও শুভাকাঙ্ক্ষীর আকৃতি ধারণ করে হাজির হয়ে বলে: তুমি খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহণ কর। কেননা তা ঐ ধর্ম যা মূসা আ.-এর ধর্ম রহিত করে দিয়েছে। শয়তান এভাবে প্রত্যেক ধর্মের বাতিল আকীদা ও ভ্রান্ত মতবাদ মুমূর্ষু ব্যক্তির অন্তরে বদ্ধমূল করতে থাকে। ফলে যার ভাগ্যে সঠিক ধর্ম ইসলাম থেকে ফিরে যাওয়া লেখা থাকে। সে ঐ সময় কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে ভ্রান্ত মতবাদ গ্রহণ করে। তাই এ থেকে বিরত থাকার জন্য আল্লাহ্ তা'আলা মহাগ্রন্থ আল-কুর'আনে মানুষের জন্য দু'আ শিক্ষা দিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন:
رَبَّنَا لَا تُزِغْ قُلُوبَنَا بَعْدَ إِذْ هَدَيْتَنَا وَهَبْ لَنَا مِنْ لَدُنْكَ رَحْمَةً إِنَّكَ أَنْتَ الْوَهَّابُ.
“হে আমাদের প্রভু! সরল পথ প্রদর্শনের পর তুমি আমাদের অন্তরকে সত্য লঙ্ঘনে উৎসাহিত করো না এবং তোমার নিকট থেকে আমাদেরকে অনুগ্রহ দান কর। তুমিই সব কিছু দানকারী।”২৯ অন্য এক বর্ণনায় এসেছে, এ সময় জিব্রাঈল আ. এসে বলেন: হে অমুক! তুমি কি আমাকে চিনতে পারনি, আমি জিব্রাঈল। আর এরা হলো তোমার দুশমন শয়তান, তুমি তাদের কথা শোনবে না। স্বীয় দ্বীনে হানিফ ও শরীয়াতে মুহাম্মাদীর উপর অটল থাক। ঐ সময়টা মুমূর্ষু ব্যক্তির জন্য এমন মধুর হয় যে, কোন বস্তুই তার চেয়ে অধিক প্রফুল্লতা দানকারী ও আরামদায়ক হয় না। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ্ তা'আলা ঘোষণা করেন:
الَّذِينَ آمَنُوا وَكَانُوا يَتَّقُونَ . لَهُمُ الْبُشْرَى فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَفِي الْآخِرَةِ.
"যারা ঈমান এনেছে এবং তাকওয়া অবলম্বন করেছে, তাদের জন্য পার্থিব জীবনে ও পরকালীন জীবনে রয়েছে সুসংবাদ।"৩০
টিকাঃ
২৪. আলী ইব্ন আবী বকর, গায়াতুল মাকাসিদ, ১খ., পৃ. ১৬৪৭।
২৫. আলী ইব্ন আবী বকর, গায়াতুল মাকাসিদ, ১খ., পৃ. ১২৬২।
২৬. কানযুল উম্মাল, খ.৮।
২৭. সূরা সাবা, ২০।
২৮. ইবন আবী হাতিম।
২৯. সূরা আলে 'ইমরান, ৮।
৩০. সূরা ইউনুস, ৬৩।
📄 মৃত্যুর সময় শয়তানের মোকাবিলায় ফেরেশতাদের সাহায্য-সহযোগিতা
মানুষ অসহায় দুর্বল আবার দীর্ঘ দিনের অসুস্থতার কারণে শিরা-উপশিরা পর্যন্ত ক্ষত-বিক্ষত, আগে থেকেই বোধশূন্য ও বিবেচনাহীন এর উপর আত্মা কবজ ও মৃত্যুর তীব্র কষ্ট এ ভয়ানক অবস্থায় দুশমনের দল হামলা করে, আবার দুশমনের দলও দুশমনের বেশে নয়; বরং পিতা-মাতা, বন্ধু-বান্ধব ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের বেশধারণ করে পরামর্শ দেয়, এসকল অবস্থা চিন্তা করলে মনে হয়, কোন মানুষই এ সংকটময় মুহূর্তে ঈমানের উপর অটল থাকতে পারবে না। কিন্তু প্রবাদে আছে, 'দুশমন চেহ কুনাদ চু মেহেরবা বাশাদ দোস্ত'। যখন বন্ধু মেহরবান হয় দুশমন তখন কী করবে? মৃত্যুকালীন মুহূর্তটা যেমন অত্যন্ত ভয়ানক ও বিপদসংকুল দৃশ্যে পরিপূর্ণ, তেমনি পরম দয়াময় আল্লাহ্ তা'আলার ঐ সময় মানুষের সাহায্য-সহানুভূতির জন্য যথেষ্ট ব্যবস্থাও প্রস্তুত করে রেখেছেন। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ্ ঘোষণা করেন:
إِنَّ الَّذِينَ قَالُوا رَبُّنَا اللَّهُ ثُمَّ اسْتَقَامُوا تَتَنَزَّلُ عَلَيْهِمُ الْمَلَائِكَةُ أَلَّا تَخَافُوا وَلَا تَحْزَنُوا وَأَبْشِرُوا بِالْجَنَّةِ الَّتِي كُنْتُمْ تُوعَدُونَ . نَحْنُ أَوْلِيَاؤُكُمْ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَفِي الْآخِرَةِ وَلَكُمْ فِيهَا مَا تَشْتَهِي أَنْفُسُكُمْ وَلَكُمْ فِيهَا مَا تَدَّعُونَ . نُزُلًا مِنْ غَفُورٍ رَحِيمٍ.
"যারা বলে, 'আমাদের প্রতিপালক আল্লাহ্', অতপর অবিচলিত থাকে, তাদের নিকট অবতীর্ণ হয় ফেরেস্তা এবং বলে, 'তোমরা ভীত হইও না, চিন্তিত হইও না এবং তোমাদেরকে যে জান্নাতের প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল তার জন্য আনন্দিত হও। 'আমরাই তোমাদের বন্ধু দুনিয়ার জীবনে ও আখিরাতে। সেখানে তোমাদের জন্য রয়েছে যা কিছু তোমাদের মন চায় এবং সেখানে তোমাদের জন্য রয়েছে যা তোমরা ফরমায়েশ কর।' এটা ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু আল্লাহর পক্ষ হইতে আপ্যায়ন।"৩১
আলোচ্য আয়াতসমূহের তাফসীরে সাহাবায়েকিরাম ও তাবেঈনদের থেকে ইস্তিকামত-এর একাধিক অর্থ করা হয়েছে। তবে সেসব তাফসীরের সবগুলোর সারকথা একই। আর এ প্রসঙ্গে আবু বকর সিদ্দীক রা. বলেছেন: ইস্তিকামাতের ব্যাখ্যা হলো ঈমান ও তাওহীদের উপর অটল এবং অবিচল থাকা। আর শিরক ও কুফরীতে লিপ্ত না হওয়া। ৩২
উল্লিখিত আয়াতের মালাইকা শব্দের একাধিক তাফসীর রয়েছে। কারো কারো মতে, ফেরেস্তাগণ মৃত্যুর সময় মুমূর্ষু ব্যক্তির সাহায্যের জন্য নাযিল হবেন। কারো কারো মতে, কবরে অবতীর্ণ হবেন। আবার কারো মতে, হাশরের ময়দানে উপস্থিত হবেন। কিন্তু ইব্ন কাছীর রহ. সাহাবী ইব্ন আসলাম রা. থেকে বর্ণনা করে বলেন: ফেরেস্তাগণ তাদেরকে মৃত্যুর সময় কবরে এবং যে সময় হাশরের ময়দানে পুনরুত্থিত হবে, সুসংবাদ প্রদান করবে। উল্লেখ্য যে, এ মর্মে যত তাফসীর বর্ণিত উল্লিখিত তাফসীর সবগুলোর সমষ্টি এবং প্রকৃতপক্ষে এটাই বেশি নির্ভরশীল। ৩৩
অপর একটি প্রসিদ্ধ তাফসীরগ্রন্থে এসেছে, ফেরেস্তাগণ মৃত্যুমুখে পতিত ব্যক্তিকে সকল প্রকার সাহায্য করবেন। এ সময় ইহকাল ও পরকাল সম্পর্কীয় যত প্রকার চিন্তাভাবনার সম্মুখীন হোক না কেন, ফেরেস্তাগণ তার সাহায্যে সহযোগিতায় এগিয়ে আসবেন, তার সকল প্রকার চিন্তা দূর করে দিবেন এবং সকল প্রকার ভয়-ভীতি ও কষ্ট থেকে তাকে উদ্ধার করবেন। ৩৪
টিকাঃ
৩১. সূরা হা-মীম আস-সাজদা, ৩০-৩২।
৩২. ইব্ন কাছীর, তাফসীরুল কুর'আনিল আজীম, ৭খ., পৃ. ২৩৬।
৩৩. ইব্ন কাছীর, তাফসীরুল কুর'আনিল আজীম, ৭খ., পৃ. ২৩৭।
৩৪. শিহাবুদ্দীন আলুসী, তাফসীরু রূহুল মা'আনী, ১৪ খ., পৃ ১০৭।