📘 মৃত্যুর পরে অনন্ত জীবন > 📄 প্রত্যেক প্রাণির রূহ কবজ করার নির্ধারিত স্থান

📄 প্রত্যেক প্রাণির রূহ কবজ করার নির্ধারিত স্থান


যার যেখানে মৃত্যু হবে, সেস্থানে তার মৃত্যু নির্ধারিত এবং যেখানে তার কবর হওয়া নির্দিষ্ট আছে, সেস্থানেই তার কবর হবে। যদিও বা সে কোন দূরবর্তী স্থানে অবস্থান করুক না কেন, আত্মা কবজের পূর্বে সে সেখানে পৌঁছবেই। কেননা আল্লাহ্ তা'আলা মালাকুল আরহাম নামক এক প্রকার ফেরেস্তা সৃষ্টি করে রেখেছেন। শিশু মায়ের উদরে থাকাকালীন সময় ঐ ফেরেস্তা আল্লাহর দরবারে আরজ করেন: হে আল্লাহ্! এ শিশুর গঠন, হায়াত, মউত ও রিযিক কী হবে? তখন আল্লাহ্ তা'আলা তাকে লক্ষ্য করে বলেন: তুমি লওহে মাহফুজে তাকিয়ে দেখ আমি তার ৫০০০০ বছর আগে এগুলো তার জন্য লিপিবদ্ধ করে রেখেছি। তখন তার মৃত্যুর স্থানের কিছু মাটি এনে ঐ শিশুর শরীরের গঠনের সময় নাভিতে মিশিয়ে দেন। ১৫
ফলে জন্মের পর মানুষ যে জায়গায় ঘুরে বেড়াক না কেন, মৃত্যুর আগে যেখান থেকে রক্ত-মাংসের সাথে মিশ্রিত মাটি নেয়া হয়েছিল, সেখানে এসে সে উপস্থিত হয় এবং সেখানেই তার মৃত্যু সংঘটিত হয়। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ্র ঘোষণা হলো:
قُلْ لَّوْ كُنْتُمْ فِي بُيُوتِكُمْ لَبَرَزَ الَّذِينَ كُتِبَ عَلَيْهِمُ الْقَتْلُ إِلَىٰ مَضَاجِعِهِمْ.
“হে নবী! আপনি বলে দিন : তোমরা যদি তোমাদের ঘরেও থাকতে তবু যার যে জায়গায় মৃত্যু (নির্ধারিত হয়ে আছে) তাকে অবশ্যই সে জায়গাতেই পৌঁছতে হবে।”১৬ এ আয়াতের তাফসীরে বলা হয়েছে যে, একদিন আজরাঈল আ. সুলাইমান আ.-এর দরবারে আসেন এবং সেখানে উপস্থিত এক সুশ্রী তুবককে দেখে তিনি তার দিকে খুব কঠোর দৃষ্টিতে তাকান। এতে যুবকটি ভয় পেয়ে গেল। আজরাঈল আ. চলে যাওয়ার পর যুবকটি সুলাইমান আ.-কে বলল : হে আল্লাহর রাসূল! আমার অনুরোধ, আপনার নির্দেশে বায়ু যেন আমাকে এখনই চীন দেশে নিয়ে যায়। যুবকটিকে কিছুক্ষণের মধ্যেই বায়ু চীন দেশে নিয়ে গেল। পুনরায় আজরাঈল আ. সুলাইমান আ.-এর দরবারে আগমন করলে ঐ যুবকটির দিকে ঐভাবে তাকানোর কারণ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন: আমি এ যুবকের আত্মা চীন দেশেই কবজ করার জন্য আদিষ্ট হয়েছি। সে ভয়ে আপনাকে অনুরোধ করে তাকে চীন দেশে পৌঁছে দেয়ার জন্য। আর আমি সেখানেই তার রূহ কবজ করতে পারবো। ১৭

টিকাঃ
১৫. ছানাউল্লাহ পানিপথী, তাফসীরে মাযহারী।
১৬. সূরা আলে 'ইমরান, ১৫৪।
১৭. ইবন জারীর আত-তাবারী, আল-জামিউল ফী তা'বীলিল কুর'আন, ৭খ., পৃ. ৮৫৬।

📘 মৃত্যুর পরে অনন্ত জীবন > 📄 মৃত্যুর তথ্য গোপন করার রহস্য

📄 মৃত্যুর তথ্য গোপন করার রহস্য


মহান আল্লাহ্ মৃত্যুর কথা মানুষের নিকট থেকে গোপন করেছেন। এর পেছনে কয়েকটি কারণ বিদ্যমান। যেমন: এক. পৃথিবীর শৃঙ্খলা ঠিক রাখার জন্য। দুই. মানুষকে নামায-রোযা ও অন্যান্য ফরয কাজের প্রতি উৎসাহ দেয়ার জন্য। তিন. ২৪ ঘন্টা মানুষকে আল্লাহর ইবাদতের মধ্যে থাকার জন্য।১৮

টিকাঃ
১৮. ছানাউল্লাহ্ পানিপথী, তাফসীরে মাজহারী, ৫খ., পৃ. ৫২৩।

📘 মৃত্যুর পরে অনন্ত জীবন > 📄 মৃত্যুর যন্ত্রণা

📄 মৃত্যুর যন্ত্রণা


এ প্রসঙ্গে আল্লামা ইমাম সুয়ূতী রহ. বলেন: যখন আজরাঈল আ. আসবে তখন ৫০০ ফেরেস্তা তাকে চাপ দিয়ে ধরবে। মুমিন হলে ৫০০ রহমতের ফেরেস্তা আসবে। আর মৃত্যুর যন্ত্রণা শুরু হবে পায়ের বৃদ্ধা আঙ্গুল থেকে। এমনকি তা কণ্ঠনালী পর্যন্ত চলে আসবে। ১৯
হাদীসের এক বর্ণনায় এসেছে, মূসা আ.-এর ইন্তিকালের পর এক লোক তাকে স্বপ্নে দেখে বলল: হে আল্লাহর নবী! আপনি কী মৃত্যুর যন্ত্রণায় কষ্ট পেয়েছেন? উত্তরে মূসা আ. বললেন: আমার মৃত্যুর সময় মনে হলো কতকগুলো বিষাক্ত কাটা আমার কলিজার মধ্যে ঢুকায়ে সমস্ত রগের মধ্যে পেঁচিয়ে সমস্ত লোক একত্রিত হয়ে টান দিলে যেমন কষ্ট হয় তার চেয়ে মৃত্যুর যন্ত্রণা আমার কাছে আরো অধিক বেশি কষ্টের মনে হয়েছে।২০
আব্দুল্লাহ্ ইবন মাসউদ রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন; রাসূলুল্লাহ্ সা. বলেছেন: তোমরা বনী ইসরাঈল থেকে ঘটনাবলী বর্ণনা কর। এতে কোন ক্ষতি নেই। কেননা, তাদের মাঝে বহু বিস্ময়কর ঘটনা আছে। অতপর তিনি একটি ঘটনা বলতে শুরু করলেন: নবী ইসরাঈলের কিছু লোক একবার হাঁটতে হাঁটতে এক কবরস্থানে এসে পৌছল। তারা তারা তখন-বলল এসো আমরা নামায পড়ে আমাদের রবের নিকট দু'আ করি। যেন তিনি আমাদের সামনে কোন মৃত ব্যক্তিকে জীবিত করে দেন। আর সে আমাদের নিকট মৃত্যু সম্পর্কে কিছু বলে। তারপর তারা নামায পড়ল এবং দু'আ করল। ইতোমধ্যে একটি কবর থেকে এক ব্যক্তি মাথা তুলে বলল: হে লোকেরা! তোমরা কী চাও? নব্বই বছর আগে আমি মৃত্যুবরণ করেছি। এখনো মৃত্যু যন্ত্রণা আমার থেকে দূর হয়ে যায়নি। এখনো আমি তা অনুভব করি। সুতরাং তোমরা আল্লাহর নিকট দু'আ কর, যেন আমি (দুনিয়াতে) যে অবস্থায় ছিলাম, সে অবস্থায় তিনি আমাকে ফিরিয়ে নেন। আর সেই ব্যক্তির কপালে সিজদার দাগ ছিল। ২১
অপর এক বর্ণনায় এসেছে, ঈসা আ. একবার এক কবরের নিকট যেয়ে বললেন: تُم بِإِذْنِ اللَّهِ مَنْ أَنْتَ؟ وَمَا إِسْمُكَ؟ "আল্লাহর নির্দেশে জীবিত হও। (যখন লোকটি আল্লাহর নির্দেশে জীবিত হলো, তখন তিনি তাকে জিজ্ঞেস করলেন) তুমি কে? তোমার নাম কী? তখন লোকটি বলল: আমার নাম সাম ইন্ন নূহ। তখন ঈসা আ. তাঁকে কয়েকটি প্রশ্ন করেছিলেন। তন্মধ্যে একটি হলো, তিনি তাঁকে বললেন: আপনি কি আবারও কবরে থাকতে চান, না দুনিয়াতে থাকতে চান? তিনি বললেন: হে আল্লাহর নবী ঈসা আ.! আমি যদি এ দুনিয়ায় আবার থেকে যাই তাহলে কী আগের মৃত্যুর সময় আজরাঈল যেমন আমার রূহ কবজ করেছে তেমন আবদারও রুহ কবজ করবে? তখন ঈসা আ. বললেন: আপনি আল্লাহর পয়গম্বর। আপনি কেন আজরাইলকে এত ভয় করেন? জবাবে সাম ইব্‌ন নূহ আ. বললেন : আপনার সাথে তো আর আজরাইলের দেখা হয়নি এ জন্য এ মন্তব্য করছেন। হে আল্লাহর নবী ঈসা আ.! আজ থেকে ৮০০০ বছর পূর্বে আজরাইল আমার রুহ কবজ করেছিল কিন্তু আমি আজও আমার মৃত্যুর যন্ত্রনাকে ভুলতে পারিনি। ২২
আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন আল্লাহর নিকট পৃথিবীর অন্যান্য সকল নবীদের থেকে অধিক প্রিয়। হাদীসের বিশুদ্ধ বর্ণনা মতে, আমাদের প্রিয়নবীর রুহ যেদিন কবজ করা হয় সেদিন জিবরাঈল আ.-এর সাথে আরেকজন ফেরেশতা রাসূলুল্লাহ সা.-এর নিকট আগমন করেন যার নাম হলো মালাকুল মউত আজরাইল আ.! জিবরাঈল আ. রাসূলুল্লাহ সা.-এর হুজরা মুবারকের দরজায় দাঁড়িয়ে রাসূলুল্লাহ সা.-এর নিকট অনুমতি নেয়ার পর তাঁকে বলেন : আল্লাহর নবী আজ আমি আপনার নিকট একজন নতুন ফেরেশতা সাথে নিয়ে এসেছি যে ইতিপূর্বে আপনার কাছে আর কোন দিন আসেনি। তার নাম হলো মালাকুল মউত আজরাইল আ.! আজরাইল আ.-কে অনুমতি দেয়ার পর রাসূলুল্লাহ সা.-কে তিনি বললেন : হে আল্লাহর রাসূল! আমি পৃথিবীতে ইতিপূর্বে সকল প্রাণীর রুহ কবজ করেছি কিন্তু কারো নিকট কোন প্রকার অনুমতি প্রার্থনা করিনি। শুধু আমি আপনার নিকট আপনার রুহ কবজ করার জন্য অনুমতি প্রার্থনা করছি।
রাসূলুল্লাহ সা. বললেন : যদি না দেই; তখন আজরাইল আ. বললেন : তাহলে আমাকে ফিরে যেতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। তখন জিবরাঈল আ. বললেন : হে আল্লাহর রাসূল সা. অথচ আল্লাহ্ আপনার দীদারের অপেক্ষা করছেন। এরপর রাসূলুল্লাহ সা. তাঁকে রুহ কবজের অনুমতি দিলেন। ফাতেমা রা. তখন রাসূলুল্লাহ সা.-এর কাছে অবস্থান করছিলেন। তিনি বলেন : আমি দেখলাম, মৃত্যুর যন্ত্রণার কারণে রাসূলুল্লাহ সা.-এর হাত মুবারক একবার গুটিয়ে আসছে আরেকবার মেলে যাচ্ছে। এসময় তিনি একটি চাদর দ্বারা আবৃত ছিলেন। এরপর আমি চাদরটি উঠিয়ে দেখি রাসূলুল্লাহ সা.-এর সমস্ত শরীরের প্রত্যেকটি লোমকূপের গোড়া থেকে ঘাম নির্গত হচ্ছে। আজরাইল আ. যখন রাসূলুল্লাহ সা.-এর রুহ কবজ করার জন্য রাসূলুল্লাহ সা.-এর বুকের উপর হাত রাখলেন, তখন রাসূলুল্লাহ সা. বললেন : হে আজরাইল! তুমি তো আমার বুকে হাত রেখেছ বলে মনে হচ্ছে না আমার বুকে ওহুদ পাহাড় চেপে ধরেছ। ২৩

টিকাঃ
১৯. আস-সুয়ূতী, নূরুস সুদূর ফী আহওয়ালির কবর।
২০. জালালুদ্দীন আস-সুযুতী, জামিউল আহাদীস, ৭খ., পৃ. ৩৮১।
২১. আহমাদ, কিতাবুয যুহুদ, পৃ. ২৩।
২২. ইব্‌ন আসাকির, তারীখুদ্‌ দামেশ্‌ক, ২৪, পৃ. ৩২৮।
২৩. আবুল ফারাজ আব্দুর রহমান, জামিউল উলূম ওয়াল হিকুম, ১৪, পৃ. ৩৭০।

📘 মৃত্যুর পরে অনন্ত জীবন > 📄 বে-ঈমানদারের রূহ কবজ

📄 বে-ঈমানদারের রূহ কবজ


বে-ঈমানদারদের মৃত্যুর সময় আজরাঈল তার আসল চেহারায় আবির্ভূত হন। সে সময় ঐ মুমূর্ষু ব্যক্তির চোখের দৃষ্টি যতদূর পর্যন্ত যায়, সে শুধু উক্তরূপ ফেরেস্তাকেই দেখতে পায়। উক্ত ফেরেস্তা খারাপ লোকের রূহ কবজ করার জন্য একটি চাটাই নিয়ে আসে। কিছুক্ষণ পরেই মালাকুল মউত আজরাঈল আ. তার মাথার দিকে বসে বলে : হে বদবখত আত্মা! আল্লাহ্ তা'আলার অসন্তুষ্টির দিকে তাড়াতাড়ি বের হয়ে আস। ঐ ব্যক্তির আত্মাটি এ ঘোষণা শোনার পর শরীরের বিভিন্ন স্থানে পলায়ন করার চেষ্টা-প্রচেষ্টা করতে থাকবে।
তখন মালাকুল মউত বেঈমানের শরীর হতে আত্মাকে এমনভাবে টেনে হিছড়ে বের করবে যেমনভাবে কোন গরম লোহার শিক ভিজা তুলার মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়ে পুনরায় টেনে বের করলে তার সাথে জড়িয়ে হাতে তুলা বের হয়ে থাকে। অতপর যমদূত ঐ বেঈমানের আত্মাটিকে হাতে তুলে নেয়। মুহূর্তের মধ্যে অন্যান্য তাঁর হাত হতে খারাপ আত্মাকে নিজেদের হাতে নিয়ে চাটাইয়ের মধ্যে রেখে মোড়িয়ে ফেলে।
কোন কোন বর্ণনায় এসেছে যে, তারা জাহান্নাম থেকে সবচেয়ে নিকৃষ্ট একটি নেকড়া নিয়ে আসবে।
উক্ত চাটাইয়ের মধ্য হতে গলিত লাশের দুর্গন্ধের মত ভীষণ দুর্গন্ধ বের হতে থাকে। অতপর ফেরেস্তাগণ চাটাইতে মোড়ান লাশ বহন করে আসমানের পানে চলতে থাকে। তারা যখন যে ফেরেস্তাদের নিকট দিয়ে যেতে থাকবে, তখন তারা জিজ্ঞেস করবে : এ বদবখত আত্মাটি কার? তখন আত্মাবহনকারী ফেরেস্তাগণ তার ও তার পিতার কদর্য নামদ্বয় উচ্চারণ করে বলবে : এটি অমুকের পুত্র অমুকের আত্মা।
এভাবে আত্মা বহনকারী ফেরেস্তাগণ যখন প্রথম আসমানের দরজার নিকট পৌঁছবে এবং দরজা উন্মুক্ত করার জন্য চেষ্টা করবে; কিন্তু আসমানের দরজা খোলা হবে না। অতপর আসমান হতে আল্লাহ্ তা'আলা বলবেন : হে ফেরেস্তারা! এর নাম সিজ্জীনে তালিকভুক্ত কর।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00