📘 মৃত্যুর পরে অনন্ত জীবন > 📄 মৃত্যু কী?

📄 মৃত্যু কী?


পৃথিবীতে যত প্রাণি এসেছে তা একদিন না একদিন মৃত্যুবরণ করতে হবে। কোন প্রাণিই এ মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ থেকে নিষ্কৃতি পাবে না। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ্ তা'আলা বলেন:

أَلَمْ تَرَ إِلَى الَّذِينَ خَرَجُوا مِنْ دِيَارِهِمْ وَهُمْ أُلُوفٌ حَذَرَ الْمَوْتِ فَقَالَ لَهُمُ اللَّهُ مُوتُوا ثُمَّ أَحْيَاهُمْ إِنَّ اللَّهَ لَذُو فَضْلٍ عَلَى النَّاسِ وَلَكِنَّ أَكْثَرَ النَّاسِ لَا يَشْكُرُونَ.

"তুমি কি তাদেরকে দেখ নাই যারা মৃত্যুভয়ে হাজারে হাজারে স্বীয় আবাসভূমি পরিত্যাগ করেছিল? অতপর আল্লাহ্ তাদেরকে বলেছিলেন: 'তোমাদের মৃত্যু হোক।' তারপর আল্লাহ্ তাদের জীবিত করেছিলেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ্ মানুষের প্রতি অনুগ্রহশীল; কিন্তু অধিকাংশ লোক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না।"১

অন্য এক আয়াতে আল্লাহ্ তা'আলা বলেন:

كُلُّ نَفْسٍ ذَائِقَةُ الْمَوْتِ وَإِنَّمَا تُوَفَّوْنَ أُجُورَكُمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ فَمَنْ زُحْزِحَ عَنِ النَّارِ وَأُدْخِلَ الْجَنَّةَ فَقَدْ فَازَ وَمَا الْحَيَاةُ الدُّنْيَا إِلَّا مَتَاعُ الْغُرُورِ.

"জীবমাত্রই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে। কিয়ামতের দিন তোমাদেরকে তোমাদের কর্মফল পূর্ণ মাত্রায় দেয়া হবে। যাকে অগ্নি হতে দূরে রাখা হবে এবং জান্নাতে দাখিল করা হবে সে-ই সফলকাম এবং পার্থিব জীবন ছলনাময় ভোগ ব্যতীত কিছুই নয়।"২

মহান আল্লাহ্ তা'আলা অন্যত্র বলেন

إِنَّمَا التَّوْبَةُ عَلَى اللَّهِ لِلَّذِينَ يَعْمَلُونَ السُّوءَ بِجَهَالَةٍ ثُمَّ يَتُوبُونَ مِنْ قَرِيبٍ فَأُولَئِكَ يَتُوبُ اللَّهُ عَلَيْهِمْ وَكَانَ اللَّهُ عَلِيمًا حَكِيمًا . وَلَيْسَتِ التَّوْبَةُ لِلَّذِينَ يَعْمَلُونَ السَّيِّئَاتِ حَتَّى إِذَا حَضَرَ أَحَدَهُمُ الْمَوْتُ قَالَ إِنِّي تُبْتُ الْآنَ وَلَا الَّذِينَ يَمُوتُونَ وَهُمْ كُفَّارٌ أُولَئِكَ أَعْتَدْنَا لَهُمْ عَذَابًا أَلِيمًا.

"আল্লাহ্ অবশ্যই সেসব লোকের তওবা কবুল করবেন যারা ভুলবশত মন্দ কাজ করে এবং সত্বর তওবা করে, এরাই তারা, যাদের তওবা আল্লাহ্ কবুল করেন। আল্লাহ্ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়। তওবা তাদের জন্য নয় যারা আজীবন মন্দ কাজ করে, অবশেষে তাদের কারও মৃত্যু উপস্থিত হলে সে বলে: 'আমি এখন তওবা করছি' এবং তাদের জন্যও নহে, যাদের মৃত্যু হয় কাফির অবস্থায়। এরাই তারা যাদের জন্য মর্মন্তুদ শাস্তির ব্যবস্থা করেছি।"৩

যদিও আল্লাহ্ তা'আলা মৃত্যু সম্পর্কে এমন কঠিন কথা আল-কুর'আনে ঘোষণা করেছেন তারপরও মানুষ এ বিষয়ে সম্পূর্ণ গাফিল। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্ তা'আলা বলেন:

وَلَقَدْ خَلَقْنَا الْإِنْسَانَ وَنَعْلَمُ مَا تُوَسْوِسُ بِهِ نَفْسُهُ وَنَحْنُ أَقْرَبُ إِلَيْهِ مِنْ حَبْلِ الْوَرِيدِ . إِذْ يَتَلَقَّى الْمُتَلَقِّيَانِ عَنِ الْيَمِينِ وَعَنِ الشِّمَالِ قَعِيدٌ . مَا يَلْفِظُ مِنْ قَوْلٍ إِلَّا لَدَيْهِ رَقِيبٌ عَتِيدٌ . وَجَاءَتْ سَكْرَةُ الْمَوْتِ بِالْحَقِّ ذَلِكَ مَا كُنْتَ مِنْهُ تَحِيدُ.

"আমিই মানুষকে সৃষ্টি করেছি এবং তার প্রবৃত্তি তাকে যে কুমন্ত্রণা দেয় তা আমি জানি। আমি তার গ্রীবাস্থিত ধমনী অপেক্ষাও নিকটতর। স্মরণ রাখিও, 'দুই গ্রহণকারী' ফেরেস্তা তার দক্ষিণে ও বামে বসে তার কর্ম লিপিবদ্ধ করে; মানুষ যে কথাই উচ্চারণ করে তার জন্য তৎপর প্রহরী তার নিকটেই রয়োছে। মৃত্যুযন্ত্রণা সত্যই আসবে; এটা হতেই তোমরা অব্যাহতি চেয়ে এসেছি।"৪

মৃত্যু একটি অনিবার্য ও শাশ্বত সত্য বিষয়। ইসলামে এ বিষয়ে অনেক সতর্ক করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্ তা'আলা বলেন:

وَمَنْ يَرْغَبُ عَنْ مِلَّةِ إِبْرَاهِيمَ إِلَّا مَنْ سَفِهَ نَفْسَهُ وَلَقَدِ اصْطَفَيْنَاهُ فِي الدُّنْيَا وَإِنَّهُ فِي الْآخِرَةِ لَمِنَ الصَّالِحِينَ إِذْ قَالَ لَهُ رَبُّهُ أَسْلِمْ قَالَ أَسْلَمْتُ لِرَبِّ الْعَالَمِينَ . وَوَصَّى بِهَا إِبْرَاهِيمُ بَنِيهِ وَيَعْقُوبُ يَا بَنِيَّ إِنَّ اللَّهَ اصْطَفَى لَكُمُ الدِّينَ فَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنْتُمْ مُسْلِمُونَ . أَمْ كُنْتُمْ شُهَدَاءَ إِذْ حَضَرَ يَعْقُوبَ الْمَوْتُ إِذْ قَالَ لِبَنِيهِ مَا تَعْبُدُونَ مِنْ بَعْدِي قَالُوا نَعْبُدُ إِلَهَكَ وَإِلَهَ آبَائِكَ إِبْرَاهِيمَ وَإِسْمَاعِيلَ وَإِسْحَاقَ إِلَهَا وَاحِدًا وَنَحْنُ لَهُ مُسْلِمُونَ . تِلْكَ أُمَّةٌ قَدْ خَلَتْ لَهَا مَا كَسَبَتْ وَلَكُمْ مَا كَسَبْتُمْ وَلَا تُسْأَلُونَ عَمَّا كَانُوا يَعْمَلُونَ.

"যে নিজেকে নির্বোধ করেছে সে ব্যতীত ইব্রাহীমের ধর্মাদর্শ হতে আর কে বিমূখ হবে। পৃথিবীতে তাকে আমি মনোনীত করেছি; আর আখিরাতেও সে অবশ্যই সৎকর্মপরায়ণগণের অন্যতম। তার প্রতিপালক যখন তাকে বলিয়াছিলেন, 'আত্মসমর্পণ কর', সে বলেছিল, 'জগতসমূহের প্রতিপালকের নিকট আত্মসমর্পণ করলাম এবং ইব্রাহীম ও ইয়া'কূব এই সম্বন্ধে তাদের পুত্রগণকে নির্দেশ দিয়ে বলেছিল: 'হে পুত্রগণ! আল্লাহই তোমাদের জন্য এ দ্বীনকে মনোনীত করেছেন। সুতরাং আত্মসমর্পণকারী না হয়ে তোমরা কখনও মৃত্যুবরণ করোও না। ইয়া'কূবের নিকট যখন মৃত্যু এসেছিল তোমরা কি তখন উপস্থিত ছিলে? সে যখন পুত্রগণকে জিজ্ঞেস করেছিল: 'আমার পরে তোমরা কিসের 'ইবাদত করবে?' তারা তখন বলেছিল: 'আমরা আপনার ইলাহ্-এর এবং আপনার পিতৃপুরুষ ইব্রাহীম, ইস্মাঈল ও ইসহাকের ইলাহ্-এরই 'ইবাদত করব। তিনি একমাত্র ইলাহ্ এবং আমরা তাঁর নিকট আত্মসমর্পণকারী।' সে ছিল এক উম্মত, তা অতীত হয়েছে। তারা যা অর্জন করেছে তা তাদের। তোমরা যা অর্জন কর তা তোমাদের। তারা যা করত সে সম্বন্ধে তোমাদের কোন প্রশ্ন করা হবে না।"৫

মৃত্যু নামক বস্তুকে আল্লাহ্ তা'আলা কখন কোথায় কিভাবে সৃষ্টি করেছেন, তার সঠিক ইতিহাস জানা যায় না। সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ তা'আলা মৃত্যুকে নিরাকারভাবে সৃষ্টি করেছেন। কোন কোন বিজ্ঞ আলিমের মতে, হযরত আদম আ.-এর সৃষ্টির
অনেক আগে মহান আল্লাহ মৃত্যুকে সৃষ্টি করেছেন। এ সম্পর্কে আল্লাহ্ তা'আলা বলেন:

الَّذِي خَلَقَ الْمَوْتَ وَالْحَيَاةَ لِيَبْلُوَكُمْ أَيُّكُمْ أَحْسَنُ عَمَلًا.

"আল্লাহ্ তা'আলা মৃত্যু ও হায়াতকে সৃষ্টি করেছেন।"৬ এ আয়াতে আল্লাহ্ তা'আলা মৃত্যুকে প্রথমে উল্লেখ করেছেন, তাই এটা দ্বারা বুঝা যায় যে, তিনি মৃত্যুকে আগে সৃষ্টি করেছেন। অতপর জীবনকে সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহ্ তা'আলা যা সৃষ্টি করেছেন, তার মৃত্যুও অনিবার্য অর্থাৎ যার শুরু আছে, তার শেষও রয়েছে। অতএব, প্রত্যেক প্রাণিকে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে। কেউ মৃত্যুর থেকে রক্ষা পাবে না। আল্লাহ্ তা'আলা কিভাবে মৃত্যুকে সৃষ্টি করেছেন, সে বিষয়ে রাসূল সা. বলেছেন: "মৃত্যু বস্তুকে সৃষ্টি করে আল্লাহ্ তা'আলা শত-সহস্র আবরণের মধ্যে একে অদৃশ্য করে রেখে দেন। আল্লাহ্ তা'আলা নভোমন্ডল ও ভূমন্ডলের সকল বস্তু হতে বিরাট আকারে মহাশক্তিশালী ও শ্রেষ্ঠ রূপে মৃত্যুকে সৃষ্টি করেছেন। এমনকি তা নভোমন্ডল ও ভূমন্ডল হতেও বেশি শক্তিশালী। মৃত্যুকে সৃষ্টি করে আল্লাহ্ তা'আলা মৃত্যুকে সত্তরটি মজবুত শিকল দ্বারা বেঁধে এক গোপন স্থানে রেখে দেন। উক্ত প্রত্যেকটি শিকলের দৈর্ঘ এক হাজার বছরের রাস্তার সমান দূরত্ব। আর এটিকে মহান আল্লাহ্ এমন এক জায়গাতে সংরক্ষিত অবস্থায় রেখেছেন যেখানকার সন্ধান কোন ফেরেস্তা পর্যন্তও পায়নি। তারা এটির অস্তিত্ব খুঁজে পেয়েছিলেন তখন যখন আল্লাহ্ তা'আলা হযরত আদম আ.-কে সৃষ্টি করেছেন।

আল্লাহ্ তা'আলা মানুষের মৃত্যু ঘটানোর জন্য একজন ফেরেশতা নির্ধারণ করে রেখেছেন। যার নাম আজরাঈল। তার উপাধি হল 'মালাকুল মাউত'। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ্ বলেন:

قُلْ يَتَوَفَّاكُم مَّلَكُ الْمَوْتِ الَّذِي وُكِّلَ بِكُمْ ثُمَّ إِلَى رَبِّكُمْ تُرْجَعُونَ . وَلَوْ تَرَى إِذِ الْمُجْرِمُونَ نَاكِسُوا رُؤُوسِهِمْ عِنْدَ رَبِّهِمْ رَبَّنَا أَبْصَرْنَا وَسَمِعْنَا فَارْجِعْنَا نَعْمَلْ صَالِحًا إِنَّا مُوقِنُونَ . وَلَوْ شِئْنَا لَآتَيْنَا كُلَّ نَفْسٍ هُدَاهَا وَلَكِنْ حَقَّ الْقَوْلُ مِنِّي لَأَمْلأَنَّ جَهَنَّمَ مِنَ الْجِنَّةِ

وَالنَّاسِ أَجْمَعِينَ . فَذُوقُوا بِمَا نَسِيتُمْ لِقَاءَ يَوْمِكُمْ هَذَا إِنَّا نَسِينَا كُمْ وَذُوقُوا عَذَابَ الْخُلْدِ بِمَا كُنتُمْ تَعْمَلُونَ .

"বল: 'তোমাদের জন্য নিযুক্ত মৃত্যুর ফেরেস্তা তোমাদের প্রাণ হরণ করবে। অবশেষে তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের নিকট প্রত্যানীত হবে।' হায়, তুমি যদি দেখতে! যখন অপরাধীরা তাদের প্রতিপালকের সম্মুখে অধোবদন হয়ে বলবে: 'হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা প্রত্যক্ষ করলাম ও শ্রবণ করলাম, এখন তুমি আমাদেরকে পুনরায় প্রেরণ কর, আমরা সৎকর্ম করব, আমরা তো দৃঢ় বিশ্বাসী।' আমি ইচ্ছা করলে প্রত্যেক ব্যক্তিকে সৎপথে পরিচালিত করতাম; কিন্তু আমার এই কথা অবশ্যই সত্য আমি নিশ্চয়ই জিন ও মানুষ উভয় দ্বারা জাহান্নাম পূর্ণ করব।"৭

মৃত্যু সৃষ্টির পর আল্লাহ্ তা'আলা মালাকুল মউত তথা আজরাঈল আ. কে বললেন -: হে মালাকুল মউত! আজ হতে তোমাকে আমি মৃত্যু নামক বস্তুর উপর সম্পূর্ণ কর্তৃত্ব ও শক্তি অর্পণ করলাম। মালাকুল মউত আল্লাহ্ তা'লার এ নির্দেশ শ্রবণ মাত্রই জিজ্ঞেস করলেন : হে দয়াময় আল্লাহ্! মৃত্যু আবার কী বস্তু? তখন আল্লাহ্ তা'আলা মৃত্যুর চতুর্দিকের শত আবরণ উন্মুক্ত করে বললেন : হে মালাকুল মউত। এই দেখ মৃত্যু নামক বস্তু। এর উপর সম্পূর্ণ কর্তৃত্ব আমি তোমাকে দিয়েছি। এরপর আল্লাহ্ তা'আলা সকল ফেরেস্তাকে এ মৃত্যু নামক ভয়ঙ্কর জিনিস দেখানোর জন্য মৃত্যুকে তার শত আবরণের উন্মুক্ত করতে বললেন এবং ফেরেশতাগণকে সারিবদ্ধভাবে দণ্ডায়মান হয়ে মৃত্যুর প্রতি দৃষ্টিপাত করতে নির্দেশ দিলেন। তারা আল্লাহ্ তা'আলার নির্দেশ পেয়ে সকলেই সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে গেলেন এবং মৃত্যুকে দেখার জন্য অপেক্ষা করতে থাকলেন।

এ সময় আল্লাহ্ তা'আলা মৃত্যুকে হুকুম করলেন : হে মৃত্যু! তুমি তোমার সকল পাখা মেলে এদের উপর উড়ে ভ্রমণ কর এবং তোমার সকল মুদিত চোখ খুলে তাদের প্রতি দৃষ্টিপাত কর। অতপর মৃত্যু আল্লাহর নির্দেশ পেয়ে তার সকল পাখা মেলে এবং চোখ খুলে ফেরেস্তাদের প্রতি দৃষ্টিপাত করতঃ তাদের মাথার উপর দিয়ে চক্রাকারে ঘুরতে আরম্ভ করল। ফেরেস্তাগণ মৃত্যুর ভয়ঙ্কর বিরাট ও বিশাল আকৃতি দর্শন করে সকলেই বেহুশ হয়ে অচেনভাবে যমীনে পড়ে গেল। এ অবস্থায় তারা এক হাজার বছর অতিবাহিত করল। এরপর আল্লাহ্ তা'আলার নির্দেশে তারা সজাগ হয়ে আল্লাহর দরবারে করজোড়ে মিনতি করল: হে মহান প্রভু! আপনি কি এটি অপেক্ষা আরো কোন বিশাল ভয়ঙ্কর বস্তু কিছু সৃষ্টি
করেছেন? আল্লাহ্ তা'আলা তাদের প্রশ্নের জবাবে বললেন: হে ফেরেস্তাগণ! তোমরা জেনে রাখ, আমি সকল কিছুর সৃষ্টিকর্তা এবং মহিয়ান, গরিয়ান ও সর্বশ্রেষ্ঠ। আমার সৃষ্ট সকল প্রাণিকূলকে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে। তার কবল থেকে কেউ রক্ষা পাবে না, এমনকি তোমরাও না।

অতপর আল্লাহ্ তা'আলা মালাকুল মউত ফেরেস্তা আজরাঈল আ.-কে উদ্দেশ্য করে বললেন: হে মালাকুল মউত! দুনিয়ার সকল প্রাণির রূহ কবজ করার দায়িত্ব আমি তোমাকে অর্পণ করলাম। এ কথা শ্রবণে মালাকুল মউত বললেন: হে আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন! মৃত্যু আমার অপেক্ষা অধিক শক্তিশালী আমি কীভাবে তাকে আমার অধীনস্থ করব? আল্লাহ্ তা'আলা বললেন: তুমি ঘাবড়িও না, আমি এ মুহূতে মৃত্যুকে তোমার অধীনস্থ করে দিলাম। এরপর ফেরেস্তা মালাকুল মউত আল্লাহ্র সামনে আরজ করে বললেন: হে শক্তিমান আল্লাহ! আমাকে একটু সময় দিন যাতে আমি ভূমন্ডল ও নভোমন্ডল ঘুরে ভ্রমণ করে সকল প্রাণি জগতটাকে আমার শক্তি ও দায়িত্ব কর্তব্যের কথা জানিয়ে আসি।

আল্লাহ্ তাঁকে এ অনুমতি প্রদানের পর মালাকুল মউত বিদ্যুৎ বেগে ভ্রমণ করে ভয়ঙ্কর শব্দে গর্জন করে বলতে শুরু করল, হে আল্লাহর সৃষ্টি প্রাণিকূল! তোমরা জেনে রাখ, আল্লাহর পক্ষ থেকে আমি যে কাজের দায়িত্ব ও কর্তব্য পেয়েছি, তা দ্বারা আমি সকল বন্ধুকে বন্ধুর মিলন হতে, স্বামীকে তার স্ত্রীর সম্মুখ হতে এবং স্ত্রীকে তার স্বামীর সম্মুখ হতে বিচ্ছিন্ন করে তার প্রাণবায়ু কেড়ে নিব। এভাবে মালাকুল মউত সমগ্র দুনিয়া ঘুরে ঘুরে এ সকল কথা ঘোষণা করে দিলেন।

মালাকুল মউত আরো বলবেন: হে হতভাগ্য মৃত্যু পথযাত্রী! তুমি কি আখিরাতের জন্য কোন সৎকাজ করেছ? যা আজকে তোমার উদ্ধারকারী, সাহায্যকারী হিসেবে তোমার সাথী হবে। কিন্তু আফসোস! তুমি জীবনভর আখিরাতের পাথেয় হিসেবে কিছুই সংগ্রহ করনি, তুমি যা অর্জন করেছ তা আজকে কোন কাজেই আসবে না। একথা শ্রবণে মমূর্ষ ব্যক্তি তার মুখমন্ডল অন্য পার্শ্বে ঘুরিয়ে নিবে; কিন্তু যমদূত মুহূতের মধ্যে সেদিকেও উপস্থিত হয়ে বলতে থাকবে: হে হতভাগ্য বান্দা! তুমি কি আমাকে চিনতে পেরেছ? আমি তো তোমার আত্মার হরণকারী, আমি তোমার সম্মুখে তোমার পিতা-মাতার রূহ কবজ করেছি, তখন তুমি তাদের সম্মুখেই দন্ডায়মান ছিলে। কিন্তু তুমি কি তখন অনুধাবন করতে পারনি যে, মৃত্যু কী বস্তু? কিভাবে রূহ কবজ করা হয়।"৮

টিকাঃ
১. সূরা আল-বাকারাহ, ২৪৩।
২. সূরা আলে 'ইমরান, ১৮৫।
৩. সূরা আন-নিসা, ১৭-১৮।
৪. সূরা ক্বা-ফ, ১৬-১৯।
৫. সূরা আল-বাকারাহ, ১৩০-০৩৪।
৬. সূরা আল-মুলক, ২।
৭. সূরা আস-সাজদা, ১১-১৪।
৮. আল-মুখতাসারুস সহীহ আনিল মাউতি ওয়াল কবরি ওয়াল হাশর, পৃ. ৪৫।

📘 মৃত্যুর পরে অনন্ত জীবন > 📄 রূহ কবজের পদ্ধতি

📄 রূহ কবজের পদ্ধতি


রূহ কবজ করা একটি ভয়নক কাজ। এ কাজে মালাকুল মউত নিয়োজিত। হাদীসের এক বর্ণনায় এসেছে, মুকাতিল রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: আল্লাহ্ তা'আলা আজরাঈল আ.-এর জন্য সপ্তম আসমানে, কোন কোন বর্ণনায় এসেছে চতুর্থ আসমানে সত্তর হাজার খুটির উপর নূরের একটি সিংহাসন তৈরি করেছেন। তাঁর শরীরে চারটি পাখা সারা শরীরে সকল প্রাণির সংখ্যানুপাতে চোখ ও জিহ্বা রয়েছে।
হাদীসের অপর এক বর্ণনায় এসেছে, রাসূল সা. বলেছেন: মালকুল মউতের ডানে, বামে, উপরে, নীচে এবং সামনে ও পেছনে ছয়টি মুখ রয়েছে। উপস্থিত সাহাবাগণ আরজ করলেন, হে আল্লাহর রাসূল সা.! ছয়টি মুখ কেন? রাসূলুল্লাহ সা. বললেন: ডান পাশের মুখ দিয়ে পাশ্চাত্যের আর বাম পাশের মুখ দিয়ে প্রাচ্যের, পেছনের মুখ দিয়ে পাপী দের আর উপরের মুখ দিয়ে আকাশবাসীর এবং নীচের মুখ দিয়ে দৈত্য-দানবের রূহ কবজ করেন।১০
রাসূলুল্লাহ্ সা. আরো বলেন: আজরাঈলের চারটি মুখ রয়েছে। মাথার উপরের মুখ দ্বারা নবী ও ফেরেস্তাদের আত্মা, সামনের মুখ দ্বারা মুমিন বান্দাদের আত্মা, সামনের মুখ দিয়ে মু'মিনের, পেছনের মুখ দ্বারা দোযখীদের এবং পদতলস্থ মুখ দৈত্য-দানব, জ্বিন ও শয়তানের আত্মা কবজ করে থাকেন। তার একটি পা দোযখের উপরস্থিত পুলসিরাতের উপর অপরটি জান্নাতে অবস্থিত সিংহাসনের উপর। ১১
হাদীসের অপর এক নির্ভরযোগ্য তথ্যের ভিত্তিতে জানা যায় যে, আজরাঈলের দেহ এত বড় যে, পৃথিবীর সকল নদী-নালা, সাগর-সমুদ্রের সব পানিও যদি তার মাথায় ঢেলে দেয়া হয়, তবুও এক ফোঁটা পানি মাটিতে গড়িয়ে পড়বে না। তার সামনে পৃথিবীর আত্মাসমূহ এতই ছোট, যেন বিভিন্ন খাদ্যে পরিপূর্ণ একটি থালা তাঁর সামনে রেখে দেয়া হয়েছে এমন। আর তিনি যেখান থেকে যা এবং যতটুকু ইচ্ছা খেতে পারেন।১২
প্রখ্যাত সাহাবী কা'ব রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: আল্লাহ্ তা'আলা স্বীয় আরশের নিচে একটি বৃক্ষ সৃষ্টি করে রেখেছে। উক্ত বৃক্ষে জীবিত মানুষের সংখ্যানুপাতে পাতা সৃষ্টি করে রেখেছেন। তার প্রত্যেকটি পাতায় মানুষের নামসমূহ আলাদাভাবে লিখে রেখেছেন। যে সময় যে মানুষের হায়াত শেষ অবস্থায় পৌঁছানোর চল্লিশ দিন বাকী থাকে, তখন সে বৃক্ষ থেকে উক্ত লোকের নাম ও ঠিকানা লিখিত পাতাটি মালাকুল মউতের সামনে পড়ে যায়। সাথে সাথে মালাকুল মউত অনুভব করেন যে, অমুক ব্যক্তির রূহ কবজ করার আর মাত্র চল্লিশ দিন বাকি রয়েছে। তখন হতে মালাকুল মউত এ ব্যক্তির রূহ কবজ করার প্রস্তুতি নিতে থাকেন। ১৩
কাজেই ঐ ব্যক্তির মৃত্যুর চল্লিশ দিন পূর্বেই তাঁর মৃত্যুর খবর আসমানে প্রচারিত হতে থাকে। যদি ঐ লোকটি পৃথিবীতে চিন্তাহীনভাবে আরাম আয়েসের মধ্যে জীবন অতিবাহিত করতে থাকে, তার জন্য আফসোস! মৃত্যু পথযাত্রী ব্যক্তি কিংবা পৃথিবীর অন্য কোন মানুষের পক্ষেও তা অনুধাবন করা সম্ভব নয় যে, সে আর কতদিন পৃথিবীতে বসবাস করার সুযোগ অর্জন করবে। এ ছাড়া ঐ লোকটি চল্লিশ দিন পর্যন্ত যে, কত অপরাধের কাজে লিপ্ত হবে, তার হিসাব কে রাখবে? ঐ ব্যক্তি নিজেও জানে না যে, তার মৃত্যু আসন্ন, সে কী করছে, কোথায় তার গন্তব্য স্থান, হয়তো বা ঐ সময়ের মধ্যে সে সমস্ত অপরাধের কাজ করে ফেলেছে। বিভিন্ন প্রসিদ্ধ ও নির্ভরযোগ্য তথ্যের ভিত্তিতে জানা যায় যে, মালাকুল মউতের অনেক সাহায্যকারী ফেরেস্তা রয়েছে, তারা মালাকুল মউতের পক্ষ হয়ে মানুষের রূহ কবজ করে থাকেন।
হাদীসের এক বর্ণনায় এসেছে, সকল প্রকার চতুষ্পদ জন্তু জানোয়ার আল্লাহ্ তা'আলার যিকিরে সর্বদা নিয়োজিত থাকে। যে সকল চতুষ্পদ জানোয়ার যখনই আল্লাহ্ তা'আলার যিকির হতে বিরত থাকবে, সাথে সাথে আল্লাহ্ তা'আলা ঐ সকল চতুষ্পদ জানোয়ারকে জান কবজের নির্দেশ দিয়ে থাকেন। ১৪

টিকাঃ
৯. শারহুস সুদূর আলা বিশরাহি হালিল মাউতা ওয়াল কুবুর, পৃ. ১৩।
১০. আহমাদ ইবন আবী বকর, ইত্তিহাফুল খাইরাতুল মাহরাহ, ২খ., পৃ. ২৯২।
১১. আবুল ফজল আহমাদ ইবন আলী, ইতরাফুল মুসনাদ, হাদীস নং-৯৬৮৫.
১২. আবু বকর আহমাদ ইবনুল হুসাইন, আস-সুনানুল কুবরা, ৫খ., পৃ. ৫২৪।
১৩. আল-হাইছামী, মুসনাদে হারিস, ১খ., পৃ. ৩১৫।
১৪. যাইনুদ্দীন আব্দুর রহীম, তাকরীবুল আসানীদ ওয়া তরতীবুল মাসানীদ, ১খ., পৃ. ৬৩।

📘 মৃত্যুর পরে অনন্ত জীবন > 📄 প্রত্যেক প্রাণির রূহ কবজ করার নির্ধারিত স্থান

📄 প্রত্যেক প্রাণির রূহ কবজ করার নির্ধারিত স্থান


যার যেখানে মৃত্যু হবে, সেস্থানে তার মৃত্যু নির্ধারিত এবং যেখানে তার কবর হওয়া নির্দিষ্ট আছে, সেস্থানেই তার কবর হবে। যদিও বা সে কোন দূরবর্তী স্থানে অবস্থান করুক না কেন, আত্মা কবজের পূর্বে সে সেখানে পৌঁছবেই। কেননা আল্লাহ্ তা'আলা মালাকুল আরহাম নামক এক প্রকার ফেরেস্তা সৃষ্টি করে রেখেছেন। শিশু মায়ের উদরে থাকাকালীন সময় ঐ ফেরেস্তা আল্লাহর দরবারে আরজ করেন: হে আল্লাহ্! এ শিশুর গঠন, হায়াত, মউত ও রিযিক কী হবে? তখন আল্লাহ্ তা'আলা তাকে লক্ষ্য করে বলেন: তুমি লওহে মাহফুজে তাকিয়ে দেখ আমি তার ৫০০০০ বছর আগে এগুলো তার জন্য লিপিবদ্ধ করে রেখেছি। তখন তার মৃত্যুর স্থানের কিছু মাটি এনে ঐ শিশুর শরীরের গঠনের সময় নাভিতে মিশিয়ে দেন। ১৫
ফলে জন্মের পর মানুষ যে জায়গায় ঘুরে বেড়াক না কেন, মৃত্যুর আগে যেখান থেকে রক্ত-মাংসের সাথে মিশ্রিত মাটি নেয়া হয়েছিল, সেখানে এসে সে উপস্থিত হয় এবং সেখানেই তার মৃত্যু সংঘটিত হয়। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ্র ঘোষণা হলো:
قُلْ لَّوْ كُنْتُمْ فِي بُيُوتِكُمْ لَبَرَزَ الَّذِينَ كُتِبَ عَلَيْهِمُ الْقَتْلُ إِلَىٰ مَضَاجِعِهِمْ.
“হে নবী! আপনি বলে দিন : তোমরা যদি তোমাদের ঘরেও থাকতে তবু যার যে জায়গায় মৃত্যু (নির্ধারিত হয়ে আছে) তাকে অবশ্যই সে জায়গাতেই পৌঁছতে হবে।”১৬ এ আয়াতের তাফসীরে বলা হয়েছে যে, একদিন আজরাঈল আ. সুলাইমান আ.-এর দরবারে আসেন এবং সেখানে উপস্থিত এক সুশ্রী তুবককে দেখে তিনি তার দিকে খুব কঠোর দৃষ্টিতে তাকান। এতে যুবকটি ভয় পেয়ে গেল। আজরাঈল আ. চলে যাওয়ার পর যুবকটি সুলাইমান আ.-কে বলল : হে আল্লাহর রাসূল! আমার অনুরোধ, আপনার নির্দেশে বায়ু যেন আমাকে এখনই চীন দেশে নিয়ে যায়। যুবকটিকে কিছুক্ষণের মধ্যেই বায়ু চীন দেশে নিয়ে গেল। পুনরায় আজরাঈল আ. সুলাইমান আ.-এর দরবারে আগমন করলে ঐ যুবকটির দিকে ঐভাবে তাকানোর কারণ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন: আমি এ যুবকের আত্মা চীন দেশেই কবজ করার জন্য আদিষ্ট হয়েছি। সে ভয়ে আপনাকে অনুরোধ করে তাকে চীন দেশে পৌঁছে দেয়ার জন্য। আর আমি সেখানেই তার রূহ কবজ করতে পারবো। ১৭

টিকাঃ
১৫. ছানাউল্লাহ পানিপথী, তাফসীরে মাযহারী।
১৬. সূরা আলে 'ইমরান, ১৫৪।
১৭. ইবন জারীর আত-তাবারী, আল-জামিউল ফী তা'বীলিল কুর'আন, ৭খ., পৃ. ৮৫৬।

📘 মৃত্যুর পরে অনন্ত জীবন > 📄 মৃত্যুর তথ্য গোপন করার রহস্য

📄 মৃত্যুর তথ্য গোপন করার রহস্য


মহান আল্লাহ্ মৃত্যুর কথা মানুষের নিকট থেকে গোপন করেছেন। এর পেছনে কয়েকটি কারণ বিদ্যমান। যেমন: এক. পৃথিবীর শৃঙ্খলা ঠিক রাখার জন্য। দুই. মানুষকে নামায-রোযা ও অন্যান্য ফরয কাজের প্রতি উৎসাহ দেয়ার জন্য। তিন. ২৪ ঘন্টা মানুষকে আল্লাহর ইবাদতের মধ্যে থাকার জন্য।১৮

টিকাঃ
১৮. ছানাউল্লাহ্ পানিপথী, তাফসীরে মাজহারী, ৫খ., পৃ. ৫২৩।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00