📄 দাজ্জালের আগমন
আবু দারদা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, নবিজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন—
مَنْ حَفِظَ عَشْرَ آيَاتٍ مِنْ أَوَّلِ سُورَةِ الْكَهْفِ عُصِمَ مِنَ الدَّجَّالِ.
যে ব্যক্তি সূরা কাহাফের প্রথম দশটি আয়াত মুখস্থ করবে, তাকে দাজ্জাল থেকে মুক্ত রাখা হবে。
কোনো কোনো বর্ণনায় সূরা কাহাফের শেষ দশ আয়াতের কথা আছে।
হযরত হুযাইফা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন—
الدَّجَّالُ أَعْوَرُ الْعَيْنِ الْيُسْرَى جُفَالُ الشَّعَرِ مَعَهُ جَنَّةٌ وَنَارٌ فَنَارُهُ جَنَّةٌ وَجَنَّتُهُ نَارٌ.
দাজ্জালের বাম চোখ হবে কানা, ফোলানো চুল হবে (চুল বেশি হওয়ার কারণে এমন মনে হবে), তার সঙ্গে থাকবে জান্নাত ও জাহান্নাম। তবে তার জাহান্নাম প্রকৃত জান্নাত এবং তার জান্নাত হলো প্রকৃত জাহান্নাম。
হুজরাত হুজাইফা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, 'আমি খুব ভালোভাবে জানি যে, দাজ্জালের সঙ্গে কী আছে! তার সঙ্গে থাকবে প্রবহমান দুটি নদী, একটি দেখতে হবে সাদা পানি, আরেকটি দেখতে হবে জ্বলন্ত আগুন। যদি কেউ দাজ্জালকে পেয়ে যায়, তাহলে সে যেন ওই নদীতে যায় যেখানে আগুন দেখবে। তারপর চোখ বন্ধ করে তার মধ্যে মাথা ঢুকিয়ে দিয়ে পানি পান করবে। কারণ, সেটা হবে প্রকৃত শীতল পানি। দাজ্জালের একচোখ হবে নিশানা, যার ওপর থাকবে মোটা চামড়া আর দুই চোখের মাঝামাঝি অংশে লেখা থাকবে `كفر`- কাফির’ শিক্ষিত ও অশিক্ষিত প্রতিটি মুমিন তা পড়তে পারবে.`
আবু বকর সিদ্দিক রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, 'দাজ্জাল পাশ্চাত্যের খোরাসান থেকে বের হবে। অনেকেই তার অনুসারী হবে। তার চেহারা হবে পেঁচানো চালের মতো.'
উবাদা ইবনু সামিত রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন— `আমি তোমাদেরকে প্রতিশ্রুত دাজ্জাল সম্পর্কে বলছিলাম, তবে আশঙ্কা করছিলাম যে, তোমরা হয়তো বুঝবে না। মনে রেখো, দাজ্জাল হবে খাটো, অহংকারী, বাঁকা কানা চোখবিশিষ্ট, চোখ হবে নিশানা-সমান, উঁচুও হবে না, আবার গভীরও হবে না। যদি তার ব্যাপারে সন্দেহে নিপতিত হও, তবে মনে রেখো, তোমাদের রব কানা নন.'
জ্ঞাতব্য: নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমনভাবে দাজ্জালের পরিচয়, বিবরণ ও গুণাগুণ বলে দিয়েছেন যে, এরপর তাকে নিয়ে আর কোনো সংশয় থাকার অবকাশ নেই। তবে তার সমস্ত গুণই নিফাক। সুস্থ জ্ঞানের অধিকারী প্রত্যেকের কাছেই যা স্পষ্ট। কিন্তু যার কপালে দুর্ভাগ্য নির্ধারিত হয়ে গেছে, সে দাজ্জালের অনুসারী হবে, মিথ্যা ও নির্দিষ্টতায় তার অনুসারী হবে এবং সত্যের অনুসরণ ও তিলাওয়াতের জ্যোতি থেকে বঞ্চিত হবে। তো হাদিসে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী, `নিশ্চয় দাজ্জাল কানা, কিন্তু তোমাদের রব কানা নন'-এটি সেসকল মানুষের জন্য সতর্কবাণী- যাদের বুদ্ধি কম, উদাসীন। যেন তারা খুব ভালোভাবে এ-কথা বুঝে নেয়, যে ব্যক্তি নিজেই অসম্পূর্ণ, নিজের সমস্যাই যে সমাধান করতে পারে না, সে কোনোভাবেই ইলাহ হওয়ার যোগ্যতা রাখে না। কারণ, সে অক্ষম, দুর্বল। আর যে ব্যক্তি নিজের অসম্পূর্ণতা ও সমস্যা দূর করতে অক্ষম, সে অবশ্যই অন্যের উপকার করতে এবং অন্যের ক্ষতি প্রতিরোধ করতে আরও ও বেশি অক্ষম।
টিকাঃ
[৩৫৭] সহীহ মুসলিম, খণ্ড : ৪, পৃষ্ঠা : ১০৪。
[৩৫৮] সহীহ মুসলিম, খণ্ড : ৪, পৃষ্ঠা : ১০৯。
[৩৯৬] সহিহ মুসলিম, খণ্ড : ১৫, পৃষ্ঠা : ১৫২, হাদিস : ৭২২২。
[৩৯৭] সহিহ মুসলিম, খণ্ড : ১৫, পৃষ্ঠা : ১৫২, হাদিস : ৭২২৩。
[৩৯৮] সুনানে তিরমিজি, খণ্ড : ৮, পৃষ্ঠা : ১৮৭, হাদিস : ২২৪৬。
[৩৯৯] মুনতাজু আদি দাজ্জাল, খণ্ড : ১১, পৃষ্ঠা : ০৩৮, হাদিস : ৩৪৩৪。
📄 যে শহরে দাজ্জালের প্রবেশ নিষেধ
আনাস ইবনু মালিক রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন—
لَيْسَ مِنْ بَلَدٍ إِلَّا سَيَطَؤُهُ الدَّجَّالُ إِلَّا مَكَّةَ وَالْمَدِينَةَ
দাজ্জাল মক্কা ও মদিনা ছাড়া প্রতিটি শহরেই প্রবেশ করবে.`
অন্য বর্ণনায় আছে—`আমি মক্কা ও পবিত্র নগরী ছাড়া প্রতিটা জনপদেই প্রবেশ করব এবং চল্লিশ দিন পর্যন্ত সেগুলোকে পদানত করব। আর এই দুটি নগরী আমার জন্য হারাম.'
টিকাঃ
[৪০০] সহিহ বুখারি, খণ্ড : ৪, পৃষ্ঠা : ৪০৯, হাদিস : ১৭৯৪; সহিহ মুসলিম, খণ্ড : ১৫, পৃষ্ঠা : ১৭৯, হাদিস : ৭২৩১。
[৪০১] সহিহ মুসলিম, খণ্ড : ১৫, পৃষ্ঠা : ১৭৮, হাদিস : ৭২২৯。
📄 দাজ্জাল বের হওয়ার কারণ এবং ফিতনার আস্ফালন
ইমরান ইবনু হুসাইন রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি—
مَا بَيْنَ خَلْقِ آدَمَ إِلَى قِيَامِ السَّاعَةِ خَلْقٌ أَكْبَرُ مِنَ الدَّجَّالِ
'হযরত আদম আলাইহিস সালামের সৃষ্টি এবং কিয়ামতের মাঝে দাজ্জালের চেয়ে বড় আর কোনো সৃষ্টি নেই.'`
তামিম আদ-দারি রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, 'আমরা দ্রুত চলতে লাগলাম এবং একপর্যায়ে একটি গির্জায় প্রবেশ করলাম। হঠাৎ সেখানে (প্রচণ্ডভাবে, লম্বার দিক থেকে নয়) বিশালাকারের একটি মানুষ দেখলাম, যাকে শক্তভাবে বেঁধে রাখা হয়েছে.`
আবদুল্লাহ ইবনু উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেন, মদিনার কোনো এক রাস্তায় ইবনুস সাইয়্যাদের সঙ্গে মিলিত হলে ইবনু উমর তাকে কিছু কথা বলেন, যার ফলে সে রাগে ফুলতে থাকে; সে এমন ফুলল যা, পুরো গলি যেন পূর্ণ হয়ে গেলো। অতঃপর ইবনু উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুমা হজরত হাফসা রাদিয়াল্লাহু আনহার ঘরে কাজে গেলেন। তিনি ইবনু উমরের বিষয়টি আগেই জানতে পেরেছিলেন। সুতরাং তিনি ইবনু উমরকে বললেন—
رَحْمَةُ الله مَا أَرَدْتَ مِنْ ابْنِ صَائِدٍ أَمَا عَلِمْتَ أَنَّ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ إِنَّمَا يَخْرُجُ مِنْ غَضْبَةٍ يَغْضَبُهَا
আল্লাহ তোমার প্রতি রহম করুন! তুমি ইবন সাঈদের কাছে কী ইচ্ছা করেছিলে? তুমি কি জানো না যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কী বলেছেন? তিনি বলেছেন, সে (দাজ্জাল) তো রাগ করেই বের হবে.`
টিকাঃ
[৪০২] সহিহ মুসলিম, খণ্ড : ১৫, পৃষ্ঠা : ১৬০, হাদিস : ৭২০৪。
[৪০৩] সহিহ মুসলিম, খণ্ড : ১৫, পৃষ্ঠা : ১৬৭, হাদিস : ৭২০৫。
[৪০৪] সহিহ মুসলিম, খণ্ড : ১৫, পৃষ্ঠা : ১৬৪, হাদিস : ৭২৩১。
📄 ইসা আলাইহিস সালাম
হুজুরবে হুজাইফা রাদিয়াল্লাহু আনহুর হাদিসের আলোকে আলোচনা করা হয়েছে যে, দাজ্জালের হাতে জান্নাত ও জাহান্নাম দুটি থাকবে। তবে তার জান্নাত হবে প্রকৃতপক্ষে জাহান্নাম এবং তার জাহান্নাম হবে প্রকৃতপক্ষে জান্নাত。
ইমরান ইবনু হুসাইন রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন—
مَنْ سَمِعَ بِالدَّجَّالِ فَلْيَنْأَ عَنْهُ فَوَاللهِ إِنَّ الرَّجُلَ لَيَأْتِيهِ وَهُوَ يَحْسَبُ أَنَّهُ مُؤْمِنٌ فَيَتَّبِعُهُ مِمَّا يَبْعَثُ بِهِ مِنَ الشُّبُهَاتِ أَوْ لِمَا يَبْعَثُ بِهِ مِنَ الشُّبُهَاتِ.
যে ব্যক্তি দাজ্জালের কথা শুনবে সে যেন তার থেকে দূরে থাকে। আল্লাহ্র কসম, একজন মানুষ নিজেকে মুমিন ভেবে তার কাছে যাবে, কিন্তু তার অন্তরে থাকা সংশয়ের কারণে বা দাজ্জালের কারণে উদ্ভুত সংশয়ের কারণে সে দাজ্জালের অনুসারী হয়ে যাবে.`
আবু সাঈদ খুদরি রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন—দাজ্জাল বের হওয়ার পর একজন মুমিন তার দিকে এগিয়ে যাবে। যার সম্পর্কে দাজ্জাল জানতে পেরেছিল, তাকে দাজ্জাল সম্পর্কে জানাতে চাইবে। তুমি কোথায় যাবে? মুমিন লোকটি বলবে, আবিষ্কৃত ওই লোকটির কাছে যাব। তারা বলবে, তুমি কি আমাদের রবের (দাজ্জালের) প্রতি ইমান আনবে না? মুমিন লোকটি বলবে, আমাদের রবের (আল্লাহর) প্রতি অভিমান নেই তো! তারা বলবে, ওকে হত্যা করো। তখন তারাই পরস্পরকে বলাবলি করবে, তোমরা রব (দাজ্জাল) কি তোমাদেরকে তার অনুপস্থিতিতে কাউকে হত্যা করতে বারণ করেনি? বর্ণনাকারী বলেন, সুতরাং তারা দাজ্জালের কাছে যাবে। মুমিন ব্যক্তি তাকে দেখেই বলতে আরম্ভ করবে, হে লোক সকল! এটাই সেই দাজ্জাল, যার কথা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলে গেছেন। বর্ণনাকারী বলেন, তখন দাজ্জালের নির্দেশ দেওয়া বন্ধ করা হবে। এবার দাজ্জাল বলবে, তাকে ধরে আঘাত করো। সুতরাং প্রহরের তারা পেট ও পিঠ লম্বা করে ফেলা হবে। বর্ণনাকারী বলেন, তখন দাজ্জাল বলবে, তুমি আমার প্রতি ইমান আনবে? মুমিন ব্যক্তি বলবে, তুই-ই তো প্রতিশ্রুত দাজ্জাল। বর্ণনাকারী বলেন, সুতরাং দাজ্জালের নির্দেশে করাত দিয়ে তার শরীরে জোড়ার স্থান থেকে ফাঁড়া শুরু করবে এবং তার দুই পা'কে বিচ্ছিন্ন করে ফেলবে। বর্ণনাকারী বলেন, এরপর দাজ্জাল নিহত মুমিন ব্যক্তির শরীরের দুই টুকরোর মাঝখান দিয়ে যাবে এবং বলবে, দাঁড়িয়ে যা। সুতরাং মুমিন ব্যক্তির লাশ কিনা হয়ে সোজা দাঁড়িয়ে যাবে। তখন দাজ্জাল বলবে, এবার কি আমার প্রতি ইমান আনবে? মুমিন ব্যক্তি জবাব দেবে, তোর ব্যাপারে আমার অভিজ্ঞতা বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্ণনাকারী বলেন, তারপর মুমিন ব্যক্তি বলবে, হে লোক সকল! দাজ্জাল আমার পরে আর কারও সঙ্গে এরূপ করতে পারবে না। বর্ণনাকারী বলেন, সুতরাং দাজ্জাল জবাই করার জন্য মুমিন ব্যক্তিকে ধরবে এবং गर्दन ও গলার মাঝে আঘাত করতে থাকবে, কিন্তু তার কিছুই করতে পারবে না। বর্ণনাকারী বলেন, সুতরাং দাজ্জাল তার দুই হাত ও দুই পা ধরে নিক্ষেপ করবে। লোকজন মনে করবে তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করেছে, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তাকে জান্নাতে ফেলে দেওয়া হয়েছে। বর্ণনাকারী বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, রাব্বুল আলামিনের কাছে এই মুমিন ব্যক্তিটি হবে সবচেয়ে মর্যাদাবান শহিদ.'
অন্য বর্ণনায় আছে—
'দাজ্জাল আসবে, তবে তার জন্য মদিনায় প্রবেশ হারাম। যার কারণে মদিনার সঙ্গে সংযুক্ত কিছু বিরান ভূমিকে যাবে। সুতরাং উত্তম একজন মুমিন তার কাছে এগিয়ে আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি তুই সেই দাজ্জাল, যার ব্যাপারে আল্লাহ্র রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন। তখন দাজ্জাল বলবে, আমি যদি তাকে হত্যা করি, তাহলে তোমরা কি এ-বিষয়ে সন্দেহ করবে? তারা বলবে, না। বর্ণনাকারী বলেন, সুতরাং তাকে হত্যা করবে, তারপর জীবিত করবে। জীবিত করার সঙ্গেই মুমিন ব্যক্তি বলবে, আল্লাহ্র কসম! এখন তোর ব্যাপারে আমার অভিজ্ঞতা আরও শক্তিশালী হয়েছে। বর্ণনাকারী বলেন, দাজ্জাল আবার তাকে হত্যা করতে উদ্যত হবে, কিন্তু সেই সুযোগ তাকে দেওয়া হবে না.'
আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, মক্কা ও মদিনা ছাড়া দাজ্জাল প্রতিটি শহরেই প্রবেশ করবে। মক্কা ও মদিনা প্রতিটি গলিতে ফিরিশতা সারিদ্ধভাবে পাহারা দেবে। একপর্যায়ে গভীরনয়ে নেমে আসবে। তারপর মদিনা তাদের অধিবাসীদের তিনবার প্রকাশিত হবে। যার ফলে প্রতিটি কাফির ও মুনাফিক সেখান থেকে বের হয়ে দাজ্জালের কাছে যাবে.`
নাওয়াস ইবনু সামআন আল-কিলাবি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আলোচনা করেছেন, দাজ্জাল সকালবেলা আসবে। অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার তুলতুলে বর্ণনা করলেন, আবার তার কিয়ামতও দাজ্জাল এমনভাবে আলোচনা করলেন যে, আমরা মনে করলাম দাজ্জাল কোনো খেজুরের বাগানে ওত পেতে রয়েছে। অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আমি তোমাদের ও দাজ্জালের চেয়েও অন্য একটি বিষয়কে বেশি ভয় করছি। যদি আমার জীবদ্দশায় দাজ্জাল বের হয়, তাহলে তোমাদের পক্ষে আমিই তার মোকাবিলা করব। আর যদি আমার অবর্তমানে বের হয়, তাহলে প্রতিটি মানুষ নিজেই তার মোকাবিলা করবে, আর আল্লাহ তাআলা প্রতিটি মুসলিমের জন্য আমার প্রতিনিধি হবেন। দাজ্জাল হবে দামড়া যুবক, তার চোখ হবে স্বল্প দৃষ্টিসম্পন্ন-বাঁকা। আমার কাছে মনে হয় সে হবে আবদুল উজ্জা ইবনু কাতানের মতো। তোমাদের মধ্য থেকে যে ব্যক্তি তাকে পাবে, সে যেন তার ওপর সূরা কাহাফের প্রারম্ভিক আয়াতগুলো পড়ে। দাজ্জাল সিরিয়া ও ইরাকের মাঝে এক প্রশস্ত পথ ধরে বের হবে। তারপর সে ডানে বামে ফিতনা- ফাসাদ সৃষ্টি করবে। হে আল্লাহ্র বান্দারা, অবিচল থেকো! আমরা বললাম, হে আল্লাহ্র রাসূল, সা. পৃথিবীতে কতদিন থাকবে? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, চল্লিশ দিন। প্রথম দিন হবে বছরের মতো, দ্বিতীয় দিন হবে মাসের মতো, তৃতীয় দিন হবে সপ্তাহের মতো এবং অন্যান্য দিনগুলো হবে তোমাদের দিনগুলোর মতো। আমরা জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রাসূল, যে দিনটি হবে এক বছরের সমান, আমরা কি সেদিনে এক দিনের নামাজের ওয়াক্তই সালাত করব? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, না, বরং তোমরা প্রতিদিনের সময় নির্ধারণ করে নেবে。 আমরা বললাম, হে আল্লাহর রাসূল, জামিনের তার চলার গতি কেমন হবে? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, বাতাসের চলমান মেঘের মতো। সে একটি কওমকে কাছে গিয়ে তাদেরকে নিজের দিকে ডাকবে। সুতরাং তারা তাকে বিশ্বাস করবে এবং তার ডাকে সাড়া দেবে। ফলে সে আকাশকে নির্দেশ দিলে বৃষ্টি বর্ষণ হবে, জমিন ফসল উৎপন্ন করবে। তারপর সন্ধ্যাবেলায়ই পূর্বের চেয়ে লম্বা লম্বা জোয়ার (তাদের একটি প্রজাতি) সৃষ্টি হবে, শীর্ষ পূর্ণ হয়ে যাবে এবং ফসলের কাণ্ডগুলো লম্বা লম্বা হবে।
তারপর দাজ্জাল আরেকটি কওমের কাছে গিয়ে তাদেরকে নিজের দাসত্বের দিকে ডাকবে। কিন্তু তারা দাজ্জালের কথা প্রত্যাখ্যান করবে। সুতরাং সে সেখান থেকে চলে যাবে। পরে তারা অনীহাবসতও রিক্ত হস্তে উদাস হয়ে পড়বে। দাজ্জাল বিধ্বস্ত জমিনে চলবে এবং তা জমিনকে লক্ষ্য করে বলবে, তোর খনিজ সম্পদগুলো বের করে দে। সুতরাং জামিনের খনিজগুলো মৌমাছির ঝাঁকের মতো দাজ্জালের পিছু পিছু চলতে থাকবে。
তারপর ঈসাবগে একজন যুবককে ডেকে তোলওয়ার আঘাতে দু টুকরো করে বর্শা পরিমাণ দূরে দূরে রাখবে। তারপর দাজ্জাল সেই নিহত যুবককে ডাকবে। ফলে যুবক উজ্জ্বল চেহারায় হাসতে হাসতে সামনে আসবে। ইতিমধ্যে আল্লাহ তায়ালা হজরত ঈসা ইবনু মারইয়াম আলাইহিস সালামকে প্রেরণ করবেন। তিনি দামেশকের পূর্বাঞ্চলে সাদা মিনারের কাছে অবতরণ করবেন। তিনি গোলাপ ও জাফরান দ্বারা রাঙানো কাপড় পরিহিত থাকবেন। দুজন ফিরিশতার কাঁধে ভর করে অবতরণ করবেন। তার মাথা থেকে ফোঁটা ফোঁটা পানি পড়বে। যখন তিনি মাথা উঁচু করবেন, মনে হবে মুক্তার মতো পানির ফোঁটাগুলো ঝরতে থাকবে। কাফির মাত্রই তার নিঃশ্বাসের আঘাতে মারা যাবে। হজরত ঈসা আলাইহিস সালামের দৃষ্টি যতদূর পৌঁছবে, তার নিশ্বাসও ততদূর পৌঁছবে। তিনি দাজ্জালকে খুঁজে খুঁজেছে বাবুল-লুদে গিয়ে পাবেন এবং তাকে হত্যা করবেন。
এরপর একটি কওম হজরত ঈসা ইবনু মারইয়াম আলাইহিস সালামের কাছে আসবে- যাদেরকে আল্লাহ তায়ালা দাজ্জাল থেকে হিফাজত করেছেন। ঈসা আলাইহিস সালাম তাদের চেহারাগুলো আলতো রেখা দেবেন এবং তাদের সঙ্গে জান্নাতের তাদের মর্যাদা সম্পর্কে কথাবার্তা বলবেন। ইতিমধ্যে আল্লাহ তায়ালা হজরত ঈসা আলাইহিস সালামের কাছে ইলহাম প্রেরণ করবেন, আমার এমন কিছু বান্দাকে আমি বের করেছি, যুদ্ধে যারা তাদের দুটি হাত হারিয়েছে। তুমি আমার বান্দাদেরকে জমায়েত করে তুর পাহাড়ে আরোহণ করো। এরপর আল্লাহ তায়ালা ইয়াজুজ-মাজুজকে পাঠাবেন। তারা চতুর্দিক থেকে আছড়ে পড়বে। তাদের প্রথম দলটি তাবারিয়া সমুদ্র অতিক্রম করবে এবং তার সমস্ত পানি খেয়ে ফেলবে। পরবর্তী দল ওই সমুদ্র পাড়ি দেওয়ার সময় বলবে, এখানে কি কখনো পানি ছিল? তারপর হজরত ঈসা আলাইহিস সালাম এবং তার সাথিদেরকে অবরোধ করা হবে। ইয়াজুজ-মাজুজদের কাছে মাহিয়্যের মাংস সেদিন একশ দিনার (বাজারে প্রয়োজন ও লোভের কারণে) অপেক্ষা উত্তম হবে। তখন হজরত ঈসা এবং তার সাথিরা আল্লাহর প্রতি মনোনিবেশ করবেন। তখন আল্লাহ তায়ালা ইয়াজুজ- মাজুজদের ঘাড়ে এক প্রকার পোকা প্রেরণ করবেন। সুতরাং তারা (একসঙ্গে) একটি প্রাণীর মতো মারা যাবে।
তারপর আল্লাহর নবি হজরত ঈসা আলাইহিস সালাম তার সাথিদেরকে নিয়ে নিচে নেমে আসবেন। কিন্তু এসে দেখবেন যে, গোটা দুনিয়া ইয়াজুজ-মাজুজদের লাশের ভীড়ে ভরে গেছে, এক বিঘত পরিমাণ জায়গাও ফাকা নেই। তখন ঈসা আলাইহিস সালাম এবং তার সাথিরা আল্লাহর প্রতি মনোনিবেশ করবেন। সুতরাং আল্লাহ তায়ালা উটের গলার মতো পাখি প্রেরণ করবেন। পাখিরা এসে ইয়াজুজ-মাজুজদের লাশগুলো উঠিয়ে নিয়ে গিয়ে আল্লাহর ইচ্ছাকৃত স্থানে ফেলে দেবে। তারপর আল্লাহ তায়ালা এমন বৃষ্টি বর্ষণ করবেন-যা থেকে মাটির বা পাথরের কোনো ঘরই বাদ পড়বে না। যার কারণে গোটা ভূখণ্ড ধুলো পরিষ্কার হয়ে যাবে。
তারপর জমিনকে বলা হবে, তোমার ফল উপগত করো, তোমার বরকত ফিরিয়ে দাও। সেদিন একটি পরিবার একটি ডালিম থেকে খেতে পারবে, তার খোলায় ছাতা বানাতে পারবে এবং দুধে বরকত দান করা হবে। এমনকি একটি উটের ওলান (দুধ) বিশাল একদল মানুষের জন্য যথেষ্ট হবে, একটি গাভীর দুধ একটি বংশের লোকের জন্য যথেষ্ট হবে এবং একটি ছাগীর দুধ একটি পরিবারের জন্য যথেষ্ট হবে। এভাবেই তারা চলতে থাকবে। ইতিমধ্যে সাল্লাল্লাহু আলাইহি পবিত্র বাতাস প্রেরণ করবে। সুতরাং সেই বাতাস তাদেরকে নিজের নিয়ন্ত্রণর মধ্যে নিয়ে আসবে। অতঃপর প্রত্যেক মু’সলিমের প্রাণবায়ু বের করে নেবে。
বাকি থাকবে খারাপ মানুষগুলো। তারা গাধার মতো বিকট আওয়াজে চিল্লাচিল্লি আরম্ভ করবে। তাদের ওপরই কিয়ামত কায়িম হবে。
আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন—
وَاللهِ لَيَنْزِلَنَّ ابْنُ مَرْيَمَ حَكَمًا عَادِلاً فَلَيَكْسِرَنَّ الصَّلِيبَ وَيَقْتُلَنَّ الخِنْزِيرَ وَلَيَضَعَنَّ الْجِزْيَةَ وَلَتُرَكَنَّ الْقِلاَصُ فَلاَ يُسْعَى عَلَيْهَا وَلَتَذْهَبَنَّ الشَّحْنَاءُ وَالتَّبَاغُضُ وَالتَّحَاسُدُ وَلَيَدْعُوَنَّ إِلَى الْمَالِ فَلَا يَقْبَلُهُ أَحَدٌ
আল্লাহর কসম! মারইয়ামের তনয় নবিব্যান শাসক হয়ে অবতরণ করবেন। ক্রুশ ভেঙে ফেলবেন, শূকর হত্যা করবেন, কর মাওকুফ করবেন, উট ছেড়ে দেওয়া হবে, সেগুলো ধরার জন্য চেষ্টা করা হবে না, শত্রুতা, বিদ্বেষ এবং হিং’সা দূর হবে, তারা সম্পদ প্রদান করার জন্য মানুষকে ডাকবে, কিন্তু কেউ তা গ্রহণ করবে না。
আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন—
وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ لَيُهِلَّنَّ ابْنُ مَرْيَمَ بِفَجِّ الرَّوْحَاءِ حَاجًا أَوْ مُعْتَمِرًا أَوْ لَيُثْنِيَنَّهُمَا.
ওই সত্তার শপথ, যার হাতে আমার প্রাণ! মারইয়ামের তনয় ঈসা রাওহা নামক স্থানের প্রশস্ত অঞ্চল থেকে হজ বা উমরায়র জন্য বা উভয়টির জন্য হাদি (কুরবানির জন্তু) প্রেরণ করবেন。
টিকাঃ
[৪০৫] সুনান আবু দাউদ, খণ্ড : ১১, পৃষ্ঠা : ০৩৯, হাদিস : ৪৭৫২。
[৪০৬] সহিহ মুসলিম, খণ্ড : ১৫, পৃষ্ঠা : ১৬৪, হাদিস : ৭২৩১。
[৪০৭] সহিহ মুসলিম, খণ্ড : ১৫, পৃষ্ঠা : ১৭৯, হাদিস : ৭২২৯。
[৪০৮] সহিহ মুসলিম, খণ্ড : ১৫, পৃষ্ঠা : ১৭২, হাদিস : ৭২২৭。
[৩৭০] সহিহ মুসলিম, খণ্ড: ১৪, পৃষ্ঠা: ১৩৭, হাদিস: ৫২২৯。
[৩৭১] সহিহ মুসলিম, খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ২২১, হাদিস: ১৫৫。
[৩৭২] সহিহ মুসলিম, খণ্ড: ৪, পৃষ্ঠা: ৩৯৯, হাদিস: ১২৫১。