📄 ফিতনা সম্পর্কে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী
হুজাইফা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, “রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের মাঝে দাঁড়িয়ে কিয়ামত পর্যন্ত যা কিছু ঘটবে সব বিষয়ে বললেন। যার মনে রাখার সে মনে রেখেছে, যার ভুলে যাওয়ার সে ভুলে গেছে। আমার সেই সাথিরা বিষয়টি জেনেছে। সেগুলোর মধ্য থেকে সংঘাতপূর্ণ কিছু বিষয় আমি তুলেছি। ঠিক যেমন একজন মানুষ আজকের দিনের মুখোমুখি হলে চিনতে পারে, তারপর ভুলে যায়, আবার দেখলে চিনতে পারে।”
হুজাইফা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমন একটি মজলিসে ফিতনা সম্পর্কে আলোচনা করলেন—যেখানে আমিও উপস্থিত ছিলাম। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গুণে গুণে ইরশাদ করলেন—
مِّنْهُنَّ ثَلَاثٌ لَّا يَكَدْنَ يَدَعْنَ شَيْئًا وَمِنْهُنَّ فِتَنٌ كَرِيَاحِ الصَّيْفِ مِنْهَا صِغَارٌ وَمِنْهَا كِبَارٌ.
সেগুলোর মধ্য থেকে তিনটি কোনো বস্তুকে ছাড়বে না, যার মধ্য থেকে কিছু ফিতনা—গ্রীষ্মকালের বাতাসে মতো, যেগুলোর মধ্য থেকে কিছু ছোট ফিতনা এবং কিছু হবে বড় ফিতনা। হজরত হুযাইফা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমি ছাড়া তারা সকলেই চলে গেল。
টিকাঃ
[১৬৮] সহিহ মুসলিম, খণ্ড: ১৪, পৃষ্ঠা: ৪৭, হাদিস: ৫১৪২。
[১০০] সহীহ মুসলিম, খণ্ড: ১৪, পৃষ্ঠা: ৭১, হাদিস: ৫১৪৬。
📄 ফিতনার উত্তাল তরঙ্গ
হজরত হুযাইফা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমরা হজরত উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু এর কাছে বসে ছিলাম। তিনি বললেন, ফিতনার বিষয়ে তোমাদের মধ্য থেকে কোন ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদিস জানে? বললাম, আমি হজরত উমর বললেন, তুমি অবশ্যই দুঃসাহসী। তারপর হজরত হুযাইফা রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি—
يُفْتَنُ الرَّجُلُ فِي أَهْلِهِ وَمَالِهِ وَوَلَدِهِ وَجَارِهِ فَتُكَفِّرُهُ الصَّلَاةُ وَالصَّدَقَةُ وَالْأَمْرُ بِالْمَعْرُوفِ وَالنَّهْيُ عَنِ الْمُنْكَرِ
‘মানুষ ফিতনা তার পরিবার, সন্তান এবং প্রতিবেশীর মাঝে। নামাজ, রোজা, সাদাকা, সৎকাজের আদেশ এবং অসৎকাজ থেকে বাধা প্রদান তার ক্ষতিপূরণস্বরূপ হবে।’
হজরত উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, আমি এটা শুনতে চাচ্ছি না, আমি শুনতে চাচ্ছি উত্তাল তরঙ্গের মতো যেয়ে আসা ফিতনা সম্পর্কে। হুযাইফা রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, হে আমিরুল মুমিনিন, আপনি এই ব্যাপারটিতে উদগ্রীব কেন? আপনার মাঝে ও ফিতনার মাঝে তো অন্তরায় রয়েছে। তো সেই অন্তরায় কি খুলে দেওয়া হবে বা ভেঙে ফেলা হবে? তিনি বললেন, ভেঙে ফেলা হবে。
আর ভাঙাটা খোলার চেয়ে বেশি কঠিন। হজরত শফিক বলেন, আমি হুযাইফা রাদিয়াল্লাহু আনহুকে বললাম, হজরত উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু কি ফিতনার দরজা সম্পর্কে জানতেন? তিনি বললেন, হ্যাঁ, তিনি ঠিক এমনভাবে জানতেন—যেভাবে জানেন যে আগামীকালকের পর রাত আসবে। শফিক বলেন, আমি তাকে বিশুদ্ধ হাদিস বর্ণনা করেছি। আমরা হজরত হুযাইফাকে সে দরজা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করতে মনস্থ করলাম। সুতরাং মাসরুককে বললাম, হজরত হুযাইফাকে জিজ্ঞেস করুন। জবাবে তিনি বললেন, হজরত উমর রাদিয়াল্লাহু সেই দরজা。
আমর ইবনু ইহইইয়া ইবনু সাঈদ থেকে বর্ণনা করেছেন, আমাকে হাদিস বর্ণনা করেছেন আমার দাদা, তিনি বলেন, আমি হজরত আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহুর সঙ্গে মসজিদে নববিতে বসে ছিলাম, আমার সঙ্গে মারওয়ানও ছিল। হজরত আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, আমি সত্যবাদী এবং সত্যায়িত ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি—
هَلَكَةُ أُمَّتِي عَلَى يَدَيْ غِلْمَةٍ مِنْ قُرَيْشٍ
আমার উম্মত ধ্বংস হবে কুরাইশের এক শিশুর হাতে।
মারওয়ান বললেন, তাদের ওপর আল্লাহর অভিসম্পাতও নাযিল হোক। হজরত আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, আপনি চাইলে আমি বলতে পারব—সে অন্ধের দুই পুত্রও তো! তো আমি একদা দাদার সঙ্গে বনি মারওয়ানের দিকে যাচ্ছিলাম, যখন তারা সিরিয়া ওপরে রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করেছিল। যখন তাদেরকে দেখলেন, সেখানে একজন উদীইয়াম শিশুর প্রতি নজর পড়ল! দাদা আমাদেরকে বললেন, এই শিশুটি তাদের মধ্য থেকে (উম্মতকে ধ্বংসকারীদের মধ্য থেকে) হতে পারে। আমরা বললাম, আপনিই ভালো জানেন。
টিকাঃ
[১০১] তিনি হযরত ইবনু কালিমের হজরত উমরুই ফিতনা প্রকাশের মাঝে অন্যায় ও বাধার প্রাচীর। তার হওয়ার মাধ্যমে ফিতনার আমার সৃষ্টি হবে। –অনুবাদক。
[১০২] সুনানু আবি দাউদ, খণ্ড: ২, পৃষ্ঠা: ৪৪৬, হাদিস: ৪২৪২。
[১০৩] সহীহ বুখারী, খণ্ড: ২২, পৃষ্ঠা: ৪৪৬, হাদিস: ৬৩১৪。
📄 ফিতনামুক্ত ব্যক্তিই হবে সৌভাগ্যবান
মিকদাদ ইবনু আসওয়াদ বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, তিনি বলেছেন—
إِنَّ السَّعِيدَ لَمَنْ جُنِّبَ الْفِتَنَ إِنَّ السَّعِيدَ لَمَنْ جُنِّبَ الْفِتَنَ لِمَنْ جُنِّبَ الْفِتَنَ وَلَمَنْ ابْتُلِيَ فَصَبَرَ فُواها
সৌভাগ্যবান ওই ব্যক্তি—যাকে ফিতনা থেকে দূরে রাখা হয়েছে, সৌভাগ্যবান ওই ব্যক্তি যাকে ফিতনা থেকে দূরে রাখা হয়েছে এবং ওই ব্যক্তি—যে ফিতনায় আক্রান্ত হয়েও সবর করবে。
আনাস ইবনু মালিক রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন—‘মানুষের ওপর এমন একটি সময় আসবে, যখন দ্বীনের ওপর সবর করার হাতে ধারণ করার মতো কঠিন হবে।’
টিকাঃ
[১০৪] সুনানু আবি দাউদ, খণ্ড: ২১, পৃষ্ঠা: ৪৪৬, হাদিস: ৪২৪১。
[১০৬] সুনান তিরমিযি, খণ্ড: ৮, পৃষ্ঠা: ২১০, হাদিস: ২১৮৬。
📄 এই উম্মতের প্রথমাংশ ও শেষাংশের ভিন্ন-ভিন্ন ভাগ্যলিপি
আব্দুল্লাহ ইবনু উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমরা কোনো এক সফরে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে ছিলাম। পথে এক জায়গায় যাত্রাবিরতি করলাম। তখন আমাদের মধ্যে কেউ তাঁবু স্থাপন করছিল, কেউ ভাতের ব্যবস্থা করছিল এবং মজাকেন ঘোষণা করছিল। ইতিমধ্যে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মুয়াজ্জিন ঘোষণা করলেন—নামাজে দাঁড়াও। সুতরাং আমি নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে হাজির হলাম। তখন তিনি বললেন, ‘আমার পূর্বে যত নবি অতীত হয়েছেন—সকলের দায়িত্ব ছিল তার উম্মতকে যাবতীয় কল্যাণের প্রতি উৎসাহিত করা এবং সব প্রকারের অকল্যাণ থেকে সতর্ক করা। আর এই উম্মতের প্রথমাপণের জন্য নিরাপত্তা এবং শেষাপণের জন্য রয়েছে বিপদ। এখন এমন কিছু বিষয়ের ফায়সালা করা হয়েছে—যা তোমরা জানো না। একটি ফিতনা আসবে, তখন তারা পরস্পরকে দোষি পরিণত করবে। আরেকটি ফিতনা আসবে, তখন মুমিনরা বলবে, আমরা ধ্বংস হয়ে যাব, তারপর ফিতনা নির্মূল হবে। আবার ফিতনা আসবে, তখন মুমিনরা বলবে, এটা তো!…এ সময় যে ব্যক্তি জাহান্নাম থেকে মুক্তি পেয়ে জান্নাতে প্রবেশ করতে ভালোবাসবে তার মৃত্যু চলে আসবে। যে অবস্থায়, সে আল্লাহর প্রতি ও পরকাল দিবসের প্রতি ইমান আনবে এবং এমন মানুষের কাছে যাবে—যাকে সে নিজের দিকে আনতে ভালোবাসে। আর যে ব্যক্তি ইমানের হাতে বাহিত হবে, তার হাতে নিজেকে অর্পণ করবে, নিজের করমমের বিষয়টিও তার কাছে মাওন করবে, সে যথাসম্ভব ইমানের আনুগত্য করবে। যদি অন্য কেউ ইমানের সঙ্গে ইমানত নিয়ে যুদ্ধ করে, তাহলে দৃঢ়তার গড়দানে আঘাত করো।’