📄 ফিতনার দিনে করণীয়-বর্জনীয়
আবু মূসা আশআরি রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন—
إِنَّ بَيْنَ يَدَيْ السَّاعَةِ فِتَنًا كَقِطَعِ اللَّيْلِ الْمُظْلِمِ يُصْبِحُ الرَّجُلُ فِيهَا مُؤْمِنًا وَيُمْسِي كَافِرًا وَيُمْسِي مُؤْمِنًا وَيُصْبِحُ كَافِرًا الْقَاعِدُ فِيهَا خَيْرٌ مِنْ الْقَائِمِ وَالْقَائِمُ فِيهَا خَيْرٌ مِنْ الْمَاشِي وَالْمَاشِي فِيهَا خَيْرٌ مِنْ السَّاعِي فَكَسِّرُوا فِيهَا سُيُوفَكُمْ وَقَطِّعُوا أَوْتَارَكُمْ وَاضْرِبُوا بِسُيُوفِكُمْ الْحِجَارَةَ فَإِنْ دَخَلَ عَلَى أَحَدِكُمْ فَلْيَكُنْ كَخَيْرِ ابْنَيْ آدَمَ.
নিশ্চয় ফিতনা তোমাদের সামনে অন্ধকার রাতের মতো হেলে আসবে। তখন মানুষ সকালে থাকবে মুমিন, সন্ধ্যায় হবে কাফিরা। সন্ধ্যায় উপস্থিত ব্যক্তি দণ্ডায়মান ব্যক্তির চেয়ে উত্তম হবে। দণ্ডায়মান ব্যক্তি চলমান মানুষের চেয়ে ভালো হবে। চলমান মানুষ দৌড়াও মানুষের চেয়ে উৎকৃষ্ট হবে। অতএব, তোমাদের ধনুকের রশি ছিঁড়ে ফেলো, ধনুক ভেঙে ফেলো এবং তলোয়ার দিয়ে পাথরে আঘাত করো। তারপরও যদি কারও ওপর ফিতনা এসে পড়ে, তাহলে সে যেন আদম আলাইহিস সালামের দুই সন্তানের মধ্য থেকে উত্তমটির (হাবিলের) মতো (নিহত) হয় (অন্যের ওপর আঘাত না করে)。
আবদুল্লাহ ইবনু উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন—
‘নিকট ভবিষ্যতে তোমাদের অবস্থা কেমন হবে? সেসময় মানুষ গন্ডগোলকে নষ্টই বর্বর মতো ভেসে যাবে। তাদের প্রতিপত্তিগুলো ভেঙে যাবে, আমানতগুলো গুরুত্বহীন হয়ে পড়বে এবং পরস্পরের মতবিরোধিয়ে জড়িয়ে পড়বে। তারা এভাবে বহুদর্শী আন্তরিকতায় আক্রান্ত হবে, বলেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার এক হাতে আঙুলগুলো অন্য হাতের আঙুলগুলোর মাঝে ঢোকালেন। সাহাবায়ে কিরাম বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! সেসময় আমাদের কী অবস্থা হবে? নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমরা চেনা বস্তুকে গ্রহণ করবে, অচেনা বস্তুকে পরিহার করবে, নিজেদের বিবেচনাজ্ঞানকে প্রতি অগ্রবর্তী হবে এবং সাধারণদের বিশ্বাসগুলোকে ছেড়ে দেবে।’
টিকাঃ
[২৩৯] সুনানু আবু দাউদ, খণ্ড: ১১, পৃষ্ঠা: ৩৩১, হাদিস: ৩৮৯৯। হাদিসে উল্লিখিত أَغْمِدُوْ سُيُوْفَكُمْ অর্থাৎ মূল অর্থ হলো—উটের পিঠের সঙ্গে লাগানো খড়গাচ্ছের নিচের কাপড়টি এমনত কাপড় অর্থে বলা হয়েছে—উটের এই কাপড়ের মতো নিজেদের ঘরের সঙ্গে লাগিয়ে রাখো। এ/শুল্লর ম/অর্ঘ অবস্নবে অর্থটি করা হয়েছে—অগ্লবন্ধক。
[২৪০] সুনানু ইবনু মাজাহ, খণ্ড: ১১, পৃষ্ঠা: ৪৫৫, হাদিস: ৩৯৬১; সুনানু আবু দাউদ, খণ্ড: ১১, পৃষ্ঠা: ৩৩৭, হাদিস: ৩৮৯৮। আবদুন নিফাওই আবদুন মারুন শরাহে আবু দাউদ অনবুলন— খণ্ড: ২, পৃষ্ঠা: ২১৯, হাদিস: ৩৮৯৫। –অনুবাদ
[২৪১] সুনানু ইবনু মাজাহ, খণ্ড: ১১, পৃষ্ঠা: ৪৫১, হাদিস: ৩৯৪৬; সুনানু আবু দাউদ, খণ্ড: ১১, পৃষ্ঠা: ৩৩৭, হাদিস: ৩৯২১。
📄 ফিতনার সময় সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিমদেরকে আঁকড়ে ধরুন
নসর ইবনু আলিম আল-লাইসি বলেন, আমরা বনি লাইসের একটি কাফেলার সঙ্গে ইয়াশকারীর হুররাতের গমন করলাম। তিনি বললেন, তোমরা কারা? বনু লাইল বলল, আমরা আপনার কাছে হুযাইফার হাদিস সম্পর্কে জানতে এসেছি। তিনি বললেন, আমরা আবু মূসার সঙ্গে ছুটি কাফেলার কাছে গেলাম। কুফায় আমাদের সওয়াগিরও ঘুরিয়ে গেলা। ইয়াশকারীর বললেন, আমি এবং আমার সাথি আবু মূসার কাছে কুফায় যাওয়ার অনুমতি চাইলাম, তিনি অনুমতি প্রদান করলেন। সুতরাং আমরা কুফায় গেলাম। অতঃপর আমার সাথিকে বললাম, আমি মসজিদে যাচ্ছি। তারপর যখন বাজারের দোকানপাট খুলতে শুরু করবে তখন আমি তোমার কাছে আসব। ইয়াশকারী বললেন, সুতরাং আমি মসজিদে প্রবেশ করে দেখলাম, সেখানে কিছু লোক গোলার হয়ে বসে আছে, ঠিক এমনভাবে যেন তাদের মাথাগুলো কেটে ফেলা হয়েছে। তারা এভাবে বসে একজন লোকের কথা শুনছে। সুতরাং আমি তাদের পাশে গিয়ে দাড়ালাম। ইখমিঘুন একজন লোক এসে আমার পাশে দাড়ালা। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, লোকটি কে? সে আমাকে জিজ্ঞেস করল, আপনি কি বসরার অধিবাসী? আমি বললাম—হ্যাঁ। সে বলল, আমি বুঝতে পেরেছি কারণ, আপনি যদি কুফার অধিবাসী হতেন, তাহলে এমন প্রশ্ন করতেন না। সুতরাং আমি তার নিকটবর্তী হলাম। তখন শুনতে পেলাম, হযরত হুযাইফা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলছেন—লোকজন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে কল্যাণ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করছিল, আর আমি তাকে অনিষ্টতা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছিলাম। কারণ, আমি জানতাম, কল্যাণ আমার হাত থেকে ছাড়া পড়বে না। হযরত হুযাইফা রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বললেন, আমি জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রাসূল! এই কল্যাণের পর কি অনিষ্টতা রয়েছে? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তিনবার বললেন—
يَا حُذَيْفَةَ، تَعَلَّمُ كِتَابَ اللَّهِ وَاتَّبِعُ مَا فِيهِ .
হে হুযাইফা, আল্লাহর কিতাব শিক্ষা করো এবং তার বিধানাবলি মেনে চলো。
আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রাসূল, এই কল্যাণের পর কি অনিষ্টতা রয়েছে? নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন,
يَا حُذَيْفَةَ، تَعَلَّمُ كِتَابَ اللَّهِ وَاتَّبِعُ مَا فِيهِ .
হে হুযাইফা, আল্লাহর কিতাব শিক্ষা করো এবং তার বিধানাবলি মেনে চলো。
আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রাসূল, এই কল্যাণের পর কি অনিষ্টতা রয়েছে? নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন,
هُدْنَةٌ عَلَى دَخَنِ وَجَمَاعَةٌ عَلَى أَقْذَاءٍ فِيهَا أَوْ فِيهِمْ .
বিয়ানা ও মুনাফিকির সঙ্গে সন্ধি করা হবে আর কপট একটি দল হবে。
আমি জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রাসূল, هُدْنَةٌ عَلَى دَخَنِ কী? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন—
لَا تَرْجِعُ قُلُوبُ أَقْوَامٍ عَلَى الَّذِي كَانَتْ عَلَيْهِ .
মানুষের হৃদয়গুলো (কুফর শক্তি স্থাপিত হওয়ার পর) পূর্বাবস্থায় (নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রকৃত সুন্নতের ওপর) ফিরে আসবে না。
আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রাসূল, এই কল্যাণের পর কি কোনো অনিষ্টতা আছে? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন,
فِتْنَةٌ عَمْيَاءَ صَمَّاءَ عَلَيْهَا دُعَاةٌ عَلَى أَبْوَابِ النَّارِ فَإِنْ تَمُتْ يَا حُذَيْفَةُ وَأَنْتَ عَاضٌّ عَلَى جِذْلِ خَيْرٌ لَكَ أَنْ تَتَّبِعَ أَحَدًا مِنْهُمْ .
ফিতনা অন্ধ ও বধিরের মতো (আছড়ে পড়বে)। সেখানে জাহান্নামের আহ্বায়করা দাওয়াতুম থেকে জাহান্নামের দিকে আহ্বান করবে। হে হুযাইফা! তুমি যদি তখন গাছের শিকড় কামড়ে ধরেও থাকো, (ফিতনায় আকাঙ্ক্ষা না হও) তাহলে তাদের অনুসরণ করার চেয়ে এটাই হবে তোমার জন্য কল্যাণকর。
হুযাইফা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন—লোকজন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে কল্যাণ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করত, আর আমি তাকে জিজ্ঞেস করতাম অকল্যাণ সম্পর্কে। এই ভয়ে যে, যেন তা আমাকে পেয়ে না বসে। সুতরাং আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমরা বর্বরতা ও অনিষ্টতায় নিমজ্জিত ছিলাম। অতঃপর আল্লাহ তাআলা এই কল্যাণ (দ্বীন মানার পরের স্বীয় সুখাবস্থব) দান করেছেন। এই কল্যাণের পর কি অকল্যাণ আছে? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন,
نَعَمْ وَفِيهِ دَخَنٌ .
হ্যাঁ, তার মধ্যে دَخَنٌ থাকবে。
আমি বললাম, دَخَنٌ কী? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন—
قَوْمٌ يَسْتَنُّونَ بِغَيْرِ سُنَّتِي وَيَهْدُونَ بِغَيْرِ هَدْيِي تَعْرِفُ مِنْهُمْ وَتُنْكِرُ .
মানুষ আমার আদর্শ ছেড়ে অন্যের আদর্শ ধরবে এবং আমার প্রদর্শিত পথ ছেড়ে অন্য পথে চলবে। তাদের কাউকে তুমি চিনবে এবং কাউকে চিনবে না。
আমি বললাম, ওই কল্যাণের পর কি অনিষ্টতা আছে? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন—
نَعَمْ دُعَاةٌ عَلَى أَبْوَابِ جَهَنَّمَ مَنْ أَجَابَهُمْ إِلَيْهَا قَذَفُوهُ فِيهَا .
হ্যাঁ, জাহান্নামের দরজায় আহ্বায়করা ডাকবে। যারা তাদের ডাকে সাড়া দেবে তাদেরকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবে。
আমি বললাম, আমাদেরকে তাদের পরিচয় বলুন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন—
نَعَمْ قَوْمٌ مِنْ جِلْدَتِنَا وَيَتَكَلَّمُونَ بِأَلْسِنَتِنَا .
তাদের চামড়া হবে আমাদের মতো এবং কথা ও বলবে আমাদের মতো。
আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমরা তাদেরকে পেলে কী করব? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন—
تَلْزَمُ جَمَاعَةَ الْمُسْلِمِينَ وَإِمَامَهُمْ .
তুমি মুসলিমদের সংখ্যাগরিষ্ঠ দলকে এবং তাদের ইমামকে আঁকড়ে ধরবে。
আমি আবার জানতে চাইলাম, যদি তাদের দল বা ইমাম না থাকে তাহলে কী করব? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন—
فَاعْتَزِلْ تِلْكَ الْفِرَقَ كُلَّهَا وَلَوْ أَنْ تَعَضَّ عَلَى أَصْلِ شَجَرَةٍ حَتَّى يُدْرِكَكَ الْمَوْتُ وَأَنْتَ عَلَى ذَلِكَ .
সঙ্গত দণ্ডকে ছেড়ে দাও (কোনো দণ্ড ভোগ দিয়ে দশা-দণ্ডরাশি না জড়িয়ে) এবং আমৃত্যু গায়ের শিকড় (সার্বক্ষণিক চলমান শরীরত্বের বিধানকে আঁকড়ে ধরে) কামড়ে পড়ে থাকো。
টিকাঃ
[২৪১] সুনানু আবু দাউদ, খণ্ড: ১১, পৃষ্ঠা: ৩৩৮, হাদিস: ৩৮৯৯。
📄 হত্যাকারী ও নিহত দুজনই যখন জাহান্নামি
আহনাফ ইবনু কাইস বলেন, আমি এই লোককে (হজরত আসিফ বিন দিফদুও করে) খুঁজতে বের হলাম। পথে আবু বাকরাহ সাথে সাক্ষাৎ হলো। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, আহনাফ! কোথায় যাচ্ছেন? বললাম, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চাচাতো ভাই আলিকে সাহায্য করতে চাই। তিনি আমাকে বললেন, আহনাফ ফিরে যাও! কারণ, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি—
إِذَا تَوَاجَهَ الْمُسْلِمَانِ بِسَيْفَيْهِمَا فَالْقَاتِلُ وَالْمَقْتُولُ فِي النَّارِ.
যখন মুসলিম দুজন (দুনিয়ার স্বার্থে) তলোয়ার নিয়ে মুখোমুখি হবে, তখন হত্যাকারী এবং নিহত দুজনই জাহান্নামে যাবে。
আমি বললাম বা বলা হলো—হে আল্লাহর রাসূল, হত্যাকারীর বিষয়টি তো বুঝলাম, কিন্তু নিহত ব্যক্তির কী দোষ? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জবাব দিলেন—
إِنَّهُ قَدْ أَرَادَ قَتْلَ صَاحِبِهِ.
সে তার সাথীকে হত্যার ইচ্ছা করেছে。
কোনো বর্ণনায় হাদিসের এই অংশটির শব্দ এরকম আছে—
إِنَّهُ كَانَ حَرِيصًا عَلَى قَتْلَ صَاحِبِهِ.
সে তার ভাইকে হত্যা করতে উদ্যোগী ছিল。
দ্রষ্টব্য: উলামায়ে কিরাম বলেছেন, উপরের হাদিসটি নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবিদের ব্যাপারে প্রযোজ্য নয়। প্রমাণ হিসাবে তারা এই আয়াতটি পেশ করেছেন—
وَ إِنْ طَاۤئِفَتَانِ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ اقْتَتَلُوْا فَاَصْلِحُوْا بَيْنَهُمَا ۚ فَاِنْ بَغَتْ اِحْدٰهُمَا عَلَى الْاُخْرٰى فَقَاتِلُوا الَّتِيْ تَبْغِيْ حَتّٰى تَفِيْٓءَ اِلٰى اَمْرِ اللّٰهِ.
যদি মুমিনদের দুই দল যুদ্ধ লিপ্ত হয়ে পড়ে, তবে তোমরা তাদের মধ্যে মীমাংসা করে দেবে। তারপর যদি তাদের একদল অপর দলের ওপর চড়াও হয়, তবে তোমরা আক্রমণকারী দলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে; যে পর্যন্ত না তারা আল্লাহর নির্দেশের দিকে ফিরে আসে। [সূরা হুজুরাত, আয়াত: ৯]
নোট: এই আয়াতে সীমালঙ্ঘনকারী দলের সঙ্গে যুদ্ধ করার নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে। যদি মুসলিমরা বিদ্রোহিদেরকে প্রতিরোধ করার যুদ্ধে শরিক না হয়, তাহলে আল্লাহ তায়ালার দেওয়া একটি ফরয অকেজো হয়ে পড়বে। যা প্রমাণ করে যে, হাদিসে বর্ণিত ‘হত্যাকারী এবং নিহত উভয়েই জাহান্নামি হবে’ বিধানটি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবাদেরকে কোরাণের ব্যাপারে প্রযোজ্য নয়। কারণ, তাঁরা কোরআন কায়িমের ব্যাপারে আনুগত্যই যুদ্ধ করেছেন。
সুতরাং সাহাবায়ে কেরামের সম্মান করা, তাদের পদস্খলন নিয়ে সমালোচনা না করা, তাদের সৌন্দর্য প্রচার করা মুসলিমদের ওপর ওয়াজিব। কারণ, আল্লাহ তায়ালা স্বয়ং তাঁর কিতাবে সাহাবায়ে কেরামের প্রশংসা করেছেন। ইরশাদ হয়েছে—
لَقَدْ رَضِيَ اللّٰهُ عَنِ الْمُؤْمِنِينَ إِذْ يُبَايِعُونَكَ تَحْتَ الشَّجَرَةِ.
আল্লাহ মুমিনদের প্রতি সন্তুষ্ট হলেন যখন তারা বৃক্ষের নিচে আপনার কাছে শপথ করল। [সূরা ফাতাহ, আয়াত: ১৮]
অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে—
مُّحَمَّدٌ رَّسُوْلُ اللّٰهِ ؕ وَ الَّذِيْنَ مَعَهٗ اَشِدَّاۤءُ عَلَى الْكُفَّارِ رُحَمَاۤءُ بَيْنَهُمْ تَرٰىهُمْ رُكَّعًا سُجَّدًا يَّبْتَغُوْنَ فَضْلًا مِّنَ اللّٰهِ وَ رِضْوَانًا ۫ سِيْمَاهُمْ فِيْ وُجُوْهِهِمْ مِّنْ اَثَرِ السُّجُوْدِ ؕ ذٰلِكَ مَثَلُهُمْ فِي التَّوْرٰىةِ ۫ وَ مَثَلُهُمْ فِي الْاِنْجِيْلِ ۫ كَزَرْعٍ اَخْرَجَ شَطْـَٔهٗ فَاٰزَرَهٗ فَاسْتَغْلَظَ فَاسْتَوٰى عَلٰى سُوْقِهٖ يُعْجِبُ الزُّرَّاعَ لِيَغِيْظَ بِهِمُ الْكُفَّارَ ؕ وَعَدَ اللّٰهُ الَّذِيْنَ اٰمَنُوْا وَعَمِلُوا الصّٰلِحٰتِ مِنْهُمْ مَّغْفِرَةً وَّ اَجْرًا عَظِيْمًا.
আল্লাহর রাসূল মুহাম্মাদ এবং তাঁর সহচরগণ কাফিরদের প্রতি কঠোর, নিজেদের মধ্যে পরস্পর সহানুভূতিশীল। আল্লাহর অনুগ্রহ ও সন্তুষ্টি কামনায় আপনি তাদেরকে রুকু ও সিজদারত দেখবেন। তাদের অবয়বে রয়েছে সিজদার চিহ্ন। তাওরাতে এবং ইঞ্জিলে তাদের অবস্থার বিবরণ রয়েছে—যেমন একটি চারা গাছ, যা থেকে নির্গত হয় কঁচিপাতা, অতঃপর তা শক্ত ও মজবুত হয় এবং কাণ্ডের ওপর দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে থাকে। আনন্দে অভিভূত করে, যাতে আল্লাহ তাদের দ্বারা কাফিরদের অন্তর্জ্বালা সৃষ্টি করেন। তাদের মধ্যে যারা বিশ্বাস স্থাপন করে এবং সৎকর্ম করে, আল্লাহ তাদের ক্ষমা ও মহাপুরস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। [সূরা ফাতাহ, আয়াত: ২৯]
আরও ইরশাদ হয়েছে—
لَا يَسْتَوِيْ مِنْكُمْ مَّنْ اَنْفَقَ مِنْ قَبْلِ الْفَتْحِ وَ قٰتَلَ ؕ اُولٰۤئِكَ اَعْظَمُ دَرَجَةً مِّنَ الَّذِيْنَ اَنْفَقُوْا مِنْ بَعْدُ وَ قٰتَلُوْا ؕ وَ كُلًّا وَّعَدَ اللّٰهُ الْحُسْنٰى.
তোমাদের মধ্যে যে মক্কা বিজয়ের পূর্বে ব্যয় করেছে ও জিহাদ করেছে, সে সমান নয়; এরূপ লোকদের মর্যাদা তাদের চেয়ে অনেক বেশি—যারা পরে ব্যয় করেছে ও জিহাদ করেছে; তবে আল্লাহ উভয়কে কল্যাণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। [সূরা হাদিদ, আয়াত: ১০]
তাদের মধ্যে যারা ফিতরা দিয়ে পোশন করেছেন—তারা ছিলেন মজুর ও অক্ষম। যদিও তাদের কেউ কেউ অন্য কাজও চেয়ে উত্তম অগ্রগামী।
কেউ কেউ বলেছেন, যেসব সাহাবায়ে কিরাম নবিজির আলোচিত হাদিসটিকে ব্যাপক অর্থে গ্রহণ করে যুদ্ধ থেকে বিরত থেকেছেন, তাদের অনেকেই পরবর্তী সময়ে জিহাদ ত্যাগ করার কারণে লজ্জিত হয়েছেন। যেমন হজরত আবদুল্লাহ ইবনু উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুমা। তিনি হজরত আলি রাদিয়াল্লাহু আনহুকে সাহায্য না করার কারণে লজ্জিত হয়েছেন। মুকাতিল ইবনু মালিহিন—কোনো বস্তুর কারণে আমি এত বেশি পরিতাপ করি না বিদ্রোহী দলের—হজরত মুয়াবিয়া রাদিয়াল্লাহু আনহুর দলের বিরুদ্ধে যুদ্ধে শরিক না হওয়ার কারণে যতটা পরিতাপ করি। আর এটা বিশুদ্ধ কথা যে—যখন কোনো বিদ্রোহী দলের বিদ্রোহের বিষয়টি স্পষ্ট হবে, তখন তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে হবে।
টিকাঃ
[১৬১] সহিহ মুসলিম, খণ্ড: ২, পৃষ্ঠা: ৩৫-৬, হাদিস: ৫৪৩৪。
[১৬২] সহিহ মুসলিম, খণ্ড: ১৪, পৃষ্ঠা: ৬২, হাদিস: ৫১৩৯। হজরত আবু বাকরাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু সাহাবারো কেতাবের এই খণ্ডকে পার্থিব স্বার্থে ভেবেছিলেন। বিনা প্রকৃতপক্ষে তাদের দ্বন্দ্ব ছিল দ্বীনের বিধান নিয়ে। তাই তাদের এই দ্বন্দ্বকে আলোচিত হাদিসের শামিল মনে করা যাবে না আর। বাকরার অবস্থান ছিল সতর্কতামূলক — অনুধাবক。
[১৬৩] সহিহ বুখারি, খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ৫৭, হাদিস: ৩০。
📄 আল্লাহ তাআলা এই উম্মতের পরস্পরের মাঝে যুদ্ধের ফায়সালা করেছেন
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন—
أَوْ يُلْبِسَكُمْ شِيَعًا وَيُذِيقَ بَعْضَكُمْ بَأْسَ بَعْضٍ
অথবা তোমাদেরকে দলে-উপদলে বিভক্ত করে সবাইকে মুখোমুখি করে দেবেন এবং একেক অন্যের ওপর আক্রমণের স্বাদ আস্বাদন করাবেন। [সূরা আনআম, আয়াত: ৬৫]
সাওয়ান রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন—
‘আল্লাহ তাআলা আমার সামনে গোটা জমিনকে সংকুচিত করে তুলে ধরলেন। সুতরাং আমি পৃথিবীর পূর্ব ও পশ্চিম পুরোটাই দেখতে পেলাম। আমার সামনে পৃথিবীর যতটুকু উপস্থাপন করা হয়েছে, আমার উম্মত সে পর্যন্ত পৌঁছাবে। আর আমাকে লাল ও সাদা দুটি খনি দান করা হয়েছে。
ইমাম ইবনু মাজাহ রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, খনি দুটি হলো স্বর্ণের ও রূপার。
অন্য বর্ণনায় আছে। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘আর আমি আমার রবের কাছে আবেদন করেছি, তিনি যেন আমার উম্মতকে দুর্ভিক্ষ দিয়ে ধ্বংস না করেন এবং নিজেদের বাহিরে থেকে এমন কোনো শত্রুকে যেন তাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া না হয়—যারা তাদের দল, রাজত্ব ও সম্মানকে ধ্বংস করে ফেলবে। আমার রব বলেছেন, হে মুহাম্মাদ! আমি এমন ফায়সালা করেছি, যা প্রত্যাহার করা যাবে না। আমি তোমার উম্মতকে দুটি বিষয় দান করলাম—তাদের দুর্ভিক্ষ দিয়ে ধ্বংস করব না, তাদের ওপর এমন শত্রুকে চাপিয়ে দেবো না—যারা তাদের দল, রাজত্ব এবং সম্মান সবকিছুর নাশ ঘটাবে, যদিও তারা মুসলিম উম্মাহর পরিধির অভ্যন্তরে ঢুকে পড়ে। তবে পরিশেষে মুসলিমরা পরস্পরকে ধ্বংস করবে এবং পরস্পরকে গালি দেবে。
সাআদ ইবনু আব ওয়াক্কাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদিন আলিয়া অঞ্চল থেকে বা সাহাবারা কেরামের একটি দলের কাছ থেকে এলেন। একপর্যায়ে যখন তিনি হজরত মুয়াবিয়া রাদিয়াল্লাহু আনহু কর্তৃক নির্মিত মসজিদ আজিম অতিক্রম করলেন, সেখানে প্রবেশ করে দু রাকাত নামাজ আদায় করলেন। আমরাও তাঁর সঙ্গে নামাজ আদায় করলাম। অতঃপর নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর রবের কাছে দীর্ঘ দুআ করলেন। তারপর আমাদের দিকে ফিরে বললেন,
‘আমার রবের কাছে আমি তিনটি বিষয় আবেদন করেছি, তিনি দুটি দান করেছেন এবং একটি প্রত্যাখ্যান করেছেন। আমি আবেদন করেছি, আমার উম্মতকে যেন দুর্ভিক্ষে সমূহ ধ্বংস না করা হয়; তিনি আমাকে দান করেছেন। আমি আবেদন করেছি, আমার উম্মতকে যেন ডুবিয়ে ধ্বংস করা না হয়; তিনি আমাকে দান করেছেন। আমি আবেদন করেছি, আমার উম্মত যেন পরস্পরকে যুদ্ধ না করে; সুতরাং এটা প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে।’
টিকাঃ
[১৬৪] সহিহ মুসলিম, খণ্ড: ১৪, পৃষ্ঠা: ৩৯, হাদিস: ৫১৪৪。
[১৬৫] সুনানু ইবনু মাজাহ, খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ৪৪, হাদিস: ৫১৪১。
[১৬৬] সহিহ মুসলিম, খণ্ড: ১৪, পৃষ্ঠা: ৪২, হাদিস: ৫১৪৫。
[১৬৭] সহিহ মুসলিম, খণ্ড: ১৪, পৃষ্ঠা: ৪৩, হাদিস: ৫১৪১。