📄 প্রতিটি মুহূর্ত হবে ভয়াবহ
জুবাইর ইবনু আদি বলেন, আমরা হজরত আনাস ইবনু মালিক রাদিয়াল্লাহু আনহুর কাছে হাজির হয়ে আমাদের সঙ্গে হাজ্জাজের আচরণ সম্পর্কে অভিযোগ করলাম। জবাবে তিনি বললেন,
'ধৈর্যধারণ করো। কারণ, তোমাদের ওপর অতিবাহিত প্রতিটি মুহূর্ত পূর্বের চেয়ে বেশি অনিষ্টকর হবে এবং এমন একসময় তোমরা তোমাদের রবের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবে। আমি এভাবেই নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছ থেকে শুনেছি।’
আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন—'সময় খুব দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলবে (বছরকে মনে হবে মাসের মতো), আমল হ্রাস পাবে, সুদের প্রচলন ঘটবে, ফিতনা ছড়িয়ে পড়বে, ফরজ বৃদ্ধি হবে। সাহাবায়ে কিরাম আরজ করলেন, ফরজ কী? নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হত্যা।’
ব্যাখ্যা: হাদিসের বাক্য—'সময় খুব দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলবে'—নর্ম সম্পর্কে—কেউ বলেছেন, হায়াতও কমে যাবে, বরকতও হ্রাস পাবে। কেউ বলেছেন, কিয়ামাত নিকটবর্তী হওয়া। কেউ বলেছেন, দিনের সময় হ্রাস পাওয়া। যেমন হাদিসে বর্ণিত আছে, "আনাস ইবনু মালিক রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ততক্ষণ পর্যন্ত কিয়ামত সংঘটিত হবে না, যতক্ষণ সময়ের গতি বৃদ্ধি না পাবে। সুতরাং বছর হবে মাসের মতো, মাস হবে সপ্তাহের মতো, সপ্তাহ হবে দিনের মতো, দিন হবে ঘণ্টার মতো এবং ঘণ্টা হবে খেজুর বৃক্ষের ডাল পড়ার সময়ের মতো।"
টিকাঃ
[৩০১] সহীহ মুসলিম, খণ্ড: ১৪, পৃষ্ঠা: ১৫৭, হাদিস: ৬১২১。
[৩০২] সহীহুল বুখারি, খণ্ড: ৭, পৃষ্ঠা: ৪৩৭, হাদিস: ১৯৪১। তিরমিযী ইমাম তিরমিযীও বর্ণনা করে বলেছেন—সহীহ。
[৩০৩] সহীহ মুসলিম, খণ্ড: ১৫, পৃষ্ঠা: ১০৩, হাদিস: ৯৯৭৬。
[৩০৪] সুনানুত তিরমিজি, খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ০২১, হাদিস: ২২৭৭。
📄 ফিতনা থেকে পলায়ন
আবু সাঈদ খুদরি রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন—
يُوشِكُ أَنْ يَكُونَ خَيْرَ مَالِ الْمُسْلِمِ غَنَمٌ يَتْبَعُ بِهَا شَعَفَ الْجِبَالِ وَمَوَاقِعَ الْقَطْرِ يَفِرُّ بِدِينِهِ مِنَ الْفِتَنِ.
অতিসত্বর মুসলিমদের সবচেয়ে উত্তম সম্পদ হবে ছাগল। সেগুলো নিয়ে পাহাড়ের চূড়ায় ওঠবে ও পানি জমা হওয়ার স্থানে যাবে এবং নিজের দ্বীনকে সঙ্গে নিয়ে ফিতনা থেকে বেঁচে পালাবে।’
আবু বাকরা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন— 'অতিসত্বর ফিতনা হবে! সাবধান! তারপর আবার ফিতনা হবে। সেসময় উপবিষ্ট ব্যক্তি চলন্ত ব্যক্তির চেয়ে উত্তম হবে, চলন্ত ব্যক্তি ফিতনার দিকে দৌড়রত ব্যক্তির চেয়ে উত্তম হবে। সাবধান! যখন ফিতনা আবির্ভূত হবে, তখন যে ব্যক্তিরা উট থাকবে সে যেন উটের সঙ্গে লেগে থাকে, যার ছাগল থাকবে সে যেন ছাগলের সঙ্গে লেগে থাকে। যার জমিন থাকবে সে যেন জমিনের সঙ্গে লেগে থাকে। হজরত আবু বাকরা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, তখন জনৈক ব্যক্তি বলল, হে আল্লাহর রাসূল! যার উট নেই, ছাগল নেই এবং জমিও নেই; তার ব্যাপারে আপনার নির্দেশনা কী? নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জবাব দিলেন—সে তার তলোয়ারের ওপর ভরসা করবে। পাথর দ্বারা তলোয়ার ধার করবে, তারপর সাধ্যমতো (ফিতনা থেকে) মুক্তির জন্য চেষ্টা করবে। হে আল্লাহ, আমি কি পৌঁছিয়েছি? হে আল্লাহ, আমি কি পৌঁছিয়েছি? হে আল্লাহ, আমি কি পৌঁছিয়েছি? বর্ণনাকারী বলেন, তখন জনৈক ব্যক্তি বলল, হে আল্লাহর রাসূল, যদি আমাকে জোরপূর্বক কোনো এক কাতারে বা কোনো এক দলে নিয়ে যাওয়া হয়, তারপর একজন আমাকে তলোয়ার দ্বারা আঘাত করে, বা অন্য কোনোভাবে আঘাত লেগে আমি নিহত হই, তাহলে আমার ব্যাপারে আপনার মন্তব্য কী? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জবাব দিলেন, হত্যাকারী নিজের ও তোমার গুনাহের দায়ভার বহন করবে এবং জাহান্নামি হবে।’
টিকাঃ
[৩০৫] সুনানু ইবনু মাজাহ, খণ্ড: ৬, পৃষ্ঠা: ৪৬, হাদিস: ১২০০。
📄 ফিতনার সময় ঘরে থাকুন
আবু মুসা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন—
إِنَّ بَيْنَ أَيْدِيكُمْ فِتَنًا كَقِطَعِ اللَّيْلِ الْمُظْلِمِ يُصْبِحُ الرَّجُلُ فِيهَا مُؤْمِنًا وَيُمْسِي فَاجِرًا الْقَاعِدُ فِيهَا خَيْرٌ مِنَ الْقَائِمِ وَالْقَائِمُ فِيهَا خَيْرٌ مِنَ السَّاعِي وَالسَّاعِي فِيهَا خَيْرٌ مِنَ الْمَاشِي قَالُوا فَمَا تَأْمُرُنَا قَالَ كُونُوا أَحْلَاسَ بُيُوتِكُمْ.
নিশ্চয় ফিতনা তোমাদের সামনে অন্ধকার রাতের মতো ধেয়ে আসবে। তখন মানুষ সকালে থাকবে মুমিন সন্ধ্যায় হবে কাফির। সেসময় উপবিষ্ট ব্যক্তি দণ্ডায়মান ব্যক্তির চেয়ে উত্তম হবে। দণ্ডায়মান ব্যক্তি চলমান মানুষের চেয়ে উত্তম হবে। চলমান মানুষ দৌড়রত মানুষের চেয়ে উৎকৃষ্ট হবে। সাহাবায়ে কিরাম আরজ করলেন, আপনি আমাদেরকে কী নির্দেশ দিচ্ছেন? নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমরা নিজেদের ঘরের সঙ্গে লেগে থাকো。
নোট: উলামায়ে কিরাম বলেছেন, মুহাম্মাদ ইবনু মাসলামা রাদিয়াল্লাহু আনহু সাহাবায়ে কিরামের মাঝে সংঘটিত বিরোধ ও যুদ্ধগুলো থেকে দূরে সরে থাকতেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে নির্দেশ দিয়েছিলেন—যখন এ ধরনের ঘটনা ঘটবে, তখন সে যেন কাটের তলোয়ার ধারণ করে। সুতরাং তিনি এমনটিই করেছেন ও গৃহবন্দি হয়ে বসে থেকেছেন। তিনি সেসব লোকদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন—যারা ফিতনা থেকে দূরে থেকেছেন। যেমন হযরত আবু বাকরাহ, আবদুল্লাহ ইবনু উমর, উসামা ইবনু জাঈদ, আবু জুররা, হুযাইফা, ইমরান ইবনু হুসাইন, আবু মূসা, আবান ইবনু সহুকি, সাআদ ইবনু আবূ ওয়াক্কাস প্রমুখ সাহাবায়ে কিরাম রাদিয়াল্লাহু আনহুম। তাবিয়িনগণের মাঝে ফিতনা থেকে দূরে ছিলেন—শুরাইহ, নাখাঈ প্রমুখ রাদিয়াল্লাহু আনহুম।
আমি (লেখক) বলব, সেই ফিতনা ও যুদ্ধ তাদের মাঝে ইজতিহাদের ওপর ভিত্তি করে। তাদের মধ্যে যারা বিশুদ্ধ ছিলেন, তারা দেখেছেন দু’নেকি আর পদস্থলের শিকার মুজতাহিদিন পেয়েছেন এক নেকি। তাদের পরস্পরের মায়ের এই যুদ্ধ ছিল দ্বীনকে কেন্দ্র করে। আজকে যারা প্রবৃত্তির দাসত্ব করে রাজত্বের আশায় এবং জাগতিক ঐশ্বর্য লাভ করার জন্য রক্তপাত ঘটায় তাদের অবস্থা কী হবে? (জালামা ছাড়া আর কী হতে পারে।) সুতরাং মানুষের জন্য জরুরি হলো—ফিতনা প্রকাশের সময়, মুসিবত ও কষ্টের সময় হাত ও মুখ বন্ধ রাখা।
আল্লাহর কাছে আমরা চাচ্ছি শান্তি এবং পরকালে সম্মানের ঘর।
আর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নির্দেশ—সবাই ঘরের সঙ্গে লেগে থাকো, ঘরে অবস্থান করো—এর মাধ্যমে ঘরবন্দি থাকতে এবং ঘরে অবস্থান করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যেন সে মানুষ থেকে এবং মানুষেরা তার কাছ থেকে নিরাপদ থাকে。
টিকাঃ
[৩০৬] সহীহ মুসলিম, খণ্ড: ১৫, পৃষ্ঠা: ১০২, হাদিস: ৯৯৬১。
📄 ফিতনার দিনে করণীয়-বর্জনীয়
আবু মূসা আশআরি রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন—
إِنَّ بَيْنَ يَدَيْ السَّاعَةِ فِتَنًا كَقِطَعِ اللَّيْلِ الْمُظْلِمِ يُصْبِحُ الرَّجُلُ فِيهَا مُؤْمِنًا وَيُمْسِي كَافِرًا وَيُمْسِي مُؤْمِنًا وَيُصْبِحُ كَافِرًا الْقَاعِدُ فِيهَا خَيْرٌ مِنْ الْقَائِمِ وَالْقَائِمُ فِيهَا خَيْرٌ مِنْ الْمَاشِي وَالْمَاشِي فِيهَا خَيْرٌ مِنْ السَّاعِي فَكَسِّرُوا فِيهَا سُيُوفَكُمْ وَقَطِّعُوا أَوْتَارَكُمْ وَاضْرِبُوا بِسُيُوفِكُمْ الْحِجَارَةَ فَإِنْ دَخَلَ عَلَى أَحَدِكُمْ فَلْيَكُنْ كَخَيْرِ ابْنَيْ آدَمَ.
নিশ্চয় ফিতনা তোমাদের সামনে অন্ধকার রাতের মতো হেলে আসবে। তখন মানুষ সকালে থাকবে মুমিন, সন্ধ্যায় হবে কাফিরা। সন্ধ্যায় উপস্থিত ব্যক্তি দণ্ডায়মান ব্যক্তির চেয়ে উত্তম হবে। দণ্ডায়মান ব্যক্তি চলমান মানুষের চেয়ে ভালো হবে। চলমান মানুষ দৌড়াও মানুষের চেয়ে উৎকৃষ্ট হবে। অতএব, তোমাদের ধনুকের রশি ছিঁড়ে ফেলো, ধনুক ভেঙে ফেলো এবং তলোয়ার দিয়ে পাথরে আঘাত করো। তারপরও যদি কারও ওপর ফিতনা এসে পড়ে, তাহলে সে যেন আদম আলাইহিস সালামের দুই সন্তানের মধ্য থেকে উত্তমটির (হাবিলের) মতো (নিহত) হয় (অন্যের ওপর আঘাত না করে)。
আবদুল্লাহ ইবনু উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন—
‘নিকট ভবিষ্যতে তোমাদের অবস্থা কেমন হবে? সেসময় মানুষ গন্ডগোলকে নষ্টই বর্বর মতো ভেসে যাবে। তাদের প্রতিপত্তিগুলো ভেঙে যাবে, আমানতগুলো গুরুত্বহীন হয়ে পড়বে এবং পরস্পরের মতবিরোধিয়ে জড়িয়ে পড়বে। তারা এভাবে বহুদর্শী আন্তরিকতায় আক্রান্ত হবে, বলেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার এক হাতে আঙুলগুলো অন্য হাতের আঙুলগুলোর মাঝে ঢোকালেন। সাহাবায়ে কিরাম বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! সেসময় আমাদের কী অবস্থা হবে? নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমরা চেনা বস্তুকে গ্রহণ করবে, অচেনা বস্তুকে পরিহার করবে, নিজেদের বিবেচনাজ্ঞানকে প্রতি অগ্রবর্তী হবে এবং সাধারণদের বিশ্বাসগুলোকে ছেড়ে দেবে।’
টিকাঃ
[২৩৯] সুনানু আবু দাউদ, খণ্ড: ১১, পৃষ্ঠা: ৩৩১, হাদিস: ৩৮৯৯। হাদিসে উল্লিখিত أَغْمِدُوْ سُيُوْفَكُمْ অর্থাৎ মূল অর্থ হলো—উটের পিঠের সঙ্গে লাগানো খড়গাচ্ছের নিচের কাপড়টি এমনত কাপড় অর্থে বলা হয়েছে—উটের এই কাপড়ের মতো নিজেদের ঘরের সঙ্গে লাগিয়ে রাখো। এ/শুল্লর ম/অর্ঘ অবস্নবে অর্থটি করা হয়েছে—অগ্লবন্ধক。
[২৪০] সুনানু ইবনু মাজাহ, খণ্ড: ১১, পৃষ্ঠা: ৪৫৫, হাদিস: ৩৯৬১; সুনানু আবু দাউদ, খণ্ড: ১১, পৃষ্ঠা: ৩৩৭, হাদিস: ৩৮৯৮। আবদুন নিফাওই আবদুন মারুন শরাহে আবু দাউদ অনবুলন— খণ্ড: ২, পৃষ্ঠা: ২১৯, হাদিস: ৩৮৯৫। –অনুবাদ
[২৪১] সুনানু ইবনু মাজাহ, খণ্ড: ১১, পৃষ্ঠা: ৪৫১, হাদিস: ৩৯৪৬; সুনানু আবু দাউদ, খণ্ড: ১১, পৃষ্ঠা: ৩৩৭, হাদিস: ৩৯২১。