📄 জান্নাতিদের আল্লাহ্র সন্তুষ্টি
আবু সাঈদ খুদরি রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন—
‘আল্লাহ তাআলা জান্নাতিদেরকে ডাকবেন, হে জান্নাতিরা! তারা বলবে, হে আমাদের রব! আমরা উপস্থিত। আল্লাহ বলবেন, তোমরা কি সন্তুষ্ট? তারা বলবে, তুমি আমাদেরকে এমন সব নিয়ম দান করেছ, যা তোমার অন্য কোনো সৃষ্টিকেই দাওনি, তাই সন্তুষ্ট না হওয়ার কী আছে?! তখন আল্লাহ বলবেন, আমি তোমাদেরকে এর চেয়েও উত্তম কিছু দেবো! তারা বলবে, হে আমাদের রব, এগুলোর চেয়ে উত্তম বস্তু কী আছে? তখন আল্লাহ তাআলা বলবেন, তোমাদের জন্য আমার সন্তুষ্টি প্রদান করব, সুতরাং আর কখনো অসন্তুষ্ট হব না।’
টিকাঃ
[২৪২] সহিহুল বুখারি, খণ্ড: ২০, পৃষ্ঠা: ২১৩, হাদিস: ৬৫৭১。
📄 জান্নাতিদের জন্য সবচেয়ে বড় নিয়ামত হবে ‘আল্লাহর দিদার’
সুহাইব রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বর্ণনা করেছেন—
إِذَا دَخَلَ أَهْلُ الْجَنَّةِ الْجَنَّةَ قَالَ يَقُولُ اللَّهُ تَبَارَكَ وَتَعَالَى تُرِيدُونَ شَيْئًا أَزِيدُكُمْ فَيَقُولُونَ أَلَمْ تُبَيِّضُ وُجُوهَنَا أَلَمْ تُدْخِلْنَا الْجَنَّةَ وَتُنَجِّنَا مِنَ النَّارِ قَالَ فَيُكْشَفُ الْحِجَابُ فَمَا أَعْطُوا شَيْئًا أَحَبَّ إِلَيْهِمْ مِنَ النَّظَرِ إِلَى رَبِّهِمْ عَزَّ وَجَلَّ
যখন জান্নাতিরা জান্নাতে প্রবেশ করবে, আল্লাহ তাআলা বলবেন, তোমরা কিছু চাও—যা আমি বাড়িয়ে দেবো? তারা বলবে, আপনি কি আমাদের মুখাবয়ব শুভ্র করে দেননি? আমাদেরকে কি জান্নাতে প্রবেশ করাননি? জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেননি? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তখন আল্লাহ তাআলা বলবেন, তোমার জন্য দিদার স্বরূপ বড় পর্দা দেবেন। (তখন তারা আল্লাহর দিদার লাভে ধন্য হবে।) জান্নাতিদেরকে আল্লাহর দিদারের চেয়ে প্রিয় কোনো বস্তু প্রদান করা হয়নি。
সুহাইব রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, ‘রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই আয়াতটি পড়লেন—‘যারা সৎকর্ম করেছে তাদের জন্য রয়েছে কল্যাণ এবং তারচেয়েও বেশি’ [সূরা ইউনুস, আয়াত: ২৬] তারপর বললেন, যখন জান্নাতিরা জান্নাতে এবং জাহান্নামি জান্নামে প্রবেশ করবে, একজন ঘোষক ঘোষণা করবেন, হে জান্নাতিরা! আল্লাহর পক্ষ থেকে তোমাদের সঙ্গে একটি প্রতিশ্রুতি দেওয়া আছে, তিনি এখন সেই প্রতিশ্রুতিটি তোমাদের সঙ্গে পূর্ণ করতে চান। তারা বলবে, তিনি কি আমাদের মুখাবয়ব শুভ্র করেননি? আমাদের আমলনামা কি ভারি করে দেননি? আমাদেরকে তিনি কি জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেননি? ঘোষক বলবেন, তখন পর্দা সরিয়ে ফেলা হবে, সুতরাং জান্নাতিরা আল্লাহকে দেখবে। আল্লাহর কসম, তিনি জান্নাতিদেরকে তার দিদারের চেয়ে প্রিয় এবং তাদের চক্ষু শীতলকারী কোনো নিআমত দান করেননি।’
জাবির ইবনু আব্দুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমরা এক পূর্ণিমার রাতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছেই ছিলাম, তিনি হঠাৎ চাঁদের দিকে তাকালেন— ‘তারপর বললেন, তোমরা যেভাবে চাঁদ দেখছ এবং দেখতে কোনো সমস্যা হচ্ছে না, ঠিক এমনিভাবে তোমরা তোমাদের রবকে দেখতে পারবে। যদি তোমরা এই নিআমত থেকে বঞ্চিত না হতে চাও, তাহলে ফজর আর আসরের নামাজ পড়ো। তারপর এই আয়াত তিলাওয়াত করলেন ‘এবং সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের পূর্বে আপনার পালনকর্তার প্রশংসা পবিত্রতা ঘোষণা করুন’ (ফজর ও আসরের নামাজ পড়ো)। [সূরা ক্বফ, আয়াত : ৩৯]
টিকাঃ
[২৪৩] সহিহ মুসলিম, খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ৪২৭, হাদিস: ১৮১。
[২৪৪] সহিহুল মুসলিম, খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ২৬১, হাদিস: ১৮১。
[২৪৫] সহিহুল বুখারি, খণ্ড: ২, পৃষ্ঠা: ৩৯১, হাদিস: ৫২১; সহিহ মুসলিম, খণ্ড: ৩, পৃষ্ঠা: ০৩৬, হাদিস: ৬৩৩。
📄 পিতা-মাতার আগে সন্তানের মৃত্যুর উপহার
আবু হাসসান বলেন, আমি হজরত আবু হুরাইরাকে বললাম, আমার দুটি পুত্রসন্তান মারা গেছে। তো আপনি কি এ ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে এমন কোনো হাদিস শোনাতে পারবেন—যা আমাদের হৃদয়কে প্রশান্ত করে? হজরত আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, হ্যাঁ, পারব। তারপর বললেন—
‘ছোট সন্তান তাদের পরিবারকে জান্নাতে প্রবেশ করানোর জন্য তাদের সঙ্গে লেগে থাকবে। তাদের একজন তাদের পিতা বা পিতা-মাতার উভয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তার কাপড় বা হাত ধরবে, ঠিক আমি যেভাবে তোমার কাপড়ের আঁচল ধরে আছি। এভাবে আল্লাহ তাআলা তাকে এবং তার পিতাকে (বা পিতা-মাতাকে) জান্নাতে প্রবেশ না করানো পর্যন্ত ছেড়ে দেবে না।’
জ্ঞাতব্য: এই অধ্যায়টি প্রমাণ করে যে, মুমিনদের ছোট সন্তানেরা জান্নাতে রয়েছে। এটা এই অধিকাংশ আলিমদের মতামত। যেমন আমরা আলোচনা করে এসেছি। দলিল হিসাবে নিম্নোক্ত আয়াত তিলাওয়াত করা হয়—
وَالَّذِينَ آمَنُوا وَاتَّبَعَتْهُمْ ذُرِّيَّتُهُمْ بِإِيمَانٍ أَلْحَقْنَا بِهِمْ ذُرِّيَّتَهُمْ
যারা ঈমানদার এবং তাদের সন্তানেরা ঈমানে তাদের অনুগামী, আমি তাদেরকে তাদের পিতাপুরুদের সঙ্গে মিলিত করে দেবো। [সূরা তূর, আয়াত: ২১] তবে কিছু আলিম-এর বিপরীত মতও প্রদান করেছেন; তবে এই বিপরীত মতমত নবিবংশের সন্তানদের ব্যাপারে নয়। কারণ, এটা ইজমা দ্বারা প্রমাণিত যে, নবিবংশের মৃত ছোট সন্তানেরা জান্নাতে অবস্থান করছেন।
আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন—
مَنْ مَاتَ لَهُ ثَلَاثَةٌ مِنَ الْوَلَدِ لَمْ يَبْلُغُوا الْحِنْثَ كَانَ لَهُ حِجَابًا مِنَ النَّارِ أَوْ دَخَلَ الْجَنَّةَ
যে ব্যক্তির তিনটি সন্তান নাবালেগ অবস্থায় মারা গেল, সেই সন্তান তার জাহান্নামের পথে অন্তরায় হবে কিংবা তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবে。
আবু উমর আব্দুল বার বলেন, মুসলিম উলামায়ে কিরাম এ-বিষয়ে একমত যে, মুসলিমদের শিশুসন্তানেরা জান্নাতি। কেবল জাবারিয়া সম্প্রদায়ের কিছু লোক ছাড়া কেউ বিপরীত কথা বলেনি। ইজমার বিপরীতে তাদের কথার কোনো গ্রহণযোগ্যতা নেই, তা প্রত্যাখ্যাত। তাদের অনুকরণ করে এমন ভুল কথা বলা জায়েজ নেই।
টিকাঃ
[২৪৬] সহিহুল বুখারি, খণ্ড: ১০, পৃষ্ঠা: ৪২, হাদিস: ৬৭৯১。
[২৪৭] সহিহুল বুখারি, খণ্ড: ২, পৃষ্ঠা: ১০০, হাদিস: ১২৫১。
📄 জান্নাতিদের প্রথম আপ্যায়ন ও উপঢৌকন
সাফওয়ান রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমি নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দরবারে উপস্থিত ছিলাম। ইতাবসরে জনৈক ইহুদি পাদরি তার কাছে এসে বলল, আসসালামু আলাইকা ইয়া মুহাম্মাদ! তৎক্ষণাৎ আমি তাকে এত জোরে ধাক্কা দিলাম যে, সে আছড়ে পড়ল। পাদরি আমাকে বলল, আমাকে ধাক্কা দিলে কেন? আমি বললাম, তুমি বলতে পারলে না—ইয়া রাসূলুল্লাহ? ইহুদি জবাব দিলো, আমি তাকে সেই নামেই ডেকেছি, তার পরিবারের লোকজন তাকে যে নামে ডাকে। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন—
إِنَّمَا شَيْخِي الَّذِي سَمَّانِي بِهِ أَهْلِي
নিশ্চয় আমার নাম মুহাম্মাদ। আমার পরিবার আমার এই নামই রেখেছে।
তখন ইহুদি বলল, আমি আপনার কাছে একটি বিষয় জিজ্ঞেস করতে এসেছি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন—
أَنَّمَا تَمْتَمَائِي إِنْ حَدَّثْتُكَ
আমি তোমার সঙ্গে কথা বললে কি তোমার কোনো উপকার হবে?
পাদরি বলল, আমি মনোযোগসহ শুনব। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার হাতে থাকা একটি কাঠি দিয়ে আঁক দিলেন। তারপর বললেন, জিজ্ঞেস করো! এরপর প্রশ্নোত্তর আরম্ভ হলো—
ইহুদির: যেদিন আকাশ ও জমিনকে অন্য আকাশ ও জমিনের দ্বারা পরিবর্তন করা হবে, সেদিন মানুষ কোথায় অবস্থান করবে?
নবিজি: পুনরুত্থানের কাজে আঁধারের মধ্যে।
ইহুদির: সর্বাগ্রে কাদেরকে জান্নাতে প্রবেশের অনুমতি প্রদান করা হবে?
নবিজি: গরিব মুহাজিরদেরকে।
ইহুদির: জান্নাতে প্রবেশ করার সময় তাদের উপঢৌকন কী হবে?
নবিজি: মাছের কলিজার ভুনা।
ইহুদির: এরপর তাদের খাবার কী হবে?
নবিজি: তাদের সৌজন্যে আশাহররত জান্নাতি গরুগুলো তাদের জন্য খাবার হবে।
ইহুদির: এগুলোর শুরূব-কওল কী হবে?
নবিজি: সালসাবিল নামক সেখানকার ঝরনার পানি।
ইহুদির: আপনি সত্য বলেছেন。
টিকাঃ
[২৪৮] সহিহ মুসলিম, খণ্ড: ২, পৃষ্ঠা: ১৯০, হাদিস: ৪৭০১。