📄 জান্নাতের দরজা রাইয়্যান ও রোজাদার
হজরত সাহাল ইবনু সাদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন—
إِنَّ فِي الْجَنَّةِ بَابًا يُقَالُ لَهُ الرَّيَّانُ يَدْخُلُ مِنْهُ الصَّائِمُونَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ لَا يَدْخُلُ مِنْهُ أَحَدٌ غَيْرُهُمْ يُقَالُ أَيْنَ الصَّائِمُونَ فَيَقُومُونَ لَا يَدْخُلُ مِنْهُ أَحَدٌ غَيْرُهُمْ فَإِذَا دَخَلُوا أُغْلِقَ فَلَمْ يَدْخُلْ مِنْهُ أَحَدٌ
জান্নাতে একটি দরজা আছে, যার নাম বলা হয় রাইয়ান; কিয়ামতের দিন এই দরজা দিয়ে রোজাদার ছাড়া কেউ প্রবেশ করতে পারবে না। বলা হবে, রোজাদাররা কোথায়? তখন রোজাদাররা দাঁড়াবে, তারা ছাড়া কেউ প্রবেশ করতে পারবে না। রোজাদাররা প্রবেশ করেছে বলে রুদ্ধ করে দেওয়া হবে, সুতরাং অন্য কেউ প্রবেশ করতে পারবে না。
হজরত আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু এর হাদিসে এসেছে, কিছু মানুষ এমন রয়েছে, যাদেরকে প্রতিটা দরজা থেকেই আহ্বান করা হবে। ডাকটা হবে উচ্চস্বরে এবং তাকে সমস্ত আনন্দের উপহার দেওয়া হবে। যেহেতু সে সমস্ত আমলই করেছে, তাই সবগুলোরই প্রতিদান পাবে। তারপর সেই দরজা দিয়ে প্রবেশ করবে, তার আমলের পরিমাণ যেহেতু বেশি হবে। আল্লাহই ভালো জানেন।
হজরত আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, 'রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিজ্ঞেস করলেন, আজ কে রোজা রেখেছো? হজরত আবু বকর বললেন, আমি। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবার জিজ্ঞেস করলেন, তোমাদের মধ্যে আজ কেউ জানাযায় শরিক হয়েছো? আবু বকর বললেন, আমি শরিক হয়েছি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবার প্রশ্ন করলেন, আজকে তোমাদের মধ্যে কে মিসকিনকে খানা খাইয়েছে? আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, আমি। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিজ্ঞেস করলেন, আজকে তোমাদের মধ্যে কে রোগীর শুশ্রূষা করেছে? হজরত আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, আমি। এবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, যার মাঝে এতগুলো আমল জমা হবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।’
টিকাঃ
[১০৩] সহীহুল বুখারী, খণ্ড: ৩, পৃষ্ঠা: ৪৩১, হাদিস: ১৮৯৩; সহীহ মুসলিম, খণ্ড: ৬, পৃষ্ঠা: ২০, হাদিস: ১৮৯৭。
[১০৪] সহীহ মুসলিম, খণ্ড: ৫, পৃষ্ঠা: ২২৬, হাদিস: ২৪০১。
📄 জান্নাতের স্তর
মুয়াজ ইবনু জাবাল রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি—
فِي الْجَنَّةِ مِائَةَ دَرَجَةٍ مَا بَيْنَ كُلِّ دَرَجَتَيْنِ كَمَا بَيْنَ السَّمَاءِ وَالْأَرْضِ وَالْفِرْدَوْسُ أَعْلَى الْجَنَّةِ وَأَوْسَطُهَا وَفَوْقَ ذَلِكَ عَرْشُ الرَّحْمَنِ وَمِنْهَا تَفَجَّرُ أَنْهَارُ الْجَنَّةِ فَإِذَا سَأَلْتُمُ اللَّهَ فَسَلُوهُ الْفِرْدَوْسَ.
জান্নাতে একশটি স্তর আছে। প্রত্যেক দুই স্তরের মাঝে আকাশ-জমিন সমান দূরত্ব থাকবে। জান্নাতুল ফিরদাউস উচ্চতায় জান্নাতের সর্বোচ্চ স্তরে আছে এবং অবস্থানগতভাবে সমস্ত জান্নাতের মাঝামাঝি আছে। এর ওপরেই আল্লাহর আরশ। আরশ থেকেই জান্নাতের নহরগুলো প্রবাহিত হবে। অতএব, যখন তোমরা আল্লাহর কাছে চাও, তার কাছে ফিরদাউস চাও。
আবদুল্লাহ ইবনু আমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন—
'কারিককে বলা হবে, পড়ো, ওপরে ওঠো এবং তারতিলসহ পড়ো, যেভাবে দুনিয়ায় পড়তে। কারণ, যেখানে পড়া শেষ সেখানেই হবে তোমার ঠিকানা।’
নোট: উলামায়ে কিরাম বলেছেন, কুরআন কারিমের বাহক এবং পাঠকগণ হলেন তারা—যারা কুরআনুল কারিমের বিধান মতো চলেন, হালাল-হারাম বেছে চলেন এবং কুরআন কারিমে যা আছে তা পালন করেন।
সহীহুল বুখারিতে আছে, 'যে মুমিন কুরআন পড়ে এবং তদনুযায়ী আমলে করে—সে হলো লেবুর মতো; তার স্বাদও সুন্দর এবং ঘ্রাণও মনোমুগ্ধকর। আর যে মুমিন কুরআন পড়ে না, তবে কুরআন অনুপাতে আমল করে—সে হলো খেজুরের মতো; যার স্বাদ সুস্বাদু কিন্তু ঘ্রাণ নেই。
টিকাঃ
[১০৫] সুনানুত তিরমিজি, খণ্ড: ৯, পৃষ্ঠা: ৭১, হাদিস: ২৪৯৯। নোট: ইবনু তিবরিজি রাদিয়াল্লাহু বলেছেন—হজরত আতা ইবনু ইয়াসার রাদিয়াল্লাহু হজরত মুয়াজ ইবনু জাবাল রাদিয়াল্লাহু আনহুএর সাক্ষাৎ পাননি। আমি বলব—হাদিসটি ইমাম বুখারি রাদিয়াল্লাহু হজরত আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণনা করেছেন সেই সনদটি মুত্তাসিল এবং সহীহ。
[১০৬] সুনানু আবি দাউদ, খণ্ড: ৪, পৃষ্ঠা: ২৫০, হাদিস: ১৪৬৪。
[১০৭] সহীহুল বুখারী, হাদিস: ৫০৫৯。
📄 জান্নাতের কক্ষ এবং সেগুলোর অধিকারী
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন—
لَكِنِ الَّذِينَ اتَّقَوْا رَبَّهُمْ لَهُمْ غُرَفٌ مِّن فَوْقِهَا غُرَفٌ مَبْنِيَّةٌ
কিন্তু যারা তাদের রবকে ভয় করে, তাদের জন্য রয়েছে প্রাসাদের পর প্রাসাদ। [সুরা জু্মার, আয়াত: ২০]
আল্লাহ তাআলা আরও ইরশাদ করেছেন—
إِنَّ الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ كَانَتْ لَهُمْ جَنَّاتُ الْفِرْدَوْسِ نُزُلًا خَالِدِينَ فِيهَا لَا يَبْغُونَ عَنْهَا حِوَلًا
যারা বিশ্বাস স্থাপন করে ও সৎকর্ম করে, তারা তাদের রবের বহুস্তর প্রতিদান পাবে এবং তারা সুউচ্চ প্রাসাদে নিরাপদে বসবাস করবে। [সুরা কাহাফ, আয়াত: ১০৭-১০৮]
আরও ইরশাদ হয়েছে—
أُوْلَئِكَ يُجْزَوْنَ الْغُرْفَةَ بِمَا صَبَرُوا
তাদেরকে তাদের সবরের প্রতিদানে জান্নাতে প্রাসাদ দেওয়া হবে। [সুরা ফুরকান, আয়াত: ৭৫]
সাহাল ইবনু সাআদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেছেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন—
إِنَّ أَهْلَ الْجَنَّةِ لَيَتَرَاءَوْنَ أَهْلَ الْغُرَفِ مِنْ فَوْقِهِمْ كَمَا تَتَرَاءَوْنَ الْكَوْكَبَ الدُّرِّيَّ الْغَابِرَ مِنَ الْأُفُقِ مِنَ الْمَشْرِقِ أَوِ الْمَغْرِبِ لِتَفَاضُلِ مَا بَيْنَهُمْ قَالُوا يَا رَسُولَ اللَّهِ تِلْكَ مَنَازِلُ الْأَنْبِيَاءِ لَا يَبْلُغُهَا غَيْرُهُمْ قَالَ بَلَى وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ رِجَالٌ آمَنُوا بِاللَّهِ وَصَدَّقُوا الْمُرْسَلِينَ.
জান্নাতিরা প্রাসাদবাসীদেরকে তাদের ওপরে দেখতে পাবে, যেভাবে তোমরা তোমরা পূর্ব ও পশ্চিমের উজ্জ্বল দিতিয়ে মুক্তার ন্যায় ঝলমলে তারকা দেখতে পাও। কারণ, উভয়ের মাঝে মর্যাদার অনেক ব্যবধান থাকবে। সাহাবায়ে কিরাম জানতে চাইলেন, হে আল্লাহর রাসূল, সেগুলো কি নবিগণের স্থান—যেখানে অন্যেরা পৌঁছাতে পারবে না? নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, অবশ্যই না! বরং এই সত্তার শপথ যার হাতে আমার প্রাণ, তারা তো এমন মুমিন—যারা আল্লাহর প্রতি ঈমান এনেছে এবং রাসূলগণকে সত্যায়ন করেছে。
আলি রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন— 'জান্নাতে এমন অনেক প্রাসাদ আছে যেগুলোর ভেতর থেকে বাইরে এবং বাইরে থেকে ভেতরে দেখা যাবে। তখন জনৈক গ্রাম্য লোক দাঁড়িয়ে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! এমন প্রাসাদ কারা পাবে? নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, যে সুন্দরভাবে কথা বলে, অসহায়কে খানা খাওয়ায়, নিয়মিত রোজা রাখে এবং রাতে নামাজ পড়ে—যখন মানুষ ঘুমিয়ে থাকে।’
নোট: জেনে রাখা ভালো যে, এই প্রাসাদগুলো উচ্চতা ও গুণাবলিতে জান্নাতিদের আমলের বেশকমের ভিত্তিতে বিভিন্ন প্রকার হবে। একটির উচ্চতা ও অনন্যতা আরেকটির চেয়ে অনেক বেশি হবে।
টিকাঃ
[১০৮] সহীহ মুসলিম, খণ্ড: ১০, পৃষ্ঠা: ৪৬৬, হাদিস: ২৫৩。
[১০৯] সুনানুত তিরমিজি, খণ্ড: ৯, পৃষ্ঠা: ৭৩, হাদিস: ২৪৯৫。
📄 জান্নাতিদের বালাখানা, বাড়ি-ঘর
বুরাইদা ইবনু হাসিব রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, একদা সকালে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হজরত বিলাল রাদিয়াল্লাহু আনহুকে ডেকে বললেন—
'হে বিলাল, তুমি কোন আমলের কারণে আমার আগেই জান্নাতে প্রবেশ করেছো? আমি যেই জান্নাতেই প্রবেশ করেছি, সেখানেই আমার সামনে তোমার পদধ্বনি শুনছি। আমি স্বপ্নে জান্নাতে প্রবেশ করলাম, সেখানেও আমার সামনে তোমার পদধ্বনি শুনলাম। অতঃপর স্বপ্নের স্তরে পৌঁছার উঁচু এলাকায় এলাম, তারপর জিজ্ঞেস করলাম, এই বালখানায়টি কার? তারা বলল, অমুকের এক ব্যক্তির। আমি বললাম, আমি তো একজন আরব; সুতরাং এই বালখানাটি কার? তারা বলল, একজন কুরাইশি মানুষের। বললাম, আমি তো কুরাইশি। তারা, বলল, উম্মতে মুহাম্মাদীর একজন মানুষের। আমি বললাম, আমি মুহাম্মাদ? এই বালখানাটি কার? তারা বলল, উমর ইবনুল খাত্তাবের। হজরত বেলাল রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, আমি যখনই আজান দিয়েছি, তখনই দু রাকাত নামাজ পড়েছি। আমার অজু ছুটে গেলেই অজু করেছি এবং আল্লাহর জন্য দুই রাকাত নামাজ পড়েছি। তখন নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এজন্যই。
টিকাঃ
[১১০] সুনানুত তিরমিজি, খণ্ড: ১২, পৃষ্ঠা: ১৪৯, হাদিস: ৩৬৮২। হাদিসটি হাসান, সহীহ।