📘 মৃত্যুর ওপারে অনন্তের পথে > 📄 হাউজে কাউসারের বিবরণ

📄 হাউজে কাউসারের বিবরণ


আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেছেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন—
بَيْنَا أَنَا قَائِمٌ إِذَا زُمْرَةٌ حَتَّى إِذَا عَرَفْتُهُمْ خَرَجَ رَجُلٌ مِنْ بَيْنِي وَبَيْنِهِمْ فَقَالَ هَلُمَّ فَقُلْتُ أَيْنَ قَالَ إِلَى النَّارِ وَاللَّهِ قُلْتُ وَمَا شَأْنُهُمْ قَالَ إِنَّهُمْ ارْتَدُّوا بَعْدَكَ عَلَى أَدْبَارِهِمُ الْقَهْقَرَى ثُمَّ إِذَا زُمْرَةٌ حَتَّى إِذَا عَرَفْتُهُمْ خَرَجَ رَجُلٌ مِنْ بَيْنِي وَبَيْنِهِمْ فَقَالَ هَلُمَّ قُلْتُ أَيْنَ قَالَ إِلَى النَّارِ وَاللَّهِ قُلْتُ وَمَا شَأْنُهُمْ قَالَ إِنَّهُمْ ارْتَدُّوا بَعْدَكَ عَلَى أَدْبَارِهِمُ الْقَهْقَرَى فَلَا أَرَاهُ يَخْلُصُ مِنْهُمْ إِلَّا مِثْلُ هَمَلِ النَّعَمِ
আমি (হাওজের পার্শ্বে) দাঁড়িয়ে থাকব। ইতমধ্যেই একদল মানুষ আসবে, আমি তাদেরকে চিনতে পারব। হঠাৎ আমার ও তাদের মাঝে একজন লোক বের হয়ে তাদেরকে বলবে—চলো। আমি বলব কোথায়? সে বলবে জাহান্নামের দিকে। আল্লাহর কসম, আমি জিজ্ঞেস করব, তাদের দোষ কী? লোকটি বলবে, তারা দলে-দলে মুরতাদ হয়ে গেছে। তারপর আরেক দল মানুষ আসবে। আমি তাদেরকে চিনতে পারব। হঠাৎ আমার ও তাদের মাঝ থেকে একজন লোক বের হয়ে আসবে। তারপর তাদেরকে ডাকবে—চলো। আমি জিজ্ঞেস করব, কোথায় যাবে? সে বলবে জাহান্নামের দিকে। আমি জানতে চাইব এদের দোষ কী? তারা বলবে তারা মুরতাদ হয়ে গেছে। আমি তাদের কাউকে মুক্ত হতে দেখব না, তবে পশুপাল উটের মতো (সামান্য কিছু কিছু) মানুষ মুক্ত হতে পারবে。
আবু জর রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমি নবিজীকে বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! হাউজের তাপমাত্রা কেমন হবে? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন—
ওই সত্তার শপথ যার হাতে আমার প্রাণ! (আমার) হাউজের পানপাত্রা নক্ষত্ররাজি অপেক্ষা অন্ধকার রাতের আকাশের নক্ষত্র ও তারকাগুলির চেয়েও বেশি হবে। পাত্রগুলো হবে জান্নাতের। যে ব্যক্তি সেই হাউজ থেকে পান করবে, কিয়ামতের শেষ পর্যন্ত সে পিপাসার্ত হবে না। এই হাউজে জান্নাতের দুটি নালা প্রবাহিত হবে। যে ব্যক্তি সেখান থেকে পান করবে, সে কখনো পিপাসার্ত হবে না। যার প্রস্থ হবে আয়মান থেকে আইলার দূরত্ব সমপরিমাণ। আর তার পানি হবে দুধের চেয়ে সাদা এবং মধুর চেয়ে মিঠা。
আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন—একদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের মাঝেই ছিলেন। হঠাৎ তিনি তন্দ্রাচ্ছন্ন হলেন। তারপর মুচকি হেসে মাথা উদ্বোধন করলেন। আমরা জানতে চাইলাম, আপনি হাসলেন কেন? নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আমার ওপর এই মুহূর্তে একটি সূরা অবতীর্ণ হয়েছে। সুতরাং তিনি পড়লেন—
শুকর করছি অতিশয় দয়ালু পরম করুণাময় আল্লাহর নামে। আমি তোমাকে কাউসার দান করেছি। অতএব, তুমি তোমার রবের জন্য নামাজ পড়ো এবং কুরবানি করো। নিশ্চয় তোমার শত্রুই নির্বংশ হবে।' তারপর বললেন— তোমরা কি জানো কাউসার কী? আমরা বললাম, আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলই ভালো জানেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, সেটি একটি নদী। যার প্রতিটিপ্রান্তে আমার রব আমাকে দিয়েছেন। তাতে রয়েছে অনেক কল্যাণ। সেটি এমন একটি হাউজ, যার পানত্সংখ্যা তারকারাজির সমান। কিয়ামতের দিন আমার উম্মাত সেখান থেকে পান করার জন্য আসবে। তাদের মধ্য থেকে কিছু বান্দাকে ঠেঁল মেরে নিয়ে যাওয়া হবে। আমি বলব—হে আমার রব! সে তো আমার উম্মত! তখন আল্লাহ বলবেন—তুমি জানো না, তোমার অবর্তমানে তারা (দীনের মধ্যে) নতুন কী আবিষ্কার করেছে!

টিকাঃ
[১২৬] সহিহুল বুখারি, খণ্ড: ২০, পৃষ্ঠা: ২১০, হাদিস: ৬২১২。
ব্যাখ্যা: ‘আহ্ল-ক্বুরঅহ’ গ্রন্থপ্রণেতা প্রফুল্লর মন্তব্য হলো, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাউজ হবে পুলসিরাতের পরে। তবে বিশুদ্ধ মতানুযায়ী, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দুটি হাউজ আছে। একটি অবস্থান কিয়ামতের মাঠে পুলসিরাতের আগে। আর দ্বিতীয়টি অবস্থান হলো—জান্নাতে। দুটি হাউজেরই কাউসার বলা হয়। সামনে ইনশাআল্লাহ এর আলোচনা আসবে। আবারি ভাষায় কাউসার শব্দের অর্থ হলো—অফারন্ত কল্যাণ। তবে ইবনু যা হিশাম-কাসসাসের গলায় আছে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেই বলেছেন—
কেউ বলেছেন মিজান আলো, কেউ বলেছেন হাউজ আলো। আবুল হাসান আল-কাবিসী বলেছেন, বিশুদ্ধ কথা হলো—হাউজ আলো।
আমি বলব, প্রকৃত অর্থ হলো দুটিই হবে। কারণ, মানুষেরা কখন থেকে পিপাসার্ত হয়ে উঠবে, যেমন পূর্বে বলা হয়েছে। সুতরাং মানুষ মিজান এবং পুলসিরাতের আগে হাউজের কাছেই আসবে। আবার আল্লাহ তাআলা জান্না—ফেরত। নোট: (লেখক) আমি বলব, হাদিসটি হাউজ হওয়ার সাথে সাথে এ-বিষয়টির প্রতিও খুব ভালোভাবে প্রমাণ বহন করছে যে, হাউজটি কিয়ামতের মাঠে পুলসিরাতের আগেই হবে। কেননা, পুলসিরাত হলো—জাহান্নামের ওপর স্থাপিত সুদীর্ঘ সেতু, যার ওপর দিয়ে পার হতে হবে। যে ব্যক্তি হাউজ থেকে পান করবে, সে জাহান্নামে থেকে নিরাপদ থাকতে পারবে। (তার তো আর পানি পান করে নিরাপদ থাকার প্রয়োজন হবে না।) যা প্রমাণ করে যে, নবিবরের হাউজটি কিয়ামতের ময়দানেই অবস্থিত হবে。
[১২৭] সহিহ মুসলিম, খণ্ড: ২১, পৃষ্ঠা: ৪২২, হাদিস: ৪২২৪。
[১১৯] সহিহ মুসলিম, খণ্ড : ২, পৃষ্ঠা : ৩৯৪, হাদিস : ৪০৭。

📘 মৃত্যুর ওপারে অনন্তের পথে > 📄 হাউজে কাউসার থেকে যাদেরকে বিতাড়িত করা হবে

📄 হাউজে কাউসার থেকে যাদেরকে বিতাড়িত করা হবে


আবদুল্লাহ ইবনু আমর ইবনুল আস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন—
وَهُوَ حَوْضِي مِسِيرَةَ شَهْرٍ وَزَوَايَاهُ سَوَاءٌ وَمَاؤُهُ أَبْيَضُ مِنَ الْوَرِقِ وَرِيحُهُ أَطْيَبُ مِنَ الْمِسْكِ وَكِيرَانُهُ كَنُجُومِ السَّمَاءِ فَمَنْ شَرِبَ مِنْهُ فَلَا يَظْمَأُ بَعْدَهُ أَبَدًا.
আমার হাউজের আয়তন হবে এক মাসের দূরত্বের সমপরিমাণ। তার কোণগুলো সমান। তার পানি রূপার চেয়ে সাদা, তার গন্ধ মিশকের চেয়ে বেশি সুঘ্রাণযুক্ত, তার পানগুলো আকাশের তারকারাজিসম। যে ব্যক্তি সেখান থেকে পান করবে, সে পরবর্তী সময়ে কখনো পিপাসার্ত হবে না。
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বর্ণনা করেছেন—
لَيَرِدَنَّ عَلَيَّ نَاسٌ مِنْ أَصْحَابِي الْحَوْضَ حَتَّى عَرَفْتُهُمْ اخْتُلِجُوا دُونِي فَأَقُولُ أَصْحَابِي فَيَقُولُ لَا تَدْرِي مَا أَحْدَثُوا بَعْدَكَ.
হাউজের পাশে আমার অনেক উম্মত পানি পান করার জন্য আমার কাছে আসবে। আমি তাদেরকে চিনতে পারব। কিন্তু আমার কাছে আসার পরেই তাদেরকে ঠেলে মেরে উঠিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে। আমি বলব—তারা তো আমার উম্মত! তখন আল্লাহ বলবেন—তুমি জানো না, তোমার অবর্তমানে তারা (দীনের মধ্যে) নতুন কী আবিষ্কার করেছিল!
আসমা বিনত আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন—'আমি হাউজের পাড়ে অবস্থান করতে থাকব। ইতিমধ্যেই তোমাদের মধ্য থেকে অনেকে আমার কাছে পানি পান করার জন্য আসতে চাইবে। তখন তাদের মধ্য থেকে অনেককেই আমার কাছে আসতে বাধা দেওয়া হবে। আমি বলব—হে আমার রব! সে আমার দলের এবং আমার উম্মতের অন্তর্ভুক্ত। তখন বলা হবে, তুমি তো বুঝতে পারোনি যে, তোমার অবর্তমানে তারা কী করেছে! আল্লাহর কসম! তোমার অবর্তমানে তারা অবিচল থাকেনি, বরং উল্টো দিকে ফিরে গেছে।'
ব্যাখ্যা : উলামায়ে কিরাম বলেছেন, যারা মুরতাদ হয়ে যাবে, দীনের মধ্যে এমন কিছু আবিষ্কার করবে—যার প্রতি আল্লাহ রাজি নন এবং যার অনুমতিও আল্লাহ তাআলা প্রদান করেননি, তারাই হাউজে কাউসার থেকে বিতাড়িত হবে এবং তাদেরকে সেখান থেকে দূর করে দেওয়া হবে। আর সবচেয়ে বেশি বিতাড়িত হবে সেসব মানুষ—যারা মুসলিমদের দলবদ্ধতার বিরোধিতা করেছে এবং তাদের পথ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছে। যেমন খারিজিদের বিভিন্ন শ্রেণি, রাফিজিদের বিভিন্ন শ্রেণি পথভ্রষ্টরা এবং মু'তাজিলাদের সমস্ত শ্রেণি। তারা সকলেই দীনকে বিকৃত করেছে। সেসকল জালিম— যারা জুলুম নির্যাতনও লিপ্ত ছিল, সত্যকে দমিয়ে ফেলার অপচেষ্টা করেছে, সত্যের অনুসারীদেরকে হত্যা ও লাঞ্ছিত করেছে। সেসব অভিশপ্ত মানুষ—যারা কবিরা গুনাহের ফাঁদকে হালকা ভেবেছে। ঠিক তেমনিভাবে সেসব মানুষ—যারা দীনের মাঝে বক্রতা ও বিদআত সৃষ্টি করেছে এবং প্রবৃত্তির দাসত্ব করেছে।

টিকাঃ
[১২০] সহিহ মুসলিম, খণ্ড : ১১, পৃষ্ঠা : ৪১১, হাদিস : ৪২৪৪。
[১২১] সহিহ বুখারি, খণ্ড : ২০, পৃষ্ঠা : ২৪৭, হাদিস : ৬২৯৬。
[১২২] সহিহ মুসলিম, খণ্ড : ১১, পৃষ্ঠা : ৪১১, হাদিস : ৪২৪৪。

📘 মৃত্যুর ওপারে অনন্তের পথে > 📄 জান্নাতে নবিজির হাউজে কাউসার

📄 জান্নাতে নবিজির হাউজে কাউসার


আনাস ইবনু মালেক রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন—
بَيْنَمَا أَنَا أَسِيرُ فِي الْجَنَّةِ إِذَا أَنَا بِنَهْرِ حَافَتَاهُ قِبَابُ الدُّرِّ الْمُجَوَّفِ قُلْتُ مَا هَذَا يَا جِبْرِيلُ قَالَ هَذَا الْكَوْثَرُ الَّذِي أَعْطَاكَ رَبُّكَ فَإِذَا طِينُهُ أَوْ طِيبُهُ مِسْكٌ أَذْفَرُ.
আমি জান্নাতের মধ্যে ভ্রমণ করতে করতে হঠাৎ একটি নদীর কাছে পৌঁছে গেলাম। যার কিনারে মুক্তার তৈরি পাত্র ছিল। আমি বললাম, জিবরিল এটা কী? তিনি বললেন, এটাই সেই কাউসার—আপনার রব আপনাকে যা দান করেছেন। এর মাটি বা সুঘ্রাণ হলো অজস্র মিশক。
আবদুল্লাহ ইবনু উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন—
'কাউসার জান্নাতে অবস্থিত একটি নদী। তার কিনারাগুলো স্বর্ণের। এটি প্রবাহিত হবে মুক্তা ও ইয়াকুত পাথরের ওপর দিয়ে। তার মৃত্তিকা হবে মিশকের চেয়েও সুগন্ধিময়। তার পানি হবে মধুর চেয়েও মিষ্টি এবং বরফের চেয়ে সাদা।'

টিকাঃ
[১২৩] সহিহ বুখারি, খণ্ড : ২০, পৃষ্ঠা : ২৪৬, হাদিস : ৬২৭১。
[১২৪] সুনানুত তিরমিজি, খণ্ড : ১১, পৃষ্ঠা : ২০৪, হাদিস : ৩২৪৪। ইমাম তিরমিজি বলেন—হাদিসটি হাসান সহিহ。

📘 মৃত্যুর ওপারে অনন্তের পথে > 📄 মিজানের মাধ্যমে আমল পরিমাপের পদ্ধতি

📄 মিজানের মাধ্যমে আমল পরিমাপের পদ্ধতি


আবদুল্লাহ ইবনু আমর ইবনু আস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন—
إِنَّ اللَّهَ سَيُخَلِّصُ رَجُلًا مِنْ أُمَّتِي عَلَى رُءُوسِ الْخَلَائِقِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ فَيَنْشُرُ عَلَيْهِ تِسْعَةً وَتِسْعِينَ سِجِلَّا كُلُّ سِجِلٍّ مِثْلَ مَدِّ الْبَصَرِ ثُمَّ يَقُولُ أَتُنْكِرُ مِنْ هَذَا شَيْئًا أظَلَمَكَ كَتَبَتِي الْحَافِظُونَ فَيَقُولُ لَا يَا رَبِّ فَيَقُولُ أَفَلَكَ عُذْرٌ فَيَقُولُ لَا يَا رَبِّ فَيَقُولُ بَلَى إِنَّ لَكَ عِنْدَنَا حَسَنَةً فَإِنَّهُ لَا ظُلْمَ عَلَيْكَ الْيَوْمَ فَتُخْرَجُ بِطَاقَةٌ فِيهَا أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ فَيَقُولُ أَقْبِلْ حَسَنَتُكَ وَرَبِّ يَا مَا هَذِهِ الْبِطَاقَةُ مَعَ هَذِهِ السِّجِلَّاتِ فَقَالَ إِنَّكَ لَا تُظْلَمُ قَالَ فَتُوضَعُ السِّجِلَّاتُ فِي كِفَّةٍ وَالْبِطَاقَةُ فِي كِفَّةٍ فَطَاشَتِ السِّجِلَّاتُ وَثَقُلَتِ الْبِطَاقَةُ فَلَا يَثْقُلُ مَعَ اسْمِ اللَّهِ شَيْءٌ
আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের দিন সবার সামনে আমার একজন উম্মতকে মুক্তি দেবেন। তার সামনে নিরানব্বইটি খাতা খুলবেন। প্রতিটি খাতা হবে দৃষ্টিসীমা পর্যন্ত প্রসারিত। তারপর আল্লাহ জিজ্ঞেস করবেন—তুমি কি এগুলোর কোনোটি অস্বীকার করতে পারবে এবং বলতে পারবে যে, আমার পক্ষ থেকে নিযুক্ত লেখক তোমার প্রতি জুলুম করেছে? সে বলবে, হে আমার রব, না। আল্লাহ আবার জিজ্ঞেস করবেন—তোমার কি কোনো আপত্তি আছে? সে বলবে, হে আমার রব! না। এবার আল্লাহ তাআলা বলবেন—তবে আমার কাছে তোমার একটি নেকি আছে। আজকে তোমার ওপর জুলুম করা হবে না। তখন একটি কাগজের টুকরো বের হবে—যাতে লেখা আছে:
أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ.
আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহই একমাত্র উপাস্য এবং মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর বান্দা ও রাসুল।
এবার আল্লাহ বলবেন—কাগজটকে তোমার ওজনের পাল্লায় রাখো। সে বলবে, এতগুলো খাতার সাথে এই কাগজের টুকরোর কী মূল্য আছে? আল্লাহ বলবেন, তোমার প্রতি জুলুম করা হবে না। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন—তখন এক পাল্লায় খাতাগুলো রাখা হবে, আরেক পাল্লায় রাখা হবে কাগজের টুকরোটি। সাথে সাথে খাতাগুলো শূন্য উঠে যাবে এবং কাগজের টুকরোটি ভারী হবে। কারণ, আল্লাহর নামের সাথে অন্য কোনো বস্তু ভারী হতে পারে না。
জ্ঞাতব্য: উলামায়ে কিরাম বলেছেন, পরকালে মানুষ তিন শ্রেণিতে বিভক্ত হবে:
প্রথমত: মু’মিন, যাদের কোনো কবিরা গুনাহ নেই। দ্বিতীয়ত: মিশ্র শ্রেণির, যারা নির্লজ্জ এবং কবিরা গুনাহ করেছে; তবে ঈমানদার। তৃতীয়ত: কাফির।
মুআহিদগণের নেকগুলো জ্যোতির্ময় পাল্লায় রাখা হবে, যদি তাদের কোনো সগিরা গুনাহ থাকে, তাহলে অন্য পাল্লায় রাখা হবে। আল্লাহ তাআলা সেই সগিরা গুনাহগুলোর কোনো ওজন রাখবেন না। যার কারণে জ্যোতির্ময় পাল্লা ভারী হয়ে যাবে। এমনকি অন্ধকার পাল্লাটা হালকা হওয়ার কারণে ওপরের দিকে উঠে থাকবে।
মিশ্র শ্রেণির লোকেদের নেকগুলো জ্যোতির্ময় পাল্লায় রাখা হবে, আর পাপগুলো রাখা হবে অন্ধকার পাল্লায়। তাদের কবিরা গুনাহগুলোর ওজন থাকবে। যদি সামান্যতম তাদের নেকির পাল্লাটা ভারী হয়, তাহলে জান্নাতে প্রবেশ করবে। আর যদি পাপের পাল্লাটাই সামান্যতমও ভারী হয়, তাহলে জাহান্নামে প্রবেশ করবে। তবে, আল্লাহ তাআলা ক্ষমা করে দিলে কথা ভিন্ন। আর যদি উভয় পাল্লা বরাবর হয়, তাহলে আ’রাফে স্থান পাবে; যার আলোচনা সামনে আসবে। তবে এই বিচারটা হবে সেই ক্ষেত্রে, যখন কবিরা গুনাহের সম্পৃক্ততা থাকে আল্লাহ ও বান্দার মাঝে। পক্ষান্তরে যদি সাথে আর কোনো গুনাহও থাকে (যেগুলোর বান্দার হকের সাথে), ওদিকে তার অনেক নেকি থাকে, তাহলে পাপের বদলা হিসেবে তার নেকি কমে থাকবে। যদি বিনিময় শেষ করতে করতে তার নেকি শেষ হয়ে যায়, তাহলে তার ওপর গুনাহের বোঝা চাপানো হবে, তারপর শাস্তি প্রদান করা হবে। এ কথাগুলো আলোচিত ও আলোচিতব্য হাদিসগুলোর সারকথা।
সুফিয়ান সাওরি রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন— তুমি যদি আল্লাহর সাথে এমন সত্তাটি গুনাহ নিয়ে সাক্ষাৎ করো—যার সম্পর্ক আল্লাহ এবং তোমার সাথে, তাহলে এটা তোমার জন্য অনেক হালকা; এমন একটি গুনাহ নিয়ে সাক্ষাৎ করার চেয়ে—যার সম্পর্ক তোমার ও অন্য বান্দার সাথে।
‘আমি (ইমাম কুরতুবি রাহিমাহুল্লাহ) বলব—কথাটি অবশ্যই সঠিক। কারণ, আল্লাহ তাআলা অনুগ্রহশীল, দয়াময়। আর যদি আদমদয় মিথ্যা, অসহায়। সেদিন প্রত্যেকে একটি নেকির দরুন হলে একটি গুনাহ অন্যের ঘাড়ে চাপিয়ে দেবে, যেন মিজানে তার নেকির পাল্লাটা ভারী হয় এবং তার কল্যাণ ও নেকি বেশি হয়।
আরো কাফির! তার কুফরকে অন্ধকার পাল্লায় রাখা হবে, কিন্তু অন্য পাল্লায় রাখার মতো তার কোনো নেকি থাকবে না। যার কারণে তা শূন্য পড়ে থাকবে, কল্যাণ থেকে মুক্ত থাকবে। সুতরাং আল্লাহ তাআলা তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করার নির্দেশ দেবেন এবং বদআমল ও গুনাহ অনুযায়ী তাদের আজাব দেওয়া হবে।
আর মুরাক্বিবদের অবস্থা! কবিরা গুনাহ থেকে বিরত থাকার কারণে তাদের সগিরা গুনাহগুলো মোচন করা হয় এবং তাদেরকে জান্নাতে প্রবেশ করানোর নির্দেশ প্রদান করা হয়। তাদের প্রত্যেকেরই তাদের নেকি ও ইবাদত সমপরিমাণ প্রতিদান প্রদান করা হয়। কুরআন কারিম এবং সুন্নাত সংক্রান্ত আয়াতগুলোতে এই দুই প্রকারের কথা বলা হয়েছে। কেননা, আল্লাহ তাআলা কুরআন কারিমে কেবল মিজানের পাল্লা ভারী ও হালকা হওয়ার কথা উল্লেখ করেছেন। তারপর পাল্লা ভারী হলে অকাট্যতা সফলতার এবং সুখী জীবনের ফায়সালা ঘোষণা করেন এবং আর পাল্লা হালকা হলে কুফরির গুণে গুণান্বিত করে চিরস্থায়ী জাহান্নামের ফায়সালা ঘোষণা করেন। বাকি থাকল—মিশ্রদের কথা। যাদের আমলনামায়ও নেকিও আছে, বদিকেও আছে। সেগুলোর ব্যাপারে আমরা নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কথা আলোচনা করে এসেছি।

টিকাঃ
[১০১] সুন্নাতুল তিরমিযী, খণ্ড: ৯, পৃ: ২০২, হাদিস: ২৬৬১। ইমাম তিরমিযী বলেছেন, হাদিসটি হাসান গারিব।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00