📄 যাকাত অস্বীকারকারীর শাস্তি এবং প্রতারক ও সীমালঙ্ঘনকারীর লাঞ্ছনা
আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন—
‘যে স্বর্ণ ও রৌপ্যর মালিক তার হক আদায় করেনি (জাকাত প্রদান করেনি), কিয়ামতের দিন তার জন্য আগুনের পাত বানানো হবে। অতঃপর সেটিকে আগুনে জ্বালানো হবে। তারপর উত্তপ্ত পাতের মাধ্যমে তার পিঠকে, তার কপালকে এবং তার পিঠ পুঁকিয়ে দেওয়া হবে। যখনই শীতল হয়ে যাবে, আবার গরম করা হবে; এমন দিন এটি করা হবে—যেদিনের পরিমাণ হবে (দুনিয়ার) পঞ্চাশ হাজার বছর। এরই মাঝে বান্দাদের ফায়সালা হয়ে যাবে। তারা হয়তো জান্নাতের পথ নতুবা জাহান্নামের পথ দেখবে। বলা হলো—হে আল্লাহর রাসূল, উটের বিষয়টি? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন—উটের মালিকও যদি তার অধিকার প্রদান না করে, যেমন তার অধিকারের মধ্য থেকে এটাও যে—তার পানি পান করার দিন তাকে দোহন করা হবে; (যদি তার অধিকারগুলো প্রদান না করা হয়) তাহলে কিয়ামতের দিন তার জন্য এমন বিশাল ও সমতল ভুমির ব্যবস্থা করা হবে—যেখানে একটি দানার অধিকারও বাদ পড়বে না। এই মাঠের মধ্যে উট তাকে খুর দ্বারা পদদলিত করবে এবং মুখ দ্বারা কামড়াবে। এরপর যখন এমন করবে, আবার শুরু করা হবে। সে দিনটি হবে পঞ্চাশ হাজার বছরের সমপরিমাণ। এভাবে একসময় বান্দাদের ফায়সালা হয়ে যাবে। তারা হয়তো জান্নাতের দিকে বা নতুবা জাহান্নামের দিকে নিজের পথ দেখবে। আবার জিজ্ঞেস করা হলো—হে আল্লাহ রাসূল! গরু ও ছাগলের ব্যাপারটি? রাসূল সা. বললেন, গরু ও ছাগলের মালিকও যে তাদের অধিকার আদায় করেনি, কিয়ামতের দিন তার জন্য বিশাল সমতল ভূমির ব্যবস্থা করা হবে। যেখানে কোনো অধিকার বাদ পড়বে না। কোনো গরু বা ছাগলের প্যাটানো শিং থাকবে না, কোনোটি শিংহীন থাকবে না এবং কোনোটীর শিং ভেতর থেকে ভাঙাও থাকবে না। এমন গরু ও ছাগলগুলো তাকে শিং দ্বারা গুঁতোবে এবং খুর দ্বারা পদদলিত করবে। একবার যখন আক্রমণ করবে, আবার ফিরিয়ে দেওয়া হবে। এই দিনটি হবে পঞ্চাশ হাজার বছরের সমপরিমাণ। একসময় বান্দাদের মাঝে ফায়সালা হয়ে যাবে। প্রত্যেকেই জান্নাতের পথ বা জাহান্নামের পথ দেখবে。
হাদিসটি এই অর্থে বুখারিও বর্ণনা করেছেন。
আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন—
مَنْ آتَاهُ اللَّهُ مَالًا فَلَمْ يُؤَدِّ زَكَاتَهُ مُثِّلَ لَهُ مَالُهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ شُجَاعًا أَقْرَعَ لَهُ زَبِيبَتَانِ يَطَوَّقُهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ ثُمَّ يَأْخُذُ بِلِهْزِمَتَيْهِ يَعْنِي بِشِدْقَيْهِ ثُمَّ يَقُولُ أَنَا مَالُكَ أَنَا كَنْزُكَ ) ثُمَّ تَلَا { لَا يَحْسَبَنَّ الَّذِينَ يَبْخَلُونَ }
যাকে আল্লাহ সম্পদ দান করেছেন কিন্তু সে সম্পদের জাকাত প্রদান করল না, কিয়ামতের দিন সেই সম্পদকে তার জন্য এমন টাকওয়ালা দুই মুখ-বিশিষ্ট বিষাক্ত সাপ রূপান্তরিত করা হবে। সাপটিকে তার গলায় প্যাঁচিয়ে দেওয়া হবে। সাপটি তার দুই চাপাকে জাপটে ধরবে, তারপর বলবে—আমি তোর সম্পদ, আমি তোর অর্থের ভান্ডার। তারপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই আয়াতটি তিলাওয়াত করেছেন—
وَلَا يَحْسَبَنَّ الَّذِينَ يَبْخَلُونَ بِمَا آتَاهُمُ اللَّهُ مِن فَضْلِهِ هُوَ خَيْرًا لَّهُمْ ۖ بَلْ هُوَ شَرٌّ لَّهُمْ ۖ سَيُطَوَّقُونَ مَا بَخِلُوا بِهِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ ۗ
মানুষ যেন আল্লাহ্প্রদত্ত সম্পদ কুক্ষিগত করাকে তাদের জন্য কল্যাণকর মনে না করে। বরং এটা তাদের পক্ষে ক্ষতিকর হবে। যেসব বিষয় নিয়ে তারা কার্পণ্য করে সেগুলো বেড়ি বানিয়ে কিয়ামতের দিন তাদের গলায় পরানো হবে。
আবদুল্লাহ ইবনু উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন—
কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা যখন পূর্বাপর সকলদেরকে সমবেত করবেন, তখন প্রত্যেক প্রতারকের জন্য পতাকা উঁচু করা হবে এবং বলা হবে—এটা অমুকের ছেলে অমুকের সে প্রতারণাকারী。
আল্লাহ তাআলা সীমালঙ্ঘনকারী এবং জাকাত অস্বীকারকারীকে যে লাঞ্ছনায় পতিত করবেন, তা ঠিক গদ্দারের লাঞ্ছনার মতোই হবে। আল্লাহ তাআলা এই শাস্তিকে মানুষের বুঝ ও অনুধাবন-শক্তি অনুপাতে নির্ধারিত করেছেন।
টিকাঃ
[১১৯] সহিহ মুসলিম, খণ্ড: ৫, পৃষ্ঠা: ১৯৩, হাদিস: ১৬৪৭。
[১২০] সহিহুল বুখারি: হাদিস: ১৪০২。
[১২১] সহিহুল বুখারি, খণ্ড: ৫, পৃষ্ঠা: ২১৩, হাদিস : ১৪০৩। তবে হাদিসে কেবল আয়াতের প্রথমাংশটি উল্লেখ আছে। হাসাদিক হওয়ার কারণে আমি পরেরও অংশকাল উল্লেখ করেছি। — অনুবাদক。
[১২২] সহিহ মুসলিম, খণ্ড: ৫, পৃষ্ঠা: ১৯৩, হাদিস: ১৬৪৬。
📄 দায়িত্বশীলদের আলোচনা
আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন—
مَا مِنْ أَمِيرٍ عَشْرَةٍ إِلَّا يُؤْتَى بِهِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ مَغْلُولًا إِلَّا الْعَدْلَ أَوْيُفِكُّهُ الْفَوْرَ
দশজনের নেতাকে কিয়ামতের দিন হাত বেঁধে নিয়ে আসা হবে। তারপর হয়তো তার কৃত ইনসাফ তাকে মুক্ত করবে কিংবা তার কৃত জুলুম তাকে ধ্বংস করবে。
আবু হুমাঈদ সায়িদি রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেছেন, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বনি আসাদ্দ গোত্রের ‘ইবনু-লুতাবিয়াহ’ নামক লোককে জাকাত আদায়ের কাজে নিয়োগ দিলেন। তিনি জাকাত আদায় করে এসে বললেন—এটা আপনাদের, আর এটা আমাকে হাদিয়া দেওয়া হয়েছে। তখন নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মিম্বরে আরোহণ করে আল্লাহর প্রশংসা এবং তাঁর স্তুতি বর্ণনা করে বলেন—
জাকাত আদায়কারীর কী হলো! আমরা তাকে আদায়ের কাজে প্রেরণ করলাম। আর সে এসে বলছে—এটা আপনাদের, আর এটা আমার! সে কেন নিজের পিতা-মাতার ঘরে বসে থাকল না? তাহলে দেখতে পেত যে, তাকে হাদিয়া দেওয়া হয় কি না! ওই সত্তার শপথ যার হাতে আমার প্রাণ; সে যা-ই গ্রহণ করবে, কিয়ামতের দিন তা কঁধে করে হাজির হবে। যদি উট হয়, তাহলে তার স্বাভাবজাত শব্দ করবে। যদি গরু হয়, তাহলে সে তার স্বাভাবজাত শব্দ করবে। আর যদি ছাগল হয়, তবুও সে তার স্বাভাবজাত শব্দ করবে। এরপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার দুই হাত উত্তোলন করলেন, এমনকি আমরা তার দুই বগলের শুভ্রতা দেখতে পারলাম। তারপর বললেন—হে আল্লাহ, আমি কি পৌঁছে দিয়েছি? এভাবে তিন বার বললেন。
বুরাইদা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন—
مَنِ اسْتَعْمَلْنَاهُ عَلَى عَمَلٍ فَرَزَقْنَاهُ رِزْقًا فَمَا أَخَذَ بَعْدَ ذَلِكَ فَهُوَ غُلُولٌ
‘আমরা যাকে কাজে নিযুক্ত করি, তার রিজিকের ব্যবস্থা করি। এরপর যা সে গ্রহণ করবে, সেটা ‘আত্মসাৎ’
টিকাঃ
[১২৩] সুনানু আবু দাউদ, খণ্ড: ১১, পৃষ্ঠা: ২৪৭, হাদিস: ২৯৪১。
[১২৪] সহিহ মুসলিম, খণ্ড: ২১, পৃষ্ঠা: ১৯১, হাদিস: ১৬৬২。
[১২৫] সুনানু আবু দাউদ, খণ্ড: ১১, পৃষ্ঠা: ২৫৪, হাদিস: ২৯৪৫。
📄 হাউজে কাউসারের বিবরণ
আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেছেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন—
بَيْنَا أَنَا قَائِمٌ إِذَا زُمْرَةٌ حَتَّى إِذَا عَرَفْتُهُمْ خَرَجَ رَجُلٌ مِنْ بَيْنِي وَبَيْنِهِمْ فَقَالَ هَلُمَّ فَقُلْتُ أَيْنَ قَالَ إِلَى النَّارِ وَاللَّهِ قُلْتُ وَمَا شَأْنُهُمْ قَالَ إِنَّهُمْ ارْتَدُّوا بَعْدَكَ عَلَى أَدْبَارِهِمُ الْقَهْقَرَى ثُمَّ إِذَا زُمْرَةٌ حَتَّى إِذَا عَرَفْتُهُمْ خَرَجَ رَجُلٌ مِنْ بَيْنِي وَبَيْنِهِمْ فَقَالَ هَلُمَّ قُلْتُ أَيْنَ قَالَ إِلَى النَّارِ وَاللَّهِ قُلْتُ وَمَا شَأْنُهُمْ قَالَ إِنَّهُمْ ارْتَدُّوا بَعْدَكَ عَلَى أَدْبَارِهِمُ الْقَهْقَرَى فَلَا أَرَاهُ يَخْلُصُ مِنْهُمْ إِلَّا مِثْلُ هَمَلِ النَّعَمِ
আমি (হাওজের পার্শ্বে) দাঁড়িয়ে থাকব। ইতমধ্যেই একদল মানুষ আসবে, আমি তাদেরকে চিনতে পারব। হঠাৎ আমার ও তাদের মাঝে একজন লোক বের হয়ে তাদেরকে বলবে—চলো। আমি বলব কোথায়? সে বলবে জাহান্নামের দিকে। আল্লাহর কসম, আমি জিজ্ঞেস করব, তাদের দোষ কী? লোকটি বলবে, তারা দলে-দলে মুরতাদ হয়ে গেছে। তারপর আরেক দল মানুষ আসবে। আমি তাদেরকে চিনতে পারব। হঠাৎ আমার ও তাদের মাঝ থেকে একজন লোক বের হয়ে আসবে। তারপর তাদেরকে ডাকবে—চলো। আমি জিজ্ঞেস করব, কোথায় যাবে? সে বলবে জাহান্নামের দিকে। আমি জানতে চাইব এদের দোষ কী? তারা বলবে তারা মুরতাদ হয়ে গেছে। আমি তাদের কাউকে মুক্ত হতে দেখব না, তবে পশুপাল উটের মতো (সামান্য কিছু কিছু) মানুষ মুক্ত হতে পারবে。
আবু জর রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমি নবিজীকে বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! হাউজের তাপমাত্রা কেমন হবে? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন—
ওই সত্তার শপথ যার হাতে আমার প্রাণ! (আমার) হাউজের পানপাত্রা নক্ষত্ররাজি অপেক্ষা অন্ধকার রাতের আকাশের নক্ষত্র ও তারকাগুলির চেয়েও বেশি হবে। পাত্রগুলো হবে জান্নাতের। যে ব্যক্তি সেই হাউজ থেকে পান করবে, কিয়ামতের শেষ পর্যন্ত সে পিপাসার্ত হবে না। এই হাউজে জান্নাতের দুটি নালা প্রবাহিত হবে। যে ব্যক্তি সেখান থেকে পান করবে, সে কখনো পিপাসার্ত হবে না। যার প্রস্থ হবে আয়মান থেকে আইলার দূরত্ব সমপরিমাণ। আর তার পানি হবে দুধের চেয়ে সাদা এবং মধুর চেয়ে মিঠা。
আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন—একদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের মাঝেই ছিলেন। হঠাৎ তিনি তন্দ্রাচ্ছন্ন হলেন। তারপর মুচকি হেসে মাথা উদ্বোধন করলেন। আমরা জানতে চাইলাম, আপনি হাসলেন কেন? নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আমার ওপর এই মুহূর্তে একটি সূরা অবতীর্ণ হয়েছে। সুতরাং তিনি পড়লেন—
শুকর করছি অতিশয় দয়ালু পরম করুণাময় আল্লাহর নামে। আমি তোমাকে কাউসার দান করেছি। অতএব, তুমি তোমার রবের জন্য নামাজ পড়ো এবং কুরবানি করো। নিশ্চয় তোমার শত্রুই নির্বংশ হবে।' তারপর বললেন— তোমরা কি জানো কাউসার কী? আমরা বললাম, আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলই ভালো জানেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, সেটি একটি নদী। যার প্রতিটিপ্রান্তে আমার রব আমাকে দিয়েছেন। তাতে রয়েছে অনেক কল্যাণ। সেটি এমন একটি হাউজ, যার পানত্সংখ্যা তারকারাজির সমান। কিয়ামতের দিন আমার উম্মাত সেখান থেকে পান করার জন্য আসবে। তাদের মধ্য থেকে কিছু বান্দাকে ঠেঁল মেরে নিয়ে যাওয়া হবে। আমি বলব—হে আমার রব! সে তো আমার উম্মত! তখন আল্লাহ বলবেন—তুমি জানো না, তোমার অবর্তমানে তারা (দীনের মধ্যে) নতুন কী আবিষ্কার করেছে!
টিকাঃ
[১২৬] সহিহুল বুখারি, খণ্ড: ২০, পৃষ্ঠা: ২১০, হাদিস: ৬২১২。
ব্যাখ্যা: ‘আহ্ল-ক্বুরঅহ’ গ্রন্থপ্রণেতা প্রফুল্লর মন্তব্য হলো, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাউজ হবে পুলসিরাতের পরে। তবে বিশুদ্ধ মতানুযায়ী, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দুটি হাউজ আছে। একটি অবস্থান কিয়ামতের মাঠে পুলসিরাতের আগে। আর দ্বিতীয়টি অবস্থান হলো—জান্নাতে। দুটি হাউজেরই কাউসার বলা হয়। সামনে ইনশাআল্লাহ এর আলোচনা আসবে। আবারি ভাষায় কাউসার শব্দের অর্থ হলো—অফারন্ত কল্যাণ। তবে ইবনু যা হিশাম-কাসসাসের গলায় আছে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেই বলেছেন—
কেউ বলেছেন মিজান আলো, কেউ বলেছেন হাউজ আলো। আবুল হাসান আল-কাবিসী বলেছেন, বিশুদ্ধ কথা হলো—হাউজ আলো।
আমি বলব, প্রকৃত অর্থ হলো দুটিই হবে। কারণ, মানুষেরা কখন থেকে পিপাসার্ত হয়ে উঠবে, যেমন পূর্বে বলা হয়েছে। সুতরাং মানুষ মিজান এবং পুলসিরাতের আগে হাউজের কাছেই আসবে। আবার আল্লাহ তাআলা জান্না—ফেরত। নোট: (লেখক) আমি বলব, হাদিসটি হাউজ হওয়ার সাথে সাথে এ-বিষয়টির প্রতিও খুব ভালোভাবে প্রমাণ বহন করছে যে, হাউজটি কিয়ামতের মাঠে পুলসিরাতের আগেই হবে। কেননা, পুলসিরাত হলো—জাহান্নামের ওপর স্থাপিত সুদীর্ঘ সেতু, যার ওপর দিয়ে পার হতে হবে। যে ব্যক্তি হাউজ থেকে পান করবে, সে জাহান্নামে থেকে নিরাপদ থাকতে পারবে। (তার তো আর পানি পান করে নিরাপদ থাকার প্রয়োজন হবে না।) যা প্রমাণ করে যে, নবিবরের হাউজটি কিয়ামতের ময়দানেই অবস্থিত হবে。
[১২৭] সহিহ মুসলিম, খণ্ড: ২১, পৃষ্ঠা: ৪২২, হাদিস: ৪২২৪。
[১১৯] সহিহ মুসলিম, খণ্ড : ২, পৃষ্ঠা : ৩৯৪, হাদিস : ৪০৭。
📄 হাউজে কাউসার থেকে যাদেরকে বিতাড়িত করা হবে
আবদুল্লাহ ইবনু আমর ইবনুল আস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন—
وَهُوَ حَوْضِي مِسِيرَةَ شَهْرٍ وَزَوَايَاهُ سَوَاءٌ وَمَاؤُهُ أَبْيَضُ مِنَ الْوَرِقِ وَرِيحُهُ أَطْيَبُ مِنَ الْمِسْكِ وَكِيرَانُهُ كَنُجُومِ السَّمَاءِ فَمَنْ شَرِبَ مِنْهُ فَلَا يَظْمَأُ بَعْدَهُ أَبَدًا.
আমার হাউজের আয়তন হবে এক মাসের দূরত্বের সমপরিমাণ। তার কোণগুলো সমান। তার পানি রূপার চেয়ে সাদা, তার গন্ধ মিশকের চেয়ে বেশি সুঘ্রাণযুক্ত, তার পানগুলো আকাশের তারকারাজিসম। যে ব্যক্তি সেখান থেকে পান করবে, সে পরবর্তী সময়ে কখনো পিপাসার্ত হবে না。
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বর্ণনা করেছেন—
لَيَرِدَنَّ عَلَيَّ نَاسٌ مِنْ أَصْحَابِي الْحَوْضَ حَتَّى عَرَفْتُهُمْ اخْتُلِجُوا دُونِي فَأَقُولُ أَصْحَابِي فَيَقُولُ لَا تَدْرِي مَا أَحْدَثُوا بَعْدَكَ.
হাউজের পাশে আমার অনেক উম্মত পানি পান করার জন্য আমার কাছে আসবে। আমি তাদেরকে চিনতে পারব। কিন্তু আমার কাছে আসার পরেই তাদেরকে ঠেলে মেরে উঠিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে। আমি বলব—তারা তো আমার উম্মত! তখন আল্লাহ বলবেন—তুমি জানো না, তোমার অবর্তমানে তারা (দীনের মধ্যে) নতুন কী আবিষ্কার করেছিল!
আসমা বিনত আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন—'আমি হাউজের পাড়ে অবস্থান করতে থাকব। ইতিমধ্যেই তোমাদের মধ্য থেকে অনেকে আমার কাছে পানি পান করার জন্য আসতে চাইবে। তখন তাদের মধ্য থেকে অনেককেই আমার কাছে আসতে বাধা দেওয়া হবে। আমি বলব—হে আমার রব! সে আমার দলের এবং আমার উম্মতের অন্তর্ভুক্ত। তখন বলা হবে, তুমি তো বুঝতে পারোনি যে, তোমার অবর্তমানে তারা কী করেছে! আল্লাহর কসম! তোমার অবর্তমানে তারা অবিচল থাকেনি, বরং উল্টো দিকে ফিরে গেছে।'
ব্যাখ্যা : উলামায়ে কিরাম বলেছেন, যারা মুরতাদ হয়ে যাবে, দীনের মধ্যে এমন কিছু আবিষ্কার করবে—যার প্রতি আল্লাহ রাজি নন এবং যার অনুমতিও আল্লাহ তাআলা প্রদান করেননি, তারাই হাউজে কাউসার থেকে বিতাড়িত হবে এবং তাদেরকে সেখান থেকে দূর করে দেওয়া হবে। আর সবচেয়ে বেশি বিতাড়িত হবে সেসব মানুষ—যারা মুসলিমদের দলবদ্ধতার বিরোধিতা করেছে এবং তাদের পথ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছে। যেমন খারিজিদের বিভিন্ন শ্রেণি, রাফিজিদের বিভিন্ন শ্রেণি পথভ্রষ্টরা এবং মু'তাজিলাদের সমস্ত শ্রেণি। তারা সকলেই দীনকে বিকৃত করেছে। সেসকল জালিম— যারা জুলুম নির্যাতনও লিপ্ত ছিল, সত্যকে দমিয়ে ফেলার অপচেষ্টা করেছে, সত্যের অনুসারীদেরকে হত্যা ও লাঞ্ছিত করেছে। সেসব অভিশপ্ত মানুষ—যারা কবিরা গুনাহের ফাঁদকে হালকা ভেবেছে। ঠিক তেমনিভাবে সেসব মানুষ—যারা দীনের মাঝে বক্রতা ও বিদআত সৃষ্টি করেছে এবং প্রবৃত্তির দাসত্ব করেছে।
টিকাঃ
[১২০] সহিহ মুসলিম, খণ্ড : ১১, পৃষ্ঠা : ৪১১, হাদিস : ৪২৪৪。
[১২১] সহিহ বুখারি, খণ্ড : ২০, পৃষ্ঠা : ২৪৭, হাদিস : ৬২৯৬。
[১২২] সহিহ মুসলিম, খণ্ড : ১১, পৃষ্ঠা : ৪১১, হাদিস : ৪২৪৪。