📘 মৃত্যুর ওপারে অনন্তের পথে > 📄 প্রথমে বান্দার যা হিসাব হবে

📄 প্রথমে বান্দার যা হিসাব হবে


আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন— أَوَّلُ مَا يُقْضَى بَيْنَ النَّاسِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ فِي الدِّمَاءِ কিয়ামতের দিন মানুষের মাঝে প্রথম হত্যা সম্পর্কে ফায়সালা করা হবে。
(কিয়ামতের দিন) ‘প্রথমত বান্দার নামাজের হিসাব গ্রহণ করা হবে এবং মানুষের পরস্পরের মাঝে প্রথমে হত্যার বিচার হবে।’
আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বর্ণনা করেছেন, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন—‘কিয়ামতের দিন নিজকে তার হকদারদেরকে খবর নিয়ে আসা হবে, তখন হত্যাকারী কপালের চুল ও মাথার দিক থেকে তাকে রগগুলো থেকে ধরে বের করা হবে। নিহত ব্যক্তি বলবে—হে আমার রব! এই লোকটি আমাকে হত্যা করেছে, এভাবে তাকে আরশের কাছে নিয়ে যাওয়া হবে।’
আর হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেছেন, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন— কিয়ামতের দিন প্রথমত মানুষের আমলগুলোর মাঝে নামাজের হিসাব গ্রহণ করা হবে। আমাদের রব আল্লাহ তাআলা সবচেয়ে ভালো ভাবে জানা সত্ত্বেও ফিরিশতাদেরকে বলবেন, আমার বান্দার নামাজগুলো দেখো তো পূর্ণ করেছে নাকি অসম্পূর্ণ রেখেছে! যদি পূর্ণ হয়, তাহলে পূর্ণ লিখে দেওয়া হবে। আর যদি অসম্পূর্ণ থাকে, তাহলে ফিরিশতাদেরকে বলবেন—দেখো তো তার কোনো নফল ইবাদত আছে কি না? যদি তার নফল ইবাদত থাকে, তাহলে আল্লাহ তাআলা বলবেন—তার নফল থেকে ফরজগুলোকে পূর্ণ করে দাও। পরে এর ওপর ভিত্তি করেই অন্যান্য আমল গ্রহণ করা হবে。
উলামায়ে কিরাম বলেছেন—নফল ইবাদতের মাধ্যমে ফরজ ইবাদতের অপূর্ণতা পূরণ করে দেওয়া হবে কেবল সেই ব্যক্তির ক্ষেত্রে—যার থেকে অনিচ্ছাকৃত ভুল কোনো ফরজ ছুটে গেছে, অথবা নামাজের রুকু সিজদা সুন্দরভাবে আদায় করতে পারেনি এবং সে তা বুঝতেও পারেনি। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে গোটা নামাজ বা তার কোনো গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছেড়ে দিয়েছে, মনে হওয়ার পর তা আদায় করেনি বরং পরবর্তী সময়ে ফরজের কথা মনে হওয়া সত্ত্বেও নফলও মত হয় না, তাহলে এমন ব্যক্তির ফরজের অপূর্ণতা নফল দিয়ে পূরণ করা হবে না। আল্লাহই ভালো জানেন।
অতএব, আমাদের কর্তব্য হলো—ফরজ আদায়ে যত্নবান হওয়া এবং আল্লাহ তাআলা যেভাবে নির্দেশ করেছেন সেভাবেই আদায় করা। যেমন রুকু সিজদা পূর্ণ করা, কলবকে উপস্থিত রেখে নামাজ আদায় করা। যদি এগুলোর কোনোটিতে উদাসীনতা এসে থেকে, তাহলে নফল দ্বারা তা পূর্ণ করার চেষ্টা করা। এ ব্যাপারে কোনোপ্রকার অবহেলা করবেন না এবং ছেড়েও দেবেন না। যে ব্যক্তি সুন্দরভাবে ফরজ নামাজ পড়তে পারে না, সে নফল ইবাদতও ভালোভাবে পালন না করার পথ খোঁজে। কী সাংঘাতিক ব্যাপার! বরং মানুষ তো চূড়ান্ত পর্যায়ে অসম্পূর্ণতা ও বিফলতার নফল ইবাদত করে। কারণ, তারা মনে করে নফল তো হালকা, নফল তো গুরুত্বপূর্ণ।
আল্লাহপাক কসম! বরং বর্তমান যুগে দেখা যায়—যেই লোকটি মানুষের অনুসরণীয় বলে খ্যাত, যার ইলমের আলোচনা হয়, সেও এভাবে নফল আদায় করে। বরং সে ফরজ নামাজও আদায় করে মুরগির ঠোকরের মতো। তাহলে নামাজ সম্পর্কে জাহিরিরা কী করবে! যদি এটাই বাস্তবতা হয়, তাহলে এমন নফল দিয়ে ফরজের অসম্পূর্ণতা কীভাবে পূর্ণ হবে? আফসোস! আফসোস!
মনে রাখবেন, যদি এমনই হয় নামাজের অবস্থা, তাহলে সেই নামাজি ব্যক্তিও আল্লাহ তাআলার এই ঘোষণার অন্তর্ভুক্ত হবে। যেখানে আল্লাহ তাআলা বলেছেন—
فَخَلَفَ مِنۢ بَعْدِهِمْ خَلْفٌ أَضَاعُواْ ٱلصَّلَوٰةَ وَٱتَّبَعُواْ ٱلشَّهَوَٰتِ فَسَوْفَ يَلْقَوْنَ غَيًّاۗ
অতঃপর তাদের পরে এলো অপরাধী স্থলাভিষিক্তরা। তারা নামাজ নষ্ট করল এবং কুপ্রবৃত্তির অনুসারী হলো। সুতরাং তারা অচিরেই পথভ্রষ্টতা প্রত্যক্ষ করবে। [সুরা মারইয়াম, আয়াত: ৫৯]

টিকাঃ
[১১০] সহিহ মুসলিম, খণ্ড : ২, পৃষ্ঠা : ৩০, হাদিস : ৩১৭৮。
[১১১] সুনানুন নাসায়ি, খণ্ড : ১২, পৃষ্ঠা : ৩৪২, হাদিস : ৩১২৬。
[১১৩] সুনানুন তিরমিযি, খণ্ড : ১০, পৃষ্ঠা : ২৩১, হাদিস : ২৪৫৫। ইমাম তিরমিযি রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, হাদিসটি হাসান গারিব。
[১১৩] সুনানু আবু দাউদ, খণ্ড : ৩, পৃষ্ঠা : ২৮, হাদিস : ৭৬৭; সুনানুন তিরমিযি : হাদিস : ৪১৩; সুনানুন নাসায়ি : হাদিস : ৪৬২。

📘 মৃত্যুর ওপারে অনন্তের পথে > 📄 অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ মানুষের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিবে

📄 অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ মানুষের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিবে


আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন—
ٱلْيَوْمَ نَخْتِمُ عَلَىٰٓ أَفْوَٰهِهِمْ وَتُكَلِّمُنَآ أَيْدِيهِمْ وَتَشْهَدُ أَرْجُلُهُم بِمَا كَانُواْ يَكْسِبُونَ
আজ আমি তাদের মুখে মোহর মেরে দেবো। তাদের হাত আমার সাথে কথা বলবে এবং তাদের পা তাদের কৃতকর্মের সাক্ষ্য দেবে। [সুরা ইয়াসিন, আয়াত: ৬৫]
আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন—
يَوْمَ تَشْهَدُ عَلَيْهِمْ أَلْسِنَتُهُمْ وَأَيْدِيهِمْ وَأَرْجُلُهُم بِمَا كَانُواْ يَعْمَلُونَ
যেদিন প্রকাশ করে দেবে তাদের জিহ্বা, তাদের হাত ও তাদের পা, যা কিছু তারা করত। [সুরা নুর, আয়াত: ২৪]
আর ও ইরশাদ হয়েছে—
وَقَالُواْ لِجُلُودِهِمْ لِمَ شَهِدتُّمۡ عَلَيۡنَاۖ
এবং তারা নিজেদের চামড়াগুলোকে বলবে—তোমরা আমাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিচ্ছ কেন? [সুরা ফুসসিলাত, আয়াত: ২১]
আবু সাঈদ খুদরি রাহিমাহুল্লাহু বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন—
يَوْمَ يَبْعَثُهُمُ ٱللَّهُ جَمِيعٗا فَيُنَبِّئُهُم بِمَا عَمِلُوٓاْ ۚ أَحۡصَىٰهُ ٱللَّهُ وَنَسُوهُ ۚ وَٱللَّهُ عَلَىٰ كُلِّ شَيۡءٖ شَهِيدٌ
কিয়ামতের দিন বান্দাকে হাজির করা হবে। তখন আল্লাহ তাআলা বলবেন, আমি কি তোমাকে কান, চোখ, সম্পদ এবং সন্তান দিইনি? তোমার জন্য চতুষ্পদ জন্তু এবং ফসলকে অনুগত করে দিইনি? আমি কি তোমাকে মাথা উঁচু করে নেতৃত্ব দেওয়ার এবং বিশ্রামী হয়ে চলার সুযোগ করে দিইনি? তুমি কি কখনো ভেবেছিলে আজকে আমার সাথে সাক্ষাৎ করতে হবে? বান্দা বলবে—না। তখন আল্লাহ বলবেন—আজকে আমি তোমাকে ভুলে গেলাম, তুমি যেভাবে আমাকে ভুলে গিয়েছিলে。
আনাস ইবনু মালেক রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমরা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে উপস্থিত ছিলাম, খিদমতে তিনি হেসে উঠলেন। তারপর বললেন, তোমরা কি জানো আমি কেন হাসলাম? আমরা বললাম, আল্লাহ্ এবং তাঁর রাসুলই ভালো জানেন। তখন তিনি বললেন—
‘বান্দা তার রবের সাথে যে কথোপকথন হবে তা স্মরণ হয়ে গেল। বান্দা বলবে, হে আমার রব, তুমি কি আমাকে জুলুম থেকে মুক্তি দাওনি? আল্লাহ বলবেন—অবশ্যই。
বান্দা বলবে, আমি আমার ব্যাপারে নিজের সাক্ষ্য ব্যতীত কারও সাক্ষ্য হওয়াকে মেনে করি না। আল্লাহ বলবেন—আজকে তোমার বিরুদ্ধে তোমার নফস এবং কিরামান কাতিবিন-ই সাক্ষী হিসেবে যথেষ্ট। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন— সুতরাং তার মুখের ওপর সিলগালা করে দিয়ে তার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে বলা হবে—তোমরা কথা বলো! সুতরাং সেগুলো নিজেদের কর্মের কথাগুলো প্রকাশ করবে। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন—তারপর বান্দা ও তার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের কথার মাঝে থেকে অজুহাত তুলে দেওয়া হবে। তখন বান্দা বলবে—তোরা দূর হয়ে যা, তোরা ভোগে যা। তোদের কারণেই তো আমি (পাপের পথে) সংগ্ৰাম করেছি।”
আনাস ইবনু মালেক রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেছেন, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন—
‘কিয়ামতের দিন কাফিরকে নিয়ে আসা হবে। অতঃপর তাকে বলা হবে, তোমাকে যদি জমিন পূর্ণ করে স্বর্ণ দেওয়া হতো, তাহলে তুমি কি তা থেকে দান করতে? সে বলবে, হ্যাঁ। তখন তাকে বলা হবে—তোমার কাছে এর চেয়েও কম মূল্যের বস্তু চাওয়া হয়েছিল (কিন্তু তুমি তা দান করোনি)।’

টিকাঃ
[১১০] সহীহ মুসলিম, খণ্ড: ৪, পৃষ্ঠা: ২২৭, হাদিস: ৩০২২。
[১১৪] সহীহ মুসলিম, খণ্ড: ১৪, পৃষ্ঠা: ২২৩, হাদিস: ৫২৯৭。
[১১৫] সহীহ বুখারি, খণ্ড: ২০, পৃষ্ঠা: ২০৪, হাদিস: ৬৪৬৭। ইমাম মুসলিমও হাদীসটি বর্ণনা করেছেন, তবে মূল পাঠ কিছুটা লেখক থেকে। যেমন সহীহ বুখারিতে আছে—
قَدْ كُنْتَ سُئِلْتَ مَا هُوَ أَيَسَرُ مِنْ ذَلِكَ
তোমার কাছে এর চেয়েও কমমূল্যের বস্তু চাওয়া হয়েছিল (কিন্তু তুমি তা দান করোনি)। আর সহীহ মুসলিমে আছে—
كُنْتَ قَدْ سُئِلْتَ مَا هُوَ أَيْسَرُ مِنْ ذَلِكَ
‘তুমি মিথ্যা বলছো! কারণ, তোমার কাছে এর চেয়েও কম মূল্যের বস্তু চাওয়া হয়েছিল (কিন্তু তুমি তা দান করোনি)।’

📘 মৃত্যুর ওপারে অনন্তের পথে > 📄 পূর্ববর্তী নবিদের পক্ষে উম্মতে মুহাম্মাদির সাক্ষ্য

📄 পূর্ববর্তী নবিদের পক্ষে উম্মতে মুহাম্মাদির সাক্ষ্য


আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন—
فَلَنَسْـَٔلَنَّ ٱلَّذِينَ أُرۡسِلَ إِلَيۡهِمۡ وَلَنَسْـَٔلَنَّ ٱلۡمُرْسَلِينَ ٦٨ فَلَنَقُصَّنَّ عَلَيۡهِم بِعِلۡمٖ وَمَا كُنَّا غَآئِبِينَ ٦٩
অতএব, আমি অবশ্যই আমাদের জিজ্ঞাস করব—যাদের কাছে রাসুল প্রেরিত হয়েছিলেন এবং আমি অবশ্যই জিজ্ঞাসাবাদ করব রাসুলগণকে। অতঃপর আমি সজ্ঞানে তাদের কাছে অবস্থা বর্ণনা করব, বস্তুত আমি অনুপস্থিত ছিলাম না। [সুরা আ’রাফ, আয়াত: ৬-৭]
আর ও ইরশাদ হয়েছে—
فَأَوۡجَسَ مِنۡهُمۡ خِيفَةٗ قَالُواْ لَا تَخَفۡۖ
অতএব, আপনার পালনকর্তার কসম! আমি অবশ্যই ওদের সবাইকে জিজ্ঞাসাবাদ করব! [সুরা হিজর, আয়াত: ৯২]
জিজ্ঞাসাবাদের আরও হবে নবিদের থেকে। ইরশাদ হয়েছে—
فَيَقُولُ مَاذَا أُجِبۡتُمۡ
তোমাদের কী জবাব দেওয়া হয়েছে? [সুরা মায়েদা, আয়াত: ১০৯]
এই আয়াতের তাফসিরে বলা হয়েছে, তারা সবগুলো জবাব জানতেন। কিন্তু আজকে তাদের জ্ঞান লোপ পাবে, তাদের বুদ্ধি চলে যাবে এবং কঠিন আতঙ্ক, সংশোধনের আবশ্যতা এবং বিষয়টির কাঠিন্যে তারা সব ভুলে যাবেন। যার কারণে তারা জবাব দেবেন—
لَا عِلْمَ لَنَآ ۖ إِنَّكَ أَنتَ عَلَّٰمُ ٱلۡغُيُوبِ
আমরা অবগত নই; আপনিই অদৃশ্য বিষয়ে মহাজ্ঞানী। [সুরা মায়েদা, আয়াত: ১০৯]
তারপর আল্লাহ তাআলা নবিদেরকে নৈকট্য প্রদান করবেন। অতঃপর নূহ আলাইহিস সালামকে ডাকবেন। ডেকে বলা হবে—আজকে গোটা সমাবেশের জ্ঞান লোপ পাওয়ায় জবাব দিতে পারবেন না। তারপর আল্লাহ তাআলা তাদেরকে স্বাভাবিক করবেন, তাদের স্মরণশক্তি জাগ্রত করবেন। সুতরাং তারা উন্মুক্ত পক্ষ হয়ে নির্জন জিজ্ঞাসার জবাব দেবেন। বলা হয়—তারা আত্মসম্পূর্ণমূলক জবাব দেবেন। যেমন ঈসা মাসিহ আলাইহিস সালাম বলবেন—
تَعْلَمُ مَا فِى نَفْسِى وَلَآ أَعْلَمُ مَا فِى نَفْسِكَ ۚ إِنَّكَ أَنتَ عَلَّٰمُ ٱلۡغُيُوبِ
আপনি তো আমার মনের কথা জানেন এবং আর আমি জানি না যা আপনার মনে আছে। নিশ্চয় আপনিই অদৃশ্য বিষয়ে জ্ঞাত। [সুরা মায়েদা, আয়াত: ১১৬]
যে প্রথম মতটিই অধিক বিশুদ্ধ। কারণ, রাসুলদের মাঝে পদমর্যাদার তারতম্য রয়েছে। হাঁ, ইসা আলাইহিস সালাম সর্বাধিক মর্যাদাশীলদের মধ্যে একজন। কেননা, তিনি আল্লাহ্ তায়ালার কালিমা এবং তাঁর সৃষ্টি রুহ। ইমাম আবু হামেদ রাহিমাহুল্লাহু এভাবেও বলেছেন।
আবু সাঈদ খুদরি রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন—
'(কিয়ামতের দিন) একজন নবি আসবেন, তার সাথে দুজন অথবা তিনজন লোক আসবে। বা তার চেয়েও বেশকম মানুষ থাকবে। তখন নবিকে বলা হবে—আপনি কি আপনার জাতির কাছে দ্বীন পৌঁছিয়েছেন? তিনি বলবেন—হ্যাঁ। তখন তাঁর জাতিকে ডাকা হবে। অতঃপর তাদেরকে জিজ্ঞাসা করা হবে, নবি কি তোমাদের কাছে দ্বীন পৌঁছিয়েছেন? তারা বলবে—না। তখন নবিকে বলা হবে—আপনার পক্ষে কে সাক্ষ্য দেবে? নবি বলবেন—মুহাম্মাদ এবং তাঁর উম্মতরা। অতঃপর মুহাম্মাদ উম্মতকে ডাকা হবে এবং তাদেরকে জিজ্ঞাসা করা হবে—এই নবি কি তার জাতির কাছে দ্বীন পৌঁছিয়েছেন? তারা বলবে, হ্যাঁ। তখন তাদেরকে বলা হবে—তোমরা এটা কীভাবে জানলে? তারা বলবে, আমাদের নবি আমাদেরকে জানিয়েছেন—রাসুলগণ তার জাতির কাছে দ্বীন পৌঁছিয়েছেন। আমরা আমাদের নবিকে সম্মান করেছি। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, এ কথাটিই কুরআন কারিমে বলা হয়েছে—
وَكَذَٰلِكَ جَعَلۡنَٰكُمۡ أُمَّةٗ وَسَطٗا لِّتَكُونُواْ شُهَدَآءَ عَلَى ٱلنَّاسِ وَيَكُونَ ٱلرَّسُولُ عَلَيۡكُمۡ شَهِيدٗا
এমনিভাবে আমি তোমাদের মধ্যপন্থী সম্প্রদায় করেছি, যাতে করে তোমরা সাক্ষ্যদাতা হও মানবমণ্ডলীর জন্য এবং যাতে রাসুল সাক্ষ্যদাতা হন তোমাদের জন্য। [সুরা বাকারা, আয়াত: ১৪৩]
আবু সাঈদ খুদরি রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন—
‘কিয়ামতের দিন নূহ আলাইহিস সালামকে ডাকা হবে। তিনি বলবেন, হে আমার রব! আমি উপস্থিত! তখন আল্লাহ তাআলা জিজ্ঞাসা করবেন, তুমি কি দ্বীন পৌঁছে দিয়েছ? তিনি বলবেন, হ্যাঁ। তখন তাঁর উম্মতকে জিজ্ঞাসা করা হবে—নূহ কি তোমাদের কাছে দ্বীন পৌঁছে দিয়েছেন? তারা বলবে—আমাদের কাছে কোনো সতর্ককারী আসেনি। তখন আল্লাহ নূহকে জিজ্ঞাসা করবেন, তোমার সাক্ষী কে? তিনি বলবেন—মুহাম্মাদ এবং তাঁর উম্মত। তখন সাক্ষ্য দেবে যে, নূহ আলাইহিস সালাম দ্বীন তাঁর জাতির কাছে পৌঁছেছেন। কুরআনের আয়াত এবং রাসূল তোমাদের বিপক্ষে সাক্ষী হবেন। এটাই হচ্ছে নিচের আয়াতটির নূর—
এমিভাবে আমি তোমাদের মধ্যপস্থী সম্প্রদায় করেছি, যাতে করে তোমরা সাক্ষ্যদাতা হও মানবমণ্ডলীর জন্য এবং যাতে রাসূল সাক্ষ্যদাতা হন তোমাদের জন্য। [সূরা বাকারা, আয়াত: ১৪৩]

📘 মৃত্যুর ওপারে অনন্তের পথে > 📄 যাকাত অস্বীকারকারীর শাস্তি এবং প্রতারক ও সীমালঙ্ঘনকারীর লাঞ্ছনা

📄 যাকাত অস্বীকারকারীর শাস্তি এবং প্রতারক ও সীমালঙ্ঘনকারীর লাঞ্ছনা


আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন—
‘যে স্বর্ণ ও রৌপ্যর মালিক তার হক আদায় করেনি (জাকাত প্রদান করেনি), কিয়ামতের দিন তার জন্য আগুনের পাত বানানো হবে। অতঃপর সেটিকে আগুনে জ্বালানো হবে। তারপর উত্তপ্ত পাতের মাধ্যমে তার পিঠকে, তার কপালকে এবং তার পিঠ পুঁকিয়ে দেওয়া হবে। যখনই শীতল হয়ে যাবে, আবার গরম করা হবে; এমন দিন এটি করা হবে—যেদিনের পরিমাণ হবে (দুনিয়ার) পঞ্চাশ হাজার বছর। এরই মাঝে বান্দাদের ফায়সালা হয়ে যাবে। তারা হয়তো জান্নাতের পথ নতুবা জাহান্নামের পথ দেখবে। বলা হলো—হে আল্লাহর রাসূল, উটের বিষয়টি? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন—উটের মালিকও যদি তার অধিকার প্রদান না করে, যেমন তার অধিকারের মধ্য থেকে এটাও যে—তার পানি পান করার দিন তাকে দোহন করা হবে; (যদি তার অধিকারগুলো প্রদান না করা হয়) তাহলে কিয়ামতের দিন তার জন্য এমন বিশাল ও সমতল ভুমির ব্যবস্থা করা হবে—যেখানে একটি দানার অধিকারও বাদ পড়বে না। এই মাঠের মধ্যে উট তাকে খুর দ্বারা পদদলিত করবে এবং মুখ দ্বারা কামড়াবে। এরপর যখন এমন করবে, আবার শুরু করা হবে। সে দিনটি হবে পঞ্চাশ হাজার বছরের সমপরিমাণ। এভাবে একসময় বান্দাদের ফায়সালা হয়ে যাবে। তারা হয়তো জান্নাতের দিকে বা নতুবা জাহান্নামের দিকে নিজের পথ দেখবে। আবার জিজ্ঞেস করা হলো—হে আল্লাহ রাসূল! গরু ও ছাগলের ব্যাপারটি? রাসূল সা. বললেন, গরু ও ছাগলের মালিকও যে তাদের অধিকার আদায় করেনি, কিয়ামতের দিন তার জন্য বিশাল সমতল ভূমির ব্যবস্থা করা হবে। যেখানে কোনো অধিকার বাদ পড়বে না। কোনো গরু বা ছাগলের প্যাটানো শিং থাকবে না, কোনোটি শিংহীন থাকবে না এবং কোনোটীর শিং ভেতর থেকে ভাঙাও থাকবে না। এমন গরু ও ছাগলগুলো তাকে শিং দ্বারা গুঁতোবে এবং খুর দ্বারা পদদলিত করবে। একবার যখন আক্রমণ করবে, আবার ফিরিয়ে দেওয়া হবে। এই দিনটি হবে পঞ্চাশ হাজার বছরের সমপরিমাণ। একসময় বান্দাদের মাঝে ফায়সালা হয়ে যাবে। প্রত্যেকেই জান্নাতের পথ বা জাহান্নামের পথ দেখবে。
হাদিসটি এই অর্থে বুখারিও বর্ণনা করেছেন。
আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন—
مَنْ آتَاهُ اللَّهُ مَالًا فَلَمْ يُؤَدِّ زَكَاتَهُ مُثِّلَ لَهُ مَالُهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ شُجَاعًا أَقْرَعَ لَهُ زَبِيبَتَانِ يَطَوَّقُهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ ثُمَّ يَأْخُذُ بِلِهْزِمَتَيْهِ يَعْنِي بِشِدْقَيْهِ ثُمَّ يَقُولُ أَنَا مَالُكَ أَنَا كَنْزُكَ ) ثُمَّ تَلَا { لَا يَحْسَبَنَّ الَّذِينَ يَبْخَلُونَ }
যাকে আল্লাহ সম্পদ দান করেছেন কিন্তু সে সম্পদের জাকাত প্রদান করল না, কিয়ামতের দিন সেই সম্পদকে তার জন্য এমন টাকওয়ালা দুই মুখ-বিশিষ্ট বিষাক্ত সাপ রূপান্তরিত করা হবে। সাপটিকে তার গলায় প্যাঁচিয়ে দেওয়া হবে। সাপটি তার দুই চাপাকে জাপটে ধরবে, তারপর বলবে—আমি তোর সম্পদ, আমি তোর অর্থের ভান্ডার। তারপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই আয়াতটি তিলাওয়াত করেছেন—
وَلَا يَحْسَبَنَّ الَّذِينَ يَبْخَلُونَ بِمَا آتَاهُمُ اللَّهُ مِن فَضْلِهِ هُوَ خَيْرًا لَّهُمْ ۖ بَلْ هُوَ شَرٌّ لَّهُمْ ۖ سَيُطَوَّقُونَ مَا بَخِلُوا بِهِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ ۗ
মানুষ যেন আল্লাহ্প্রদত্ত সম্পদ কুক্ষিগত করাকে তাদের জন্য কল্যাণকর মনে না করে। বরং এটা তাদের পক্ষে ক্ষতিকর হবে। যেসব বিষয় নিয়ে তারা কার্পণ্য করে সেগুলো বেড়ি বানিয়ে কিয়ামতের দিন তাদের গলায় পরানো হবে。
আবদুল্লাহ ইবনু উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন—
কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা যখন পূর্বাপর সকলদেরকে সমবেত করবেন, তখন প্রত্যেক প্রতারকের জন্য পতাকা উঁচু করা হবে এবং বলা হবে—এটা অমুকের ছেলে অমুকের সে প্রতারণাকারী。
আল্লাহ তাআলা সীমালঙ্ঘনকারী এবং জাকাত অস্বীকারকারীকে যে লাঞ্ছনায় পতিত করবেন, তা ঠিক গদ্দারের লাঞ্ছনার মতোই হবে। আল্লাহ তাআলা এই শাস্তিকে মানুষের বুঝ ও অনুধাবন-শক্তি অনুপাতে নির্ধারিত করেছেন।

টিকাঃ
[১১৯] সহিহ মুসলিম, খণ্ড: ৫, পৃষ্ঠা: ১৯৩, হাদিস: ১৬৪৭。
[১২০] সহিহুল বুখারি: হাদিস: ১৪০২。
[১২১] সহিহুল বুখারি, খণ্ড: ৫, পৃষ্ঠা: ২১৩, হাদিস : ১৪০৩। তবে হাদিসে কেবল আয়াতের প্রথমাংশটি উল্লেখ আছে। হাসাদিক হওয়ার কারণে আমি পরেরও অংশকাল উল্লেখ করেছি। — অনুবাদক。
[১২২] সহিহ মুসলিম, খণ্ড: ৫, পৃষ্ঠা: ১৯৩, হাদিস: ১৬৪৬。

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00