📘 মৃত্যুর ওপারে অনন্তের পথে > 📄 কিয়ামতের দিন হবে ইনসাফ ও বদলা নেওয়ার দিন

📄 কিয়ামতের দিন হবে ইনসাফ ও বদলা নেওয়ার দিন


আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেছেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন—
لَتُؤَدُّنَّ الْحُقُوقَ إِلَى أَهْلِهَا يَوْمَ الْقِيَامَةِ حَتَّى يُقَادَ لِلشَّاةِ الْجَلْحَاءِ مِنَ الشَّاةِ الْقَرْنَاءِ কিয়ামতের দিন অধিকারীর অধিকার প্রদান করা হবে। এমনকি শিংহীন ছাগলকে শিংযুক্ত ছাগল থেকে বদলা নেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে。
আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন— যদি কারও কাছে তার ভাইয়ের কাছ জুলুম নেওয়া কোনো বস্তু থাকে, তাহলে সে যেন আজকেই তার কাছ থেকে তা শেষ করে নেয়। কেননা, পরে অর্থ-কড়িও নাও থাকতে পারে; সেই ক্ষতিটি আসার পূর্বে—যখন তার ভাইয়ের জন্য তার সওয়াব থেকে জুলুমের বিনিময় দেওয়া হবে; নেকি না থাকলে ভাইয়ের গুনাহ তার ওপর চাপানো হবে。
আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন— ‘তোমরা কি জানো প্রকৃত নিস্ব কে?’ সাহাবাগণ বললেন, নিস্ব তো সেই ব্যক্তি যার কাছে অর্থসম্পদ কিছু নেই। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আমার উম্মতের মধ্যে নিস্ব তো ওই ব্যক্তি—যে কিয়ামতের দিন নামাজ, রোজা, যাকাত নিয়ে হাজির হবে; কিন্তু সে কাউকে গালি দিয়েছে, কারও ওপর মিথ্যা অপবাদ আরোপ করেছে, কারও সম্পদ অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করেছে, অন্যায়ভাবে কারও রক্ত প্রবাহিত করেছে বা কাউকে প্রহার করেছে। সুতরাং একজনকে নেকি দেবে, আরেকজনকে নেকি দেবে। যদি সবার অধিকার আদায়ের পূর্বেই তার নেকি শেষ হয়ে যায়, তাহলে হকদারদের গুনাহ তার ওপর চাপানো হবে, তারপর তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে。
আমরা যখন এটা স্বীকার করব, তখন প্রতিটি মুসলিমের ওপর জরুরি হবে, নিজের নফসের হিসাবের প্রতি সজাগ হওয়া। যেমন উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন—
حَاسِبُوا أَنْفُسَكُمْ قَبْلَ أَنْ تُحَاسَبُوا وَزِنُوا قَبْلَ أَنْ تُوزَنُوا তোমরা নিজেদের হিসাব নাও হিসাব করার পূর্বে এবং নিজের আমল পরিমাপ করো—তোমাদের আমল পরিমাপ করার পূর্বে।
তো নিজের হিসাব নিজে কীভাবে করতে হবে? পদ্ধতি হলো—মৃত্যুর পূর্বে সমস্ত পাপের থেকে একনিষ্ঠভাবে তাওবা করতে হবে। আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে ফরজকৃত ছুটে যাওয়া বিধানগুলোকে পূর্ণ করতে হবে। মাজলুমদের অধিকারগুলো পুঙ্খানুপুঙ্খ বুঝিয়ে দিতে হবে। যাদেরকে কষ্ট দেওয়া হয়েছে—সেটা মুখ দিয়ে হোক, হাত দিয়ে হোক, হৃদয়ের ওপর চাপ প্রয়োগ করা হোক—সকলকে সন্তুষ্ট করতে হবে। যেন মৃত্যুর মুহূর্তে তার দায়িত্বে কোনো ফরজ বা জুলুম অবশিষ্ট না থাকে। এমন ব্যক্তি বিনা হিসাবে জান্নাতে প্রবেশ করবে।
আর যদি মাজলুমের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার পূর্বেই মারা যায়, তাহলে সকল হকদার জমা হবে। তারপর কেউ তার হাত ধরবে, কেউ কপালের চুল ধরবে, কেউ তার গলা ধরবে। একজন বলবে, আমার প্রতি তুই জুলুম করেছিস, আরেকজন বলবে—আমাকে গালি দিয়েছিস। আরেকজন বলবে—আমাকে উপহাস করেছিস। অন্যজন বলবে—পঁচাতে আমার নিন্দা করেছিস। আরেকজন বলবে—আমি তোর প্রতিবেশী ছিলাম, আমার সাথে অসদাচরণ করেছিস। একজন বলবে—আমাকে কাজ দিয়ে প্রতারণা করেছিস। আরেকজন বলবে—আমার কাছে পণ্য বিক্রয় করেছিস দোষ গোপন রেখে। কেউ বলবে—আমাকে অভাবী দেখেছিলে অথচ তুই ধনাঢ্য ছিলি, তারপরও আমার আহরণের ব্যবস্থা করিসনি। অন্যজন বলবে—আমাকে মাজলুম পেয়েছিলি, ওদিকে তুই জুলুমের প্রতিরোধ করার ক্ষমতা রাখিস; কিন্তু তুমি জালিমের সাথে সখ্য করেছিলে, আমার প্রতি কোনোশঙ্কার সহানুভূতি দেখাসনি। (অতএব, এগুলোর ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে)।

টিকাঃ
[১০৬] সহিহ মুসলিম, খণ্ড : ১৯, পৃষ্ঠা : ৪৩০, হাদিস : ৪৬৭৯。
[১০৭] সহিহ বুখারি, খণ্ড : ১০, পৃষ্ঠা : ১৪৫, হাদিস : ৬০৫৩。
[১০৮] সহিহ বুখারি, খণ্ড : ১২, পৃষ্ঠা : ৪২২, হাদিস : ৬৪২৪。
[১০৯] তিরমিযি, আলোচ্য হাদিসে বুঝানো হয়েছে, ঐ ব্যক্তির আমলনামায় নামাজ-রোজা সহ আসল থাকার পরও সে কিয়ামতের দিন নিস্ব হয়ে যাবে। কারণ, তার নেকি ওই সকল লোকের দিয়ে দিতে হবে; দুনিয়াতে যাদের হক সে নষ্ট করেছে—সম্পাদক。

📘 মৃত্যুর ওপারে অনন্তের পথে > 📄 প্রথমে বান্দার যা হিসাব হবে

📄 প্রথমে বান্দার যা হিসাব হবে


আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন— أَوَّلُ مَا يُقْضَى بَيْنَ النَّاسِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ فِي الدِّمَاءِ কিয়ামতের দিন মানুষের মাঝে প্রথম হত্যা সম্পর্কে ফায়সালা করা হবে。
(কিয়ামতের দিন) ‘প্রথমত বান্দার নামাজের হিসাব গ্রহণ করা হবে এবং মানুষের পরস্পরের মাঝে প্রথমে হত্যার বিচার হবে।’
আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বর্ণনা করেছেন, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন—‘কিয়ামতের দিন নিজকে তার হকদারদেরকে খবর নিয়ে আসা হবে, তখন হত্যাকারী কপালের চুল ও মাথার দিক থেকে তাকে রগগুলো থেকে ধরে বের করা হবে। নিহত ব্যক্তি বলবে—হে আমার রব! এই লোকটি আমাকে হত্যা করেছে, এভাবে তাকে আরশের কাছে নিয়ে যাওয়া হবে।’
আর হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেছেন, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন— কিয়ামতের দিন প্রথমত মানুষের আমলগুলোর মাঝে নামাজের হিসাব গ্রহণ করা হবে। আমাদের রব আল্লাহ তাআলা সবচেয়ে ভালো ভাবে জানা সত্ত্বেও ফিরিশতাদেরকে বলবেন, আমার বান্দার নামাজগুলো দেখো তো পূর্ণ করেছে নাকি অসম্পূর্ণ রেখেছে! যদি পূর্ণ হয়, তাহলে পূর্ণ লিখে দেওয়া হবে। আর যদি অসম্পূর্ণ থাকে, তাহলে ফিরিশতাদেরকে বলবেন—দেখো তো তার কোনো নফল ইবাদত আছে কি না? যদি তার নফল ইবাদত থাকে, তাহলে আল্লাহ তাআলা বলবেন—তার নফল থেকে ফরজগুলোকে পূর্ণ করে দাও। পরে এর ওপর ভিত্তি করেই অন্যান্য আমল গ্রহণ করা হবে。
উলামায়ে কিরাম বলেছেন—নফল ইবাদতের মাধ্যমে ফরজ ইবাদতের অপূর্ণতা পূরণ করে দেওয়া হবে কেবল সেই ব্যক্তির ক্ষেত্রে—যার থেকে অনিচ্ছাকৃত ভুল কোনো ফরজ ছুটে গেছে, অথবা নামাজের রুকু সিজদা সুন্দরভাবে আদায় করতে পারেনি এবং সে তা বুঝতেও পারেনি। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে গোটা নামাজ বা তার কোনো গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছেড়ে দিয়েছে, মনে হওয়ার পর তা আদায় করেনি বরং পরবর্তী সময়ে ফরজের কথা মনে হওয়া সত্ত্বেও নফলও মত হয় না, তাহলে এমন ব্যক্তির ফরজের অপূর্ণতা নফল দিয়ে পূরণ করা হবে না। আল্লাহই ভালো জানেন।
অতএব, আমাদের কর্তব্য হলো—ফরজ আদায়ে যত্নবান হওয়া এবং আল্লাহ তাআলা যেভাবে নির্দেশ করেছেন সেভাবেই আদায় করা। যেমন রুকু সিজদা পূর্ণ করা, কলবকে উপস্থিত রেখে নামাজ আদায় করা। যদি এগুলোর কোনোটিতে উদাসীনতা এসে থেকে, তাহলে নফল দ্বারা তা পূর্ণ করার চেষ্টা করা। এ ব্যাপারে কোনোপ্রকার অবহেলা করবেন না এবং ছেড়েও দেবেন না। যে ব্যক্তি সুন্দরভাবে ফরজ নামাজ পড়তে পারে না, সে নফল ইবাদতও ভালোভাবে পালন না করার পথ খোঁজে। কী সাংঘাতিক ব্যাপার! বরং মানুষ তো চূড়ান্ত পর্যায়ে অসম্পূর্ণতা ও বিফলতার নফল ইবাদত করে। কারণ, তারা মনে করে নফল তো হালকা, নফল তো গুরুত্বপূর্ণ।
আল্লাহপাক কসম! বরং বর্তমান যুগে দেখা যায়—যেই লোকটি মানুষের অনুসরণীয় বলে খ্যাত, যার ইলমের আলোচনা হয়, সেও এভাবে নফল আদায় করে। বরং সে ফরজ নামাজও আদায় করে মুরগির ঠোকরের মতো। তাহলে নামাজ সম্পর্কে জাহিরিরা কী করবে! যদি এটাই বাস্তবতা হয়, তাহলে এমন নফল দিয়ে ফরজের অসম্পূর্ণতা কীভাবে পূর্ণ হবে? আফসোস! আফসোস!
মনে রাখবেন, যদি এমনই হয় নামাজের অবস্থা, তাহলে সেই নামাজি ব্যক্তিও আল্লাহ তাআলার এই ঘোষণার অন্তর্ভুক্ত হবে। যেখানে আল্লাহ তাআলা বলেছেন—
فَخَلَفَ مِنۢ بَعْدِهِمْ خَلْفٌ أَضَاعُواْ ٱلصَّلَوٰةَ وَٱتَّبَعُواْ ٱلشَّهَوَٰتِ فَسَوْفَ يَلْقَوْنَ غَيًّاۗ
অতঃপর তাদের পরে এলো অপরাধী স্থলাভিষিক্তরা। তারা নামাজ নষ্ট করল এবং কুপ্রবৃত্তির অনুসারী হলো। সুতরাং তারা অচিরেই পথভ্রষ্টতা প্রত্যক্ষ করবে। [সুরা মারইয়াম, আয়াত: ৫৯]

টিকাঃ
[১১০] সহিহ মুসলিম, খণ্ড : ২, পৃষ্ঠা : ৩০, হাদিস : ৩১৭৮。
[১১১] সুনানুন নাসায়ি, খণ্ড : ১২, পৃষ্ঠা : ৩৪২, হাদিস : ৩১২৬。
[১১৩] সুনানুন তিরমিযি, খণ্ড : ১০, পৃষ্ঠা : ২৩১, হাদিস : ২৪৫৫। ইমাম তিরমিযি রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, হাদিসটি হাসান গারিব。
[১১৩] সুনানু আবু দাউদ, খণ্ড : ৩, পৃষ্ঠা : ২৮, হাদিস : ৭৬৭; সুনানুন তিরমিযি : হাদিস : ৪১৩; সুনানুন নাসায়ি : হাদিস : ৪৬২。

📘 মৃত্যুর ওপারে অনন্তের পথে > 📄 অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ মানুষের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিবে

📄 অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ মানুষের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিবে


আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন—
ٱلْيَوْمَ نَخْتِمُ عَلَىٰٓ أَفْوَٰهِهِمْ وَتُكَلِّمُنَآ أَيْدِيهِمْ وَتَشْهَدُ أَرْجُلُهُم بِمَا كَانُواْ يَكْسِبُونَ
আজ আমি তাদের মুখে মোহর মেরে দেবো। তাদের হাত আমার সাথে কথা বলবে এবং তাদের পা তাদের কৃতকর্মের সাক্ষ্য দেবে। [সুরা ইয়াসিন, আয়াত: ৬৫]
আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন—
يَوْمَ تَشْهَدُ عَلَيْهِمْ أَلْسِنَتُهُمْ وَأَيْدِيهِمْ وَأَرْجُلُهُم بِمَا كَانُواْ يَعْمَلُونَ
যেদিন প্রকাশ করে দেবে তাদের জিহ্বা, তাদের হাত ও তাদের পা, যা কিছু তারা করত। [সুরা নুর, আয়াত: ২৪]
আর ও ইরশাদ হয়েছে—
وَقَالُواْ لِجُلُودِهِمْ لِمَ شَهِدتُّمۡ عَلَيۡنَاۖ
এবং তারা নিজেদের চামড়াগুলোকে বলবে—তোমরা আমাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিচ্ছ কেন? [সুরা ফুসসিলাত, আয়াত: ২১]
আবু সাঈদ খুদরি রাহিমাহুল্লাহু বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন—
يَوْمَ يَبْعَثُهُمُ ٱللَّهُ جَمِيعٗا فَيُنَبِّئُهُم بِمَا عَمِلُوٓاْ ۚ أَحۡصَىٰهُ ٱللَّهُ وَنَسُوهُ ۚ وَٱللَّهُ عَلَىٰ كُلِّ شَيۡءٖ شَهِيدٌ
কিয়ামতের দিন বান্দাকে হাজির করা হবে। তখন আল্লাহ তাআলা বলবেন, আমি কি তোমাকে কান, চোখ, সম্পদ এবং সন্তান দিইনি? তোমার জন্য চতুষ্পদ জন্তু এবং ফসলকে অনুগত করে দিইনি? আমি কি তোমাকে মাথা উঁচু করে নেতৃত্ব দেওয়ার এবং বিশ্রামী হয়ে চলার সুযোগ করে দিইনি? তুমি কি কখনো ভেবেছিলে আজকে আমার সাথে সাক্ষাৎ করতে হবে? বান্দা বলবে—না। তখন আল্লাহ বলবেন—আজকে আমি তোমাকে ভুলে গেলাম, তুমি যেভাবে আমাকে ভুলে গিয়েছিলে。
আনাস ইবনু মালেক রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমরা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে উপস্থিত ছিলাম, খিদমতে তিনি হেসে উঠলেন। তারপর বললেন, তোমরা কি জানো আমি কেন হাসলাম? আমরা বললাম, আল্লাহ্ এবং তাঁর রাসুলই ভালো জানেন। তখন তিনি বললেন—
‘বান্দা তার রবের সাথে যে কথোপকথন হবে তা স্মরণ হয়ে গেল। বান্দা বলবে, হে আমার রব, তুমি কি আমাকে জুলুম থেকে মুক্তি দাওনি? আল্লাহ বলবেন—অবশ্যই。
বান্দা বলবে, আমি আমার ব্যাপারে নিজের সাক্ষ্য ব্যতীত কারও সাক্ষ্য হওয়াকে মেনে করি না। আল্লাহ বলবেন—আজকে তোমার বিরুদ্ধে তোমার নফস এবং কিরামান কাতিবিন-ই সাক্ষী হিসেবে যথেষ্ট। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন— সুতরাং তার মুখের ওপর সিলগালা করে দিয়ে তার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে বলা হবে—তোমরা কথা বলো! সুতরাং সেগুলো নিজেদের কর্মের কথাগুলো প্রকাশ করবে। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন—তারপর বান্দা ও তার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের কথার মাঝে থেকে অজুহাত তুলে দেওয়া হবে। তখন বান্দা বলবে—তোরা দূর হয়ে যা, তোরা ভোগে যা। তোদের কারণেই তো আমি (পাপের পথে) সংগ্ৰাম করেছি।”
আনাস ইবনু মালেক রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেছেন, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন—
‘কিয়ামতের দিন কাফিরকে নিয়ে আসা হবে। অতঃপর তাকে বলা হবে, তোমাকে যদি জমিন পূর্ণ করে স্বর্ণ দেওয়া হতো, তাহলে তুমি কি তা থেকে দান করতে? সে বলবে, হ্যাঁ। তখন তাকে বলা হবে—তোমার কাছে এর চেয়েও কম মূল্যের বস্তু চাওয়া হয়েছিল (কিন্তু তুমি তা দান করোনি)।’

টিকাঃ
[১১০] সহীহ মুসলিম, খণ্ড: ৪, পৃষ্ঠা: ২২৭, হাদিস: ৩০২২。
[১১৪] সহীহ মুসলিম, খণ্ড: ১৪, পৃষ্ঠা: ২২৩, হাদিস: ৫২৯৭。
[১১৫] সহীহ বুখারি, খণ্ড: ২০, পৃষ্ঠা: ২০৪, হাদিস: ৬৪৬৭। ইমাম মুসলিমও হাদীসটি বর্ণনা করেছেন, তবে মূল পাঠ কিছুটা লেখক থেকে। যেমন সহীহ বুখারিতে আছে—
قَدْ كُنْتَ سُئِلْتَ مَا هُوَ أَيَسَرُ مِنْ ذَلِكَ
তোমার কাছে এর চেয়েও কমমূল্যের বস্তু চাওয়া হয়েছিল (কিন্তু তুমি তা দান করোনি)। আর সহীহ মুসলিমে আছে—
كُنْتَ قَدْ سُئِلْتَ مَا هُوَ أَيْسَرُ مِنْ ذَلِكَ
‘তুমি মিথ্যা বলছো! কারণ, তোমার কাছে এর চেয়েও কম মূল্যের বস্তু চাওয়া হয়েছিল (কিন্তু তুমি তা দান করোনি)।’

📘 মৃত্যুর ওপারে অনন্তের পথে > 📄 পূর্ববর্তী নবিদের পক্ষে উম্মতে মুহাম্মাদির সাক্ষ্য

📄 পূর্ববর্তী নবিদের পক্ষে উম্মতে মুহাম্মাদির সাক্ষ্য


আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন—
فَلَنَسْـَٔلَنَّ ٱلَّذِينَ أُرۡسِلَ إِلَيۡهِمۡ وَلَنَسْـَٔلَنَّ ٱلۡمُرْسَلِينَ ٦٨ فَلَنَقُصَّنَّ عَلَيۡهِم بِعِلۡمٖ وَمَا كُنَّا غَآئِبِينَ ٦٩
অতএব, আমি অবশ্যই আমাদের জিজ্ঞাস করব—যাদের কাছে রাসুল প্রেরিত হয়েছিলেন এবং আমি অবশ্যই জিজ্ঞাসাবাদ করব রাসুলগণকে। অতঃপর আমি সজ্ঞানে তাদের কাছে অবস্থা বর্ণনা করব, বস্তুত আমি অনুপস্থিত ছিলাম না। [সুরা আ’রাফ, আয়াত: ৬-৭]
আর ও ইরশাদ হয়েছে—
فَأَوۡجَسَ مِنۡهُمۡ خِيفَةٗ قَالُواْ لَا تَخَفۡۖ
অতএব, আপনার পালনকর্তার কসম! আমি অবশ্যই ওদের সবাইকে জিজ্ঞাসাবাদ করব! [সুরা হিজর, আয়াত: ৯২]
জিজ্ঞাসাবাদের আরও হবে নবিদের থেকে। ইরশাদ হয়েছে—
فَيَقُولُ مَاذَا أُجِبۡتُمۡ
তোমাদের কী জবাব দেওয়া হয়েছে? [সুরা মায়েদা, আয়াত: ১০৯]
এই আয়াতের তাফসিরে বলা হয়েছে, তারা সবগুলো জবাব জানতেন। কিন্তু আজকে তাদের জ্ঞান লোপ পাবে, তাদের বুদ্ধি চলে যাবে এবং কঠিন আতঙ্ক, সংশোধনের আবশ্যতা এবং বিষয়টির কাঠিন্যে তারা সব ভুলে যাবেন। যার কারণে তারা জবাব দেবেন—
لَا عِلْمَ لَنَآ ۖ إِنَّكَ أَنتَ عَلَّٰمُ ٱلۡغُيُوبِ
আমরা অবগত নই; আপনিই অদৃশ্য বিষয়ে মহাজ্ঞানী। [সুরা মায়েদা, আয়াত: ১০৯]
তারপর আল্লাহ তাআলা নবিদেরকে নৈকট্য প্রদান করবেন। অতঃপর নূহ আলাইহিস সালামকে ডাকবেন। ডেকে বলা হবে—আজকে গোটা সমাবেশের জ্ঞান লোপ পাওয়ায় জবাব দিতে পারবেন না। তারপর আল্লাহ তাআলা তাদেরকে স্বাভাবিক করবেন, তাদের স্মরণশক্তি জাগ্রত করবেন। সুতরাং তারা উন্মুক্ত পক্ষ হয়ে নির্জন জিজ্ঞাসার জবাব দেবেন। বলা হয়—তারা আত্মসম্পূর্ণমূলক জবাব দেবেন। যেমন ঈসা মাসিহ আলাইহিস সালাম বলবেন—
تَعْلَمُ مَا فِى نَفْسِى وَلَآ أَعْلَمُ مَا فِى نَفْسِكَ ۚ إِنَّكَ أَنتَ عَلَّٰمُ ٱلۡغُيُوبِ
আপনি তো আমার মনের কথা জানেন এবং আর আমি জানি না যা আপনার মনে আছে। নিশ্চয় আপনিই অদৃশ্য বিষয়ে জ্ঞাত। [সুরা মায়েদা, আয়াত: ১১৬]
যে প্রথম মতটিই অধিক বিশুদ্ধ। কারণ, রাসুলদের মাঝে পদমর্যাদার তারতম্য রয়েছে। হাঁ, ইসা আলাইহিস সালাম সর্বাধিক মর্যাদাশীলদের মধ্যে একজন। কেননা, তিনি আল্লাহ্ তায়ালার কালিমা এবং তাঁর সৃষ্টি রুহ। ইমাম আবু হামেদ রাহিমাহুল্লাহু এভাবেও বলেছেন।
আবু সাঈদ খুদরি রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন—
'(কিয়ামতের দিন) একজন নবি আসবেন, তার সাথে দুজন অথবা তিনজন লোক আসবে। বা তার চেয়েও বেশকম মানুষ থাকবে। তখন নবিকে বলা হবে—আপনি কি আপনার জাতির কাছে দ্বীন পৌঁছিয়েছেন? তিনি বলবেন—হ্যাঁ। তখন তাঁর জাতিকে ডাকা হবে। অতঃপর তাদেরকে জিজ্ঞাসা করা হবে, নবি কি তোমাদের কাছে দ্বীন পৌঁছিয়েছেন? তারা বলবে—না। তখন নবিকে বলা হবে—আপনার পক্ষে কে সাক্ষ্য দেবে? নবি বলবেন—মুহাম্মাদ এবং তাঁর উম্মতরা। অতঃপর মুহাম্মাদ উম্মতকে ডাকা হবে এবং তাদেরকে জিজ্ঞাসা করা হবে—এই নবি কি তার জাতির কাছে দ্বীন পৌঁছিয়েছেন? তারা বলবে, হ্যাঁ। তখন তাদেরকে বলা হবে—তোমরা এটা কীভাবে জানলে? তারা বলবে, আমাদের নবি আমাদেরকে জানিয়েছেন—রাসুলগণ তার জাতির কাছে দ্বীন পৌঁছিয়েছেন। আমরা আমাদের নবিকে সম্মান করেছি। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, এ কথাটিই কুরআন কারিমে বলা হয়েছে—
وَكَذَٰلِكَ جَعَلۡنَٰكُمۡ أُمَّةٗ وَسَطٗا لِّتَكُونُواْ شُهَدَآءَ عَلَى ٱلنَّاسِ وَيَكُونَ ٱلرَّسُولُ عَلَيۡكُمۡ شَهِيدٗا
এমনিভাবে আমি তোমাদের মধ্যপন্থী সম্প্রদায় করেছি, যাতে করে তোমরা সাক্ষ্যদাতা হও মানবমণ্ডলীর জন্য এবং যাতে রাসুল সাক্ষ্যদাতা হন তোমাদের জন্য। [সুরা বাকারা, আয়াত: ১৪৩]
আবু সাঈদ খুদরি রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন—
‘কিয়ামতের দিন নূহ আলাইহিস সালামকে ডাকা হবে। তিনি বলবেন, হে আমার রব! আমি উপস্থিত! তখন আল্লাহ তাআলা জিজ্ঞাসা করবেন, তুমি কি দ্বীন পৌঁছে দিয়েছ? তিনি বলবেন, হ্যাঁ। তখন তাঁর উম্মতকে জিজ্ঞাসা করা হবে—নূহ কি তোমাদের কাছে দ্বীন পৌঁছে দিয়েছেন? তারা বলবে—আমাদের কাছে কোনো সতর্ককারী আসেনি। তখন আল্লাহ নূহকে জিজ্ঞাসা করবেন, তোমার সাক্ষী কে? তিনি বলবেন—মুহাম্মাদ এবং তাঁর উম্মত। তখন সাক্ষ্য দেবে যে, নূহ আলাইহিস সালাম দ্বীন তাঁর জাতির কাছে পৌঁছেছেন। কুরআনের আয়াত এবং রাসূল তোমাদের বিপক্ষে সাক্ষী হবেন। এটাই হচ্ছে নিচের আয়াতটির নূর—
এমিভাবে আমি তোমাদের মধ্যপস্থী সম্প্রদায় করেছি, যাতে করে তোমরা সাক্ষ্যদাতা হও মানবমণ্ডলীর জন্য এবং যাতে রাসূল সাক্ষ্যদাতা হন তোমাদের জন্য। [সূরা বাকারা, আয়াত: ১৪৩]

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00