📄 নবিজির শাফায়াতে ধন্য হবেন যারা
আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! কিয়ামতের দিন আপনার শাফায়াতলাভের সৌভাগ্যবান ব্যক্তি কে? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন—
'যে ব্যক্তি তার হৃদয় থেকে, তার প্রাণ থেকে কেবল আল্লাহর জন্য লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু বলবে আমি তার জন্য শাফায়াত করব।'
টিকাঃ
[১০০] সহিহুল বুখারি, খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ২১৪, হাদিস: ৯৯。
📄 সাক্ষাৎকার ও আমলনামা সমাচার
আয়িশা সিদ্দিকা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন—
لَيْسَ أَحَدٌ تُحَاسَبُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ إِلَّا هَلَكَ فَقُلْتُ يَا رَسُولَ اللَّهِ أَلَيْسَ قَدْ قَالَ اللَّهُ تَعَالَى فَأَمَّا مَنْ أُوتِيَ كِتَابَهُ بِيَمِينِهِ فَسَوْفَ يُحَاسَبُ حِسَابًا يَسِيرًا فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِنَّمَا ذَلِكَ الْعَرْضُ وَلَيْسَ أَحَدٌ يُنَاقَشُ الْحِسَابَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ إِلَّا عَذِّبَ
কিয়ামতের দিন যার হিসাব নেওয়া হবে—সে ধ্বংস হয়ে যাবে। আয়িশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন, আমি বললাম, আল্লাহ তাআলা কি বলেননি, যার আমলনামা ডান হাতে দেওয়া হবে, তার হিসাব সহজভাবে গ্রহণ করা হবে? [সূরা ইনশিকাক, আয়াত: ৭-৯] রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন—এটা তো হিসাব নয়, বরং হিসাবের উপস্থাপনা মাত্র। আর যাকেই কিয়ামতের দিন কড়াকড়ি হিসাবের সম্মুখীন করা হবে—তাকে আজাব দেওয়া হবে。
আয়িশা সিদ্দিকা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন, জাহান্নামের কথা স্মরণ হওয়া মাত্র আমি কেঁদে ফেললাম। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কাঁদছ কেন? আমি বললাম, জাহান্নামের কথা স্মরণ করা। আপনারা কি কিয়ামতের দিন আপনাদের পরিবারের লোকদেয়কে স্মরণ করবেন? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করলেন—
أَمَا فِي ثَلَاثَةِ مَوَاطِنَ فَلَا يَذْكُرُ أَحَدٌ أَحَدًا عِنْدَ الْمِيزَانِ حَتَّى يَعْلَمَ أَيَخِفُ مِيزَانُهُ أَوْ يَثْقُلُ وَعِنْدَ الْكِتَابِ حِينَ يُقَالُ { هَاؤُمُ اقْرَءُوا كِتَابِيَهْ } حَتَّى يَعْلَمَ أَيْنَ يَقَعُ كِتَابُهُ أَنِّي بِيَمِينِهِ أَمْ فِي شَمَالِهِ أَمْ مِنْ وَرَاءِ ظَهْرِهِ وَعِنْدَ الصِّرَاطِ إِذَا وُضِعَ بَيْنَ ظَهْرَيْ جَهَنَّمَ
তবে তিন স্থানে কেউ কাউকে মনে রাখবে না—মিজানের সামনে, আমলনামা হালকা হবে নাকি ভারী, জানার আগপর্যন্ত। আমলনামা প্রদান করার সময়, যখন বলা হবে—এসো তোমাদের আমলনামা পড়ো, এ কথা জানার আগপর্যন্ত যে, তা ডান হাতে না, বাম হাতে আসবে, নাকি পিঠের পেছন দিয়ে দেওয়া হবে। পুলসিরাতের কাছে, যখন আমার পেছনে জাহান্নাম থাকবে。
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন—
وَكُلَّ إِنْسَانٍ أَلْزَمْنَاهُ طَائِرَهُ فِي عُنُقِهِ
আমি প্রত্যেক মানুষের কর্মকে তার গ্রীবালগ্ন করে রেখেছি। [সূরা বনি ইসরাইল, আয়াত: ১৩]
ইবরাহিম ইবনু আদহাম রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, প্রতিটি মানুষের গ্রীবাদেশে একটি মালা ঝুলানো আছে, যাতে তার আমলনামা লেখা হয়। যখন সে মারা যায়, তা প্যাঁচিয়ে রাখা হয়। আর যখন তার পুনরুত্থান ঘটবে, তখন তা খোলা হবে এবং তাকে বলা হবে—
اقْرَأْ كِتَابَكَ كَفَىٰ بِنَفْسِكَ الْيَوْمَ عَلَيْكَ حَسِيبًا
পাঠ করো তোমার কিতাব। আজ তোমার হিসাব গ্রহণের জন্য তুমিই যথেষ্ট। [সূরা বনি ইসরাইল, আয়াত: ১৪]
কুরআন কারিমে ইরশাদ হয়েছে—
وَنُخْرِجُ لَهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ كِتَابًا يَلْقَاهُ مَنْشُورًا، اقْرَأْ كِتَابَكَ كَفَىٰ بِنَفْسِكَ الْيَوْمَ عَلَيْكَ حَسِيبًا.
কিয়ামতের দিন বের করে দেখাব তাকে একটি কিতাব, যা সে খোলা অবস্থায় পাবে। পাঠ করো তুমি তোমার কিতাব। আজ তোমার হিসাব গ্রহণের জন্য তুমিই যথেষ্ট। [সূরা বনি ইসরাইল, আয়াত: ১৩-১৪]
হাসান বাসরি রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, মানুষ মূর্খ হোক বা শিক্ষিত—তার আমলনামা পড়তে পারবে।
টিকাঃ
[১০১] সহিহুল বুখারি, খণ্ড: ২০, পৃষ্ঠা: ২৩০, হাদিস: ৬৪৬৯; সহিহ মুসলিম, খণ্ড: ১৪, পৃষ্ঠা: ৬৯, হাদিস : ৬৯১৪। তবে উভয় গ্রন্থের মূল শব্দের মাঝে কিছুকিছু বৈষম্য রয়েছে—অনুবাদক。
[১০২] সুনানু আবু দাউদ, খণ্ড: ১২, পৃষ্ঠা: ৩৭০, হাদিস: ৪৭৫২。
📄 বান্দাকে জিজ্ঞাসিতব্য বিষয় এবং জিজ্ঞাসার পদ্ধতি
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন—
إِنَّ السَّمْعَ وَالْبَصَرَ وَالْفُؤَادَ كُلُّ أُولَئِكَ كَانَ عَنْهُ مَسْئُولًا
নিশ্চয় কান, চক্ষু ও অন্তঃকরণ এদের প্রত্যেকটি জিজ্ঞাসিত হবে। [সূরা বনি ইসরাইল, আয়াত: ৩৬]
আরও ইরশাদ হয়েছে—
ثُمَّ لَتُسْأَلُنَّ يَوْمَئِذٍ عَنِ النَّعِيمِ فَبِمَا كُنتُمْ تَعْمَلُونَ
অতঃপর আমার নিকট প্রত্যাবর্তন করতে হবে। তখন আমি যাগুলো দেবো, যা কিছু তোমরা করত। [সূরা ইউনুস, আয়াত: ২৩]
অন্যান্য ইরশাদ হয়েছে—
قُلْ بَلَى وَرَبِّي لَتُبْعَثُنَّ ثُمَّ لَتُنَبَّؤُنَّ بِمَا عَمِلْتُمْ ۚ وَذَلِكَ عَلَى اللَّهِ يَسِيرٌ বলুন, অবশ্যই হবে, আমার পালনকর্তার কসম, তোমরা নিশ্চয় পুনরুত্থিত হবে, অতঃপর তোমাদের অবহিত করা হবে যা তোমরা করতে; এটা আল্লাহর পক্ষে অতি সহজ। [সূরা তাগাবুন, আয়াত : ৭]
কুরআন কারিম আরও বলেছে— فَمَنْ يَعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ خَيْرًا يَرَهُ যে ব্যক্তি অণু পরিমাণ মন্দ কাজ করবে, সে তা দেখতে পারবে। [সূরা যিলযাল, আয়াত : ৮] অর্থাৎ অণু পরিমাণ পাপ সম্পর্কেও জিজ্ঞেস করা হবে এবং তার বদলা দেওয়া হবে। আল্লাহ তাআলা আরও ইরশাদ করেছেন— ثُمَّ لَتُسْأَلُنَّ يَوْمَئِذٍ عَنِ النَّعِيمِ তারপর অবশ্য অবশ্যই তোমাদেরকে জিজ্ঞেস করা হবে (ভোগকৃত) নিয়ামত সম্পর্কে। [সূরা তাকাসুর, আয়াত : ৮]
আবু বারজাহ আল-আসলামি রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন— لَا تَزُولُ قَدَمَا عَبْدٍ يَوْمَ الْقِيَامَةِ حَتَّى تُسْأَلَ عَنْ عُمُرِهِ فِيمَا أَفْنَاهُ وَعَنْ عِلْمِهِ فِيمَا فَعَلَ وَعَنْ مَالِهِ مِنْ أَيْنَ اكْتَسَبَهُ وَفِيمَ أَنْفَقَهُ وَعَنْ جِسْمِهِ فِيمَ أَبْلَاهُ কিয়ামতের দিন ততক্ষণ পর্যন্ত বান্দার দু পা নড়াচড়া করতে পারবে না, যতক্ষণ জিজ্ঞেস করা না হবে—তার জীবন সম্পর্কে, সে তা কোথায় ব্যয় করেছে; তার ইলম সম্পর্কে, সে তা কোন কাজে লাগিয়েছে; তার অর্থ সম্পর্কে, সে তা কোথা থেকে উপার্জন করেছে এবং কোথায় ব্যয় করেছে এবং তার শরীর সম্পর্কে—সে তা কোথায় নষ্ট করেছে。
সাফওয়ান ইবনু মুআত্তাল রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, জনৈক ব্যক্তি আবদুল্লাহ ইবনু উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুকে বললেন, আপনি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে নাজওয়া সম্পর্কে কীভাবে বলতে শুনেছেন? ইবনু উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বললেন, আমি তাকে বলতে শুনেছি— কিয়ামতের দিন মুমিনকে আল্লাহর নিকটবর্তী করা হবে, এমনকি সীমাহীন তাআলাকি তাকে একান্তে নিজের কাছে নিয়ে তার পাপরাশি সম্পর্কে স্বীকৃতিও করাবেন। তারপর তাকে বলবেন—তুমি এগুলোর কথা জানো? স্বীকারোক্তি করলে। তারপর তাকে বলবেন, আমি দুনিয়াতে সে বলবে, হে আমার রব! আমি জানি। আল্লাহ বলবেন, আমি দুনিয়াতে তোমার এই অপরাধগুলো গোপন করে রেখেছিলাম, আর আজকে সেগুলো ক্ষমা করে দিচ্ছি। অতঃপর তার নেককাজের আমলনামা দেওয়া হবে। আর কাফির ও মুনাফিকদেরকে সমস্ত সৃষ্টির সামনে ডেকে বলা হবে—এরাই পৃথিবীতে আল্লাহ তাআলার ওপর মিথ্যাচারণ করেছিল。
টিকাঃ
[১০০] সুনানুত তিরমিযি, খণ্ড: ৮, পৃষ্ঠা : ৪৪৬, হাদিস : ২০৪৬。
[১০১] সহিহ মুসলিম, খণ্ড : ১০, পৃষ্ঠা : ৩৪৫, হাদিস : ৪৮৭২。
📄 আল্লাহ তাআলা বান্দার সাথে দোভাষী ছাড়াই কথা বলবেন
ইমাম বুখারি ও হাদিসটি বর্ণনা করেছেন এবং পরিশেষে বলেছেন— هَؤُلَاءِ الَّذِينَ كَذَبُوا عَلَى اللَّهِ أَلَا لَعْنَةُ اللَّهِ عَلَى الظَّالِمِينَ এরাই সেসব লোক—যারা তাদের পালনকর্তার প্রতি মিথ্যাচারোপ করেছিল, শুনে রাখো, জালিমদের ওপর আল্লাহ তাআলার অভিশাপ রয়েছে। [সূরা হুদ, আয়াত : ১৮]
আবু ইবনু হাতিম রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন— আল্লাহ তাআলা সবার সাথেই কথা বলবেন, তার মাঝে ও আল্লাহর মাঝে কোনো দোভাষী থাকবে না। সে ডান দিকে তাকালেও নিজের প্রেরিত আমলই দেখতে পারবে, বাম দিকে তাকালেও নিজের প্রেরিত আমলই দেখতে পারবে। সামনে তাকালে নিজের সামনে কেবল জাহান্নামই দেখতে পারবে। অতএব, এক টুকরো খেজুর দিয়ে (আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করে) হলেও জাহান্নাম থেকে বাঁচো。
টিকাঃ
[১০২] সহিহ বুখারি, খণ্ড : ২, পৃষ্ঠা : ১২৪, হাদিস : ১৩৪৮。
[১০৩] সহিহ বুখারি, খণ্ড : ১০, পৃষ্ঠা : ১৪৫, হাদিস : ৬০৫৩。