📄 হাশরবাসীর জন্য আমাদের নবির শর্তহীন শাফায়াত
আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, একদিন নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে গোশত নিয়ে আসা হলো। তিনি নিজের পছন্দনীয় রান উঠিয়ে নিলেন এবং সেখান থেকে কিছু আহার করলেন। তারপর নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন— আমি কিয়ামতের দিন সমস্ত মানুষের সর্দার। তোমরা কি জানো—কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা পূর্বাপর সকলকে এক মাটিতে একত্রিত করবেন? অতঃপর তাদেরকে আহ্বানকারী আহ্বান করবে, চোখ তাদেরকে নজরদারি করবে এবং সূর্য তাদের নিকটবর্তী হবে। ফলে মানুষ অবর্ণনীয় ও অসহনীয় চিন্তা ও কষ্টে পতিত হবে। তখন কিছু মানুষ পরস্পরকে বলবে, দেখছ না—তোমরা কোন্ পরিস্থিতিতে আছ? দেখছ না তোমাদের কী হচ্ছে? তোমরা কি এমন কাউকে দেখছ না যিনি তোমাদের জন্য তোমাদের রবের কাছে শাফায়াত করবেন? তখন কিছু মানুষ পরস্পরকে বলবে—আদম আলাইহিস সালামের কাছে চলো। সুতরাং তারা আদম আলাইহিস সালামের নিকট গিয়ে বলবে—হে আদম, আপনি আমাদের পিতা, আপনি সমগ্র মানবজাতির পিতা, আল্লাহ তাআলা আপনাকে নিজ হাতে সৃষ্টি করেছেন, আপনার মাঝে রুহ ফুঁকে দিয়েছেন, ফিরিশতাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন আপনার উদ্দেশ্যে সিজদা করতে; আপনি আমাদের জন্য আপনার রবের কাছে শাফায়াত করুন। আপনি কি দেখছেন না—আমরা কোন্ পরিস্থিতিতে পড়েছি? আপনি কি দেখছেন না—আমাদের অবস্থা কত ভয়াবহ? তখন আদম আলাইহিস সালাম বলবেন, আজকে আমার রব এত বেশি ক্রোধান্বিত হয়েছেন ইতিপূর্বে এ পরিমাণ ক্রোধ কখনো করেননি, পরবর্তী সময়েও কখনো এত রাগান্বিত হবেন না। তিনি আমাকে গাছের ফল খেতে বারণ করেছিলেন। কিন্তু আমি তাঁর নিষেধাবজ্ঞা অমান্য করেছি। আমার কী হবে, আমার কী হবে? তোমরা অন্য কারও কাছে যাও! তোমরা নূহের কাছে যাও! এরপর তারা নূহ আলাইহিস সালামের কাছে গিয়ে বলবে—হে নূহ, আপনি পৃথিবীতে প্রথম রাসুল। আল্লাহ তাআলা আপনাকে কৃতজ্ঞ বান্দা বলে স্বীকৃতি দিয়েছেন। আপনি আমাদের জন্য আপনার রবের কাছে শাফায়াত করুন। আপনি কি দেখছেন না—আমরা কোন্ পরিস্থিতিতে পড়েছি? আপনি কি দেখছেন না—আমাদের অবস্থা কত ভয়াবহ? তখন নূহ আলাইহিস সালাম বলবেন, আজকে আমার রব এত বেশি ক্রোধান্বিত হয়েছেন ইতিপূর্বে এ পরিমাণ ক্রোধ কখনো করেননি, পরবর্তী সময়েও কখনো এত রাগান্বিত হবেন না। আমি আমার দায়িত্ব ছিল আমার জাতিকে দীনের পথে আহ্বান করা (কিন্তু আমি তাদের বিরুদ্ধে বদদোয়া করেছিলাম) আমার কী হবে, আমার কী হবে? তোমরা বরং ইবরাহিমের কাছে যাও! তারা ইবরাহিম আলাইহিস সালামের কাছে গিয়ে বলবে—হে ইবরাহিম, আপনি আল্লাহর নবি, গোটা পৃথিবীতে কেবল আপনিই তাঁর খলিল-বন্ধু, আমাদের জন্য আপনার রবের কাছে শাফায়াত করুন। আপনি কি দেখছেন না—আমরা কোন্ পরিস্থিতিতে পড়েছি? আপনি কি দেখছেন না—আমাদের অবস্থা কত ভয়াবহ? তখন ইবরাহিম আলাইহিস সালাম বলবেন—আজকে আমার রব এত বেশি ক্রোধান্বিত হয়েছেন ইতিপূর্বে এ পরিমাণ ক্রোধ কখনো করেননি, পরবর্তী সময়েও কখনো এত রাগান্বিত হবেন না। এরপর নিজের তাওয়ারিয়া (বাস্তবিক অর্থে মিথ্যা, কিন্তু নিগূঢ় অর্থে সত্য) এর কথা আলোচনা করে বলবেন—আমার কী হবে, আমার কী হবে? তোমরা অন্যের কাছে যাও, মূসার কাছে যাও! তারা মূসা আলাইহিস সালামের কাছে গিয়ে বলবে—হে মূসা, আপনি আল্লাহর রাসুল। আল্লাহ আপনাকে তাঁর রিসালাত দ্বারা এবং গোটা মানবজাতির মধ্য থেকে কেবল আপনাকে তাঁর সাথে কথা বলার সুযোগ দিয়ে সম্মানিত করেছেন; আপনি আপনার রবের কাছে আমাদের জন্য শাফায়াত করুন। আপনি কি দেখছেন না—আমরা কোন্ পরিস্থিতিতে পড়েছি? আপনি কি দেখছেন না—আমাদের অবস্থা কত ভয়াবহ? তখন মূসা আলাইহিস সালাম বলবেন, আজকে আমার রব এত বেশি ক্রোধান্বিত হয়েছেন ইতিপূর্বে এ পরিমাণ ক্রোধ কখনো করেননি, পরবর্তী সময়েও কখনো এত রাগান্বিত হবেন না। আমি আমার নিজের নির্দেশ ছাড়াই একজন লোককে হত্যা করেছিলাম। আমার কী হবে, আমার কী হবে? তোমরা ইসার কাছে যাও! তারা ইসা আলাইহিস সালামের কাছে গিয়ে বলবে—হে ইসা, আপনি আল্লাহর রাসুল। মায়ের কোলে মানুষের সাথে কথা বলেছেন। আপনি আল্লাহর কালিমা, তিনি আপনার মা মারইয়ামের মাঝে তা ফুঁকে দিয়েছেন এবং তাঁর পক্ষ থেকে প্রেরিত রুহ। আপনি আমাদের জন্য আপনার রবের কাছে শাফায়াত করুন। আপনি কি দেখছেন না—আমরা কোন্ পরিস্থিতিতে পড়েছি? আপনি কি দেখছেন না—আমাদের অবস্থা কত ভয়াবহ? তখন ইসা আলাইহিস সালাম বলবেন—আজকে আমার রব এত বেশি ক্রোধান্বিত হয়েছেন ইতিপূর্বে এ পরিমাণ ক্রোধ কখনো করেননি, পরবর্তী সময়েও কখনো এত রাগান্বিত হবেন না। তিনি নিজের কোন্ গুনাহের আলোচনা না করেই বলবেন—আমার কী হবে, আমার কী হবে? তোমরা অন্যের কাছে যাও, মুহাম্মদের কাছে যাও!
অবশেষে তারা আমার কাছে এসে বলবে—হে মুহাম্মদ, আপনি আল্লাহর রাসুল, আপনি শেষ নবি। আল্লাহ আপনার অতীত ও ভবিষ্যতের সকল অপরাধ মার্জনা করেছেন। আমাদের জন্য আপনার রবের কাছে শাফায়াত করুন। আপনি কি দেখছেন না—আমরা কোন্ পরিস্থিতিতে পড়েছি? আপনি কি দেখছেন না—আমাদের অবস্থা কত ভয়াবহ? সুতরাং আমি আরশের নিচে এসে আমার রবের উদ্দেশ্যে সিজদায় পড়ে যাব। তখন আল্লাহ আমার জন্য সুযোগ করে দেবেন এবং আমার জন্য তাঁর এমন প্রশংসা ও স্তুতি ইলহাম করবেন ইতিপূর্বে যা অন্য কারও জন্য অবারিত করেননি। তারপর আল্লাহ বলবেন—হে মুহাম্মদ, মাথা উত্তোলন করো। চাও, তোমাকে দেওয়া হবে। শাফায়াত করো, তোমার শাফায়াত গ্রহণ করা হবে। সুতরাং আমি মাথা উঠিয়ে বলব—হে আমার রব, আমার উম্মতের কী হবে, আমার উম্মতের কী হবে? তখন বলা হবে—হে মুহাম্মদ, তুমি জান্নাতের বাবুল আইমান দিয়ে তোমার বে-হিসাব উম্মতকে জান্নাতে প্রবেশ করাও। তারা অন্যান্য দরজা বাদ দিয়ে এই দরজায় সকলের সাথে শরিক থাকবে। ওই সত্তার শপথ যাঁর হাতে মুহাম্মদের জীবন, জান্নাতের দরজার দুই চৌকাঠের মাঝে মক্কা ও হাজারের দূরত্ব পরিমাণ দূরত্ব, অথবা মক্কা ও বসরার দূরত্ব সমপরিমাণ দূরত্ব。
সহীহুল বুখারিতে রয়েছে—মক্কা ও হিময়ারের দূরত্বের সমপরিমাণ দূরত্ব রয়েছে。
জ্ঞাতব্য : এই শর্তহীন ও ব্যাপক শাফায়াত—যা সমস্ত মানুষর মাঝে কেবল আমাদের নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিশেষত্ব। এটাই নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এই হাদিসের উদ্দেশ্য—
لِكُلِّ نَبِيٍّ دَعْوَةٌ مُسْتَجَابَةٌ فَتَعَجَّلَ كُلُّ نَبِيٍّ دَعْوَتَهُ وَإِنِّي اخْتَبَأْتُ دَعْوَتِي شَفَاعَةً لِأُمَّتِي يَوْمَ الْقِيَامَةِ.
প্রতিটি নবির একটি দুআ অবশ্যই কবুল করা হয়। প্রত্যেক নবিই তা দ্রুতই চেয়ে নিয়েছেন। কিন্তু আমি সে দুআটি কিয়ামতের দিন আমার উম্মতের শাফায়াত করার জন্য রেখে দিয়েছি。
আর সুদীর্ঘ এই হাদিসে হাশরবাসীর জন্য যেই শাফায়াতের কথা বলা হয়েছে, তা হলো—কৃত্ত্ব হিসাব গ্রহণ করার জন্য এবং কিয়ামতের বিভীষিকা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য। এটাও নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিশেষত্ব。
টিকাঃ
[২৯] সহীহ মুসলিম, খণ্ড : ১, পৃষ্ঠা : ৪৭, হাদিস : ১৭৬。
[৩০] সহীহুল বুখারি, খণ্ড : ২, পৃষ্ঠা : ৬২২, হাদিস : ৪৫০。
[৩১] সহীহ মুসলিম, খণ্ড : ১, পৃষ্ঠা : ৪৪, হাদিস : ২১৯。
📄 এই শাফায়াতই মাকামে মাহমুদ
তারো হাদিসে যে কথা হয়েছে—নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন— আমার উম্মতকে বাঁচাও, আমার উম্মতকে বাঁচাও—এর মর্ম কী? এর মর্ম হলো, নিজের উম্মতের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব প্রদান, তাদের ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ এবং তাদের প্রতি মমতাময় আচরণ। আর আল্লাহ তাআলা যে তাকে বলবেন—হে মুহাম্মদ, তুমি জান্নাতের বাবুল আইমান দিয়ে তোমার বে-হিসাব উম্মতকে জান্নাতে প্রবেশ করাও—এর মর্ম হলো, তাকে বলা হয়েছে, খুব দ্রুত গোটা হাশরবাসীর জন্য শাফায়াত করতে। কারণ, যখন তাকে অগণিত মানুষকে জান্নাতে প্রবেশ করানোর কথা বলা হয়েছে, তার মধ্যে নিজের উম্মত এবং অন্যান্য উম্মতও শামিল হয়ে গেছে। আর মানুষেরও এই শাফায়াতের আবেদন করবে আল্লাহর পক্ষ থেকে ইশারা ও ইশারাহের কারণেই। যার মাধ্যমে আমাদের পক্ষ থেকে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্য প্রতিশ্রুত মাকামে মাহমুদের রূপায়ন ঘটবে। এজন্য প্রত্যেক নবিজি বলেছেন—আমরা এই শাফায়াতের জন্য নই, আমরা এই শাফায়াতের জন্য নই। শেষ পর্যন্ত বিষয়টি নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পর্যন্ত গড়ালে, তখন নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন—এ কাজের জন্যই তো আমি। আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন—
يُجْمَعُ اللَّهُ النَّاسَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ فَيَهْمُونَ لِذَلِكَ وَ قَالَ ابْنُ عَبِيدٍ فَيَقُولُونَ لَوْ اسْتَشْفَعْنَا عَلَى رَبِّنَا حَتَّى يُرِيحَنَا مِنْ مَكَانِنَا هَذَا قَالَ فَيَأْتُونَ آدَمَ.
আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের দিন মানুষজনকে একত্রিত করবেন। তারপর তাদের প্রতি ইলহাম-ইশারা করা হবে; যার কারণে তারা বলবে—আমরা যদি আমাদের রবের কাছে শাফায়াতের জন্য কাউকে পেতাম, যার মাধ্যমে তিনি আমাদেরকে এই অবস্থান থেকে প্রশান্তি দেবেন। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন—সুতরাং তারা আদম আলাইহিস সালামের কাছে যাবে。
**এই শাফায়াতে মাকামে মাহমুদ**
আবু সাঈদ খুদরি রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন—
'আমি কিয়ামতের দিন আদমসন্তানের সর্দার হব, তবে এতে অহংকার কিছু নেই। আদম আমার হাতে থাকবে প্রশংসার ঝাণ্ডা, তবে এতেও অহংকার কিছু নেই। আদম আলাইহিস সালাম-এর প্রত্যেক নবি সেদিন আমার ঝাণ্ডাতলে অবস্থান করবেন। আমার দ্বারা প্রথমে জমিন বিদীর্ণ হবে, তবে এতেও গর্বের কিছু নেই। তারপর মানুষ তিনটি আঙুরের মুখোমুখি হবে।
তারা (আঙুল থেকে মুক্তির জন্য) আদম আলাইহিস সালামের কাছে গিয়ে বলবে—আপনি আমাদের পিতা, তাই আপনার রবের কাছে আমাদের জন্য শাফায়াত করুন। আদম আলাইহিস সালাম বলবেন, আমি একটি পদস্খলনের শিকার হয়ে জমিনে নিক্ষিপ্ত হয়েছি (তাই আমি শাফায়াত করতে পারব না), তোমরা নূহের কাছে যাও।
তারা নূহ আলাইহিস সালামের কাছে যাবে। নূহ বলবেন—আমি জমিনবাসীর বিরুদ্ধে বদ-দুআ করায় তাদেরকে ধ্বংস করা হয়েছে (তাই আমি শাফায়াত করতে পারব না), তোমরা ইবরাহিমের কাছে যাও। সুতরাং তারা ইবরাহিম আলাইহিস সালামের কাছে যাবে। তিনি বলবেন, আমি তিনটি অসত্য বলেছি (তাই শাফায়াত করতে পারব না)। তারপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলবেন—তার প্রতিটি অসত্যই আল্লাহর দ্বীন শেখার ছিল। ইবরাহিম আলাইহিস সালাম বলবেন, অতএব তোমরা মূসার কাছে যাও!
তারা মূসা আলাইহিস সালামের কাছে যাবে। তিনি বলবেন, আমি একজনকে হত্যা করেছি (তাই শাফায়াত করতে পারব না)। তোমরা ঈসার কাছে যাও! সুতরাং তারা ঈসা আলাইহিস সালামের কাছে যাবে। তিনি বলবেন—আল্লাহকে ছেড়ে মানুষ আমার ইলাহও করেছে (আমি কীভাবে শাফায়াত করব)? তোমরা মুহাম্মাদের কাছে যাও। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, সুতরাং তারা আমার কাছে আসবে। আমি তাদের সাথে যাব।
ইবনু জুবহান বলেন, আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, আমি যেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছিলাম। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তারপর আমি জান্নাতের দরজার চৌকাট ধরে ঝাঁকুনি দেবো। বলা হবে, কে তিনি? তখন বলা হবে—মুহাম্মদ! সুতরাং আমার জন্য খুলে দেওয়া হবে এবং তারা আমাকে মারহাবা জানাবে। অতঃপর আমি সিজদাবনত হব। সুতরাং আল্লাহ তাআলা আমার হৃদয়ে তার প্রশংসা ও স্তুতি ইলহাম করবেন। তারপর আমাকে বলা হবে—মাথা উঁচু করে চাও, তোমাকে প্রদান করা হবে, শাফায়াত করো, তোমার শাফায়াত কবুল করা হবে এবং বলো, তোমার কথা শোনা হবে। এটাই হলো 'মাকামে মাহমুদ' যার ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন—
وَلَسَوْفَ يُعْطِيكَ رَبُّكَ فَتَرْضَىٰ
হায়াতো বা আপনার পালনকর্তা আপনাকে মাকামে মাহমুদে পৌঁছাবেন। [সূরা বনি ইসরাইল, আয়াত: ৭৯]
আব্দুল্লাহ ইবনু উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন—
কিয়ামতের দিন মানুষেরা লাশের মতো হয়ে যাবে। প্রতিটি উন্মুক্ত দাঁত তাদের নবির পিছু পিছু চলবে আর বলবে, হে অমুক! শাফায়াত করুন, হে অমুক! শাফায়াত করুন। পরিশেষে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর শাফায়াতের দায়িত্ব বর্তাবে। এটিই হবে সেই দিন—যেদিন আল্লাহ তাআলা তাকে মাকামে মাহমুদে অধিষ্ঠিত করবেন。
আবু সাইদ খুদরি রাদিয়াল্লাহু আনহু এর হাদিসে যে—'তিনটি আতঙ্কজনক' পরিস্থিতির কথা বলা হয়েছে, সেগুলো হলো—(আল্লাহই ভালো জানেন) প্রথমবার যখন জাহান্নামের তার লাগাম ধরে টেনে আনা হবে, এটি হবে আল্লাহর তাআলার সামনে হাজির হবার এবং হিসাবের পূর্বে। দ্বিতীয়বার যখন জাহান্নام নিঃশ্বাস ত্যাগ করবে, তখন সকলের হৃদয়ে ভয় ও আতঙ্ক শুরু বৃদ্ধি পাবে। তারপর তৃতীয়বার যখন জাহান্নাম আরেকবার নিঃশ্বাস গ্রহণ করবে, লোকজন ভয়ে উপুড় হয়ে পড়ে যাবে, চোখগুলো হানাবড়া হয়ে যাবে এবং তারা ওই ভয়ে অদূরাসে দেখতে থাকবে—হয়তো জাহান্নামের আগুন তাদের কাছে পৌঁছে যাবে বা আগুন তাদেরকে পাকড়াও করবে। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে তা থেকে মুক্তি দিন।
জাস্সাস: যখন প্রমাণিত হলো যে, মাকামে মাহমুদ হলো শাফায়াতের বিষয়, যাকে নবিগণ উপেক্ষা করবেন এবং অবশেষে আমাদের নবি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে আসবে। তখন তিনি মুমিন-কাফির নির্বিশেষে সকল হাশরকারীর জন্য নিঃশর্ত শাফায়াত করবেন যে, তাদেরকে কিয়ামতের বিভীষিকা থেকে পরিত্রাণ দেওয়া হোক। তবে জেনে রাখা ভালো যে, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শাফায়াতের পরিমাণ নিয়ে ওলামায়ে কেরামের মাঝে মতবিরোধ রয়েছে—তা কতবার হবে?
কাজি আয়ায রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, কিয়ামতের দিন আমাদের নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পাঁচটি শাফায়াত করবেন:
১. ব্যাপক ও শর্তহীন শাফায়াত।
২. একদল জান্নাতিকে হিসাব ছাড়া জান্নাতে প্রবেশ করানোর শাফায়াত।
৩. এমন একদল উন্মত—গুনাহের কারণে যাদের ওপর জাহান্নাম ওয়াজিব হয়ে যাবে, তাদের জন্য এবং নবিজির ইচ্ছা অনুযায়ী আরও কিছু মানুষের জন্য নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শাফায়াত।
৪. যেসব উন্মত যারা গুনাহের কারণে জাহান্নামে প্রবেশ করবে, তারপর তাদের মুক্তির জন্য আমাদের নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং অন্যান্য নবি আলাইহিমুস সালাম, ফেরেশতা এবং অন্যান্য মুমিন ভাইদের শাফায়াত।
৫. জান্নাতিদের সম্মান ও মর্যাদা বৃদ্ধি করার জন্য নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শাফায়াত।
ইমাম কুরতুবি রাহিমাহুল্লাহ বলেন—ছয় নাম্বার শাফায়াতও হবে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সম্মানিত চাচা আবু তালিবের আজাব হালকা করার জন্য।
টিকাঃ
[৩২] সহীহ মুসলিম, খণ্ড : ১, পৃষ্ঠা : ৪৪২, হাদিস : ২১৪。
[৯৯] মুসলিমুন জিয়াদাতুন, খণ্ড: ১০, পৃষ্ঠা: ৪১২, হাদিস: ৩০৭০。
[১০০] সহিহুল বুখারি, খণ্ড: ১৪, পৃষ্ঠা: ৩৩৪, হাদিস: ৫৯৯৬。
📄 নবিজির শাফায়াতে ধন্য হবেন যারা
আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! কিয়ামতের দিন আপনার শাফায়াতলাভের সৌভাগ্যবান ব্যক্তি কে? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন—
'যে ব্যক্তি তার হৃদয় থেকে, তার প্রাণ থেকে কেবল আল্লাহর জন্য লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু বলবে আমি তার জন্য শাফায়াত করব।'
টিকাঃ
[১০০] সহিহুল বুখারি, খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ২১৪, হাদিস: ৯৯。
📄 সাক্ষাৎকার ও আমলনামা সমাচার
আয়িশা সিদ্দিকা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন—
لَيْسَ أَحَدٌ تُحَاسَبُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ إِلَّا هَلَكَ فَقُلْتُ يَا رَسُولَ اللَّهِ أَلَيْسَ قَدْ قَالَ اللَّهُ تَعَالَى فَأَمَّا مَنْ أُوتِيَ كِتَابَهُ بِيَمِينِهِ فَسَوْفَ يُحَاسَبُ حِسَابًا يَسِيرًا فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِنَّمَا ذَلِكَ الْعَرْضُ وَلَيْسَ أَحَدٌ يُنَاقَشُ الْحِسَابَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ إِلَّا عَذِّبَ
কিয়ামতের দিন যার হিসাব নেওয়া হবে—সে ধ্বংস হয়ে যাবে। আয়িশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন, আমি বললাম, আল্লাহ তাআলা কি বলেননি, যার আমলনামা ডান হাতে দেওয়া হবে, তার হিসাব সহজভাবে গ্রহণ করা হবে? [সূরা ইনশিকাক, আয়াত: ৭-৯] রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন—এটা তো হিসাব নয়, বরং হিসাবের উপস্থাপনা মাত্র। আর যাকেই কিয়ামতের দিন কড়াকড়ি হিসাবের সম্মুখীন করা হবে—তাকে আজাব দেওয়া হবে。
আয়িশা সিদ্দিকা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন, জাহান্নামের কথা স্মরণ হওয়া মাত্র আমি কেঁদে ফেললাম। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কাঁদছ কেন? আমি বললাম, জাহান্নামের কথা স্মরণ করা। আপনারা কি কিয়ামতের দিন আপনাদের পরিবারের লোকদেয়কে স্মরণ করবেন? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করলেন—
أَمَا فِي ثَلَاثَةِ مَوَاطِنَ فَلَا يَذْكُرُ أَحَدٌ أَحَدًا عِنْدَ الْمِيزَانِ حَتَّى يَعْلَمَ أَيَخِفُ مِيزَانُهُ أَوْ يَثْقُلُ وَعِنْدَ الْكِتَابِ حِينَ يُقَالُ { هَاؤُمُ اقْرَءُوا كِتَابِيَهْ } حَتَّى يَعْلَمَ أَيْنَ يَقَعُ كِتَابُهُ أَنِّي بِيَمِينِهِ أَمْ فِي شَمَالِهِ أَمْ مِنْ وَرَاءِ ظَهْرِهِ وَعِنْدَ الصِّرَاطِ إِذَا وُضِعَ بَيْنَ ظَهْرَيْ جَهَنَّمَ
তবে তিন স্থানে কেউ কাউকে মনে রাখবে না—মিজানের সামনে, আমলনামা হালকা হবে নাকি ভারী, জানার আগপর্যন্ত। আমলনামা প্রদান করার সময়, যখন বলা হবে—এসো তোমাদের আমলনামা পড়ো, এ কথা জানার আগপর্যন্ত যে, তা ডান হাতে না, বাম হাতে আসবে, নাকি পিঠের পেছন দিয়ে দেওয়া হবে। পুলসিরাতের কাছে, যখন আমার পেছনে জাহান্নাম থাকবে。
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন—
وَكُلَّ إِنْسَانٍ أَلْزَمْنَاهُ طَائِرَهُ فِي عُنُقِهِ
আমি প্রত্যেক মানুষের কর্মকে তার গ্রীবালগ্ন করে রেখেছি। [সূরা বনি ইসরাইল, আয়াত: ১৩]
ইবরাহিম ইবনু আদহাম রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, প্রতিটি মানুষের গ্রীবাদেশে একটি মালা ঝুলানো আছে, যাতে তার আমলনামা লেখা হয়। যখন সে মারা যায়, তা প্যাঁচিয়ে রাখা হয়। আর যখন তার পুনরুত্থান ঘটবে, তখন তা খোলা হবে এবং তাকে বলা হবে—
اقْرَأْ كِتَابَكَ كَفَىٰ بِنَفْسِكَ الْيَوْمَ عَلَيْكَ حَسِيبًا
পাঠ করো তোমার কিতাব। আজ তোমার হিসাব গ্রহণের জন্য তুমিই যথেষ্ট। [সূরা বনি ইসরাইল, আয়াত: ১৪]
কুরআন কারিমে ইরশাদ হয়েছে—
وَنُخْرِجُ لَهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ كِتَابًا يَلْقَاهُ مَنْشُورًا، اقْرَأْ كِتَابَكَ كَفَىٰ بِنَفْسِكَ الْيَوْمَ عَلَيْكَ حَسِيبًا.
কিয়ামতের দিন বের করে দেখাব তাকে একটি কিতাব, যা সে খোলা অবস্থায় পাবে। পাঠ করো তুমি তোমার কিতাব। আজ তোমার হিসাব গ্রহণের জন্য তুমিই যথেষ্ট। [সূরা বনি ইসরাইল, আয়াত: ১৩-১৪]
হাসান বাসরি রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, মানুষ মূর্খ হোক বা শিক্ষিত—তার আমলনামা পড়তে পারবে।
টিকাঃ
[১০১] সহিহুল বুখারি, খণ্ড: ২০, পৃষ্ঠা: ২৩০, হাদিস: ৬৪৬৯; সহিহ মুসলিম, খণ্ড: ১৪, পৃষ্ঠা: ৬৯, হাদিস : ৬৯১৪। তবে উভয় গ্রন্থের মূল শব্দের মাঝে কিছুকিছু বৈষম্য রয়েছে—অনুবাদক。
[১০২] সুনানু আবু দাউদ, খণ্ড: ১২, পৃষ্ঠা: ৩৭০, হাদিস: ৪৭৫২。