📄 কিয়ামত দিবসের বিভিন্ন নাম
কিয়ামত দিবসের অনেক নাম রয়েছে। যেমন:
১. قِيَامَةُ السَّاعَةِ – কুরআন কারিমে ইরশাদ হয়েছে— ﴿ وَيَوْمَ تَقُومُ السَّاعَةُ يُقْسِمُ الْمُجْرِمُونَ مَا لَبِثُوا غَيْرَ سَاعَةٍ ﴾ যেদিন কিয়ামত সংঘটিত হবে, সেদিন অপরাধীরা কসম খেয়ে বলবে যে, এক মুহূর্তের বেশি অবস্থান করিনি। [সূরা রূম, আয়াত: ৫৫] আরও ইরশাদ হয়েছে— ﴿ وَيَوْمَ تَقُومُ السَّاعَةُ يُبْلِسُ الْمُجْرِمُونَ ﴾ যেদিন কিয়ামত সংঘটিত হবে, সেদিন অপরাধীরা হতাশ হয়ে যাবে। [সূরা রূম, আয়াত: ১২]
২. يَوْمُ الْقِيَامَةِ – আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন— ﴿ لَا أُقْسِمُ بِيَوْمِ الْقِيَامَةِ ﴾ আমি শপথ করি কিয়ামত দিবসের। [সূরা কিয়ামা, আয়াত: ১]
৩. يَوْمُ النَّفْخِ – আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন—
﴿ وَلَهُ الْمُلْكُ يَوْمَ يُنفَخُ فِي الصُّورِ ﴾ সেদিন তাঁরই আধিপত্য হবে যেদিন সিঙ্গায় ফুঁৎকার দেওয়া হবে। [সূরা আনআম, আয়াত: ৭৩]
৪. يَوْمُ الرَّاجِفَةِ ও يَوْمُ الرَّادِفَةِ – আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন— ﴿ يَوْمَ تَرْجُفُ الرَّاجِفَةُ O تَتْبَعُهَا الرَّادِفَةُ ﴾ ‘যেদিন প্রকম্পিত করবে প্রকম্পিতকারী, অতঃপর পশ্চাতে আসবে পশ্চাদগামী।’ [সূরা নাযিয়াত, আয়াত: ৬, ৭] যেমিন প্রকম্পিত করবে প্রকম্পিতকারী, অতঃপর পশ্চাতে আসবে পশ্চাদগামী।
কিয়ামত দিবসের অন্য নামগুলো হলো:
৫. يَوْمُ الْقَارِعَةِ – কড়াক্কাত করার দিন। কারণ, এ দিনের ভয়াবহতা হৃদয়গুলোকে কড়াক্কাত করবে।
৬. يَوْمُ الْبَعْثِ – পুনরুত্থান দিবস।
৭. يَوْمُ النُّشُورِ – উত্থানের দিন। যার মাঝে জীবিত করার অর্থ রয়েছে। আরবিতে বলা হয়ে থাকে—
أَنْشَرَ اللَّهُ الْمَوْتَى فَنُشِرُوا আল্লাহ মৃতদেরকে জীবিত করেছেন, সুতরাং তারা জীবিত হয়েছে।
৮. يَوْمُ الْخُرُوجِ – আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন— ﴿ يَوْمَ يَخْرُجُونَ مِنَ الْأَجْدَاثِ سِرَاعًا ﴾ সেদিন তারা কবর থেকে দ্রুত বেগে বের হবে। [সূরা মাআরিজ, আয়াত: ৪৩] তো এই দিনের শুরুটা হবে কবর থেকে বের হওয়ার মাধ্যমে, আর শেষটা হবে মুনিদের জাহান্নামে থেকে বের হওয়ার মাধ্যমে। তারপর কেউ জাহান্নাম থেকে বেরও হবে না এবং জাহান্নামে প্রবেশও করবে না।
৯. يَوْمُ الْحَشْرِ – সমবেত হওয়ার দিন।
১০. يَوْمُ الْعَرْضِ – উপস্থাপন করার দিন। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন— ﴿ يَوْمَئِذٍ تُعْرَضُونَ لَا تَخْفَى مِنكُمْ خَافِيَةٌ ﴾
'সেদিন তোমাদের উপস্থিত করা হবে; তোমাদের কোনো কিছু গোপন থাকবে না' [সুরা হাক্কাহ, আয়াত: ১৮] এর প্রকৃতি হলো — কারও অবস্থা জানার জন্য কোনো একটি ইন্দ্রিয়ের ব্যবহার করা。
১৭. يوم الجمعة -একত্রিত হওয়ার দিন। এর প্রকৃতি হলো —একজনকে আরেকজনের সাথে মিলিয়ে জোড় করে দেওয়া। অথবা এক জোড়াকে আরেক জোড়ার সাথে মিলিয়ে জামায়েত করে দেওয়া। আল্লাহ্ তায়ালা ইরশাদ করেছেন— يَوْمَ يَجْمَعُكُمْ لِيَوْمِ الْجَمْعِ সম্মেলনের দিন আল্লাহ্ তোমাদের সমবেত করবেন। [সুরা তাগাবুন, আয়াত: ৯]
১৮. يوم الفزع -আতঙ্কের দিন। কুরআন কারিমে ইরশাদ হয়েছে— لَا يَحْزُنُهُمُ الْفَزَعُ الْأَكْبَرُ মহাত্রাস তাদের চিন্তান্বিত করবে না। [সুরা আম্বিয়া, আয়াত: ১০৩]
১৯. يوم التناد -আর্তনাদের দিন। কুরআন কারিমে ইরশাদ হয়েছে— أَخَافُ عَلَيْكُمْ يَوْمَ التَّنَادِ، يَوْمَ تُوَلُّونَ مُدْبِرِينَ আমি তোমাদের ওপর ভয় করছি আর্তনাদের দিনে। যেদিন তোমরা মুখ ফিরিয়ে পালাবে। [সুরা গাফির, আয়াত: ৩২-৩৩]
২০. يوم الواقعة -আরবি ভাষায় শব্দটির মূল হলো وقع , যার অর্থ সংঘটিত হওয়া, পাওয়া। শরিয়তে কিয়ামতকে দিন সংঘটিত হওয়ার এবং পাপ-পুণ্যের বিনিময় পাওয়ার বিষয়াদির প্রতি গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
২১. يوم الحافضة والرافعة -উঁচু-নিচু করার দিন। অর্থাৎ এক শ্রেণির জান্নাতকে উত্তীর্ণ হবে, আরেকটি শ্রেণি জাহান্নামে অধঃপতিত হবে।
২২. يوم الحساب -হিসাবের দিন। আল্লাহ্ তায়ালা এই দিন সৃষ্টির ভালো ও মন্দ আমলের হিসাব নেবেন, নিজের নিয়ামত দান করবেন। তারপর পরস্পরের বিনিময় দেবেন。
২৩. يوم السؤال -জিজ্ঞাসার দিন। আল্লাহ্ তায়ালা তার সৃষ্টিকে ইহকালে-পরকালে জিজ্ঞাসা করবেন, তাদের বিরুদ্ধে প্রমাণ প্রতিষ্ঠা করার জন্য এবং হিকমত প্রকাশ করার জন্য।
২৪. يوم الشهادة -সাক্ষ্যের দিন। ইরশাদ হয়েছে— يَوْمَ يَقُومُ الْأَشْهَادُ যেদিন সাক্ষীরা দাঁড়াবে। [সুরা গাফির, আয়াত: ৫১]
২৫. يوم الخالصة -সত্যের দিন। কারণ, এদিন সমস্ত বিষয় সত্যরূপে প্রকাশিত হবে।
২৬. يوم القامة -বিজয়ীর দিন।
২৭. يوم الصائخة -ফুঁৎকারর দিন। ইকরিমা বলেছেন— الصائخة -হলো প্রথম ফুঁৎকার। আর الطامة -দ্বিতীয় ফুঁৎকার।
২৮. يوم الوعيد -শাস্তির দিন। আল্লাহ্ তায়ালা অনেক কাজের আদেশ যেমন দিয়েছেন, তেমনি অনেক কাজ থেকে বারণ করেছেন। অনেক কিছুর প্রতিশ্রুতি যেমন দিয়েছেন, তেমনি অনেক কাজের ব্যাপারে ভীতিপ্রদর্শনমূলক সতর্কবার্তা প্রদান করেছেন। সুতরাং এটি যদি الوعيد প্রতিশ্রুতির দিন। তো প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন নিয়ামতের, আর সতর্ক করেছেন যন্ত্রণাময়ক শাস্তির ব্যাপারে। সতর্কবার্তার মূল হলো—আল্লাহ্ বিধানের অন্যথা করলে শাস্তি পেতে হবে। আর প্রতিশ্রুতির মূল হলো—আল্লাহ্ বিধানের অনুকূল চললে পুরষ্কৃত হতে হবে।
২৯. يوم الدين -প্রতিদান দিবস।
৩০. يوم الجزاء -প্রতিদানের দিন। আল্লাহ্ তায়ালা ইরশাদ করেছেন— الْيَوْمَ تُجْزَوْنَ مَا كُنْتُمْ تَعْمَلُونَ আজকে তোমাদের কৃতকর্মের প্রতিদান প্রদান করা হবে। [সুরা জাসিয়া, আয়াত: ২৮] আরও ইরশাদ হয়েছে—
الْيَوْمَ تُجْزَى كُلُّ نَفْسٍ بِمَا كَسَبَتْ প্রতিটি প্রাণকে তার কৃতকর্মের বিনিময় দেওয়া হবে। [সুরা গাফির, আয়াত: ১৭]
৩১. يوم التلاق -সাক্ষাতের দিন। কুরআন কারিমে ইরশাদ হয়েছে— لِتُنْذِرَ يَوْمَ التَّلَاقِ যেন সাক্ষাতের দিন সম্পর্কে সতর্ক করো। [সুরা গাফির, আয়াত: ১৫]
৩২. يوم الأرفة -নেকটের দিন।
৩৩. يوم المآب -আল্লাহর কাছে ফিরে যাওয়ার দিন।
৩৪. يوم المصير -আল্লাহর কাছে ফিরে যাওয়ার দিন। কুরআন কারিমে ইরশাদ হয়েছে— وَلِلَّهِ مُلْكُ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضِ ۖ وَإِلَى اللَّهِ الْمَصِيرُ আকাশ ও জমিনসমূহের আধিপত্য আল্লাহর এবং আল্লাহর কাছেই ফিরে যেতে হবে। [সুরা নুর, আয়াত: ৪২]
৩৫. يوم القضاء -ফায়সালার দিন। এ দিন চূড়ান্ত নির্দেশ ও ফায়সালা প্রদান করা হবে।
৩৬. يوم الوزن -ওজন করার দিন। আল্লাহ্ তায়ালা ইরশাদ করেছেন— وَ الْوَزْنُ يَوْمَئِذٍ الْحَقُّ এবং সেদিনের ওজন হবে সত্য। [সুরা আরাফ, আয়াত: ৮]
৩৭. يوم عظيم -বড়ো দিন। যেহেতু এই দিনের পর দুনিয়ার আর কোনো দিন থাকবে না, এজন্য কিয়ামতের দিনকে বড়ো নামে বিশেষায়িত করা হয়েছে।
৩৮. يوم عسير -কঠিন দিন। এই কঠিন মুহূর্ত বিশেষভাবে কাফিরদের জন্য।
৩৯. يوم مشهود -প্রত্যক্ষকৃত দিন। যেহেতু এই দিনটিকে সবাই প্রত্যক্ষ করবে, তাই প্রত্যক্ষকৃত দিনও বলা হয়। কেউ কেউ বলেছেন—যেহেতু শাহিদগণ এদিন সাক্ষ্য প্রদান করবে, তাই কিয়ামতের দিনকে مشهود يوم তথা সাক্ষ্য দেওয়ার দিনও বলা হয়।
৪০. يوم التغابُن -প্রতারণার দিন। যেহেতু এদিন মানুষ আল্লাহর কাছে তাদের কামনা অনুপাতে মর্যাদা পেতে ব্যর্থ হবে এবং মনে মনে প্রতারিত হবে—একদল যাবে জান্নাতের দিকে, আরেক দল যাবে জাহান্নামে। তাই এই দিনটিকে প্রতারণার দিন বলা হয়। আরবি ভাষায় লেনদেনের ক্ষেত্রে কোনো একজনের জন্য আধিকা প্রমাণিত হওয়াকে তাগাবুন বলা হয়। (যেহেতু কিয়ামতের মাঠে একদল জান্নাতে যাবে, আরেক দল বঞ্চিত হয়ে জাহান্নামে যাবে, তাই এই দিনকে يوم التغابن -প্রতারণার দিন বলা হয়।)
৪১. يوم الغاشية -আবরণের দিন। এদিন যেহেতু আতঙ্ক সবার চোখ বন্ধ হয়ে যাবে, ভয়ের আবরণে ঢেকে যাবে, তাই কিয়ামতের দিনকে الغاشية يوم -আবরণের দিনও বলা হয়。
📄 কিয়ামতের ভয়াবহতা ও কষ্ট থেকে মুক্তি পাওয়ার উপায়
আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন— যে ব্যক্তি কোনো মুমিনের জাগতিক কোনো কষ্ট দূর করে, আল্লাহ্ তায়ালা তার ওপর থেকে কিয়ামতের কোনো কষ্ট দূর করবেন。
আব্দুল্লাহ্ ইবনু মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন— তোমাদের পূর্ববর্তী একজন মানুষের হিসাব নেওয়া হবে। তখন তার কোনো নেক আমল পাওয়া যাবে না। তবে সে লোকজনের সাথে মিশত, এদিকে লোকটি ছিল ধনাঢ্য। সে তার কর্মচারীদেরকে নির্দেশ দিত—লোকজনের প্রতি যেন কঠোরতা প্রদর্শন না করে। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আল্লাহ্ তায়ালা বলেছেন—আমি মানুষের দোষ ক্ষমা করার ব্যাপারে তার চেয়ে বেশি হকদার। অতএব, তোমরাও তাদের দোষ ক্ষমা করো。
হুযাইফা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, মিনহিজি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন— জনৈক ব্যক্তি মারা গিয়ে জান্নাতে প্রবেশ করল। তাকে জিজ্ঞেস করা হলো—তুমি কী আমল করতে? সে বলল—আমি লোকজনের সাথে ব্যবসা করতাম। তো আমি যখন কোনো অভাবী মানুষকে দেখতাম, নগদ কিছু টাকা-পয়সা ছেড়ে দিতাম। এই ওসিলায় আমাকে ক্ষমা করা হয়েছে。
কাতাদা রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেছেন, একজন ঋণগ্রস্ত ব্যক্তিকে তিনি খুঁজছিলেন, যে আত্মগোপন করে ছিল। তারপর তাকে পেলেন। সে বলল—আমি অভাবী। কাতাদা বললেন, আল্লাহর কসম? লোকটি বলল—আল্লাহর কসম। তারপর কাতাদা রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, আমি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি—
مَنْ سَرَّهُ أَنْ يُنْجِيَهُ اللَّهُ مِنْ كُرَبِ يَوْمِ الْقِيَامَةِ فَلْيُنَفْسْ عَنْ مُعْسِرٍ أَوْ يَضَعْ عَنْهُ
যে ব্যক্তি এটা চেয়ে খুশি হয় যে, আল্লাহ্ তায়ালা তাকে কিয়ামতের কষ্ট থেকে মুক্তি দেবেন, সে যেন অভাবী মানুষের কষ্ট দূর করে বা তার ঋণ মওকুফ করে দেয়。
আবুল ইয়াসার বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি— যে ব্যক্তি কোনো অভাবীকে অবকাশ দেয় বা তার ঋণ মওকুফ করে দেয়, তাকে আল্লাহ্ তায়ালা তার (আরশের) ছায়ায় আশ্রয় দান করবেন。
রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেছেন—
سَبْعَةٌ يُظِلُّهُمُ اللَّهُ فِي ظِلِّهِ يَوْمَ لَا ظِلَّ إِلَّا ظِلُّهُ الْإِمَامُ الْعَادِلُ وَشَابٌّ نَشَأَ فِي عِبَادَةِ رَبِّهِ وَرَجُلٌ قَلْبُهُ مُعَلَّقُ فِي الْمَسَاجِدِ وَرَجُلَانِ تَحَابَّا فِي اللَّهِ اجْتَمَعَا عَلَيْهِ وَتَفَرَّقَا عَلَيْهِ وَرَجُلٌ طَلَبَتْهُ امْرَأَةٌ ذَاتُ مَنْصَبٍ وَجَمَالٍ فَقَالَ إِنِّي أَخَافُ اللَّهَ وَرَجُلٌ تَصَدَّقَ أَخْفَى حَتَّى لَا تَعْلَمَ شِمَالُهُ مَا تُنْفِقُ يَمِينُهُ وَرَجُلٌ ذَكَرَ اللَّهَ خَالِيًا فَفَاضَتْ عَيْنَاهُ.
সাত শ্রেণির মানুষকে আল্লাহ্ তার আরশের ছায়ায় আশ্রয় প্রদান করবেন, যেদিন তার আরশের ছায়া ব্যতীত অন্য কোনো ছায়া থাকবে না। তারা —নেকীবান শাসক; ওই যুবক যে তার যৌবনকালকে তার রবের ইবাদতে কাটিয়েছে; ওই মানুষ যার কলব মসজিদের সাথে সম্পর্ক থাকে; ওই দুজন মানুষ যারা পরস্পরকে আল্লাহর জন্য ভালোবাসে, তারপর আল্লাহর জন্যই একত্রিত হয় এবং আল্লাহর জন্যই বিচ্ছিন্ন হয়; ওই মানুষ যাকে সম্ভ্রান্ত পরিবারের কোনো সুন্দরী ললনা ব্যাভিচারের প্রতি আহ্বান করে, আর সে জবাব দেয়—আমি আল্লাহকে ভয় করি; ওই মানুষ যে এত গোপনে দান করে যে, তার বাম হাত জানে না ডান হাত কী দান করেছে এবং সেই মানুষ যে নির্জনে আল্লাহকে স্মরণ করে, যার কারণে তার চোখ দিয়ে অশ্রু প্রবাহিত হয়。
এই অধ্যায়ের সমর্থনে এবং অধ্যায়ের সবগুলোকে পরিব্যাপ্ত করে কুরআন কারিমের এই আয়াতগুলোই ইশাদ হয়েছে—
وَيُؤْتُونَ بِالْخُبْزِ وَيُطْعِمُونَ الطَّعَامَ عَلَى حُبِّهِ مِسْكِينًا وَيَتِيمًا وَأَسِيرًا، إِنَّمَا نُطْعِمُكُمْ لِوَجْهِ اللَّهِ لَا نُرِيدُ مِنكُمْ جَزَاءً وَلَا شُكُورًا، إِنَّا نَخَافُ مِن رَّبِّنَا يَوْمًا عَبُوسًا قَمْطَرِيرًا، فَوَقَاهُمُ اللَّهُ شَرَّ ذَلِكَ الْيَوْمِ وَلَقَّاهُمْ نَضْرَةً وَسُرُورًا.
তারা মানত পূর্ণ করে এবং সেদিনকে ভয় করে, যেদিনের অনিষ্ট হবে সুদূরপ্রসারী। তারা আল্লাহর প্রেমে অভাবগ্রস্ত, এতিম ও বন্দিকে আহার্য দান করে। তারা বলে, কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য আমরা তোমাদের আহার্য দান করি এবং তোমাদের কাছে কোনো প্রতিদান ও কৃতজ্ঞতা কামনা করি না। আমরা আমাদের পালনকর্তার তরফ থেকে এক ভীতিপ্রদ ভয়াবহ দিনের ভয় রাখি, অতঃপর আল্লাহ তাদের সেদিনের অনিষ্ট থেকে রক্ষা করবেন এবং তাদেরকে দেবেন সজীবতা ও আনন্দ। [সুরা দাহর, আয়াত: ৭-১১]
আরও ইশাদ হয়েছে—
إِنَّا لَا نُضِيعُ أَجْرَ مَنْ أَحْسَنَ عَمَلًا
যে ব্যক্তি নেককাজ করে, আমরা তার প্রতিদান নষ্ট করব না। [সুরা কাহাফ, আয়াত: ৩০]
এমনিভাবে অনেক স্থানে নেককাজের আলোচনা করা পর বলা হয়েছে—
فَلَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ
তাদের ওপর না কোনো ভয় আসবে, না কোনো কারণে তারা চিন্তগ্রস্ত হবে। [সুরা বাকারা, আয়াত: ৩৮]
টিকাঃ
[৬০] সহীহ মুসলিম, খণ্ড: ৪, পৃষ্ঠা: ২০২, হাদিস: ২১২১。
[৬১] সহীহ মুসলিম, খণ্ড: ৪, পৃষ্ঠা: ২০২, হাদিস: ২১২৮。
[৬০] সহীহ মুসলিম, খণ্ড: ৩, পৃষ্ঠা: ৯৯৪, হাদিস: ২১২১。
[৬১] সহীহ মুসলিম, খণ্ড: ৩, পৃষ্ঠা: ৯৯৪, হাদিস: ২১২৮。
[৬২] সহীহ মুসলিম, খণ্ড: ৩, পৃষ্ঠা: ১০০, হাদিস: ২১৬১。
[৬৩] সহীহ মুসলিম, খণ্ড: ৩, পৃষ্ঠা: ২০২, হাদিস: ৬৯২。
[৬৪] সহীহ বুখারী, খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ২১২, হাদিস: ৬৬০。
[২৫] সহীহুল বুখারি, খণ্ড : ১, পৃষ্ঠা : ২১, হাদিস : ৬২০; সহীহ মুসলিম, খণ্ড : ৪, পৃষ্ঠা : ২২৯, হাদিস : ১৭২。
📄 হাশরবাসীর জন্য আমাদের নবির শর্তহীন শাফায়াত
আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, একদিন নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে গোশত নিয়ে আসা হলো। তিনি নিজের পছন্দনীয় রান উঠিয়ে নিলেন এবং সেখান থেকে কিছু আহার করলেন। তারপর নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন— আমি কিয়ামতের দিন সমস্ত মানুষের সর্দার। তোমরা কি জানো—কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা পূর্বাপর সকলকে এক মাটিতে একত্রিত করবেন? অতঃপর তাদেরকে আহ্বানকারী আহ্বান করবে, চোখ তাদেরকে নজরদারি করবে এবং সূর্য তাদের নিকটবর্তী হবে। ফলে মানুষ অবর্ণনীয় ও অসহনীয় চিন্তা ও কষ্টে পতিত হবে। তখন কিছু মানুষ পরস্পরকে বলবে, দেখছ না—তোমরা কোন্ পরিস্থিতিতে আছ? দেখছ না তোমাদের কী হচ্ছে? তোমরা কি এমন কাউকে দেখছ না যিনি তোমাদের জন্য তোমাদের রবের কাছে শাফায়াত করবেন? তখন কিছু মানুষ পরস্পরকে বলবে—আদম আলাইহিস সালামের কাছে চলো। সুতরাং তারা আদম আলাইহিস সালামের নিকট গিয়ে বলবে—হে আদম, আপনি আমাদের পিতা, আপনি সমগ্র মানবজাতির পিতা, আল্লাহ তাআলা আপনাকে নিজ হাতে সৃষ্টি করেছেন, আপনার মাঝে রুহ ফুঁকে দিয়েছেন, ফিরিশতাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন আপনার উদ্দেশ্যে সিজদা করতে; আপনি আমাদের জন্য আপনার রবের কাছে শাফায়াত করুন। আপনি কি দেখছেন না—আমরা কোন্ পরিস্থিতিতে পড়েছি? আপনি কি দেখছেন না—আমাদের অবস্থা কত ভয়াবহ? তখন আদম আলাইহিস সালাম বলবেন, আজকে আমার রব এত বেশি ক্রোধান্বিত হয়েছেন ইতিপূর্বে এ পরিমাণ ক্রোধ কখনো করেননি, পরবর্তী সময়েও কখনো এত রাগান্বিত হবেন না। তিনি আমাকে গাছের ফল খেতে বারণ করেছিলেন। কিন্তু আমি তাঁর নিষেধাবজ্ঞা অমান্য করেছি। আমার কী হবে, আমার কী হবে? তোমরা অন্য কারও কাছে যাও! তোমরা নূহের কাছে যাও! এরপর তারা নূহ আলাইহিস সালামের কাছে গিয়ে বলবে—হে নূহ, আপনি পৃথিবীতে প্রথম রাসুল। আল্লাহ তাআলা আপনাকে কৃতজ্ঞ বান্দা বলে স্বীকৃতি দিয়েছেন। আপনি আমাদের জন্য আপনার রবের কাছে শাফায়াত করুন। আপনি কি দেখছেন না—আমরা কোন্ পরিস্থিতিতে পড়েছি? আপনি কি দেখছেন না—আমাদের অবস্থা কত ভয়াবহ? তখন নূহ আলাইহিস সালাম বলবেন, আজকে আমার রব এত বেশি ক্রোধান্বিত হয়েছেন ইতিপূর্বে এ পরিমাণ ক্রোধ কখনো করেননি, পরবর্তী সময়েও কখনো এত রাগান্বিত হবেন না। আমি আমার দায়িত্ব ছিল আমার জাতিকে দীনের পথে আহ্বান করা (কিন্তু আমি তাদের বিরুদ্ধে বদদোয়া করেছিলাম) আমার কী হবে, আমার কী হবে? তোমরা বরং ইবরাহিমের কাছে যাও! তারা ইবরাহিম আলাইহিস সালামের কাছে গিয়ে বলবে—হে ইবরাহিম, আপনি আল্লাহর নবি, গোটা পৃথিবীতে কেবল আপনিই তাঁর খলিল-বন্ধু, আমাদের জন্য আপনার রবের কাছে শাফায়াত করুন। আপনি কি দেখছেন না—আমরা কোন্ পরিস্থিতিতে পড়েছি? আপনি কি দেখছেন না—আমাদের অবস্থা কত ভয়াবহ? তখন ইবরাহিম আলাইহিস সালাম বলবেন—আজকে আমার রব এত বেশি ক্রোধান্বিত হয়েছেন ইতিপূর্বে এ পরিমাণ ক্রোধ কখনো করেননি, পরবর্তী সময়েও কখনো এত রাগান্বিত হবেন না। এরপর নিজের তাওয়ারিয়া (বাস্তবিক অর্থে মিথ্যা, কিন্তু নিগূঢ় অর্থে সত্য) এর কথা আলোচনা করে বলবেন—আমার কী হবে, আমার কী হবে? তোমরা অন্যের কাছে যাও, মূসার কাছে যাও! তারা মূসা আলাইহিস সালামের কাছে গিয়ে বলবে—হে মূসা, আপনি আল্লাহর রাসুল। আল্লাহ আপনাকে তাঁর রিসালাত দ্বারা এবং গোটা মানবজাতির মধ্য থেকে কেবল আপনাকে তাঁর সাথে কথা বলার সুযোগ দিয়ে সম্মানিত করেছেন; আপনি আপনার রবের কাছে আমাদের জন্য শাফায়াত করুন। আপনি কি দেখছেন না—আমরা কোন্ পরিস্থিতিতে পড়েছি? আপনি কি দেখছেন না—আমাদের অবস্থা কত ভয়াবহ? তখন মূসা আলাইহিস সালাম বলবেন, আজকে আমার রব এত বেশি ক্রোধান্বিত হয়েছেন ইতিপূর্বে এ পরিমাণ ক্রোধ কখনো করেননি, পরবর্তী সময়েও কখনো এত রাগান্বিত হবেন না। আমি আমার নিজের নির্দেশ ছাড়াই একজন লোককে হত্যা করেছিলাম। আমার কী হবে, আমার কী হবে? তোমরা ইসার কাছে যাও! তারা ইসা আলাইহিস সালামের কাছে গিয়ে বলবে—হে ইসা, আপনি আল্লাহর রাসুল। মায়ের কোলে মানুষের সাথে কথা বলেছেন। আপনি আল্লাহর কালিমা, তিনি আপনার মা মারইয়ামের মাঝে তা ফুঁকে দিয়েছেন এবং তাঁর পক্ষ থেকে প্রেরিত রুহ। আপনি আমাদের জন্য আপনার রবের কাছে শাফায়াত করুন। আপনি কি দেখছেন না—আমরা কোন্ পরিস্থিতিতে পড়েছি? আপনি কি দেখছেন না—আমাদের অবস্থা কত ভয়াবহ? তখন ইসা আলাইহিস সালাম বলবেন—আজকে আমার রব এত বেশি ক্রোধান্বিত হয়েছেন ইতিপূর্বে এ পরিমাণ ক্রোধ কখনো করেননি, পরবর্তী সময়েও কখনো এত রাগান্বিত হবেন না। তিনি নিজের কোন্ গুনাহের আলোচনা না করেই বলবেন—আমার কী হবে, আমার কী হবে? তোমরা অন্যের কাছে যাও, মুহাম্মদের কাছে যাও!
অবশেষে তারা আমার কাছে এসে বলবে—হে মুহাম্মদ, আপনি আল্লাহর রাসুল, আপনি শেষ নবি। আল্লাহ আপনার অতীত ও ভবিষ্যতের সকল অপরাধ মার্জনা করেছেন। আমাদের জন্য আপনার রবের কাছে শাফায়াত করুন। আপনি কি দেখছেন না—আমরা কোন্ পরিস্থিতিতে পড়েছি? আপনি কি দেখছেন না—আমাদের অবস্থা কত ভয়াবহ? সুতরাং আমি আরশের নিচে এসে আমার রবের উদ্দেশ্যে সিজদায় পড়ে যাব। তখন আল্লাহ আমার জন্য সুযোগ করে দেবেন এবং আমার জন্য তাঁর এমন প্রশংসা ও স্তুতি ইলহাম করবেন ইতিপূর্বে যা অন্য কারও জন্য অবারিত করেননি। তারপর আল্লাহ বলবেন—হে মুহাম্মদ, মাথা উত্তোলন করো। চাও, তোমাকে দেওয়া হবে। শাফায়াত করো, তোমার শাফায়াত গ্রহণ করা হবে। সুতরাং আমি মাথা উঠিয়ে বলব—হে আমার রব, আমার উম্মতের কী হবে, আমার উম্মতের কী হবে? তখন বলা হবে—হে মুহাম্মদ, তুমি জান্নাতের বাবুল আইমান দিয়ে তোমার বে-হিসাব উম্মতকে জান্নাতে প্রবেশ করাও। তারা অন্যান্য দরজা বাদ দিয়ে এই দরজায় সকলের সাথে শরিক থাকবে। ওই সত্তার শপথ যাঁর হাতে মুহাম্মদের জীবন, জান্নাতের দরজার দুই চৌকাঠের মাঝে মক্কা ও হাজারের দূরত্ব পরিমাণ দূরত্ব, অথবা মক্কা ও বসরার দূরত্ব সমপরিমাণ দূরত্ব。
সহীহুল বুখারিতে রয়েছে—মক্কা ও হিময়ারের দূরত্বের সমপরিমাণ দূরত্ব রয়েছে。
জ্ঞাতব্য : এই শর্তহীন ও ব্যাপক শাফায়াত—যা সমস্ত মানুষর মাঝে কেবল আমাদের নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিশেষত্ব। এটাই নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এই হাদিসের উদ্দেশ্য—
لِكُلِّ نَبِيٍّ دَعْوَةٌ مُسْتَجَابَةٌ فَتَعَجَّلَ كُلُّ نَبِيٍّ دَعْوَتَهُ وَإِنِّي اخْتَبَأْتُ دَعْوَتِي شَفَاعَةً لِأُمَّتِي يَوْمَ الْقِيَامَةِ.
প্রতিটি নবির একটি দুআ অবশ্যই কবুল করা হয়। প্রত্যেক নবিই তা দ্রুতই চেয়ে নিয়েছেন। কিন্তু আমি সে দুআটি কিয়ামতের দিন আমার উম্মতের শাফায়াত করার জন্য রেখে দিয়েছি。
আর সুদীর্ঘ এই হাদিসে হাশরবাসীর জন্য যেই শাফায়াতের কথা বলা হয়েছে, তা হলো—কৃত্ত্ব হিসাব গ্রহণ করার জন্য এবং কিয়ামতের বিভীষিকা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য। এটাও নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিশেষত্ব。
টিকাঃ
[২৯] সহীহ মুসলিম, খণ্ড : ১, পৃষ্ঠা : ৪৭, হাদিস : ১৭৬。
[৩০] সহীহুল বুখারি, খণ্ড : ২, পৃষ্ঠা : ৬২২, হাদিস : ৪৫০。
[৩১] সহীহ মুসলিম, খণ্ড : ১, পৃষ্ঠা : ৪৪, হাদিস : ২১৯。
📄 এই শাফায়াতই মাকামে মাহমুদ
তারো হাদিসে যে কথা হয়েছে—নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন— আমার উম্মতকে বাঁচাও, আমার উম্মতকে বাঁচাও—এর মর্ম কী? এর মর্ম হলো, নিজের উম্মতের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব প্রদান, তাদের ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ এবং তাদের প্রতি মমতাময় আচরণ। আর আল্লাহ তাআলা যে তাকে বলবেন—হে মুহাম্মদ, তুমি জান্নাতের বাবুল আইমান দিয়ে তোমার বে-হিসাব উম্মতকে জান্নাতে প্রবেশ করাও—এর মর্ম হলো, তাকে বলা হয়েছে, খুব দ্রুত গোটা হাশরবাসীর জন্য শাফায়াত করতে। কারণ, যখন তাকে অগণিত মানুষকে জান্নাতে প্রবেশ করানোর কথা বলা হয়েছে, তার মধ্যে নিজের উম্মত এবং অন্যান্য উম্মতও শামিল হয়ে গেছে। আর মানুষেরও এই শাফায়াতের আবেদন করবে আল্লাহর পক্ষ থেকে ইশারা ও ইশারাহের কারণেই। যার মাধ্যমে আমাদের পক্ষ থেকে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্য প্রতিশ্রুত মাকামে মাহমুদের রূপায়ন ঘটবে। এজন্য প্রত্যেক নবিজি বলেছেন—আমরা এই শাফায়াতের জন্য নই, আমরা এই শাফায়াতের জন্য নই। শেষ পর্যন্ত বিষয়টি নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পর্যন্ত গড়ালে, তখন নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন—এ কাজের জন্যই তো আমি। আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন—
يُجْمَعُ اللَّهُ النَّاسَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ فَيَهْمُونَ لِذَلِكَ وَ قَالَ ابْنُ عَبِيدٍ فَيَقُولُونَ لَوْ اسْتَشْفَعْنَا عَلَى رَبِّنَا حَتَّى يُرِيحَنَا مِنْ مَكَانِنَا هَذَا قَالَ فَيَأْتُونَ آدَمَ.
আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের দিন মানুষজনকে একত্রিত করবেন। তারপর তাদের প্রতি ইলহাম-ইশারা করা হবে; যার কারণে তারা বলবে—আমরা যদি আমাদের রবের কাছে শাফায়াতের জন্য কাউকে পেতাম, যার মাধ্যমে তিনি আমাদেরকে এই অবস্থান থেকে প্রশান্তি দেবেন। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন—সুতরাং তারা আদম আলাইহিস সালামের কাছে যাবে。
**এই শাফায়াতে মাকামে মাহমুদ**
আবু সাঈদ খুদরি রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন—
'আমি কিয়ামতের দিন আদমসন্তানের সর্দার হব, তবে এতে অহংকার কিছু নেই। আদম আমার হাতে থাকবে প্রশংসার ঝাণ্ডা, তবে এতেও অহংকার কিছু নেই। আদম আলাইহিস সালাম-এর প্রত্যেক নবি সেদিন আমার ঝাণ্ডাতলে অবস্থান করবেন। আমার দ্বারা প্রথমে জমিন বিদীর্ণ হবে, তবে এতেও গর্বের কিছু নেই। তারপর মানুষ তিনটি আঙুরের মুখোমুখি হবে।
তারা (আঙুল থেকে মুক্তির জন্য) আদম আলাইহিস সালামের কাছে গিয়ে বলবে—আপনি আমাদের পিতা, তাই আপনার রবের কাছে আমাদের জন্য শাফায়াত করুন। আদম আলাইহিস সালাম বলবেন, আমি একটি পদস্খলনের শিকার হয়ে জমিনে নিক্ষিপ্ত হয়েছি (তাই আমি শাফায়াত করতে পারব না), তোমরা নূহের কাছে যাও।
তারা নূহ আলাইহিস সালামের কাছে যাবে। নূহ বলবেন—আমি জমিনবাসীর বিরুদ্ধে বদ-দুআ করায় তাদেরকে ধ্বংস করা হয়েছে (তাই আমি শাফায়াত করতে পারব না), তোমরা ইবরাহিমের কাছে যাও। সুতরাং তারা ইবরাহিম আলাইহিস সালামের কাছে যাবে। তিনি বলবেন, আমি তিনটি অসত্য বলেছি (তাই শাফায়াত করতে পারব না)। তারপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলবেন—তার প্রতিটি অসত্যই আল্লাহর দ্বীন শেখার ছিল। ইবরাহিম আলাইহিস সালাম বলবেন, অতএব তোমরা মূসার কাছে যাও!
তারা মূসা আলাইহিস সালামের কাছে যাবে। তিনি বলবেন, আমি একজনকে হত্যা করেছি (তাই শাফায়াত করতে পারব না)। তোমরা ঈসার কাছে যাও! সুতরাং তারা ঈসা আলাইহিস সালামের কাছে যাবে। তিনি বলবেন—আল্লাহকে ছেড়ে মানুষ আমার ইলাহও করেছে (আমি কীভাবে শাফায়াত করব)? তোমরা মুহাম্মাদের কাছে যাও। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, সুতরাং তারা আমার কাছে আসবে। আমি তাদের সাথে যাব।
ইবনু জুবহান বলেন, আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, আমি যেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছিলাম। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তারপর আমি জান্নাতের দরজার চৌকাট ধরে ঝাঁকুনি দেবো। বলা হবে, কে তিনি? তখন বলা হবে—মুহাম্মদ! সুতরাং আমার জন্য খুলে দেওয়া হবে এবং তারা আমাকে মারহাবা জানাবে। অতঃপর আমি সিজদাবনত হব। সুতরাং আল্লাহ তাআলা আমার হৃদয়ে তার প্রশংসা ও স্তুতি ইলহাম করবেন। তারপর আমাকে বলা হবে—মাথা উঁচু করে চাও, তোমাকে প্রদান করা হবে, শাফায়াত করো, তোমার শাফায়াত কবুল করা হবে এবং বলো, তোমার কথা শোনা হবে। এটাই হলো 'মাকামে মাহমুদ' যার ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন—
وَلَسَوْفَ يُعْطِيكَ رَبُّكَ فَتَرْضَىٰ
হায়াতো বা আপনার পালনকর্তা আপনাকে মাকামে মাহমুদে পৌঁছাবেন। [সূরা বনি ইসরাইল, আয়াত: ৭৯]
আব্দুল্লাহ ইবনু উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন—
কিয়ামতের দিন মানুষেরা লাশের মতো হয়ে যাবে। প্রতিটি উন্মুক্ত দাঁত তাদের নবির পিছু পিছু চলবে আর বলবে, হে অমুক! শাফায়াত করুন, হে অমুক! শাফায়াত করুন। পরিশেষে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর শাফায়াতের দায়িত্ব বর্তাবে। এটিই হবে সেই দিন—যেদিন আল্লাহ তাআলা তাকে মাকামে মাহমুদে অধিষ্ঠিত করবেন。
আবু সাইদ খুদরি রাদিয়াল্লাহু আনহু এর হাদিসে যে—'তিনটি আতঙ্কজনক' পরিস্থিতির কথা বলা হয়েছে, সেগুলো হলো—(আল্লাহই ভালো জানেন) প্রথমবার যখন জাহান্নামের তার লাগাম ধরে টেনে আনা হবে, এটি হবে আল্লাহর তাআলার সামনে হাজির হবার এবং হিসাবের পূর্বে। দ্বিতীয়বার যখন জাহান্নام নিঃশ্বাস ত্যাগ করবে, তখন সকলের হৃদয়ে ভয় ও আতঙ্ক শুরু বৃদ্ধি পাবে। তারপর তৃতীয়বার যখন জাহান্নাম আরেকবার নিঃশ্বাস গ্রহণ করবে, লোকজন ভয়ে উপুড় হয়ে পড়ে যাবে, চোখগুলো হানাবড়া হয়ে যাবে এবং তারা ওই ভয়ে অদূরাসে দেখতে থাকবে—হয়তো জাহান্নামের আগুন তাদের কাছে পৌঁছে যাবে বা আগুন তাদেরকে পাকড়াও করবে। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে তা থেকে মুক্তি দিন।
জাস্সাস: যখন প্রমাণিত হলো যে, মাকামে মাহমুদ হলো শাফায়াতের বিষয়, যাকে নবিগণ উপেক্ষা করবেন এবং অবশেষে আমাদের নবি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে আসবে। তখন তিনি মুমিন-কাফির নির্বিশেষে সকল হাশরকারীর জন্য নিঃশর্ত শাফায়াত করবেন যে, তাদেরকে কিয়ামতের বিভীষিকা থেকে পরিত্রাণ দেওয়া হোক। তবে জেনে রাখা ভালো যে, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শাফায়াতের পরিমাণ নিয়ে ওলামায়ে কেরামের মাঝে মতবিরোধ রয়েছে—তা কতবার হবে?
কাজি আয়ায রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, কিয়ামতের দিন আমাদের নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পাঁচটি শাফায়াত করবেন:
১. ব্যাপক ও শর্তহীন শাফায়াত।
২. একদল জান্নাতিকে হিসাব ছাড়া জান্নাতে প্রবেশ করানোর শাফায়াত।
৩. এমন একদল উন্মত—গুনাহের কারণে যাদের ওপর জাহান্নাম ওয়াজিব হয়ে যাবে, তাদের জন্য এবং নবিজির ইচ্ছা অনুযায়ী আরও কিছু মানুষের জন্য নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শাফায়াত।
৪. যেসব উন্মত যারা গুনাহের কারণে জাহান্নামে প্রবেশ করবে, তারপর তাদের মুক্তির জন্য আমাদের নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং অন্যান্য নবি আলাইহিমুস সালাম, ফেরেশতা এবং অন্যান্য মুমিন ভাইদের শাফায়াত।
৫. জান্নাতিদের সম্মান ও মর্যাদা বৃদ্ধি করার জন্য নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শাফায়াত।
ইমাম কুরতুবি রাহিমাহুল্লাহ বলেন—ছয় নাম্বার শাফায়াতও হবে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সম্মানিত চাচা আবু তালিবের আজাব হালকা করার জন্য।
টিকাঃ
[৩২] সহীহ মুসলিম, খণ্ড : ১, পৃষ্ঠা : ৪৪২, হাদিস : ২১৪。
[৯৯] মুসলিমুন জিয়াদাতুন, খণ্ড: ১০, পৃষ্ঠা: ৪১২, হাদিস: ৩০৭০。
[১০০] সহিহুল বুখারি, খণ্ড: ১৪, পৃষ্ঠা: ৩৩৪, হাদিস: ৫৯৯৬。