📄 নগ্ন পা-উলঙ্গ-খাতনাহীন জমায়েত
আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেছেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের সামনে নফরিতও করার জন্য দাঁড়িয়ে বললেন—‘হে মানবজাতি! তোমরা আল্লাহর নিকট পুনরুত্থিত হবে নগ্ন পায়ে, উলঙ্গ হয়ে, খতনাহীন অবস্থায়! (কুরআন কারিমে ইরশাদ হয়েছে) যেভাবে আমি প্রথমবার সৃষ্টি করেছিলাম, সেভাবে আবার সৃষ্টি করব। আমি প্রতিজ্ঞা করেছি, আমি তা পূর্ণ করবই। [সূরা আম্বিয়া, আয়াত: ১০৪] খবরদার, কিয়ামতের দিন প্রথম পোশাক পরানো হবে ইবরাহিম আলাইহিস সালামকে। খবরদার, আমার উম্মতের অনেক মানুষকে নিয়ে আসা হবে, অতঃপর তাদেরে বাম পার্শ্বে রাখা হবে। তখন আমি বলব—হে আমার রব, এরা আমার সাথি, তখন আল্লাহ তাআলা বলবেন—তুমি জানো না, তোমার অবর্তমানে (জীবনের মধ্যে) নতুন কী আবিষ্কার করেছে। তখন আমি সেকথাই বলব যেমন নেককার বান্দা বলেছে। (কুরআন কারিমে ইরশাদ হয়েছে!)
আর তাদের কাজকর্মের আমি সাক্ষী ছিলাম, যতদিন তাদের মাঝে বিদ্যমান ছিলাম। অতঃপর তুমি আমাকে উঠিয়ে নিলে, তখন তুমিই ছিলে তাদের কার্যকলাপের তত্ত্বাবধায়ক, আর তুমি হলে প্রত্যেক ব্যাপারের সাক্ষী। তুমি যদি তাদেরে শাস্তি দাও, তবে তারা তো তোমারই বান্দা, আর যদি তাদেরে ক্ষমা করে দাও, তাহলে তুমি তো মহাপরাক্রমশালী, মহাজ্ঞানধর অধিপতি। [সূরা মায়িদা, আয়াত: ১১৬-১১৭] তখন আমাকে বলা হবে—যখন থেকে তুমি তাদেরে হতে বিচ্ছিন্ন হয়েছিলে, তারা সর্বদা পৃষ্ঠ প্রদর্শন করেছ এবং উল্টো পায়ে ফিরে গেছে。
হাদিসে বর্ণিত বার্তা—প্রথমে ইবরাহিম আলাইহিস সালামকে পোশাক পরানো হবে, এর মাধ্যমে তার বিশাল মর্যাদা এবং বিশেষত্বের কথা বলা হয়েছে। যেমন মূসা আলাইহিস সালামের বিশেষত্ব হলো—নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে আরশের সাথে সম্পৃক্ত অবস্থায় পাবেন; অথচ নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রথমত জমিন বিদীর্ণ হয়ে বের হবেন। তবে এর দ্বারা এমনটা আবশ্যক হবে না যে, সাধারণত ইবরাহিম এবং মূসা আলাইহিমাস সালামের মর্যাদা নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চেয়ে অধিক হবে। বরং নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিয়ামতের মাঠে সবার চেয়ে বেশি মর্যাদাবান হবেন।
টিকাঃ
[১০৩] সহীহ মুসলিম, খণ্ড: ১৪, পৃষ্ঠা: ১৩৭, হাদিস: ৫১০৪。
[১০৪] সহীহ বুখারী, খণ্ড: ১৩, পৃষ্ঠা: ১৫২, হাদিস: ৪১০০。
📄 কিয়ামতের দিন প্রত্যেকেই নিজের চিন্তায় বিভোর থাকবে
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন— ﴿ لِكُلِّ امْرِئٍ مِّنْهُمْ يَوْمَئِذٍ شَأْنٌ يُغْنِيهِ ﴾ সেদিন প্রত্যেকেই নিজের এক চিন্তা থাকবে, যা তাকে ব্যতিব্যস্ত করে রাখবে। [সূরা আবাসা, আয়াত: ৩৭]
আয়িশা সিদ্দিকা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেছেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি—
﴿ يُبْصِرُ النَّاسَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ حُفَاةً عُرَاةً غُرْلًا فَقُلْتُ يَا رَسُولَ اللَّهِ النِّسَاءُ وَالرِّجَالُ جَمِيعًا يَنْظُرُ بَعْضُهُمْ إِلَى بَعْضٍ قَالَ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَا عَائِشَةَ الْأَمْرُ أَعْظَمُ مِنْ أَن يُنْظَرَ بَعْضُهُمْ إِلَى بَعْضٍ ﴾ মানুষকে কিয়ামতের দিন নগ্ন পায়ে, উলঙ্গ অবস্থায় খতনাহীনভাবে জমায়েত করা হবে। আয়িশা বললেন, আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! নর-নারী সবাই একে অপরের দিকে দেখবে? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন—হে আয়িশা, পরিস্থিতি পরস্পরের দিকে তাকানোর চেয়ে মারাত্মক কঠিন হবে। (যার কারণে অন্যের দিকে তাকানোর অবকাশ থাকবে না)।
টিকাঃ
[১০৫] সহীহ মুসলিম, খণ্ড: ১৪, পৃষ্ঠা: ১৪০, হাদিস: ৫১০২。
📄 কিয়ামত দিবসের বিভিন্ন নাম
কিয়ামত দিবসের অনেক নাম রয়েছে। যেমন:
১. قِيَامَةُ السَّاعَةِ – কুরআন কারিমে ইরশাদ হয়েছে— ﴿ وَيَوْمَ تَقُومُ السَّاعَةُ يُقْسِمُ الْمُجْرِمُونَ مَا لَبِثُوا غَيْرَ سَاعَةٍ ﴾ যেদিন কিয়ামত সংঘটিত হবে, সেদিন অপরাধীরা কসম খেয়ে বলবে যে, এক মুহূর্তের বেশি অবস্থান করিনি। [সূরা রূম, আয়াত: ৫৫] আরও ইরশাদ হয়েছে— ﴿ وَيَوْمَ تَقُومُ السَّاعَةُ يُبْلِسُ الْمُجْرِمُونَ ﴾ যেদিন কিয়ামত সংঘটিত হবে, সেদিন অপরাধীরা হতাশ হয়ে যাবে। [সূরা রূম, আয়াত: ১২]
২. يَوْمُ الْقِيَامَةِ – আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন— ﴿ لَا أُقْسِمُ بِيَوْمِ الْقِيَامَةِ ﴾ আমি শপথ করি কিয়ামত দিবসের। [সূরা কিয়ামা, আয়াত: ১]
৩. يَوْمُ النَّفْخِ – আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন—
﴿ وَلَهُ الْمُلْكُ يَوْمَ يُنفَخُ فِي الصُّورِ ﴾ সেদিন তাঁরই আধিপত্য হবে যেদিন সিঙ্গায় ফুঁৎকার দেওয়া হবে। [সূরা আনআম, আয়াত: ৭৩]
৪. يَوْمُ الرَّاجِفَةِ ও يَوْمُ الرَّادِفَةِ – আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন— ﴿ يَوْمَ تَرْجُفُ الرَّاجِفَةُ O تَتْبَعُهَا الرَّادِفَةُ ﴾ ‘যেদিন প্রকম্পিত করবে প্রকম্পিতকারী, অতঃপর পশ্চাতে আসবে পশ্চাদগামী।’ [সূরা নাযিয়াত, আয়াত: ৬, ৭] যেমিন প্রকম্পিত করবে প্রকম্পিতকারী, অতঃপর পশ্চাতে আসবে পশ্চাদগামী।
কিয়ামত দিবসের অন্য নামগুলো হলো:
৫. يَوْمُ الْقَارِعَةِ – কড়াক্কাত করার দিন। কারণ, এ দিনের ভয়াবহতা হৃদয়গুলোকে কড়াক্কাত করবে।
৬. يَوْمُ الْبَعْثِ – পুনরুত্থান দিবস।
৭. يَوْمُ النُّشُورِ – উত্থানের দিন। যার মাঝে জীবিত করার অর্থ রয়েছে। আরবিতে বলা হয়ে থাকে—
أَنْشَرَ اللَّهُ الْمَوْتَى فَنُشِرُوا আল্লাহ মৃতদেরকে জীবিত করেছেন, সুতরাং তারা জীবিত হয়েছে।
৮. يَوْمُ الْخُرُوجِ – আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন— ﴿ يَوْمَ يَخْرُجُونَ مِنَ الْأَجْدَاثِ سِرَاعًا ﴾ সেদিন তারা কবর থেকে দ্রুত বেগে বের হবে। [সূরা মাআরিজ, আয়াত: ৪৩] তো এই দিনের শুরুটা হবে কবর থেকে বের হওয়ার মাধ্যমে, আর শেষটা হবে মুনিদের জাহান্নামে থেকে বের হওয়ার মাধ্যমে। তারপর কেউ জাহান্নাম থেকে বেরও হবে না এবং জাহান্নামে প্রবেশও করবে না।
৯. يَوْمُ الْحَشْرِ – সমবেত হওয়ার দিন।
১০. يَوْمُ الْعَرْضِ – উপস্থাপন করার দিন। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন— ﴿ يَوْمَئِذٍ تُعْرَضُونَ لَا تَخْفَى مِنكُمْ خَافِيَةٌ ﴾
'সেদিন তোমাদের উপস্থিত করা হবে; তোমাদের কোনো কিছু গোপন থাকবে না' [সুরা হাক্কাহ, আয়াত: ১৮] এর প্রকৃতি হলো — কারও অবস্থা জানার জন্য কোনো একটি ইন্দ্রিয়ের ব্যবহার করা。
১৭. يوم الجمعة -একত্রিত হওয়ার দিন। এর প্রকৃতি হলো —একজনকে আরেকজনের সাথে মিলিয়ে জোড় করে দেওয়া। অথবা এক জোড়াকে আরেক জোড়ার সাথে মিলিয়ে জামায়েত করে দেওয়া। আল্লাহ্ তায়ালা ইরশাদ করেছেন— يَوْمَ يَجْمَعُكُمْ لِيَوْمِ الْجَمْعِ সম্মেলনের দিন আল্লাহ্ তোমাদের সমবেত করবেন। [সুরা তাগাবুন, আয়াত: ৯]
১৮. يوم الفزع -আতঙ্কের দিন। কুরআন কারিমে ইরশাদ হয়েছে— لَا يَحْزُنُهُمُ الْفَزَعُ الْأَكْبَرُ মহাত্রাস তাদের চিন্তান্বিত করবে না। [সুরা আম্বিয়া, আয়াত: ১০৩]
১৯. يوم التناد -আর্তনাদের দিন। কুরআন কারিমে ইরশাদ হয়েছে— أَخَافُ عَلَيْكُمْ يَوْمَ التَّنَادِ، يَوْمَ تُوَلُّونَ مُدْبِرِينَ আমি তোমাদের ওপর ভয় করছি আর্তনাদের দিনে। যেদিন তোমরা মুখ ফিরিয়ে পালাবে। [সুরা গাফির, আয়াত: ৩২-৩৩]
২০. يوم الواقعة -আরবি ভাষায় শব্দটির মূল হলো وقع , যার অর্থ সংঘটিত হওয়া, পাওয়া। শরিয়তে কিয়ামতকে দিন সংঘটিত হওয়ার এবং পাপ-পুণ্যের বিনিময় পাওয়ার বিষয়াদির প্রতি গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
২১. يوم الحافضة والرافعة -উঁচু-নিচু করার দিন। অর্থাৎ এক শ্রেণির জান্নাতকে উত্তীর্ণ হবে, আরেকটি শ্রেণি জাহান্নামে অধঃপতিত হবে।
২২. يوم الحساب -হিসাবের দিন। আল্লাহ্ তায়ালা এই দিন সৃষ্টির ভালো ও মন্দ আমলের হিসাব নেবেন, নিজের নিয়ামত দান করবেন। তারপর পরস্পরের বিনিময় দেবেন。
২৩. يوم السؤال -জিজ্ঞাসার দিন। আল্লাহ্ তায়ালা তার সৃষ্টিকে ইহকালে-পরকালে জিজ্ঞাসা করবেন, তাদের বিরুদ্ধে প্রমাণ প্রতিষ্ঠা করার জন্য এবং হিকমত প্রকাশ করার জন্য।
২৪. يوم الشهادة -সাক্ষ্যের দিন। ইরশাদ হয়েছে— يَوْمَ يَقُومُ الْأَشْهَادُ যেদিন সাক্ষীরা দাঁড়াবে। [সুরা গাফির, আয়াত: ৫১]
২৫. يوم الخالصة -সত্যের দিন। কারণ, এদিন সমস্ত বিষয় সত্যরূপে প্রকাশিত হবে।
২৬. يوم القامة -বিজয়ীর দিন।
২৭. يوم الصائخة -ফুঁৎকারর দিন। ইকরিমা বলেছেন— الصائخة -হলো প্রথম ফুঁৎকার। আর الطامة -দ্বিতীয় ফুঁৎকার।
২৮. يوم الوعيد -শাস্তির দিন। আল্লাহ্ তায়ালা অনেক কাজের আদেশ যেমন দিয়েছেন, তেমনি অনেক কাজ থেকে বারণ করেছেন। অনেক কিছুর প্রতিশ্রুতি যেমন দিয়েছেন, তেমনি অনেক কাজের ব্যাপারে ভীতিপ্রদর্শনমূলক সতর্কবার্তা প্রদান করেছেন। সুতরাং এটি যদি الوعيد প্রতিশ্রুতির দিন। তো প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন নিয়ামতের, আর সতর্ক করেছেন যন্ত্রণাময়ক শাস্তির ব্যাপারে। সতর্কবার্তার মূল হলো—আল্লাহ্ বিধানের অন্যথা করলে শাস্তি পেতে হবে। আর প্রতিশ্রুতির মূল হলো—আল্লাহ্ বিধানের অনুকূল চললে পুরষ্কৃত হতে হবে।
২৯. يوم الدين -প্রতিদান দিবস।
৩০. يوم الجزاء -প্রতিদানের দিন। আল্লাহ্ তায়ালা ইরশাদ করেছেন— الْيَوْمَ تُجْزَوْنَ مَا كُنْتُمْ تَعْمَلُونَ আজকে তোমাদের কৃতকর্মের প্রতিদান প্রদান করা হবে। [সুরা জাসিয়া, আয়াত: ২৮] আরও ইরশাদ হয়েছে—
الْيَوْمَ تُجْزَى كُلُّ نَفْسٍ بِمَا كَسَبَتْ প্রতিটি প্রাণকে তার কৃতকর্মের বিনিময় দেওয়া হবে। [সুরা গাফির, আয়াত: ১৭]
৩১. يوم التلاق -সাক্ষাতের দিন। কুরআন কারিমে ইরশাদ হয়েছে— لِتُنْذِرَ يَوْمَ التَّلَاقِ যেন সাক্ষাতের দিন সম্পর্কে সতর্ক করো। [সুরা গাফির, আয়াত: ১৫]
৩২. يوم الأرفة -নেকটের দিন।
৩৩. يوم المآب -আল্লাহর কাছে ফিরে যাওয়ার দিন।
৩৪. يوم المصير -আল্লাহর কাছে ফিরে যাওয়ার দিন। কুরআন কারিমে ইরশাদ হয়েছে— وَلِلَّهِ مُلْكُ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضِ ۖ وَإِلَى اللَّهِ الْمَصِيرُ আকাশ ও জমিনসমূহের আধিপত্য আল্লাহর এবং আল্লাহর কাছেই ফিরে যেতে হবে। [সুরা নুর, আয়াত: ৪২]
৩৫. يوم القضاء -ফায়সালার দিন। এ দিন চূড়ান্ত নির্দেশ ও ফায়সালা প্রদান করা হবে।
৩৬. يوم الوزن -ওজন করার দিন। আল্লাহ্ তায়ালা ইরশাদ করেছেন— وَ الْوَزْنُ يَوْمَئِذٍ الْحَقُّ এবং সেদিনের ওজন হবে সত্য। [সুরা আরাফ, আয়াত: ৮]
৩৭. يوم عظيم -বড়ো দিন। যেহেতু এই দিনের পর দুনিয়ার আর কোনো দিন থাকবে না, এজন্য কিয়ামতের দিনকে বড়ো নামে বিশেষায়িত করা হয়েছে।
৩৮. يوم عسير -কঠিন দিন। এই কঠিন মুহূর্ত বিশেষভাবে কাফিরদের জন্য।
৩৯. يوم مشهود -প্রত্যক্ষকৃত দিন। যেহেতু এই দিনটিকে সবাই প্রত্যক্ষ করবে, তাই প্রত্যক্ষকৃত দিনও বলা হয়। কেউ কেউ বলেছেন—যেহেতু শাহিদগণ এদিন সাক্ষ্য প্রদান করবে, তাই কিয়ামতের দিনকে مشهود يوم তথা সাক্ষ্য দেওয়ার দিনও বলা হয়।
৪০. يوم التغابُن -প্রতারণার দিন। যেহেতু এদিন মানুষ আল্লাহর কাছে তাদের কামনা অনুপাতে মর্যাদা পেতে ব্যর্থ হবে এবং মনে মনে প্রতারিত হবে—একদল যাবে জান্নাতের দিকে, আরেক দল যাবে জাহান্নামে। তাই এই দিনটিকে প্রতারণার দিন বলা হয়। আরবি ভাষায় লেনদেনের ক্ষেত্রে কোনো একজনের জন্য আধিকা প্রমাণিত হওয়াকে তাগাবুন বলা হয়। (যেহেতু কিয়ামতের মাঠে একদল জান্নাতে যাবে, আরেক দল বঞ্চিত হয়ে জাহান্নামে যাবে, তাই এই দিনকে يوم التغابن -প্রতারণার দিন বলা হয়।)
৪১. يوم الغاشية -আবরণের দিন। এদিন যেহেতু আতঙ্ক সবার চোখ বন্ধ হয়ে যাবে, ভয়ের আবরণে ঢেকে যাবে, তাই কিয়ামতের দিনকে الغاشية يوم -আবরণের দিনও বলা হয়。
📄 কিয়ামতের ভয়াবহতা ও কষ্ট থেকে মুক্তি পাওয়ার উপায়
আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন— যে ব্যক্তি কোনো মুমিনের জাগতিক কোনো কষ্ট দূর করে, আল্লাহ্ তায়ালা তার ওপর থেকে কিয়ামতের কোনো কষ্ট দূর করবেন。
আব্দুল্লাহ্ ইবনু মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন— তোমাদের পূর্ববর্তী একজন মানুষের হিসাব নেওয়া হবে। তখন তার কোনো নেক আমল পাওয়া যাবে না। তবে সে লোকজনের সাথে মিশত, এদিকে লোকটি ছিল ধনাঢ্য। সে তার কর্মচারীদেরকে নির্দেশ দিত—লোকজনের প্রতি যেন কঠোরতা প্রদর্শন না করে। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আল্লাহ্ তায়ালা বলেছেন—আমি মানুষের দোষ ক্ষমা করার ব্যাপারে তার চেয়ে বেশি হকদার। অতএব, তোমরাও তাদের দোষ ক্ষমা করো。
হুযাইফা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, মিনহিজি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন— জনৈক ব্যক্তি মারা গিয়ে জান্নাতে প্রবেশ করল। তাকে জিজ্ঞেস করা হলো—তুমি কী আমল করতে? সে বলল—আমি লোকজনের সাথে ব্যবসা করতাম। তো আমি যখন কোনো অভাবী মানুষকে দেখতাম, নগদ কিছু টাকা-পয়সা ছেড়ে দিতাম। এই ওসিলায় আমাকে ক্ষমা করা হয়েছে。
কাতাদা রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেছেন, একজন ঋণগ্রস্ত ব্যক্তিকে তিনি খুঁজছিলেন, যে আত্মগোপন করে ছিল। তারপর তাকে পেলেন। সে বলল—আমি অভাবী। কাতাদা বললেন, আল্লাহর কসম? লোকটি বলল—আল্লাহর কসম। তারপর কাতাদা রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, আমি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি—
مَنْ سَرَّهُ أَنْ يُنْجِيَهُ اللَّهُ مِنْ كُرَبِ يَوْمِ الْقِيَامَةِ فَلْيُنَفْسْ عَنْ مُعْسِرٍ أَوْ يَضَعْ عَنْهُ
যে ব্যক্তি এটা চেয়ে খুশি হয় যে, আল্লাহ্ তায়ালা তাকে কিয়ামতের কষ্ট থেকে মুক্তি দেবেন, সে যেন অভাবী মানুষের কষ্ট দূর করে বা তার ঋণ মওকুফ করে দেয়。
আবুল ইয়াসার বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি— যে ব্যক্তি কোনো অভাবীকে অবকাশ দেয় বা তার ঋণ মওকুফ করে দেয়, তাকে আল্লাহ্ তায়ালা তার (আরশের) ছায়ায় আশ্রয় দান করবেন。
রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেছেন—
سَبْعَةٌ يُظِلُّهُمُ اللَّهُ فِي ظِلِّهِ يَوْمَ لَا ظِلَّ إِلَّا ظِلُّهُ الْإِمَامُ الْعَادِلُ وَشَابٌّ نَشَأَ فِي عِبَادَةِ رَبِّهِ وَرَجُلٌ قَلْبُهُ مُعَلَّقُ فِي الْمَسَاجِدِ وَرَجُلَانِ تَحَابَّا فِي اللَّهِ اجْتَمَعَا عَلَيْهِ وَتَفَرَّقَا عَلَيْهِ وَرَجُلٌ طَلَبَتْهُ امْرَأَةٌ ذَاتُ مَنْصَبٍ وَجَمَالٍ فَقَالَ إِنِّي أَخَافُ اللَّهَ وَرَجُلٌ تَصَدَّقَ أَخْفَى حَتَّى لَا تَعْلَمَ شِمَالُهُ مَا تُنْفِقُ يَمِينُهُ وَرَجُلٌ ذَكَرَ اللَّهَ خَالِيًا فَفَاضَتْ عَيْنَاهُ.
সাত শ্রেণির মানুষকে আল্লাহ্ তার আরশের ছায়ায় আশ্রয় প্রদান করবেন, যেদিন তার আরশের ছায়া ব্যতীত অন্য কোনো ছায়া থাকবে না। তারা —নেকীবান শাসক; ওই যুবক যে তার যৌবনকালকে তার রবের ইবাদতে কাটিয়েছে; ওই মানুষ যার কলব মসজিদের সাথে সম্পর্ক থাকে; ওই দুজন মানুষ যারা পরস্পরকে আল্লাহর জন্য ভালোবাসে, তারপর আল্লাহর জন্যই একত্রিত হয় এবং আল্লাহর জন্যই বিচ্ছিন্ন হয়; ওই মানুষ যাকে সম্ভ্রান্ত পরিবারের কোনো সুন্দরী ললনা ব্যাভিচারের প্রতি আহ্বান করে, আর সে জবাব দেয়—আমি আল্লাহকে ভয় করি; ওই মানুষ যে এত গোপনে দান করে যে, তার বাম হাত জানে না ডান হাত কী দান করেছে এবং সেই মানুষ যে নির্জনে আল্লাহকে স্মরণ করে, যার কারণে তার চোখ দিয়ে অশ্রু প্রবাহিত হয়。
এই অধ্যায়ের সমর্থনে এবং অধ্যায়ের সবগুলোকে পরিব্যাপ্ত করে কুরআন কারিমের এই আয়াতগুলোই ইশাদ হয়েছে—
وَيُؤْتُونَ بِالْخُبْزِ وَيُطْعِمُونَ الطَّعَامَ عَلَى حُبِّهِ مِسْكِينًا وَيَتِيمًا وَأَسِيرًا، إِنَّمَا نُطْعِمُكُمْ لِوَجْهِ اللَّهِ لَا نُرِيدُ مِنكُمْ جَزَاءً وَلَا شُكُورًا، إِنَّا نَخَافُ مِن رَّبِّنَا يَوْمًا عَبُوسًا قَمْطَرِيرًا، فَوَقَاهُمُ اللَّهُ شَرَّ ذَلِكَ الْيَوْمِ وَلَقَّاهُمْ نَضْرَةً وَسُرُورًا.
তারা মানত পূর্ণ করে এবং সেদিনকে ভয় করে, যেদিনের অনিষ্ট হবে সুদূরপ্রসারী। তারা আল্লাহর প্রেমে অভাবগ্রস্ত, এতিম ও বন্দিকে আহার্য দান করে। তারা বলে, কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য আমরা তোমাদের আহার্য দান করি এবং তোমাদের কাছে কোনো প্রতিদান ও কৃতজ্ঞতা কামনা করি না। আমরা আমাদের পালনকর্তার তরফ থেকে এক ভীতিপ্রদ ভয়াবহ দিনের ভয় রাখি, অতঃপর আল্লাহ তাদের সেদিনের অনিষ্ট থেকে রক্ষা করবেন এবং তাদেরকে দেবেন সজীবতা ও আনন্দ। [সুরা দাহর, আয়াত: ৭-১১]
আরও ইশাদ হয়েছে—
إِنَّا لَا نُضِيعُ أَجْرَ مَنْ أَحْسَنَ عَمَلًا
যে ব্যক্তি নেককাজ করে, আমরা তার প্রতিদান নষ্ট করব না। [সুরা কাহাফ, আয়াত: ৩০]
এমনিভাবে অনেক স্থানে নেককাজের আলোচনা করা পর বলা হয়েছে—
فَلَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ
তাদের ওপর না কোনো ভয় আসবে, না কোনো কারণে তারা চিন্তগ্রস্ত হবে। [সুরা বাকারা, আয়াত: ৩৮]
টিকাঃ
[৬০] সহীহ মুসলিম, খণ্ড: ৪, পৃষ্ঠা: ২০২, হাদিস: ২১২১。
[৬১] সহীহ মুসলিম, খণ্ড: ৪, পৃষ্ঠা: ২০২, হাদিস: ২১২৮。
[৬০] সহীহ মুসলিম, খণ্ড: ৩, পৃষ্ঠা: ৯৯৪, হাদিস: ২১২১。
[৬১] সহীহ মুসলিম, খণ্ড: ৩, পৃষ্ঠা: ৯৯৪, হাদিস: ২১২৮。
[৬২] সহীহ মুসলিম, খণ্ড: ৩, পৃষ্ঠা: ১০০, হাদিস: ২১৬১。
[৬৩] সহীহ মুসলিম, খণ্ড: ৩, পৃষ্ঠা: ২০২, হাদিস: ৬৯২。
[৬৪] সহীহ বুখারী, খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ২১২, হাদিস: ৬৬০。
[২৫] সহীহুল বুখারি, খণ্ড : ১, পৃষ্ঠা : ২১, হাদিস : ৬২০; সহীহ মুসলিম, খণ্ড : ৪, পৃষ্ঠা : ২২৯, হাদিস : ১৭২。