📄 কবরে প্রশ্ন এবং আজাব থেকে আশ্রয় চাওয়া
আনাস ইবনু মালিক রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন—
إِنَّ الْعَبْدَ إِذَا وُضِعَ فِي قَبْرِهِ وَتَوَلَّى عَنْهُ أَصْحَابُهُ وَإِنَّهُ لَيَسْمَعُ قَرْعَ نِعَالِهِمْ أَتَاهُ مَلَكَانِ فَيُقْعِدَانِهِ فَيَقُولَانِ مَا كُنْتَ تَقُولُ فِي هَذَا الرَّجُلِ لِمُحَمَّدٍ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَأَمَّا الْمُؤْمِنُ فَيَقُولُ أَشْهَدُ أَنَّهُ عْبُدُ اللَّهِ وَرَسُولُهُ فَيُقَالُ لَهُ انْظُرْ إِلَى مَقْعَدِكَ مِنَ النَّارِ قَدْ أَبْدَلَكَ اللَّهُ بِهِ مَقْعَدًا مِنَ الْجَنَّةِ فَيَرَاهُمَا جَمِيعًا قَالَ قَتَادَةُ وَذُكِرَ لَنَا أَنَّهُ يُفْسَحُ لَهُ فِي قَبْرِهِ أَمَّا الْكَافِرُ أَوْ الْمُنَافِقُ فَيَقُولُ لَا أَدْرِي كُنْتُ أَقُولُ مَا يَقُولُ النَّاسُ فَيُقَالُ لَا دَرَيْتَ وَلَا تَلَيْتَ ثُمَّ يُضْرَبُ بِمِطْرَقَةٍ مِنْ حَدِيدٍ ضَرْبَةً بَيْنَ أُذُنَيْهِ فَيَصِيحُ صَيْحَةً يَسْمَعُهَا مَنْ يَلِيهِ إِلَّا الثَّقَلَيْنِ.
বান্দাকে কবরে রাখার পর যখন তার সঙ্গীরা ফিরে যেতে থাকে, তখনো সে সঙ্গীদের জুতার শব্দ শুনতে পায়, ইতিমধ্যে দুজন ফিরিশতা এসে তাকে বসায়। তারপর সেই দুই ফিরিশতা বান্দাকে বলেন—মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নামের এই লোকটির ব্যাপারে তোমার মন্তব্য কী? বান্দা মুমিন হলে জবাব দেয়—আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, তিনি আল্লাহর বান্দা এবং তাঁর রাসূল। এরপর তাকে বলা হয়—তুমি তোমার জাহান্নামের ঠিকানাটা দেখো! তবে আল্লাহ তোমার সেই ঠিকানাকে জান্নাত দ্বারা পালটে দিয়েছেন। তখন সে জান্নাত ও জাহান্নাম উভয়টিই দেখতে পায়। কাতাদা রাদিয়াল্লাহু বলেন, আমাদের সামনে আলোচনা করা হয়েছে যে, তার জন্য কবরকে প্রশস্ত করে দেওয়া হয়। আর কাফির ও মুনাফিক্ব বললে, জানি না; লোকজন যা বলত আমি তা বলতাম কি না! সুতরাং তাকে বলা হয়—তুমি জানো না, তুমি পড়োওনি। তারপর লোহার খুন্তি দ্বারা তার দুই কানের মাঝে আঘাত করা হবে। যার কারণে সে এত বিকট শব্দে চিৎকার করবে যে, মানুষ ও জিন ছাড়া সবাই তা শুনতে পারবে。
টিকাঃ
[৪৫৫] সহীহুল বুখারী, খণ্ড: ৩, পৃষ্ঠা: ৪১, হাদিস: ১২১২。
[৪৫৬] সহীহুল বুখারী, খণ্ড: ৩, পৃষ্ঠা: ১১০, হাদিস: ১২২২。
📄 মাইয়্যেতের রুহ কবজ এবং তার কবরের অবস্থা
বারা ইবনু আজিব রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন—আমরা জনৈক আনসারায় জানাযায় অংশগ্রহণের উদ্দেশ্যে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে যাত্রা করলাম। একপর্যায়ে আমরা কবরের কাছে পৌঁছালাম। কবরটি লাহাদ্ কবর ছিল না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বসলেন, আমরাও তাঁর পাশে বসলাম। চারদিকে ছিল নীরবতা, যেন আমাদের মাথার ওপর পাখি বসে আছে। আমার ইবনু সাবিঙ এবং আবূ আওয়ানার বর্ণিত শব্দের মাঝে সামান্য বেশকম আছে, তবে অর্থ ও মর্ম একই। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কখনো চোখ উঁচু করে আকাশের দিকে দেখছিলেন, আবার কখনো চোখ নিচু করে জমিনের দিকে দেখছিলেন। তারপর বললেন—
'আমি কবরের আযাব থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করছি এই কথাটি তিনি কয়েকবার বললেন। তারপর বললেন—মুমিন বান্দা যখন পৃথিবীর সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে পরকালের দিকে যাত্রা করতে শুরু করবে, তখন একজন ফিরিশতা এসে তার শিরে বসে বলবে—হে পবিত্র আত্মা, আল্লাহর ক্ষমা এবং তাঁর সন্তুষ্টির প্রতি যাত্রা করো। সুতরাং তার প্রাণ দেহ থেকে এমনভাবে বের হবে, যেন বৃষ্টির পানি প্রবাহিত হয়। জান্নাত থেকে শুভ্র অবয়ব-বিশিষ্ট ফিরিশতামণ্ডলী অবতরণ করবে, যাদের চোহারাগুলো হবে সূর্যের মতো জ্যোতির্ময়। তাদের কাছে থাকবে জান্নাতি কাফন ও মেহেদি। তারা সে ব্যক্তির সম্মুখে বসবে। ফিরিশতা যখন তার প্রাণ কবজ করবে, এক মুহূর্তের জন্যও তাকে তার হাতে ছাড়বে না। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন—
تَوَفَّتْهُ رُسُلُنَا وَهُمْ لَا يُفَرِّطُونَ
তাকে আমাদের দূতগণ (ফিরিশতামণ্ডলী) মৃত্যু দিয়েছে, তবে তারা বাড়াবাড়ি করেনি। [সূরা আনআম, আয়াত: ৬১]
সুতরাং তার প্রাণটি সুঘ্রাণের ন্যায় বের হবে যা অনুভব করা যাবে। এরপর তাকে নিয়ে ফিরিশতারা ওপরের দিকে উঠতে থাকবে। আকাশ ও জমিনের প্রতিটি বাহিনী—যাদের কাছ দিয়েও (এই রূহ বহনকারী ফিরিশতারা) অতিক্রম করবে, তারা বলবে—এই রূহ প্রাণটি কার? তার সুন্দর নাম নিয়ে বলা হবে—অমুক। এভাবে তারা দুনিয়ার আকাশের দরজার কাছে যখন পৌঁছবে, সুতরাং তার জন্য দরজা খুলে দেওয়া হবে। এভাবে প্রতিটি আকাশের 'নৈকট্যপ্রাপ্ত ফিরিশতারা' তাকে সম্ভাষণ জানাবে। একপর্যায়ে সপ্তম আকাশে পৌঁছে যাবে। তখন বলা হবে—তার আমলনামাকে ইল্লিয়িনে লিখে দাও! আল্লাহ তাআলা কুরআন কারিমে ইরশাদ করেছেন—
أَمَدْرَاكَ مَا عِلِيُّونَ كَلَّا إِنَّ كِتَبَ الْفُجَّارِ لَفِي سِجِّينٍ وَمَا أَدْرَاكَ مَا سِجِّينٌ كَلَّا إِنَّ كِتَبَ الْأَبْرَارِ لَفِي عِلِّيِّينَ
আপনি জানেন 'ইল্লিয়িন' কী? এটা লিপিবদ্ধ খাতা, আল্লাহর নৈকট্যপ্রাপ্ত ফিরিশতাগণ একে প্রত্যক্ষ করে। [সূরা মুতাফ্ফিফীন, আয়াত: ১৮-২১]
তার আমলনামাকে ইল্লিয়িনে লিখে দেওয়া হবে। তারপর বলা হবে—তাকে জমিনে ফিরিয়ে নিয়ে যাও। কারণ, আমি তাকে সাথে প্রতিজ্ঞা করেছি—তাদেরকে মাটি থেকে সৃষ্টি করেছি, মাটিতে ফিরিয়ে দেবো এবং তাদেরকে আবার মাটি থেকেই পুনরুত্থিত করব। বর্ণনাকারী বলেন, সুতরাং তাকে জমিনে ফিরিয়ে দেওয়া হবে এবং তার রূহকে তার শরীরে ফিরিয়ে দেওয়া হবে। এরপর পাথর দুজন ফিরিশতা তার কাছে আসবে, অতঃপর তাকে বাকি দিয়ে উঠিয়ে বসাবেন তারপর জিজ্ঞেস করবে—তোমার রব কে? তোমার দ্বীন-ধর্ম কী? এবং তোমার নবি কে? সে জবাব দেবে—আমার রব আল্লাহ এবং আমার দ্বীন ইসলাম। তখন ফিরিশতা দুজন জিজ্ঞেস করবে—তোমাদের মাঝে প্রেরিত এই মানুষটির ব্যাপারে কী বলবে? সে বলবে—তিনি আল্লাহর রাসূল। তখন ফিরিশতারা জিজ্ঞেস করবে—তুমি কীভাবে জানলে? সে বলবে, তিনি আমাদের রবের পক্ষ থেকে আমাদের কাছে প্রমাণসহ আগমন করেছিলেন। সুতরাং আমরা তার প্রতি ঈমান এনেছি এবং তাকে সত্যয়ান করেছি। বিষয়টি আল্লাহ তাআলা এভাবে বলেছেন—
يُثَبِّتُ اللهُ الَّذِينَ ءَامَنُواْ بِالْقَوْلِ الثَّابِتِ فِي الْحَيَوةِ الدُّنْيَا وَفِي الْآخِرَةِ
আল্লাহ তাআলা মুমিনদেরকে ইহকালে ও পরকালে দৃঢ় কথার (কালিমার) মাধ্যমে অবিচল রাখবেন। [সূরা ইবরাহিম, আয়াত: ২৭]
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন—আকাশ থেকে জনৈক ঘোষক ঘোষণা দেবেন—আমার বান্দা সত্য বলেছে, সুতরাং তাকে জান্নাতের পোশাক পরিয়ে দাও, তার জন্য জান্নাতের বিছানা বিছিয়ে দাও এবং তাকে জান্নাতের ঠিকানা দেখিয়ে দাও! তার জন্য দূরীয়সীমা পর্যন্ত কবরকে প্রশস্ত করে দেওয়া হবে। তার আমলকে সুন্দর অবয়ববিশিষ্ট, সুঘ্রাণযুক্ত এবং সুন্দর কাপড় পরিহিত মানুষের রূপে উপস্থাপন করা হবে। সে বলবে—তুমি সুসংবাদ গ্রহণ করো। সে বিষয়গুলো—যা আল্লাহ তাআলা তোমার জন্য প্রস্তুত করেছেন, আল্লাহর সন্তুষ্টির সুসংবাদ গ্রহণ করো এবং বাগিচাসমূহের সুসংবাদ গ্রহণ করো—যা নিয়ামতে পরিপূর্ণ! সে জিজ্ঞেস করবে, আল্লাহ কল্যাণের সুসংবাদ দিয়েছেনা তুমি কে? তোমার চেহারা তো এমন যা, কল্যাণই নিয়ে এসেছে। তখন মানুষরূপী আমল বলবে—এটা তোমার সাথে প্রতিশ্রুতি দিন এবং তোমার সাথে প্রতিশ্রুত বিষয়। আমি তোমার নেক আমল। আল্লাহ তাআলার কসম! আমি তোমাকে পেয়েছি আল্লাহর রেযামন্দি এবং আল্লাহর আযাবাধার প্রতি পেয়েছি মহৎ। অতএব, আল্লাহ তোমাকে উত্তম প্রতিদান প্রদান করুন। তখন বান্দা বলবে—হে আমার রব! কিয়ামত সংঘটিত করো, যেন আমি নিজের পরিবার ও সম্পদের কাছে ফিরে যেতে পারি।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন—যদি মৃত ব্যক্তি পাপাচারী হয় এবং সে ইহকালকে বিদায় জানিয়ে পরকালের যাত্রার জন্য অপেক্ষায় থাকে, তখন জনৈক ফিরিশতা এসে তার শিরে বসে বলবে, হে নোংরা আত্মা! বের হ। সুসংবাদ গ্রহণ কর আল্লাহর অসন্তুষ্টি এবং ক্রোধের! অতঃপর আগুনের চট নিয়ে রুক্ষ চেহার- বিশিষ্ট এসকল ফিরিশতা অবতরণ করবে। ফিরিশতারা তাকে মৃত্যুকাল অবকাশ না দিয়ে তার প্রাণ সংহার করার জন্য প্রস্তুত হবে। তখন তার প্রাণটি গোটা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। যার কারণে ফিরিশতা তাকে জোরপূর্বক সংহার করেন। ফলে তার শরীরের শিরা- উপশিরা এবং রগগুলো ছিঁড়ে যায়। যেন ভেজা চামড়ার ভেতরে লোহার শিং ঢুকিয়ে দেওয়া হয়, তারপর ফিরিশতারা সেগুলো ধরে খুব জোরে টান দেন। ফলে দুর্দশাগ্রস্ত নোংরা বাতাসের মতো বের হয়ে আসে। যার কারণে আকাশ ও জমিনের যে অঞ্চল দিয়ে অতিক্রম করে, সেখানকার অধিবাসীরা বলে—এই নোংরা প্রাণটি কার? তারা মৃত ব্যক্তির নিকৃষ্টতম নামগুলো নিয়ে বলবে—অমুকের। এভাবে যখন তারা প্রথম আকাশের কাছে পৌঁছে যায়, তার জন্য আকাশের দরজা খোলা হয় না। আল্লাহ তাআলা বলবে—তাকে জমিনে ফিরিয়ে নিয়ে যাও! আমি তাদেরকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছি যে, তোমাদেরকে মাটি থেকে সৃষ্টি করেছি, মাটিতে ফিরিয়ে দেবো এবং তাদেরকে মাটি থেকেই পুনরুত্থিত করব। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন—সুতরাং তাকে আকাশ থেকে ছুঁড়ে মারা হয়। এরপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই আয়াতটি তিলাওয়াত করেন—
وَمَنْ يُشْرِكْ بِاللَّهِ فَكَأَنَّمَا خَرَّ مِنَ السَّمَاءِ فَتَخْطَفُهُ الطَّيْرُ أَوْ تَهْوِي بِهِ الرِّيحُ فِي مَكَانٍ سَحِيقٍ
এবং যে কেউ আল্লাহর সাথে শরিক করল, সে যেন আকাশ থেকে ছিটকে পড়ল, অতঃপর মৃতভোজী পাখি তাকে ছোঁ মেরে নিয়ে গেল, অথবা বাতাস তাকে উড়িয়ে নিয়ে কোনো দূরবর্তী স্থানে নিক্ষেপ করল। [সূরা হজ, আয়াত: ৩১]
তাকে জমিনে ফিরিয়ে দেওয়া হবে এবং প্রাণটাকে তার শরীরে প্রবেশ করানো হবে। এরপর শক্তিশালী দুজন ফিরিশতা এসে তাকে উঠিয়ে বসাবে এবং তাকে জিজ্ঞেস করবে—তোমার রব কে? তোমার দ্বীন কী? সে বলবে—আমি জানি না। ফিরিশতা দুজন আবার জিজ্ঞেস করবে—তোমাদের মাঝে প্রেরিত (নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এই লোকটির ব্যাপারে কী বলবে? সে নবিজীর নাম জানবে না, সুতরাং বলবে—আমি জানি না। তবে লোকজনকে এমন এমন কথা বলতে শুনেছি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন—সুতরাং তাকে বলা হবে—তুই ব্যর্থ অভাব, তার কবরকে সংকুচিত করা হবে, যার কারণে তার পাঁজরের হাড়গুলো পরস্পরের মাঝে ঢুকে পড়বে। তার বদআমলের এমন একজন মানুষের রূপ দেওয়া হবে—যার চেহারা হবে কুশ্রী, শরীর থেকে প্রচণ্ড দুর্গন্ধ বের হবে এবং তার পোশাক হবে নিকৃষ্ট। ওই লোকটি তাকে বলবে—আল্লাহর আযাব এবং তার অস্বস্তির সুসংবাদ গ্রহণ কর। তখন সে মানুষরূপী আমলকে বলবে, কে তুমি—যে নিকৃষ্ট বিষয় নিয়ে এসেছ? তখন মানুষরূপী আমল বলবে, আমি তোর বদআমল। আল্লাহর কসম, আমি তোকে আল্লাহর আনুগত্যে পেয়েছি মন্থর আর তার অবাধ্যতায় পেয়েছি অগ্রগামী।
অপর হাদিসে বারা ইবনু আবিব্নু রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণনা করেছেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন—
فَيُقَيَّضُ لَهُ مَلَكٌ أَصَمُّ أَبْكَمُ مَعَهُ مِرْزَبَّةٌ لَوْ ضُرِبَ بِهَا جَبَلٌ صَارَ تُرَابًا - أَو قَالَ: رَمِيْمًا - فَيَضْرِبُهُ بِهَا ضَرْبَةً يَسْمَعُهَا الثَّقَلَانِ إِلَّا الْإِنْسَ وَالْجِنَّ فَيُعَادُ فِيْهِ الرُّوْحُ فَيُضْرَبُهُ ضَرْبَةً أُخْرَى.
তার ওপর নিযুক্ত করা হবে বধির ও মূক এমন একজন ফিরিশতাকে—যার হাতে থাকবে লোহার গদা। যদি তা দ্বারা পাহাড়ে আঘাত করা যায়, তাহলে তা মাটিতে পরিণত হবে। সে গুর্ব দ্বারা তাকে এমনভাবে আঘাত করা হবে, যার শব্দ মানুষ ও জিন ছাড়া পৃথিবীর সবকিছুই শুনতে পারবে। আবার তাকে প্রাণ ফিরিয়ে দেওয়া হবে। তারপর আবার আঘাত করা হবে। (এভাবে চলতে থাকবে কিয়ামত পর্যন্ত)।
টিকাঃ
[৫০] মুসনাদু আবি দাউদ তায়ালিসি, খণ্ড: ২, পৃষ্ঠা: ৩২৮, হাদিস: ৭৯২。
📄 মুমিনের আমল অনুপাতে কবরে প্রশস্ততা হবে
বুখারী ও মুসলিম গ্রন্থে বর্ণিত আছে—
أَنَّهُ يُفْسَحُ لَهُ فِي قَبْرِهِ سَبْعُونَ ذِرَاعًا
কবরকে সত্তর গজ প্রশস্ত করা হবে。
সুনানুত তিরমিজিতে বর্ণিত আছে—
يُفْسَحُ لَهُ فِي قَبْرِهِ سَبْعُونَ ذِرَاعًا فِي سَبْعِينَ
তার জন্য কবরকে সত্তর বর্গগজ প্রশস্ত করা হবে。
বারা ইবনু আবিব্নু রাদিয়াল্লাহু আনহু এর হাদিসে বর্ণিত আছে—
مُدُّ الْبَصَرِ
দৃষ্টিসীমা পর্যন্ত প্রশস্ত হবে。
আলি ইবনু মাবাদ মুআজ্জাহ বলেন, আমি আয়িশা সিদ্দিকা রাদিয়াল্লাহু আনহাকে বললাম, আপনি কি আমাদের কবর সম্পর্কে অবহিত করাবেন না যে, সেখানে আমরা কেমন পরিস্থিতির শিকার হব এবং আমাদের সাথে কী আচরণ করা হবে? আয়িশা সিদ্দিকা রাদিয়াল্লাহু আনহা বললেন—মুমিন হলে তার কবরকে সত্তর গজ প্রশস্ত করা হবে।
আমি বলব—এটা হবে কবরকে সংকোচন এবং জিজ্ঞাসাবাদ করার পর। আর কাফিরের কবর সর্বদা সংকুচিত থাকবে।
আমরা আল্লাহর কাছে ইহ ও পরকালীন ক্ষমা এবং শান্তি প্রার্থনা করছি।
টিকাঃ
[৫১] সহিহ মুসলিম, খণ্ড: ১৪, পৃষ্ঠা: ৩১, হাদিস: ৫১১৮。
[৫২] সুনানুত তিরমিজি, খণ্ড: ৪, পৃষ্ঠা: ২০৭, হাদিস: ২৪৯৯。
[৫৩] মুসনাদু তায়ালিসি, খণ্ড: ২, পৃষ্ঠা: ৩২৮, হাদিস: ৭৯২。
📄 কবরের আজাব সত্য ও কাফিরের আজাবের বিভিন্নতা
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন—
وَمَنْ أَعْرَضَ عَنْ ذِكْرِي فَإِنَّ لَهُ مَعِيشَةً ضَنْكًا
এবং যে আমার স্মরণ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে, তার জীবিকা সংকীর্ণ হবে। [সূরা তোহা, আয়াত: ১২৪]
আবু সাইদ খুদরি এবং আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেছেন—
আয়াতে উল্লেখিত ‘ضَنْكًا’ শব্দ দ্বারা কবরের আযাব উদ্দেশ্য।
কুরআন কারিমে আরও বলা হয়েছে—
গুনাহগারদের জন্য এ আযাব আরও আযাব রয়েছে। [সূরা যুর, আয়াত: ২৭]
সেটা হলো কবরের আযাব। কারণ, আল্লাহ তাআলা এ কথাটি বলেছেন নিয়োগ করার পর-ই:
তাদেরকে ছেড়ে দিন সেদিন পর্যন্ত, যেদিন তাদের ওপর বজ্রাঘাত পতিত হবে। [সূরা যুর, আয়াত: ৪৮]
এই দিনটি পার্থিব দিনগুলোর শেষদিন। যা প্রমাণ করে যে, তারা যেই আযাবে আক্রান্ত হবে সেটি হলো কবরের আযাব। এজন্যই তো আল্লাহ তাআলা বলেছেন:
কিন্তু তাদের অধিকারসমূহ বিষয়টি জানে না। [সূরা যুর, আয়াত: ৪৭]
কেননা, কবরের আযাবটি গায়েব-অদৃশ্য। তাইতো আল্লাহ তাআলা আরও ইরশাদ করেছেন—
আর কঠিন শাস্তি ফিরাউনদের লোকজনকে চতুর্দিক থেকে ঘিরে ফেলল। কবরে সকাল-সন্ধ্যায় তাদেরকে জাহান্নামের আগুনের সামনে উপস্থিত করা হয়। আর যেদিন কিয়ামত সংঘটিত হবে—সেদিন (ফিরিশতাদেরকে) বলা হবে ফিরাউনদের জনগোষ্ঠীকে কঠিন আযাবে প্রবিষ্ট করো। [সূরা গাফির, আয়াত: ৪৫-৪৬]
এ আয়াতে উল্লেখিত আযাব বলতে জাহান্নামের আযাব নয়, বরং কবরের আযাব উদ্দেশ্য—যা বরযখের জগতে হবে। জাহান্নামের আযাব হবে হিসাব-কিতাবের পর।
আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেছেন—
كَلاَّ سَوْفَ تَعْلَمُونَ
অচিরেই জানতে পারবে। [সূরা তাকাছুর, আয়াত: ৩]
এই আয়াতে মানুষের ওপর অবতীর্ণ কবরের আযাবের কথা বলা হয়েছে।
তারপরের আয়াত—
ثُمَّ كَلَّا سَوْفَ تَعْلَمُونَ
তারপরও আবার শীঘ্রই জানতে পারবে। [সূরা তাকাছুর, আয়াত: ৪]
এই আয়াতে পরকালে হিসাব-কিতাবের পর জাহান্নামের আযাবের কথা বলা হয়েছে। এবং এই কথার পুনরাবৃত্তি করা হয়েছে দুই অবস্থার জন্য。
ইবনু ইবনু আবি খালিদ থেকে বর্ণনা করেছেন—আমরা কবরের আযাব সম্পর্কে সন্দেহ করেছিলাম, তখন সূরা তাকাছুরের এই আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়েছে—
أَلْهَاكُمُ التَّكَاثُرُ ﴿١﴾ حَتَّى زُرْتُمُ الْمَقَابِرَ ﴿٢﴾ كَلاَّ سَوْفَ تَعْلَمُونَ ﴿٣﴾ ثُمَّ كَلَّا سَوْفَ تَعْلَمُونَ ﴿٤﴾
প্রাচুর্যের প্রতিযোগিতা তোমাদেরকে মোহগ্রস্থ রেখেছে, যতক্ষণ না তোমরা কবরে উপনীত হও। কখনো না (এটা ঠিক নয়), তোমরা দ্রুতই (তা) জানতে পারবে। তারপর কখনো না (তারপরও বলি এটা ঠিক নয়)। আর তা), তোমরা খুব দ্রুতই জানতে পারবে। [সূরা তাকাছুর, আয়াত: ১-৫]
অর্থাৎ অতি শিগগির তোমরা কবরের আযাব জানতে পারবে।
আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন—কাফিরদের জন্য তাদের কবরকে সংকুচিত করা হবে, যার কারণে তার উভয় পাঁজরের হাড়গুলো পরস্পরের মাঝে ঢুকে যাবে। এটাই হলো সংকুচিত জীবন (مَعِيْشَةً ضَنْكًا)।