📘 মৃত্যুর ওপারে অনন্তের পথে > 📄 লাহাদ কবর

📄 লাহাদ কবর


সুরত কবর দুই ধরনের হয়ে থাকে। লাহাদ ও শাক্বা। লাহাদ কবর হলো—শঙ্কু জমি হল কবর গভীরভাবে খনন করার পর কবরের পশ্চিম পার্শ্বে গর্ত করে সেখানে লাশ রাখা হয়; এটা সরাসরি নিচের দিকে খনন করার চেয়ে উত্তম। কেননা, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লাহাদ কবরকেই পছন্দ করেছেন。
আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন— اللَّحْدُ لَنَا وَالشَّقُّ لِغَيْرِنَا.

টিকাঃ
[৭১] সুনানু আবু দাউদ, খণ্ড : ০২, পৃষ্ঠা : ৩০৫, হাদিস : ৩২০৪。
[৭২] কবর খনন ও লাশ দাফন-কাফনের সুন্নাত তরিক্কা বিজ্ঞ কোনো আলেমের কাছ হতে সরাসরি দেখে শেখা দরকার।—অনুবাদক

📘 মৃত্যুর ওপারে অনন্তের পথে > 📄 দাফন ও দুআর পর কবরের পাশে কিছুক্ষণ অবস্থান করা

📄 দাফন ও দুআর পর কবরের পাশে কিছুক্ষণ অবস্থান করা


লাহাদ কবর আমাদের জন্য, আর শাক্ব (সোজা খননকৃত) কবর অন্যদের জন্য।
ইমাম আবু হুরায়রা রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন—মৃত ব্যক্তিকে কবরে রাখার সময় নিচের দুআ পাঠ করাকে মুস্তাহাব মনে করতেন— اللَّهُمَّ أَعِذْهُ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيمِ হে আল্লাহ, তাকে বিতাড়িত শয়তান থেকে মুক্তি দাও!
ইবনু শিমাষা আল-মিশরি রাহিমাহুল্লাহ বলেন—আমরা এমন সময় ইবনুল আসের কাছে উপস্থিত হলাম, যখন তিনি মৃত্যুর প্রহর গুনছিলেন। এই হাদিসের একপর্যায়ে বলা হয়েছে—(ইমাম ইবনুল আস বলেছেন) যখন তোমরা আমাকে দাফন করবে, তখন আমার ওপর আস্তে আস্তে মাটি ফেলবে; এবং আমার কবরের পার্শ্বে এতটুকু সময় দাঁড়িয়ে থাকবে—যতটুকু সময়ের মাঝে উট জবাই করে তার মাংস বণ্টন করা যায়, যেন আমি তোমাদের সৎকর্মপুতঃ অনুভূতি হয়ে দেখতে পাই যে—আমার রবের দূতদেরকে কী দিয়ে ফেরত পাঠালাম!
ইমাম আহুরি রাহিমাহুল্লাহ কিতাবুন-নাসিহা বলেছেন, মৃতকে দাফন ও তার জন্য দুআ করার পর কবরের দিকে মুখ করে মাইয়েতের অবিচলতার জন্য অবস্থান করা মুস্তাহাব। তার জন্য এভাবে দুআ করবে: اللَّهُمَّ هَذَا عَبْدُكَ وَأَنْتَ أَعْلَمُ بِهِ مِنَّا وَلَا نَعْلَمُ مِنْهُ إِلَّا خَيْرًا وَقَدْ أَجْلَسْتَهُ لِسُؤَالِهِ اللَّهُمَّ فَتَبِّتْهُ بِالْقَوْلِ الثَّابِتِ فِي الْآخِرَةِ كَمَا ثَبَّتَهُ بِالْقَوْلِ الثَّابِتِ فِي الْحَيَياةِ الدُّنْيَا اللَّهُمَّ ارْحَمْهُ وَلَا تُعَذِّبْهُ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَلَا تَحْرِمْنَا أَجْرَهُ. হে আল্লাহ, এটা তোমার বান্দা। তুমি তার ব্যাপারে আমাদের চেয়ে অধিক জানো। আমরা কেবল তার ভালোর দিকেই দেখেছি। তুমি তাকে জিন্নাতবাদের জন্য বসিয়েছ। হে আল্লাহ, তাকে পরকালে দৃঢ় কালিমাশর (ঈমানদার) মাধ্যমে অবিচল রাখো, যেভাবে তাকে ইহকালে দৃঢ় কালিমাশর (ঈমানদার) মাধ্যমে অবিচল রেখেছিলে। হে আল্লাহ, তার প্রতি রহম করো এবং তাকে তার নবি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে মিলিত করো। তার অবর্তমানে আমাদেরকে গোমরাহ করো না এবং তার প্রতিদান থেকে আমাদেরকে বঞ্চিত করো না।
কাবর ও ইহকালের পর রূহজানের কর্তব্য হলো, তার জন্য সবর করা, উদ্বেগবস্থায় কান্নাকাটি না করা এবং তার মাগফিরাতের জন্য দুআ করা। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন—'যারা গাল চাপড়ায়, কাপড় ছিঁড়ে এবং জাহালতের যুগের মতো চিৎকার করে তারা আমার উম্মাহর অন্তর্ভুক্ত নয়।'
আবু বুরদাহ ইবনু আবূ মূসা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন—আবূ মূসা আশআরি রাদিয়াল্লাহু আনহু কঠিন রোগে আক্রান্ত হলেন, এমনকি এ কারণে অজ্ঞান হয়ে গেলেন। তখন তার মাথা তার পরিবারের কোনো এক নারীর কোলে রাখা ছিল। ইতিমধ্যে তার পরিবারের অন্য একজন মহিলা চিৎকার করতে লাগল। তাকে তিনি কোনো কথার উত্তর দিতে পারছিলেন না। জ্ঞান ফিরে আসার পর আবু মূসা আশআরি রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন—সেসব বিষয় থেকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুক্ত, তা থেকে আমিও মুক্ত। আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেসব নারীর সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করেছেন—যারা চিৎকার করে কাঁদে, মাথা মুণ্ডায় এবং কাপড় ছিঁড়ে ফেলে。
আবদুর রহমান ইবনু ইয়াযিদ এবং আবূ বুরদাহ ইবনু আবু মূসা বলেছেন—আবূ মূসা অজ্ঞান হলেন। তখন জনৈক মহিলা চিৎকার করে কাঁদতে লাগল। দুজন বসবাসকারী বললেন—তারপর আবু মূসা জ্ঞান ফিরে পেয়ে বললেন—তুমি কি জানো না যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন—
'আমি ওই ব্যক্তি থেকে মুক্ত—যে মৃতার কারণে মাথা মুণ্ডিয়ে ফেলে, চিৎকার করে কাঁদে এবং (কাপড় বা শরীর) ফাটায়।'

টিকাঃ
[৭৩] সুনানু আবু দাউদ, খণ্ড : ২, পৃষ্ঠা : ৩, হাদিস : ২৭১৬। সুনানু ইবনু মাজাহ, খণ্ড : ৩, পৃষ্ঠা : ২০, হাদিস : ১৫৫৪, মুসতাদরাক হাকিম, খণ্ড : ৪, পৃষ্ঠা : ৬২০, হাদিস : ১০৮৮, ইমাম তিরমিযি রাহিমাহুল্লাহ হাদিসটিকে হাসান গরিব বলেছেন。
[৭৪] সহীহ মুসলিম, খণ্ড : ১, পৃষ্ঠা : ৩০৪, হাদিস : ১৭১。
[৪৫২] সহীহুল বুখারী, খণ্ড: ৩, পৃষ্ঠা: ৪১, হাদিস: ১২১২。
[৪৫৩] সহীহুল বুখারী, হাদিস: ১২৯৬; সহীহ মুসলিম, হাদিস: ১০৪。
[৪৫৪] সহীহ মুসলিম, খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ২৭১, হাদিস: ১২৩。

📘 মৃত্যুর ওপারে অনন্তের পথে > 📄 কবরে প্রশ্ন এবং আজাব থেকে আশ্রয় চাওয়া

📄 কবরে প্রশ্ন এবং আজাব থেকে আশ্রয় চাওয়া


আনাস ইবনু মালিক রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন—
إِنَّ الْعَبْدَ إِذَا وُضِعَ فِي قَبْرِهِ وَتَوَلَّى عَنْهُ أَصْحَابُهُ وَإِنَّهُ لَيَسْمَعُ قَرْعَ نِعَالِهِمْ أَتَاهُ مَلَكَانِ فَيُقْعِدَانِهِ فَيَقُولَانِ مَا كُنْتَ تَقُولُ فِي هَذَا الرَّجُلِ لِمُحَمَّدٍ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَأَمَّا الْمُؤْمِنُ فَيَقُولُ أَشْهَدُ أَنَّهُ عْبُدُ اللَّهِ وَرَسُولُهُ فَيُقَالُ لَهُ انْظُرْ إِلَى مَقْعَدِكَ مِنَ النَّارِ قَدْ أَبْدَلَكَ اللَّهُ بِهِ مَقْعَدًا مِنَ الْجَنَّةِ فَيَرَاهُمَا جَمِيعًا قَالَ قَتَادَةُ وَذُكِرَ لَنَا أَنَّهُ يُفْسَحُ لَهُ فِي قَبْرِهِ أَمَّا الْكَافِرُ أَوْ الْمُنَافِقُ فَيَقُولُ لَا أَدْرِي كُنْتُ أَقُولُ مَا يَقُولُ النَّاسُ فَيُقَالُ لَا دَرَيْتَ وَلَا تَلَيْتَ ثُمَّ يُضْرَبُ بِمِطْرَقَةٍ مِنْ حَدِيدٍ ضَرْبَةً بَيْنَ أُذُنَيْهِ فَيَصِيحُ صَيْحَةً يَسْمَعُهَا مَنْ يَلِيهِ إِلَّا الثَّقَلَيْنِ.
বান্দাকে কবরে রাখার পর যখন তার সঙ্গীরা ফিরে যেতে থাকে, তখনো সে সঙ্গীদের জুতার শব্দ শুনতে পায়, ইতিমধ্যে দুজন ফিরিশতা এসে তাকে বসায়। তারপর সেই দুই ফিরিশতা বান্দাকে বলেন—মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নামের এই লোকটির ব্যাপারে তোমার মন্তব্য কী? বান্দা মুমিন হলে জবাব দেয়—আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, তিনি আল্লাহর বান্দা এবং তাঁর রাসূল। এরপর তাকে বলা হয়—তুমি তোমার জাহান্নামের ঠিকানাটা দেখো! তবে আল্লাহ তোমার সেই ঠিকানাকে জান্নাত দ্বারা পালটে দিয়েছেন। তখন সে জান্নাত ও জাহান্নাম উভয়টিই দেখতে পায়। কাতাদা রাদিয়াল্লাহু বলেন, আমাদের সামনে আলোচনা করা হয়েছে যে, তার জন্য কবরকে প্রশস্ত করে দেওয়া হয়। আর কাফির ও মুনাফিক্ব বললে, জানি না; লোকজন যা বলত আমি তা বলতাম কি না! সুতরাং তাকে বলা হয়—তুমি জানো না, তুমি পড়োওনি। তারপর লোহার খুন্তি দ্বারা তার দুই কানের মাঝে আঘাত করা হবে। যার কারণে সে এত বিকট শব্দে চিৎকার করবে যে, মানুষ ও জিন ছাড়া সবাই তা শুনতে পারবে。

টিকাঃ
[৪৫৫] সহীহুল বুখারী, খণ্ড: ৩, পৃষ্ঠা: ৪১, হাদিস: ১২১২。
[৪৫৬] সহীহুল বুখারী, খণ্ড: ৩, পৃষ্ঠা: ১১০, হাদিস: ১২২২。

📘 মৃত্যুর ওপারে অনন্তের পথে > 📄 মাইয়্যেতের রুহ কবজ এবং তার কবরের অবস্থা

📄 মাইয়্যেতের রুহ কবজ এবং তার কবরের অবস্থা


বারা ইবনু আজিব রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন—আমরা জনৈক আনসারায় জানাযায় অংশগ্রহণের উদ্দেশ্যে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে যাত্রা করলাম। একপর্যায়ে আমরা কবরের কাছে পৌঁছালাম। কবরটি লাহাদ্ কবর ছিল না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বসলেন, আমরাও তাঁর পাশে বসলাম। চারদিকে ছিল নীরবতা, যেন আমাদের মাথার ওপর পাখি বসে আছে। আমার ইবনু সাবিঙ এবং আবূ আওয়ানার বর্ণিত শব্দের মাঝে সামান্য বেশকম আছে, তবে অর্থ ও মর্ম একই। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কখনো চোখ উঁচু করে আকাশের দিকে দেখছিলেন, আবার কখনো চোখ নিচু করে জমিনের দিকে দেখছিলেন। তারপর বললেন—
'আমি কবরের আযাব থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করছি এই কথাটি তিনি কয়েকবার বললেন। তারপর বললেন—মুমিন বান্দা যখন পৃথিবীর সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে পরকালের দিকে যাত্রা করতে শুরু করবে, তখন একজন ফিরিশতা এসে তার শিরে বসে বলবে—হে পবিত্র আত্মা, আল্লাহর ক্ষমা এবং তাঁর সন্তুষ্টির প্রতি যাত্রা করো। সুতরাং তার প্রাণ দেহ থেকে এমনভাবে বের হবে, যেন বৃষ্টির পানি প্রবাহিত হয়। জান্নাত থেকে শুভ্র অবয়ব-বিশিষ্ট ফিরিশতামণ্ডলী অবতরণ করবে, যাদের চোহারাগুলো হবে সূর্যের মতো জ্যোতির্ময়। তাদের কাছে থাকবে জান্নাতি কাফন ও মেহেদি। তারা সে ব্যক্তির সম্মুখে বসবে। ফিরিশতা যখন তার প্রাণ কবজ করবে, এক মুহূর্তের জন্যও তাকে তার হাতে ছাড়বে না। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন—
تَوَفَّتْهُ رُسُلُنَا وَهُمْ لَا يُفَرِّطُونَ
তাকে আমাদের দূতগণ (ফিরিশতামণ্ডলী) মৃত্যু দিয়েছে, তবে তারা বাড়াবাড়ি করেনি। [সূরা আনআম, আয়াত: ৬১]
সুতরাং তার প্রাণটি সুঘ্রাণের ন্যায় বের হবে যা অনুভব করা যাবে। এরপর তাকে নিয়ে ফিরিশতারা ওপরের দিকে উঠতে থাকবে। আকাশ ও জমিনের প্রতিটি বাহিনী—যাদের কাছ দিয়েও (এই রূহ বহনকারী ফিরিশতারা) অতিক্রম করবে, তারা বলবে—এই রূহ প্রাণটি কার? তার সুন্দর নাম নিয়ে বলা হবে—অমুক। এভাবে তারা দুনিয়ার আকাশের দরজার কাছে যখন পৌঁছবে, সুতরাং তার জন্য দরজা খুলে দেওয়া হবে। এভাবে প্রতিটি আকাশের 'নৈকট্যপ্রাপ্ত ফিরিশতারা' তাকে সম্ভাষণ জানাবে। একপর্যায়ে সপ্তম আকাশে পৌঁছে যাবে। তখন বলা হবে—তার আমলনামাকে ইল্লিয়িনে লিখে দাও! আল্লাহ তাআলা কুরআন কারিমে ইরশাদ করেছেন—
أَمَدْرَاكَ مَا عِلِيُّونَ كَلَّا إِنَّ كِتَبَ الْفُجَّارِ لَفِي سِجِّينٍ ۝ وَمَا أَدْرَاكَ مَا سِجِّينٌ ۝ كَلَّا إِنَّ كِتَبَ الْأَبْرَارِ لَفِي عِلِّيِّينَ
আপনি জানেন 'ইল্লিয়িন' কী? এটা লিপিবদ্ধ খাতা, আল্লাহর নৈকট্যপ্রাপ্ত ফিরিশতাগণ একে প্রত্যক্ষ করে। [সূরা মুতাফ্ফিফীন, আয়াত: ১৮-২১]
তার আমলনামাকে ইল্লিয়িনে লিখে দেওয়া হবে। তারপর বলা হবে—তাকে জমিনে ফিরিয়ে নিয়ে যাও। কারণ, আমি তাকে সাথে প্রতিজ্ঞা করেছি—তাদেরকে মাটি থেকে সৃষ্টি করেছি, মাটিতে ফিরিয়ে দেবো এবং তাদেরকে আবার মাটি থেকেই পুনরুত্থিত করব। বর্ণনাকারী বলেন, সুতরাং তাকে জমিনে ফিরিয়ে দেওয়া হবে এবং তার রূহকে তার শরীরে ফিরিয়ে দেওয়া হবে। এরপর পাথর দুজন ফিরিশতা তার কাছে আসবে, অতঃপর তাকে বাকি দিয়ে উঠিয়ে বসাবেন তারপর জিজ্ঞেস করবে—তোমার রব কে? তোমার দ্বীন-ধর্ম কী? এবং তোমার নবি কে? সে জবাব দেবে—আমার রব আল্লাহ এবং আমার দ্বীন ইসলাম। তখন ফিরিশতা দুজন জিজ্ঞেস করবে—তোমাদের মাঝে প্রেরিত এই মানুষটির ব্যাপারে কী বলবে? সে বলবে—তিনি আল্লাহর রাসূল। তখন ফিরিশতারা জিজ্ঞেস করবে—তুমি কীভাবে জানলে? সে বলবে, তিনি আমাদের রবের পক্ষ থেকে আমাদের কাছে প্রমাণসহ আগমন করেছিলেন। সুতরাং আমরা তার প্রতি ঈমান এনেছি এবং তাকে সত্যয়ান করেছি। বিষয়টি আল্লাহ তাআলা এভাবে বলেছেন—
يُثَبِّتُ اللهُ الَّذِينَ ءَامَنُواْ بِالْقَوْلِ الثَّابِتِ فِي الْحَيَوةِ الدُّنْيَا وَفِي الْآخِرَةِ
আল্লাহ তাআলা মুমিনদেরকে ইহকালে ও পরকালে দৃঢ় কথার (কালিমার) মাধ্যমে অবিচল রাখবেন। [সূরা ইবরাহিম, আয়াত: ২৭]
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন—আকাশ থেকে জনৈক ঘোষক ঘোষণা দেবেন—আমার বান্দা সত্য বলেছে, সুতরাং তাকে জান্নাতের পোশাক পরিয়ে দাও, তার জন্য জান্নাতের বিছানা বিছিয়ে দাও এবং তাকে জান্নাতের ঠিকানা দেখিয়ে দাও! তার জন্য দূরীয়সীমা পর্যন্ত কবরকে প্রশস্ত করে দেওয়া হবে। তার আমলকে সুন্দর অবয়ববিশিষ্ট, সুঘ্রাণযুক্ত এবং সুন্দর কাপড় পরিহিত মানুষের রূপে উপস্থাপন করা হবে। সে বলবে—তুমি সুসংবাদ গ্রহণ করো। সে বিষয়গুলো—যা আল্লাহ তাআলা তোমার জন্য প্রস্তুত করেছেন, আল্লাহর সন্তুষ্টির সুসংবাদ গ্রহণ করো এবং বাগিচাসমূহের সুসংবাদ গ্রহণ করো—যা নিয়ামতে পরিপূর্ণ! সে জিজ্ঞেস করবে, আল্লাহ কল্যাণের সুসংবাদ দিয়েছেনা তুমি কে? তোমার চেহারা তো এমন যা, কল্যাণই নিয়ে এসেছে। তখন মানুষরূপী আমল বলবে—এটা তোমার সাথে প্রতিশ্রুতি দিন এবং তোমার সাথে প্রতিশ্রুত বিষয়। আমি তোমার নেক আমল। আল্লাহ তাআলার কসম! আমি তোমাকে পেয়েছি আল্লাহর রেযামন্দি এবং আল্লাহর আযাবাধার প্রতি পেয়েছি মহৎ। অতএব, আল্লাহ তোমাকে উত্তম প্রতিদান প্রদান করুন। তখন বান্দা বলবে—হে আমার রব! কিয়ামত সংঘটিত করো, যেন আমি নিজের পরিবার ও সম্পদের কাছে ফিরে যেতে পারি।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন—যদি মৃত ব্যক্তি পাপাচারী হয় এবং সে ইহকালকে বিদায় জানিয়ে পরকালের যাত্রার জন্য অপেক্ষায় থাকে, তখন জনৈক ফিরিশতা এসে তার শিরে বসে বলবে, হে নোংরা আত্মা! বের হ। সুসংবাদ গ্রহণ কর আল্লাহর অসন্তুষ্টি এবং ক্রোধের! অতঃপর আগুনের চট নিয়ে রুক্ষ চেহার- বিশিষ্ট এসকল ফিরিশতা অবতরণ করবে। ফিরিশতারা তাকে মৃত্যুকাল অবকাশ না দিয়ে তার প্রাণ সংহার করার জন্য প্রস্তুত হবে। তখন তার প্রাণটি গোটা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। যার কারণে ফিরিশতা তাকে জোরপূর্বক সংহার করেন। ফলে তার শরীরের শিরা- উপশিরা এবং রগগুলো ছিঁড়ে যায়। যেন ভেজা চামড়ার ভেতরে লোহার শিং ঢুকিয়ে দেওয়া হয়, তারপর ফিরিশতারা সেগুলো ধরে খুব জোরে টান দেন। ফলে দুর্দশাগ্রস্ত নোংরা বাতাসের মতো বের হয়ে আসে। যার কারণে আকাশ ও জমিনের যে অঞ্চল দিয়ে অতিক্রম করে, সেখানকার অধিবাসীরা বলে—এই নোংরা প্রাণটি কার? তারা মৃত ব্যক্তির নিকৃষ্টতম নামগুলো নিয়ে বলবে—অমুকের। এভাবে যখন তারা প্রথম আকাশের কাছে পৌঁছে যায়, তার জন্য আকাশের দরজা খোলা হয় না। আল্লাহ তাআলা বলবে—তাকে জমিনে ফিরিয়ে নিয়ে যাও! আমি তাদেরকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছি যে, তোমাদেরকে মাটি থেকে সৃষ্টি করেছি, মাটিতে ফিরিয়ে দেবো এবং তাদেরকে মাটি থেকেই পুনরুত্থিত করব। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন—সুতরাং তাকে আকাশ থেকে ছুঁড়ে মারা হয়। এরপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই আয়াতটি তিলাওয়াত করেন—
وَمَنْ يُشْرِكْ بِاللَّهِ فَكَأَنَّمَا خَرَّ مِنَ السَّمَاءِ فَتَخْطَفُهُ الطَّيْرُ أَوْ تَهْوِي بِهِ الرِّيحُ فِي مَكَانٍ سَحِيقٍ
এবং যে কেউ আল্লাহর সাথে শরিক করল, সে যেন আকাশ থেকে ছিটকে পড়ল, অতঃপর মৃতভোজী পাখি তাকে ছোঁ মেরে নিয়ে গেল, অথবা বাতাস তাকে উড়িয়ে নিয়ে কোনো দূরবর্তী স্থানে নিক্ষেপ করল। [সূরা হজ, আয়াত: ৩১]
তাকে জমিনে ফিরিয়ে দেওয়া হবে এবং প্রাণটাকে তার শরীরে প্রবেশ করানো হবে। এরপর শক্তিশালী দুজন ফিরিশতা এসে তাকে উঠিয়ে বসাবে এবং তাকে জিজ্ঞেস করবে—তোমার রব কে? তোমার দ্বীন কী? সে বলবে—আমি জানি না। ফিরিশতা দুজন আবার জিজ্ঞেস করবে—তোমাদের মাঝে প্রেরিত (নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এই লোকটির ব্যাপারে কী বলবে? সে নবিজীর নাম জানবে না, সুতরাং বলবে—আমি জানি না। তবে লোকজনকে এমন এমন কথা বলতে শুনেছি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন—সুতরাং তাকে বলা হবে—তুই ব্যর্থ অভাব, তার কবরকে সংকুচিত করা হবে, যার কারণে তার পাঁজরের হাড়গুলো পরস্পরের মাঝে ঢুকে পড়বে। তার বদআমলের এমন একজন মানুষের রূপ দেওয়া হবে—যার চেহারা হবে কুশ্রী, শরীর থেকে প্রচণ্ড দুর্গন্ধ বের হবে এবং তার পোশাক হবে নিকৃষ্ট। ওই লোকটি তাকে বলবে—আল্লাহর আযাব এবং তার অস্বস্তির সুসংবাদ গ্রহণ কর। তখন সে মানুষরূপী আমলকে বলবে, কে তুমি—যে নিকৃষ্ট বিষয় নিয়ে এসেছ? তখন মানুষরূপী আমল বলবে, আমি তোর বদআমল। আল্লাহর কসম, আমি তোকে আল্লাহর আনুগত্যে পেয়েছি মন্থর আর তার অবাধ্যতায় পেয়েছি অগ্রগামী।
অপর হাদিসে বারা ইবনু আবিব্নু রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণনা করেছেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন—
فَيُقَيَّضُ لَهُ مَلَكٌ أَصَمُّ أَبْكَمُ مَعَهُ مِرْزَبَّةٌ لَوْ ضُرِبَ بِهَا جَبَلٌ صَارَ تُرَابًا - أَو قَالَ: رَمِيْمًا - فَيَضْرِبُهُ بِهَا ضَرْبَةً يَسْمَعُهَا الثَّقَلَانِ إِلَّا الْإِنْسَ وَالْجِنَّ فَيُعَادُ فِيْهِ الرُّوْحُ فَيُضْرَبُهُ ضَرْبَةً أُخْرَى.
তার ওপর নিযুক্ত করা হবে বধির ও মূক এমন একজন ফিরিশতাকে—যার হাতে থাকবে লোহার গদা। যদি তা দ্বারা পাহাড়ে আঘাত করা যায়, তাহলে তা মাটিতে পরিণত হবে। সে গুর্ব দ্বারা তাকে এমনভাবে আঘাত করা হবে, যার শব্দ মানুষ ও জিন ছাড়া পৃথিবীর সবকিছুই শুনতে পারবে। আবার তাকে প্রাণ ফিরিয়ে দেওয়া হবে। তারপর আবার আঘাত করা হবে। (এভাবে চলতে থাকবে কিয়ামত পর্যন্ত)।

টিকাঃ
[৫০] মুসনাদু আবি দাউদ তায়ালিসি, খণ্ড: ২, পৃষ্ঠা: ৩২৮, হাদিস: ৭৯২。

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00