📘 মৃত্যুর ওপারে অনন্তের পথে > 📄 মৃত্যুকালীন বিভিন্ন পরিস্থিতি

📄 মৃত্যুকালীন বিভিন্ন পরিস্থিতি


আল্লাহ্ তাআলা পবিত্র কুরআনে মৃত্যুকালীন অবস্থার সংক্ষেপ ও বিস্তারিত উভয় রকম আলোচনা করেছেন। ইরশাদ হয়েছে—
الَّذِينَ تَتَوَفَّاهُمُ الْمَلَائِكَةُ طَيِّبِينَ
ফিরিশতারা তাদের জান কবজ করেন পবিত্র থাকা অবস্থায়। [সূরা নাহল, আয়াত : ৩২]
আরও ইরশাদ হয়েছে—
قُلْ يَتَوَفَّاكُمْ مَلَكُ الْمَوْتِ الَّذِي وُكِّلَ بِكُمْ
বলুন, তোমাদের প্রাণ হরণের দায়িত্বে নিয়োজিত ফিরিশতা তোমাদের প্রাণ হরণ করবে। [সূরা সিজদাহ, আয়াত : ১১]
অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে—
تَوَفَّتْ رُسُلُنَا وَهُمْ لَا يُفَرِّطُونَ
আমার প্রেরিত ফিরিশতারা তার মৃত্যু ঘটায় এবং এতে তারা কোনো ত্রুটি করে না। [সূরা আনআম, আয়াত : ৬১]
আরও ইরশাদ হয়েছে—
الَّذِينَ تَتَوَفَّاهُمُ الْمَلَائِكَةُ ظَالِمِي أَنْفُسِهِمْ
‘ফিরিশতারা তাদের জান এমতাবস্থায় কবজ করে যে, তারা নিজেদের ওপর জুলুম করেছে।’ [সূরা নাহল, আয়াত : ২৮]
অন্য আয়াতে ইরশাদ হয়েছে—
وَلَوْ تَرَى إِذْ يَتَوَفَّى الَّذِينَ كَفَرُوا الْمَلَائِكَةُ يَضْرِبُونَ وُجُوهَهُمْ وَ أَدْبَارَهُمْ
‘আর যদি তুমি দেখো, যখন ফিরিশতারা কাফিরদের জান কবজ করে; প্রহার করে তাদের মুখে এবং তাদের পশ্চাদদেশে আর বলে, জ্বলন্ত আযাবের স্বাদ গ্রহণ করো।’ [সূরা আনফাল, আয়াত : ৫০]
জ্ঞাতব্য: মুফাসসিরিনে কিরাম বলেছেন—এই আয়াতটি বদরযুদ্ধে নিহত কাফিরদের সাথে নির্দিষ্ট। আমাদের অনেক উলামায়ে কিরামও তা-ই বলেছেন। তবে ইমাম আল-মাওদুদি রাহিমাহুল্লাহু প্রমুখ এ-বিষয়ে দ্বিমতের কথা ও উল্লেখ করেছেন এবং তারা বলেন, সবসময় মৃত্যুর খাটে অবস্থানকারী কাফিরদের চেহারা ও পিঠে ফিরিশতারা প্রহার করবেন এবং তাদেরকে লাঞ্ছিত করবেন। আল্লাহ তাআলা ভালো জানেন।
বদরের যুদ্ধের ব্যাপারে দীর্ঘ একটি হাদীস বর্ণনা করেছেন। তাতে রয়েছে—আবু জুমাইহ বলেছেন, আমাকে ইবনু আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা হাদীস বর্ণনা করেছেন—
জাঁকে মুসলিম যুদ্ধের দিন একজন মুশরিকের পিছু পিছু যাচ্ছিলেন। হঠাৎ তিনি সেই মুশরিকের ওপর চাবুকের আঘাতের আওয়াজ শুনতে পেলেন এবং সাথে শুনতে পেলেন একজন অশ্বারোহীর শব্দ—হাইযুম সামনে চলো! ইতিমধ্যে তিনি দেখতে পেলেন—মুশরিকটি তার সামনে শায়াবী হয়ে পড়ে আছে! তিনি তাকিয়ে দেখলেন— মুশরিকের নাক ফেটে গেছে, তার চেহারা ফেটে আছে; যেন তাকে চাবুক দ্বারা আঘাত করা হয়েছে, যার কারণে গোটা শরীর সবুজ হয়ে গেছে! অতঃপর সেই আনসারি সাহাবি নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দরবারে হাজির হয়ে ঘটনার বিবরণ দিলেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন—তুমি সত্যিই বলছ! এটা দ্বিতীয় আকাশ থেকে নাজিল হওয়া সাহায্য! এই দিন মুসলিমরা সত্তরজন কাফিরকে হত্যা করেছে এবং সত্তরজনকে বন্দি করেছে।”
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন—
وَ لَوْ تَرَى إِذِ الظَّالِمُونَ فِي غَمَرَاتِ الْمَوْتِ وَ الْمَلٰٓئِكَةُ بَاسِطُوْا أَيْدِيْهِمْ ؕ اَخْرِجُوْۤا أَنْفُسَكُمُ ؕ اَلْيَوْمَ تُجْزَوْنَ عَذَابَ الْهُوْنِ بِمَا كُنْتُمْ تَقُوْلُوْنَ عَلَى اللّٰهِ غَيْرَ الْحَقِّ وَ كُنْتُمْ عَنْ اٰيٰتِهٖ تَسْتَكْبِرُوْنَ ﴿۹۳﴾
যদি আপনি দেখেন যখন জালিমরা মৃত্যু-যন্ত্রনায় থাকে এবং ফিরিশতারা স্বীয় হস্ত (আযাবসহ) প্রসারিত করে বলে, বের কর স্বীয় আত্মাকে। অন্য তোমাদের অবমাননাকর শাস্তি প্রদান করা হবে। কারণ, তোমরা আল্লাহর ওপর অসত্য বলতে এবং তাঁর আয়াতসমূহের ব্যাপারে অহংকার করতে। [সূরা আনআম, আয়াত: ৯৩]
**নোট:** যদি কেউ বলে—এই আয়াতগুলোর মাঝে সমন্বয় কীভাবে হতে পারে? আর কীভাবে মালাকুল মাউত-মৃত্যুর ফিরিশতা পূর্ব ও পশ্চিম গোটা পৃথিবীর আত্মাগুলোকে একসাথে কবজ করেন?
তাকে বলা হবে—মৃত্যুর আরবি শব্দ ওফাত-থেকে তওফা শব্দের উৎপত্তি। এখান থেকেই উৎসর্গীকৃত আরবিতে ব্যবহৃত দুটি বাক্য হলো—تَوْفِيةُ الدَّيْنِ ও تَوْفِيةُ الْكَيْلِ —কাফও কাছ থেকে যখন আপনি কোনো বস্তু সম্পূর্ণরূপে বুঝে পাবেন তখন এই বাক্য দুটি বলবেন। যার অর্থ হলো—আপনি ঋণ পূর্ণ করেছেন এবং তা পূর্ণরূপে বুঝে পেয়েছেন। যার মর্ম হলো—কোনো কিছু পূর্ণতায় পৌঁছে যাওয়া। তো মৃত্যুর অর্থ হলো—মানুষের জীবনের বরাদ্দ থাকা সময় পূর্ণ হয়ে যাওয়া। যার কারণে কখনো কখনো মৃত্যুকে মালাকুল মাউতের দিকে সোপান করা হয়; কারণ, তিনিই মৃত্যু দেওয়ার এই দায়িত্বটি পালন করেন। আবার কখনো তার সহকর্মী ফিরিশতাদের প্রতিও মৃত্যু দেওয়ার এই দায়িত্বটির সোপান করা হয়; কারণ, তারাও কথনোপখনো এই দায়িত্ব পালন করে থাকেন। এমনকি কখনো আবার মৃত্যু দেওয়ার কাজটি আল্লাহ তাআলার প্রতিও সোরোপিত করা হয়। কারণ, প্রকৃতপক্ষে মৃত্যু তো তাঁরই ফয়সালা। তাই তো কুরআন কারিমে ইরশাদ হয়েছে—
اللّٰهُ يَتَوَفَّى الْاَنْفُسَ حِيْنَ مَوْتِهَا
আল্লাহ (সুব্বীহীবে) মৃত্যুর সময় তাদের প্রাণগুলোকে মৃত্যু দেন।
আরও ইরশাদ হয়েছে—
وَ هُوَ الَّذِيْ أَحْيَاكُمْ ثُمَّ يُمِيْتُكُمْ
তিনিই ওই আল্লাহ—যিনি তোমাদেরকে প্রাণ দিয়েছেন, তারপর তোমাদেরকে মৃত্যু দেন। [সূরা হুদ, আয়াত: ৬৯]
আরও ইরশাদ হয়েছে—
الَّذِيْ خَلَقَ الْمَوْتَ وَ الْحَيٰوةَ لِيَبْلُوَكُمْ
যিনি সৃষ্টি করেছেন মরণ ও জীবন, যেন তোমাদের পরীক্ষা করেন। [সূরা মুলক, আয়াত: ২]
সুতরাং প্রত্যেক ফিরিশতা যেভাকে আদিষ্ট হন সেভাবেই নিজের দায়িত্ব পালন করেন।

টিকাঃ
[৬৯] সহীহ মুসলিম, খণ্ড: ৪, পৃষ্ঠা: ২৯৪, হাদীস: ১০০৬。

📘 মৃত্যুর ওপারে অনন্তের পথে > 📄 রুহ কবজ করার সময় চোখও রুহের অনুসরণ করে

📄 রুহ কবজ করার সময় চোখও রুহের অনুসরণ করে


উম্মু সালামা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন, আবু সালামা রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর ইনতিকাল হলে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার কাছে গিয়ে দেখলেন যে, তার চোখগুলো খোলা রয়েছে। সুতরাং রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চোখ দু'টোকে মুছে বললেন—
اِنَّ الرُّوحَ إِذَا قُبِضَ تَبِعَهُ الْبَصَرُ
যখন প্রাণ হরণ করা হয় তখন তার অনুসরণ করে。
আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন—
‘তোমরা মানুষকে দেখোনি—যখন মারা যায় তখন তার চোখ খোলা থাকে? সাহাবায়ে কিরাম বলেন—জ্বী। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন—চোখ তখন তার প্রাণের অনুসরণ করে。
উপরের দুই হাদিসের একটিতে নফস এবং অপরটিতে রূহ শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। যার দ্বারা জানা গেল, রূহ ও নফস একই বস্তুর দুটি নাম।

টিকাঃ
[৭০] সহীহ মুসলিম, খণ্ড: ৪, পৃষ্ঠা: ৪৪০, হাদীস: ১৫৬৮。
[৭১] প্রাগুক্ত, খণ্ড: ৪, পৃষ্ঠা: ৪২, হাদীস: ৯৮৯。

📘 মৃত্যুর ওপারে অনন্তের পথে > 📄 কাফন সুন্দর হওয়া উচিত

📄 কাফন সুন্দর হওয়া উচিত


জাবির ইবনু আব্দুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন—
إِذَا كَفَّنَ أَحَدُكُمْ أَخَاهُ فَلْيُحْسِنْ كَفَنَهُ
তোমাদের কেউ যখন তার ভাইয়ের কাফন দেবে, সে যেন তার জন্য সুন্দর কাফনের ব্যবস্থা করে。
ইবনুল মুবারক রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন—সবচেয়ে উত্তম হলো সেই কাপড়ে কাফন দেওয়া—যেই কাপড়ে সে নামাজ আদায় করত।

টিকাঃ
[৭২] সহীহ মুসলিম, খণ্ড: ৪, পৃষ্ঠা: ৩০, হাদীস: ১৫৬৭。
[৭৩] সহীহ মুসলিম, খণ্ড: ৪, পৃষ্ঠা: ৩০, হাদীস: ১৫৬৭。

📘 মৃত্যুর ওপারে অনন্তের পথে > 📄 দ্রুত সময়ে জানাযা ও কাফন-দাফন হওয়া উচিত

📄 দ্রুত সময়ে জানাযা ও কাফন-দাফন হওয়া উচিত


আবু সাঈদ খুদরি রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন—
اِذَا وُضِعَتِ الْجَنَازَةُ وَاحْتَمَلَهَا الرِّجَالُ عَلٰى أَعْنَاقِهِمْ ؕ فَاِنْ كَانَتْ صَالِحَةً قَالَتْ قَدِّمُوْنِيْ ؕ وَاِنْ كَانَتْ غَيْرَ صَالِحَةٍ قَالَتْ يٰوَيْلَهَاۤ اَيْنَ يَذْهَبُوْنَ بِهَا يَسْمَعُ صَوْتَهَا كُلُّ شَيْءٍ إِلَّا الْإِنْسَانَ ؕ وَلَوْ سَمِعَهُ لَصُعِقَ ؕ
যখন জানাযা রাখা হয় এবং লোকজন তাকে কাঁধে তুলে নেয়, যদি মৃত ব্যক্তি হয়, তাহলে তখন সে বলে—আমাকে দ্রুত (কবরে) এগিয়ে দাও। আর বদকার হলে বলে—হায়! তারা কোথায় নিয়ে যাচ্ছে? তখন মানুষ ছাড়া সবাই তার আওয়াজ শুনতে পারে। যদি মানুষই সেই শব্দ শুনতে পায়, তাহলে জ্ঞান হারিয়ে ফেলবে。
আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন—‘তোমরা খুব দ্রুত জানাযা দাও। যদি নেককার হয়, তাহলে তো কল্যাণময় তাকে কল্যাণের দিকে দিচ্ছ। আর যদি বদকার হয়, তাহলে অনিষ্টকর! যাকে তোমরা নিজেদের কাঁধে বহন করছ。

টিকাঃ
[৭৪] সহীহ বুখারী, খণ্ড: ৫, পৃষ্ঠা: ৭৮, হাদীস: ১২৬১。
[৭৫] সহীহ বুখারী, খণ্ড: ৫, পৃষ্ঠা: ১২৬, হাদীস: ১২৫১; সহীহ মুসলিম, খণ্ড: ৪, পৃষ্ঠা: ০২, হাদীস: ১৫৬১。

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00