📘 মৃত্যুর ওপারে অনন্তের পথে > 📄 তাওবার ব্যাখ্যা ও তাওবাকারী

📄 তাওবার ব্যাখ্যা ও তাওবাকারী


নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন—
إِنَّ اللَّهَ يَقْبَلُ تَوْبَةَ الْعَبْدِ مَا لَمْ يُغَرْغِرُ
'আল্লাহ ততক্ষণ পর্যন্ত বান্দার তাওবা কবুল করেন, যতক্ষণ (মৃত্যুকালীন) গড়গড়া সৃষ্টি না হয়।'
অর্থাৎ গড়গড়া সৃষ্টি হওয়ার সময়, রূহ হলকুম পর্যন্ত পৌঁছে যাওয়া পর্যন্ত—যখন সে আল্লাহর রহমত বা তার শাস্তি অবলোকন করে, তখন তাওবা এবং ঈমান কোনো উপকারে আসবে না। কুরআন কারিমে স্পষ্ট ভাষায় বলা হয়েছে—
فَلَمَّا رَأَوْا بَأْسَنَا
যখন তারা আমার শাস্তিকে দেখবে তখন তাদের ঈমান তাদের কোনো উপকারে আসবে না। [সূরা গাফির, আয়াত : ৮৫]
আরও ইরশাদ হয়েছে—
وَلَيْسَتِ التَّوْبَةُ لِلَّذِينَ يَعْمَلُونَ السَّيِّئَاتِ حَتَّى إِذَا حَضَرَ أَحَدَهُمُ الْمَوْتُ قَالَ إِنِّي تُبْتُ الْآنَ
আর এমন লোকদের জন্য কোনো ক্ষমা নেই, যারা মন্দ কাজ করতেই থাকে। এমন কি যখন তাদের কারও সামনে মৃত্যু উপস্থিত হয়, তখন বলতে থাকে আমি এখন তাওবা করছি। [সূরা নিসা, আয়াত : ১৮]
তাওবার দরজা বান্দার জন্য ততক্ষণ পর্যন্ত উন্মুক্ত যতক্ষণ পর্যন্ত সে রুহ্ কণ্ঠনালীকে অবলম্বন না করে, আর সে সময়টি হলো—গড়গড়ায়া সৃষ্টি হওয়ার মুহূর্ত।
সুন্নাহ্ মানুষের জন্য এই মুহূর্ত অবলম্বনে করার পূর্বেই তাওবা করা আবশ্যক। আল্লাহ তাআলা সেটিই বলেছেন—
إِنَّمَا التَّوْبَةُ عَلَى اللَّهِ لِلَّذِينَ يَعْمَلُونَ السُّوءَ بِجَهَالَةٍ ثُمَّ يَتُوبُونَ مِنْ قَرِيبٍ فَأُولَئِكَ يَتُوبُ اللَّهُ عَلَيْهِمْ وَكَانَ اللَّهُ عَلِيمًا حَكِيمًا.
অবশ্যই আল্লাহ্ তাদের তাওবা কবুল করবেন—যারা ভুলবশত মন্দ কাজ করে, অতঃপর অনতিবিলম্বে তাওবা করে; এরাই হলো সেসব লোক-যাদেরকে আল্লাহ্ ক্ষমা করে দেন। আল্লাহ্ মহাজ্ঞানী, রহস্যবিদ। [সূরা নিসা, আয়াত : ১৭]
ব্যাখ্যা: আবদুল্লাহ্ ইবনু আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেছেন, অনতিবিলম্বে অর্থ হলো—অসুস্থতা এবং মৃত্যুর পূর্বেই তাওবা করা।
আবু মিজলাজ, দাহ্হাক, ইকরামা এবং ইবনু জায়েদ প্রমুখ বলেছেন—স্থিরিশক্তিদেরকে দেখা, রুহের যাত্রা করা এবং মানুষের নিজের নিয়ন্ত্রণক্ষমতা হারিয়ে ফেলার পূর্বে তাওবা কবুল হয়।
আরও বলা হয়েছে—গুনাহ্ করার পর হঠকারিতা না করে খুব দ্রুত তাওবা করে নেওয়া এবং সুস্থাবস্থায় তাওবার দিকে অগ্রণী হওয়া উত্তম কাজ।
গ্রহণযোগ্য মুমিনদের ঐকমত্যে তাওবা করা প্রতিটি মুমিনের জন্য ফরজ। কারণ, আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন—
وَتُوبُوا إِلَى اللَّهِ جَمِيعًا أَيُّهَا الْمُؤْمِنُونَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ
হে মুমিনগণ! তোমরা সবাই আল্লাহর কাছে তাওবা করো, যাতে তোমরা সফলকাম হও। [সূরা নূর, আয়াত : ৩১]
আরও ইরশাদ হয়েছে—
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا تُوبُوا إِلَى اللَّهِ تَوْبَةً نَصُوحًا
হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহ্ তাআলার কাছে তাওবা করো আন্তরিকভাবে। [সূরা তাহরিম, আয়াত : ৮]

টিকাঃ
[২৯] সুন্নাতুত তিরমিযি, খণ্ড : ১১, পৃষ্ঠা : ১৪৫, হাদিস : ৩৫৩৩৭

📘 মৃত্যুর ওপারে অনন্তের পথে > 📄 তাওবা গ্রহণযোগ্য হওয়ার চারটি শর্ত

📄 তাওবা গ্রহণযোগ্য হওয়ার চারটি শর্ত


১. আন্তরিকভাবে লজ্জিত হওয়া।
২. এখনই গুনাহ্ পরিহার করা।
৩. আবারও গুনাহ্ সংক্রান্তে আকাঙ্ক্ষা না হওয়ার জন্য দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করা।
৪. কেবল আল্লাহকে লজ্জা করে তার ভয়ে তাওবা করা, অন্য কারণও জন্য নয়।
যদি এই শর্তগুলোয় মধ্যে থেকে একটিও বিচ্যুত হয়, তাহলে তাওবা বিশুদ্ধ হবে না। তাওবার আরেকটি শর্ত হলো—গুনাহের স্বীকারোক্তি দেওয়া, অধিকাংশ ইস্তিগফার করা, যেন তাওবার মাধ্যমে কৃত চুক্তিও মজবুত হয় এবং তার মর্ম হৃদয়ের গভীরে স্থিত হয়, কেবল মৌখিক উচ্চারণের ওপর ফাত্ত্ব না থাকে। যে ব্যক্তি কেবল মুখে বলে ‘আস্তাগফিরুল্লাহ’, কিন্তু তার হৃদয় থাকে গুনাহের ওপর অবিচল, তাহলে তার এই ইস্তিগফারও আরেকটি ইস্তিগফারের মুখাপেক্ষী।
হাসান বসরি রাহিমাহুল্লাহু বলেছেন—‘আমাদের ইস্তিগফারও ইস্তিগফারের মুখাপেক্ষী।’
শাইখ আবদুুল্লাহ রাহিমাহুল্লাহু বলেন, হাসান বসরি রাহিমাহুল্লাহু তো তার যুগে কথাটি বলেছিলেন, তাহলে বর্তমান যুগের অবস্থা কেমন হবে—যখন দেখা যাচ্ছে যে, মানুষ গুনাহ ও জুলুমের ওপর অবিচলভাবে চলছেই আছে? এক টুকরো তুলার ব্যাপারেও যে দুর্নীতি করতে ছাড়ছে না, কেবল এই ধারণায় যে, সে তার গুনাহ থেকে ইস্তিগফার করবে। এটা তো প্রকৃতপক্ষে ইস্তিগফারকে উপহাস করা এবং গুনাহকে তুচ্ছ ভাবা। সে ওই লোকদের অন্তর্ভুক্ত—যারা আল্লাহ্ তাআলার আয়াতগুলোকে উপহাস করে। কুরআন কারিমে ইরশাদ হয়েছে—
لَا تَقْنَطُوا مِنْ رَّوْحِ اللَّهِ إِنَّهُ لَا يَاْسٌ مِنْ رَّوْحِ اللَّهِ
আল্লাহ্ তাআলার আয়াতগুলোকে উপহাস করে পাত্র বানিয়ো না। [সূরা বাকারা, আয়াত : ১০১]
আরও বলা হয়েছে, মানুষ যখন ঈমানী তাওবা করে—জুলুমকে প্রতিরোধ করা, প্রতিপক্ষকে আপন করে নেওয়া এবং ইবাদতে সার্বক্ষণিক হওয়া ইত্যাদি।
সালাফাকা : সালাফরা বলেছেন—প্রতিপক্ষকে সন্তুষ্ট করার পদ্ধতি হলো—তার কাছ থেকে ছিনতাইকৃত অর্থ ফিরিয়ে দেওয়া, আত্মসাৎকৃত সম্পদ ফিরিয়ে দেওয়া, বিজড়িত অন্যায় ফিরিয়ে দেওয়া, গিবত করলে ক্ষমা চাওয়া, কোনো আসবাবপত্র নষ্ট করলে তার ক্ষতিপূরণ দেওয়া, গালি দিলে ক্ষমা চাওয়া, অভিশাপপাত করলে মাফ চাওয়া। মোটকথা, যেকোনো প্রকার অসংগতিমূলক আচরণ করলে ক্ষমা চেয়ে তাকে খুশি করে আপন করে নেওয়া। সাথে সাথে অতীতে কৃত অনাচারের প্রতি লজ্জিত হবে এবং জীবনের মূল্যবান সময় এমন অবৈধ কাজে নষ্ট করার জন্য পরিতাপ করবে।
আয়েশা সিদ্দিকা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন—আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, তিনি বলেছিলেন—‘বান্দা যখন নিজের গুনাহের স্বীকৃতি দিয়ে তাওবা করে, আল্লাহ্ তার তাওবা কবুল করেন।’

টিকাঃ
[৯৯] সহিহুল বুখারী, খণ্ড : ৯, পৃষ্ঠা : ১৪৬, হাদিস : ৯৫৯৭; সহিহ মুসলিম, খণ্ড : ১০, পৃষ্ঠা : ৩৪৭, হাদিস : ৪১৪৪।

📘 মৃত্যুর ওপারে অনন্তের পথে > 📄 রুহ কবজ করার সময়ে সুসংবাদ বা দুঃসংবাদ প্রদান করা হয়

📄 রুহ কবজ করার সময়ে সুসংবাদ বা দুঃসংবাদ প্রদান করা হয়


হাম্মাদ রাহিমাহুল্লাহু বলেন, আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, ‘মুমিনের রুহ্ যখন বের হয়, তখন দুজন ফিরিশতা সাক্ষাৎ করে তাকে ওপরের দিকে নিয়ে যান।’ বুনানীরী হাম্মাদ বলেন, হাদীসে সুঘ্রাণ ও মিশকের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি বলেছেন, আকাশবাসী বলেন—পবিত্র রুহটি জমিন থেকে এসেছে। আল্লাহ্ তোমার প্রতি রহম করুন এবং সেই শরীরের ওপরও রহম করুন—যাতে তুমি জীবন কাটিয়েছ। অতঃপর তাকে তার রবের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। তারপর বলেন—তাকে জীবনের শেষ পর্যায়ে নিয়ে চলো। পক্ষান্তরে যখন কাফিরের রুহ্ বের হয়, হাম্মাদ বলেন, তার দুর্গন্ধ এবং অভিশাপাতের কথা বলা হয়েছে। আকাশবাসী বলেন—জমিন থেকে নিকৃষ্ট রুহ্ এসেছে। তিনি বলেন, তাকে বলা হয়—তাকে নিয়ে জীবনের শেষ পর্যায়ে চলো। আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার শরীর থেকে কাফনের কাপড়ের অংশ এভাবে নাকের ওপর দেন。
উবাদাহ ইবনু সামিত রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন—
وَ يُثَبِّتُ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا بِالْقَوْلِ الثَّابِتِ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَفِي الْآخِرَةِ وَيُضِلُّ اللَّهُ الظَّالِمِينَ وَيَفْعَلُ اللَّهُ مَا يَشَاءُ
যে ব্যক্তি আল্লাহর সাক্ষাতকে ভালোবাসে আল্লাহ্ তার সাক্ষাতকে ভালোবাসেন। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর সাক্ষাতকে অপছন্দ করে আল্লাহ্ তার সাক্ষাতকে অপছন্দ করেন। আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বা নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অন্য কোনো স্ত্রী বলেছেন—আমরা তো মৃত্যুকে অপছন্দ করি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন—এটার কথা বলছি না। কিন্তু মুমিন ব্যক্তির কাছে যখন মৃত্যু হাজির হয়, তখন আল্লাহ্র সন্তুষ্টি এবং তার মর্যাদার সুসংবাদ দেওয়া হয়। বান্দার কাছে আল্লাহ্র সাক্ষাতের চেয়ে উত্তম কোনো জিনিস নেই। সুতরাং যে ব্যক্তি আল্লাহর সাক্ষাতকে ভালোবাসে আল্লাহ্ তাকে ভালোবাসেন। পক্ষান্তরে কাফিরের কাছে যখন মৃত্যু হাজির হয়, তখন আল্লাহ্র আযাব এবং তার শাস্তির সুসংবাদ দেওয়া হয়। সুতরাং ওই বান্দার কাছে আল্লাহ্র সাক্ষাতের চেয়ে অপ্রিয় কোনো বস্তু নেই। যে কারণে সে আল্লাহ্র সাক্ষাতকে অপছন্দ করে এবং আল্লাহ্ তার সাক্ষাতকে অপছন্দ করেন。
আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন—
إِذَا أَرَادَ اللَّهُ بِعَبْدٍ خَيْرًا اسْتَعْمَلَهُ فَقِيلَ كَيْفَ يَسْتَعْمِلُهُ يَا رَسُولَ اللَّهِ قَالَ يُوَفِّقُهُ لِعَمَلٍ صَالِحٍ قَبْلَ الْمَوْتِ.
আল্লাহ্ যখন কোনো বান্দার কল্যাণ চান তখন তাকে কাজে লাগান। তাকে জিজ্ঞেস করা হলো—হে আল্লাহর রাসূল! কীভাবে আল্লাহ্ তাকে কাজে লাগান? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জবাবে বললেন—মৃত্যুর পূর্বে তাকে নেককাজের তাওফিক দান করেন。

টিকাঃ
[১০০] সূত্র : সহিহ মুসলিম, খণ্ড : ۱۴, পৃষ্ঠা : ৫১, হাদিস : ৪১১৯。
[১০১] সহিহুল বুখারী, খণ্ড : ১০, পৃষ্ঠা : ১৪৯, হাদিস : ৬৩৫৭, সহিহ মুসলিম, খণ্ড : ১০, পৃষ্ঠা : ১৮১, হাদিস : ৪১৪৫। নোট: যদিও এই হাদিসটির অর্থ ও মর্ম পরিষ্কার, তারপরও হযরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা এও এই হাদিসের ব্যাখ্যা জানতে চেয়েছিলেন যখন তিনি বলেন। একবার জিজ্ঞেস করা হয়েছিল আনাস ইবনু আবদুুল্লাহ্ আনহু হযরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহার কাছ থেকে এ হাদিসটি শুনেছেন তাঁর ব্যাখ্যা কী? তখন তিনি আয়িশা রাদিয়াল্লাহু আনহা হতে বলেছেন— ‘বিষয়টি কেমন নয় যেমন তুমি জুলুম ঘৃণা কর এবং কষ্ট হয়, যুদ্ধের মধ্যে পড়ে পরাজয় শব্দ হয়, চামড়া সাক্ষাতকে ভালোবাসেন। আর যে আল্লাহর সাক্ষাতকে অপছন্দ করে আল্লাহ্ তার সাক্ষাতকে অপছন্দ করেন। আর [১০১] সূত্র : সহিহ বুখারী, খণ্ড : ৭, পৃষ্ঠা : ৫২, হাদিস : ৭২৯৯। ইবনে তিমিয়্যি রাহিমাহুল্লাহু হাদিসটিকে হাসান বলেছেন。

📘 মৃত্যুর ওপারে অনন্তের পথে > 📄 মৃত্যুকালীন বিভিন্ন পরিস্থিতি

📄 মৃত্যুকালীন বিভিন্ন পরিস্থিতি


আল্লাহ্ তাআলা পবিত্র কুরআনে মৃত্যুকালীন অবস্থার সংক্ষেপ ও বিস্তারিত উভয় রকম আলোচনা করেছেন। ইরশাদ হয়েছে—
الَّذِينَ تَتَوَفَّاهُمُ الْمَلَائِكَةُ طَيِّبِينَ
ফিরিশতারা তাদের জান কবজ করেন পবিত্র থাকা অবস্থায়। [সূরা নাহল, আয়াত : ৩২]
আরও ইরশাদ হয়েছে—
قُلْ يَتَوَفَّاكُمْ مَلَكُ الْمَوْتِ الَّذِي وُكِّلَ بِكُمْ
বলুন, তোমাদের প্রাণ হরণের দায়িত্বে নিয়োজিত ফিরিশতা তোমাদের প্রাণ হরণ করবে। [সূরা সিজদাহ, আয়াত : ১১]
অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে—
تَوَفَّتْ رُسُلُنَا وَهُمْ لَا يُفَرِّطُونَ
আমার প্রেরিত ফিরিশতারা তার মৃত্যু ঘটায় এবং এতে তারা কোনো ত্রুটি করে না। [সূরা আনআম, আয়াত : ৬১]
আরও ইরশাদ হয়েছে—
الَّذِينَ تَتَوَفَّاهُمُ الْمَلَائِكَةُ ظَالِمِي أَنْفُسِهِمْ
‘ফিরিশতারা তাদের জান এমতাবস্থায় কবজ করে যে, তারা নিজেদের ওপর জুলুম করেছে।’ [সূরা নাহল, আয়াত : ২৮]
অন্য আয়াতে ইরশাদ হয়েছে—
وَلَوْ تَرَى إِذْ يَتَوَفَّى الَّذِينَ كَفَرُوا الْمَلَائِكَةُ يَضْرِبُونَ وُجُوهَهُمْ وَ أَدْبَارَهُمْ
‘আর যদি তুমি দেখো, যখন ফিরিশতারা কাফিরদের জান কবজ করে; প্রহার করে তাদের মুখে এবং তাদের পশ্চাদদেশে আর বলে, জ্বলন্ত আযাবের স্বাদ গ্রহণ করো।’ [সূরা আনফাল, আয়াত : ৫০]
জ্ঞাতব্য: মুফাসসিরিনে কিরাম বলেছেন—এই আয়াতটি বদরযুদ্ধে নিহত কাফিরদের সাথে নির্দিষ্ট। আমাদের অনেক উলামায়ে কিরামও তা-ই বলেছেন। তবে ইমাম আল-মাওদুদি রাহিমাহুল্লাহু প্রমুখ এ-বিষয়ে দ্বিমতের কথা ও উল্লেখ করেছেন এবং তারা বলেন, সবসময় মৃত্যুর খাটে অবস্থানকারী কাফিরদের চেহারা ও পিঠে ফিরিশতারা প্রহার করবেন এবং তাদেরকে লাঞ্ছিত করবেন। আল্লাহ তাআলা ভালো জানেন।
বদরের যুদ্ধের ব্যাপারে দীর্ঘ একটি হাদীস বর্ণনা করেছেন। তাতে রয়েছে—আবু জুমাইহ বলেছেন, আমাকে ইবনু আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা হাদীস বর্ণনা করেছেন—
জাঁকে মুসলিম যুদ্ধের দিন একজন মুশরিকের পিছু পিছু যাচ্ছিলেন। হঠাৎ তিনি সেই মুশরিকের ওপর চাবুকের আঘাতের আওয়াজ শুনতে পেলেন এবং সাথে শুনতে পেলেন একজন অশ্বারোহীর শব্দ—হাইযুম সামনে চলো! ইতিমধ্যে তিনি দেখতে পেলেন—মুশরিকটি তার সামনে শায়াবী হয়ে পড়ে আছে! তিনি তাকিয়ে দেখলেন— মুশরিকের নাক ফেটে গেছে, তার চেহারা ফেটে আছে; যেন তাকে চাবুক দ্বারা আঘাত করা হয়েছে, যার কারণে গোটা শরীর সবুজ হয়ে গেছে! অতঃপর সেই আনসারি সাহাবি নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দরবারে হাজির হয়ে ঘটনার বিবরণ দিলেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন—তুমি সত্যিই বলছ! এটা দ্বিতীয় আকাশ থেকে নাজিল হওয়া সাহায্য! এই দিন মুসলিমরা সত্তরজন কাফিরকে হত্যা করেছে এবং সত্তরজনকে বন্দি করেছে।”
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন—
وَ لَوْ تَرَى إِذِ الظَّالِمُونَ فِي غَمَرَاتِ الْمَوْتِ وَ الْمَلٰٓئِكَةُ بَاسِطُوْا أَيْدِيْهِمْ ؕ اَخْرِجُوْۤا أَنْفُسَكُمُ ؕ اَلْيَوْمَ تُجْزَوْنَ عَذَابَ الْهُوْنِ بِمَا كُنْتُمْ تَقُوْلُوْنَ عَلَى اللّٰهِ غَيْرَ الْحَقِّ وَ كُنْتُمْ عَنْ اٰيٰتِهٖ تَسْتَكْبِرُوْنَ ﴿۹۳﴾
যদি আপনি দেখেন যখন জালিমরা মৃত্যু-যন্ত্রনায় থাকে এবং ফিরিশতারা স্বীয় হস্ত (আযাবসহ) প্রসারিত করে বলে, বের কর স্বীয় আত্মাকে। অন্য তোমাদের অবমাননাকর শাস্তি প্রদান করা হবে। কারণ, তোমরা আল্লাহর ওপর অসত্য বলতে এবং তাঁর আয়াতসমূহের ব্যাপারে অহংকার করতে। [সূরা আনআম, আয়াত: ৯৩]
**নোট:** যদি কেউ বলে—এই আয়াতগুলোর মাঝে সমন্বয় কীভাবে হতে পারে? আর কীভাবে মালাকুল মাউত-মৃত্যুর ফিরিশতা পূর্ব ও পশ্চিম গোটা পৃথিবীর আত্মাগুলোকে একসাথে কবজ করেন?
তাকে বলা হবে—মৃত্যুর আরবি শব্দ ওফাত-থেকে তওফা শব্দের উৎপত্তি। এখান থেকেই উৎসর্গীকৃত আরবিতে ব্যবহৃত দুটি বাক্য হলো—تَوْفِيةُ الدَّيْنِ ও تَوْفِيةُ الْكَيْلِ —কাফও কাছ থেকে যখন আপনি কোনো বস্তু সম্পূর্ণরূপে বুঝে পাবেন তখন এই বাক্য দুটি বলবেন। যার অর্থ হলো—আপনি ঋণ পূর্ণ করেছেন এবং তা পূর্ণরূপে বুঝে পেয়েছেন। যার মর্ম হলো—কোনো কিছু পূর্ণতায় পৌঁছে যাওয়া। তো মৃত্যুর অর্থ হলো—মানুষের জীবনের বরাদ্দ থাকা সময় পূর্ণ হয়ে যাওয়া। যার কারণে কখনো কখনো মৃত্যুকে মালাকুল মাউতের দিকে সোপান করা হয়; কারণ, তিনিই মৃত্যু দেওয়ার এই দায়িত্বটি পালন করেন। আবার কখনো তার সহকর্মী ফিরিশতাদের প্রতিও মৃত্যু দেওয়ার এই দায়িত্বটির সোপান করা হয়; কারণ, তারাও কথনোপখনো এই দায়িত্ব পালন করে থাকেন। এমনকি কখনো আবার মৃত্যু দেওয়ার কাজটি আল্লাহ তাআলার প্রতিও সোরোপিত করা হয়। কারণ, প্রকৃতপক্ষে মৃত্যু তো তাঁরই ফয়সালা। তাই তো কুরআন কারিমে ইরশাদ হয়েছে—
اللّٰهُ يَتَوَفَّى الْاَنْفُسَ حِيْنَ مَوْتِهَا
আল্লাহ (সুব্বীহীবে) মৃত্যুর সময় তাদের প্রাণগুলোকে মৃত্যু দেন।
আরও ইরশাদ হয়েছে—
وَ هُوَ الَّذِيْ أَحْيَاكُمْ ثُمَّ يُمِيْتُكُمْ
তিনিই ওই আল্লাহ—যিনি তোমাদেরকে প্রাণ দিয়েছেন, তারপর তোমাদেরকে মৃত্যু দেন। [সূরা হুদ, আয়াত: ৬৯]
আরও ইরশাদ হয়েছে—
الَّذِيْ خَلَقَ الْمَوْتَ وَ الْحَيٰوةَ لِيَبْلُوَكُمْ
যিনি সৃষ্টি করেছেন মরণ ও জীবন, যেন তোমাদের পরীক্ষা করেন। [সূরা মুলক, আয়াত: ২]
সুতরাং প্রত্যেক ফিরিশতা যেভাকে আদিষ্ট হন সেভাবেই নিজের দায়িত্ব পালন করেন।

টিকাঃ
[৬৯] সহীহ মুসলিম, খণ্ড: ৪, পৃষ্ঠা: ২৯৪, হাদীস: ১০০৬。

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00