📄 ফলাফলের মাপকাঠি হবে শেষ আমল
আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন— إِنَّ الرَّجُلَ لَيَعْمَلُ الْعَمَلَ الْجَنَّةِ ثُمَّ لَهُ عَمَلُ أَهْلِ النَّارِ وَإِنَّ الرَّجُلَ لَيَعْمَلُ الْعَمَلَ النَّارِ ثُمَّ لَهُ عَمَلُ أَهْلِ الْجَنَّةِ.
একজন মানুষ দীর্ঘ সময় যাবৎ জান্নাতি মানুষের মতো আমল করে, তারপর তার আমলের পরিসমাপ্তি ঘটে জাহান্নামের আমলের মাধ্যমে। তদ্রূপ একজন মানুষ দীর্ঘ সময় যাবৎ জাহান্নামি মানুষের মতো আমল করে, তারপর তার আমলের পরিসমাপ্তি ঘটে জান্নাতির আমলের মাধ্যমে।'
সাহল ইবনু সাআদ সূত্র বর্ণিত আছে, তিনি নবিজ্বী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেছেন—‘নিশ্চয় কোনো বান্দা জাহান্নামির ন্যায় আমল করে, অথচ সে জান্নাতি। আবার কোনো বান্দা জান্নাতির ন্যায় আমল করে, অথচ সে জাহান্নামি। মূলত শেষ আমলের ওপরই (জান্নাত ও জাহান্নামের) ভিত্তি।'
ব্যাখ্যা: আবু মুহাম্মাদ আব্দুল হক বলেছেন—'জেনে রাখুন! মন্দ পরিণতি ওই ব্যক্তির হয় না—যে তার বাহ্যিক আমলকে সঠিক রাখে এবং অন্তরকে পরিশুদ্ধ করে। এমন কখনো শোনা যায়নি, জানাও যায়নি আলহামদুলিল্লাহ। বরং মন্দ পরিণতি (আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাই) ওই ব্যক্তিরই হয়—যার বুদ্ধিও থাকে নৈরাজ্যিক মনোভাব, গুনাহের প্রতি থাকে অবিচলতা, বড় বড় অপরাধে হয় অগ্রগামী। এমনকি এভাবে অপরাধেই তার ওপর থাকে বিজয়ী, আর এমতাবস্থায় অবস্থার পূর্বেই যখন তার ওপর মুদ্রা আবির্ভূত হয়, এই কঠোর মুহূর্তে শয়তান তাকে আক্রমণ করে এবং এই ভীতিকর পরিস্থিতিতে শয়তান তার ঈমানকে ছিনিয়ে নেয়। আল্লাহ তাআলার কাছে এমন ভয়ংকর পরিস্থিতি থেকে আশ্রয় চাচ্ছি。
অথবা সঠিক পথেই পরিচালিত হতে থাকে। তারপর তার অবস্থার পরিবর্তন ঘটে, ফের হয়ে যায় তার নীতি থেকে, গ্রহণ করে ভিন্ন পথ; যা তার মন্দ পরিণতি এবং শেষ পরিণাম অশুভ হওয়ার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। যেমন : ইবলিস। বর্ণিত আছে—সে দীর্ঘ আশি হাজার বছর যাবত আল্লাহ তাআলার ইবাদত করেছে। তদ্রূপ বালআম ইবনু বাউরা। যাকে আল্লাহ তাআলা বিশেষ নিদর্শনে দিয়েছিলেন, তার সব দুআ কবুল হতো। সে সম্প্রদায়ের লোভে মুসা আ.-এর বিপক্ষে জালিমদের জন্য দুআ করতে সম্মত হয়েছিল; কিন্তু তার মুখ দিয়ে বদুআ বের হয়নি, তার জিহ্বা বেরিয়ে এসে বুকে লটকে গেল। প্রবৃত্তির অনুসরণের কারণেই তার এমন পরিণতি হয়েছে। তেমনি বায়সিস আবিদ। যার ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা দিয়েছেন— كَمَا لَخْلَشَ الْقَلْبُ إِذْ قَالَ لِلْإِنْسَانِ اكْفُرْ সে শয়তানের অনুরূপ। কারণ, সে মানুষকে কুফরির নির্দেশ দিয়েছিলো। [সূরা হাশর, আয়াত : ১৬]
বসরাব একজন আবিদ রবি ইবনু সাবরাহ ইবনু মা’বাদ আল-জুহানি বলেছেন—আমি সিলিয়ায় কিছু মানুষকে দেখেছি। তাদের মধ্যে জনৈক ব্যক্তিকে বলা হলো—হে আল্লাহ বান্দা, বলো লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ! সে বলল—মদ পান করো! এবং আমাকে পান করাও! (কালিমা পড়তে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করল)।
আহওয়ায শহরের এক ব্যক্তিকে বলা হলো, বলো, লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ! জবাবে সে বলল—দাহ ইয়াওয়াছ দাহওয়াছ! যার ব্যাখ্যা হলো—দশ, এগারো, বারো। লোকটি ছিল অমিসসার ও হিসাব বিভাগের লোক। যার কারণে তার মন-মানসিকতায় হিসাব-নিকাসের বিষয়টিই জেঁকে বসে ছিল।
আমি (লেখক) বলি, এমন অনেক মানুষ রয়েছে—যাদের হৃদয় ও মানসিকতায় জাগতিক ব্যস্ততা, দুনিয়ার চিন্তা এবং পৃথিবীর নানা উপাস্য-উপকরণের কারণে এমনটা হয়েছে। এমনকি আমরা এমন ঘটনাও শুনেছি—জনৈক দালাল যখন মৃত্যুপথযাত্রী হলো, তাকে বলা হলো—বলো লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ! জবাবে সে বলাছিল—সাড়ে তিন এবং সাড়ে চার! দালালির তার ওপর জেঁকে বসেছিল।
আমি জনৈক হিসাবরক্ষককে দেখেছি—সে কঠিন রোগাক্রান্ত অবস্থায় আঙ্গুলের কড় গুনে গুণে হিসাব করছিল।
আরেকজনকে বলা হলো—লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ! সে বলছিল—অমুক বাড়িতে এই সংস্কারমূলক কাজ এবং অমুক বাগানগুলোতে এই পরিমাণ-এই পরিমাণ কাজের লোক নিয়োগ করো।
আল্লাহর কাছে এমন পরিস্থিতি থেকে আশ্রয় চাচ্ছি এবং তার অনুগ্রহ ও দয়ায় শাহাদাতের মৃত্যু কামনা করছি!
সালিম ইবনু আবদুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অধিকাংশ সময় কসম খেয়ে বলতেন— لَا وَمُقَلِّبِ الْقُلُوبِ ‘কলব পরিবর্তনকারীর শপথ।’
যার মর্ম হলো—আল্লাহ তাআলা বাতাসকে চেয়েও দ্রুত গতিতে কোনো আবেদন/দুআ কবুল করতে পারেন কিংবা প্রত্যাখ্যানও করতে পারেন; তদ্রূপ কোনো কিছুর ইচ্ছা কিংবা অপছন্দ ইত্যাদিও দ্রুত হতে পারে। তাই কলব পরিবর্তনকারীর শপথ করা হয়েছে।
কুরআন কারিমে ইরশাদ হয়েছে— وَاعْلَمُوا أَنَّ اللَّهَ يَحُولُ بَيْنَ الْمَرْءِ وَقَلْبِهِ জেনে রেখো, আল্লাহ মানুষ এবং তার অন্তরের মাঝে অন্তরায় হয়ে যান। [সূরা আনফাল, আয়াত : ২৪]
উপরোক্ত আয়াতের ব্যাখ্যাতে মুজাহিদ রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, অন্তরায় হওয়ার অর্থ হলো—বান্দা বুঝতে পারে না যে, সে কী করবে! অন্য আয়াতে এভাবে তার বিবরণ দেওয়া হয়েছে— إِنَّ فِي ذَلِكَ لَذِكْرَى لِمَن كَانَ لَهُ قَلْبٌ এতে উপদেশ রয়েছে তার জন্য, যার অনুধাবন করার মতো অন্তর রয়েছে। [সূরা ক্বাফ, আয়াত : ৩৭]
টিকাঃ
[২] সহীহ মুসলিম, খণ্ড: ১০, পৃষ্ঠা: ১৯০, হাদীস: ৪৭৬১。
[৩] সহীহ বুখারী, খণ্ড: ২, পৃষ্ঠা: ২৫৪, হাদীস: ৭১১৬。
[২৪] সহীহুল বুখারী, খণ্ড : ২০, পৃষ্ঠা : ২৯০, হাদিস : ৬১২২
📄 মৃত্যুর পূর্বে মৃত্যুদূতের আগমন
ইমাম তাবারী রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন—আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, যিনি বান্দার কলবগুলোর মালিকা। তিনি বান্দা এবং তার ইচ্ছার মাঝে অন্তরায় হন, সুতরাং বান্দা আল্লাহর ইচ্ছার বাইরে কোনো ইচ্ছাই করতে পারে না।
মৃত্যুভয় পূর্বে মৃত্যুভয়ের আগমন
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন— أَوَلَمْ نُعَمِّرْكُم مَّا يَتَذَكَّرُ فِيهِ مَن تَذَكَّرَ وَجَاءَكُمُ النَّذِيرُ আমি কি তোমাদেরকে এতটা বয়স দিইনি, যাতে চিন্তা করার বিষয়ে চিন্তা করতে পারো? উপরন্তু তোমাদের কাছে সতর্ককারীও আগমন করেছিল। [সূরা ফাতির, আয়াত : ৩৭]
আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন—'আল্লাহ তাআলা একজন বান্দার প্রতি অনুগ্রহ করে তার মৃত্যুকে বিলম্বিত করেছেন এবং তিনি ষাট বছরে উপনীত হয়েছেন।'
আদম সন্তানের প্রতি আল্লাহ তাআলার সবচেয়ে বড় অনুগ্রহ হলো—তিনি তাদের প্রতি রাসূলগণকে প্রেরণ করেছেন এবং তাদের কাছে নিজেদের প্রমাণকে পূর্ণ করেছেন।
কুরআন কারিমে ইরশাদ হয়েছে— وَمَا كُنَّا مُعَذِّبِينَ حَتَّى نَبْعَثَ رَسُولًا আমি রাসূল প্রেরণের পূর্বপর্যন্ত কাউকে আযাব দিই না। [সূরা বনি ইসরাঈল, আয়াত : ১৫]
আরও ইরশাদ হয়েছে— وَجَاءَكُمُ النَّذِيرُ এবং তোমাদের কাছে সতর্ককারী আগমন করেছেন। [সূরা ফাতির, আয়াত : ৩৭]
ব্যাখ্যা: সতর্ককারী বলতে কী বোঝানো হয়েছে? হতে পারে কুরআন কারিম, হতে পারে তাদের প্রতি প্রেরিত রাসূলগণ。
ইবনু আব্বাস, ইকরামা, সুফিয়ান, ওয়াফি, হুসাইন ইবনু ফজল, ফাররা এবং তাবারী থেকে বর্ণিত, সেই সতর্ককারী হলো—বার্ধক্য। কেননা, তখন মানুষ বার্ধক্যে পৌঁছে যায়। এটা মানুষের দূরুপগনার এবং খেলাধুলার সময় থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার আলামত।
জনৈক কবি বলেছেন— رَأَيْتُ الشَّيْبَ مِنْ نَذْيرَ لِصَاحِبِهِ وَ حَسْبِكَ مِنْ نَذِيرِ 'বার্ধক্যকে আমি দেখেছি মৃত্যুর সতর্ককারী হিসেবে— বুদ্ধের জন্য, এবং বার্ধক্যই যথেষ্ট সতর্ককারী হিসেবে।'
আরও বলা হয়েছে—সেই সতর্ককারী হলো জ্বর ও অসুস্থতা।
কেউ কেউ বলেছেন—পরিবার, আত্মীয়স্বজন, বন্ধু-বান্ধব এবং ভাইদের মৃত্যু। এটা এমন এক সতর্ককারী, যা সদা-সর্বদা, প্রতিটি মুহূর্তে এবং প্রতিটি স্থানে উপস্থিত থাকে।
কারও মতে সতর্ককারী হলো—জ্ঞান-বুদ্ধির পূর্ণতা, যখন কোনো মানুষ প্রতিটি বস্তুর প্রকৃতি সম্পর্কে বুঝতে পারে এবং ভালো ও মন্দের ব্যবধান অনুধাবন করতে শিখে। প্রকৃত জ্ঞানী পরকালের জন্য আমল করে এবং তার রবের কাছে থাকা বস্তুর জন্য উদগ্রীব থাকে। এই জ্ঞানই সতর্ককারী।
ষাট বছর বয়স্ক চাতুর্য পূর্ণতার অনুগ্রহ বলা হয়েছে। কেননা, ষাট বছর বান্দার পরিণত বয়স। এটা আল্লাহর নেকটা লাভ করার, তাকে ভয় করার এবং আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ করার বয়স। মানুষ এই বয়সে মৃত্যু এবং আল্লাহর সাক্ষাতের ধ্যান করে। এভাবে মানুষের ওপর অনুগ্রহের পর অনুগ্রহ করা হয় এবং সতর্কতার পর সতর্ক করা হয়। প্রথমত নবি প্রেরণের মাধ্যমে, দ্বিতীয়ত বার্ধক্যের মাধ্যমে, আর এটা হয় বয়স চল্লিশ বছর পূর্ণ করার মাধ্যমে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন— حَتَّى إِذَا بَلَغَ أَشُدَّهُ وَ بَلَغَ أَرْبَعِينَ سَنَةً قَالَ رَبِّ أَوْزِعْنِي أَنْ أَشْكُرَ نِعْمَتَكَ الَّتِي أَنْعَمْتُ عَلَيَّ وَ عَلَى وَالِدَيَّ وَ أَنْ أَعْمَلَ صَالِحًا تَرْضَاهُ وَ أَصْلِحْ لِي فِي ذُرِّيَّتِي إِنِّي تُبْتُ إِلَيْكَ وَإِنِّي مِنَ الْمُسْلِمِينَ 'অবশেষে সে যখন শক্তি-সামর্থ্যে বয়সে ও চল্লিশ বছরে পৌঁছেছে, তখন বলতে লাগল, হে আমার পালনকর্তা! আমাকে এরূপ ভাগ্য দান করো, যাতে আমি তোমার নিয়ামতের শোকর করি, যা তুমি দান করেছ আমাকে ও আমার পিতা-মাতাকে এবং যাতে তোমার পছন্দনীয় সৎকাজ করি। আমার সন্তানদের সৎকর্মপরায়ণ করো, আমি তোমার প্রতি তাওবা করলাম এবং আমি আত্মসমর্পণকারীদের একজন।' [সূরা আহকাফ, আয়াত : ১৫]
আল্লাহ তাআলা আলোচনা করেছেন—মানুষ চল্লিশ বছর বয়স পৌঁছার পর সে এখন নিজের প্রতি এবং নিজের পিতা-মাতার প্রতি আল্লাহপ্রদত্ত নিয়ামতগুলোর অনুধাবন করতে শিখে এবং সেগুলোর কৃতজ্ঞতা আদায় করে।
ইমাম মালিক রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, 'আমি আমার শহরের আলিমদেরকে দেখেছি; তারা দুনিয়া অন্বেষণ করে মানুষের সাথে মিশল। অতঃপর যখন তাদের বয়স চল্লিশে পৌঁছে গেল, তখন তারা মানুষ থেকে দূরে চলে গেল।'
তাওবার পঞ্চাশ ও তাওবাকারী
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন— إِنَّ اللَّهَ يَقْبَلُ تَوْبَةَ الْعَبْدِ مَا لَمْ يُغَرْغِرُ 'আল্লাহ ততক্ষণ পর্যন্ত বান্দার তাওবা কবুল করেন, যতক্ষণ (মৃত্যুকালীন) গড়গড়া সৃষ্টি না হয়।'
অর্থাৎ গড়গড়া সৃষ্টি হওয়ার সময়, রূহ হলকুম পর্যন্ত পৌঁছে যাওয়া পর্যন্ত—যখন সে আল্লাহর রহমত বা তার শাস্তি অবলোকন করে, তখন তাওবা এবং ঈমান কোনো উপকারে আসবে না। কুরআন কারিমে স্পষ্ট ভাষায় বলা হয়েছে— فَلَمَّا رَأَوْا بَأْسَنَا যখন তারা আমার শাস্তিকে দেখবে তখন তাদের ঈমান তাদের কোনো উপকারে আসবে না। [সূরা গাফির, আয়াত : ৮৫]
আরও ইরশাদ হয়েছে— وَلَيْسَتِ التَّوْبَةُ لِلَّذِينَ يَعْمَلُونَ السَّيِّئَاتِ حَتَّى إِذَا حَضَرَ أَحَدَهُمُ الْمَوْتُ قَالَ إِنِّي تُبْتُ الْآنَ
আর এমন লোকদের জন্য কোনো ক্ষমা নেই, যারা মন্দ কাজ করতেই থাকে। এমন কি যখন তাদের কারও সামনে মৃত্যু উপস্থিত হয়, তখন বলতে থাকে আমি এখন তাওবা করছি। [সূরা নিসা, আয়াত : ১৮]
তাওবার দরজা বান্দার জন্য ততক্ষণ পর্যন্ত উন্মুক্ত যতক্ষণ পর্যন্ত সে রুহ্ কণ্ঠনালীকে অবলম্বন না করে, আর সে সময়টি হলো—গড়গড়ায়া সৃষ্টি হওয়ার মুহূর্ত।
সুন্নাহ্ মানুষের জন্য এই মুহূর্ত অবলম্বনে করার পূর্বেই তাওবা করা আবশ্যক। আল্লাহ তাআলা সেটিই বলেছেন—
إِنَّمَا التَّوْبَةُ عَلَى اللَّهِ لِلَّذِينَ يَعْمَلُونَ السُّوءَ بِجَهَالَةٍ ثُمَّ يَتُوبُونَ مِنْ قَرِيبٍ فَأُولَئِكَ يَتُوبُ اللَّهُ عَلَيْهِمْ وَكَانَ اللَّهُ عَلِيمًا حَكِيمًا.
অবশ্যই আল্লাহ্ তাদের তাওবা কবুল করবেন—যারা ভুলবশত মন্দ কাজ করে, অতঃপর অনতিবিলম্বে তাওবা করে; এরাই হলো সেসব লোক-যাদেরকে আল্লাহ্ ক্ষমা করে দেন। আল্লাহ্ মহাজ্ঞানী, রহস্যবিদ। [সূরা নিসা, আয়াত : ১৭]
ব্যাখ্যা: আবদুল্লাহ্ ইবনু আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেছেন, অনতিবিলম্বে অর্থ হলো—অসুস্থতা এবং মৃত্যুর পূর্বেই তাওবা করা।
আবু মিজলাজ, দাহ্হাক, ইকরামা এবং ইবনু জায়েদ প্রমুখ বলেছেন—স্থিরিশক্তিদেরকে দেখা, রুহের যাত্রা করা এবং মানুষের নিজের নিয়ন্ত্রণক্ষমতা হারিয়ে ফেলার পূর্বে তাওবা কবুল হয়।
আরও বলা হয়েছে—গুনাহ্ করার পর হঠকারিতা না করে খুব দ্রুত তাওবা করে নেওয়া এবং সুস্থাবস্থায় তাওবার দিকে অগ্রণী হওয়া উত্তম কাজ।
গ্রহণযোগ্য মুমিনদের ঐকমত্যে তাওবা করা প্রতিটি মুমিনের জন্য ফরজ। কারণ, আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন—
وَتُوبُوا إِلَى اللَّهِ جَمِيعًا أَيُّهَا الْمُؤْمِنُونَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ
হে মুমিনগণ! তোমরা সবাই আল্লাহর কাছে তাওবা করো, যাতে তোমরা সফলকাম হও। [সূরা নূর, আয়াত : ৩১]
আরও ইরশাদ হয়েছে—
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا تُوبُوا إِلَى اللَّهِ تَوْبَةً نَصُوحًا
হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহ্ তাআলার কাছে তাওবা করো আন্তরিকভাবে। [সূরা তাহরিম, আয়াত : ৮]
তাওবা গ্রহণযোগ্য় হওয়ার চারটি শর্ত
১. আন্তরিকভাবে লজ্জিত হওয়া।
২. এখনই গুনাহ্ পরিহার করা।
৩. আবারও গুনাহ্ সংক্রান্তে আকাঙ্ক্ষা না হওয়ার জন্য দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করা।
৪. কেবল আল্লাহকে লজ্জা করে তার ভয়ে তাওবা করা, অন্য কারণও জন্য নয়।
যদি এই শর্তগুলোয় মধ্যে থেকে একটিও বিচ্যুত হয়, তাহলে তাওবা বিশুদ্ধ হবে না। তাওবার আরেকটি শর্ত হলো—গুনাহের স্বীকারোক্তি দেওয়া, অধিকাংশ ইস্তিগফার করা, যেন তাওবার মাধ্যমে কৃত চুক্তিও মজবুত হয় এবং তার মর্ম হৃদয়ের গভীরে স্থিত হয়, কেবল মৌখিক উচ্চারণের ওপর ফাত্ত্ব না থাকে। যে ব্যক্তি কেবল মুখে বলে ‘আস্তাগফিরুল্লাহ’, কিন্তু তার হৃদয় থাকে গুনাহের ওপর অবিচল, তাহলে তার এই ইস্তিগফারও আরেকটি ইস্তিগফারের মুখাপেক্ষী।
হাসান বসরি রাহিমাহুল্লাহু বলেছেন—‘আমাদের ইস্তিগফারও ইস্তিগফারের মুখাপেক্ষী।’
শাইখ আবদুুল্লাহ রাহিমাহুল্লাহু বলেন, হাসান বসরি রাহিমাহুল্লাহু তো তার যুগে কথাটি বলেছিলেন, তাহলে বর্তমান যুগের অবস্থা কেমন হবে—যখন দেখা যাচ্ছে যে, মানুষ গুনাহ ও জুলুমের ওপর অবিচলভাবে চলছেই আছে? এক টুকরো তুলার ব্যাপারেও যে দুর্নীতি করতে ছাড়ছে না, কেবল এই ধারণায় যে, সে তার গুনাহ থেকে ইস্তিগফার করবে। এটা তো প্রকৃতপক্ষে ইস্তিগফারকে উপহাস করা এবং গুনাহকে তুচ্ছ ভাবা। সে ওই লোকদের অন্তর্ভুক্ত—যারা আল্লাহ্ তাআলার আয়াতগুলোকে উপহাস করে। কুরআন কারিমে ইরশাদ হয়েছে—
لَا تَقْنَطُوا مِنْ رَّوْحِ اللَّهِ إِنَّهُ لَا يَاْسٌ مِنْ رَّوْحِ اللَّهِ
আল্লাহ্ তাআলার আয়াতগুলোকে উপহাস করে পাত্র বানিয়ো না। [সূরা বাকারা, আয়াত : ১০১]
আরও বলা হয়েছে, মানুষ যখন ঈমানী তাওবা করে—জুলুমকে প্রতিরোধ করা, প্রতিপক্ষকে আপন করে নেওয়া এবং ইবাদতে সার্বক্ষণিক হওয়া ইত্যাদি。
টিকাঃ
[২৪] সহীহুল বুখারী, খণ্ড : ২০, পৃষ্ঠা : ৪৪, হাদিস : ৬৪০১
[২৯] সুন্নাতুত তিরমিযি, খণ্ড : ১১, পৃষ্ঠা : ১৪৫, হাদিস : ৩৫৩৩৭
📄 তাওবার ব্যাখ্যা ও তাওবাকারী
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন—
إِنَّ اللَّهَ يَقْبَلُ تَوْبَةَ الْعَبْدِ مَا لَمْ يُغَرْغِرُ
'আল্লাহ ততক্ষণ পর্যন্ত বান্দার তাওবা কবুল করেন, যতক্ষণ (মৃত্যুকালীন) গড়গড়া সৃষ্টি না হয়।'
অর্থাৎ গড়গড়া সৃষ্টি হওয়ার সময়, রূহ হলকুম পর্যন্ত পৌঁছে যাওয়া পর্যন্ত—যখন সে আল্লাহর রহমত বা তার শাস্তি অবলোকন করে, তখন তাওবা এবং ঈমান কোনো উপকারে আসবে না। কুরআন কারিমে স্পষ্ট ভাষায় বলা হয়েছে—
فَلَمَّا رَأَوْا بَأْسَنَا
যখন তারা আমার শাস্তিকে দেখবে তখন তাদের ঈমান তাদের কোনো উপকারে আসবে না। [সূরা গাফির, আয়াত : ৮৫]
আরও ইরশাদ হয়েছে—
وَلَيْسَتِ التَّوْبَةُ لِلَّذِينَ يَعْمَلُونَ السَّيِّئَاتِ حَتَّى إِذَا حَضَرَ أَحَدَهُمُ الْمَوْتُ قَالَ إِنِّي تُبْتُ الْآنَ
আর এমন লোকদের জন্য কোনো ক্ষমা নেই, যারা মন্দ কাজ করতেই থাকে। এমন কি যখন তাদের কারও সামনে মৃত্যু উপস্থিত হয়, তখন বলতে থাকে আমি এখন তাওবা করছি। [সূরা নিসা, আয়াত : ১৮]
তাওবার দরজা বান্দার জন্য ততক্ষণ পর্যন্ত উন্মুক্ত যতক্ষণ পর্যন্ত সে রুহ্ কণ্ঠনালীকে অবলম্বন না করে, আর সে সময়টি হলো—গড়গড়ায়া সৃষ্টি হওয়ার মুহূর্ত।
সুন্নাহ্ মানুষের জন্য এই মুহূর্ত অবলম্বনে করার পূর্বেই তাওবা করা আবশ্যক। আল্লাহ তাআলা সেটিই বলেছেন—
إِنَّمَا التَّوْبَةُ عَلَى اللَّهِ لِلَّذِينَ يَعْمَلُونَ السُّوءَ بِجَهَالَةٍ ثُمَّ يَتُوبُونَ مِنْ قَرِيبٍ فَأُولَئِكَ يَتُوبُ اللَّهُ عَلَيْهِمْ وَكَانَ اللَّهُ عَلِيمًا حَكِيمًا.
অবশ্যই আল্লাহ্ তাদের তাওবা কবুল করবেন—যারা ভুলবশত মন্দ কাজ করে, অতঃপর অনতিবিলম্বে তাওবা করে; এরাই হলো সেসব লোক-যাদেরকে আল্লাহ্ ক্ষমা করে দেন। আল্লাহ্ মহাজ্ঞানী, রহস্যবিদ। [সূরা নিসা, আয়াত : ১৭]
ব্যাখ্যা: আবদুল্লাহ্ ইবনু আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেছেন, অনতিবিলম্বে অর্থ হলো—অসুস্থতা এবং মৃত্যুর পূর্বেই তাওবা করা।
আবু মিজলাজ, দাহ্হাক, ইকরামা এবং ইবনু জায়েদ প্রমুখ বলেছেন—স্থিরিশক্তিদেরকে দেখা, রুহের যাত্রা করা এবং মানুষের নিজের নিয়ন্ত্রণক্ষমতা হারিয়ে ফেলার পূর্বে তাওবা কবুল হয়।
আরও বলা হয়েছে—গুনাহ্ করার পর হঠকারিতা না করে খুব দ্রুত তাওবা করে নেওয়া এবং সুস্থাবস্থায় তাওবার দিকে অগ্রণী হওয়া উত্তম কাজ।
গ্রহণযোগ্য মুমিনদের ঐকমত্যে তাওবা করা প্রতিটি মুমিনের জন্য ফরজ। কারণ, আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন—
وَتُوبُوا إِلَى اللَّهِ جَمِيعًا أَيُّهَا الْمُؤْمِنُونَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ
হে মুমিনগণ! তোমরা সবাই আল্লাহর কাছে তাওবা করো, যাতে তোমরা সফলকাম হও। [সূরা নূর, আয়াত : ৩১]
আরও ইরশাদ হয়েছে—
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا تُوبُوا إِلَى اللَّهِ تَوْبَةً نَصُوحًا
হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহ্ তাআলার কাছে তাওবা করো আন্তরিকভাবে। [সূরা তাহরিম, আয়াত : ৮]
টিকাঃ
[২৯] সুন্নাতুত তিরমিযি, খণ্ড : ১১, পৃষ্ঠা : ১৪৫, হাদিস : ৩৫৩৩৭
📄 তাওবা গ্রহণযোগ্য হওয়ার চারটি শর্ত
১. আন্তরিকভাবে লজ্জিত হওয়া।
২. এখনই গুনাহ্ পরিহার করা।
৩. আবারও গুনাহ্ সংক্রান্তে আকাঙ্ক্ষা না হওয়ার জন্য দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করা।
৪. কেবল আল্লাহকে লজ্জা করে তার ভয়ে তাওবা করা, অন্য কারণও জন্য নয়।
যদি এই শর্তগুলোয় মধ্যে থেকে একটিও বিচ্যুত হয়, তাহলে তাওবা বিশুদ্ধ হবে না। তাওবার আরেকটি শর্ত হলো—গুনাহের স্বীকারোক্তি দেওয়া, অধিকাংশ ইস্তিগফার করা, যেন তাওবার মাধ্যমে কৃত চুক্তিও মজবুত হয় এবং তার মর্ম হৃদয়ের গভীরে স্থিত হয়, কেবল মৌখিক উচ্চারণের ওপর ফাত্ত্ব না থাকে। যে ব্যক্তি কেবল মুখে বলে ‘আস্তাগফিরুল্লাহ’, কিন্তু তার হৃদয় থাকে গুনাহের ওপর অবিচল, তাহলে তার এই ইস্তিগফারও আরেকটি ইস্তিগফারের মুখাপেক্ষী।
হাসান বসরি রাহিমাহুল্লাহু বলেছেন—‘আমাদের ইস্তিগফারও ইস্তিগফারের মুখাপেক্ষী।’
শাইখ আবদুুল্লাহ রাহিমাহুল্লাহু বলেন, হাসান বসরি রাহিমাহুল্লাহু তো তার যুগে কথাটি বলেছিলেন, তাহলে বর্তমান যুগের অবস্থা কেমন হবে—যখন দেখা যাচ্ছে যে, মানুষ গুনাহ ও জুলুমের ওপর অবিচলভাবে চলছেই আছে? এক টুকরো তুলার ব্যাপারেও যে দুর্নীতি করতে ছাড়ছে না, কেবল এই ধারণায় যে, সে তার গুনাহ থেকে ইস্তিগফার করবে। এটা তো প্রকৃতপক্ষে ইস্তিগফারকে উপহাস করা এবং গুনাহকে তুচ্ছ ভাবা। সে ওই লোকদের অন্তর্ভুক্ত—যারা আল্লাহ্ তাআলার আয়াতগুলোকে উপহাস করে। কুরআন কারিমে ইরশাদ হয়েছে—
لَا تَقْنَطُوا مِنْ رَّوْحِ اللَّهِ إِنَّهُ لَا يَاْسٌ مِنْ رَّوْحِ اللَّهِ
আল্লাহ্ তাআলার আয়াতগুলোকে উপহাস করে পাত্র বানিয়ো না। [সূরা বাকারা, আয়াত : ১০১]
আরও বলা হয়েছে, মানুষ যখন ঈমানী তাওবা করে—জুলুমকে প্রতিরোধ করা, প্রতিপক্ষকে আপন করে নেওয়া এবং ইবাদতে সার্বক্ষণিক হওয়া ইত্যাদি।
সালাফাকা : সালাফরা বলেছেন—প্রতিপক্ষকে সন্তুষ্ট করার পদ্ধতি হলো—তার কাছ থেকে ছিনতাইকৃত অর্থ ফিরিয়ে দেওয়া, আত্মসাৎকৃত সম্পদ ফিরিয়ে দেওয়া, বিজড়িত অন্যায় ফিরিয়ে দেওয়া, গিবত করলে ক্ষমা চাওয়া, কোনো আসবাবপত্র নষ্ট করলে তার ক্ষতিপূরণ দেওয়া, গালি দিলে ক্ষমা চাওয়া, অভিশাপপাত করলে মাফ চাওয়া। মোটকথা, যেকোনো প্রকার অসংগতিমূলক আচরণ করলে ক্ষমা চেয়ে তাকে খুশি করে আপন করে নেওয়া। সাথে সাথে অতীতে কৃত অনাচারের প্রতি লজ্জিত হবে এবং জীবনের মূল্যবান সময় এমন অবৈধ কাজে নষ্ট করার জন্য পরিতাপ করবে।
আয়েশা সিদ্দিকা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন—আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, তিনি বলেছিলেন—‘বান্দা যখন নিজের গুনাহের স্বীকৃতি দিয়ে তাওবা করে, আল্লাহ্ তার তাওবা কবুল করেন।’
টিকাঃ
[৯৯] সহিহুল বুখারী, খণ্ড : ৯, পৃষ্ঠা : ১৪৬, হাদিস : ৯৫৯৭; সহিহ মুসলিম, খণ্ড : ১০, পৃষ্ঠা : ৩৪৭, হাদিস : ৪১৪৪।