📄 মৃত্যু ও আখিরাতের স্মরণ এবং দুনিয়া পরিত্যাগ
আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন—নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর মাতার কবর জিয়ারত করতে গিয়ে কেঁদে ফেললেন, সঙ্গী-সাথিওরা কাঁদলেন। তখন নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন—
اسْتَأْذَنْتُ رَبِّيَ فِي أَنْ أَسْتَغْفِرَ لَهَا فَلَمْ يُؤْذَنْ لِي وَاسْتَأْذَنْتُهُ فِي أَنْ أَزُورَ قَبْرَهَا فَأَذَنَ لِي فَزُورُوا الْقُبُورَ فَإِنَّهَا تُذَكِّرُ الْمَوْتَ.
আমি আমার রবের কাছে আমার মায়ের জন্য ক্ষমা চাওয়ার অনুমতি প্রার্থনা করলাম। কিন্তু তিনি অনুমতি দিলেন না। তারপর আমার রবের কাছে মায়ের কবর জিয়ারত করার অনুমতি চাইলাম। তিনি অনুমতি দিলেন। অতএব, তোমরা কবর জিয়ারত করো! কেননা, তা মৃত্যুকে স্মরণ করিয়ে দেয়।
সালাফগন: সালাফরা বলেছেন, অসুস্থ হৃদয়ের জন্য কবর জিয়ারত করার চেয়ে উপকারী কোনো আমল নেই। বিশেষভাবে যদি কারণও হৃদয় খুব শক্ত হয়, তাহলে তার জন্য কবর জিয়ারত অত্যন্ত উপকারী আমল। সুতরাং কঠিন হৃদয়ের মানুষগুলো এই কয়েকটি বিষয়ের মাধ্যমে তার হৃদয়ের চিকিৎসা করবে:
প্রথম বিষয়: হৃদয়ের কঠোরতা ও অপসাকে উপড়ে ফেলতে হবে। এর উপায় হলো, ইলমের এমন বৈঠকগুলোতে অংশগ্রহণ করতে হবে—যেখানে ওয়াজ-নসিহত করা হয়, জাহান্নামের ভয় এবং জান্নাতের আশা প্রদর্শন করা হয় এবং নেককারের ঘটনা শোনানো হয়। কেননা, এগুলোতে হৃদয়কে করে কোমল-বিগলিত এবং তার মাঝে সৃষ্টি করে কল্যাণের পুষ্টি।
দ্বিতীয় বিষয়: মৃত্যুর আলোচনা। দুনিয়া ত্যাগ-আল্লাহ আদ বিনাশকারী, আজকে বিক্রমিকারী এবং সন্তানসন্ততিকে অতিক্রমকারী মৃত্যুর আলোচনা বেশি বেশি করতে হবে।
তৃতীয় বিষয়: মৃত্যুমুখ্য শাস্তিও ব্যক্তিদের কাছে উপস্থিত থাকা। কারণ, মৃত্যুর দিকে তাকিয়ে থাকা, মৃত্যুমুখী ব্যক্তিকে প্রত্যক্ষ করা, মৃত্যুর সময়ের টানাটেনেগুলোকে অবলোকন করা এবং মৃত্যুপববর্তী অবস্থা সম্পর্কে চিন্তাভাবনা করা হৃদয়ের স্বাদ- আস্বাদনকে নিঃশেষ করে দেয়। অন্তরের খুশিতে ডিঙা দেয়। নিদ্রার খোকরকে নির্মূল করে দেয়, শরীরকে বিশ্রাম থেকে উঠিয়ে ইবাদতের পরিশ্রমে নিয়োজিত করে, আমলের প্রতি করে উদগ্রীব এবং অধিক পরিমাণ কষ্ট ও পরিশ্রমের প্রতি করে উৎসাহিত।
টিকাঃ
[১] সহীহ মুসলিম: খণ্ড: ৭০, পৃষ্ঠা: ১৩৯, হাদিস: ৯৯২২।
📄 কবর জিয়ারতের বিধান
বুরাইদা ইবনু হাসিব রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন—
نَهَيْتُكُمْ عَنْ زِيَارَةِ الْقُبُورِ فَزُورُوهَا فَإِنَّ فِي زِيَارَتِهَا تَذْكِرَةً
তোমাদেরকে কবর জিয়ারত করা থেকে বারণ করেছিলাম, (তবে এখন থেকে) তোমরা কবর জিয়ারত করো। কেননা, কবর জিয়ারতের মধ্যে (পরকালের) স্মরণ রয়েছে।
বুরাইদা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন—'যে ব্যক্তি কবর জিয়ারত করতে চায়, সে যেন কবর জিয়ারত করে। এবং তোমরা মন্দ কথা বলো না।'
আয়িশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেছেন—'আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসুল! আমরা তাদের (কবরবাসীর) জন্য কীভাবে দুআ করব? রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহিহি ওয়াসাল্লাম বললেন এভাবে বলো—
اَلسَّلَامُ عَلَى أَهْلِ الدِّيَارِ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ وَالْمُسْلِمِينَ يَرْحَمُ اللهُ الْمُسْتَقْدِمِينَ مِنَّا وَالْمُسْتَأْخِرِينَ وَإِنَّا إِنْ شَاءَ اللهُ بِكُمْ لاَحِقُونَ.
মুমিন ও মুসলিম কবরবাসীর ওপর শান্তি বর্ষিত হোক, আমাদের থেকে আগের ও পরের সকলের প্রতি আল্লাহ রহম করুন। আল্লাহ চাইলে আমরা শিগগির তোমাদের সাথে মিলিত হব。
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদা এক মহিলার পাশ দিয়ে অতিক্রম করলেন—যে একটি কবরের পাশে কাঁদছিল। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে উদ্দেশ্য করে বললেন—
اتَّقِي اللهَ وَاصْبِرِي.
আল্লাহকে ভয় করো এবং ধৈর্যধারণ করো。
নোট: আরবদের কাছে কান্নার ছিল একটি প্রসিদ্ধ রূপ। তারা বর্ণনা করে কাঁদত। সাথে করত চিৎকার, গালে থাপ্পড় মারত বাদ্যযন্ত্র, কাপড়চোপড়ও ফেঁড়ে ফেলত।
ইসলামে কিরাম এমন কান্না হারাম হওয়ার ব্যাপারে একমত। এমন কান্নার ব্যাপারে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পক্ষ থেকে শাস্তিবাদী উচ্চারিত হয়েছে—
أَنَا بَرِيءٌ مِّمَّنْ حَلَقَ وَخَرَقَ وَشَقَّ.
আমি ওই ব্যক্তি থেকে মুক্ত—যে চিৎকার করে, কাট্ট ভাষায় কথা বলে এবং কাপড়চোপড় ফাড়ো。
তবে চিৎকার করা ছাড়া কান্নার ব্যাপারে অনুমতি রয়েছে। কবরের কাছে এবং মৃত্যুর সময় কান্নার বৈধতার ব্যাপারে হাদিস বর্ণিত হয়েছে। এটাকে মায়া ও রহমতের কান্না বলা হয়েছে, যা সকল মানুষের মাঝেই রয়েছে। এমনকি যখন নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পুত্র হজরত ইবরাহিম রাদিয়াল্লাহু আনহু মারা গিয়েছিলেন তখন নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ক্রন্দন করেছিলেন—
টিকাঃ
[১] সুনানু আবি দাউদ, খণ্ড: ৯, পৃষ্ঠা: ৪৪, হাদিস: ২৭৯৬
[২] সহীহ মুসলিম: খণ্ড: ৭০, পৃষ্ঠা: ১০০১। তবে আমি মাকতাবায়ে শামেলায় হাদিসের এই পার্টটি পাইনি—অনুবাদক。
[১০] সহীহ মুসলিম, খণ্ড: ৫, পৃষ্ঠা: ১০২, হাদিস: ৯৯৩৮。
[১১] সহীহ বুখারি, খণ্ড: ৪, পৃষ্ঠা: ৪৭৬, হাদিস: ১২৮৩。
[১২] সহীহ মুসলিম, খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ২৭১, হাদিস: ১৬৯১।
📄 মুমিন ব্যক্তি ললাট ঘর্মাক্ত অবস্থায় মারা যায়
হজরত বুরাইদা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন—
اَلْمُؤْمِنُ يَمُوتُ بِعَرَقِ الْجَبِينِ.
মু'মিন ব্যক্তি মারা যায় ললাটের ঘর্ম নিয়ে।
কোনো কোনো আলিম বলেছেন—মু'মিন ব্যক্তি যখন রবের কারিমের অবাধ্যতা করে অনুতপ্ত হয়, তখন তার ললাট ঘামে ভিজে যায়।
টিকাঃ
[১০] সুনানু ইবনু মাজাহ, খণ্ড: ৪, পৃষ্ঠা: ৩৫৪, হাদিস: ১৪৪২。
📄 মৃত্যুর কঠোরতা
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা চারটি আয়াতে মৃত্যুর কঠোরতা সম্পর্কে আলোচনা করেছেন—
প্রথম আয়াত:
وَ جَآءَتْ سَكْرَةُ الْمَوْتِ بِالْحَقِّ.
মৃত্যুর যন্ত্রণা সত্যিই আসবে। [সূরা কফ, আয়াত: ১৯]
দ্বিতীয় আয়াত:
وَلَوْ تَرٰى إِذِ الظّٰلِمُوْنَ فِيْ غَمَرَاتِ الْمَوْتِ.
হায়! তুমি যদি ওই জালিমদেরকে দেখতে যারা মৃত্যু-যন্ত্রণায় ছটফট করবে। [সূরা আনআম, আয়াত: ৯৩]
তৃতীয় আয়াত:
فَلَوْلَا إِذَا بَلَغَتِ الْحُلْقُوْمَ
'তাহলে কেন (তোমরা বাধা দাও না) যখন প্রাণ এসে যায় কণ্ঠনালীতে?' [সূরা আল-ক্বিয়ামাহ, আয়াত: ২৬]
চতুর্থ আয়াত:
كَلَّا إِذَا بَلَغَ التَّرَاقِيَ
কখনো নয়, প্রাণ যখন কণ্ঠে এসে পৌঁছেছে। [সূরা ক্বিয়ামাহ, আয়াত: ২৬]
আয়িশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেছেন—রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পাশে একটি চামড়ার বা কাঠের বড় পাত্র ছিল। যাতে পানি রাখা ছিল। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার মধ্যে হাত ভিজিয়ে সেই ভেজা হাত চেহারায় বুলিয়ে দিলেন আর বলছিলেন—'লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ, নিশ্চয় মৃত্যুর রয়েছে কঠিন যন্ত্রণা। তারপর হাত প্রসারিত করে বলতে লাগলেন—"আল্লাহুম্মা বির-রাফিকিল আ'লা"। ইতিমধ্যে তার মৃত্যু হলো এবং তার হাত নুয়ে পড়ল。
কবি বলেছেন—
بَيْنَا الْفَتَى مَرَحَ الْخُطَى إِذْ قِيلَ: قَدْ مَرِضَ الْفَتَى. إِذْ قِيلَ: بَاتَ بِلَيْلَةٍ مَّا نَامَهَا *** إِذْ قِيلَ: أَصْبَحَ مُسْخَنًا مَّا يَرْجَى. إِذْ قِيلَ: أَصْبَحَ شَخْصًا وَمَوجَعًا *** وَمُعَلَلًا ، إِذْ قِيلَ: أَصْبَحَ قَدْ قَضَى.
যুবকটি চঞ্চল পথে আনন্দিত হয়ে চলেছিল, চেষ্টা করছিল সেজন্যাই; ইতিমধ্যে বলা হলো—যুবকটি অসুস্থ! যখন বলা হলো—যুবকটি সারারাত ঘুমায়নি; সাথেই বলা হলো—অপ্রত্যাশিতভাবে হয়েছে মোটা। যখন বলা হলো—জাগ্রত হয়েছে ব্যক্তিগতপূর্ণ, যুক্তিপূর্ণ সচেতন হয়ে, বলা হলো—সকালেই তার মৃত্যু হয়েছে।
উলামায়ে কিরাম রাহিমানহুমুল্লাহ বলেছেন, মৃত্যুর এই কঠোরতা যখন নবিগণ, রাসুলগণ, আউলিয়ানে কিরাম এবং মুত্তাকিদেরকেও ছাড়েনি, তখন আমরা এই মৃত্যু থেকে বিমুখ থাকার এবং প্রস্তুতি গ্রহণ না করার দুঃসাহস কীভাবে দেখাতে পারি? আল্লাহ তাআলা নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে নির্দেশ করেছেন—
قُلْ هُوَ اللهُ أَحَدٌ وَمَا أَدْرَاكَ
বলুন, এটি এক মহসংবাদ। যা থেকে তোমরা মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছ। [সূরা সোয়াদ, আয়াত: ৬৮-৬৯]
টিকাঃ
[১৪] সহীহ বুখারি, খণ্ড: ২০, পৃষ্ঠা: ১৩৯, হাদিস: ৬৩২৯。