📄 মিথ্যা কথার পরিণাম
মহানবী সা. বলেছেন,
عَنْ أَبُو بَرْزَةَ، رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ، سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم يَقُولُ : " أَلاَ إِنَّ الْكَذِبَ يُسَوِّدُ الْوَجْهَ، وَالنَّمِيمَةَ عَذَابُ الْقَبْرِ "
আবু বুরযাহ রা. থেকে বর্ণিত, আমি রাসূল সা. কে বলতে শুনেছি, সাবধান! মিথ্যা কথা মানুষের মুখকে কাল করে দেয় আর চোগলখোরী কবরের শাস্তি হয়। (আত্ত-তারগীব ওয়াত তারহীব, ৩য় খণ্ড ১৪৮১ নং হাদীস)
গীবতের মহাপরিণাম
মহানবী সা. বলেছেন,
الغيبة و النميمة يختان الايمان كما يعضد الراعي الشجرة
অর্থঃ ওসমান বিন আফফান রা.থেকে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ আমি রাসূল সা. কে বলতে শুনেছি, রাখাল যেভাবে গাছের পাতা পেড়ে ঠিক সেভাবে গীবত ও চোগলখোরী ঈমানকে ধ্বংস করে দেয়। (আত্ত-তারগীব ওয়াত তারহীব, ৩য় খণ্ড ১৪৮৫ নং হাদীস)
দোষ-ত্রুটি বলা সম্পর্কে মহানবী সা. বলেছেন,
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ - رضي الله عنه - أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ - صلى الله عليه وسلم - قَالَ : « إيَّاكُمْ وَالظَّنَّ ، فَإِنَّ الظَّنَّ أَكْذَبُ الْحَدِيثِ ، وَلَا تَحَسَّسُوا ، وَلَا تَجَسَّسُوا ، وَلَا تَنَافَسُوا ، وَلَا تَحَاسَدُوا ، وَلَا تَبَاغَضُوا ، وَلَا تَدَابَرُوا ، وَكُونُوا عِبَادَ اللَّهِ إِخْوَاناً كَمَا أَمَرَكُمْ . الْمُسْلِمُ أَخُو الْمُسْلِمِ ، لَا يَظْلِمُهُ ، وَلَا يَخْذُلُهُ وَلَا يَحْقِرُهُ ، التَّقْوَى هَا هُنَا التَّقْوَى هَا هُنَا » وَيُشِيرُ إِلَى صَدْرِهِ « بِحَسْبِ امْرِئٍ مِنَ الشَّرِّ أَنْ يَحْقِرَ أَخَاهُ الْمُسْلِمَ ، كُلُّ الْمُسْلِمِ عَلَى الْمُسْلِمِ حَرَامٌ : دَمُهُ ، وَعِرْضُهُ ، وَمَالُهُ . إِنَّ اللَّهَ لَا يَنْظُرُ إِلَى أَجْسَادِكُمْ ، وَلَا إِلَى صُوَرِكُمْ ، وَلَكِنْ يَنْظُرُ إِلَى قُلُوبِكُمْ وَأَعْمَالِكُمْ » وَفِي رواية : « لَا تَحَاسَدُوا ، وَلَا تَبَاغَضُوا ، وَلَا تَجَسَّسُوا ، وَلَا تَحَسَّسُوا ، وَلَا تَنَاجَشُوا وَكُونُوا عِبَادَ اللَّهِ إِخْوَاناً » وَفِي رواية : « لَا تَقَاطَعُوا ، وَلَا تَدَابَرُوا ، وَلَا تَبَاغَضُوا ، وَلَا تَحَاسَدُوا ، وَكُونُوا عِبَادَ اللَّهِ إِخْوَاناً » وَفِي رواية : « لَا تَهَاجَرُوا وَلَا يَبِعْ بَعْضُكُمْ عَلَى بَيْعِ بَعْضٍ » . رواه مسلم بكل هذه الروايات ، وروى البخاري أكثرها .
হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসূল সা. বলেছেন, সাবধান! অযথা ধারণা করা থেকে বিরত থাক। কেননা অযথা ধারণা পোষণ করা সবচেয়ে বড় মিথ্যা কথা। মানুষের দোষ অনুসন্ধান করবে না। পরস্পর ত্রুটি অন্বেষণে লেগে যেয়ো না। পরস্পর হিংসা পোষণ করবে না। যোগাযোগ বন্ধ করবে না। আল্লাহ্র বান্দারা ভাই ভাই হয়ে থাকো, যেভাবে তোমাদের হুকুম করা হয়েছে। এক মুসলিম অপর মুসলিমের ভাই। সে তার ওপর যুলুম করতে পারে না। তাকে অপমানিত করতে পারে না। এমন কি অবজ্ঞাও করতে পারে না। তাকওয়া ও আল্লাহভীতি এখানে। এই বলে তিনি তার বুকের দিকে ইশারা করেছেন। কোন ব্যক্তির খারাপ হওয়ার জন্য এটুকুই যথেষ্ট যে, সে মুসলিম ভাইকে অবজ্ঞা ঘৃণা করবে। প্রত্যেক মুসলিমের জন্য প্রত্যেক মুসলমানের রক্ত, মান-মর্যাদা ও ধন-সম্পদ হরণ করা হারাম। মহান আল্লাহ্ তোমাদের শরীর ও চেহারার দিকে দৃষ্টি দেবেন না বরং তিনি দেখবেন তোমাদের অন্তর ও আমলের দিকে।
অপর এক বর্ণনায় রয়েছে, পরস্পর হিংসা-বিদ্বেষ পোষণ করবে না, ছিদ্রান্বেষণ করবে না। দোষ অনুসন্ধান করবে না, অন্যের ওপর দর কষাকষি করবে না। আল্লাহ্র বান্দা ভাই ভাই সম্পর্কে চলে গেল। অপর বর্ণনায় আছে, সম্পর্কচ্ছেদ করবে না। খোঁজ-খবর নেয়া বন্ধ করবে না। হিংসা-বিদ্বেষ পরিত্যাগ করো। একজনের ক্রয়-বিক্রয়ের ওপর দিয়ে অপরজন যেন ক্রয়-বিক্রয় না করে। (রিয়াদুস সালেহীন ১৫৭০ নং হাদীস)
📄 প্রতিবেশীর হক্ব
এ সম্পর্কে আল্লাহ্ তায়ালা বলেছেন,
وَاعْبُدُوا اللَّهَ وَلَا تُشْرِكُوا بِهِ شَيْئًا وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا وَبِذِي الْقُرْبَى وَالْيَتَامَى وَالْمَسَاكِينِ وَالْجَارِ ذِي الْقُرْبَى وَالْجَارِ الْجُنُبِ وَالصَّاحِبِ بِالْجَنْبِ وَابْنِ السَّبِيلِ
অর্থঃ তোমরা আল্লাহ্র ইবাদত কর, তাঁর সাথে কাউকে শরীক করবে না। আর মাতা-পিতা, নিকটাত্মীয় ইয়াতীম, মিসকীন, নিকটাত্মীয় প্রতিবেশী, প্রতিবেশী এবং এবং মুসাফিরদের সাথে সৎ ও সদয় ব্যবহার করবে। (সূরা নিসা: আয়াত- ৩৬)
এখানে ذِي الْقُرْبَى وَالْجَارِ বলতে যারা প্রতিবেশী হওয়ার সাথে সাথে আত্মীয় বটে। আর الْجُنُبِ وَالْجَارِ বলতে প্রতিবেশীকে বুঝায়, যার সাথে আত্মীয়তার সম্পর্ক নেই।
একে অন্যের সাথে হক্ব
(ক) নিকটাত্মীয়ের হক্ব
(১) পিতা-মাতার হক্ব
(২) সন্তান-সন্ততির হক্ব
(৩) ভাই বোনদের হক্ব
(৪) স্বামী-স্ত্রীর পরস্পরের প্রতি পরস্পরের হক্ব
(৫) দাদা-দাদী, নানা-নানী, ফুফু-চাচা, খালা-মামাদের হক্ব
(খ) দূরবর্তী আত্মীয়দের হক্বঃ
(১) আপন আত্মীয়দের আত্মীয়ের হক্ব
(২) স্ত্রীর আত্মীয়দের হক্ব
(৩) মামাত, ফুফাত, চাচাত, খালাত ভাই-বোনদের হক্ব
(গ) প্রতিবেশীর হক্ব
(১) আত্মীয় প্রতিবেশীর হক্ব
(২) দূর আত্মীয় প্রতিবেশীর হক্ব
(৩) অনাত্মীয় প্রতিবেশীর হক্ব
(৪) নিকট প্রতিবেশীর হক্ব- যারা একেবারেই ঘরের পাশে থাকে।
(ঘ) দূর প্রতিবেশীর হক্ব। যারা ঘরের পাশে নয় কিন্তু প্রতিবেশীর সীমার মধ্যেই বসবাস করে।
(ঙ) মুসলিম প্রতিবেশীর হক্ব
(চ) অমুসলিম প্রতিবেশীর হক্ব
(ছ) সাধারণভাবে দেশবাসী হক্ব। তাতে যত কাছের হবে তত অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে হক্ব আদায় করতে হবে।
(জ) শাসক শাসিতের হক্ব
(ঝ) অভাবী লোকের হক্ব
(ঞ) ইয়তিম বা পিতৃ-মাতৃহীন ছেলে-মেয়েদের হক্ব
(ট) মিসকীন বা উপার্জনে অক্ষম অন্ধ, খোঁড়া, বিধবা প্রভৃতিজনের হক্ব
(ঠ) ঋণগ্রস্ত মুসলিম ব্যক্তির হক্ব
(ড) দাস-দাসীর হক্ব
(ঢ) মুসাফির পথিকের হক্ব
(ণ) বন্দী মুসলিমদের হক্ব
(ত) ক্ষতিগ্রস্ত মুসলিমদের হক্ব
(থ) সাহায্য প্রার্থীদের হক্ব
(দ) অমুসলিমদের হক্ব
(ধ) সাধারণ মুসলিমদের হক্ব। চাই দেশের মুসলিম হোক বা বিদেশের মুসলিম হোক।
মুসলমানের একে অন্যের ওপর হক্ব সমূহঃ
১) পরস্পর সালাম বিনিময় করা।
২) দাওয়াত করলে তাতে যোগদান করা।
৩) পরস্পর দ্বীন শিক্ষা দেয়া ও শিক্ষা করা।
৪) পরস্পর সৎ উপদেশ দেয়া ও গ্রহণ করা।
৫) পরস্পর সাহায্য করা।
৬) কেউ হাঁচি দিয়ে আলহামদু লিল্লাহে বললে জবাবে ইয়ার হামু কাল্লাহ্ বলা।
৭) অসুস্থ ব্যক্তিকে দেখতে যাওয়া।
৮) কেউ মৃত্যুবরণ করলে দাফন কাজে অংশ নেয়া।
৯) নিজের জন্য যা পছন্দ করবে অন্যের জন্যও তা পছন্দ করা।
১০) নিজেরহাত ও জিহবা থেকে অন্যকে নিরাপদ রাখা।
১১) বিনম্র হওয়া। নিজেকে বড় মনে করে অন্যের প্রতি অহঙ্কার না করা।
১২) কারো বিরুদ্ধে কেউ কোন কুৎসা বললে তা না শুনা। কারণ থেকে পারে সে অপরাধ করেনি কিন্তু তাকে হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য অথবা দুর্নাম করেছে।
১৩) মনোবিবাদ ত্যাগ করা। অর্থাৎ মনের মধ্যে কারো প্রতি রাগ না রাখা। বরং তা মিটিয়ে ফেলা।
১৪) কাউকে বঞ্চিত না করা। অপরের উপকার করা।
১৫) ছোটদের স্নেহ করা ও বড়দের সম্মান করা।
১৬) সকল মুমিন মুসলিমদের সাথে মিলেমিসে থাকা, এতেই সমাজের লোক শান্তিতে বসবাস করতে পারে।
১৭) ওয়াদা করে তা ভঙ্গ না করা।
১৮) প্রত্যেক ব্যক্তিকে তার পদমর্যাদা অনুযায়ী সম্মান করা।
১৯) দুই মুসলিমের মাঝে বিবাদ মিমাংসা করে দেয়া।
২০) মুসলিম ভাইবোনদের দোষ-ত্রুটি গোপন রাখা।
২১) কারো দুর্নাম রটানো ও অপবাদ দেয়া থেকে বিরত থাকা।
২২) অন্যের জন্য সুপারিশ করা যাতে তার উপকার হয়।
📄 সৎ ও উত্তম প্রতিবেশী
মহানবী সা. বলেছেন,
إِنَّ اللَّهَ لَيَدْفَعُ بِالْمُسْلِمِ الصَّالِحِ عَنْ مِائَةِ أَهْلِ بَيْتٍ مِنْ جِيرَانِهِ الْبَلَاءَ
অর্থঃ ইবনু ওমর রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: মহানবী সা. বলেছেন, আল্লাহ্ তায়ালা একজন সৎকর্মশীল মুসলমানের কল্যাণে তার প্রতিবেশীদের মধ্য থেকে ১০০ টি পরিবারকে বিপদ-মসিবত থেকে রক্ষা করেন। এরপর তিনি সূরা আন্ নিসার ২৫ নং আয়াতের নিচের অংশটুকু তিলাওয়াত করেন-
وَلَوْلَا دَفْعُ اللَّهِ النَّاسَ بَعْضَهُمْ بِبَعْضٍ لَفَسَدَتِ الْأَرْضُ
অর্থঃ আল্লাহ্ তায়ালা বলেছেন, যদি কিছু লোককে অপর কিছু লোক দ্বারা প্রতিহত না করাতেন তাহলে পৃথিবী অরাজকতায় ভরে যেত। ( সূত্রঃ তারগীব ওয়াত-তারহীব ৩য় খণ্ড, হাদীস নং ১৩০৯ )
প্রতিবেশীর প্রকার সম্পর্কে মহানবী সা. বলেছেন,
الْجِيرَانُ ثَلَاثَةٌ فَجَارٌ لَهُ حَقٌّ وَجَارٌ لَهُ حَقَّانِ وَجَارٌ لَهُ ثَلَاثَةُ حُقُوقٍ فَأَمَّا الَّذِي لَهُ حَقٌّ وَاحِدٌ وَهُوَ أَدْنَى الْجِيرَانِ حَقًّا وَجَارٌ مُشْرِكٌ لَا رَحِمَ لَهُ لَهُ حَقُّ الْجِوَارِ وَأَمَّا الَّذِي لَهُ حَقَّانِ فَجَارٌ مُسْلِمٌ لَهُ حَقُّ الْإِسْلَامِ وَحَقُّ الْجِوَارِ وَأَمَّا الَّذِي لَهُ ثَلَاثَةُ حُقُوقٍ فَجَارٌ مُسْلِمٌ ذُو رَحِمٍ لَهُ حَقُّ الْإِسْلَامِ وَحَقُّ الْجِوَارِ وَحَقُّ الرَّحِمِ
অর্থঃ জাবির বিন আব্দুল্লাহ রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেছেন, রাসূল সা. বলেছেন: প্রতিবেশী তিন প্রকার: (১) কোন প্রতিবেশী রয়েছে যার মাত্র একটি হক্ব, আর সেটাই সর্বনিম্ন হক্ব (২) কোন প্রতিবেশী রয়েছে যার মাত্র দুইটি হক্ব রয়েছে; (৩) কোন প্রতিবেশী রয়েছে যার মাত্র তিনটি হক্ব রয়েছে। আর এটাই সর্বোত্তম প্রতিবেশীর হক্ব।
প্রথম প্রকারঃ এক হক্ব বিশিষ্ট প্রতিবেশী হল, অমুসলিম প্রতিবেশী- যার সাথে আত্মীয়তা নেই। তার জন্য শুধু প্রতিবেশীর হক্ব।
দ্বিতীয় প্রকারঃ দুই হক্ব বিশিষ্ট প্রতিবেশী হল, মুসলিম প্রতিবেশী- তার জন্য মুসলিম হওয়ার হক্ব ও প্রতিবেশী হক্ব।
তৃতীয় প্রকারঃ তিন হক্ব বিশিষ্ট প্রতিবেশী হল, মুসলিম আত্মীয় প্রতিবেশী- তার মুসলিম হওয়ার হক্ব, আত্মীয়তার হক্ব ও প্রতিবেশী হওয়ার হক্ব রয়েছে। (সূত্র: তাফসীর ইবনে কাসীর ১ম খণ্ড, ৬৫৫ পৃ:)
কত বাড়ি মিলে প্রতিবেশী হয় এ সম্পর্কে মহানবী সা. বলেছেন,
عَنِ الْحَسَنِ ؛ أَنَّهُ سُئِلَ عَنِ الْجَارِ ؟ فَقَالَ : أَرْبَعِينَ دَارًا أَمَامَهُ ، وَأَرْبَعِينَ خَلْفَهُ ، وَأَرْبَعِينَ عَنْ يَمِينِهِ ، وَأَرْبَعِينَ عَنْ يَسَارِهِ
অর্থঃ হাসান রা. থেকে বর্ণিত, তাঁকে প্রতিবেশী সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেনঃ নিজের ঘর থেকে সামনে চল্লিশ ঘর, পিছনের চল্লিশ ঘর, ডানের চল্লিশ ঘর এবং বামের চল্লিশ ঘর তোমাদের প্রতিবেশী। (সূত্র: বুখারী, আদাবুল মুফরাদ)
অনত্র মহানবী সা. বলেছেন,
أَنَّهُ لَا يَمْنَعُ جَارَهُ أَنْ يَغْرِزَ خَشَبَهُ فِي جِدَارِهِ
অর্থঃ হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূল সা. বলেছেন: এক প্রতিবেশী যেন নিজের দেয়ালের সাথে অপর প্রতিবেশীকে খুঁটি গাঁড়তে নিষেধ না করে। (বুখারী- হাদীস নং ২৪, মুসলিম)