📄 তাওবার হৃদয় বিদারক ঘটনা
“মা'য়েয বিন মালেক আল আসলামী রাসূল সা. এর কাছে এসে বললেন: হে রাসূল, আমি নিজের ওপর অবিচার করেছি এবং যিনা করেছি, আমি চাই আপনি আমাকে পবিত্র করবেন। রাসূল সা. তাকে ফিরিয়ে দেন। এরপর তিনি পরদিন আবার এসে বললেন হে রাসূল, আমি যিনা করেছি, রাসূল সা. তাকে দ্বিতীয়বার ফিরিয়ে দেন। এরপর রাসূল সা. তার গোত্রের কাছে লোক পাঠালেন, তিনি এসে জিজ্ঞাসা করলেন, তোমরা কি তার বুদ্ধিতে কোন সমস্যা আছে বলে মনে কর? তোমরা কি তাকে সুস্থ মনে কর? তারা বললেন, আমরা তাকে পরিপূর্ণ বুদ্ধিমান বলেই জানি, আমাদের মাঝে সংশোধনকর্মে অন্তর্ভুক্ত বলে দেখি। মা'য়েয তৃতীয়বার এলেন। রাসূল সা. আবারো তার কাছে মানুষ পাঠালেন। এসে তার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলেন। তারা বললেন, তার মাঝে কোন সমস্যা নেই। তার বুদ্ধিতেও কোন অসুবিধা নেই। এরপর যখন চতুর্থবার এলেন, রাসূল সা. তার জন্য একটি গর্ত করলেন, অতঃপর তাকে গর্তে ফেলার আদেশ দেন, এবং তাকে রজম ( পাথর দ্বারা মৃত্যু কার্যকর করার দণ্ডবিধি) করা হল। বর্ণনাকারী বলেছেন, এ ঘটনার পর গামিদিইয়্যা এসে বললেন, হে আল্লাহ্র রাসূল, আমি যিনা করেছি, আপনি আমাকে পবিত্র করুন, রাসূল সা. ফিরিয়ে দিলেন। এরপর পরদিন তিনি আবার এসে বললেন, হে আল্লাহ্র রাসূল, আপনি আমাকে ফিরিয়ে দিয়েছেন কেন? আপনি হয়ত আমাকে ফিরিয়ে দিয়েছেন যেভাবে মা'য়েককে ফিরিয়ে দিয়েছেন। আল্লাহ্র কসম আমি গর্ভবতী। রাসূল সা. বললেন, তাহলে এখন নয়, তুমি যাও, গিয়ে বাচ্চা প্রসব কর। বর্ণনাকারী বলেছেন, যখন সে বাচ্চা প্রসব করেছে একটি কাপড়ে টুকরায় করে তাকে নিয়ে রাসূলের কাছে এসে বলে এ বাচ্চা আমি জন্ম দিয়েছি। রাসূল সা. বললেন, যাও, গিয়ে তাকে দুধ ছাড়িয়েছো, বাচ্চাকে নিয়ে রাসূল সা. এর কাছে এল, সে সময় বাচ্চার হাতে রুটি জাতীয় একটি রুটির টুকরা ছিল, এসে বলে, হে রাসূল একে আমি দুধ ছাড়িয়েছি, সে এখন খাবার খেতে শিখেছে। তখন রাসূল সা. বাচ্চাটিকে একজন মুসলমান ব্যক্তির কাছে দিয়ে লোক রজমের আদেশ করেন, তার বুক পর্যন্ত গর্ত করা হল, এরপর লোকজনকে পাথর নিক্ষেপ করতে আদেশ করেন। সবাই পাথর মারে। এসময় খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ একটি পাথর নিয়ে তার মাথায় নিক্ষেপ করলে রক্তের ছিটা এসে খালেদের চেহারায় লেগে যায়, তাই তিনি তাকে গালি দেন। রাসূল সা. খালেদের গালি দিতে শুনে বললেন, খালেদ থাম! কসম ঐ সত্তার যার হাতে আমার প্রাণ, সে এমন তাওবা করেছে যা যাজনা উসুলকারীও করত তাকে ক্ষমা করে দেয়া হত। এরপর তার জানাযা পড়ার আদেশ দেন, তার জানাযা পড়া হল এবং দাফন করা হয়। (মুসলিম-৪৫২৭, আবু দাউদ-৪৪৪৪)
অপর এক বর্ণনায় রয়েছে, এরপর ওমর রা. বলেন হে রাসূল, আপনি তাকে রজম করেছেন আবার তার জানাযা নামায পড়ছেন! তখন রাসূল সা. বললেন, সে এমন তাওবা করেছে, যদি তা সব জন মদীনাবাসির মাঝে ভাগ করা হয় এরপরও তা যথেষ্ট হবে। সে আল্লাহ্র জন্য নিজের প্রাণ বিসর্জন দিয়েছে। তুমি কি এর চেয়ে উত্তম কোন তাওবা পেয়েছ? আবদুর রাজ্জাক তাঁর মুসান্নাফে বর্ণনা করেছেন। (সুনানুত তিরমিযি-১৪৩৫)
📄 তাওবার সালাতের বর্ণনা
মহানবী সা. বলেছেন-
وَإِنَّهُ حَدَّثَنِي أَبُو بَكْرٍ وَصَدَقَ أَبُو بَكْرٍ قَالَ سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ مَا مِنْ رَجُلٍ يُذْنِبُ ذَنْبًا ثُمَّ يَقُومُ فَيَتَطَهَّرُ ثُمَّ يُصَلِّي ثُمَّ يَسْتَغْفِرُ اللَّهَ إِلاَّ غَفَرَ لَهُ ثُمَّ قَرَأَ هَذِهِ الآيَةَ وَالَّذِينَ إِذَا فَعَلُوا فَاحِشَةً أَوْ ظَلَمُوا أَنْفُسَهُمْ ذَكَرُوا اللَّهَ فَاسْتَغْفَرُوا لِذُنُوبِهِمْ وَمَنْ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ إِلاَّ اللَّهُ وَلَمْ يُصِرُّوا عَلَى مَا فَعَلُوا وَهُمْ يَعْلَمُونَ (١٣٥)
অর্থ: “আবু বকর রা. থেকে বর্ণিত তিনি বলেছেন, আমি রাসূল সা. কে বলতে শুনেছি, যে কোন ব্যক্তি যখন কোন গুনাহ করে এরপর সে দণ্ডায়মান হয় এবং অজু করে, এরপর দুই রাকাত সালাত আদায় করে এরপর আল্লাহ্র কাছে ক্ষমার আবেদন করলে আল্লাহ তাকে মাফ করে দেন। হাদীসটি সুনানের ইমামগণ বর্ণনা করেছেন, সহিহুত তারগীব ওয়াত তারহীবঃ ১/২৮৪ এরপর তিনি রাসূল সা. এ আয়াতটি পাঠ করেন “আর তারা কখনও কোন অশ্লীল কাজ করে ফেলে বা কোন মন্দ কাজে জড়িয়ে নিজের ওপর অবিচার করে ফেললে আল্লাহকে স্মরণ করে এবং নিজের পাপের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে। আল্লাহ্ ছাড়া আর কে পাপ ক্ষমা করবে? আর তারা জানা অবস্থায় নিজ কৃতকর্মে করতে থাকে না। (আল ইমরান-১৩৫)
📄 আল্লাহ্র দয়া কতটুকু
কোন এক সৎ মানুষ একটি রাস্তায় চলছিল। পথে সে একটি দরজা খোলা দেখতে পেল। সে দরজার থেকে একটি হাত বের হল, একটি সাহায্য চাইছে ও কাঁদছে এবং তার মা তাকে পেছন থেকে তাড়াচ্ছে। এমনকি ছেলেটি বেরিয়ে পড়ে যা তার মুখোমুখি দরজাটি বন্ধ করে দিয়ে ঢুকে পড়ে। বাচ্চাটি সামান্য দূরে চলে যায়। এরপর চিন্তা করে সেখানে দাঁড়িয়ে থাকে। কিন্তু ওর থেকে তাকে তাড়িয়ে দেয়া হয়েছে এ ছাড়া সে কোন আশ্রয় জায়গা পেল না এবং তার মা ছাড়া কোন আশ্রয়দাতা পেল না। ফলে সে চিন্তিত ভগ্ন হৃদয়ে ফিরে এল। এসে দরজা বন্ধ পেল। তাই দরজাকে বালিশ বানিয়ে গাল দরজায় চৌকাঠে রেখে দেয় এবং তার দুই গালে অশ্রু ঝরঝর অবস্থায় ঘুমিয়ে পড়ে। একটু পর তার মা বের হল। এবং ছেলেকে এ অবস্থায় দেখে নিজেকে আটকে রাখতে না পেরে ছেলের ওপর পড়ে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরে চুমা দিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলে হে পুত্র, তুই আমাকে ছেড়ে কোথায় গিয়েছিলি। আমি ছাড়া তুই আর কে আশ্রয় দেবে? আমি কি তোকে বলিনি, আমার কথা অমান্য করিস না? তোর ওপর যে দয়া ও স্নেহ দিয়ে আল্লাহ্ আমাকে সৃষ্টি করেছেন এর বিপরীত আমি তোকে শাস্তি দিতে বাধ্য করিস না। এরপর মা তাকে ধরে ঘরে প্রবেশ করে।
অথচ রাসূল সা. বলেছেন,
فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم لَلَّهُ أَرْحَمُ بِعِبَادِهِ مِنْ هَذِهِ بِوَلَدِهَا
অর্থ: “অবশ্যই আল্লাহ তাঁর বান্দার ওপর এর চেয়ে বেশি দয়াবান।” (সহীহ মুসলিম-৭১১৫)
অর্থ: “বান্দা যখন আল্লাহ্র কাছে তাওবা করে তখন তিনি তার ওপর এ ব্যক্তির চেয়ে অনেক বেশি খুশি হন যে তার মরুভূমিতে সফররত ছিল। এ সময় সে তার উপাসনারত অবতরণ করে। সাথে রয়েছে তার বাহন যার ওপর তার খাবার ও পানীয় রয়েছে। এরপর সে একটি গাছের ছায়ায় আশ্রয় নেয় এবং তার মাথা গাছের নিচে নিচেই ঘুমিয়ে পড়ে। এরপর সে জাগ্রত হল তখন দেখে তার বাহনসহ চলে গিয়েছে। সে তার সন্ধানে করতে এদিক ওদিক কিছুই দেখতে পেল না। এরপর আরেকটি উদ্যানে এসে বসে তবু কিছু দেখতে পেলনা। এমনকি যখন তাকে প্রচন্ড গরম ও পিপাসায় পেল সে বলে: আমি যে জায়গায় ছিলাম সেখানে ঘুমিয়ে পড়ব নতুবা মারা যাব। সে তার বাহনসহ থেকে নিরাশ হয়ে গাছটির নিচে এসে তার হাত দিয়ে দেয়ালের কাছে দাঁড়ানো, সে তার নাকে বাঁশি টানছে, বাহনের ওপর তার পাথেয় খাবার ও পানীয় রয়েছে। অতএব সে তার লাগামটি ধরে নেয়। আল্লাহ্ তাঁর মুমিন বান্দার তাওবায় এ বাহন ও পাথেয় পাওয়া থেকে বেশি খুশি হন।” কয়েকটি সহীহ বর্ণনার সমষ্টি, দেখুন তারতীব সহীহুল জামি-৪/৩৬৮ (সহীহুল বুখারী-৫৯৪৯, সহীহুল মুসলিম- ৭১৩১)
📄 এক মহিলার গুনাহের জন্য ক্ষমা চাওয়ার দৃষ্টান্ত
মহানবী (সা.) বলেছেন,
عَنْ عِمْرَانَ بْنِ حُصَيْنٍ : أَنَّ امْرَأَةً مِنْ جُهَيْنَةَ أَتَتْ النَّبِيَّ -صلى الله عليه وسلم- وَهِيَ حُبْلَى مِنَ الزِّنَا فَقَالَتْ يَا رَسُولَ اللَّهِ أَصَبْتُ حَدًّا فَأَقِمْهُ عَلَىَّ. فَدَعَا نَبِيُّ اللَّهِ -صلى الله عليه وسلم- وَلِيَّهَا فَقَالَ « أَحْسِنْ إِلَيْهَا فَإِذَا وَضَعَتْ فَأْتِنِي بِهَا ». فَفَعَلَ فَأَمَرَ بِهَا نَبِيُّ اللَّهِ -صلى الله عليه وسلم- فَشُكَّتْ عَلَيْهَا ثِيَابُهَا ثُمَّ أَمَرَ بِهَا فَرُجِمَتْ ثُمَّ صَلَّى عَلَيْهَا فَقَالَ لَهُ عُمَرُ تُصَلِّى عَلَيْهَا يَا رَسُولَ اللَّهِ وَقَدْ زَنَتْ فَقَالَ « لَقَدْ تَابَتْ تَوْبَةً لَوْ قُسِمَتْ بَيْنَ أَهْلِ الْمَدِينَةِ لَوَسِعَتْهُمْ وَهَلْ وَجَدْتَ شَيْئًا أَفْضَلَ مِنْ أَنْ جَادَتْ بِنَفْسِهَا »
অর্থ: ইমরান ইবনু হুসাইন (রা.) থেকে বর্ণিত, জুহায়না গোত্রের এক মহিলা যিনার কারণে গর্ভবতী হয়ে রাসূলুল্লাহ্ (সা.) এর কাছে এসে বলে, হে আল্লাহ্র রাসূল! আমি যিনার গুনাহ করেছি, আমাকে এর শাস্তি দিন। তার অভিভাবককে ডেকে এনে নবী (সা.) বললেন, এর সাথে ভাল ব্যবহার করবে। সে সন্তান প্রসব করার পর তাকে আমার কাছে নিয়ে আসবে। এ ব্যক্তি তাই করে। এরপর নবী (সা.) তাকে যিনার শাস্তির আদেশ করলেন। তার শরীরের সাথে কাপড় ভালভাবে বেঁধে দেয়া হল এবং নির্দেশ অনুযায়ী তাকে পাথর মেরে হত্যা করা হল। রাসূলুল্লাহ্ (সা.) তার জানাযার সালাত আদায় করলেন। ওমর (রা.) বললেন, হে আল্লাহ্র রাসূল! এতো যিনা করেছে, আপনি তবুও এর জানাযার সালাত আদায় করছেন? রাসূলুল্লাহ্ (সা.) বললেন, সে এমন তাওবা করেছে যা ৭০ জন মদিনাবাসীর মাঝে ভাগ করে দেয়া হলেও তাদের জন্য তা যথেষ্ট হয়ে যেত। আল্লাহ্র জন্য নিজের প্রাণকে যে মহিলা স্বেচ্ছায় বিলিয়ে দেয় তার এমন তাওবার চেয়ে উত্তম কোন কাজ তোমার কাছে আছে কি? (মুসলিম হা/৪৫২৯)