📄 কিয়ামত দিবসে মানুষের অবস্থা
ক্বিয়ামত দিবসে মানুষের অবস্থা (أحوال الناس يوم القيامة)
(১) আল্লাহ বলেন, يَوْمَئِذٍ تُعْرَضُونَ لَا تَخْفَى مِنْكُمْ خَافِيَةٌ (۱۸) فَأَمَّا مَنْ أُوتِيَ كِتَابَهُ بِيَمِينِهِ فَيَقُولُ هَاؤُمُ اقْرَءُوا كِتَابِيَهْ (۱۹) إِنِّي ظَنَنْتُ أَنِّي مُلَاقٍ حِسَانِيَهُ (۲۰) فَهُوَ فِي عِيْشَة راضِيَة (۲۱) فِي جَنَّةِ عَالِيَةِ (۲۲) قُطُوفُهَا دَانِيَةٌ (۲۳) كُلُوا وَاشْرَبُوا هَنِيئًا، بِمَا أَسْلَمْتُمْ فِي الْأَيَّامِ الْحَالِيَةِ (٢٤) وَأَمَّا مَنْ أُوتِيَ كِتَابَهُ بِشِمَالِهِ فَيَقُولُ يَا لَيْتَنِي لَمْ أُوتَ كِتَابِيَة (٢٥) وَلَمْ أَدْرِ مَا حِسَابِيَهْ (٢٦) يَالَيْتَهَا كَانَتِ الْقَاضِيَةَ (۲۷) مَا أَغْنَى عَنِّي مَالِيَة (۲۸) هَلَكَ عَنِّي سُلْطَانِيَهْ (۲۹) خُذُوهُ فَغُلُّوهُ (۳۰) ثُمَّ الْجَحِيمَ صَلُّوهُ (۳۱) ثُمَّ فِي سِلْسِلَةٍ ذَرْعُهَا سَبْعُونَ ذِرَاعًا فَاسْلُكُوهُ (۳۲) إِنَّهُ كَانَ لَا يُؤْمِنُ بِاللَّهِ الْعَظِيمِ (۳۳) وَلَا يَحُضُّ عَلَى طَعَامِ الْمِسْكِيْنِ (٣٤) فَلَيْسَ لَهُ الْيَوْمَ هَاهُنَا حَمِيمٌ (٣٥) وَلَا طَعَامٌ إِلَّا مِنْ غِسْلِيْنِ (٣٦) لَا يَأْكُلُهُ إِلَّا الْخَاطِئُونَ - (الحاقة ١٨/٦٩-٣٧)
'সেদিন তোমাদেরকে (আল্লাহর সামনে) পেশ করা হবে এবং কোনকিছুই তোমাদের গোপন থাকবে না' (১৮)। 'অতঃপর যার আমলনামা তার ডান হাতে দেওয়া হবে, সে বলবে, এসো তোমরা আমার আমলনামা পড়ে দেখ'! (১৯) 'আমি নিশ্চিতভাবে জানতাম যে, আমি অবশ্যই হিসাবের সম্মুখীন হব' (২০)। 'অতঃপর সে সুখী জীবন যাপন করবে' (২১)। 'সুউচ্চ জান্নাতে' (২২)। 'যার ফলসমূহ থাকবে নাগালের মধ্যে' (২৩)। '(বলা হবে) তোমরা খুশীমনে খাও ও পান কর বিগত দিনে যেসব সৎকর্ম অগ্রিম প্রেরণ করেছিলে, তার প্রতিদান হিসাবে' (২৪)। 'পক্ষান্তরে যার আমলনামা তার বাম হাতে দেওয়া হবে, সে বলবে, হায়! যদি আমাকে এ আমলনামা না দেওয়া হ'ত!' (২৫) 'যদি আমি আমার হিসাব না জানতাম'! (২৬) 'হায়! মৃত্যুই যদি আমার শেষ পরিণতি হ'ত'! (২৭) 'আমার ধন-সম্পদ আমার কোন কাজে আসল না' (২৮)। 'আমার ক্ষমতা বরবাদ হয়ে গেছে' (২৯)। '(তখন ফেরেশতাদের বলা হবে) শক্তভাবে ধরো ওকে। অতঃপর (হাত সহ) গলায় বেড়ীবদ্ধ করো ওকে' (৩০)। 'অতঃপর জাহান্নামে প্রবেশ করাও ওকে' (৩১)। 'অতঃপর সত্তর হাত লম্বা শিকলে পেঁচিয়ে বাঁধো ওকে' (৩২)। 'সে মহান আল্লাহতে বিশ্বাসী ছিল না' (৩৩)। 'সে অভাবগ্রস্তকে খাদ্য দানে উৎসাহ প্রদান করত না' (৩৪)। 'অতএব আজকে এখানে তার কোন বন্ধু নেই' (৩৫)। 'আর তার জন্য কোন খাদ্য নেই কেবল দেহনিঃসৃত পুঁজ-রক্ত ব্যতীত' (৩৬)। 'যা কেউ খাবে না পাপীরা ব্যতীত' (হা-ক্কাহ ৬৯/১৮-৩৭)।
📄 কর্ম যার ফলাফল তার
কর্ম যার ফলাফল তার উপর বর্তাবে : (جزاء العمل لمن عمل
মুসলিমগণ বিশ্বাস পোষণ করেন যে, আখেরাতে প্রত্যেক মানুষ স্ব স্ব কর্ম অনুযায়ী ফলাফল প্রাপ্ত হবে। যেমন (১) আল্লাহ বলেন, مَنْ عَمِلَ صَالِحًا فَلِنَفْسِهِ وَمَنْ أَسَاءَ فَعَلَيْهَا وَمَا رَبُّكَ بِظَلَّامٍ لِّلْعَبِيدِ 'যে ব্যক্তি সৎকর্ম করে, সে তার নিজের জন্যই সেটা করে। আর যে ব্যক্তি অসৎকর্ম করে তার প্রতিফল তার উপরেই বর্তাবে। বস্তুতঃ তোমার প্রতিপালক তার বান্দাদের প্রতি যুলুমকারী নন' (হা-মীম সাজদাহ ৪১/৪৬; জাছিয়াহ ৪৫/১৫)। (২) তিনি আরও বলেন, وَلَا تَزِرُ وَازِرَةٌ وِزْرَ أُخْرَى ثُمَّ إِلَى رَبِّكُمْ مَرْجِعُكُمْ فَيُنَبِّئُكُمْ بِمَا كُنْتُمْ فِيهِ تَخْتَلِفُونَ 'কেউ কারু বোঝা বহন করবে না। অবশেষে তোমাদের প্রতিপালকের নিকট তোমাদের প্রত্যাবর্তন করতে হবে। অতঃপর তিনি তোমাদের জানিয়ে দিবেন যেসব বিষয়ে তোমরা মতভেদ করতে' (আন'আম ৬/১৬৪)।
وَكُلٌّ إِنْسَانِ أَلْزَمْنَاهُ طَائِرَهُ فِي عُنُقِهِ وَنُخْرِجُ لَهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ كِتَابًا يَلْقَاهُ مَنْشُورًا - اقْرَأْ كِتَابَكَ كَفَى بِنَفْسِكَ الْيَوْمَ عَلَيْكَ حَسِيبًا 'প্রত্যেক মানুষের কৃতকর্মকে আমরা তার গ্রীবালগ্ন করে রেখেছি। আর ক্বিয়ামতের দিন আমরা তাকে বের করে দেখাব একটি আমলনামা, যা সে খোলা অবস্থায় পাবে'। '(সেদিন আমরা বলব,) তুমি তোমার আমলনামা পাঠ কর। আজ তুমি নিজেই নিজের হিসাবের জন্য যথেষ্ট' (বনু ইস্রাঈল ১৭/১৩-১৪)।
(৪) আল্লাহ আরও বলেন, وَوُضِعَ الْكِتَابُ فَتَرَى الْمُجْرِمِينَ مُشْفِقِينَ مِمَّا فِيهِ وَيَقُولُونَ يَا وَيْلَتَنَا مَالِ هَذَا الْكِتَابِ لَا يُغَادِرُ صَغِيرَةً وَلَا كَبِيرَةً إِلَّا أَحْصَاهَا وَوَجَدُوا مَا عَمِلُوا حَاضِرًا وَّلَا يَظْلِمُ رَبُّكَ أَحَدًا - 'অতঃপর পেশ করা হবে আমলনামা। তখন তাতে যা আছে তার কারণে তুমি অপরাধীদের দেখবে আতংকগ্রস্ত। তারা বলবে, হায় আফসোস! এটা কেমন আমলনামা যে, ছোট-বড় কোন কিছুই ছাড়েনি, সবকিছুই গণনা করেছে? আর তারা তাদের কৃতকর্ম সামনে উপস্থিত পাবে। বস্তুতঃ তোমার প্রতিপালক কাউকে যুলুম করেন না' (কাহফ ১৮/৪৯)।
(৫) আল্লাহ বলেন, يَوْمَئِذٍ يَصْدُرُ النَّاسُ أَشْتَاتًا لِّيُرَوْا أَعْمَالَهُمْ - فَمَنْ يَعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ خَيْرًا يَرَهُ - وَمَنْ يَعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ شَرًّا يَرَة 'সেদিন মানুষ বিভিন্ন দলে প্রকাশ পাবে, যাতে তাদেরকে তাদের কৃতকর্ম সমূহ দেখানো যায়' (৬)। 'অতঃপর কেউ অণু পরিমাণ সৎকর্ম করলেও তা সে দেখতে পাবে' (৭)। 'আর কেউ অণু পরিমাণ মন্দকর্ম করলেও তা সে দেখতে পাবে' (যিলযাল ৯৯/৬-৮)।
(৬) তিনি বলেন, فَأَمَّا مَنْ ثَقُلَتْ مَوَازِينُهُ فَهُوَ فِي عِيشَةٍ رَّاضِيَةِ - وَأَمَّا مَنْ حَفَّتْ مَوَازِينُهُ - فَأُمُّهُ هَاوِيَةٌ 'অতঃপর যার ওযনের পাল্লা ভারি হবে' (৬)। 'সে (জান্নাতে) সুখী জীবন যাপন করবে' (৭)। 'আর যার ওযনের পাল্লা হালকা হবে' (৮)। 'তার ঠিকানা হবে 'হাভিয়াহ' (ক্বা-রে'আহ ১০১/৮-৯)। 'হাভিয়াহ' হ'ল জাহান্নামের অন্যতম নাম।
📄 বিচার দিবসের একটি চিত্র
বিচার দিবসের একটি চিত্র: রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) একদিন ছাহাবীদের বললেন,
أَتَدْرُونَ مَا الْمُفْلِسُ قَالُوا الْمُفْلِسُ فِينَا مَنْ لا دِرْهَمَ لَهُ وَلَا مَتَاعَ فَقَالَ إِنَّ الْمُفْلِسَ مِنْ أُمَّتِي يَأْتِي يَوْمَ الْقِيَامَةِ بِصَلَاةٍ وَصِيَامٍ وَزَكَاةٍ وَيَأْتِي قَدْ شَتَمَ هَذَا وَقَذَفَ هَذَا وَأَكَلَ مَالَ هَذَا وَسَفَكَ دَمَ هَذَا وَضَرَبَ هَذَا فَيُعْطَى هَذَا مِنْ حَسَنَاتِهِ وَهَذَا مِنْ حَسَنَاتِهِ فَإِنْ فَنِيَتْ حَسَنَاتُهُ قَبْلَ أَنْ يُقْضَى مَا عَلَيْهِ أُخِذَ مِنْ خَطَايَاهُمْ فَطُرِحَتْ عَلَيْهِ ثُمَّ طُرِحَ فِي النَّارِ-
'তোমরা কি জানো নিঃস্ব কে? সবাই বলল, আমাদের মধ্যে নিঃস্ব সেই ব্যক্তি যার কোন টাকা-পয়সা ও ধন-সম্পদ নেই। তখন তিনি বললেন, আমার উম্মতের মধ্যে নিঃস্ব সেই ব্যক্তি, যে দুনিয়া থেকে ছালাত-ছিয়াম- যাকাত ইত্যাদি আদায় করে আসবে। সাথে ঐসব লোকেরাও আসবে, যাদের কাউকে সে গালি দিয়েছে, কারো উপরে অপবাদ দিয়েছে, কারো মাল গ্রাস করেছে, কাউকে হত্যা করেছে বা কাউকে প্রহার করেছে। তখন ঐসব পাওনাদারকে ঐ ব্যক্তির নেকী থেকে পরিশোধ করা হবে। এভাবে পরিশোধ করতে করতে যদি তার নেকী শেষ হয়ে যায়, তখন ঐসব লোকদের পাপসমূহ এই ব্যক্তির উপর চাপানো হবে। অতঃপর তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে'। ৯৬
সেকারণ রাসূল (ছাঃ) স্বীয় উম্মতকে বলেন, مَنْ كَانَتْ لَهُ مَظْلَمَةٌ لِّأَحَدٍ مِّنْ عِرْضِهِ أَوْ شَيْءٍ فَلْيَتَحَلَّلْهُ مِنْهُ الْيَوْمَ، قَبْلَ أَنْ لَا يَكُونَ دِينَارٌ وَلَا دِرْهَمْ إِنْ كَانَ لَهُ عَمَلٌ صَالِحٌ أُخِذَ مِنْهُ بِقَدْرِ مَظْلَمَتِهِ، وَإِنْ لَّمْ تَكُنْ لَهُ حَسَنَاتٌ أُخِذَ مِنْ سَيِّئَاتِ صَاحِبِهِ فَحُمِلَ عَلَيْهِ - বা অন্য কোন বস্তুর ব্যাপারে তার প্রতি যুলুম করে, তবে সে যেন আজই তা মিটিয়ে নেয়; সেদিন আসার আগে, যেদিন কোন দীনার ও দিরহাম তার সঙ্গে থাকবে না। সেদিন যদি তার কোন নেক আমল থাকে, তবে তার যুলুম পরিমাণ নেকী সেখান থেকে নিয়ে নেওয়া হবে। আর যদি তার কাছে নেকী না থাকে, তবে মযলূম ব্যক্তির পাপসমূহ তার উপর চাপিয়ে দেওয়া হবে'। ৯৭
সেদিন কোন যালেম তার যুলুম গোপন করতে পারবে না। কেননা তার নিজ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গই তার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিবে। যেমন আল্লাহ বলেন, الْيَوْمَ نَخْتِمُ عَلَى أَفْوَاهِهِمْ وَتُكَلِّمُنَا أَيْدِيهِمْ وَتَشْهَدُ أَرْجُلُهُمْ بِمَا كَانُوا يَكْسِبُونَ 'আজ আমরা তাদের মুখে মোহর মেরে দেব। আর আমাদের সাথে কথা বলবে তাদের হাত এবং সাক্ষ্য দিবে তাদের পা, (দুনিয়াতে) যা তারা উপার্জন করেছিল সে বিষয়ে' (ইয়াসীন ৩৬/৬৫)। এছাড়া তার দেহচর্ম ও ত্বক সাক্ষ্য দিবে (হা-মীম সাজদাহ/ফুছছিলাত ৪১/২০-২১)। এমনকি যে মাটিতে সে বিচরণ করত, সে মাটিও তার বৃত্তান্ত বর্ণনা করবে (যিলযাল ৯৯/৪-৫)।
টিকাঃ
৯৬. মুসলিম হা/৫৮১; মিশকাত হা/৫১২৭-২৮ শিষ্টাচার' অধ্যায় 'যুলুম' অনুচ্ছেদ।
৯৭. বুখারী হা/২৪৪৯; মিশকাত হা/৫১২৬ 'যুলুম' অনুচ্ছেদ, রাবী আবু হুরায়রা (রাঃ)।
📄 ক্ষতিগ্রস্থ আমলকারী কে?
ক্ষতিগ্রস্ত আমলকারী কে? আল্লাহ বলেন, قُلْ هَلْ نُنَبِّئُكُمْ بِالْأَخْسَرِينَ أَعْمَالًا (۱۰۳) الَّذِينَ ضَلَّ سَعْيُهُمْ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَهُمْ يَحْسَبُونَ أَنَّهُمْ يُحْسِنُونَ صُنْعًا (١٠٤) أُولَئِكَ الَّذِينَ كَفَرُوا بِآيَاتِ رَبِّهِمْ وَلِقَائِهِ فَحَبِطَتْ أَعْمَالُهُمْ فَلَا نُقِيمُ لَهُمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَزْنًا (١٠٥) ذَلِكَ جَزَاؤُهُمْ جَهَنَّمُ بِمَا كَفَرُوا وَاتَّخَذُوا آيَاتِي وَرُسُلِي هُزُوًا (١٠٦) 'বলে দাও, আমরা কি তোমাদেরকে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত আমলকারীদের সম্পর্কে জানিয়ে দেব?' (১০৩) 'তারা হ'ল সেই সব লোক যাদের সকল প্রচেষ্টা পার্থিব জীবনে বিফলে গেছে। অথচ তারা ভেবেছে যে, তারা সৎকর্ম করছে' (১০১০)। 'ওরা হ'ল তারাই, যারা তাদের প্রতিপালকের আয়াত সমূহকে এবং তার সাথে সাক্ষাতকে অস্বীকার করে। ফলে তাদের সকল কর্ম নিস্ফল হয়ে গেছে। ক্বিয়ামতের দিন আমরা তাদের জন্য মীযানের পাল্লা খাড়া করব না' (১০৫)। 'জাহান্নামই তাদের প্রতিফল। কেননা তারা অবিশ্বাসী হয়েছে এবং আমার আয়াত সমূহকে ও আমার রাসূলদেরকে ঠাট্টার বস্তুরূপে গ্রহণ করেছে' (কাহফ ১৮/১০৩-১০৬)।