📄 মৃত্যু চিন্তা আধ্যাত্মিকি সৃষ্টি করে ও ঈমান বৃদ্ধি করে
মৃত্যুর চিন্তা আল্লাহভীতি সৃষ্টি করে ও ঈমান বৃদ্ধি করে ذِكْرُ الْمَوْتِ يُنْشِئُ التَّقْوَى وَيَزِيدُ الْإِيْمَانَ
রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) সম্ভবতঃ কবরপূজার শিরকের কথা ভেবে প্রথমে কবর যিয়ারত নিষিদ্ধ করেছিলেন। কিন্তু পরে অনুমতি দিয়ে বলেন, نَهَيْتُكُمْ عَنْ زِيَارَةِ الْقُبُورِ فَزُورُوهَا، فَإِنَّهَا تُذَكِّرُ الْمَوْتَ - ‘আমি তোমাদেরকে কবর যিয়ারত থেকে নিষেধ করেছিলাম। কিন্তু এখন তোমরা যিয়ারত কর’। 'কেননা এটি তোমাদেরকে মৃত্যুর কথা স্মরণ করিয়ে দেবে’। ৭০ তিনি বলেন, مَنِ اتَّبَعَ جَنَازَةَ مُسْلِمٍ إِيمَانًا وَاحْتِسَابًا ، وَكَانَ مَعَهُ حَتَّى يُصَلَّى عَلَيْهَا، وَيُفْرَغَ مِنْ دَفْنِهَا، فَإِنَّهُ يَرْجِعُ مِنَ الْأَجْرِ بِقِيرَاطَيْنِ، كُلُّ قِيرَاطٍ مِّثْلُ أُحُدٍ، وَمَنْ صَلَّى عَلَيْهَا ثُمَّ رَجَعَ قَبْلَ أَنْ تُدْفَنَ فَإِنَّهُ يَرْجِعُ بِقِيرَاطٍ - সাথে ও ছওয়াবের আশায় কোন মুসলিম মাইয়েতের জানাযার অনুসরণ করে এবং ছালাতে অংশগ্রহণ করা পর্যন্ত তার সঙ্গে থাকে ও দাফন কার্য শেষ করে, সে ব্যক্তি দুই ক্বীরাত্ব সমপরিমাণ নেকী নিয়ে ফিরে আসে। এক ক্বীরাত্ব হ'ল ওহোদ পাহাড়ের সমান। আর যে ব্যক্তি জানাযার ছালাত আদায় করে, অতঃপর দাফনের পূর্বে ফিরে আসে, সে ব্যক্তি এক ক্বীরাত্ব পরিমাণ নেকী নিয়ে ফিরে আসে'। ৭১
জানাযায় অংশগ্রহণ করলে নিজের জানাযার কথা স্মরণ হয়। অন্যকে কবরে শোয়ানো দেখে নিজের কবরে শোয়ার কথা মনে পড়ে। অন্যের অসহায় চেহারা দেখে নিজের মৃত্যুকরণ চেহারার কথা মনের মধ্যে উদয় হয়। যাতে মানুষের অহংকার চূর্ণ হয় এবং সে বিনয়ী হয়। অতঃপর সে পরপারে যাত্রার প্রস্তুতি গ্রহণে সচেষ্ট হয়। হযরত আনাস (রাঃ) বলেন, حَطَّ النَّبِيُّ - صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ - خُطُوْطًا فَقَالَ : هَذَا الأَمَلُ وَهَذَا أَجَلُهُ، فَبَيْنَمَا هُوَ كَذَلِكَ إِذْ جَاءَهُ الْخَطُ الْأَقْرَبُ ‘একদিন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) কতগুলি দাগ কাটলেন। অতঃপর বললেন, 'এটি মানুষের আকাঙ্ক্ষা ও এটি তার মৃত্যু। এর মধ্যেই মানুষ চলতে থাকে। এক সময় সে তার মৃত্যুর দাগের নিকটে এসে যায়'। ৭২ হযরত আব্দুল্লাহ ইবনু ওমর (রাঃ) বলেন, একদিন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) আমার কাঁধে হাত রেখে বললেন, كُنْ فِي الدُّنْيَا كَأَنَّكَ غَرِيبٌ أَوْ عَابِرُ - سبیل ‘তুমি দুনিয়াতে বসবাস কর যেন তুমি একজন আগন্তুক বা একজন মুসাফির'। রাবী ইবনু ওমর (রাঃ) বলতেন, إِذَا أَمْسَيْتَ فَلَا تَنْتَظِرِ الصباح وَإِذَا أَصْبَحْتَ فَلَا تَنْتَظِرِ الْمَسَاءَ، وَخُذْ مِنْ صِحْتِكَ لِمَرَضِكَ، وَمِنْ حَيَاتِكَ - لموتك 'যখন তুমি সন্ধ্যা করবে, তখন আর সকালের অপেক্ষা করো না। যখন সকাল করবে, তখন আর সন্ধ্যার অপেক্ষা করো না। তুমি তোমার অসুস্থতার পূর্বে সুস্থতাকে এবং মৃত্যুর পূর্বে জীবনকে কাজে লাগাও'।৭৩
টিকাঃ
৭০. মুসলিম হা/৯৭৭, ৯৭৬; মিশকাত হা/১৭৬২, ১৭৬৩; রাবী বুরাইদা ও আবু হুরায়রা (রাঃ)।
৭১. বুখারী হা/৪৭; মুসলিম হা/৯৪৫; মিশকাত হা/১৬৫১, রাবী আবু হুরায়রা (রাঃ)।
৭২. বুখারী হা/৬৪১৮; মিশকাত হা/৫২৬৯।
৭৩. বুখারী হা/৬৪১৬; মিশকাত হা/১৬০৪।
📄 জ্ঞানী মানুষদের কিছু উক্তি
নেককার ও বদকার প্রত্যেকেই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে এবং প্রত্যেকেই কবরে যাবে। কিন্তু সেখানে গিয়ে কেউ আগুনের খোরাক হবে এবং কেউ জান্নাতের সুবাতাস পেয়ে ধন্য হবে। কেউ পুনরুত্থান দিবস পর্যন্ত অন্ধ-বধির এক ভয়ংকর ফেরেশতার প্রচণ্ড হাতুড়িপেটা খাবে, কেউ জান্নাতের সুগন্ধিতে নব বিবাহিতের ন্যায় সুখনিদ্রায় ঘুমিয়ে যাবে। কেউ সংকীর্ণ কবরে পিষ্ট হবে। কারু জন্য কবর প্রশস্ত ও আলোকিত হবে। আবার কারু জন্য সেটি জাহান্নামের অগ্নিসজ্জা হবে। অতএব বুদ্ধিমান মানুষের সাবধান হওয়া উচিত। জ্ঞানী মানুষদের কিছু উক্তি (بعض أقوال الحكماء) (১) জ্যেষ্ঠ তাবেঈ কায়েস বিন আবু হাযেম (মৃ. ৯৮ হি.) বনু উমাইয়াদের জনৈক খলীফার দরবারে গেলে তিনি বলেন, হে আবু হাযেম! আমাদের কি হ'ল যে আমরা মৃত্যুকে অপসন্দ করছি? জওয়াবে তিনি বলেন, এটা এজন্য যে, আপনারা আপনাদের আখেরাতকে নষ্ট করছেন ও দুনিয়াকে আবাদ করছেন। সেকারণ আপনারা আবাদী স্থান থেকে অনাবাদী স্থানে যেতে চান না'। ৭৪ (২) খ্যাতনামা তাবেঈ হাসান বাছরী (২১-১১০ হি.) বলেন, হে আদম সন্তান! মুমিন ব্যক্তি সর্বদা ভীত অবস্থায় সকাল করে, যদিও সে সৎকর্মশীল হয়। কেননা সে সর্বদা দু'টি ভয়ের মধ্যে থাকে। (ক) বিগত পাপ সমূহের ব্যাপারে। সে জানেনা আল্লাহ সেগুলির বিষয়ে কি করবেন। (খ) মৃত্যুর ভয়, যা এখনো সামনে আছে। সে জানেনা আল্লাহ তখন তাকে কোন পরীক্ষায় ফেলবেন। অতএব আল্লাহ রহম করুন ঐ ব্যক্তির উপরে, যে এগুলি বিষয়ে গভীরভাবে চিন্তা করে...এবং নিজেকে প্রবৃত্তি পরায়ণতা হ'তে বিরত রাখে'। ৭৫ (৩) তিনি বলতেন, দুনিয়া তিনদিনের জন্য। গতকাল, যে তার আমল নিয়ে চলে গেছে। আগামীকাল, সেটা তুমি না-ও পেতে পার। আজকের দিন, এটি তোমার জন্য। অতএব তুমি এর মধ্যে আমল কর'। ৭৬
টিকাঃ
৭৪. আয়মান আশ-শা'বান, কায়ফা আছবাহতা (রিয়ায : মাকতাবা কাওছার ১৪৩৫/২০১৪), উক্তি সংখ্যা ৯, পৃ. ১২; ইবনু 'আসাকির (৪৯৯-৫৭১ হি.), তারীখু দিমাঞ্চু ২২/৩০ পৃ.। অত্র বইয়ে ৮১টির অধিক উক্তি সংকলিত হয়েছে।
৭৫. ঐ, উক্তি সংখ্যা ১০, পৃ. ১৩; ইবনুল জাওযী (৫১০-৫৯৭ হি.), আদাবুল হাসান বাছরী ১২৩ পৃ.।
৭৬. -في الدُّنْيَا ثَلَاثَةُ أَيَّامٍ : أَمَّا أَمْسِ فَقَدْ ذَهَبَ بِمَا فِيهِ وَأَمَّا غَدًا فَلَعَلَّكَ لَا تُدْرِكُهُ وَالْيَوْمُ فَاعْمَلْ فِيهِ উক্তি সংখ্যা ৩৯, পৃ. ৩৩; ইবনু আবিদুনিয়া (মৃ. ২৮১ হি.), আয-যুহদ, ক্রমিক ৪৫৮, পৃ. ১৯৭।
📄 দ্রুত সৎকর্ম সম্পাদন
(৪) জনৈক ব্যক্তি তাকে কুশল জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, ঐ ব্যক্তির অবস্থা কেমন থাকবে, যে সকাল-সন্ধ্যা মৃত্যুর প্রতীক্ষা করে? সে জানেনা আল্লাহ তার সাথে কি ব্যবহার করবেন'। ৭৭ (৫) তিনি যখন কোন জানাযা পড়াতেন, তখন কবরের মধ্যে উঁকি মেরে জোরে জোরে বলতেন, কত বড়ই না উপদেশদাতা সে। যদি সে জীবিত অন্তরগুলিকে তার অনুগামী করতে পারত!৭৮ (৬) তাঁকে একদিন জনৈক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করল, আপনি কেমন আছেন? জবাবে তিনি মুচকি হেসে বলেন, তুমি আমাকে আমার অবস্থা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করছ? আচ্ছা ঐ ব্যক্তিদের সম্পর্কে তোমার কি ধারণা, যারা একটি নৌকায় চড়ে সাগরে গেছে। অতঃপর মাঝ দরিয়ায় গিয়ে তাদের নৌকা ভেঙ্গে গেছে। তখন তারা যে যা পেয়েছে সেই টুকরা নিয়ে বাঁচার চেষ্টা করছে। লোকটি বলল, সেতো এক ভয়ংকর অবস্থা। হাসান বাছরী বললেন, আমার অবস্থা তাদের চাইতে কঠিন'। ৭৯
(৭) তাবেঈ বিদ্বান মুহাম্মাদ বিন ওয়াসে' আযদী আল-বাছরী (মৃ. ১২৩ হি.) সেনাপতি কুতায়বা বিন মুসলিম (৪৯-৯৬ হি.)-এর সঙ্গে খোরাসানে সাক্ষাৎ করলে তাঁকে বলা হ'ল, আপনি কিভাবে সকাল করেছেন? জবাবে তিনি বলেন, 'আমার মৃত্যু নিকটবর্তী, আকাংখা দূরবর্তী, আমল মন্দ'।৮০ (৮) আরেকবার তাঁকে জিজ্ঞেস করা হয়, আপনি কিভাবে সন্ধ্যা করেছেন? জবাবে তিনি বলেন, ঐ ব্যক্তি সম্পর্কে তোমার কি ধারণা, যে ব্যক্তি প্রতিদিন পরকালের পথ পাড়ি দিচ্ছে এক এক মনযিল করে?৮১
(৯) ছাহাবী আবুদ্দারদা (হি. পৃ. ৫৪-৩২ হি.) বলেন, তিনজন লোককে দেখলে আমার হাসি পায়। (ক) দুনিয়ার আকাঙ্ক্ষী। অথচ মৃত্যু তাকে খুঁজছে (খ) উদাসীন ব্যক্তি। অথচ আল্লাহ তার থেকে উদাসীন নন। (গ) অট্টহাস্যকারী। অথচ সে জানেনা যে, সে আল্লাহকে খুশী করতে পেরেছে না ক্রুদ্ধ করেছে? অতঃপর তিনি বলেন, তিনটি বস্তু আমাকে কাঁদায়। (ক) মুহাম্মাদ (ছাঃ) ও তাঁর সাথীদের থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া। (খ) মৃত্যুকালের ভয়ংকর অবস্থা। (গ) আল্লাহ্র সামনে দণ্ডায়মান হওয়া। যেদিন গোপন বস্তু সমূহ প্রকাশিত হয়ে পড়বে। অতঃপর আমি জানিনা আমি জান্নাতে যাব, না জাহান্নামে যাব'।৮২ (১০) বিখ্যাত তাবেঈ ও কূফার দীর্ঘ ষাট বছরের প্রধান বিচারপতি কাযী শুরাইহ-কে জিজ্ঞেস করা হ'ল আপনি আজ কিভাবে সকাল করেছেন? তিনি বললেন, এমন অবস্থায় যে, অর্ধেক মানুষ আমার উপর চরম ক্ষুব্ধ'।৮৩
(১১) প্রসিদ্ধ বিদ্বান ফুযায়েল বিন মাসউদ (১০৭-১৮৭ হি.)-কে জনৈক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করল, আপনি কেমন আছেন? জওয়াবে তিনি বললেন, যদি তুমি আমার দুনিয়া সম্পর্কে জিজ্ঞেস কর, তবে আমি বলব যে, দুনিয়া আমাদেরকে যেখানে খুশী নিয়ে চলেছে। আর যদি আখেরাত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে থাক, তাহ'লে ঐ ব্যক্তির অবস্থা কি জানবে যার পাপ বৃদ্ধি পেয়েছে ও নেক আমল কম হয়েছে। যার বয়স শেষ হয়ে যাচ্ছে, অথচ তার পরকালের জন্য পাথেয় সঞ্চিত হয়নি। মৃত্যুর জন্য প্রস্তুতি নেয়নি, তার জন্য বিনত হয়নি, তার জন্য পা বাড়ায়নি, তার জন্য আমলকে সৌন্দর্যমণ্ডিত করেনি। অথচ দুনিয়ার জন্য সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে চলেছে'?৮৪
(১২) আবু সুলায়মান দারানী (১৪০-২১৫ হি.) স্বীয় উস্তায উম্মে হারুণকে জিজ্ঞেস করেন, আপনি কেমন আছেন? উত্তরে তিনি বলেন, ঐ ব্যক্তি কেমন থাকবে যার রূহ অন্যের হাতে'? তিনি আরেকবার তাঁকে প্রশ্ন করেন, আপনি কি মৃত্যুকে ভালবাসেন? জবাবে তিনি বলেন, আমি কোন ব্যক্তির অবাধ্যতা করলে তার সাক্ষাৎ পসন্দ করি না। তাহ'লে আমি কিভাবে আল্লাহ্ সাক্ষাৎ পসন্দ করব, অথচ আমি তার অবাধ্যতা করছি?৮৬
(১৩) জনৈক জ্ঞানী ব্যক্তিকে জিজ্ঞেস করা হ'ল আপনি কিভাবে সকাল করলেন? তিনি বললেন, সকালে আমি আমার রবের দেওয়া রুযী খাই। আর আমি তার শত্রু ইবলীসের আনুগত্য করি'।৮৭ (১৪) আব্দুল্লাহ বিন আমর ইবনুল 'আছ (হি. পৃ. ৬-৬৩ হি.) বলেন, আল্লাহ্ ভয়ে এক ফোঁটা অশ্রুপাত আমার নিকট এক হাযার দীনার (স্বর্ণমুদ্রা) ছাদাক্বা করার চাইতে অধিক প্রিয়'।৮৮
রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, ক্বিয়ামতের দিন সাত শ্রেণীর লোক আল্লাহ্র ছায়াতলে আশ্রয় পাবে, তাদের মধ্যে এক শ্রেণীর হ'ল ঐ ব্যক্তি, যে আল্লাহকে নির্জনে স্মরণ করে। অতঃপর তার দু'চোখ বেয়ে অশ্রু প্রবাহিত হয়'।৮৯ (১৫) তাবেঈ বিদ্বান রবী' বিন খায়ছাম (মৃ. ৬৫ হি.) বাড়ীতে কবর খুঁড়ে রাখতেন। যেখানে তিনি দিনে একাধিকবার ঘুমাতেন। যাতে সর্বদা মৃত্যুর কথা মনে পড়ে'। তিনি বলতেন, 'যদি আমার অন্তর এক মুহূর্ত মৃত্যুর স্মরণ থেকে বিচ্যুত হয়, তাহ'লে তা আমাকে বিনষ্ট করে দেয়'। ৯০
(১৬) তাবেঈ বিদ্বান মুত্বারিফ বিন আব্দুল্লাহ (মৃ. ৯৫ হি.) বলেন, মৃত্যু সচ্ছল ব্যক্তির সুখ-সম্ভোগকে কালিমালিপ্ত করে দেয়। অতএব তুমি এমন সুখের সন্ধান কর, যেখানে কোন মৃত্যু নেই' (অর্থাৎ জান্নাত)।৯১ (১৭) ইব্রাহীম তায়মী (মৃ. ৯৫ হি.) বলেন, দু'টি বস্তু আমার দুনিয়ার স্বাদ বিনষ্ট করেছে। মৃত্যুর স্মরণ ও আল্লাহ্র সম্মুখে দণ্ডায়মান হওয়ার ভয়'।৯২ (১৮) জ্যেষ্ঠ তাবেঈ কা'ব আল-আহবার (মৃ. ৩২ হি.) বলতেন, যে ব্যক্তি মৃত্যুকে উপলব্ধি করে, দুনিয়ার বিপদাপদ ও দুশ্চিন্তা সমূহ তার নিকট তুচ্ছ হয়ে যায়'। ৯৩
(১৯) খলীফা ওমর বিন আব্দুল আযীয (৯৯-১০১ হি./৭১৭-৭২০ খৃ.) জনৈক আলেমকে বলেন, আপনি আমাকে উপদেশ দিন। তিনি বললেন, আপনিই প্রথম খলীফা নন, যিনি মৃত্যুবরণ করবেন। খলীফা বললেন, আরও উপদেশ দিন। তিনি বললেন, আদম পর্যন্ত আপনার বাপ-দাদাদের এমন কেউ ছিলেন না যিনি মৃত্যুবরণ করেননি। এবার আপনার পালা। একথা শুনে খলীফা কেঁদে ফেলেন'। তিনি প্রতি রাতে আলেম-ওলামাদের নিয়ে বৈঠক করতেন। যেখানে মৃত্যু, ক্বিয়ামত ও আখেরাত নিয়ে আলোচনা হ'ত। তখন তারা এমনভাবে ক্রন্দন করতেন, যেন তাদের সামনেই জানাযা উপস্থিত হয়েছে'।৯৪ (২০) জনৈক জ্ঞানী ব্যক্তি তার এক বন্ধুর নিকটে লেখেন, হে বন্ধু! ইহকালে মৃত্যুকে ভয় কর, পরকালে যাওয়ার আগে। যেখানে তুমি মৃত্যু কামনা করবে, অথচ মৃত্যু হবে না'। ৯৫
(التعجيل في العمل الصالح) :
অতএব হে মানুষ! মৃত্যু আসার আগেই প্রস্তুতি গ্রহণ করো। দুনিয়ার চাকচিক্যে ভুলো না। অবিশ্বাসীদের ধোঁকায় পড়ো না। আল্লাহ বলেন, ১ - تَعْجَلْ عَلَيْهِمْ إِنَّمَا نَعُدُّ لَهُمْ عَدًّا 'তুমি তাদের বিষয়ে ব্যস্ত হয়ো না। আমরা তো তাদের জন্য নির্ধারিত (মৃত্যুর) সময়কাল গণনা করছি' (মারিয়াম ১৯/৮৪)। অর্থাৎ আল্লাহ মানুষের প্রতিটি নিঃশ্বাস গণনা করেন। বান্দা কোন্ কাজে সেটি ব্যয় করছে, তার হিসাব রাখেন। সে তার মৃত্যুর দিকে আলোর গতিতে প্রতি সেকেণ্ডে ৩ লক্ষ কি.মি. বেগে এগিয়ে চলেছে। অতএব হে মানুষ! তুমি দ্রুত সৎকর্ম সম্পাদন কর। অন্যায় করে থাকলে তওবা কর। বলো না যে, কাজটি আমি আগামীকাল করব। যেমন আল্লাহ স্বীয় রাসূলকে وَلَا تَقُولَنَّ لِشَيْءٍ إِنِّي فَاعِلٌ ذَلِكَ غَدًا إِلَّا أَنْ يَشَاءَ اللهُ ... তুমি অবশ্যই কোন বিষয়ে বলো না যে, ওটা আমি আগামীকাল করব'। 'যদি আল্লাহ চান' বলা ব্যতিরেকে...' (কাহফ ১৮/২৩-২৪)। তিনি বলেন, أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَلْتَنْظُرْ نَفْسٌ مَا قَدَّمَتْ لِغَدٍ وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ خَبِيرٌ - بِمَا تَعْمَلُونَ 'হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর। আর প্রত্যেকে ভেবে দেখুক আগামীকালের (কিয়ামতের) জন্য সে কি অগ্রিম পাঠিয়েছে। তোমরা আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের কৃতকর্ম বিষয়ে সম্যক অবহিত' (হাশর ৫৯/১৮)।
টিকাঃ
৭৭. يَا أَبَا سَعِيدِ كَيْفَ أَنْتَ وَكَيْفَ حَالُكَ قَالَ كَيْفَ حَالُ مَنْ أَمْسَى وَأَصْبَحَ يَنتَظِرُ الموت ولا يَدْري مَا يَصنع به ঐ, উক্তি সংখ্যা ৪৯, পৃ. ৩৯; ইবনু হিব্বান (মৃ. ৩৫৪ হি.), রওযাতুল উক্বালা ৩২ পৃ..
৭৮. يَا لَهَا مِنْ عِظَةِ يَا لَهَا مِنْ عِظَةِ - وَمَدَّ صَوْتَهُ بِهَا لَوْ وَافَقَتْ قَلْبًا حَيًّا - ঐ, উক্তি সংখ্যা ৭৯, পৃ. ৫১-৫২; ইবনু আবিদ্দুনিয়া, ক্বাছরুল আমাল (قصر الأمل) ১৪৫ পৃ..
৭৯. ঐ, উক্তি সংখ্যা ১৭, পৃ. ২০; আবুবকর আল-মারূযী (মৃ. ২৭৫ হি.), আখবারুশ শুরুখ ওয়া আখলাকুহুম ১৮৩ পৃ..
৮০. قريبًا أَحَلِي، بَعِيدًا أَمَلِي، سَيِّئًا عَمَلِي - ঐ, উক্তি সংখ্যা ২৫, পৃ. ২৪; ইবনু 'আসাকির, তারীখু দিমাশকু ৫৬/১৫৭।
৮১. ما ظَنُّكَ برجلٍ يَرْتَحِلُ إلى الآخرة كُلُّ يومٍ مَرْحلةঐ উক্ত সংখ্যা ২০, পৃ. ২২; ইবনু 'আসাকির, তারীখু দিমাশকু ৫৬/১৬৯ পৃ.। ইতিহাস গ্রন্থটি মোট ৭০ খণ্ডে সমাপ্ত।
৮২. أَضْحَكَنِي ثَلَاثَ وَأَبْكَانِي ثَلَاثَ : أَصْحَكَنِي مُؤَمِّلُ دُنْيَا وَالْمَوْتُ يَطْلُبُهُ، وَغَافِلٌ وَلَيْسَ بِمَعْفُولٍ عَنْهُ وَصَاحِكَ بِمِلْءِ فِيهِ وَلَا يَدْرِي أَرْضَى اللَّهُ أَمْ أَسْخَطَهُ؟ وَأَبْكَانِي فِرَاقُ الْأَحِيَّةِ مُحَمَّدٍ وَحِزْبِهِ وَهَوْلُ الْمَطْلَعِ عِنْدَ غَمَرَاتِ الْمَوْتِ وَالْوُقُوفُ بَيْنَ يَدَيِ اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ يَوْمَ تَبْدُو السَّرِيرَةُ عَلَانِيَةً، ثُمَّ لَا أَدْرِي إِلَى الْجَنَّةِ أَمْ إِلَى النَّارِ؟ ঐ, উক্তি সংখ্যা ২২, পৃ. ২১; ইবনুল মুবারক (১১৮-১৮১ হি.), আয-যুহদ (বৈরূত), ক্রমিক ২৪৯, পৃ. ১/৮৪।
৮৩. أَصْبَحْتُ وَنَصْفُ النَّاسِ عَلَى غِضَابٌ ঐ, উক্তি সংখ্যা ২৩, পৃ. ২৩; আবু সুলায়মান আল-খাত্ত্বাবী (৩১৯-৩৮৮ হি.), গারীবুল হাদীছ ১/৫০৩। কুফার খ্যাতনামা ক্বাষী শুরাইহ ছিলেন অদ্বিতীয় ন্যায়বিচারক হিসাবে প্রসিদ্ধ। একবার এক আসামীর যামিন হওয়ার পর আসামী পালালে যামিনদার নিজের ছেলেকে তিনি জেলে পাঠান ও তার জন্য নিজে জেলখানায় খাবার নিয়ে যান। ক্ষুধার্ত ও রাগান্বিত হ'লে তিনি এজলাস থেকে উঠে যেতেন। একবার একজনকে চাবুক মারলে পরে ভুল বুঝতে পেরে তিনি নিজের পিঠ পেতে দিয়ে তাকে তার বদলা দিয়ে দেন' (আত-তাবাক্বাতুল কুবরা ৬/১৩১-১৪৪)। সুয়ূতী বর্ণনা করেন, ক্বাষী শুরাইহ বিন হারিছ বিন কায়েস আল-কিন্দী রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর যুগ পেয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর সাথে সাক্ষাৎ ঘটেনি। তিনি হযরত ওমর, ওছমান, আলী ও মু'আবিয়া (রাঃ) সহ হাজ্জাজ বিন ইউসুফ-এর যুগ (৭৬-৯৬ হি.) পর্যন্ত একটানা ৬০ বছর বিচারপতির দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ১২০ বছর বেঁচেছিলেন। মৃত্যুর একবছর পূর্বে দায়িত্ব হ'তে অব্যাহতি নেন। তাঁর মৃত্যুর সন বিষয়ে ৭৮ হি., ৮০, ৮২, ৮৭, ৯৩, ৯৬, ৯৭ ও ৯৯ বিভিন্ন মতভেদ রয়েছে (সুয়ূতী, তাবাকাতুল হুফ্ফায (কায়রো ১৩৯২/১৯৭৩) জীবনী ক্রমিক ৪২, পৃঃ ২০)।
৮৪. প্রাগুক্ত, উক্তি সংখ্যা ২৯, পৃ. ২৭; আবু নু'আইম (৩৩৬-৪৩০ হি.), হিলইয়াতুল আউলিয়া ৮/৮৫-৮৬।
৮৫. يَا أُمَّ هَارُونَ كَيْفَ أَصْبَحْتِ ؟ قَالَتْ كَيْفَ أَصْبَحُ مَنْ قَلْبُهُ فِي يَدِ غَيْرِهِ - ঐ, উক্তি সংখ্যা ৪৫, পৃ. ৩৭; ইবনু 'আসাকির, তারীখু দিমা ৭০/২৬৬।
৮৬. أَتُحِبِّينَ الْمَوْتَ؟ قَالَتْ لَا ، قُلْتُ لِمَ؟ قَالَتْ لَوْ عَصَيْتُ آدَمِيًّا مَا اسْتَهَيْتُ لِقَاءَهُ، فَكَيْفَ أُحِبُّ لقاءة وَقَدْ عَصِيتُهُ؟ আবু হামেদ আল-গাযালী (৪৫০-৫০৫ হি.), এহইয়াউ উলুমিদ্দীন ৭/১৩৯।
৮৭. كيف أصبحْتَ؟ قَالَ أَصْبَحْتُ آكُلُ رِزْقَ رَبِّي وَأَطِيعُ عَدُوَّهُ إِبْلِيسَ - ঐ, উক্তি সংখ্যা ৫৭, পৃ. ৪২; গাযালী, ঐ, ৩/১৬৮।
৮৮. لأَن أَدْمَعَ دَمْعَةً مِنْ حَشِيَةِ اللَّهِ أَحَبُّ إِلَى مِنْ أَن أَتَصَدَّقَ بِأَلْفِ دِينَارٍ - বায়হাক্বী (৩৮৪-৪৫৮ হি.(, শু'আবুল ঈমান হা/৮৪২।
৮৯. وَرَجُلٌ ذَكَرَ اللَّهَ خَالِيًّا فَفَاضَتْ عَيْنَاهُ বুখারী হা/৬৬০; মুসলিম হা/১০৩১; মিশকাত হা/৭০১, রাবী আবু হুরায়রা (রাঃ)।
৯০. لَوْ فَارَقَ ذِكْرُ الْمَوْتِ قَلْبِي سَاعَةَ فَسَدَ عَلَيَّ গাযালী, এহইয়াউ উলুমিদ্দীন ৭/১৩৯; আবু নু'আইম, হিলইয়াতুল আউলিয়া ২/১১৬।
৯১. গাযালী, এহইয়াউ উলুমিদ্দীন ৭/১৩৯।
৯২. ঐ, ৭/১৩৮।
৯৩. مَنْ عَرَفَ الْمَوْتَ هَانَتْ عَلَيْهِ مَصَائِبُ الدُّنْيَا وَهُمُومُهَا - ঐ, ৭/১৩৮।
৯৪. ঐ, ৭/১৩৯।
৯৫. يَا أَخِي إِحْذَرِ الْمَوْتَ فِي هَذِهِ الدَّارِ قَبْلَ أَنْ تَصِيرَ إِلَى دَارٍ تَتَمَنَّى فِيْهَا الْمَوْتَ فَلَا تَجِدُهُ - ঐ, ৭/১৩৯।
📄 কিয়ামত দিবসে মানুষের অবস্থা
ক্বিয়ামত দিবসে মানুষের অবস্থা (أحوال الناس يوم القيامة)
(১) আল্লাহ বলেন, يَوْمَئِذٍ تُعْرَضُونَ لَا تَخْفَى مِنْكُمْ خَافِيَةٌ (۱۸) فَأَمَّا مَنْ أُوتِيَ كِتَابَهُ بِيَمِينِهِ فَيَقُولُ هَاؤُمُ اقْرَءُوا كِتَابِيَهْ (۱۹) إِنِّي ظَنَنْتُ أَنِّي مُلَاقٍ حِسَانِيَهُ (۲۰) فَهُوَ فِي عِيْشَة راضِيَة (۲۱) فِي جَنَّةِ عَالِيَةِ (۲۲) قُطُوفُهَا دَانِيَةٌ (۲۳) كُلُوا وَاشْرَبُوا هَنِيئًا، بِمَا أَسْلَمْتُمْ فِي الْأَيَّامِ الْحَالِيَةِ (٢٤) وَأَمَّا مَنْ أُوتِيَ كِتَابَهُ بِشِمَالِهِ فَيَقُولُ يَا لَيْتَنِي لَمْ أُوتَ كِتَابِيَة (٢٥) وَلَمْ أَدْرِ مَا حِسَابِيَهْ (٢٦) يَالَيْتَهَا كَانَتِ الْقَاضِيَةَ (۲۷) مَا أَغْنَى عَنِّي مَالِيَة (۲۸) هَلَكَ عَنِّي سُلْطَانِيَهْ (۲۹) خُذُوهُ فَغُلُّوهُ (۳۰) ثُمَّ الْجَحِيمَ صَلُّوهُ (۳۱) ثُمَّ فِي سِلْسِلَةٍ ذَرْعُهَا سَبْعُونَ ذِرَاعًا فَاسْلُكُوهُ (۳۲) إِنَّهُ كَانَ لَا يُؤْمِنُ بِاللَّهِ الْعَظِيمِ (۳۳) وَلَا يَحُضُّ عَلَى طَعَامِ الْمِسْكِيْنِ (٣٤) فَلَيْسَ لَهُ الْيَوْمَ هَاهُنَا حَمِيمٌ (٣٥) وَلَا طَعَامٌ إِلَّا مِنْ غِسْلِيْنِ (٣٦) لَا يَأْكُلُهُ إِلَّا الْخَاطِئُونَ - (الحاقة ١٨/٦٩-٣٧)
'সেদিন তোমাদেরকে (আল্লাহর সামনে) পেশ করা হবে এবং কোনকিছুই তোমাদের গোপন থাকবে না' (১৮)। 'অতঃপর যার আমলনামা তার ডান হাতে দেওয়া হবে, সে বলবে, এসো তোমরা আমার আমলনামা পড়ে দেখ'! (১৯) 'আমি নিশ্চিতভাবে জানতাম যে, আমি অবশ্যই হিসাবের সম্মুখীন হব' (২০)। 'অতঃপর সে সুখী জীবন যাপন করবে' (২১)। 'সুউচ্চ জান্নাতে' (২২)। 'যার ফলসমূহ থাকবে নাগালের মধ্যে' (২৩)। '(বলা হবে) তোমরা খুশীমনে খাও ও পান কর বিগত দিনে যেসব সৎকর্ম অগ্রিম প্রেরণ করেছিলে, তার প্রতিদান হিসাবে' (২৪)। 'পক্ষান্তরে যার আমলনামা তার বাম হাতে দেওয়া হবে, সে বলবে, হায়! যদি আমাকে এ আমলনামা না দেওয়া হ'ত!' (২৫) 'যদি আমি আমার হিসাব না জানতাম'! (২৬) 'হায়! মৃত্যুই যদি আমার শেষ পরিণতি হ'ত'! (২৭) 'আমার ধন-সম্পদ আমার কোন কাজে আসল না' (২৮)। 'আমার ক্ষমতা বরবাদ হয়ে গেছে' (২৯)। '(তখন ফেরেশতাদের বলা হবে) শক্তভাবে ধরো ওকে। অতঃপর (হাত সহ) গলায় বেড়ীবদ্ধ করো ওকে' (৩০)। 'অতঃপর জাহান্নামে প্রবেশ করাও ওকে' (৩১)। 'অতঃপর সত্তর হাত লম্বা শিকলে পেঁচিয়ে বাঁধো ওকে' (৩২)। 'সে মহান আল্লাহতে বিশ্বাসী ছিল না' (৩৩)। 'সে অভাবগ্রস্তকে খাদ্য দানে উৎসাহ প্রদান করত না' (৩৪)। 'অতএব আজকে এখানে তার কোন বন্ধু নেই' (৩৫)। 'আর তার জন্য কোন খাদ্য নেই কেবল দেহনিঃসৃত পুঁজ-রক্ত ব্যতীত' (৩৬)। 'যা কেউ খাবে না পাপীরা ব্যতীত' (হা-ক্কাহ ৬৯/১৮-৩৭)।