📄 আল্লাহর দীদার কামনা
আল্লাহর দীদার কামনা )رجاء لقاء الله( :
আল্লাহ্ প্রিয় বান্দারা সর্বদা আল্লাহ্ সাক্ষাৎ লাভের জন্য উন্মুখ থাকে। আর সেকারণেই আমাদের রাসূল মুহাম্মাদ (ছাঃ) মৃত্যুর প্রাক্কালে কেবলই বলেছিলেন, - اَللَّهُمَّ الرَّفِيقَ الْأَعْلَي 'হে আল্লাহ! হে সর্বোচ্চ বন্ধু'! আর এটাই ছিল তাঁর শেষ কথা। হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেন, এর দ্বারা আমি বুঝলাম যে, এখন তিনি আর আমাদের পসন্দ করবেন না'।৫৯
নিঃসন্দেহে আল্লাহ্ দীদার ও তার দর্শন কেবল জান্নাতীরাই লাভ করবে, জাহান্নামীরা নয়। আল্লাহ বলেন كَلًّا إِنَّهُمْ عَنْ رَّبِّهِمْ يَوْمَئِذٍ لَّمَحْجُوبُوْنَ - ثُمَّ - إِنَّهُمْ لَصَالُو الْجَحِيمِ 'কখনই না। তারা সেদিন তাদের প্রতিপালকের দর্শন থেকে বঞ্চিত হবে'। 'অতঃপর তারা অবশ্যই জাহান্নামে প্রবেশ করবে' (মুত্বাফফেফীন ৮৩/১৫-১৬)।
অনেক মানুষ মৃত্যু কামনা করে। কিন্তু তাতে আল্লাহর দীদার লাভের আকাঙ্ক্ষা থাকে না। ঐ মৃত্যু তার জন্য ক্ষতির লক্ষণ। সেকারণ রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, لَا تَقُوْمُ السَّاعَةُ حَتَّى يَمُرَّ الرَّجُلُ بِقَبْرِ الرَّجُلِ فَيَقُولُ يَا لَيْتَنِي -مَكَانَهُ مَا به حُبُّ لِقَاءِ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ 'অতদিন কিয়ামত হবে না, যতদিন না কোন ব্যক্তি কারু কবরের পাশ দিয়ে যাবে এবং বলবে, হায় যদি আমি তোমার স্থানে হ'তাম! অথচ তার মধ্যে আল্লাহ্ সাক্ষাৎ লাভের আকাঙ্ক্ষা থাকবে না'।৬০ অন্য বর্ণনায় এসেছে, لَيْسَ بهِ الدِّينُ إِلَّا الْبَلَاء তার মধ্যে দ্বীন থাকবে না বিপদের ভয় ব্যতীত'। অর্থাৎ আল্লাহর দীদার লাভের জন্য সে মৃত্যু কামনা করবে না। বরং দুনিয়ার কষ্ট থেকে বাঁচার জন্য সে মৃত্যু কামনা করবে। এরূপ মৃত্যু আদৌ আল্লাহ্ কাম্য নয়।
বস্তুতঃ দুনিয়াদাররা দুনিয়া ছাড়তে চায় না। তারা এখানকার ক্ষণস্থায়ী আরাম-আয়েশ থেকে বের হ'তে চায় না। পক্ষান্তরে ঈমানদারগণ দুনিয়ার চাইতে আখেরাতকে ভালবাসেন। তারা এখানকার কষ্ট-মুছীবতকে হাসিমুখে বরণ করেন আখেরাতে চিরস্থায়ী শান্তি লাভের জন্য। এ কারণেই বলা হয়েছে, الدُّنْيَا سِحْنُ الْمُؤْمِنِ وَجَنَّةُ الْكَافِرِ 'দুনিয়া মুমিনের জন্য কারাগার ও কাফেরের জন্য জান্নাত সদৃশ'। ৬২ আর তাই মুমিন দ্রুত দুনিয়া ছেড়ে আখেরাতে যেতে চায় তার প্রিয়তমের সাক্ষাৎ লাভের জন্য। ঠিক যেমন কারাবন্দী বা প্রবাসী ব্যক্তি পাগলপারা হয়ে ছুটে আসে তার পরিবার ও প্রিয়তম সাথীদের কাছে। এখানে মৃত্যু কামনা নয়। বরং প্রিয়তমের দীদার কামনাই মুখ্য। তাই রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, - مَنْ كَرِهَ لِقَاءَ اللَّهِ كَرِهَ اللَّهُ لِقَاءَهُ 'যে ব্যক্তি আল্লাহ্র সাথে সাক্ষাতকে অপসন্দ করে, আল্লাহ তার সাক্ষাতকে অপসন্দ করেন'। ৬০ ফলে আল্লাহ যে কাজ পসন্দ করেন, মুমিন সর্বদা সে কাজেই লিপ্ত থাকে। যে কাজ তিনি পসন্দ করেন না, মুমিন সে কাজ কখনই করে না। যদিও শয়তান তাকে তা করার জন্য বারবার প্রলুব্ধ করে।
ফَمَنْ كَانَ يَرْجُو لِقَاءَ رَبِّهِ فَلْيَعْمَلْ عَمَلاً صَالِحًا وَلَا يُشْرِكْ - بعِبَادَةِ رَبِّهِ أَحَدًا ....অতএব যে ব্যক্তি তার প্রভুর সাক্ষাৎ কামনা করে। সে যেন সৎকর্ম সম্পাদন করে এবং তার পালনকর্তার ইবাদতে কাউকে শরীক না করে' (কাহফ ১৮/১১০)। অর্থাৎ লোক দেখানো বা লোককে শুনানোর জন্য ইবাদত না করে, বরং সে যেন খালেছ অন্তরে স্রেফ আল্লাহকে রাযী-খুশী করার জন্য ইবাদত করে। নইলে সেটা 'রিয়া' হবে, যা ছোট শিরক। ৬৪ যা হ'ল কবীরা গোনাহ সমূহের মধ্যে সবচেয়ে বড় কবীরা গোনাহ। যার ফলে উক্ত লোক দেখানো ইবাদত আল্লাহর দরবারে কবুল হবে না।
সেদিন খুশীমনে মুমিন বান্দা তার প্রতিপালকের সামনে নেকীর ডালি নিয়ে সে হাযির হবে। অন্যদিকে তার প্রতিপালক খুশী হয়ে তাকে পুরস্কারের ডালি ভরে দিবেন। যেমন আল্লাহ বলেন, وَاتَّقُوا يَوْمًا تُرْجَعُوْنَ فِيْهِ إِلَى اللَّهِ ثُمَّ تُوَفَّى كُلُّ نَفْسٍ مَّا كَسَبَتْ وَهُمْ لَا يُظْلَمُوْنَ 'আর তোমরা ঐ দিনকে ভয় কর, যেদিন তোমরা সকলে আল্লাহর নিকটে ফিরে যাবে। অতঃপর সেদিন প্রত্যেকে স্ব স্ব কর্মের ফল পুরোপুরি পাবে এবং তাদের প্রতি কোনরূপ অবিচার করা হবে না' (বাক্বারাহ ২/২৮১)। বস্তুতঃ এটিই ছিল বান্দার প্রতি সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ্ প্রেরিত সর্বশেষ বাণী। যা রাসূল (ছাঃ)-এর মৃত্যুর মাত্র ৭ বা ২১ দিন পূর্বে নাযিল হয় (কুরতুবী)। শুধু তাই নয়, ক্বিয়ামতের দিন আল্লাহ মুমিনদের 'সালাম' দিবেন। যেমন বলা হয়েছে, سَلَامٌ قَوْلًا مِّنْ رَّبِّ -رَّحِيمٍ 'অসীম দয়ালু প্রতিপালকের পক্ষ হ'তে তাদেরকে 'সালাম' বলে সম্ভাষণ জানানো হবে' (ইয়াসীন ৩৬/৫৮)।
পাপ-পঙ্কিলতায় ভরা এ পৃথিবীকে মুমিন তার জন্য পরীক্ষাস্থল মনে করে। আল্লাহ তাকে পরীক্ষার জন্য যতদিন চাইবেন, ততদিন সে এখানে থাকবে সর্বোচ্চ ধৈর্য্যের সাথে, সর্বোচ্চ নেকী সঞ্চয়ের উদ্দেশ্যে। জনৈক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে জিজ্ঞেস করল, يَا رَسُولَ اللَّهِ أَيُّ النَّاسِ خَيْرٌ؟ قَالَ : مَنْ طَالَ عُمُرُهُ وَحَسُنَ عَمَلُهُ . قَالَ : فَأَيُّ النَّاسِ شَرٌّ؟ قَالَ : مَنْ طَالَ عُمُرُهُ وَسَاءَ عَمَلُهُ 'কোন ব্যক্তি উত্তম? তিনি বললেন, যার বয়স বৃদ্ধি পেল এবং আমল সুন্দর হ'ল। পুনরায় সে জিজ্ঞেস করল, কোন ব্যক্তি সবচেয়ে মন্দ? জবাবে রাসূল (ছাঃ) বললেন, যার বয়স বৃদ্ধি পেল এবং আমল মন্দ হ'ল'। ৬৫
মাঝে-মধ্যে আল্লাহ তার নেককার বান্দাদের কঠিন বিপদে ফেলেন বা মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরিয়ে আনেন, তাকে সাবধান করার জন্য। যাতে সে আবার পূর্ণোদ্যমে নেকী অর্জনে লিপ্ত হয়। জান্নাতের সর্বোচ্চ 'তাসনীম' ঝর্ণার মিশ্রণযুক্ত পানীয় লাভের জন্য সে যেন প্রতিযোগিতা করে। যেমন আল্লাহ বলেন, تَعْرِفُ فِي وُجُوهِهِمْ نَضْرَةَ النَّعِيمِ - يُسْقَوْنَ مِنْ رَّحِيقٍ مَّحْتُوْمٍ خِتَامُهُ مِسْكَ، وَفِي ذَلِكَ فَلْيَتَنَافَسِ الْمُتَنَافِسُونَ وَمِزَاجُهُ مِنْ CORE اي تسنيم - عَيْنًا يَشْرَبُ بِهَا الْمُقَرَّبُوْنَ ‘তুমি তাদের চেহারাসমূহে স্বচ্ছন্দের প্রফুল্লতা দেখতে পাবে’ (২৪)। ‘তাদেরকে মোহরাংকিত বিশুদ্ধ পানীয় পান করানো হবে’ (২৫)। ‘তার মোহর হবে মিশকের। আর এরূপ বিষয়েই প্রতিযোগীদের প্রতিযোগিতা করা উচিত’ (২৬)। ‘আর তাতে মিশ্রণ থাকবে তাসনীমের’ (২৭)। ‘এটি একটি ঝর্ণা, যা থেকে পান করবে নৈকট্যশীলগণ’ (মুত্বাফফেফীন ৮৩/২৪-২৮)।
টিকাঃ
৫৯. বুখারী হা/৬৩৪৮; মুসলিম হা/২৪৪৪; মিশকাত হা/৫৯৬৪; সীরাতুর রাসূল (ছাঃ) ৩য় মুদ্রণ ৭৪৩ পৃ..
৬০. আহমাদ হা/১০৮৭৮, রাবী আবু হুরায়রা (রাঃ); ছহীহাহ হা/৫৭৮।
৬১. মুসলিম হা/১৫৭; মিশকাত হা/৫৪৪৫, রাবী আবু হুরায়রা (রাঃ)।
৬২. মুসলিম হা/২৯৫৬; মিশকাত হা/৫১৫৮ 'হৃদয় গলানো' অধ্যায়, রাবী আবু হুরায়রা (রাঃ)।
৬৩. বুখারী হা/৬৫০৮; মুসলিম হা/২৬৮৩; মিশকাত হা/১৬০১, রাবী উবাদাহ বিন ছামেত (রাঃ)।
৬৪. আহমাদ হা/২৩৬৮৬; মিশকাত হা/৫৩৩৪ রাবী মাহমুদ বিন লাবীদ (রাঃ); ছহীহাহ হা/৯৫১।
৬৫. আহমাদ হা/২০৪৩১; তিরমিযী হা/২৩৩০; মিশকাত হা/৫২৮৫, রাবী আবু বাকরাহ (রাঃ)।