📄 মৃত্যুচিন্তা মানুষকে আধ্যাত্মিক ও সৎকর্মশীল বানায়
মৃত্যুচিন্তা মানুষকে আল্লাহভীরু ও সৎকর্মশীল বানায় (ذكر الموت يصبح الإنسان تقيا وصالحا)
হযরত ওছমান গণী (রাঃ)-এর গোলাম হানী (هانی) বলেন,
أَنَّهُ كَانَ إِذَا وَقَفَ عَلَى قَبْرٍ بَكَى حَتَّى يَيُلَّ لِحْيَتَهُ، فَقِيلَ لَهُ : تُذْكَرُ الْجَنَّةُ وَالنَّارُ فَلَا تَبْكِي، وَتَبْكِي مِنْ هَذَا؟ فَقَالَ : إِنَّ رَسُولَ اللَّهِ - صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ - قَالَ : إِنَّ الْقَبْرَ أَوَّلُ مَنْزِلٍ مِنْ مَنَازِلِ الْآخِرَةِ، فَإِنْ نَجَا مِنْهُ فَمَا بَعْدَهُ أَيْسَرُ مِنْهُ، وَإِنْ لَمْ يَنْجُ مِنْهُ فَمَا بَعْدَهُ أَشَدُّ مِنْهُ. قَالَ : وَقَالَ رَسُولُ اللهِ - صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ - مَا رَأَيْتُ مَنْظَرًا قَطُّ إِلَّا وَالْقَبْرُ أَفْضَعُ مِنْهُ، رَوَاهُ التَّرْمِذِيُّ وَابْنُ مَاجَهْ
'যখন ওছমান (রাঃ) কোন কবরের পাশে দাঁড়াতেন, তখন কাঁদতেন। যাতে তাঁর দাড়ি ভিজে যেত। তাঁকে বলা হ'ল জান্নাত-জাহান্নামের কথা শুনে আপনি কাঁদেন না, অথচ কবরে এসে কাঁদেন? জবাবে তিনি বলেন, কবর হ'ল আখেরাতের মনযিল সমূহের প্রথম মনযিল। যদি কেউ এখানে মুক্তি পায়, তাহ'লে পরের মনযিলগুলি তার জন্য সহজ হয়ে যায়। আর এখানে মুক্তি না পেলে পরের মনযিলগুলি তার জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। অতঃপর ওছমান বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, কবরের চাইতে ভীতিকর দৃশ্য আমি আর কখনো দেখিনি'। ৩৭
বাড়ী-গাড়ী, সন্তান-সন্ততি, আত্মীয়-স্বজন, ভক্তকুল সবাইকে রেখে সবকিছু ছেড়ে কেবল এক টুকরো কাফনের কাপড় সাথে নিয়ে কবরে প্রবেশ করতে হবে। সাবানে ধোয়া সুগন্ধিময় দেহটা পোকার খোরাক হবে। জীবনের সকল আশা-আকাঙ্ক্ষা মুহূর্তের মধ্যে বিলীন হয়ে যাবে। মানুষ তাই মরতে চায় না। সর্বদা সে মৃত্যু থেকে পালিয়ে বাঁচতে চায়। অথচ আল্লাহ বলেন, قُلْ إِنَّ الْمَوْتَ الَّذِي تَفِرُّوْنَ مِنْهُ فَإِنَّهُ مُلَاقِيْكُمْ ثُمَّ تُرَدُّوْنَ إِلَى عَالِمِ الْغَيْبِ وَالشَّهَادَةِ فَيُنَبِّئُكُمْ بِمَا كُنتُمْ تَعْمَلُوْنَ 'তুমি বলে দাও, নিশ্চয়ই যে মৃত্যু হ'তে তোমরা পালিয়ে বেড়াচ্ছ, তা অবশ্যই তোমাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবে। অতঃপর তোমাদেরকে ফিরিয়ে নেওয়া হবে সেই সত্তার নিকটে, যিনি অদৃশ্য ও দৃশ্যমান সবকিছু জানেন। অতঃপর তিনি তোমাদেরকে তোমাদের কৃতকর্ম সম্পর্কে অবহিত করবেন' (জুম'আ ৬২/৮)।
فَيَقُولَ رَبِّ لَوْلا أَخَرْتَنِي إِلَى أَجَلٍ قَرِيبٍ فَأَصَّدَّقَ وَأَكُنْ مِّنَ الصَّالِحِينَ - وَلَنْ يُؤَخِّرَ اللَّهُ نَفْسًا إِذَا جَاءَ أَجَلُهَا وَاللَّهُ خَبِيرٌ بِمَا تَعْمَلُونَ 'হে আমার প্রতিপালক! যদি তুমি আমাকে আরও কিছুকাল অবকাশ দিতে, তাহ'লে আমি ছাদাক্বা করে আসতাম ও সৎকর্মশীলদের অন্তর্ভুক্ত হ'তাম'। 'অথচ নির্ধারিত সময়কাল যখন এসে যাবে, তখন আল্লাহ কাউকে আর অবকাশ দিবেন না। বস্তুতঃ তোমরা যা কর, সে বিষয়ে আল্লাহ সম্যক অবহিত' (মুনাফিকুন ৬৩/১০-১১)। অন্য আয়াতে এসেছে, حَتَّى إِذَا جَاءَ أَحَدَهُمُ الْمَوْتُ قَالَ رَبِّ ارْجِعُوْنِ لَعَلِّي
টিকাঃ
৩৭. তিরমিযী হা/২৩০৮; ইবনু মাজাহ হা/৪২৬৭; মিশকাত হা/১৩২; ছহীহ আত-তারগীব হা/৩৫৫০।
📄 শিক্ষায় ফাঁকদান ও কিয়ামত; কিয়ামতের দিনের সময়কাল পুনরুহিতরাত
أَعْمَلُ صَالِحًا فِيمَا تَرَكْتُ كَلاً إِنَّهَا كَلِمَةٌ هُوَ قَائِلُهَا وَمِنْ وَرَائِهِمْ بَرْزَخٌ إِلَى - يَوْمٍ يُبْعَثُونَ 'অবশেষে যখন তাদের কারু কাছে মৃত্যু এসে যায়, তখন সে বলে হে আমার পালনকর্তা! আমাকে পুনরায় (দুনিয়াতে) ফেরত পাঠান'। 'যাতে আমি সৎকর্ম করতে পারি যা আমি ছেড়ে এসেছি। কখনই না। এটা তো তার একটি (বৃথা) উক্তি মাত্র যা সে বলে। বরং তাদের সামনে পর্দা থাকবে পুনরুত্থান দিবস পর্যন্ত' (মুমিনুন ২৩/৯৯-১০০)।
শিঙ্গায় ফুঁকদান ও ক্বিয়ামত: وَنُفِخَ فِي الصُّورِ فَإِذَا هُمْ مِنَ الْأَحْدَاثِ إِلَى رَبِّهِمْ يَنْسِلُونَ 'আর যখন শিঙ্গায় ফুঁক দেওয়া হবে, তখনই তারা কবর থেকে উঠে তাদের পালনকর্তার দিকে ছুটে আসবে' (ইয়াসীন ৩৬/৫১)।
ক্বিয়ামতের দিনের সময়কাল (مدة يوم القيامة) : فِي يَوْمَ كَانَ مِقْدَارُهُ خَمْسِينَ أَلْفَ سَنَةٍ - 'যে দিনের পরিমাণ তোমাদের পঞ্চাশ হাযার বছরের সমান' (মা'আরিজ ৭০/৪)। এর দ্বারা কিয়ামত দিবসের স্থায়িত্বের পরিমাণ বুঝানো হয়েছে। যাতে হিসাব শেষ করা হবে (ইবনু কাছীর)।
সেদিন মুমিনদের হিসাব সহজ হবে ও দ্রুত শেষ হবে। হযরত আয়েশা سَمِعْتُ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ : فِي بَعْضٍ صَلَاتِهِ، (রাঃ) বলেন, اللَّهُمَّ حَاسِبْنِي حِسَاباً يَسِيرًا. فَلَمَّا انْصَرَفَ قُلْتُ يَا نَبِيَّ اللَّهِ مَا الْحِسَابُ الْيَسِيرُ قَالَ : أَنْ يَنْظُرَ فِي كِتَابِهِ فَيَتَجَاوَزَ عَنْهُ إِنَّهُ مَنْ نُّوقِشَ الْحِسَابَ يَوْمَئِذٍ يَا عَائِشَةُ هَلَكَ 'আমি কোন এক ছালাতে নবী করীম (ছাঃ)-কে বলতে শুনি, 'হে আল্লাহ! তুমি আমার সহজ হিসাব গ্রহণ করো। অতঃপর তিনি ছালাত শেষ করলে আমি বললাম, হে আল্লাহর নবী! সহজ হিসাব কি? তিনি বললেন, সেটি হ'ল আল্লাহ বান্দার আমলনামা দেখবেন। অতঃপর সেটি ছেড়ে সামনে চলে যাবেন। যদি সেদিন কোন বান্দার আমলনামা যাচাই করা হয় হে আয়েশা! তাহ'লে সে ধ্বংস হবে'।৩৮
ক্বিয়ামতের দিনের সময়কাল দুনিয়ার হিসাবে পঞ্চাশ হাযার বছরের সমান বলা হ'লেও সেটি জান্নাতীদের জন্য খুবই সংক্ষিপ্ত হবে। যেমন রাসূলুল্লাহ إِلَى أَنْ يُّهَوِّنُ ذَلِكَ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ كَتَدَلَّي الشَّمْسِ لِلْغُرُوبِ (হাঃ) বলেন, تَغْرُبَ 'সেদিন মুমিনের উপর হিসাব সহজ করা হবে অস্তায়মান সূর্য্যের অস্ত যাওয়ার সময়ের ন্যায়'। ৩৯ আরবরা কষ্টের দিনগুলিকে 'দীর্ঘ' ও আনন্দের দিনগুলিকে 'সংক্ষিপ্ত' বলে থাকে (কুরতুবী)।
পক্ষান্তরে অবিশ্বাসী ও জাহান্নামীদের জন্য দিনটি খুবই দীর্ঘ হবে। কষ্ট ও শাস্তির আধিক্যের কারণে ক্বিয়ামতের দিনের স্থায়িত্ব তাদের কাছে হাযার বছরের সমান মনে হবে (সাজদাহ ৩২/৫)। আরবী ভাষায় ৭০, ১০০, ১০০০, ৫০,০০০ সংখ্যাগুলি সাধারণতঃ আধিক্যের পরিমাণ বুঝানোর অর্থে বলা হয়। সেকারণ বলা হয়ে থাকে أَيَّامُ السُّرُوْرِ قَصِيْرَةٌ وَأَيَّامُ الشَّدَّةِ طَوِيلَةٌ 'আনন্দের দিনগুলি সংক্ষিপ্ত হয় এবং কষ্টের দিনগুলি দীর্ঘ হয়'।
পুলছিরাত:
এরপর প্রত্যেক মানুষকে জাহান্নামের উপর রক্ষিত 'পুলছিরাত' পার হ'তে হবে। আল্লাহ বলেন, - وَإِنْ مِنْكُمْ إِلَّا وَارِدُهَا كَانَ عَلَى رَبِّكَ حَتْمًا مَّقْضِيًّا ثُمَّ نُنَجِّي الَّذِينَ اتَّقَوْا وَنَذَرُ الظَّالِمِينَ فِيهَا جِثِيًّا এমন কেউ নেই, যে সেখানে পৌঁছবে না। এটা তোমার পালনকর্তার অমোঘ সিদ্ধান্ত'। 'অতঃপর আমরা মুত্তাক্বীদের মুক্তি দেব এবং সীমালংঘনকারীদের সেখানে নতজানু অবস্থায় ছেড়ে দেব' (মারিয়াম ১৯/৭১-৭২)।
রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, 'যখন ক্বিয়ামত সংঘটিত হবে, তখন একজন ঘোষক ঘোষণা দিবে, প্রত্যেক উম্মত যে যার ইবাদত করত, সে যেন তার অনুগামী হয়। তখন যারা আল্লাহ ব্যতীত মূর্তি-প্রতিমা ইত্যাদির পূজা করত, তারা সবাই জাহান্নামে পতিত হবে। অবশেষে কেবল আল্লাহ্ ইবাদতকারী নেককার ও গোনাহগার ব্যতীত কেউ আর বাকী থাকবে না। অতঃপর আল্লাহ তাদের নিকট এসে বলবেন, তোমরা কার অপেক্ষায় আছ? তারা বলবে, হে আমাদের প্রতিপালক! যতক্ষণ পর্যন্ত আমাদের রব আমাদের কাছে না আসেন, ততক্ষণ আমরা এখানে অপেক্ষা করব। আল্লাহ বলবেন, তোমরা তাকে কিভাবে চিনবে? তোমাদের রবের মধ্যে এমন কোন চিহ্ন আছে কি, যাতে তোমরা তাকে চিনতে পারবে? তারা বলবে, হ্যাঁ। অতঃপর আল্লাহ স্বীয় পায়ের নলা উন্মোচিত করে দিবেন )ا (فَيَكْشِفُ عَنْ سَاقه অতঃপর যারা নিষ্ঠার সাথে আল্লাহকে সিজদা করত, তাকেই কেবল আল্লাহ অনুমতি দিবেন। আর যারা কারো প্রভাবে বা লোক দেখানোর জন্য সিজদা করত, তারা থেকে যাবে। তাদের পৃষ্ঠদেশকে আল্লাহ তকতার ন্যায় শক্ত করে দিবে। যখনই তারা সিজদা করতে চাইবে, পিছনের দিকে উল্টে পড়বে। অতঃপর জাহান্নামের উপরে পুলছিরাত স্থাপন করা হবে এবং শাফা'আতের অনুমতি দেওয়া হবে। তখন নবী-রাসূলগণ স্ব স্ব উম্মতের জন্য ফরিয়াদ করবেন, اَللَّهُمَّ سَلَّمْ سَلِّمْ 'হে আল্লাহ! বাঁচাও বাঁচাও!!
অতঃপর মুমিনগণ পুলছিরাতের উপর দিয়ে কেউ চোখের পলকে, কেউ বিদ্যুতের গতিতে, কেউ বায়ুর গতিতে, কেউ পাখির গতিতে, কেউ দ্রুতগামী ঘোড়া ও উটের গতিতে অতিক্রম করবে। কেউ নিরাপদে মুক্তি পাবে। কেউ ক্ষত-বিক্ষত হয়ে জাহান্নামে পতিত হবে ও শাস্তি শেষে মুক্তি পাবে। কেউ জাহান্নামে পতিত হয়ে থেকে যাবে'। ৪০
অন্য বর্ণনায় এসেছে, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, সে সময় রাসূলগণের মধ্যে আমি আমার উম্মতগণকে নিয়ে সর্বপ্রথম অতিক্রম করব। সেদিন রাসূলগণ ছাড়া কেউ কথা বলবে না। আর তাদের সকলের কথা হবে, اللَّهُمَّ سَلَّمْ سَلِّمْ 'হে আল্লাহ! বাঁচাও বাঁচাও!! আর জাহান্নামের মধ্যে সা'দানের কাঁটার ন্যায় আংটা থাকবে। সেগুলির বিরাটত্ব সম্পর্কে একমাত্র আল্লাহই ভালো জানেন। ঐ আংটাগুলি লোকদের আমল অনুপাতে আঁকড়িয়ে ধরবে। ফলে কিছুসংখ্যক লোক তাদের দুষ্কর্মের কারণে ধ্বংস হয়ে যাবে। কেউ টুকরা টুকরা হয়ে যাবে এবং পরে মুক্তি পাবে। অবশেষে যখন আল্লাহ বান্দাদের বিচার কার্য শেষ করবেন এবং সবশেষে জাহান্নামবাসীদের কিছু লোককে নাজাত দেওয়ার ইচ্ছা করবেন, যারা এই সাক্ষ্য দিয়েছে যে, আল্লাহ ব্যতীত কোন উপাস্য নেই; তখন তিনি ফেরেশতাদের আদেশ করবেন, যারা কেবলমাত্র আল্লাহ্ ইবাদত করেছে, তাদেরকে তোমরা বের করে আন। তখন তারা কপালে সিজদার চিহ্নধারীদেরকে জাহান্নাম থেকে বের করে আনবেন। কেননা আল্লাহ সিজদার চিহ্ন দগ্ধ করতে আগুনের উপর হারাম করে দিয়েছেন। এটুকু ব্যতীত তাদের সর্বাঙ্গ পুড়ে কয়লা হয়ে যাবে। তখন তাদের উপর সঞ্জীবনী পানি (مَاءُ الْحَيَاةِ) ঢেলে দেওয়া হবে। তাতে তারা এমনভাবে সজীব হয়ে উঠবে, যেমন কোন বীজ কোন প্রবহমান পানির ধারে অংকুরিত হয়ে ওঠে'...।৪১
ত্বীবী বলেন, এ লোকগুলি জাহান্নামে শাস্তিপ্রাপ্ত হওয়ার পর শাফা'আতের মাধ্যমে অথবা আল্লাহ্ বিশেষ অনুগ্রহে মুক্তি পাবে। এভাবে মুমিনদের মধ্যে তিনটি দল হবে' (মিরক্কাত)। একদল যারা পায়ের নলায় সিজদা করতে সক্ষম হবে, তারা নিরাপদে মুক্তি পাবে। আরেকদল সিজদায় অক্ষম হবে, তারা ক্ষত-বিক্ষত হয়ে জাহান্নামে পতিত হওয়ার পর শাস্তি ভোগ করবে। অতঃপর মুক্তি পাবে। আরেকদল শাফা'আতের কারণে অথবা তাদের খালেছ ঈমানের কারণে আল্লাহ্ বিশেষ অনুগ্রহে সবশেষে মুক্তি পাবে।
টিকাঃ
৩৮. আহমাদ হা/২৪২৬১, সনদ ছহীহ; হাকেম হা/৮৭২৭; মিশকাত হা/৫৫৬২।
৩৯. ছহীহ ইবনু হিব্বান হা/৭৩৩৩; ছহীহাহ হা/২৮১৭, রাবী আবু হুরায়রা (রাঃ)।
৪০. বুখারী হা/৭৪৩৯; মুসলিম হা/১৮৩ (৩০২); মিশকাত হা/৫৫৭৯, রাবী আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ)।
৪১. বুখারী হা/৮০৬; মুসলিম হা/১৮২; মিশকাত হা/৫৫৮১, রাবী আবু হুরায়রা (রাঃ)।
📄 জাহান্নামের পরিচয়
জাহান্নামের পরিচয়: আল্লাহ বলেন, ،وَجِيءَ يَوْمَئِذٍ بِجَهَنَّمَ 'যেদিন জাহান্নামকে আনা হবে' (ফজর ৮৯/২৩)। এতে বুঝা যায় যে, আল্লাহ তা'আলা জাহান্নামকে আগেই সৃষ্টি করে রেখেছেন। (১) রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, 'তোমাদের আগুনের উত্তাপ জাহান্নামের আগুনের উত্তাপের সতুর ভাগের একভাগ অর্থাৎ ৬৯ ভাগ বেশী। ৪২ (২) তিনি বলেন, 'কিয়ামতের দিন জাহান্নামকে উপস্থিত করা হবে এমন অবস্থায় যে, তাতে সতুর হাযার লাগাম থাকবে। আর প্রতিটি লাগামের সাথে সতুর হাযার ফেরেশতা থাকবে, যারা জাহান্নামকে টেনে আনবে'। কিয়ামতের দিন সেখান থেকে টেনে এনে জান্নাতের গমনপথে রাখা হবে। আর তার উপরেই পুলছিরাত স্থাপন করা হবে। এর দ্বারা সহজে ধারণা করা যায় যে, জাহান্নাম অতীব বৃহৎ এবং সেখান থেকে বের হওয়াটাও অসম্ভব আল্লাহ্ হুকুম ছাড়া (মিরক্কাত)। (৩) রাসূল (ছাঃ) বলেন, 'জাহান্নামীদের মধ্যে কারু আগুন পায়ের টাখনু পর্যন্ত পৌঁছবে, কারু হাঁটু পর্যন্ত, কারু কোমর পর্যন্ত এবং কারু গর্দান পর্যন্ত পৌঁছবে। ৪৪ (৪) তিনি বলেন, 'জাহান্নামীদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা হালকা শাস্তি হবে ঐ ব্যক্তির, যাকে আগুনের ফিতাসহ দুই পায়ে জুতা পরানো হবে। তাতে তার মাথার মগয এমনভাবে ফুটতে থাকবে, যেমনভাবে অগ্নিতপ্ত তামার পাত্রে উত্তপ্ত পানি ফুটতে থাকে। সে ধারণা করবে যে, তার চাইতে কঠিন শাস্তি আর কেউ ভোগ করছে না'। ৪৫ (৫) 'সেদিন সবচাইতে হালকা আযাব হবে আবু তালিবের। তার দুই পায়ে আগুনের জুতা পরানো হবে। তাতে তার মাথার মগয টগবগ করে ফুটতে থাকবে'। ৪৬
(৬) রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন,
يَقُولُ اللَّهُ لِأَهْوَنِ أَهْلِ النَّارِ عَذَابًا يَوْمَ الْقِيَامَةِ : لَوْ أَنَّ لَكَ مَا فِي الْأَرْضِ مِنْ شَيْءٍ أَكَنْتَ تَفْتَدِي بِهِ؟ فَيَقُولُ : نَعَمْ، فَيَقُولُ أَرَدْتُ مِنْكَ أَهْوَنَ مِنْ هَذَا وَأَنْتَ فِي صُلْبِ آدَمَ أَنْ لا تُشْرِكَ بِي شَيْئًا، فَأَبَيْتَ إِلَّا أَنْ تُشْرِكَ بِي - 'কিয়ামতের দিন সর্বাপেক্ষা সহজ শাস্তিপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে আল্লাহ বলবেন, গোটা পৃথিবী পরিমাণ সম্পদের বিনিময়ে কি তুমি এই শাস্তি থেকে মুক্তি পাওয়ার চেষ্টা করতে? সে বলবে, হ্যাঁ। তখন আল্লাহ বলবেন, আমি তোমার কাছ থেকে এর চাইতে সহজ একটি বিষয় কামনা করেছিলাম। যখন তুমি আদমের ঔরসে ছিলে, তখন আমি তোমাকে নির্দেশ দিয়েছিলাম যে, তুমি আমার সাথে কাউকে শরীক করো না। কিন্তু তুমি তা অমান্য করেছিলে এবং আমার সাথে অন্যকে শরীক করেছিলে'। ৪৯ যাকে 'আহদে আলাস্তু' বলা হয়। যেদিন আল্লাহ সকল বনু আদমের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন, أَلَسْتُ بِرَبِّكُمْ؟ قَالُوا بَلَىٰ 'আমি কি তোমাদের প্রতিপালক নই? তারা বলেছিল, হ্যাঁ' (আ'রাফ ৭/১৭২)।
يُبَصَّرُونَهُمْ يَوَدُّ الْمُجْرِمُ لَوْ يَفْتَدِي مِنْ عَذَابِ يَوْمِئِذٍ بِبَنِيهِ (১১) وَصَاحِبَتِهِ وَأَخِيهِ (১২) وَفَصِيلَتِهِ الَّتِي تُؤْوِيهِ (১৩) وَمَنْ فِي الْأَرْضِ جَمِيعًا ثُمَّ يُنْجِيهِ (১৪) كَلَّا إِنَّهَا لَظَىٰ (১৫) نَزَّاعَةً لِلشَّوَىٰ (১৬) পরস্পরকে ভালভাবে দেখানো হবে। অপরাধী ব্যক্তি সেদিনের শাস্তির বিনিময় হিসাবে দিতে চাইবে নিজের সন্তান-সন্ততিকে, (১১)। 'নিজের স্ত্রী ও ভাইকে; (১২)। 'তার গোত্র বা দলকে, যারা তাকে আশ্রয় দিত; (১৩)। 'এবং পৃথিবীতে যত লোক আছে সবাইকে; যেন তিনি তাকে মুক্তি দেন' (১৪)। 'কখনই না। এটাতো লেলিহান অগ্নি' (১৫)। 'যা চামড়া তুলে নিবে' (মা'আরিজ ৭০/১১-১৬)।
টিকাঃ
৪২. বুখারী হা/৩২৬৫; মুসলিম হা/২৮৪৩; মিশকাত হা/৫৬৬৫, রাবী আবু হুরায়রা (রাঃ)।
৪৩. মুসলিম হা/২৮৪২; মিশকাত হা/৫৬৬৬, রাবী ইবনু মাসউদ (রাঃ)।
৪৪. মুসলিম হা/২৮৪৫; মিশকাত হা/৫৬৭১, রাবী সামুরাহ বিন জুনদুব (রাঃ)।
৪৫. বুখারী হা/৫৬৬১-৬২; মুসলিম হা/২১৩ (৩৬৪); মিশকাত হা/৫৬৬৭, রাবী নু'মান বিন বাশীর (রাঃ)।
৪৬. মুসলিম হা/২১২; মিশকাত হা/৫৬৬৮, রাবী আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস (রাঃ)।
৪৯. বুখারী হা/৬৫৫৭; মুসলিম হা/২৮০৫; মিশকাত হা/৫৬৭০, রাবী আনাস (রাঃ)।
📄 জাহান্নামের গভীরতা
জাহান্নামের গভীরতা : আবু হুরায়রা ও ওৎবা বিন গাযওয়ান (রাঃ) হ'তে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) একদা একটি বড় পাথর খণ্ডের দিকে ইশারা করে বলেন, যদি ঐ পাথরখণ্ড জাহান্নামের কিনারা থেকে তার ভিতরে গড়িয়ে দেওয়া যায়, তবে ৭০ বছরেও সে তলা পাবে না।৪৮ অথচ আল্লাহ অবশ্যই জাহান্নাম পূর্ণ করবেন'। আল্লাহ সেদিন জাহান্নামকে বলবেন, هَلِ امْتَلَاتِ وَتَقُولُ هَلْ مِنْ مزید؟ 'তুমি কি পূর্ণ হয়ে গেছ? সে বলবে আরও কি আছে? (ক্বা-ফ ৫০/৩০)। অবশেষে আল্লাহ জাহান্নামে স্বীয় পা রাখবেন। তখন তার একাংশ অপরাংশের সাথে মিলে যাবে ও বলবে যথেষ্ট হয়েছে, যথেষ্ট হয়েছে'। ৪৯
টিকাঃ
৪৮. মুসলিম হা/২৯৬৭; মিশকাত হা/৫৬২৯ 'কিয়ামতের ভয়াবহ অবস্থা' অধ্যায়, পৃ. ১১৬-১৭।
৪৯. বুখারী হা/৬৬৬১; মুসলিম হা/২৮৪৮; মিশকাত হা/৫৬৯৫, রাবী আনাস (রাঃ)।