📘 মৃত্যুকে স্বরন > 📄 মৃত্যুকাল পূর্ব নির্ধারিত

📄 মৃত্যুকাল পূর্ব নির্ধারিত


মৃত্যুকাল পূর্ব নির্ধারিত: وَمَا كَانَ لِنَفْسٍ أَنْ تَمُوْتَ إِلَّا بِإِذْنِ اللهِ كِتَابًا مُؤَجَّلاً (১) আল্লাহ বলেন, 'আল্লাহ্ হুকুম ছাড়া কেউ মরতে পারে না। সেজন্য একটা নির্ধারিত সময়কাল রয়েছে...' (আলে ইমরান ৩/১৪৫)। (২) তিনি বলেন, إِنَّ اللَّهَ عِنْدَهُ عِلْمُ السَّاعَةِ وَيُنَزِّلُ الْغَيْثَ وَيَعْلَمُ مَا فِي الْأَرْحَامِ وَمَا تَدْرِي نَفْسٌ مَّاذَا تَكْسِبُ غَدًا، وَمَا تَدْرِي نَفْسٌ بِأَيِّ أَرْضِ تَمُوْتُ إِنَّ اللَّهَ عَلِيْمٌ خَبِيرٌ - আল্লাহর নিকটেই রয়েছে ক্বিয়ামতের জ্ঞান। আর তিনিই বৃষ্টি বর্ষণ করেন এবং তিনিই জানেন মায়ের গর্ভাশয়ে কি আছে। কেউ জানে না আগামীকাল সে কি উপার্জন করবে এবং কেউ জানে না কোন মাটিতে তার মৃত্যু হবে। নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বজ্ঞ ও সকল বিষয়ে সম্যক অবহিত' (লোকমান ৩১/৩৪)। (৩) তিনি আরও বলেন, - فَإِذَا جَاءَ أَجَلُهُمْ لاَ يَسْتَأْخِرُونَ سَاعَةً وَلاَ يَسْتَقْدِمُونَ
'...অতঃপর যখন তাদের সময়কাল এসে যাবে, তখন তারা সেখান থেকে এক মুহূর্ত পিছাতেও পারবেনা, আগাতেও পারবে না' (নাহল ১৬/৬১)।
(৪) স্বীয় কওমের প্রতি নূহ (আঃ)-এর দাওয়াতের বর্ণনা দিয়ে আল্লাহ বলেন, قَالَ يَا قَوْمِ إِنِّي لَكُمْ نَذِيرٌ مُّبِينٌ - أَنِ اعْبُدُوا اللهَ وَاتَّقُوهُ وَأَطِيعُونِ يَغْفِرْ * لَكُمْ مِنْ ذُنُوبِكُمْ وَيُؤَخِّرْكُمْ إِلَى أَجَلٍ مُّسَمًّى إِنَّ أَجَلَ اللَّهِ إِذَا جَاءَ لَا يُؤَخِّرُ لَوْ كُنْتُمْ تَعْلَمُونَ 'সে বলল, হে আমার কওম! আমি তোমাদের জন্য স্পষ্ট সতর্ককারী' (২)। 'তোমরা আল্লাহ্ ইবাদত কর ও তাঁকে ভয় কর এবং আমার আনুগত্য কর' (৩)। 'তাহ'লে তিনি তোমাদের পাপ সমূহ ক্ষমা করবেন ও নির্ধারিত সময়কাল পর্যন্ত অবকাশ দিবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহর নির্ধারিত সময়কাল যখন এসে যাবে, তখন আর অবকাশ দেওয়া হবে না, যদি তোমরা তা জানতে' (নূহ ৭১/২-৪)। অর্থাৎ তোমাদেরকে গযবে ধ্বংস না করে তোমাদের স্বাভাবিক মৃত্যুকাল অবধি দুনিয়ায় বেঁচে থাকার সুযোগ দেওয়া হবে।
এতে প্রমাণিত হয় যে, স্বাভাবিক মৃত্যুকালের আগেও আল্লাহ মানুষকে মারতে পারেন যুদ্ধ-বিগ্রহ, মহামারি ইত্যাদি নানা কারণে এবং সেটাও তার তাক্বদীরে পূর্বেই লিপিবদ্ধ থাকে। এ কারণেই হাদীছে এসেছে, صَدَقَةُ السِّر تُطْفِئُ غَضَبَ الرَّبِّ وَصِلَةُ الرَّحِمِ تَزِيدُ فِي الْعُمُرِ وَفِعْلُ الْمَعْرُوفِ يَقِي مَصَارِعَ السُّوْءِ 'গোপনে ছাদাক্বা আল্লাহ্ ক্রোধকে নিভিয়ে দেয়। আত্মীয়তার সুসম্পর্ক মানুষের আয়ু বৃদ্ধি করে। সৎকর্ম মানুষকে মন্দ পতন থেকে রক্ষা করে'। ১২ অর্থাৎ স্বাভাবিক মৃত্যুকাল অবধি তার আয়ু প্রলম্বিত হয়' (মর্মার্থ: তাফসীর কুরতুবী, ইবনু কাছীর)।

টিকাঃ
১২. বায়হাক্বী শো'আব হা/৩৪৪২; ছহীহুল জামে' হা/ ৩৭৬০, রাবী আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ)।

📘 মৃত্যুকে স্বরন > 📄 আখেরাত

📄 আখেরাত


আখেরাত (الآخرة) : মৃত্যুকে স্মরণ ২০
প্রত্যেক মানুষ এ বিষয়ে একমত যে, তার মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী। কিন্তু মৃত্যুর পরবর্তী জীবন সম্পর্কে মানুষ দুই ভাগে বিভক্ত। যারা নাস্তিক, তারা মনে করেন মৃত্যুই তাদের শেষ পরিণতি। তারা পরকালে বিশ্বাস করেন না। পক্ষান্তরে অধিকাংশ মানুষ যারা পরকালে বিশ্বাস করেন, তারাও দুই ভাগে বিভক্ত। একদল তাদের বানোয়াট ধর্ম বিশ্বাস অনুযায়ী স্বর্গ ও নরক সম্পর্কে নানাবিধ কল্পনা করেন। যেমন হিন্দুরা জন্মান্তরবাদ ও বৌদ্ধরা নির্বাণবাদের ভ্রান্ত বিশ্বাস পোষণ করেন। এ যুগের খৃষ্টানরা ধারণা করেন যে, তাদের সকল পাপের প্রায়শ্চিত্তের জন্য যীশুখ্রীষ্ট ক্রুশবিদ্ধ হয়ে নিহত হয়েছেন। অতএব খৃষ্টান হ'লে সে বিনা হিসাবে জান্নাত পাবে। যা মুসলমানদের তাওহীদ, রিসালা ও আখেরাত বিশ্বাসের সম্পূর্ণ বিপরীত।
মূল তাওরাত-ইঞ্জীল বিলুপ্ত হয়ে গেছে। পরবর্তীতে তাদের আক্বীদায় অনুপ্রবেশ ঘটেছে দ্বিত্ববাদ ও ত্রিত্ববাদের (তওবা ৯/৩০-৩১) ও সেই সাথে বৈরাগ্যবাদের। যার নির্দেশ আল্লাহ তাদের দেননি (হাদীদ ৫৭/২৭)। তাছাড়া নিজেদের কিতাবে আল্লাহর নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও তারা শেষনবী মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর উপরে ঈমান আনেনি। বরং সর্বাত্মক বিরোধিতায় লিপ্ত হয়েছিল, যা আজও অব্যাহত রয়েছে। ফলে তারা আল্লাহ্ 'অভিশপ্ত' ও 'পথভ্রষ্ট' হিসাবে অভিহিত হয়েছে (তিরমিযী হা/২৯৫৪; সূরা ফাতিহা ৭ আয়াত)।
দেড় হাযার বছর পূর্বে নুযূলে কুরআনের যুগে আরবের নাস্তিকরা বলত, وَقَالُوا مَا هِيَ إِلَّا حَيَاتُنَا الدُّنْيَا نَمُوتُ وَنَحْيَا وَمَا يُهْلِكُنَا إِلَّا الدَّهْرُ وَمَا لَهُمْ بِذَلِكَ مِنْ عِلْمٍ إِنْ هُمْ إِلَّا يَظُنُّونَ 'আর তারা বলে, আমাদের এই পার্থিব জীবন ভিন্ন আর কিছু নেই। আমরা এখানেই মরি ও বাঁচি। কালের আবর্তনই আমাদেরকে ধ্বংস করে। অথচ এ ব্যাপারে তাদের কোনই জ্ঞান নেই। তারা স্রেফ ধারণা ভিত্তিক কথা বলে' (জাছিয়াহ ৪৫/২৪)। তাদের বিষয়ে আল্লাহ্ আরও বলেন, وَإِذَا قِيلَ إِنَّ وَعْدَ اللَّهِ حَقٌّ وَالسَّاعَةُ لَا رَيْبَ فِيهَا قُلْتُمْ مَا نَدْرِي مَا السَّاعَةُ إِنْ نَظُنُّ إِلَّا ظَنَّا وَمَا نَحْنُ بِمُسْتَيْقِنِينَ

📘 মৃত্যুকে স্বরন > 📄 মৃত্যুচিন্তা মানুষকে আধ্যাত্মিক ও সৎকর্মশীল বানায়

📄 মৃত্যুচিন্তা মানুষকে আধ্যাত্মিক ও সৎকর্মশীল বানায়


মৃত্যুচিন্তা মানুষকে আল্লাহভীরু ও সৎকর্মশীল বানায় (ذكر الموت يصبح الإنسان تقيا وصالحا)
হযরত ওছমান গণী (রাঃ)-এর গোলাম হানী (هانی) বলেন,
أَنَّهُ كَانَ إِذَا وَقَفَ عَلَى قَبْرٍ بَكَى حَتَّى يَيُلَّ لِحْيَتَهُ، فَقِيلَ لَهُ : تُذْكَرُ الْجَنَّةُ وَالنَّارُ فَلَا تَبْكِي، وَتَبْكِي مِنْ هَذَا؟ فَقَالَ : إِنَّ رَسُولَ اللَّهِ - صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ - قَالَ : إِنَّ الْقَبْرَ أَوَّلُ مَنْزِلٍ مِنْ مَنَازِلِ الْآخِرَةِ، فَإِنْ نَجَا مِنْهُ فَمَا بَعْدَهُ أَيْسَرُ مِنْهُ، وَإِنْ لَمْ يَنْجُ مِنْهُ فَمَا بَعْدَهُ أَشَدُّ مِنْهُ. قَالَ : وَقَالَ رَسُولُ اللهِ - صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ - مَا رَأَيْتُ مَنْظَرًا قَطُّ إِلَّا وَالْقَبْرُ أَفْضَعُ مِنْهُ، رَوَاهُ التَّرْمِذِيُّ وَابْنُ مَاجَهْ
'যখন ওছমান (রাঃ) কোন কবরের পাশে দাঁড়াতেন, তখন কাঁদতেন। যাতে তাঁর দাড়ি ভিজে যেত। তাঁকে বলা হ'ল জান্নাত-জাহান্নামের কথা শুনে আপনি কাঁদেন না, অথচ কবরে এসে কাঁদেন? জবাবে তিনি বলেন, কবর হ'ল আখেরাতের মনযিল সমূহের প্রথম মনযিল। যদি কেউ এখানে মুক্তি পায়, তাহ'লে পরের মনযিলগুলি তার জন্য সহজ হয়ে যায়। আর এখানে মুক্তি না পেলে পরের মনযিলগুলি তার জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। অতঃপর ওছমান বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, কবরের চাইতে ভীতিকর দৃশ্য আমি আর কখনো দেখিনি'। ৩৭
বাড়ী-গাড়ী, সন্তান-সন্ততি, আত্মীয়-স্বজন, ভক্তকুল সবাইকে রেখে সবকিছু ছেড়ে কেবল এক টুকরো কাফনের কাপড় সাথে নিয়ে কবরে প্রবেশ করতে হবে। সাবানে ধোয়া সুগন্ধিময় দেহটা পোকার খোরাক হবে। জীবনের সকল আশা-আকাঙ্ক্ষা মুহূর্তের মধ্যে বিলীন হয়ে যাবে। মানুষ তাই মরতে চায় না। সর্বদা সে মৃত্যু থেকে পালিয়ে বাঁচতে চায়। অথচ আল্লাহ বলেন, قُلْ إِنَّ الْمَوْتَ الَّذِي تَفِرُّوْنَ مِنْهُ فَإِنَّهُ مُلَاقِيْكُمْ ثُمَّ تُرَدُّوْنَ إِلَى عَالِمِ الْغَيْبِ وَالشَّهَادَةِ فَيُنَبِّئُكُمْ بِمَا كُنتُمْ تَعْمَلُوْنَ 'তুমি বলে দাও, নিশ্চয়ই যে মৃত্যু হ'তে তোমরা পালিয়ে বেড়াচ্ছ, তা অবশ্যই তোমাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবে। অতঃপর তোমাদেরকে ফিরিয়ে নেওয়া হবে সেই সত্তার নিকটে, যিনি অদৃশ্য ও দৃশ্যমান সবকিছু জানেন। অতঃপর তিনি তোমাদেরকে তোমাদের কৃতকর্ম সম্পর্কে অবহিত করবেন' (জুম'আ ৬২/৮)।
فَيَقُولَ رَبِّ لَوْلا أَخَرْتَنِي إِلَى أَجَلٍ قَرِيبٍ فَأَصَّدَّقَ وَأَكُنْ مِّنَ الصَّالِحِينَ - وَلَنْ يُؤَخِّرَ اللَّهُ نَفْسًا إِذَا جَاءَ أَجَلُهَا وَاللَّهُ خَبِيرٌ بِمَا تَعْمَلُونَ 'হে আমার প্রতিপালক! যদি তুমি আমাকে আরও কিছুকাল অবকাশ দিতে, তাহ'লে আমি ছাদাক্বা করে আসতাম ও সৎকর্মশীলদের অন্তর্ভুক্ত হ'তাম'। 'অথচ নির্ধারিত সময়কাল যখন এসে যাবে, তখন আল্লাহ কাউকে আর অবকাশ দিবেন না। বস্তুতঃ তোমরা যা কর, সে বিষয়ে আল্লাহ সম্যক অবহিত' (মুনাফিকুন ৬৩/১০-১১)। অন্য আয়াতে এসেছে, حَتَّى إِذَا جَاءَ أَحَدَهُمُ الْمَوْتُ قَالَ رَبِّ ارْجِعُوْنِ لَعَلِّي

টিকাঃ
৩৭. তিরমিযী হা/২৩০৮; ইবনু মাজাহ হা/৪২৬৭; মিশকাত হা/১৩২; ছহীহ আত-তারগীব হা/৩৫৫০।

📘 মৃত্যুকে স্বরন > 📄 শিক্ষায় ফাঁকদান ও কিয়ামত; কিয়ামতের দিনের সময়কাল পুনরুহিতরাত

📄 শিক্ষায় ফাঁকদান ও কিয়ামত; কিয়ামতের দিনের সময়কাল পুনরুহিতরাত


أَعْمَلُ صَالِحًا فِيمَا تَرَكْتُ كَلاً إِنَّهَا كَلِمَةٌ هُوَ قَائِلُهَا وَمِنْ وَرَائِهِمْ بَرْزَخٌ إِلَى - يَوْمٍ يُبْعَثُونَ 'অবশেষে যখন তাদের কারু কাছে মৃত্যু এসে যায়, তখন সে বলে হে আমার পালনকর্তা! আমাকে পুনরায় (দুনিয়াতে) ফেরত পাঠান'। 'যাতে আমি সৎকর্ম করতে পারি যা আমি ছেড়ে এসেছি। কখনই না। এটা তো তার একটি (বৃথা) উক্তি মাত্র যা সে বলে। বরং তাদের সামনে পর্দা থাকবে পুনরুত্থান দিবস পর্যন্ত' (মুমিনুন ২৩/৯৯-১০০)।
শিঙ্গায় ফুঁকদান ও ক্বিয়ামত: وَنُفِخَ فِي الصُّورِ فَإِذَا هُمْ مِنَ الْأَحْدَاثِ إِلَى رَبِّهِمْ يَنْسِلُونَ 'আর যখন শিঙ্গায় ফুঁক দেওয়া হবে, তখনই তারা কবর থেকে উঠে তাদের পালনকর্তার দিকে ছুটে আসবে' (ইয়াসীন ৩৬/৫১)।
ক্বিয়ামতের দিনের সময়কাল (مدة يوم القيامة) : فِي يَوْمَ كَانَ مِقْدَارُهُ خَمْسِينَ أَلْفَ سَنَةٍ - 'যে দিনের পরিমাণ তোমাদের পঞ্চাশ হাযার বছরের সমান' (মা'আরিজ ৭০/৪)। এর দ্বারা কিয়ামত দিবসের স্থায়িত্বের পরিমাণ বুঝানো হয়েছে। যাতে হিসাব শেষ করা হবে (ইবনু কাছীর)।
সেদিন মুমিনদের হিসাব সহজ হবে ও দ্রুত শেষ হবে। হযরত আয়েশা سَمِعْتُ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ : فِي بَعْضٍ صَلَاتِهِ، (রাঃ) বলেন, اللَّهُمَّ حَاسِبْنِي حِسَاباً يَسِيرًا. فَلَمَّا انْصَرَفَ قُلْتُ يَا نَبِيَّ اللَّهِ مَا الْحِسَابُ الْيَسِيرُ قَالَ : أَنْ يَنْظُرَ فِي كِتَابِهِ فَيَتَجَاوَزَ عَنْهُ إِنَّهُ مَنْ نُّوقِشَ الْحِسَابَ يَوْمَئِذٍ يَا عَائِشَةُ هَلَكَ 'আমি কোন এক ছালাতে নবী করীম (ছাঃ)-কে বলতে শুনি, 'হে আল্লাহ! তুমি আমার সহজ হিসাব গ্রহণ করো। অতঃপর তিনি ছালাত শেষ করলে আমি বললাম, হে আল্লাহর নবী! সহজ হিসাব কি? তিনি বললেন, সেটি হ'ল আল্লাহ বান্দার আমলনামা দেখবেন। অতঃপর সেটি ছেড়ে সামনে চলে যাবেন। যদি সেদিন কোন বান্দার আমলনামা যাচাই করা হয় হে আয়েশা! তাহ'লে সে ধ্বংস হবে'।৩৮
ক্বিয়ামতের দিনের সময়কাল দুনিয়ার হিসাবে পঞ্চাশ হাযার বছরের সমান বলা হ'লেও সেটি জান্নাতীদের জন্য খুবই সংক্ষিপ্ত হবে। যেমন রাসূলুল্লাহ إِلَى أَنْ يُّهَوِّنُ ذَلِكَ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ كَتَدَلَّي الشَّمْسِ لِلْغُرُوبِ (হাঃ) বলেন, تَغْرُبَ 'সেদিন মুমিনের উপর হিসাব সহজ করা হবে অস্তায়মান সূর্য্যের অস্ত যাওয়ার সময়ের ন্যায়'। ৩৯ আরবরা কষ্টের দিনগুলিকে 'দীর্ঘ' ও আনন্দের দিনগুলিকে 'সংক্ষিপ্ত' বলে থাকে (কুরতুবী)।
পক্ষান্তরে অবিশ্বাসী ও জাহান্নামীদের জন্য দিনটি খুবই দীর্ঘ হবে। কষ্ট ও শাস্তির আধিক্যের কারণে ক্বিয়ামতের দিনের স্থায়িত্ব তাদের কাছে হাযার বছরের সমান মনে হবে (সাজদাহ ৩২/৫)। আরবী ভাষায় ৭০, ১০০, ১০০০, ৫০,০০০ সংখ্যাগুলি সাধারণতঃ আধিক্যের পরিমাণ বুঝানোর অর্থে বলা হয়। সেকারণ বলা হয়ে থাকে أَيَّامُ السُّرُوْرِ قَصِيْرَةٌ وَأَيَّامُ الشَّدَّةِ طَوِيلَةٌ 'আনন্দের দিনগুলি সংক্ষিপ্ত হয় এবং কষ্টের দিনগুলি দীর্ঘ হয়'।
পুলছিরাত:
এরপর প্রত্যেক মানুষকে জাহান্নামের উপর রক্ষিত 'পুলছিরাত' পার হ'তে হবে। আল্লাহ বলেন, - وَإِنْ مِنْكُمْ إِلَّا وَارِدُهَا كَانَ عَلَى رَبِّكَ حَتْمًا مَّقْضِيًّا ثُمَّ نُنَجِّي الَّذِينَ اتَّقَوْا وَنَذَرُ الظَّالِمِينَ فِيهَا جِثِيًّا এমন কেউ নেই, যে সেখানে পৌঁছবে না। এটা তোমার পালনকর্তার অমোঘ সিদ্ধান্ত'। 'অতঃপর আমরা মুত্তাক্বীদের মুক্তি দেব এবং সীমালংঘনকারীদের সেখানে নতজানু অবস্থায় ছেড়ে দেব' (মারিয়াম ১৯/৭১-৭২)।
রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, 'যখন ক্বিয়ামত সংঘটিত হবে, তখন একজন ঘোষক ঘোষণা দিবে, প্রত্যেক উম্মত যে যার ইবাদত করত, সে যেন তার অনুগামী হয়। তখন যারা আল্লাহ ব্যতীত মূর্তি-প্রতিমা ইত্যাদির পূজা করত, তারা সবাই জাহান্নামে পতিত হবে। অবশেষে কেবল আল্লাহ্ ইবাদতকারী নেককার ও গোনাহগার ব্যতীত কেউ আর বাকী থাকবে না। অতঃপর আল্লাহ তাদের নিকট এসে বলবেন, তোমরা কার অপেক্ষায় আছ? তারা বলবে, হে আমাদের প্রতিপালক! যতক্ষণ পর্যন্ত আমাদের রব আমাদের কাছে না আসেন, ততক্ষণ আমরা এখানে অপেক্ষা করব। আল্লাহ বলবেন, তোমরা তাকে কিভাবে চিনবে? তোমাদের রবের মধ্যে এমন কোন চিহ্ন আছে কি, যাতে তোমরা তাকে চিনতে পারবে? তারা বলবে, হ্যাঁ। অতঃপর আল্লাহ স্বীয় পায়ের নলা উন্মোচিত করে দিবেন )ا (فَيَكْشِفُ عَنْ سَاقه অতঃপর যারা নিষ্ঠার সাথে আল্লাহকে সিজদা করত, তাকেই কেবল আল্লাহ অনুমতি দিবেন। আর যারা কারো প্রভাবে বা লোক দেখানোর জন্য সিজদা করত, তারা থেকে যাবে। তাদের পৃষ্ঠদেশকে আল্লাহ তকতার ন্যায় শক্ত করে দিবে। যখনই তারা সিজদা করতে চাইবে, পিছনের দিকে উল্টে পড়বে। অতঃপর জাহান্নামের উপরে পুলছিরাত স্থাপন করা হবে এবং শাফা'আতের অনুমতি দেওয়া হবে। তখন নবী-রাসূলগণ স্ব স্ব উম্মতের জন্য ফরিয়াদ করবেন, اَللَّهُمَّ سَلَّمْ سَلِّمْ 'হে আল্লাহ! বাঁচাও বাঁচাও!!
অতঃপর মুমিনগণ পুলছিরাতের উপর দিয়ে কেউ চোখের পলকে, কেউ বিদ্যুতের গতিতে, কেউ বায়ুর গতিতে, কেউ পাখির গতিতে, কেউ দ্রুতগামী ঘোড়া ও উটের গতিতে অতিক্রম করবে। কেউ নিরাপদে মুক্তি পাবে। কেউ ক্ষত-বিক্ষত হয়ে জাহান্নামে পতিত হবে ও শাস্তি শেষে মুক্তি পাবে। কেউ জাহান্নামে পতিত হয়ে থেকে যাবে'। ৪০
অন্য বর্ণনায় এসেছে, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, সে সময় রাসূলগণের মধ্যে আমি আমার উম্মতগণকে নিয়ে সর্বপ্রথম অতিক্রম করব। সেদিন রাসূলগণ ছাড়া কেউ কথা বলবে না। আর তাদের সকলের কথা হবে, اللَّهُمَّ سَلَّمْ سَلِّمْ 'হে আল্লাহ! বাঁচাও বাঁচাও!! আর জাহান্নামের মধ্যে সা'দানের কাঁটার ন্যায় আংটা থাকবে। সেগুলির বিরাটত্ব সম্পর্কে একমাত্র আল্লাহই ভালো জানেন। ঐ আংটাগুলি লোকদের আমল অনুপাতে আঁকড়িয়ে ধরবে। ফলে কিছুসংখ্যক লোক তাদের দুষ্কর্মের কারণে ধ্বংস হয়ে যাবে। কেউ টুকরা টুকরা হয়ে যাবে এবং পরে মুক্তি পাবে। অবশেষে যখন আল্লাহ বান্দাদের বিচার কার্য শেষ করবেন এবং সবশেষে জাহান্নামবাসীদের কিছু লোককে নাজাত দেওয়ার ইচ্ছা করবেন, যারা এই সাক্ষ্য দিয়েছে যে, আল্লাহ ব্যতীত কোন উপাস্য নেই; তখন তিনি ফেরেশতাদের আদেশ করবেন, যারা কেবলমাত্র আল্লাহ্ ইবাদত করেছে, তাদেরকে তোমরা বের করে আন। তখন তারা কপালে সিজদার চিহ্নধারীদেরকে জাহান্নাম থেকে বের করে আনবেন। কেননা আল্লাহ সিজদার চিহ্ন দগ্ধ করতে আগুনের উপর হারাম করে দিয়েছেন। এটুকু ব্যতীত তাদের সর্বাঙ্গ পুড়ে কয়লা হয়ে যাবে। তখন তাদের উপর সঞ্জীবনী পানি (مَاءُ الْحَيَاةِ) ঢেলে দেওয়া হবে। তাতে তারা এমনভাবে সজীব হয়ে উঠবে, যেমন কোন বীজ কোন প্রবহমান পানির ধারে অংকুরিত হয়ে ওঠে'...।৪১
ত্বীবী বলেন, এ লোকগুলি জাহান্নামে শাস্তিপ্রাপ্ত হওয়ার পর শাফা'আতের মাধ্যমে অথবা আল্লাহ্ বিশেষ অনুগ্রহে মুক্তি পাবে। এভাবে মুমিনদের মধ্যে তিনটি দল হবে' (মিরক্কাত)। একদল যারা পায়ের নলায় সিজদা করতে সক্ষম হবে, তারা নিরাপদে মুক্তি পাবে। আরেকদল সিজদায় অক্ষম হবে, তারা ক্ষত-বিক্ষত হয়ে জাহান্নামে পতিত হওয়ার পর শাস্তি ভোগ করবে। অতঃপর মুক্তি পাবে। আরেকদল শাফা'আতের কারণে অথবা তাদের খালেছ ঈমানের কারণে আল্লাহ্ বিশেষ অনুগ্রহে সবশেষে মুক্তি পাবে।

টিকাঃ
৩৮. আহমাদ হা/২৪২৬১, সনদ ছহীহ; হাকেম হা/৮৭২৭; মিশকাত হা/৫৫৬২।
৩৯. ছহীহ ইবনু হিব্বান হা/৭৩৩৩; ছহীহাহ হা/২৮১৭, রাবী আবু হুরায়রা (রাঃ)।
৪০. বুখারী হা/৭৪৩৯; মুসলিম হা/১৮৩ (৩০২); মিশকাত হা/৫৫৭৯, রাবী আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ)।
৪১. বুখারী হা/৮০৬; মুসলিম হা/১৮২; মিশকাত হা/৫৫৮১, রাবী আবু হুরায়রা (রাঃ)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00