📄 পরীক্ষায় জিততে হবে
ইবলীস জান্নাত থেকে বহিষ্কৃত হ’লেও মানুষের বেশ ধরে অথবা মানুষের রগ-রেশায় ঢুকে ধোঁকা দেওয়ার ও তাকে বিভ্রান্ত করার ক্ষমতা আল্লাহ ইবলীসকে দিয়েছিলেন মানুষকে পরীক্ষা করার জন্য। অতএব শয়তানের ধোঁকার বিরুদ্ধে জিততে পারলেই মানুষ তার শ্রেষ্ঠত্বের মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখতে পারবে এবং আখেরাতে জান্নাত লাভে ধন্য হবে। নইলে ইহকালে ও পরকালে সে ব্যর্থকাম হবে। যেমন আল্লাহ বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا ادْخُلُوا فِي السِّلْمِ كَافَّةً، وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ مُبِينٌ - فَإِنْ زَلَلْتُمْ مِنْ بَعْدِ مَا جَاءَتْكُمُ الْبَيِّنَاتُ فَاعْلَمُوا أَنَّ اللَّهَ عَزِيزٌ حَكِيمٌ 'হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা পরিপূর্ণভাবে ইসলামে প্রবেশ কর এবং শয়তানের পদাংক অনুসরণ করো না। নিশ্চয়ই সে তোমাদের প্রকাশ্য দুশমন'। 'আর তোমাদের নিকট স্পষ্ট নিদর্শনাদি এসে যাওয়ার পরেও যদি তোমরা পদস্খলিত হও, তাহ'লে জেনে রেখ যে, আল্লাহ মহা পরাক্রান্ত ও প্রজ্ঞাময়' (বাক্বারাহ ২/২০৮-৯)। মানুষের প্রতি ফেরেশতাদের সিজদা করা ও ইবলীসের সিজদা না করার মধ্যে ইঙ্গিত রয়েছে এ বিষয়ে যে, মানুষ যেন প্রতি পদে পদে শয়তানের ব্যাপারে সতর্ক থাকে এবং আল্লাহ্ প্রতি আনুগত্যের মাধ্যমে নিজের শ্রেষ্ঠত্বের মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখে (দ্র. নবীদের কাহিনী ১/১৮)।
বর্তমান পৃথিবীতে যাবতীয় অশান্তির মূলে রয়েছে আল্লাহকে ছেড়ে শয়তানের দাসত্ব। যেকারণে ভূপৃষ্ঠের সর্বত্র প্রতিনিয়ত হানাহানি-কাটাকাটির বিস্তার ঘটছে। আল্লাহ বলেন, ظَهَرَ الْفَسَادُ فِي الْبَرِّ وَالْبَحْرِ بِمَا كَسَبَتْ أَيْدِي النَّاسِ لِيُذِيقَهُمْ بَعْضَ الَّذِي عَمِلُوا لَعَلَّهُمْ يَرْجِعُونَ ‘স্থলভাগে ও সমুদ্রে সর্বত্র বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়ছে মানুষের কৃতকর্মের ফল হিসাবে। এর মাধ্যমে আল্লাহ তাদের কৃতকর্মের কিছু স্বাদ আস্বাদন করাতে চান, যাতে তারা (তওবা করে আল্লাহ্ পথে) ফিরে আসে' (রূম ৩০/৪১)। অতএব দুনিয়াতে বিপর্যয় ও অশান্তি থেকে বাঁচতে গেলে ও পরকালে জান্নাত পেতে চাইলে সার্বিক জীবনে আল্লাহ্ বিধান মেনে চলতে হবে এবং যে কোন মূল্যে শয়তানী ধোঁকার বিরুদ্ধে জিততে হবে।
📄 জীবনের সফরসূচী
জীবনের সফরসূচী:
মানব জীবনের সফরসূচী শুরু হয় আল্লাহ্র নিকট থেকে মায়ের গর্ভে আসার মধ্য দিয়ে। এটা হ'ল তার সফরের প্রথম মনযিল। এখানে সাধারণতঃ ৯ মাস ১০ দিন থাকার পর ভূমিষ্ট হয়ে সে দুনিয়াতে আসে। মায়ের গর্ভে থাকা অবস্থায় ১২০ দিনের মাথায় সেখানে তার তাক্বদীর লিখে দেওয়া হয়। তার 'আজাল' (আয়ুষ্কাল), 'আমল' (কর্ম তৎপরতা), 'রিযিক' এবং সে 'হতভাগ্য' (জাহান্নামী) হবে, না 'সৌভাগ্যবান' (জান্নাতী) হবে। অতঃপর তার দেহে রূহ ফুঁকে দেওয়া হয়'। যেভাবে ঔষধ প্রস্তুত শেষে প্যাকেটের উপর লিখে দেওয়া হয় তার মেয়াদ কাল, তার ক্রিয়া, ব্যবহারের নিয়মাবলী এবং তার ফলাফল। এটা হ'ল দ্বিতীয় মনযিল বা 'দারুদ্দুনিয়া'। এখানে সে কমবেশী ৭০ বছর অবস্থান করে। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, أَعْمَارُ أُمَّتِي مَا بَيْنَ السَّتِّينَ إِلَى السَبْعِينَ، وَأَقَلُّهُمْ مَنْ يَجُوزُ ذَلِكَ - উম্মতের গড় আয়ু ষাট থেকে সত্তর বছরের মধ্যে হবে। খুব কম সংখ্যকই তা অতিক্রম করবে'।
মানুষের জীবন চারটি স্তরে বিভক্ত: (ক) শৈশবের দুর্বলতা (১-১৬ বছর)। (খ) যৌবনের শক্তিমত্তা (১৬-৪০ বছর)। (গ) প্রৌঢ়ত্বের পূর্ণতা (৪০-৬০ বছর) এবং (ঘ) বার্ধক্যের দুর্বলতা (৬০-৭০ বছর)। অতঃপর নির্দিষ্ট মেয়াদ শেষে মৃত্যু ও কবরে গমন।১০ এটা হ'ল তৃতীয় মনযিল বা 'দারুল বারযাখ' (মুমিনূন ২৩/১০০)। এখান থেকে তার আখেরাতের সফর শুরু হয়। যা শেষ হবে ক্বিয়ামতের দিন। কবর হবে তার জন্য জান্নাতের বিছানা অথবা জাহান্নামের অগ্নিসজ্জা'। ১১
টিকাঃ
৮. বুখারী হা/৬৫৯৪; মুসলিম হা/২৬৪৩; মিশকাত হা/৮২, রাবী আব্দুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রাঃ)।
৯. তিরমিযী হা/৩৫৫০; ইবনু মাজাহ হা/৪২৩৬; মিশকাত হা/৫২৮০, রাবী আবু হুরায়রা (রাঃ)।
১০. এজন্য ছবিসহ দেখুন ও বাড়ীতে টাঙিয়ে রাখুন, হাদীছ ফাউণ্ডেশন বাংলাদেশ প্রকাশিত দেওয়ালপত্র: হে মানুষ! আল্লাহকে ভয় কর!! নিম্নে তোমার জীবনের সফরসূচী দেখে নাও!
১১. আবুদাউদ হা/৪৭৫৩; আহমাদ হা/১৮৫৫৭; মিশকাত হা/১৩১, রাবী বারা বিন 'আযেব (রাঃ)।
📄 মৃত্যু থেকে বাঁচার উপায় নেই
মৃত্যু থেকে বাঁচার উপায় নেই )لا مناص من الموت : দুনিয়ার পাগলেরা সুদৃঢ় ও সুউচ্চ প্রাসাদসমূহ নির্মাণ করে। অথচ তাকে চলে যেতে হবে সব ছেড়ে মাটির গর্তে। যেখানে তার নীচে-উপরে ও ডাইনে-বামে থাকবে স্রেফ মাটি আর মাটি। যা থেকে সে সারা জীবন গা বাঁচিয়ে চলেছে। আল্লাহ বলেন, أَيْنَمَا تَكُونُوا يُدْرِكْكُمُ الْمَوْتُ وَلَوْ كُنْتُمْ فِي - بُرُوْحِ مُّشَيَّدَةٍ 'যেখানেই তোমরা থাক না কেন, মৃত্যু তোমাদের পাকড়াও করবেই। এমনকি যদি তোমরা সুদৃঢ় দুর্গেও অবস্থান কর' (নিসা ৪/৭৮)। كُلُّ نَفْسٍ ذَائِقَةُ الْمَوْتِ ثُمَّ إِلَيْنَا تُرْجَعُونَ - তিনি বলেন, 'প্রত্যেক প্রাণীই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে। অতঃপর তোমরা আমাদের নিকটে প্রত্যাবর্তিত হবে' (আনকাবুত ২৯/৫৭)। তিনি আরও বলেন, كُلُّ نَفْسٍ ذَائِقَةُ الْمَوْتِ وَنَبْلُوكُمْ بِالشَّرِّ وَالْخَيْرِ فِتْنَةً وَإِلَيْنَا تُرْجَعُونَ করবে। আর আমরা তোমাদেরকে মন্দ ও ভাল দ্বারা পরীক্ষা করে থাকি এবং আমাদের কাছেই তোমরা প্রত্যাবর্তিত হবে' (আম্বিয়া ২১/৩৫)।
প্রাণী মাত্রই মৃত্যুবরণ করবে। জন্ম ও মৃত্যু অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। দু'টির কোনটিরই ক্ষমতা মানুষের হাতে নেই। আল্লাহর হুকুমেই জন্ম হয়। আল্লাহ্ হুকুমেই মৃত্যু হয়। কখন হবে, কোথায় হবে, কিভাবে হবে, তা কারো জানা নেই। জীবনের সুইচ তাঁরই হাতে, যিনি জীবন দান করেছেন। অতঃপর জীবনদাতার সামনে হাযিরা দিয়ে জীবনের পূর্ণ হিসাব পেশ করতে হবে। হিসাব শেষে জান্নাত বা জাহান্নাম নির্ধারিত হবে ও সেখানেই চিরকাল শান্তিতে বসবাস করবে অথবা শাস্তি ভোগ করবে। দুনিয়ার এ চাকচিক্যে আমরা পরকালকে ভুলে যাই। অথচ নির্দিষ্ট আয়ুষ্কাল শেষে আমাদের সেখানে যেতেই হবে। কেউ আমাদের জগত সংসারে ধরে রাখতে পারবে না।
কবি বলেন, أَلَا يَا سَاكِنَ الْقَصْرِ الْمُعَلَّى + سَتُدْفَنُ عَنْ قَرِيبٍ فِي التَّرَابِ قَلِيْلُ عُمْرُنَا فِي دَارِ دُنْيَا + وَمَرْجَعُنَا إِلَى بَيْتِ التَّرَابِ
(১) 'শোন হে সুউচ্চ প্রাসাদের অধিবাসী! + সত্বর তুমি দাফন হবে মাটিতে'। (২) 'ইহকালে আমরা আমাদের জীবনের অল্প সময়ই কাটিয়ে থাকি + আর আমাদের প্রত্যাবর্তন স্থল হ'ল মাটির ঘরে (কবরে)'।
📄 মৃত্যুকাল পূর্ব নির্ধারিত
মৃত্যুকাল পূর্ব নির্ধারিত: وَمَا كَانَ لِنَفْسٍ أَنْ تَمُوْتَ إِلَّا بِإِذْنِ اللهِ كِتَابًا مُؤَجَّلاً (১) আল্লাহ বলেন, 'আল্লাহ্ হুকুম ছাড়া কেউ মরতে পারে না। সেজন্য একটা নির্ধারিত সময়কাল রয়েছে...' (আলে ইমরান ৩/১৪৫)। (২) তিনি বলেন, إِنَّ اللَّهَ عِنْدَهُ عِلْمُ السَّاعَةِ وَيُنَزِّلُ الْغَيْثَ وَيَعْلَمُ مَا فِي الْأَرْحَامِ وَمَا تَدْرِي نَفْسٌ مَّاذَا تَكْسِبُ غَدًا، وَمَا تَدْرِي نَفْسٌ بِأَيِّ أَرْضِ تَمُوْتُ إِنَّ اللَّهَ عَلِيْمٌ خَبِيرٌ - আল্লাহর নিকটেই রয়েছে ক্বিয়ামতের জ্ঞান। আর তিনিই বৃষ্টি বর্ষণ করেন এবং তিনিই জানেন মায়ের গর্ভাশয়ে কি আছে। কেউ জানে না আগামীকাল সে কি উপার্জন করবে এবং কেউ জানে না কোন মাটিতে তার মৃত্যু হবে। নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বজ্ঞ ও সকল বিষয়ে সম্যক অবহিত' (লোকমান ৩১/৩৪)। (৩) তিনি আরও বলেন, - فَإِذَا جَاءَ أَجَلُهُمْ لاَ يَسْتَأْخِرُونَ سَاعَةً وَلاَ يَسْتَقْدِمُونَ
'...অতঃপর যখন তাদের সময়কাল এসে যাবে, তখন তারা সেখান থেকে এক মুহূর্ত পিছাতেও পারবেনা, আগাতেও পারবে না' (নাহল ১৬/৬১)।
(৪) স্বীয় কওমের প্রতি নূহ (আঃ)-এর দাওয়াতের বর্ণনা দিয়ে আল্লাহ বলেন, قَالَ يَا قَوْمِ إِنِّي لَكُمْ نَذِيرٌ مُّبِينٌ - أَنِ اعْبُدُوا اللهَ وَاتَّقُوهُ وَأَطِيعُونِ يَغْفِرْ * لَكُمْ مِنْ ذُنُوبِكُمْ وَيُؤَخِّرْكُمْ إِلَى أَجَلٍ مُّسَمًّى إِنَّ أَجَلَ اللَّهِ إِذَا جَاءَ لَا يُؤَخِّرُ لَوْ كُنْتُمْ تَعْلَمُونَ 'সে বলল, হে আমার কওম! আমি তোমাদের জন্য স্পষ্ট সতর্ককারী' (২)। 'তোমরা আল্লাহ্ ইবাদত কর ও তাঁকে ভয় কর এবং আমার আনুগত্য কর' (৩)। 'তাহ'লে তিনি তোমাদের পাপ সমূহ ক্ষমা করবেন ও নির্ধারিত সময়কাল পর্যন্ত অবকাশ দিবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহর নির্ধারিত সময়কাল যখন এসে যাবে, তখন আর অবকাশ দেওয়া হবে না, যদি তোমরা তা জানতে' (নূহ ৭১/২-৪)। অর্থাৎ তোমাদেরকে গযবে ধ্বংস না করে তোমাদের স্বাভাবিক মৃত্যুকাল অবধি দুনিয়ায় বেঁচে থাকার সুযোগ দেওয়া হবে।
এতে প্রমাণিত হয় যে, স্বাভাবিক মৃত্যুকালের আগেও আল্লাহ মানুষকে মারতে পারেন যুদ্ধ-বিগ্রহ, মহামারি ইত্যাদি নানা কারণে এবং সেটাও তার তাক্বদীরে পূর্বেই লিপিবদ্ধ থাকে। এ কারণেই হাদীছে এসেছে, صَدَقَةُ السِّر تُطْفِئُ غَضَبَ الرَّبِّ وَصِلَةُ الرَّحِمِ تَزِيدُ فِي الْعُمُرِ وَفِعْلُ الْمَعْرُوفِ يَقِي مَصَارِعَ السُّوْءِ 'গোপনে ছাদাক্বা আল্লাহ্ ক্রোধকে নিভিয়ে দেয়। আত্মীয়তার সুসম্পর্ক মানুষের আয়ু বৃদ্ধি করে। সৎকর্ম মানুষকে মন্দ পতন থেকে রক্ষা করে'। ১২ অর্থাৎ স্বাভাবিক মৃত্যুকাল অবধি তার আয়ু প্রলম্বিত হয়' (মর্মার্থ: তাফসীর কুরতুবী, ইবনু কাছীর)।
টিকাঃ
১২. বায়হাক্বী শো'আব হা/৩৪৪২; ছহীহুল জামে' হা/ ৩৭৬০, রাবী আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ)।