📘 মিরাসুল আম্বিয়াঃ নাবীদের উত্তরাধিকার > 📄 ওলামায়ে কেরামের বক্তব্য ও মতামত

📄 ওলামায়ে কেরামের বক্তব্য ও মতামত


শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয় (রহঃ) বলেন: কোনো কিছু ফরজ করা এবং হারাম করার অধিকার একমাত্র আল্লাহ তায়ালার এবং তাঁর রাসুলের (সঃ)। তাই আল্লাহ তায়ালা ও তাঁর রাসুলের (সঃ) নির্দেশ ছাড়া যে ব্যক্তিকে শাস্তি দিলো এবং তা আইন বা নীতি হিসেবে গ্রহণ করলো সে আল্লাহর সাথে অন্যকে শরীক বা সমকক্ষ বানিয়ে নিলো এবং অন্যকে নবীর সমকক্ষ বানিয়ে নিলো, যেমনিভাবে মুশরিকরা আল্লাহর সাথে অন্যকে শরীক বানিয়ে ছিলো আর মুসাইলামাতুল কাযযাব (মিথ্যা নবী) কে রাসুল (সঃ) এর সমকক্ষ বানিয়েছিলো। এরা তাদেরই পর্যায়ভূক্ত, যাদের ব্যাপারে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেনঃ أَمْ لَهُمْ شُرَكُوا شَرَعُوا لَهُمْ مِنَ الدِّينِ مَا لَمْ يَأْذَنْ بِهِ اللَّهُ "তাদের কি এমন শরীক দেবতা আছে যারা তাদের জন্য সেই দ্বীনকে ঠিক করে দিয়েছে, যার অনুমতি আল্লাহ তায়ালা দেন নি।" (আশ শুরাঃ২১)
ইমাম ইবনে হাযম (রহঃ) إِنَّمَا النَّسِيُّ زِيَادَةٌ فِي الْكُفْرِ يُضَلُّ بِهِ الَّذِينَ كَفَرُوا يُحِلُّونَهُ عَامًا وَيُحَرِّمُونَهُ عَامًا لِيُواطِئُوا عِدَّةَ مَا حَرَّمَ اللهُ ، فَيُحِلُّوا مَا حَرَّمَ اللَّهُ ، زُيِّنَ لَهُمْ سُوءُ أَعْمَالِهِمْ ، وَاللَّهُ لَا يَهْدِي الْقَوْمُ الْكُفِرِينَ "নিশ্চয়ই মাস পিছিয়ে দেয়ার কাজ শুধুমাত্র কুফরীর মাত্রাকেই বৃদ্ধি করে, যার ফলে কাফেররা গোমরাহীতে পতিত হয়। তারা একে হালাল করে নেয় এক বছর এবং হারাম করে নেয় অন্য বছর, যাতে তারা আল্লাহর নিষিদ্ধ মাসগুলোর গণনা পূর্ণ করে নিতে পারে। অতঃপর তারা হালাল করে নেয় আল্লাহর হারামকৃত মাসগুলোকে। তাদের মন্দ কাজগুলো তাদের জন্য চাকচিক্যময় করে দেয়া হয়েছে। আর আল্লাহ তায়ালা কাফেরদেরকে হেদায়াত করেন না।" (আত তাওবাহঃ ৩৭)
এ আয়াতের ব্যাখ্যা প্রসংগে বলেন: যে ভাষায় কুরআন নাযিল হয়েছে সে ভাষার একটি হিকমত (কৌশল বা পান্ডিত্য) কোনো জিনিসের زيادة (যার অর্থ বেশী বা অতিরিক্ত) এর অর্থ হচ্ছে উক্ত জিনিসেরই অংশ। জিনিসটির বহির্ভুত কিছু নয়। অতএব কোনো মাসকে তার নির্ধারিত সময় থেকে পিছিয়ে দেয়া কুফরী এটাই প্রমাণিত হলো। এটা এমন কাজ যা দ্বারা আল্লাহর হারামকৃত জিনিসকে হালাল করা হয়। যে ব্যক্তি আল্লাহ তায়ালার হারামকৃত জিনিস হালাল করে অথচ সে জানে যে জিনিসটি আল্লাহ তায়ালা হারাম করেছেন, তাহলে সে এ কর্মের দ্বারাই কাফের হয়ে যাবে।
প্রিয় পাঠক, তাঁর কথা লক্ষ্য করুন : “এটি এমন একটি কাজ এবং আল্লাহর তায়ালার হারামকৃত জিনিসকে হালাল করে অথচ সে জানে যে, জিনিসটি আল্লাহর তায়ালা হারাম করেছেন।”
এতে শিক্ষনীয় বিষয় হচ্ছে এই যে, কোনো সময় আমল বা কর্ম ব্যতীত কেবল বিশ্বাসগতভাবে (إستحلال )হারাম হালাল করার ইচ্ছা বা বাসনা) হতে পারে। আবার কখনো বিশ্বাস ও কর্ম একত্রে হতে পারে। আবার কখনো শুধুমাত্র কর্মও সংঘটিত হতে পারে। হারামকে হালাল করার ক্ষেত্রে বিশ্বাস থাকার বিষয়টি শুধু কুফরীর সাথেই সীমাবদ্ধ নয় বরং কুফরীর চেয়েও বেশী। এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, মদ্যপান অথবা জ্বিনা ব্যভিচারে পতিত হওয়া এবং সুদ খাওয়া আর এগুলোর জন্য বিভিন্ন আইন কানুন, রীতি নীতি রচনা করা যার দ্বারা আল্লাহর নির্ধারিত আইনের সীমা রেখা পরিবর্তন করা হয়, অথবা মদ্যপান ও জ্বিনা-ব্যভিচার সহজ করে দেয়া হয়, অথবা মুরতাদ হওয়ার বৈধতার জন্য লাইসেন্স দেয়া হয়, অথবা সুদের অনুমতিসহ এ সব অবৈধ বিষয়গুলোর পৃষ্ঠপোষকতা ও সংরক্ষনের জন্য দেশ শাসনের নীতি হিসেবে সভা সম্মেলনের মাধ্যমে এর প্রতি গুরুত্ব আরোপ করা হয়! কখনো সমান অপরাধ হতে পারে না। প্রথম বিষয়টির (অর্থাৎ হালালকে হারাম আর হারামকে মনে না করে মদ্য ও ব্যভিচারের মতো অন্যায় কাজে পতিত হওয়ার) ক্ষেত্রে কাফের বলার ব্যাপারে হালাল মনে করে পাপ কাজটি করা হয়েছিলো কি না এ বিষয়টি অবশ্যই দেখতে হবে, কারণ এ সব গুনাহ করলেই কাফের হয়ে যায় না।
আর দ্বিতীয় বিষয়টি আইন রচনা, হারামকে হালাল এবং হালালকে হারাম করার মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি কাফের হয়ে যাবে। এ ক্ষেত্রে এতেকাদ বা বিশ্বাসের দিকে কোনো দৃষ্টিপাত করা হবে না। এ সব কাজ যে করে সে যদি হাজার হাজার বার কসম করেও বলে যে, হারামকে হালাল মনে করে এ সব করিনি তবু তার কথার প্রতি কোনো ভ্রুক্ষেপ করা হবে না।
لَا تَعْتَذِرُوا قَدْ كَفَرْتُمْ
এ সব লোকদেরকে বলা হবে, আল্লাহ তায়ালা তোমাদেরকে মিথ্যুক বলে আখ্যায়িত করেছেন, তোমাদের ঈমানকে আল্লাহ তায়ালা তোমাদের নিছক দাবী বলে ঘোষণা দিয়েছেন। অতএব যে ব্যক্তি নিছক গুনাহের কাজ মনে করে সুদের কারবার করে, আর যে ব্যক্তি সুদের কারবার করার জন্য অনুমতি বা লাইসেন্স দেয়, এর জন্য আইন রচনা করে, সুদী প্রতিষ্ঠান সমূহের হেফাজত করে, এর প্রতি তাগিদ দেয়, পরিভাষা তৈরী করে, তার মধ্যে আকাশ পাতাল পার্থক্য রয়েছে। এমনি ভাবে যে ব্যক্তি শুধু মদ পান করে, আর যে ব্যক্তি মদ্য পানের লাইসেন্স দেয়, মদ ক্রয়-বিক্রয়ের জন্য দোকানের অনুমতি দেয়, দোকান সংরক্ষনের ব্যবস্থা করে, তার নিজস্ব আইন প্রণয়নের মাধ্যমে আল্লাহ প্রদত্ত শাস্তির সীমা রেখাকে পরিবর্তন করে, তার মধ্যেও রয়েছে বিরাট পার্থক্য।
যে ব্যক্তি কোনো অন্যায় ও অশ্লীল আহবানে সাড়া দিয়ে অপরাধ বা অন্যায় মনে করে ব্যভিচার পতিত হলো, আর যে ব্যক্তি জ্বিনায় খোদা প্রদত্ত সীমা রেখাকে পরিবর্তন করলো এবং এমন আইন প্রণয়নের মাধ্যমে পতিতাদের জন্য ব্যভিচারকে বৈধতার অনুমতি দিলো, যে আইন কেবল স্বামীর ক্ষেত্রে জ্বেনাকে অন্যায় বলে বিবেচনা করে। কেননা উক্ত আইনে স্বামীর অনুমতিতে জ্বিনা করলে তা অন্যায় হিসেবে গণ্য নয় এবং এর জন্য কোনো শাস্তির বিধানও নেই। বরং তার কাছে এ কাজ বৈধ তার মধ্যেও রয়েছে আকাশ পাতাল ব্যবধান।
অতএব বিধান রচনা করা, হালালকে হারাম করা অথবা হারামকে হালাল করা নির্ঘাত কুফরী কাজ। এসব কুফরী কাজ ঐসব গুনাহর মত নয় যে গুলোতে কাফের সাব্যস্ত করার জন্য ইস্তহলাল (হারামকে হালাল মনে করা) এর আক্বীদা শর্ত। এ সব কাজে আক্বীদার বিষয়টি যোগ করা যেতে পারে শুধু কুফরীর আধিক্য বুঝানোর জন্য। এ কাজ নির্ভেজাল কুফরী। এখানে কুফরী সাব্যস্ত করার জন্য আক্বীদার প্রয়োজন নেই। কারণ এখানে কুফরী সাব্যস্ত করার জন্য আক্বীদা বা বিশ্বাস শর্ত নয়। যে সব মুশরিকরা নিষিদ্ধ মাসগুলোকে (যুদ্ধ বিগ্রহ নিষিদ্ধ যেমন মহররম) অন্য সময় দ্বারা পরিবর্তন করে যুদ্ধের জন্য বৈধ করে নিয়েছে তারা একথা জানতো এবং মনের গভীরে বিশ্বাস করতো যে, সেগুলোই প্রকৃত পক্ষে নিষিদ্ধ মাস যেগুলো আল্লাহ তায়ালার কাছে নিষিদ্ধ। তারা যে মাসগুলোকে নিষিদ্ধ হিসেবে অবিস্কার করেছে এবং পরিবর্তন করেছে সেগুলো নিষিদ্ধ মাস নয়। এমনি ভাবে ইহুদীরাও এ ধারনাই পোষণ করতো যখন তারা জ্বিনার "হদ" বা শাস্তিকে নিজের মন গড়া আইন দিয়ে পরিবর্তন করে ফেলে ছিলো। তারা কিন্তু জ্বিনা হালাল মনে করেনি। তারা এ ব্যাপারে আইন প্রণয়ন কিংবা আইনের পরিবর্তন সাধনের জন্য এ ঘোষণা দেয়নি যে, তারা অন্তর দিয়ে জ্বিনা হালাল মনে করে। এখানে আইন প্রণয়ন এবং আল্লাহর আইনে পরিবর্তন সাধনের কাজটিই হচ্ছে কুফরী। অতএব তারা এখানে যাই বলুকঃ আল্লাহর নিষিদ্ধকৃত মাসগুলোই প্রকৃত পক্ষে নিষিদ্ধ মাস। আল্লাহর কথাই ঠিক অথবা জ্বিনার শাস্তির ব্যাপারে আল্লাহ প্রদত্ত বিধানই ঠিক ও সত্য। এখানে আক্বীদা বিশ্বাসের উল্লেখ করার কোনো মূল্য নেই। তবে আক্বীদার কথা উল্লেখ করলে তা হবে শুধু কুফরীর আধিক্য বুঝানোর জন্য।
আমি বলছি এ ক্ষেত্রে দলীল ও প্রমাণ হচ্ছে, যা ইমাম আহমাদ এবং নাসায়ী যা বর্ণনা করেছেন। আর তা হচ্ছে হযরত বাররা বিন আযিব থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: আমার খালু বুরদা এর সাথে আমার সাক্ষাৎ হলো, তাঁর সাথে তখন ঝান্ডা ছিলো। তখন তিনি (তাঁর খালু) বললেন: আমাকে রাসূল ঐ ব্যক্তিকে হত্যা ও তার সম্পদ নিয়ে যাওয়ার জন্য পাঠিয়েছেন, যে ব্যক্তি নিজের বাপের স্ত্রীকে বিয়ে করেছে । (আহমদ নাসায়ী (নিকাহ নামক অধ্যায়) পৃষ্ঠা যথাক্রমে ৪/২৯৫, ৬/১০৯,১১০,
ইবনু আবি খাইশমা তাঁর তারিখে (ইতিহাসে) মুয়াবিয়া বিন কুবরা তাঁর পিতা থেকে এবং তিনি তাঁর দাদা থেকে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূল (সঃ) তাঁকে এমন এক ব্যক্তির কাছে পাঠিয়ে ছিলেন যে তার বাপের স্ত্রীর সাথে বাসর করেছিলো (অর্থ্যৎ বিয়ে করেছিলো) অতঃপর রাসূল (সঃ) এর নির্দেশে ঐ ব্যক্তিকে তিনি হত্যা করলেন। এবং গনিমতের মাল হিসেবে তার সম্পদ নিয়ে নিলেন। ইবনুল কায়্যিম বলেছেন, ইয়াহ ইয়া বিন মুঈন বলেছেন: এ হাদীসছি ছহীহ।
(তিরমিজী ১৩৬২ নং হাদীস, আবুদাউদ নং হাদীস ৪৪৫৭)
শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়া (রহঃ) বলেন: আবু বারদাহ বিন নায়ারের হাদীসও এ বিষয়ের একটি দলীল। তাঁকে যখন রাসূল (সঃ) সেই ব্যক্তির কাছে পাঠালেন যে নিজ পিতার স্ত্রীকে বিয়ে করেছিলো। রাসূল (সঃ) তাঁকে ঐ ব্যক্তিকে হত্যার এবং তার সমপদ গনিমত হিসেবে গ্রহণের নির্দেশ দিলেন, মালে গণিমত হিসেবে গ্রহণের নির্দেশ একথারই প্রমাণ পেশ করে যে, ঐ ব্যক্তি কাফের ছিলো ফাসেক নয়। তার কুফরীটা ছিলো এইযে, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল যা হারাম করেছেন, সে তা হারাম করেনি। (মাজমুআ ফতোয়া ৯০/৯১পৃঃ)
الدفاع عن اهل আল্লামা শাইখ হামাদ বিন আতীক (রহঃ) তাঁর السنة والاتباع নামক পুস্তিকায় বলেন: অষ্টম দিক হচ্ছে যা ইমাম আহমাদ এবং নাসায়ী হযরত বাররা বিন আযিব থেকে বর্ণনা করেছেনঃ তিনি বলেনঃ আমার খালু আবু বুরদার সাথে আমার সাক্ষাৎ হলো। তখন তাঁর সাথে ঝান্ডা বা পতাকা ছিলো। তিনি বললেন: রাসূল (সঃ) আমাকে এমন এক ব্যক্তিকে হত্যা করা এবং তার সম্পদকে হস্তগত করার জন্য পাঠিয়েছেন, যে তার পিতার স্ত্রীকে বিয়ে করেছে। ইবনু খাইছামা তাঁর ইতিহাসে একটি হাদীস উল্লেখ করেছেন যে, হাদীসটি মুয়াবিয়া বিন কুবরা তাঁর দাদা থেকে বর্ণনা করেছেন। রাসূল (সঃ) তাকে [দাদাকে] এমন এক ব্যক্তির কাছে পাঠিয়েছিলেন যে তার পিতার স্ত্রীর সাথে বাসর করছিলো (অর্থাৎ বিয়ে করেছিলো।) অতঃপর তিনি তাকে হত্যা করলেন এবং গনিমত হিসেবে তার মাল নিয়ে নিলেন (অর্থাৎ বাইতুল মালে জমা দিলেন)।
ইমাম আহমাদ যে ব্যক্তি তার পিতার স্ত্রীকে বিয়ে করে অথবা কোনো মাহরামকে (এমন স্ত্রী লোক যাকে বিয়ে করা শরীয়তে হারাম যেমন মা, খালা, ফুফু নিজের বোন) বিয়ে করে তার ব্যাপারে বলেছেন যে, তাকে হত্যা করা হবে এবং তার সম্পদ বাইতুল মালে জমা দেয়া হবে। এটা সুস্পষ্ট কথা যে, যে ব্যক্তির কাছে থেকে আল্লাহর হারাম বিষয়গুলোর হালাল মনে করে কোনো কাজ করা প্রকাশ পাবে সে ব্যক্তি কুফরীতে লিপ্ত এবং সে হত্যার যোগ্য। এমতাবস্থায় অন্তরে তার কুফরী আছে কিনা, তা জানা শর্ত করা হয়নি। এ ব্যাপারে ইজমা বা ঐক্যমত প্রতিষ্ঠিত হয়েছে অনেক ওলামায়ের পক্ষ থেকে। তাঁদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছেন শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়া (রহঃ) (আদদিফায় আন্ আহলে সুন্নাহ ওয়াল ইত্তিবাহ ৭৬পৃঃ)
এখানে এটা সুস্পষ্ট ভাবে প্রতিয়মান হচ্ছে যে, জ্ঞানী ব্যক্তিগণ মাহরামের সাথে জ্বিনাকার ব্যক্তি (নাউযুবিল্লাহ) আর মাহরাম ব্যক্তিকে (যাকে বিয়ে করা হারাম) যে বিয়ে করে তার মধ্যে বিরাট পার্থক্য নির্ণয় করেছেন। প্রথমোক্ত ব্যক্তি পাপী এবং কবিরাহ গুনাহ করার অপরাধে অপরাধী। তবু সে মুসলিম মিল্লাহ থেকে খারিজ হবেনা। আর দ্বিতীয় ব্যক্তি (মাহরাম কে বিয়ে করে) সে কাফের। উপরে বর্ণিত হাদীস গুলোই এর প্রমান। সবগুলো বর্ণনাতেই প্রমাণিত হয়েছে, যে পিতার স্ত্রীকে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধকারী ব্যক্তিকে ইসলাম থেকে তারা খারিজ করে দিয়ে তাকে হত্যা করেছে। তারা তাকে একথা জিজ্ঞেস করেনি, সে তার পিতার স্ত্রীকে হালাল মনে করে বিয়ে করেছে কিনা। অতএব এখানে প্রমাণিত হলো যে ইস্তিহলাল হা:রামকে হালাল মনে করার বিষয়টি আমল বা কর্মের মাধ্যমে সব্যস্ত হয়েছে।
শাইখ আহমাদ শাকের (রহঃ) তাঁর ওমদাতুতাফসীর নামক কিতাবে الَّذِيْنَ يَأْكُلُوْنَ الرِّبَا لَا يَقُوْمُوْنَ إِلَّا كَمَا يَقُوْمُ الَّذِي يَتَخَبَّطُهُ الشَّيْطَنُ مِنَ الْمَسِ - "যারা সুদ খায় তারা কেয়ামতের দিন দন্ডায়মান হবে, যেভাবে দন্ডায়মান হয় ঐ ব্যক্তি, যাকে শয়তান আসর করে মোহাবিষ্ট করে দেয়।" (আল বাকারাহ: ২৭৫) এ আয়াতের ব্যাখ্যা প্রসংগে বলেন: রাসূল (সঃ) ইরশাদ করেছেন لعن الله اكل الربا وموكله وشاهديه وكاتبه আল্লাহ তায়ালা সুদ খোর, সুদ দাতা, সুদ লেনদেনের স্বাক্ষ্য প্রদান কারী এবং সুদের লিখকের ওপর অভিসমপাত করেছেন। তারা বলেন: স্বাক্ষ্য প্রদান এবং লেখার কাজ তো তখনই হবে যখন তা বৈধ চুক্তি নামা হিসেবে প্রকাশ করা হবে, আর তার অভ্যন্তরটা হবে ফাসেদ (বাতিল, বিশৃংখল ও বিপর্যয় সৃষ্টিকারী)। অতএব এখানে বিবেচ্য বিষয় হচ্ছে এর অর্থ বা মূল বিষয়, সূরত বা অবয়ব নয়।
শাইখ বলেন: এটা তো ছিলো তখনকার কথা, যখন মুসলমানদের দেশে ইসলামের স্বার্থে আইন বলবৎ ছিলো। সেসময় যে ব্যক্তি নাফরমানী করতো এবং তা থেকে বের হতে চাইতো তখন সে প্রকাশ্য সহীহ আমলের কৌশল অবলম্বন করতো আর বর্তমান সময়ে অধিকাংশ দেশই ইসলামে নিজেদের সম্পর্কের দাবী করে এবং ইসলামী দেশ বা রাষ্ট্র হিসেবে দেশের নামকরণ করে অতঃপর দ্বীন ইসলাম বাদ দিয়ে মানব রচিত আইনে দেশ শাসন করে। পৌত্তলিক খৃষ্টান আইন এবং নাস্তিক্যবাদী আইন থেকে চয়নকৃত আইন দ্বারা দেশ পরিচালনা করা হয়। এ সব শাসকেরা এতটুকু নির্লজ্জ যে প্রকাশ করার জন্য বাহ্যিক সহীহ আমলের প্রয়োজন বোধ করে না বরং তারা বীরদর্পে প্রকাশ্যে চুক্তিনামাগুলো লেখেন বা সম্পাদন করেন। (অর্থাৎ গুণাহ পাপ ও নাফরমানী কারার ক্ষেত্রে মুসলমানদের অনুভূতি চরমভাবে লোপ পেয়েছে)। (উমরাতু তাফসীর ১৯৭/৭পৃঃ)
আল্লামা শাইখ মুহাম্মদ বিন হামিদ আল-ফকী (রহঃ) ফতহুল মজিদ নামক কিতাবের ওপর মন্তব্য করতে গিয়ে তাগুতের প্রকারবেদ উল্লেখ করার সময় বলেন: নিঃসন্দেহে এর (তাগুতের) অর্ন্তভূক্ত হচ্ছে, ইসলাম বর্হিভূত বিদেশী আইন ও বিধান এবং মানুষের জান, মাল ও ইজ্জত নিয়ন্ত্রন করার জন্য মানব রচিত যাবতীয় আইন যা দ্বারা আল্লাহর শরীয়তকে অকার্যর করা হয় এবং আল্লাহ প্রদত্ত শাস্তির বিধান কায়েম করা, সুদ, জ্বিনা, মদ ইত্যাদি হারাম করা বিষয়কে বাতিল করা হয়। যা থেকে এসব মানব রচিত আইন গৃহিত হয়েছে, যা হারাম বিষয়গুলোকে হালাল করে, এগুলো প্রয়োগের মাধ্যমে হারাম বিষয় গুলোর হেফাজত করে এবং প্রয়োগকারীদেরকেও রক্ষা করে, এসবই তাগুতের অর্ন্তভূক্ত। এ সব আইনগুলো নিজেও তাগুত, এর প্রণয়ন কারীরাও তাগুত এবং এর প্রচলন বা বাস্তবায়ন কারীরাও তাগুত। রাসূল (সঃ) কর্তৃক আনীত সত্য (ইসলামী শরীয়ত) থেকে দূরে সরানোর জন্য মানব মস্তিষ্ক প্রসূত যাবতীয় কিতাব বই পুস্তক ও লিখনী তাগুতের অর্ন্তভূক্ত। চাই ইচ্ছাকৃত ভাবে লেখা হোক, অথবা অনিচ্ছাকৃত ভাবেই হোক, সর্বাবস্থায় সে তাগুত। (ফাতহুল মাজিদ ৩৪৭-৭৬৯)
শাইখ আবদুল্লাহ বিন আবদুর রাহমান আল জাবরাইনকে যে ব্যক্তি আল্লাহর নাযিলকৃত বিধান মোতাবেক শাসন করেনা এবং এ বিষয়ে যারা استحلال এবং আক্বীদা কে শর্ত করে তাদের ব্যাপারে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন: “যারা এ বিষয়ে আক্বীদার শর্তারোপ করে, তাদের ব্যাপারে আমাদের অভিমত হচ্ছে যে, তারা ভুলের মধ্যে রয়েছে। এটা এ জন্য যে আমরা মেনে করি, যে ব্যক্তি কোনো জবরদস্তি বা বল প্রয়োগ ছাড়া এবং হত্যার কোনো হুমকি ছাড়া কোনো হারাম কাজ করে, যদি দেখা যায় সে সন্তুষ্ট চিত্তে এবং খুশীর সাথে প্রশস্ত বুকে কাজ করে যাচ্ছে, তাহলে আমরা বলবো সে হারাম কাজকে হালাল মনে করেই কাজ করছে। এবং সে একাজটাই অন্য কাজের চেয়ে বেশীভাল মনে করছে বলে যদি প্রতিয়মান হয়, তাহলে আমরা তার বহ্যিক আমলের ওপরই রায় প্রদান করবো। আর যদি সে প্রকাশ্যে কিংবা গোপনে একথা বলে যে, আমি এ কাজটিকে হালাল মনে করিনা। আমি অবৈধ কাজটি করি তবে কাজটি যে না জায়েয তা বিশ্বাস করি। তার পরও সে উক্ত কাজ বাস্তবে পরিণত করে, উক্ত কাজের প্রতি তার ঝোক প্রবনতা আছে, সে প্রকাশ্যে অন্য কাজের চেয়ে উক্ত কাজটিকে অগ্রধিকার দেয়, তাহলে আমরা তার একথাকে সত্যবলে মেনে নিবোনা, কেননা তার কথা বিশ্বাসযোগ্য নয়। বরং আমরা তাকে বলবোঃ তুমি বাহ্যিক দৃষ্টিতে নিশ্চিন্ত মনে, নির্দ্বিধায় তোমার কাজ সম্পাদন করে যাচ্ছো। অতএব তুমি তোমার কাজকে হালাল মনে করে করছো না, এ কথা আমরা গ্রহণ করতে পারছিনা। আমরা বাহ্যিক আমলের ওপরই রায় দিবো। আর তা হচ্ছে তুমি হারাম কাজকে হালাল মনে করেই করে যাচ্ছো। তোমার অন্তরের খোজ খবর নেয়া আমাদের দায়িত্ব নয়। কেননা রাসূল (সঃ) ইরশাদ করেছেনঃ
اني لم اومر ان انقب عن قلوب الناس ولا اشق بطونهم "মানুষের অন্তর পরীক্ষা করা আর তাদের পেট কেটে দুভাগ করার জন্য আমাকে নির্দেশ দেয়া হয়নি।" (বুখারী ও মুসলিম)

📘 মিরাসুল আম্বিয়াঃ নাবীদের উত্তরাধিকার > 📄 বিরোধীদের প্রতি আহবান

📄 বিরোধীদের প্রতি আহবান


সার কথা হচ্ছে যারা এ ধরনের কাজ করবে, আমরা তাদেরকে বলবোঃ হারামকে হালাল মনেকরেই কাজ করেছে, কারণ তারা তাদের হারাম কর্মের ব্যাপারে দ্বিধাহীন ছিলো, নিশ্চিন্ত ও প্রশান্ত মনে তারা কাজ করেছে। তারা বাহ্যিক দৃষ্টিতে যে কাজ করেছে, সে কাজের ভিত্তিতেই তাদের বিচার করা হবে। তারা হারামকে হালাল মনে করে কাজ করেনি, তাদের এ কথা বিবেচনার যোগ্য নয়। (ইছতেহলাল) বিষয়টি তাদের বাহ্যিক কর্মের মাধ্যমেই প্রমাণিত হবে। তাদের আমল দ্বারা তা সম্পন্ন হয়েছে। (আকওয়ালুল ফিমা বাদদালা আস সারআ)
আইন প্রণয়ন ও বিধান রচনা সংবিধানে উল্লেখিত কুফরী ধারার কতিপয় নমুনা বর্ণনা করার মাধ্যমে এ বিষয়ই আমরা পেশ করতে চেয়েছিলাম। এর দ্বারা বিধান রচনা ও আইন প্রণয়নকারী সংসদ সদস্যদের স্বরূপ সুস্পষ্ট ভাবে উন্মোচিত হয়েছে। তারা আল্লাহ তায়ালার আইন রচনার নিরঙ্কুশ অধিকারে হস্তক্ষেপ করে নিজেদেরকে তাঁর শরীক, সৃষ্টির রব এবং তাগুত হিসেবে চিহ্নিত করেছে। নিজেদেরকে আইন দাতা হিসেবে সাব্যস্ত করেছে। এ ক্ষেত্রে তাদের মধ্য থেকে কে বিপর্যয় সৃষ্টিকারী আর কে সংস্কারক এর মধ্যে কোনো পার্থক্য বা ব্যবধান নেই। কেননা তাদের প্রত্যেকেই আল্লাহর অধিকারে হস্তক্ষেপ করেছে এবং নিধারিত সীমা লংঘন করেছে। তাওহীদবাদী মুসলমানের উচিৎ তাদেরকে অস্বীকার করা এবং তাদের কাছ থেকে মুক্ত থাকা। যে ব্যক্তিই তাদেরকে আইন ও বিধান রচনা করার স্থানে বসাবে, পদবী দান করবে, বাছাই করবে, প্রার্থী বানাবে, সে আল্লাহর রুবুবিয়্যত এবং উলুহিয়্যাতের ক্ষেত্রে মুশরিক বা শিরককারী হিসেবে বিবেচিত হবে, চাই সে সৎ নিয়তেই এ কাজ করুক, অথবা খারাপ নিয়তেই করুক। আমাদের এ বক্তব্যের যারা বিরোধীতা করবে তাদেরকে আমরা চারটি বিষয়ের প্রতি আহবান জানাবো। কিতাবের (কুরআনের) দিকে, সুন্নাহর (হাদীসের) দিকে, ইজমার (মুসলিম উম্মাহর রায়) দিকে এবং এ সব অস্বীকার করলে আহবান জানাবো মুবাহালার (না হকের ওপর আল্লাহর গজব পতিত হওয়ার কামনা করে আল্লাহর কাছে সম্বিলিত দোয়া) দিকে। মুবাহালা ইসলামে বৈধ। ইসলামের অনেক ইমাম মুবাহেলার আশ্রয় নিয়েছেন। মুবাহালা প্রসংগে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন: فَمَنْ حَاجَّكَ فِيهِ مِنْ بَعْدِ مَا جَاءَ كَ مِنَ الْعِلْمِ فَقُلْ تَعَالَوْا نَدْعُ أَبْنَاءَنَا وَابْنَاءَكُمْ وَنِسَاءَنَا وَنِسَاءَكُمْ وَأَنْفُسَنَا وَأَنْفُسَكُمْ من ثُمَّ نَبْتَهِلْ فَنَجْعَل لَّعْنَةَ اللَّهِ عَلَى الكَذِبِينَ إِنَّ هَذَا لَهُوَ الْقَصَصَ الْحَقُّ ، وَمَا مِنْ اللَّهِ إِلَّا اللَّهُ ، وَإِنَّ اللَّهَ لَهُوَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ فَإِنْ تَوَلَّوْا فَإِنَّ اللَّهَ عَلِيمٌ بِالْمُفْسِدِينَ
"অতঃপর তোমার কাছে জ্ঞান আসার পর যদি কেউ বিবাদ করে তাহলে বলে দাওঃ এসো আমরা আমাদের সন্তানদেরকে ডেকে নেই, এবং তোমরাও তোমাদের সন্তানদেরকে এবং আমরা আমাদের স্ত্রীদেরকে এবং তোমরা তোমাদের স্ত্রীদেরকে ডেকে একত্রে জড়ো করি, অতঃপর চলো আমরা সবাই মিলে দোয়া করি, যেনো মিথ্যাবাদীদের ওপর আল্লাহ তায়ালার অভিশাপ বর্ষিত হয়। নিঃসন্দেহে এটাই হচ্ছে সত্য ঘটনা। এক আল্লাহ ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই। আর আল্লাহ তায়ালাই হচ্ছেন মহা পরাক্রমশালী মহাজ্ঞানী। তারপর তারা যদি এ শর্তে মোকাবিলা করতে রাজী না হয়। তবে প্রমাণিত হবে তারাই বিপর্যয় ও আশান্তি সৃষ্টিকারী। আর বিপর্যয় সৃষ্টি কারীদেরকে আল্লাহ্ ভাল ভাবেই জানেন।" (আলে-ইমরান: ৬১-৬৩)
ইমাম মুহাম্মদ বিন আবদুল ওয়াহহাব (রহঃ) বলেন : এই সদী কৌশলও এর অন্তর্ভূক্ত, যা আসহাবে সাবতের (দারররে সুন্নাহ) কৌশলের আনুরূপ অথবা তার চেয়ে ও জঘন্য। আমার মতের বিরোধীদেরকে আমি চারটি বিষয়ের যে কোনো একটি বিষয়ের দিকে আহবান জানাবো। সেগুলো হচ্ছে : আল্লাহর কিতাব, সুন্নাতে রাসূল (সাঃ) জ্ঞানীদের ইজমা, (সর্বসম্মত আভিমত। যদি তা আস্বীকার করে তাহলে মুবাহেলার প্রতি আহবান জানাবো। যেমনিভাবে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) ফরায়েজের কিছু বিষয়ে মুবাহেলার প্রতি প্রতিপক্ষকে আহবান জানিয়ে ছিলেন। এমনি ভাবে হযরত সুফইয়ান সাওরী এবং ইমাম আওযায়ী রাফউল ইয়াদাইন (দু’নামাজে দু'হাত ওপরে ওঠানো) ক্ষেত্রে এবং জ্ঞানীগনের আরো অনেকে প্রতিপক্ষকে মুবাহেলার দিকে আহবান জানিয়ে ছিলেন। আলহামদু লিল্লাহি রাব্বিল আলামীন।
وَصَلَّى اللهُ عَلَى مُحَمَّدٍ وَآلِهِ وَسَلَّم -
এ পুস্তিকায় এবং কতিপয় পৃষ্ঠার মধ্যে আমরা উপরোক্ত কথাগুলোই বর্ণনা করতে চেয়েছিলাম। যে ব্যক্তি উপদেশ গ্রহণ করতে চায়, তারজন্য উপদেশের দ্বার উন্মুক্ত। ঐ ব্যক্তির প্রতি আল্লাহ তায়ালার করুন, যে ভাল কথা বলে এর ফলে সে লাভবান হয়, আর যে ব্যক্তি খারাপ কথা না বলে চুপ থাকে সে নিরাপদে থাকে।
হে আল্লাহ ইসলাম দ্বারা আমাদেরকে দন্ডায়মান অবস্থায় হেফাজত করুন, ইসলাম দ্বারা আমাদের বসা অবস্থায় হেফাজত করুন, ইসলাম দ্বারা আমাদেরকে রুকু অবস্থায় এবং সেজদারত অবস্থায় হেফাজত করুন। (আদ্দুরাবু আস সুন্নিয়া সুন্নাহ কিতাবুল আকায়িদ ৫৫ পৃঃ)
وَاخِرُ دَعْوَانَا إِنِ الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ العُلَمِينَ -

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00