📄 দ্বিতীয় সংশয়
আল্লাহর নবী হযরত ইউসুফ (আঃ) 'কর্ম' দ্বারা তারা প্রমাণ পেশ করে। তারা বলে: হযরত ইউসুফ (আঃ) কুফরী নীতির অধীনে ধন-সম্পদ ও অর্থ বিভাগের দায়িত্ব নিয়েছিলেন। অতএব আমাদের জন্য এসব আইন প্রণয়নকারী পরিষদে অংশ করা জায়েয। বিভিন্ন দিক থেকে এর জবাব:
প্রথম দিক: তারা "নস" এর ওপর কিয়াসকে পেশ করেছে। কিয়াস মূলতঃ ইজতিহাদ (কোনো বিষয়ে কুরআন ও সুন্নাহর সুনিদিষ্ট বক্তব্য বা ফয়সালা না থাকলে চিন্তা ভাবনা করে কুরআন ও সুন্নাহ বিরোধী নয় এমন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা) আর "নস" (কুরআন সুন্নাহর সুনির্দিষ্ট বক্তব্য) কোনো বিষয়ে পাওয়া গেলে ঐ বিষয়ে ইজতিহাদের কোনো প্রয়োজন নেই। ইবনে কাইয়্যিম (রহঃ) 'আস্সাওয়ারিক আল-মুরসালা' নামক গ্রন্থে বলেন: কিয়াস যদি "নস" এর সাথে সাংঘর্ষিক ও প্রতিদ্বন্ধী হয়, তাহলে কিয়াস বাতিল বলে গণ্য হবে। আর এ কিয়াসকে ইবলিসী কিয়াস নামে অভিহিত করা হবে। কেননা এ কিয়াসের মাধ্যমে বাতিল দ্বারা হকের বিরোধীতা করা হয়। এ জন্যই এর শাস্তির পরিণতি হচ্ছে এই যে, তার আকল (জ্ঞান বুদ্ধি) বিঘড়ে যায় তার দুনিয়া ও আখেরাত নষ্ট হয়ে যাবে। যে ব্যক্তিই তার জ্ঞান বুদ্ধি দিয়ে 'অহি" এর মোকাবেলা করবে আল্লাহর তায়ালা তার আকলকে (জ্ঞান বুদ্ধিকে) বিগড়িয়ে দিবেন, যার ফলে সমস্ত জ্ঞানীরা হাসবে।
দ্বিতীয় দিক: কিয়াসের জন্য অবশ্যই কিছু শর্ত থাকতে হবে। শর্তের মধ্যে একটি হচ্ছে এই যে, আসল (মূল) এবং শাখার মধ্যে কোনো পার্থক্যকারী বিষয় থাকতে পারবে না। তাহলে কিয়াস শুদ্ধ হবে। তা না হলে কিয়াস বাতিল বলে গণ্য হবে, যার নাম "কিয়াস মাআল, ফারেক"। এখানে পার্থক্যকারী বিষয়গুলো নিম্নরূপঃ
এক: পরিষদের প্রকৃতি বা ধরণ: হযরত ইউসুফ (আঃ) এর কাজ ছিলো মানবীয়। এর প্রমাণ হচ্ছে আল্লাহ তায়ালার বাণী: وَقَالَ الْمَلِكُ ائْتُونِي بِهِ اسْتَخْلِصُهُ لِنَفْسِي ، فَلَمَّا كَلَّمَهُ قَالَ إِنَّكَ الْيَوْمَ لَدَيْنَا مَكِينَ أَمِينُ -
"বাদশাহ বললো: তাকে আমার কাছে নিয়ে এসো। আমি তাকে নিজের বিশ্বস্ত সহচর করে রাখবো। অতঃপর তার সাথে মতবিনিময় করলো তখন বললো: নিশ্চয় আপনি আমার কাছে আজ থেকে বিশ্বস্ত হিসেবে মর্যাদার স্থান লাভ করেছেন।" (ইউসুফ: ৫৪)
আর আইন প্রণয়নকারী পরিষদের সদস্যদের বিষয়টি হচ্ছে এই যে, তারা নিজেদেরকে রব বানিয়ে নিয়েছে, আর বিধান-দাতা হিসেবে তারা নিজেদেরকে আল্লাহর শরীক বানিয়ে নিয়েছে। কেননা তাদের প্রতি আইন প্রণয়নের নিরঙ্কুশ অধিকার দেয়া হয়েছে যে, অধিকার একমাত্র আল্লাহ ব্যতিত আর কারো নেই, তারা এ জঘন্য কর্ম থেকে মুক্তিও নেয়নি, তা পরিত্যাগও করেনি। এর প্রমাণ হচ্ছে তাদের সাংবিধানিক ধারা। যে ধারার বক্তব্য হচ্ছেঃ আইন প্রণয়নের ক্ষমতা ভোগ করবেন সংবিধান অনুযায়ী আমীর এবং জাতীয় সংসদ। এমনিভাবে আরেকটি ধারার বক্তব্য : রাষ্ট্রের শাসননীতি হবে গণতান্ত্রিক। সার্বভৌমত্বের মালিক হচ্ছে জাতি। আর জাতিই হচ্ছে সকল ক্ষমতা উৎস।
দুই: আল্লাহর নাযিলকৃত বিধান মোতাবেক শাসন করা: হযরত ইউসুফ (আঃ) আল্লাহর নাযিলকৃত বিধান মোতাবেক শাসন করেছেন। আল্লাহ তায়ালা বলেনঃ
كَذَلِكَ كِدْنَا لِيُوسُفَ مَا كَانَ لِيَأْخُذَ أَخَاهُ فِي دِينِ الْمَلِكِ -
"এমনিভাবে আমি ইউসুফকে কৌশল শিক্ষা দিয়েছি। সে বাদশাহর আইনে আপন ভাইকে কখনো নিতে পারতো না।" (ইউসুফ: ৭৬)
মুফাসসিরগণ বলেন: অর্থাৎ মিশরের রাষ্ট্রীয় বিধান অনুযায়ী তার [ইউসুফ (আঃ)]-এর ভাই বিনয়ামিনকে রেখে দেয়া ঠিক ছিলো না। বরং তিনি তাঁর ভাইকে রেখে দিয়েছিলেন আল্লাহর বিধান মোতাবেক। হযরত ইব্রাহীম (আঃ) এর শরীয়ত ছিলো চোরকে চুরিকৃত মালের মালিকের কাছে সমর্পণ করা এবং চুরির শাস্তি হিসেবে এক বছর কাল মালিকের গোলাম হিসেবে চোরের বন্দী জীবন কাটানো। আর আইন প্রণয়নকারী পরিষদের সদস্যদের অবস্থা হচ্ছে এই যে, তারা গাইরুল্লাহর বিধানের দিকে বিচার-ফয়সালা নিয়ে যায় এবং আল্লাহর সাথে কুফরী করার দ্বার উন্মুক্ত করে আল্লাহর আইনকে বাছাই করার ক্ষমতা ও সুযোগ দানের মাধ্যমে। এর প্রমাণ হচ্ছে সেই সাংবিধানিক ধারা, যাতে বলা হয়েছে: জাতীয় সংসদের বৈঠক বৈধ হওয়ার শর্ত হচ্ছে অর্ধেকের বেশী সদস্যের উপস্থিতি। আর সিদ্ধান্তসমূহ জারি হবে উপস্থিত সদস্যদের সংখ্যা গরিষ্ঠ রায় ও মতামতের ভিত্তিতে। এবং সেই ধারাও এর প্রমাণ স্বরূপ উল্লেখযোগ্য, যাতে বলা হয়েছেঃ জাতীয় সংসদ সদস্যের আইন ও বিধান প্রস্তাব করার অধিকার আছে এবং প্রতিটি আইন বিল কোনো সদস্যকর্তৃক উত্থাপিত হওয়ার পর সংসদ কর্তৃক যদি তা প্রত্যাখ্যাত হয় তাহলে উক্ত বিল দ্বিতীয়বার একই সেশনে পেশ করা বৈধ হবে না। ১০ নম্বর ধারার বক্তব্য হচ্ছেঃ জাতীয় সংসদ সদস্য পরিষদের কাছে অথবা সংশ্লিষ্ট কমিটির কাছে তার কাছে উদিত যে কোনো মতামত এবং চিন্তা ধারা প্রকাশ করার ব্যাপারে সম্পূর্ণ স্বাধীন। কোনো অবস্থাতেই এর জন্য তাকে জবাব দিহি করা যাবে না।
তিন: পবিত্র ও মুক্ত থাকা: হযরত ইউসুফ (আঃ) তাদের সকল মূর্তি প্রতিমা এবং উপাস্য মূক্ত ছিলেন। এর প্রমাণ হচ্ছে আল্লাহ তায়ালার বাণীঃ إِنِّي تَرَكْتُ مِلَّةَ قَوْمٍ لَا يُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَهُمْ بِالْآخِرَةِ هُمْ كَفِرُونَ وَاتَّبَعْتُ مِلَّةَ آبَانِي ابْرَاهِيمَ وَاسْحَقَ وَيَعْقُوبَ ، مَا كَانَ لَنَا أَنْ نَّشْرِكَ بِاللَّهِ مِنْ شَيْءٍ ، ذَلِكَ مِنْ فَضْلِ اللَّهِ عَلَيْنَا وَعَلَى النَّاسِ وَلَكِنَّ أَكْثَرَ النَّاسِ لَا يَشْكُرُونَ يُصَاحِبَي السجْنِ أَرْبَابٌ مُّتَفَرِّقُونَ خَيْرٌ أَم ام اللهُ الْوَاحِدُ الْقَهَّارُ - مَا تَعْبُdُونَ مِنْ دُونِهِ إِلَّا أَسْمَاءُ سَمَّيْتُمُوهَا أَنتُمْ وَآبَاءَكُمْ مَّا أَنْزَلَ اللَّهُ بِهَا مِنْ سُلْطَنِ إِنِ الْحُكْمُ ذلِكَ الدِّينُ الْقَيِّمِ وَلَكِنَّ أَكْثَرَ النَّاسِ لَا يَعْلَمُونَ إِلا اللهِ ، اَمَرَ أَلَّا تَعْبُdُوا إِلَّا إِيَّاهُ ، ذَلِك
"আমি ঐ সব লোকের ধর্ম পরিত্যাগ করেছি, যারা আল্লাহকে বিশ্বাস করে না এবং পরকালে তারা অবিশ্বাসী। আমি আপন পিতৃ পুরুষ ইব্রাহীম, ইসহাক এবং ইয়াকুবের ধর্ম অনুসরণ করছি। কোনো বস্তুকে আল্লাহর অংশীদার করা আমাদের জন্য শোভা পায়না। এটা আমাদের প্রতি এবং অন্যসব লোকের জন্য আল্লাহ তায়ালার অনুগ্রহ। কিন্তু অধিকাংশ লোকই অনুগ্রহের কথা স্বীকার করেনা। হে কারাগারের সঙ্গীরা। পৃথক পৃথক অনেক উপাস্য ভাল, নাকি পরাক্রমশালী এক আল্লাহ? তোমরা আল্লাহকে ছেড়ে নিছক কতগুলো নামের ইবাদত করছো, সেগুলো তোমরাও তোমাদের পিতৃপুরুষরা সাব্যস্ত করে নিয়েছো। আল্লাহ এ গুলোর কোনো প্রমাণ নাযিল করেননি। আল্লাহ ছাড়া কারো বিধান দেয়ার অধিকার নেই। তিনি নির্দেশ নিয়েছেন যে, তিনি ছাড়া আর কারো ইবাদত করোনা। এটাই সঠিক দ্বীন। কিন্তু অধিকাংশ লোক তা জানে না।" (ইউসূফ: ৩৯-৪০)
আইন প্রণয়নকারী সদস্যদের অবস্থা হচ্ছে এই যে তারা তাদের মূর্তি, তাদের প্রতিমা, তাদের উপাস্য, তাদের তাগুত এবং তাদের সংবিধানকে সম্মান করার জন্য শপথ গ্রহণ করেছে এর প্রমাণ একটি সাংবিধানিক ধারা, যাতে বলা হয়েছে: জাতীয় সংসদের সদস্য তার সংশ্লিষ্ট পরিষদ ও কমিটির কর্মভার গ্রহণ করার পূর্বে একটি প্রকাশ্য অধিবেশনে পরিষদের সামনে নিম্মোক্ত শপথ বাক্য পাঠ করবেন: আমি মহান আল্লাহর নামে শপথ করছি যে, আমি আমার দেশ ও আমীরের প্রতি একনিষ্ঠ হবো। আমি সংবিধান ও রাষ্ট্রের আইন কানুনকে শ্রদ্ধা করবো। আমি জনগনের স্বাধীনতা, তাদের স্বার্থ এবং তাদের সম্পদ রক্ষা করবো। আমি আমার দায়িত্ব আমানতদারী এবং সততার সাথে আদায় করবো।
চার: শক্তি ও স্থিরতার মাধ্যম : হযরত ইউসূফ (আঃ) শক্তি ও স্থিতিশীলতা অর্জন করেছিলেন মু'জেযার মাধ্যমে। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন: يَأْكُلُهُنَّ سَبْعٌ عِجَافٌ وَسَبْعِ يُوسُفُ أَيُّهَا الصِّدِّيقُ افْتِنَا فِي سَبْعِ بَقَرَتِ سِمَانِ يَأْكُلُهُنَّ سُنُبُلَتٍ خُضْرٍ وَأُخَرُ يُبِسْتِ لَعَلَّى أَرْجِعُ إِلَى النَّاسِ لَعَلَّهُمْ يَعْلَمُونَ قَلِيلًا مِّمَّا قَالَ تَزْرَعُوْنَ سَبْعَ سِنِينَ دَابًا ، فَمَا حَصَدْتُمْ فَذَرُوهُ فِي سُنُبُلِهِ إِلَّا قَدَّمْتُمْ لَهُنَّ إِلَّا قَلِيلًا مِّمَّا تَأْكُلُونَ ثُمَّ يَأْتِي مِنْ بَعْدِ ذَلِكَ سَبْعٌ شِدَادٌ يَأْكُلْنَ مَا قَدَّمْتُمْ لَهُنَّ تُحْصِنُونَ ثُمَّ يَأْتِي مِنْ بَعْدِ ذَلِكَ عَامٌ فِيْهِ يُغَاتُ النَّاسُ وَفِيهِ يَعْصِرُونَ
"হে ইউসূফ, হে সত্যবাদী! সাতটি জীর্ণ-শীর্ণ গাভী, সাতটি মোটা তাজা গাভীকে খাচ্ছে, আর সাতটি সবুজ শীষ ও অন্যান্যগুলো শুস্ক, আপনি আমাদেরকে এ স্বপ্নের ব্যাপারে দিক নির্দেশনা দিন যাতে আমি তাদের কাছে ফিরে গিয়ে তাদেরকে অবগত করাতে পারি। সে বললো: তোমরা সাত বছর উত্তমরূপে চাষাবাদ করবে। অতঃপর যা ফসল তোমরা কাটবে তা থেকে অল্প কিছু যা তোমাদের খোরাকীর জন্য প্রয়োজন-বের করে নিবে। আর বাকীগুলোকে তাদের গুচ্ছসহ রেখে দিবে। এরপর সাতটি বছর খুব কঠিন আসবে। এসময়ের জন্য তোমরা সে সব শস্য সঞ্চয় করে রাখবে, তা থেকে খেয়ে যাবে, কিন্তু অল্প পরিমান ব্যতীত যা তোমরা তুলে রাখবে, এর পরই একটি বছর, তখন রহমতের বৃষ্টি বর্ষিত হবে এবং এতে তারা রস নিংড়াবে।" (ইউসূফ: ৪৬-৪৯)
আল্লাহ তায়ালা আরো বলেন: وَقَالَ الْمَلِكُ ائْتُونِي بِهِ اسْتَخْلِصُهُ لِنَفْسِي ، فَلَمَّا كَلَّمَهُ قَالَ إِنَّكَ الْيَوْمَ لَدَيْنَا مَكِينَ آمِينَ قَالَ اجْعَلْنِي عَلَى خَزَائِنِ الْأَرْضِ إِنِّي حَفِيظٌ عَلِيمٌ وَكَذَلِكَ مَكَّنَّا لِيُوسُفَ فِي الْأَرْضِ : يَتَبُوا مِنْهَا حَيْثُ يَشَاءُ ، نَصِيبُ بِرَحْمَتِنَا مَنْ نشَاءُ وَلَا نُضِيعُ أَجْرَ الْمُحْسِنِينَ -
"বাদশাহ বললো: তাকে কাছে নিয়ে এসো, আমি তাকে নিজের বিশ্বস্ত সহচর করে রাখবো। অতঃপর যখন তার সাথে মত বিনিময় করলো, তখন বললোঃ নিশ্চয়ই আপনি আমার কাছে আজ থেকে বিশ্বস্ত হিসেবে মর্যাদার স্থান লাভ করেছেন। ইউসুফ বললো, আমাকে দেশের ধন- ভান্ডারে নিযুক্ত করুন। আমি বিশ্বস্ত রক্ষক ও অধিক জ্ঞানবান। এমনি ভাবে আমি ইউসুফকে সে দেশে প্রতিষ্ঠা দান করেছি। যেখানে ইচ্ছা সেখানে নিজের বাসস্থান বানিয়ে নেয়ার তার পূর্ণ ইখতিয়ার ছিলো। বস্তুতঃ আমি আমার রহমতের সাহায্যে যাকে ইচ্ছা ধন্য করে দেই। পণ্যবাণ লোকদের কর্মফল কখনোই আমার কাছে নষ্ট হয় না।" (ইউসুফ: ৫৪-৫৬)
এ ক্ষেত্রে আইন প্রণয়নকারী পরিষদের সদস্যদের অবস্থা হচ্ছে এই যে, তাদের কাছে শক্তি ও স্থিতিশীলতার মাধ্যম হচ্ছে বিভিন্ন দল ও জামায়াতের মধ্যে নির্বাচন। এটি মূলতঃ জাহেলী নিয়ম-নীতি। এর প্রমাণ হচ্ছে একটি সাংবিধানিক ধারা, যার বক্তব্য হচ্ছেঃ জাতীয় পরিষদ গঠিত হবে ৫০ জন সদস্যকে নিয়ে, যারা সরাসরি গোপন সাধারণ ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত হবে। এটা অবশ্যই সেই বিধান অনুযায়ী হতে হবে যা নির্বাচন সংক্রান্ত বিধিতে লেখা আছে।
পাচ: সিদ্ধান্ত জারী করাঃ হযরত ইউসুফ (আঃ) যে মন্ত্রী সভায় সিদ্ধান্ত জারি করেছিলেন তার সদস্য তিনি একাই ছিলেন। এর প্রশাসন হচ্ছে আল্লাহর তায়ালার বাণীঃ وَ قَالَ الْمَلِكُ ائْتُونِي بِهِ اسْتَخْلِصُهُ لِنَفْسِي فَلَمَّا كَلِمَةٌ قَالَ إِنَّكَ الْيَوْمَ لَدَيْنَا مَكِينٌ امين -
"বাদশাহ বললো: তাকে কাছে নিয়ে এসো, আমি তাকে নিজের বিশ্বস্ত সহচর করে রাখবো। অতঃপর যখন তার সাথে মত বিনিময় করলো, তখন বললোঃ নিশ্চয়ই আপনি আমার কাছে আজ থেকে বিশ্বস্ত হিসেবে মর্যাদার স্থান লাভ করেছেন।" (ইউসুফ: ৫৪)
এ ক্ষেত্রে আইন প্রণয়নকারী পরিষদের সদস্যদের অবস্থা হচ্ছে এই যে, তাদের কাছে পঞ্চাশটি মস্তিষ্কের পঞ্চাশটি দৃষ্টি ভঙ্গি। এর প্রশাসন হচ্ছে সেই সাংবিধানিক ধারা, যার বক্তব্য হচ্ছে: জাতীয় পরিষদের বৈঠক সহীহ হওয়ার জন্য প্রয়োজন পরিষদের অর্ধেকের বেশী সদস্যের উপস্থিতি। আর সিদ্ধান্ত জারি হবে উপস্থিত সংখ্যা গরিষ্ঠ সদস্যদের রায় ও মতামতের ভিত্তিতে।
মুসলমানের একথা জেনে রাখা উচিৎ যে, উপরোল্লিখিত ৫টি পার্থক্যকারী বিষয়ের যে কোনো একটি পাওয়া গেলেই কিয়াস বাতিল বলার জন্য যথেষ্ট। আর যদি ৫টি পার্থক্যকারী বিষয় পাওয়া যায় তাহলে নিঃসন্দেহে এটি (কেয়াস মাআল ফারিগ হওয়ার কারণে) বাতিল কেয়াস বলে গণ্য হবে।
📄 তৃতীয় সংশয়
তারা বলে আমরা আইন প্রণয়নকারী পরিষদে অংশ গ্রহণ করি স্বার্থরক্ষা করার জন্য, অসুবিধা দূর করার জন্য এবং বাতিলপন্থীদের মোকাবেলা করার জন্য।
জবাব: আমরা বলবো: নিঃসন্দেহে এটি মহৎ উদ্দেশ্য, কিন্তু উদ্দেশ্য সাধনের মাধ্যম হচ্ছে শরীয়ত পরিপন্থী। মুসলমান হিসেবে আমাদের নীতির বক্তব্য, উদ্দেশ্য ও মাধ্যমের সততার প্রমাণ পেশ করে না। তোমাদের উদ্দেশ্য সাধনের মাধ্যম হচ্ছে শিরক এবং বিদআত মিশ্রিত যা আল্লাহ তায়ালার কর্মকে অস্বীকার করে।
আল্লাহর সাথে শিরক এবং কুফরী করা যে সবচেয়ে বড় বিপর্যয়, এ ব্যাপারে তাওহীদবাদী কোনো মুসলমানেরই সন্দেহ নেই। তাই শিরকী এবং কুফরীর চেয়ে বড় গুণাহও নেই। আল্লাহ তায়ালা বলেনঃ
إِنَّ اللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَنْ يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَلِكَ لِمَنْ يَشَاءُ ، وَمَنْ يُشْرِكْ بِاللَّهِ فَقَدِ افْتَرَى إِثْمًا عَظِيمًا -
"নিশ্চয় আল্লাহ তায়ালা তাঁর সাথে কাউকে শরীক করলে তা মাফ করেন না। এ ছাড়া অন্যান্য গুনাহ যাকে ইচ্ছা মাফ করে দেন। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করলো, সে বিরাট মিথ্যা রচনা করলো এবং কঠিন গুনাহর কাজ করলো।" (আন নিসা: ৪৮)
তিনি আরো বলেন:
وَلَقَدْ أُوحِيَ إِلَيْكَ وَ إِلَى الَّذِينَ مِن قَبْلِكَ لَئِنْ أَشْرَكْتَ لَيَحْبَطَنَّ عَمَلُكَ وَلَتَكُونَنَّ مِنَ الْخُسِرِينِ -
"আপনার প্রতি এবং আপনার পূর্ববর্তীদের প্রতি এ অহী নাযিল হয়েছে যে, যদি আপনি আল্লাহর সাথে শরীক সাব্যস্ত করেন তাহলে আপনার সমস্ত আমল নষ্ট হয়ে যাবে। আর আপনি ক্ষতিগ্রস্ত লোকদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবেন।" (আযঝুমার :৬৫)
তিনি আরো ইরশাদ করেন:
لَقَدْ كَفَرَ الَّذِينَ قَالُوا إِنَّ اللَّهَ هُوَ الْمَسِيحُ ابْنُ مَرْيَمَ ، وَ قَالَ الْمَسِيحُ يَا اللَّهَ رَبِّي وَ رَبُّكُمْ ، إِنَّهُ مَنْ يُشْرِكْ بِاللَّهِ فَقَدْ حَرَّمَ اللَّهُ بَنِي إِسْرَائِيلَ اعْبُدُوا اللَّهَ رَ عَلَيْهِ الْجَنَّةَ وَمَاؤُهُ النَّارُ ، وَمَا لِلظَّلِمِينَ مِنْ أَنْصَارِ
"তারা কাফের, যারা বলে যে, মরিয়ম তনয় মসীহ-ই আল্লাহ। অথচ মসীহ বলেন; হে বনী ইসরাইল, তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো, যিনি আমার রব, তোমাদেরও রব। নিশ্চয়ই যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে শরীক স্থির করে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাত হারাম করে দেন এবং তার বাসস্থান হয় জাহান্নাম। আর অত্যাচারীদের জন্য কোনো সাহায্যকারী নেই।" (মায়েদাহঃ ৭২)
মানুষ নিজেকে আল্লাহর সাথে আইন প্রণয়নকারী বানানো (সাব্যস্ত) করা শিরকের অন্তর্ভুক্ত। এরফলে সে আইন প্রণয়নকারীর চেয়ারে বসে এবং আইন প্রণয়নকারীর পদবী গ্রহণ করে। তাগুতের কাছে বিচার চাওয়া শিরকের অন্তর্ভুক্ত। বিচার-ফয়সালা চাওয়া বান্দার ইবাদত সংক্রান্ত কর্ম যা একমাত্র আল্লাহ ছাড়া আর কারো উদ্দেশ্য নিবেদন করা যায় না। যে ব্যক্তি এ ইবাদত (বিচার চাওয়া) কে তাগুতের উদ্দেশ্যে নিবেদন করবে, সে আল্লাহর সাথে শিরককারী (মুশরিক) হিসেবে গণ্য হবে।
আর যে তাগুতকে অস্বীকার করার জন্য আল্লাহ তায়াল নির্দেশ দিয়েছেন, সেই তাগুতের সম্মান রক্ষা করার জন্য শপথ গ্রহণ করা কুফরী।
আল্লাহর আইনকে প্রস্তাব আকারে বাছাই করার জন্য ভোটা- ভোটির উদ্দেশ্যে মানুষের সামনে পেশ করাও কুফরী। আল্লাহ তায়ালার আইনকে ভোটের মাধ্যমে বাছাই করার নীতি উদ্ভাবনের দ্বারা আল্লাহর সাথে কুফরী করার দ্বার উন্মুক্ত করা কুফরী।
উপরোক্ত চারটি বিষয়ের প্রত্যেকটিই মুরতাদ হওয়াকে অপরিহার্য করে তোলে। তাই তাদের সাবধান হওয়া উচিৎ, তারা কিসের সামনে দাড়ানো আছে। তাদের আরো জেনে রাখা দরকার যে, আল্লাহর সাথে শিরক এবং কুফরী হচ্ছে সবচেয়ে বড় বিপর্যয় সৃষ্টিকারী বিষয়। আর উদ্দেশ্য মাধ্যমেরও পথ ও পদ্ধতির সত্যতার প্রমাণ পেশ করে না। আর তাদের কাছে মাধ্যম হচ্ছে কুফরী ও শিরকী কর্ম, যা আল্লাহ তায়ালার পবিত্র কর্মকে অস্বীকার করে।
📄 চতুর্থ সংশয়
কসম ও শপথ করার ব্যাপারে তারা বলেঃ আমরা যখন পরিষদে অংশ গ্রহণ করি সংবিধান এবং আইন কানুনের ব্যাপারে শপথ করে তখন সত্য ও হক বিষয়গুলোকে আমরা ব্যতিক্রম করে রাখি এবং নিয়তের মধ্যে আমরা বলি যে, এর (সংবিধানের) মধ্যে যে সব হক বিষয়াবলী আছে তার সম্মান রক্ষার জন্য আমরা শপথ গ্রহণ করি।
জবাব : আমরা বলতে চাই যে, যদি তারা জানতো, তাওহীদ কি, এবং মিল্লাতে ইব্রাহীম (আঃ) কি, তাহলে তারা এ ধরণের কথা বলতে পারতো না এবং দ্বীনের ব্যাপারে তারা এভাবে মোহাবিষ্ট হতে পারতো না, নিজেরাও গোমরাহ হতো না, অপরকেও গোমরাহ করতো না, তাদের এ সংশয়ের কয়েকটি জবাব রয়েছে।
এক : আমরা বলতে চাই, আল্লাহ তায়ালা যাকে ইসলাম সর্ম্পকে সামান্য জ্ঞান দান করেছেন, এমন প্রত্যেক ব্যক্তিই জানেন যে তাওহীদের ইতিবাচক এবং নেতিবাচক দুটি ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত সত্য বা হক যখন বাতিল ও শিরক দ্বারা মিশ্রিত হয়, তখন প্রথমেই মানুষের শিরক এবং কুফরীর মতো বাতিলকে পরিহার করে সত্যকে তা থেকে পৃথক করা অতঃপর তা প্রতিষ্ঠিত করা উচিৎ। যেমনটি তাওহীদবাদীদের ঈমান সম্পর্কে হযরত ইব্রাহীম (আঃ) তাঁর জাতিকে লক্ষ্য করে বলেছিলেন:
وَإِذْ قَالَ إِبْرَاهِيمُ لِأَبِيهِ وَقَوْمِهِ إِنَّنِي بَرَاءٌ مِّمَّا تَعْبُdُونَ ( إِلَّا الَّذِي ) إِلَّا الَّذِي فَطَرَنِي فَإِنَّهُ سَيَهْدِينِ -
"যখন ইব্রাহীম তাঁর পিতা ও তাঁর সম্প্রদায়কে বললো, তোমরা যাদের পূজা করো, তাদের সাথে আমার কোনো সম্পর্ক নেই। তবে আমার সম্পর্ক তাঁর সাথে যিনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর তিনি আমাকে সৎ পথ প্রদর্শন করবেন।" (আয যুখরুফ : ২৬-২৭)
হযরত ইব্রাহীম (আঃ) সর্ব প্রথম তাদের যাবতীয় মা'বুদ বা উপাস্যদের ব্যাপারে নিজেকে পবিত্র ও মুক্ত ঘোষণা করলেন, অতঃপর সত্যকে সেই পঙ্কিলতা থেকে পৃথক করলেন। আর সত্যটি হচ্ছে, এক আল্লাহর ইবাদত করা, এটাই হচ্ছে মিল্লাতে ইব্রাহীম যা থেকে বিমুখ হলে নিজেকে কলঙ্কিত করা হয়।
দুই : এটাতো জানা কথা যে, যে ব্যক্তি জবরদস্তি ছাড়া এবং হাকিকত সম্পর্কে অজ্ঞতা ছাড়া স্বেচ্ছায় তাগুতকে সম্মান করার জন্য শপথ করে, সে তাগুতকে অস্বীকার করলো না, অথচ অন্তর জবান ও অঙ্গ-প্রতঙ্গ দিয়ে তাগুতকে অস্বীকার করা অপরিহার্য। এ কথা জেনে রাখা উচিৎ যে, দ্বীনের স্থান হতে হবে অন্তরে বিশ্বাস, ভালবাসা এবং ঘৃণার (নাফরমানীর ক্ষেত্রে) মাধ্যমে। দ্বীনের স্থান জবানে হতে হবে সত্যের উচ্চারণ এবং কুফরী কথা পরিত্যাগের মাধ্যমে। এমনিভাবে দ্বীনের স্থান হতে হবে অঙ্গে প্রত্যঙ্গে ইসলামের মৌলিক বিষয়গুলোকে কার্যে পরিণত করার মাধ্যমে, কুফরী কর্ম পরিত্যাগ করার মাধ্যমে। এ তিনটি বিষয়ের যে কোনো একটি বিষয়ে বিনষ্ট হলে মানুষ কাফের ও মুরতাদ হয়ে যাবে। (আদ্দুরার আস সুন্নিয়া কিতাবু হুকমিল মুরতাদ ৮৭/৭ পৃঃ)
যে ব্যক্তি কুফরী কথা ও কর্মের প্রকাশ ঘটালো, সে ব্যক্তি মুরতাদ হয়ে যাওয়ার ফয়সালার ব্যাপারে এটা হচ্ছে সুস্পষ্ট কথা। অতএব যে ব্যক্তি একথা বলে যে, আমি শপথ করি এবং আমার নিয়তের মধ্যে হককে আলাদা করে রাখি। (অর্থাৎ নাফরমানীর কাছে শপথ করার সময় খারাপ কাজে তা ব্যবহার করবো না, এ নিয়ত করি) তাদের এ কথা সম্পূর্নরূপে বাতিল ও প্রত্যাখ্যাত। কেননা বাহ্যত: এটা কুফরী কথা। যেহেতু আল্লাহকে বাদ দিয়ে হাকিকত সম্পর্কে অজ্ঞতা ছাড়া কিংবা জবরদস্তি মূলক হত্যা অথবা শাস্তির আশংকা ছাড়াই তাগুতী আইনকে সম্মান করা গাইরুল্লাহর ইবাদত করার জন্য যেহেতু শপথ করা হয়েছে, সেহেতু তার কথা বাতিল ও প্রত্যাখ্যাত।
শাইখ মুহাম্মদ বিন আবদুল ওয়াহহাব (রহঃ) তাঁর কাশফুশ শুবহাত নামক পুস্তিকায় বলেন, "প্রত্যেক মাযহাবের ওলামায়ে কেরাম " মুরতাদের হুকুম সংক্রান্ত যে অধ্যায়ের কথা উল্লেখ করেছেন তার অর্থ কি? মুরতাদ হচ্ছে ঐ মুসলমান, যে ইসলামকে গ্রহণ করার পর ইসলামকে অস্বীকার করে। অতঃপর এর অনেক প্রকার ও শ্রেণীর কথা উল্লেখ করেছেন, উল্লেখিত সব বিষয়েই কুফরী সংক্রান্ত। এমনকি তারা অতিসামান্য বিষয়ের কথা ও হুকুম সহ উল্লেখ করেছেন। যেমন: এমন কথা যা মুখে বলা হয় অথচ অন্তরে নেই, অথবা এমন কথা, যা শুধুমাত্র ঠাট্টা ও খেলাচ্ছলে বলা হয়।
লক্ষ্য করুন, বলা হয়েছে, অতি সামান্য বিষয়ের কথাও তার হুকুম সহ উল্লেখ করা হয়েছে। যেমন এমন কথা যা মুখে আছে অথচ অন্তরে নেই। তিনি তাঁর পুস্তিকার শেষ দিকে বলেন: এটা যখন নিশ্চিত সত্য যে, যে সব মুনাফিক রাসুল (সঃ) এর সাথে রুমের যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেছিলো, তারা কাফের হিসেবে বিবেচিত হয়েছিলো কিছুকথা শুধুমাত্র খেলাচ্ছলে এবং ঠাট্টাচ্ছলে বলার কারণে তখন এটা সুস্পষ্ট যে, যে ব্যক্তি কুফরী কথা বলে অথবা কুফরী কর্ম করে সম্পদের স্বল্পতার আশংকায়, অথবা কারো দয়া বা সাহায্য লাভের আশায়, সে ব্যক্তির অপরাধ অবশ্যই তার চেয়ে জঘণ্য যে ব্যক্তি কুফরী কথা বলে শুধুমাত্র ঠাট্টাচ্ছলে।
আল্লামা শাইখ আবদুল্লাহ বিন আবদুর রহমান আবা বাতিন (রহঃ) বলেন: মুসলমান যখন এ কলেমার মহান মর্যাদার কথা এবং এর বাধ্যবাধকতার কথা জানতে পারলো, তখন তাকে এর প্রতিফলন ঘটাতে হবে আন্তরিক বিশ্বাসের মাধ্যমে, জবান দ্বারা উচ্চারণের মাধ্যমে এবং এর মৌলিক বিষয়গুলো আমলে পরিণত করার মাধ্যমে, এ তিনটি বিষয়ের কোনো একটিও যদি বাদ পড়ে যায় তাহলে কোনো ব্যক্তি আল্লাহ তায়ালার কিতাবের বর্ণনা মতে মুসলমান হতে পারবে না। ইসলামের মৌলিক বিষয়গুলো পালনের মাধ্যমে যদি একজন মানুষ মুসলমান হয়, অতঃপর তার মধ্যে যদি এমন কোনো কথা, কাজ এবং বিশ্বাসের সূত্রপাত হয়, যা ইসলামের বিপরীত, তাহলে, তার কোনো লাভ নেই। আল্লাহ তায়ালা তাবুক যুদ্ধের ব্যাপারে যারা কুফরী কথা বলেছে তাদের প্রসংগে বলেন:
لا تَعْتَذِرُوا قَدْ كَفَرْتُمْ بَعْدَ إِيْمَانِكُمْ - "তোমরা ছলনা করো না। তোমরা যে ঈমান গ্রহণ করার পর কুফরী করেছো।" (আত-তওবাহ: ৬৬) অন্যদের ব্যাপারে আল্লাহ বলেন:
يَحْلِفُونَ بِاللَّهِ مَا قَالُوا وَلَقَدْ قَالُوا كَلِمَةَ الْكُفْرِ وَكَفَرُوا بَعْدَ إِسْلَامِهِمْ - "এ সব লোকেরা আল্লাহর নামে শপথ করে বলে যে, তারা সে কথা বলেনি। অথচ তারা কুফরী কথা বলেছে এবং ইসলাম গ্রহণের পর কুফরী অবলম্বন করেছে।" (আত-তওবাহঃ৭৪)
শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়া (রহঃ) বলেনঃ মোদ্দা কথা হচ্ছে, যে ব্যক্তি এমন কথা বলে অথবা এমন কাজ করে যা কুফরী, সে এর দ্বারা কুফরী করলো, যদিও সে এর দ্বারা কাফের হওয়ার ইচ্ছা পোষণ করেনি। তবে ইল্লা-মাশাআল্লাহ কাফের হওয়ার ইচ্ছা কেউ পোষণ করেনা। এ প্রসংগে ওলামায়ে কেরামের কথা অনেক।
📄 পঞ্চম সংশয়
ঐ সব লোকের কথাই এখানে প্রযোজ্য, যারা নিজেদেরকে আইন প্রণয়নকারী না হয়েও বিধান রচনা কারী কর্তৃপক্ষ হওয়ার জন্য প্রার্থী হিসাবে দাড় করায়, যাতে তারা এ গুণে গুণান্বিত হতে পারে [অর্থাৎ আইন প্রণয়নকারী হিসাবে নিজেদের আসন সুদৃঢ় করতে পারে] এমনি ভাবে তাদের ব্যাপারেও একথা প্রযোজ্য যারা বলেঃ যে আইন প্রণয়নকারী পরিষদে অংশ গ্রহণ করার সময় তারা নিজেদেরকে আইন প্রণয়নকারী হিসাবে আল্লাহর অংশীদার বানাচ্ছে না। এবং যারা তাদেরকে প্রার্থী ঠিক করেছে তাদের মধ্যেও তাদেরকে রব এবং বিধান দাতা বানানোর কোনো নিয়ম নেই। বরং তারা যা করেছে তা মূলতঃ কল্যান সাধনের নিয়তেই করেছে।
এর জবাবে আমরা বলতে চাই: তারা যে বলছে, তারা আইন প্রণয়নকারী নয় তাদের একথা সম্পূর্নরূপে বাতিল। তারা নিজেরা বলছে যে, তারা আইন প্রণয়কারী নয়, এখানে তাদের একথা বিবেচ্য বিষয় নয়। বরং এখানে বিবেচ্য বিষয় হচ্ছে জ্ঞান, বাস্তবতা, সংবিধান এবং প্রচলিত রীতি-নীতিতে যা প্রমাণিত হয় তা। একজন ব্যক্তি এসে আইন প্রণয়নকারীর চেয়ারে বসলে এবং তার দায়িত্ব পালন করলে সেই আইন প্রণয়নকারী সংস্থা বা পরিষদের একজন সদস্য হিসাবে আইন প্রণয়নকারী। এক্ষেত্রে সে রাজী থাকুক বা না থাকুক, অথবা ইচ্ছা থাকুক বা না থাকুক, তাতে কিছুই যায় আসেনা। [অর্থ্যাৎ কুফরীর ব্যাপারে নিয়ত, ইচ্ছা বা অনিচ্ছার কোনো প্রভাব নেই]। এটি হচ্ছে প্রথম কথা।
দ্বিতীয় কথা হচ্ছেঃ তারা বলে, তারা আইন প্রণেতা নয়, অথচ তারা নিজেদের আইন প্রণেতার পদে আসীন করে রাখে, এটা মূলতঃ জন সাধারনের জ্ঞান-বুদ্ধির সাথে প্রতারণা ও অবজ্ঞা করা ছাড়া আর কিছুই নয়। এ যেনো ঐ ব্যক্তির ন্যায় বলা, যে নিজেকে বিচারকের পদে আসীন করে " আমি বিচারক নই" বলে নিজেকে নেতৃত্বের আসনে বা পদে আসীন করে আমি নেতা নেই বলা। এমনিভাবে প্রেসিডেন্টের পদে আসীন হয়ে "আমি প্রেসিডেন্ট নই বলা" তাদের দাবী বাতিল বলে গন্য করার জন্য এতটুকু কথাই যথেষ্ট। "তারা আইন প্রণয়নকারী নয়" এ কথার জবাবে উপরোক্ত কথাগুলো বলা হয়েছে।
আবার তারা বলেঃ আল্লাহর সাথে আইন প্রণয়নকারী হিসেবে শরীক করা আমাদের নিয়ত নয়, তাদের এ কথাও কয়েক দিক থেকে বাতিল।
একঃ আমরা বলতে চাই, নেক নিয়ত কখনো কি বিবেচনা করা হয় বা উপকারে আসে নিয়তকারীর কাজ যখন অবৈধ হয়? অর্থাৎ কাজ না জায়েয হলে নিয়তের কোনো মূল্য নেই। দ্বীনের নীতির মধ্যে এটাই চুড়ান্ত ও সিদ্ধান্ত মূলক কথা, যে বেদআতী ব্যক্তি আল্লাহর নৈকট্য লাভের জন্য অবৈধ কাজ করে অথচ এ কাজ করার জন্য তার কাছে কোনো দলীল প্রমাণ নেই, শরীয়তের দৃষ্টিতে তার এ কাজ সম্পূর্ণ রূপে বাতিল ও প্রত্যাখ্যাত। রাসূল (সঃ) ইরশাদ করেছেনঃ দলীল ছাড়া যে ব্যক্তি আমাদের দ্বীনের মধ্যে নতুন কিছু উদ্ভাবন করলো সে ব্যক্তির কাজ প্রত্যাখ্যাত। অন্য এক বর্ণনায় আছে রাসূল (সঃ) ইরশাদ করেছেনঃ যে ব্যক্তি এমন কোনো কাজ করে যার মধ্যে আমাদের দ্বীনের কোনো ভিত্তি নেই, সে কাজ প্রত্যাখ্যাত। এ হুকুম ঐ ব্যক্তির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য যে ব্যক্তি দ্বীনের এমন কোনো বিষয় বা কাজ উদ্ভাবন করলো যার কোনো ভিত্তি বা প্রমাণ কুরআন ও সুন্নাহতে নেই। এ কাজ প্রত্যাখ্যাত। এ কাজ দ্বারা সে গুণাহর অধিকারী হয়েছে। এক্ষেত্রে তার নেক নিয়তের প্রতি কোনো দৃষ্টি দেয়া হবেনা। তাহলে যে ব্যক্তি শেরেকী কাজ করলো এবং আইন প্রণয়নকারী চেয়ারে বসে বিধান দাতা স্রষ্টার ভূমিকায় অবতীর্ন হলো, তার ক্ষেত্রে কি হুকুম বা ফয়সালা হতে পারে? আইন প্রণয়নের যে নিরঙ্কুশ অধিকার একমাত্র আল্লাহ ছাড়া আর কারো নেই, সেই পদবী আকড়ে থাকার মাধ্যমে যে অপরাধ সে করেছে এ জন্যই তার নিয়তের দিকে কোনো দৃষ্টি দেয়া হবেনা। (কারণ শিরকী গুণাহ বা বড় গুনাহের ক্ষেত্রে নিয়তের কোনো প্রভাব নেই)।
দুই : তারা একথা স্বীকার করে, যে ব্যক্তি আইন প্রণয়নকারীর চেয়ারে বসে আইন প্রণয়নকারী হওয়ার নিয়ত করবে, সেই প্রণয়কারী বা বিধান দাতা হিসেবে গণ্য হবে। কিন্তু তারা এ কথা স্বীকার করেন না যে, কল্যাণ সাধনের নিয়তে আইন প্রণয়নকারীর চেয়ারে বসে কাজ করলে বিধান দাতা হিসেবে গণ্য হবে। একথার দ্বারা তারা একজন মানুষ আইন প্রণয়নকারী বা বিধান দাতা হওয়া এবং না হওয়ার মধ্যে নেক নিয়তকে পার্থক্য হিসেবে চিহ্নিত করেছে। নিঃসন্দেহে প্রকৃত বিষয়টি তারা যা বলছে তার বিপরীত। তাই যদি কোনো মানুষ নিজেকে আইন প্রণয়নকারী হিসেবে বিশ্বাস করে অতঃপর মুখে এ বিশ্বাসের কথা উচ্চারণ করে বলে : আমি একজন আইন প্রণয়নকারী, আইন প্রণয়নের অধিকার আমার আছে, তাহলেই সে আইন প্রণেতা হিসেবে বিবেচিত হবে না, যতক্ষণ না সে আইন প্রণেতার পদে আসীন হয়। এখানে মূল কথা হচ্ছে মানুষ আইন প্রণয়নকারী হিসেবে সাব্যস্ত হওয়া নির্ভর করে, তার আইন প্রণেতার স্থানে আসীন হওয়া এবং উক্ত পদবী গ্রহণ করার ওপর। এখানে বিশ্বাস এবং মৌখিক উচ্চারণ বিবেচনার কোনো বিষয় নয়।
তিন : শিরক বিশ্বাস, কথা ও কর্মের মাধ্যমে হয় এ কথা যে বিশ্বাস করে সে এ ধরনের কথা বলতে পারে না। শাইখ মুহাম্মদ বিন আবদুল ওয়াহহাব (রহঃ) বলেন: আল্লাহর দ্বীন হতে হবে অন্তকরণে বিশ্বাস, ভালবাসা (অন্যায় ও পাপের প্রতি) ঘৃনার মাধ্যমে। দ্বীন হতে হবে জবানে হক কথা উচ্চারণ এবং কুফরী কথা বর্জনের মাধ্যমে। দ্বীন হতে হবে অঙ্গে-প্রত্যঙ্গে ইসলামের মৌলিক বিষয়গুলো কার্যে পরিণত করা এবং কুফরী কর্ম পরিত্যাগ করার মাধ্যমে। এ তিনটি বিষয়ের একটি বিষয়ও যদি বাদ পড়ে যায়, তাহলে (মুসলমান) কাফের এবং মুরতাদ হয়ে যাবে।
আল্লামা আবদুল্লাহ বিন আবদুর রহমান আবা বাতিন (রহঃ) বলেন : মুসলমান যখন এ কলেমার মহান মর্যাদার কথা এবং বাধ্যবাধকতার কথা জানতে পারলো, তখন তাকে এ কলেমার প্রতিফলন ঘটাতে হবে আন্তরিক বিশ্বাসের মাধ্যমে, জবান দ্বারা উচ্চারণের মাধ্যমে এবং এর মৌলিক বিষয়গুলো আমলে পরিণত করার মাধ্যমে। এ বিষয়গুলোর কোনো একটি যদি বাদ পড়ে যায় তাহলে কোনো ব্যক্তি আল্লাহ তায়ালা তাঁর কিতাবে যা বর্ণনা করেছেন সে মতে মুসলমান হতে পারবে না। ইসলামের মৌলিক বিষয়গুলো পালনের মাধ্যমে একজন মানুষ যদি মুসলমান হয়, অতঃপর তার মধ্যে যদি এমন কোনো কথা, কাজ, এবং বিশ্বাস পরিলক্ষিত হয় যা ইসলামের বিপরীত, তাহলে এ ধরণের ইসলামে তার কোনো উপকার নেই। (মাজমুআতুত্ তাওহিদ আররিসালাত সালেসা)