📘 মিরাসুল আম্বিয়াঃ নাবীদের উত্তরাধিকার > 📄 প্রথম সংশয়

📄 প্রথম সংশয়


নাজ্জাসীর ঘটনাই হচ্ছে তাদের প্রমাণ مشروعية الدخول في المجالس التشريعية বৈধতা) নামক গ্রন্থের লিখক বলেন: আইনের ক্ষেত্রে কাফেরদের সাথে অংশ গ্রহণ থেকে দূরে থাকা যদি ইসলামের অপরিহার্য বিষয় এবং কোনো শর্তের অন্তর্ভুক্ত হতো, তাহলে নাজ্জাসীর মৃত্যুর পর রাসূল (সঃ) সে যে ভাল মানুষ ছিলো তার স্বীকৃতিও দিতেন না এবং এ প্রশংসাও করতেন না।

জবাব: এ ব্যাপারে আমরা বলতে চাই যে, সম্ভবতঃ লেখক এখানে ভুল করে ফেলেছেন। এটা ছাড়া তার আর কোনো অজুহাত নেই। কেননা লেখকের লেখা তাঁর দ্বীন সম্পর্কে বিরাট অজ্ঞতার প্রমাণ পেশ করে। আইন প্রণয়নের ব্যাপারে কাফেরদের সাথে অংশ গ্রহণ পরিত্যাগ করা কিভাবে ঈমানের জন্য শর্ত আর ইসলামের জন্য অপরিহার্য না হতে পারে। অথচ যে ব্যক্তি আল্লাহ তায়ালার নাযিলকৃত বিধান মোতাবেক শাসন করে না তাদের ব্যাপারে কুরআনে কারীম কুফরী, জালেমী, এবং ফাসেকী বলে তাদের কর্মকে চিত্রিত করা হয়েছে। তাই আল্লাহর আইনের ব্যাপারে কাফেরদের সাথে অংশ গ্রহণ পরিত্যাগ করা কিভাবে ইসলামে অপরিহার্য বিষয় এবং শর্ত না হয়ে পারে? অথচ আল্লাহ তায়ালা ঐ ব্যক্তির ঈমানের দাবীকে অস্বীকার করেছেন, যে তাগুতের কাছে বিচার-ফয়সালা নিয়ে যায়। তাই আইন রচনার ব্যাপারে কাফের সাথে অংশ গ্রহণের বিষয়টি পরিত্যাগ করা কিভাবে ইসলামের অপরিহার্য বিষয় ও শর্ত না হয়ে পারে? অথচ আল্লাহ তায়ালা কাফেরদের কাছ থেকে এবং আল্লাহ ছাড়া যার ইবাদত করা হয় সেই তাগুতের কাছ থেকে মুসলমানদের নিষ্কৃতি ওয়াজিব করে দিয়েছেন। তাই একজন মুসলমানের জন্য একটা আইন প্রণয়নকারী শক্তি বা কর্তৃপক্ষের একজন সদস্য হওয়া জায়েয হতে পারে অথচ আল্লাহ তায়ালা সুষ্পষ্টভাবে বলে দিয়েছেন যে, আল্লাহ ব্যতিত যারা আইন প্রণয়ন করে তারা নিজেদেরকে আল্লাহর শরীক মনে করে, এবং তারা নিজেদেরকে রব বানিয়ে নিয়েছে। একজন মুসলমানের জন্য আল্লাহর শরীয়ত বিরোধী আইনের কাছে বিচার-ফয়সালার কাছে যাওয়া কি ভাবে জায়েয হতে পারে? অথচ আল্লাহ তায়ালা বিচার-ফয়সালা চাওয়ার বিষয়টি কে ইবাদত হিসেবে গণ্য করেন। তাই বিচার-ফয়সালা চাওয়ার বিষয়টিকে যে আল্লাহর আইনকে বাদ দিয়ে তাগুতের আইনের কাছে প্রত্যার্পন করবে সে মুশরিক এবং কাফের, চাই সে বিশ্বাস করুক বা না করুক, চাই সে বিষয়টি কে হালাল মনে করুক বা না করুক। কেননা তাগুতের কাছে বিচার-ফয়সালা চাওয়া বড় ধরনের কুফরী কাজ। আর বড় কুফরী কাজের জন্য ইসতিহলাল অর্থাৎ হারামকে হালাল মনে করার বিষয়টি বিবেচনা করার প্রয়োজন নেই বরং তাকে কাফের গণ্য করতে হবে। আল্লাহ তায়ালা তাগুতকে অস্বীকার করার জন্য আমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন। আর এ অস্বীকৃতি হবে অবশ্যই তাগুতের কাছে বিচার-ফয়সালা না চাওয়ার মাধ্যমে। অতএব যে ব্যক্তি তাগুতের কাছে বিচার-ফয়সালা চাইলো, সে তাগুতকে অস্বীকার করেনি। কেননা তাগুতের কাছে বিচার- ফয়সালা না চাওয়াই হচ্ছে তাকে অস্বীকারের শর্ত। শাইখ সুলাইমান বিন আবদুল্লাহ আল শাইখ (রহঃ) তাঁর তাইছিরুল আজীজিল হামীদ গ্রন্থের ৪১৯ পৃষ্ঠায় বলেন: এ আয়াতে এ প্রমাণ রয়েছে যে, কিতাব এবং সুন্নাহ বাদ দিয়ে তাগুতের কাছে বিচার ফয়সালা না চাওয়াই হচ্ছে ফরজ। এবং তাগুতের কাছে বিচার প্রার্থী মুমিনও নয় মুসলিমও নয়। শাইখ মুহাম্মদ বিন আবদুল ওয়াহহাব বলেন তাগুতকে অস্বীকার করার প্রকৃতি হচ্ছে গাইরুল্লাহর ইবাদত বাতিল বলে বিশ্বাস করা, গাইরুল্লাহর ইবাদত পরিত্যাগ করা, এর প্রতি ঘৃনা পোষণ করা, গাইরুল্লাহর ইবাদত কারীরা কুফরী কর্মে লিপ্ত মনে করা এবং তাদের বিরোধিতা করা। (মাজমুআতে তাওহিদ রিসালাতে উলা)
যে ব্যক্তি গাইরুল্লাহর ইবাদতকে বাতিল বলে বিশ্বাস করে অথচ তা পরিত্যাগ করতে পারেনা, তাহলে সে তাগুতকে অস্বীকার করতে পারলোনা। আবার যে ব্যক্তি গাইরুল্লাহর ইবাদত বাতিল বলে বিশ্বাস করলো অতঃপর তা পরিত্যাগ করলো, কিন্তু এর প্রতি মুহাব্বত থাকার কারণে এর প্রতি ঘৃনা প্রদর্শন করতে পারলোনা, তাহলে সেও তাগুতকে অস্বীকার করতে পারলোনা।
শাইখ আবদুল লতিফ বিন আবদুর রহমান বিন হাসান আল-শাইখ (রহঃ) বলেন: যে ব্যক্তি জেনে শুনে আল্লাহর কিতাব ও সুন্নাহকে বাদ দিয়ে বিচার চাইলো সে কাফের। (আদ্ দুরার আস সুন্নিয়া ৪৭৬/১০ পৃঃ)
অতএব গ্রন্থকারের উচিৎ এ বিষয়ের জন্য তিনি যা মূল ভিত্তি হিসেবে দাড় করিয়েছেন, সে ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করা। কেননা তাঁর এ ধরনের কথা প্রচার হওয়ার ক্ষেত্রে তার ভাল উদ্দেশ্য আর পরিশুদ্ধ নিয়ত তার জন্য কোনো সুপারিশ করতে পারবেনা।
এ সব বাক্যগুলো তার পরিণতি নিয়ে আসতে এবং ফল দিতে শুরু করেছে। এ ফলে আমরা দেখতে পেয়েছি যে কেউ কেউ ত্রুটিমুক্ত বিচার ও ফয়সালা প্রত্যক্ষ করছে, আবার কেউ কেউ লাহুকুক কলেজে পড়া শুনা করছে। এবং বিচার ও ওকালতিতে ঢুকে পড়ছে অথচ কোনো প্রকার অসুবিধা মনে করেনা।
হায়, আমি যদি জানতাম জাতিকে জড়িয়েছে মহা সংকটে ওটা কে করেছে বৈধ, আর নিয়ে গেছে ধংসের দ্বার প্রান্ত করেছে আঘাত, হে মহা শক্তি ও নেয়ামতের আধার তোমার কাছেই পেশ করি আমি ইসলামের কঠিন পরীক্ষার শেফায়েত ও অজুহাত।
এর পর আল্লাহ তায়ালার মেহেরবাণীতে এ সন্দেহের জবাব আমরা এখনই দিচ্ছি, আমরা বলেতে চাই, প্রথমতঃ আল্লাহ তায়ালা বলেনঃ قُلْ هَاتُوا بُرْهَانَكُمْ إِنْ كُنْتُمْ صَدِقِينَ - "আপনি বলুন তোমরা তোমাদের প্রমাণাদী নিয়ে এসো, যদি তোমরা (তোমাদের দাবীতে) সত্যবাদী হও।" কবী বলেনঃ
দাবীদার যদি দাবীর পক্ষে না দেয় কোনো প্রমাণ, দাবীদার হবে নিছক দাবীদার থাকবে না তার কোনো মান।
যে ব্যক্তি এই দাবী করে যে, নাজ্জাসী তাগুতের বিধানে বিচার- ফয়সালা করতো, তার একটি প্রমাণ অন্তত: আপনারা নিয়ে আসুন, অথবা এর ওপর কোনো ঐকমত্য হয়ে থাকলে তাও নিয়ে আসুন, অথবা এমন কোনো নির্ভর যোগ্য তথ্য নিয়ে আসুন যার সূত্র ন্যায়ের যাত্রী সাহাবায়ে কেরাম (রাঃ) পর্যন্ত পৌছেছে এবং যারা নাজ্জাসী সমকালীন থেকে বিষয়টি জানতে পেরেছে যে নাজ্জাসীর অবস্থা এমন ছিলো অথবা নাজ্জাসীর তার ইসলাম গ্রহণের পর অন্ততঃ একটি বারের জন্যও তাগুতের আইনে বিচার-ফয়সালা করেছে। এটা হচ্ছে একটি দিক।
দ্বিতীয় দিকটি হচ্ছে এইযে, নাজ্জাসীর ঘটনা থেকে প্রমাণ গ্রহণ করা মূলত: কিয়াসের অন্তর্ভূক্ত। আর জানা মতে কেয়াস হচ্ছে, যে প্রাসংগিক বিষয়ে "নস" (অর্থাৎ কুরআন ও সুন্নাহর বক্তব্য) আসেনি সে বিষয়কে যে বিষয়ে "নস" এসেছে এমন দুটি বিষয়ের কারণগত সামজ্ঞস্য সৃষ্টি এবং উভয়ের মধ্যে পার্থক্য দূরীকরনের জন্য তার (যে বিষয়ে "নস" এসেছে) মূলের সাথে সম্পৃক্ত করা। কেয়াসের শর্ত হচ্ছে প্রাসংগিক বিষয়ে কোনো "নস" থাকবেনা। আল্লাহর বিধান বাতিল করে মানব রচিত বিধান দিয়ে তা পরিবর্তন করা কুফরী এ বিষযে বহু "নস" এসেছে। বরং আল্লাহর বিধান বাদ দিয়ে অন্য কোনো বিধানের কাছে বিচার চাওয়াই হচ্ছে তাগুতী বিধানের কাছে বিচার প্রার্থনা করা এবং তাগুতের প্রতি ঈমান পোষণ করা। আল্লাহ তায়ালা বলেন: أَلَمْ تَرَ إِلَى الَّذِينَ يَزْعُمُونَ أَنَّهُمْ أَمَنُوا بِمَا أُنْزِلَ إِلَيْكَ وَمَا أُنْزِلَ مِنْ قَبْلِكَ يُرِيدُونَ أَنْ يَتَحَاكَمُوا إِلَى الطَّاغُوتِ وَقَدْ أُمِرُوا أَنْ يَكْفُرُوا بِهِ ، وَيُرِيدُ الشَّيْطَانُ أَنْ يُضِلُّهُمْ ضَلَلًا بَعِيدًا (النساء (٦٠)
"আপনি কি তাদেরকে দেখেননি যারা দাবী করে যে, আপনার প্রতি যা নাযিল করা হয়েছে এবং আপনার পূর্বে যা নাযিল হয়েছে তার প্রতি তারা ঈমান এনেছে। তারা বিচার-ফয়সালাকে তাগুতের কাছে নিয়ে যেতে চায়। অথচ তাগুতকে অস্বীকার করার জন্য তাদেরকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। আর শয়তান তাদেরকে পথভ্রষ্ট করে গোমরাহীর চরমে নিয়ে যেতে চায়।" (আন নিসা: ৬০)
আল্লামা শাইখ আবদুর রহমান বিন হাসান আল্ শাইখ (রহঃ) বলেন: ওটাই হচ্ছে তাগুতের কাছে বিচার-ফয়সালা নিয়ে যাওয়া এবং তাগুতের প্রতি ঈমান পোষণ করা (ফাতহুল মাজীদ বাবে কাওলিহি তায়ালা)
আল্লামা শাইখ আবদুর রহমান আস সা'দী (রহঃ) يأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَطِيعُوا اللَّهَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ وَأُولِي الْأَمْرِ مِنكُمْ : فَإِنْ تَنَازَعْتُمْ فِي شَيْءٍ فَرُدُّوهُ إِلَى اللَّهِ وَالرَّسُولِ إِنْ كُنْتُمْ تُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ ، ذَلِكَ خَيْرٌ وَ أَحْسَنُ تَأْوِيلًا -
"হে ঈমানদারগণ তোমরা আল্লাহর আনুগত্য করো, রাসুলের আনুগত্য করো এবং সে সব লোকদেরও আনুগত্য করো, যারা তোমাদের মধ্যে দায়িত্ব সম্পন্ন। আর যদি তোমাদের মধ্যে কোনো বিষয়ে মতবিরোধ দেখা দেয়, তাহলে মীমাংসার জন্য বিষয়টিকে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের নিকট প্রত্যার্পন করো যদি তোমরা আল্লাহর প্রতি এবং আখেরাতের প্রতি ঈমান এনে থাকো। এটাই মঙ্গলজনক এবং পরিণতির দিক দিয়ে এটাই উত্তম।" (আন নিসা-৫৯)
এ আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেনঃ এ আয়াত এটাই প্রমাণ করে যে, যে ব্যক্তি বিবাদপূর্ণ বিষয়ের মীমাংসা ও ফয়সালার জন্য বিষয়টি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের (সাঃ) কাছে প্রত্যার্পন করতে পারেনা সে প্রকৃত পক্ষে মুমিন নয়। বরং সে তাগুতের প্রতি ঈমান পোষণ করে যেমনটি এর পরবর্তী আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে । (তাইসিবুল কারিম আররাহমান ফি তাফসীরে কালামিল মান্নান ৩৯৭/১)
অতএব "নস" পাওয়া যাওয়া সত্ত্বেও আমরা কিভাবে "কেয়াস" করবো? এ ক্ষেত্রে মৌলিক নীতির বক্তব্য হচ্ছে "নস" এর বিপরীতে "কেয়াস" বাতিল। এটি একটি দিক।
অন্য দিকটি হচ্ছে : কেয়াসের শর্ত হচ্ছে মূল এবং শাখা, উভয়ের মধ্যে পার্থক্যকারী থাকবে না। এখানে মূল ধরা হয়েছে "নাজ্জাসীর কর্মকে"। আর শাখা বা প্রাসংগিক বিষয় ধরা হয়েছে সেই আইন রচনাকারী পরিষদে যোগদান করাকে যেখানে আল্লাহর শরীয়তকে অকার্যকর করে গাইরুল্লাহর শরীয়তের কাছে বিচার-ফয়সালা নিয়ে যাওয়া হয়। তারা বলেন: নাজ্জাসী রাজা হয়ে শরীয়তে মুহাম্মদী অনুযায়ী বিচার- ফয়সালা বা শাসন করেনি একটি (বিশেষ) স্বার্থের জন্য আমরাও নাজ্জাসীর ওপর কিয়াস করে বর্তমান পার্লামেন্টে যোগদান করি এবং অংশ গ্রহণ করি।
এর জবাবে আমরা বলতে চাই : যখন আমরা এ কথা জানতে পারলাম যে, শুদ্ধ কেয়াসের জন্য অপরিহার্য বিষয় হচ্ছে, মূল এবং শাখার মধ্যে কোনো পার্থক্যকারী থাকবে না, তখন এটাও জেনে নিলাম যে দু'টি বিষয়ের মধ্যে পার্থক্যকারী পাওয়া যাওয়ার কারণে কিয়াস বাতিল বলে বিবেচিত হবে।
প্রথম পার্থক্যকারী বিষয় : নাজ্জাসী মারা গিয়াছিলো ইসলামী শরীয়তের পূর্ণতা প্রাপ্তির পূর্বে। (ইসলামের সকল বিষয় নাযিল হওয়ার পূর্বে এবং
الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ وَأَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِي وَرَضِيتُ لَكُمُ الْإِسْلَامَ دِينًا -
"আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করে দিলাম। তোমাদের প্রতি আমার নেয়ামত সম্পূর্ণ করে দিলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জন্য দ্বীন হিসেবে পছন্দ করলাম।" (আল মায়েদা -৩)
এ আয়াত নাযিল হওয়ার পূর্বে। হিজরী দশম সনে বিদায় হজ্জের সময় এ আয়াত নাযিল হয়েছে। অথচ নাজ্জাসীর মৃত্যু হয়েছে মক্কা বিজয়ের অনেক আগে। এতে প্রমাণিত হয় যে নাজ্জাসীর শাসনামলে ইসলামী শরীয়তের বিধি বিধান তখনো পুরোপুরি নাযিল হয়নি। সুরা মায়েদা থেকে আরো দৃষ্টান্ত গ্রহণ করুন। এ সুরাটির মধ্যে ইসলামের বিধি-বিধান অনেক বেশী। এ সূরায় আল্লাহ তায়ালা ফয়সালা দিয়েছেন যারা আল্লাহর বিধান মোতাবেক শাসন করে না তারা কাফের। এ সংক্রান্ত আয়াত নাজ্জাসীর মৃত্যুর পর নাযিল হয়েছে। এমনকি কোনো কোনো বর্ণনায় এটি হচ্ছে নাযিলকৃত সর্বশেষ সূরা। এ তথ্য দ্বারা অকাট্য ভাবে প্রমাণিত হলো যে নাজ্জাসীর মৃত্যুর পরই এ আয়াত নাযিল হয়েছে। অতএব কোন্ যুক্তিতে ইসালামী শরীয়তের পূর্ণতা লাভের আগেই যে নাজ্জাসী মারা গেলো তার অবস্থাকে বর্তমান সময়ে যখন ইসলামী শরীয়ত পরিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে তখনকার পার্লামেন্ট সদস্যদের অবস্থার সাথে তুলনা করা হচ্ছে।
দ্বিতীয় পার্থক্যকারী : পৃথিবীর রাজা বাদশাদের নিকট যখন রাসুল (সঃ) ইসলামী শরীয়া মোতাবেক দেশ পরিচালনা অথবা জিজিয়া প্রদানের জন্য চিঠি লিখেছিলেন, এর পূর্বেই নাজ্জাসীর মৃত্যু হয়। বিখ্যাত হাদীসের গ্রন্থ ছহী মুসলিম শরীফের জিহাদ অধ্যায়ের 'কাফের রাজা বাদশাহদের নিকট ইসলামের দিকে আহবান জানিয়ে রাসুল (সঃ) এর চিঠি' অনুচ্ছেদে হযরত আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, রাসুল (সঃ) রোম পারস্যের বাদশাহ, নাজ্জাসী এবং প্রত্যেক অত্যাচারী বাদশাহর নিকট ইসলামের দিকে আহবান জানিয়ে চিঠি লিখেছেন। তবে ঐ নাজ্জাসীর নিকট চিঠি লিখেন যার (গায়েবী) জানাযা রাসুল (সঃ) পড়িয়েছিলেন।
ইমাম ইবনুল কায়্যিম (রহঃ) যাদুল মাআদ কিতাবের ৩/৬৯০ পৃষ্ঠায় রাসুল (সঃ) এর প্রতি নাজ্জাসীর চিঠির কথা উল্লেখ করে বলেন : বিষয়টি আল্লাহই ভাল জানেন, নাজ্জাসীর বিষয় বর্ণনাকারী ব্যক্তি তালগোল পাকিয়ে ফেলেছে, যে নাজ্জাসীর জানাযার নামাজ রাসুল (সঃ) পড়িয়েছিল, তিনি রাসুল (সঃ) এর প্রতি ঈমান এনেছিলেন এবং সাহাবায়ে কেরামকে খুব সম্মান প্রদর্শন করেছিলেন তার মধ্যে, আর যে নাজ্জাসীকে ইসলামের দিকে আহবান জানিয়েছিলেন তার মধ্যে কোনো ভেদাভেদ করতে পারেনি। প্রকৃত পক্ষে নাজ্জাসী দু'জন ছিলো। ছহীহ মুসলিম গ্রন্থে এ ব্যাপারে সুস্পষ্ট বর্ণনা এসেছে যে, রাসূল (সঃ) নাজ্জাসীর কাছে চিঠি পাঠিয়েছিলেন ঠিকই কিন্তু ঐ নাজ্জাসীর কাছে চিঠি পাঠাননি যার জানাযার নামাজ তিনি পড়িয়েছিলেন।
হাফেজ ইবনে কাসীর আল বেদায়া ওয়ান্নেহায়াতে ইসলামের দিকে আহবান জানিয়ে পৃথিবীর রাজা বাদশাহদের নিকট রাসূল (সঃ) এর চিঠি প্রেরণের রীতির কথা উল্লেখ করে বলেন, ওয়াক্বেদী উল্লেখ করেছেন যে, এ ঘটনা ৬ষ্ঠ হিজরীর জিলহজ্জ মাসে হোদাইবিয়ার পরে সংঘটিত হয়েছিলো। আর ইমাম বায়হাক্বী এ অধ্যায়টি উল্লেখ করেছেন “মগতার” যুদ্ধের পর। এ ব্যাপারে কোনো মতানৈক্য নেই যে উক্ত ঘটনা শুরু হয়েছিলো মক্কা বিজয়ের পূর্বে এবং আবু সুফইয়ানের কথোপকথনুয়ারী হিরাক্লিয়াস আবু সুফইয়ানকে জিজ্ঞাসা করেছিলো সে কি গাদ্দারী বা বিশ্বাস ঘাতকতা করে? জবাবে আবু সুফইয়ান বলেছিলো! না। আমরা তাকে দীর্ঘ সময় থেকেই জানি। এর মধ্যে সে বিশ্বাস ঘাতকতা করেছে এমন কথা আমাদের জানা নেই। বুখারীতে এসেছে এটা সেই সময়ের কথা যে সময়ে আবু সুফইয়ান রাসূল (সঃ) এর সহযোগিতা করেছে। অতঃপর এ হাদীস উল্লেখ করার পর তিনি বলেন রাসূল (সঃ) নাজ্জাসীর কাছে চিঠি লিখতেন, তবে এ নাজ্জাসী সেই নাজ্জাসী নয় যার জানাযার নামাজ তিনি পড়িয়েছেন।
তৃতীয় পার্থক্যকারী: নাজ্জাসী এমন শরীয়তের অনুসারী ছিলো যার অনেক আইন-কানুন তখনও পরিবর্তিত হয়নি। আল্লাহ তাআলা বলেন: وَكَيْفَ يُحَكِّمُوْنَكَ وَعِنْدَهُمُ التَّوْرَاةُ فِيْهَا حُكْمُ اللهِ
“তারা আপনাকে কেমন করে বিচারক নিয়োগ করবে? অথচ তাদের কাছে তাওরাত রয়েছে। তাতে আল্লাহর নির্দেশ আছে।” (আল মায়েদা: ৪৩)
আইন প্রণয়ন ও রচনাকারী পরিষদের সদস্যসারা ওরকম নয় অর্থাৎ এর আওতাভুক্ত নয়। এ তিনটি পার্থক্যকারী বিষয়ের যে কোনো একটি পাওয়া গেলেই "কেয়াস" বাতিল হওয়ার জন্য যথেষ্ট। আর যদি উল্লেখিত তিনটি পার্থক্যকারী বিষয়ই পাওয়া যায় তাহলে নিঃসন্দেহে "কেয়াস" বাতিল।
তৃতীয় দিকঃ আমরা বলতে চাই, নিঃসন্দেহে নাজ্জাসী (রাঃ) এমন একটি পরিবেশে ইসলাম গ্রহণ করেছিলো যার অবস্থান ছিলো জ্ঞান থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন। ওলামায়ে কেরাম এ ব্যাপারে বলেন যে, যে ব্যক্তি এমন দূরাবস্থায় ইসলাম গ্রহণ করেছে, তার ব্যাপারে এমন বহু বিষয়ই ওযর (অজুহাত) হিসেবে গ্রহণযোগ্য যা অন্যের ব্যাপারে গ্রহণ যোগ্য নয়। এমনিভাবে বর্তমান যুগের মত ঐ সময় যোগাযোগ ব্যবস্থা এতটা উন্নত ছিলোনা। তাই শরীয়তের বিধি বিধান কোনো ব্যক্তির কাছে পৌঁছতে কয়েক বছর সময় লেগে যেতো। এমনকি কোনো কোনো সময় এমনও হতো যে লোকটি মারা গিয়েছে অথচ তখনও তার কাছে শরীয়তের বিধান পৌঁছেনি। এ ব্যাপারে একটি উপমা গ্রহণ করুন। আর তা হচ্ছে এই যে, সহীহ বুখারীতে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত একটি হাদীসে তিনি বলেন: আমরা রাসূল (সঃ) কে নামাজরত অবস্থায় সালাম দিতাম পরে যখন আমরা নাজ্জাসীর কাছ থেকে ফিরে এলাম এবং নামাজরত অবস্থায় সালাম করলাম তখন আর তিনি নামাজে সালামের জবাব দেননি। পরে তিনি বললেন: নামাজে কাজ আছে (অর্থাৎ নামাজের নির্ধারিত কাজ আছে, সালামের জবাব দেয়ার মতো কোনো সুযোগ নেই)
হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) এর মতো একজন বিজ্ঞ মর্যাদাবান আলেম সাহাবীর কাছেই যদি নামাজের মধ্যে কথা ও সালাম বিনিময় রহিত হওয়ার খবরটি পৌঁছে না থাকে, অথচ নামাজের বিষয়টি দিনে ও রাত্রে পাঁচবার হওয়ার কারণে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ও প্রকাশ্য। তাহলে শরীয়তের অন্যান্য বিষয়ের কথা মানুষের কাছে না পৌছা খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার। তাই যে ব্যক্তি আরবী জানে না, আর রাসুল (সঃ) এর সাহচার্যও পায়নি তার ব্যাপারে ওযর বা অজুহাত গ্রহণ করা অধিক যুক্তি সংগত।
চতুর্থ দিক: এ ধরনের অস্পষ্ট বিষয় দ্বারা দলীল পেশ করা যুক্তিসংগত নয়। কারণ অস্পষ্ট বিষয় বাদ দিয়ে "মুহকাম" সুস্পষ্ট বিষয়কে অনুসরণ করার জন্য আমাদেরকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। প্রমাণ সম্বলিত যে সব বর্ণনা উপস্থাপন করা হলো এগুলো মুহকাম বা (সুস্পষ্ট বিষয়ের অন্তর্ভুক্ত) তাই আমরা অবাক হচ্ছি এ জন্য যে, তারা (কুরআন ও সুন্নাহর) সুস্পষ্ট "নস” (বক্তব্য উদ্ধৃতি) থাকা সত্ত্বেও অস্পষ্টতা ও কল্পণা প্রসূত প্রমাণাদির দিকে গিয়েছে।
ইমাম তাবারী তাঁর তাফছীর গ্রন্থে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেন: আল্লাহর বাণী: هُوَ الَّذِي أَنْزَلَ عَلَيْكَ الْكِتَبَ مِنْهُ أَيتَ مُحْكَمْتُ هُنَّ أُمِّ الْكِتَبِ
"তিনিই (আল্লাহ) তোমার প্রতি এই কিতাব নাযিল করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে আয়াত মুহকামাত (সহজবোধ্য), যা কিতাবের মূল বুনিয়াদ।" (আলে ইমরান: ৭)
'মুহকামাত' হচ্ছে ঐসব আয়াত, যে গুলো অন্য আয়াতকে রহিতকারী ও যে গুলোতে রয়েছে হালাল ও হারামের বিধান, শরীয়তের সীমারেখা, ফরজ সমূহের বিবরণ রয়েছে। যেগুলোর প্রতি ঈমান আনা যায় এবং আমল করা যায়। وَآخَرُ مُتَشْبِهت আর মুতাশারিহাত হচ্ছে ঐ সব আয়াত যেগুলো অস্পষ্ট, যে গুলোকে রহিত করা হয়েছে। এর প্রারম্ভিক এবং শেষ, এর মতো, এবং যত শ্রেণী এবং যা শুধু বিশ্বাসই করা যায় কিন্তু তা দ্বারা আমল করা যায়না।
নাজ্জাসী সম্পর্কিত ঘটনার হুকুম রহিত হয়ে গিয়েছে। এ রহিত করণের কাজটি সম্পন্ন হয়েছে পৃথিবীর সমস্ত রাজা বাদশাদের কাছে রাসুল (সঃ) এর চিঠি প্রেরণের মাধ্যমে যাতে তারা ইসলামী আইনে শাসন করে এবং জিজিয়া (কর) আদায় করে। আর এটা হয়েছিলো নাজ্জাসীর মৃত্যুর পর। এর প্রমাণ ইতিপূর্বে পেশকৃত মুসলিমের বর্ণনাকৃত হাদীস, যাতে বর্ণিত আছে যে রাসুল (সঃ) নাজ্জাসীর কাছে চিঠি পাঠিয়েছিলেন, তবে এ নাজ্জার্সী ঐ নাজ্জার্সী ছিলোনা যার জানাযার নামাজ তিনি পড়িয়েছিলেন।
৫ম দিক: গাইরুল্লাহর আইনে যে ব্যক্তি শাসন করে আপনাদের কাছে তার সর্ব নিম্ন অবস্থা হচ্ছে এই যে, শাসন কার্য পরিচালনার দায়িত্ব প্রাপ্ত হলে সে জালেম, ফাসেক, পাপীষ্ঠ এবং যারা তাগুতী বিধানে শাসন করে তাদের প্রত্যেকের পাপের ভাগ তাকে নিতে হবে। সে তার এ অপকর্মের দ্বারা ঐ ব্যক্তির মতো হলো, যে ব্যক্তি কবর তৈরী করে তাওয়াফের মতো ইবাদতে মানুষকে লাগিয়ে দিলো, যে তওয়াফ একমাত্র আল্লাহর ঘর ছাড়া আর কোথাও করা যায়না।
এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, যে ব্যক্তি আল্লাহর বিধানের দিকে বিচার-ফয়সালা প্রত্যার্পন করতে বাধা প্রদান করে, আর তাগুতী আইনে বিচার-ফয়সালা করতে মানুষকে বাধ্য করে, আর যে ইবাদত একমাত্র আল্লাহ ছাড়া আর কারো জন্য করা যায়না, সে ইবাদত এসব তাগুতের জন্য নিবেদন করে, নিশ্চয় সে ব্যক্তি এ কর্মের দ্বারা ফাসেক, জালেম ও পাপীষ্ঠে পরিণত হয়েছে। এটাই হচ্ছে আপনাদের কাছে তাদের সর্বনিম্ন অবস্থা। তাই আমরা বলতে চাই যে নাজ্জাসী (রাঃ) এ অবস্থায় ও এ ধরনের গুণবিশিষ্ট হয়ে পূর্বে উল্লিখিত পাপীষ্টের পর্যায়ে বিবেচনা করা হবে অথচ রাসূল (সঃ) নেককার বান্দা বলে তাকে প্রশংসা করেছেন। তাহলে নিঃসন্দেহে বলা যায়, তাদের কথা ঠিক নয় বরং বাতিল। কেননা নাজ্জাসী "তাওরাতের” বিধান অনুসারী ছিলেন। তিনি তাগুতী বিধানের অনুসারী ছিলেন না। আল্লাহ তায়ালা তাঁর কিতাব তথা আল কুরআনে তাঁর (নাজ্জাসী) এবং তার সত্যানুসারী সাথী সঙ্গীদের প্রশংসা করেছেন।
لَتَجِدَنَّ أَشَدَّ النَّاسِ عَدَاوَةً لِلَّذِينَ آمَنُوا الْيَهُودَ وَالَّذِينَ أَشْرَكُوا ، وَلَتَجِدَنَّ أَقْرَبَهُمْ مَوَدَّةً لِلَّذِينَ آمَنُوا الَّذِينَ قَالُوا إِنَّا نَصْرِى ذَلِكَ بِأَنَّ مِنْهُمْ قِسِّيسِينَ وَرُهْبَانًا وَإِنَّهُمْ لَا يَسْتَكْبِرُونَ -
"মানুষের মধ্যে مسلمانوں বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশী শত্রুতা আপনি দেখতে পাবেন ইয়াহুদী ও মুশরিকদেরকে এবং ঈমানদার লোকদের সাথে বন্ধুত্ব করার দিক থেকে সবচেয়ে নিকটবর্তী পাবেন তাদেরকে যারা বলেছিলোঃ আমরা খ্রীষ্টান এটা এ জন্য যে, খ্রীষ্টানদের মধ্যে আলেম ও দরবেশ বর্তমান আছে। তাদের মধ্যে অহংকার ও অহমিকা বোধ নেই।" (আল মায়েদাহঃ ৮২)
আমরা মনে করি। নিম্নোক্ত আয়াতগুলো যাদের ব্যাপারে প্রযোজ্য তাদের মধ্যে নাজ্জাসী ও রয়েছেন। আয়াতগুলো হচ্ছেঃ إِنَّا أَنْزَلْنَا التَّوْرَاةَ فِيهَا هُدًى وَنُورٌ يَحْكُمُ بِهَا النَّبِيُّونَ الَّذِينَ أَسْلَمُوا لِلَّذِينَ هَادُوا وَالرَّبَّانِيُّونَ وَالْأَحْبَارُ بِمَا اسْتُحْفِظُوا مِنْ كِتَبِ اللَّهِ وَكَانُوا عَلَيْهِ شُهَدَاءَ . فَلَا تَخْشَوُا النَّاسَ وَاخْشَوْنِ وَلَا تَشْتَرُوا بِأَيْتِي ثَمَنًا قَلِيلًا وَمَنْ لَّمْ يَحْكُمُ بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ فَأُولَئِكَ هُمُ الْكَفِرُونَ -
"আমি তওরাত নাযিল করেছি। যাতে রয়েছে হেদায়াত ও আলো। আল্লাহর অজ্ঞাবহ নবী, দরবেশ ও আলেমগন এর মাধ্যমে ইহুদীদেরকে ফয়সালা দিতেন। কেননা তাদেরকে আল্লাহর কিতাবের রক্ষনা-বেক্ষনের দায়িত্ব দেয়া হয়েছিলো, আর তাঁরা ছিলো এর সাক্ষী। অতএব তোমরা মানুষকে ভয় করোনা, আমাকে ভয় করো। আর আমার আয়াতগুলোকে স্বল্প মূল্যে বিক্রি করোনা। যে সব লোক আল্লাহর নাযিলকৃত বিধান অনুযায়ী বিচার-ফয়সালা করেনা তারাই কাফের"। (আল মায়েদাহ: ৪৪)
এ প্রতিবেদনের পর আপনার কাছে বিষয়টি সুস্পষ্ট হয়েছে। এবং দুটি অবস্থার মধ্যে যে পার্থক্য রয়েছে তা পরিস্কার হয়েছে। অর্থাৎ নাজ্জাসীর অবস্থা আর যে ব্যক্তি আইন রচনাকারী পরিষদের সদস্য তার অবস্থার মধ্যে যে পার্থক্য তা সুষ্পষ্ট হয়েছে। নাজ্জাসীর কাহিনীতে অবস্থা ছিলো এমন এক রাজার, যে ছিলো কাফের, সে ঈমানের প্রতি আহবানকারীর আহবানে সাড়া দিয়ে ঈমান গ্রহণ করলো, ঈমানের কাছে আত্মসমর্পন করলো, অন্তর দিয়ে সবকিছু মেনে নিলো, যতটুকু সত্য তার কাছে পৌছলো ততটুকু প্রতিষ্ঠা করলো, তার সাধ্য মতো সত্যকে সাহায্য করলো দ্বীনের জন্য নিজেকে উজাড় করে দিতে তার আগ্রহ প্রকাশ করলো, তার রাজ্যে অনৈসলামি কর্মকান্ড যা ছিলো সব পরিত্যাগ করার জন্য পূর্ণ প্রস্ততি গ্রহণ করলো, আল্লাহর পথে হিজরত করার জন্য সে প্রস্তুত ছিলো এবং দ্বীনের বিরোধী সব কিছু থেকে মৃক্ত বলে ঘোষনা করলো, কিন্তু ইসলামী শরীয়তের পূর্ণতা প্রপ্তির পূর্বেই তার জীবন প্রদীপ নিভে গেলো।
পক্ষান্তরে আরেকটি অবস্থা ছিলো সম্পূর্ণ বিপরীত ধর্মী। তারা ছিলো এমন এক কওম যা করতে, তাদেরকে নির্দেশ দেননি, তারা তাই করলো, আবার যা করতে আল্লাহ তায়ালা নিষেধ করলো, তাও তারা করলো, যাবতীয় অবৈধ পন্থা তারা গ্রহণ করলো, শিরককে তারা তাওহীদের মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করলো, আর নাফরমানী বেছে নিলো আনুগত্যের পথ হিসেবে। তাদের এ অবস্থা হয়েছিলো ইসলামী শরীয়তের পূর্ণতাপ্রাপ্তি ও সত্য প্রকাশের পর।
তাহলে উপরোল্লেখিত একটি অবস্থাকে অপর অবস্থার উপরে কিয়াস করা কিভাবে সম্ভব? অথচ দুটি অবস্থার মধ্যে আকাশ পাতাল পার্থক্য রয়ে গেছে। মূলনীতি বলে যে, দুটি বিষয়ের মধ্যে পার্থক্য থাকলে সে অবস্থায় কিয়াস বাতিল বলে গণ্য হবে।
এ মূল কাহিনী দ্বারা কিভাবে প্রমাণ পেশ করা যাবে, যাতে অন্যকিছু প্রবৃষ্ট হওয়ার বহু সম্ভাবনা রয়েছে? মূলনীতি বলে যে, দলীলের মধ্যে যখন অন্যকিছু প্রবৃষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা থাকে তখন তা বাতিল হিসেবে গণ্য হয়।

📘 মিরাসুল আম্বিয়াঃ নাবীদের উত্তরাধিকার > 📄 দ্বিতীয় সংশয়

📄 দ্বিতীয় সংশয়


আল্লাহর নবী হযরত ইউসুফ (আঃ) 'কর্ম' দ্বারা তারা প্রমাণ পেশ করে। তারা বলে: হযরত ইউসুফ (আঃ) কুফরী নীতির অধীনে ধন-সম্পদ ও অর্থ বিভাগের দায়িত্ব নিয়েছিলেন। অতএব আমাদের জন্য এসব আইন প্রণয়নকারী পরিষদে অংশ করা জায়েয। বিভিন্ন দিক থেকে এর জবাব:
প্রথম দিক: তারা "নস" এর ওপর কিয়াসকে পেশ করেছে। কিয়াস মূলতঃ ইজতিহাদ (কোনো বিষয়ে কুরআন ও সুন্নাহর সুনিদিষ্ট বক্তব্য বা ফয়সালা না থাকলে চিন্তা ভাবনা করে কুরআন ও সুন্নাহ বিরোধী নয় এমন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা) আর "নস" (কুরআন সুন্নাহর সুনির্দিষ্ট বক্তব্য) কোনো বিষয়ে পাওয়া গেলে ঐ বিষয়ে ইজতিহাদের কোনো প্রয়োজন নেই। ইবনে কাইয়্যিম (রহঃ) 'আস্সাওয়ারিক আল-মুরসালা' নামক গ্রন্থে বলেন: কিয়াস যদি "নস" এর সাথে সাংঘর্ষিক ও প্রতিদ্বন্ধী হয়, তাহলে কিয়াস বাতিল বলে গণ্য হবে। আর এ কিয়াসকে ইবলিসী কিয়াস নামে অভিহিত করা হবে। কেননা এ কিয়াসের মাধ্যমে বাতিল দ্বারা হকের বিরোধীতা করা হয়। এ জন্যই এর শাস্তির পরিণতি হচ্ছে এই যে, তার আকল (জ্ঞান বুদ্ধি) বিঘড়ে যায় তার দুনিয়া ও আখেরাত নষ্ট হয়ে যাবে। যে ব্যক্তিই তার জ্ঞান বুদ্ধি দিয়ে 'অহি" এর মোকাবেলা করবে আল্লাহর তায়ালা তার আকলকে (জ্ঞান বুদ্ধিকে) বিগড়িয়ে দিবেন, যার ফলে সমস্ত জ্ঞানীরা হাসবে।
দ্বিতীয় দিক: কিয়াসের জন্য অবশ্যই কিছু শর্ত থাকতে হবে। শর্তের মধ্যে একটি হচ্ছে এই যে, আসল (মূল) এবং শাখার মধ্যে কোনো পার্থক্যকারী বিষয় থাকতে পারবে না। তাহলে কিয়াস শুদ্ধ হবে। তা না হলে কিয়াস বাতিল বলে গণ্য হবে, যার নাম "কিয়াস মাআল, ফারেক"। এখানে পার্থক্যকারী বিষয়গুলো নিম্নরূপঃ
এক: পরিষদের প্রকৃতি বা ধরণ: হযরত ইউসুফ (আঃ) এর কাজ ছিলো মানবীয়। এর প্রমাণ হচ্ছে আল্লাহ তায়ালার বাণী: وَقَالَ الْمَلِكُ ائْتُونِي بِهِ اسْتَخْلِصُهُ لِنَفْسِي ، فَلَمَّا كَلَّمَهُ قَالَ إِنَّكَ الْيَوْمَ لَدَيْنَا مَكِينَ أَمِينُ -
"বাদশাহ বললো: তাকে আমার কাছে নিয়ে এসো। আমি তাকে নিজের বিশ্বস্ত সহচর করে রাখবো। অতঃপর তার সাথে মতবিনিময় করলো তখন বললো: নিশ্চয় আপনি আমার কাছে আজ থেকে বিশ্বস্ত হিসেবে মর্যাদার স্থান লাভ করেছেন।" (ইউসুফ: ৫৪)
আর আইন প্রণয়নকারী পরিষদের সদস্যদের বিষয়টি হচ্ছে এই যে, তারা নিজেদেরকে রব বানিয়ে নিয়েছে, আর বিধান-দাতা হিসেবে তারা নিজেদেরকে আল্লাহর শরীক বানিয়ে নিয়েছে। কেননা তাদের প্রতি আইন প্রণয়নের নিরঙ্কুশ অধিকার দেয়া হয়েছে যে, অধিকার একমাত্র আল্লাহ ব্যতিত আর কারো নেই, তারা এ জঘন্য কর্ম থেকে মুক্তিও নেয়নি, তা পরিত্যাগও করেনি। এর প্রমাণ হচ্ছে তাদের সাংবিধানিক ধারা। যে ধারার বক্তব্য হচ্ছেঃ আইন প্রণয়নের ক্ষমতা ভোগ করবেন সংবিধান অনুযায়ী আমীর এবং জাতীয় সংসদ। এমনিভাবে আরেকটি ধারার বক্তব্য : রাষ্ট্রের শাসননীতি হবে গণতান্ত্রিক। সার্বভৌমত্বের মালিক হচ্ছে জাতি। আর জাতিই হচ্ছে সকল ক্ষমতা উৎস।
দুই: আল্লাহর নাযিলকৃত বিধান মোতাবেক শাসন করা: হযরত ইউসুফ (আঃ) আল্লাহর নাযিলকৃত বিধান মোতাবেক শাসন করেছেন। আল্লাহ তায়ালা বলেনঃ
كَذَلِكَ كِدْنَا لِيُوسُفَ مَا كَانَ لِيَأْخُذَ أَخَاهُ فِي دِينِ الْمَلِكِ -
"এমনিভাবে আমি ইউসুফকে কৌশল শিক্ষা দিয়েছি। সে বাদশাহর আইনে আপন ভাইকে কখনো নিতে পারতো না।" (ইউসুফ: ৭৬)
মুফাসসিরগণ বলেন: অর্থাৎ মিশরের রাষ্ট্রীয় বিধান অনুযায়ী তার [ইউসুফ (আঃ)]-এর ভাই বিনয়ামিনকে রেখে দেয়া ঠিক ছিলো না। বরং তিনি তাঁর ভাইকে রেখে দিয়েছিলেন আল্লাহর বিধান মোতাবেক। হযরত ইব্রাহীম (আঃ) এর শরীয়ত ছিলো চোরকে চুরিকৃত মালের মালিকের কাছে সমর্পণ করা এবং চুরির শাস্তি হিসেবে এক বছর কাল মালিকের গোলাম হিসেবে চোরের বন্দী জীবন কাটানো। আর আইন প্রণয়নকারী পরিষদের সদস্যদের অবস্থা হচ্ছে এই যে, তারা গাইরুল্লাহর বিধানের দিকে বিচার-ফয়সালা নিয়ে যায় এবং আল্লাহর সাথে কুফরী করার দ্বার উন্মুক্ত করে আল্লাহর আইনকে বাছাই করার ক্ষমতা ও সুযোগ দানের মাধ্যমে। এর প্রমাণ হচ্ছে সেই সাংবিধানিক ধারা, যাতে বলা হয়েছে: জাতীয় সংসদের বৈঠক বৈধ হওয়ার শর্ত হচ্ছে অর্ধেকের বেশী সদস্যের উপস্থিতি। আর সিদ্ধান্তসমূহ জারি হবে উপস্থিত সদস্যদের সংখ্যা গরিষ্ঠ রায় ও মতামতের ভিত্তিতে। এবং সেই ধারাও এর প্রমাণ স্বরূপ উল্লেখযোগ্য, যাতে বলা হয়েছেঃ জাতীয় সংসদ সদস্যের আইন ও বিধান প্রস্তাব করার অধিকার আছে এবং প্রতিটি আইন বিল কোনো সদস্যকর্তৃক উত্থাপিত হওয়ার পর সংসদ কর্তৃক যদি তা প্রত্যাখ্যাত হয় তাহলে উক্ত বিল দ্বিতীয়বার একই সেশনে পেশ করা বৈধ হবে না। ১০ নম্বর ধারার বক্তব্য হচ্ছেঃ জাতীয় সংসদ সদস্য পরিষদের কাছে অথবা সংশ্লিষ্ট কমিটির কাছে তার কাছে উদিত যে কোনো মতামত এবং চিন্তা ধারা প্রকাশ করার ব্যাপারে সম্পূর্ণ স্বাধীন। কোনো অবস্থাতেই এর জন্য তাকে জবাব দিহি করা যাবে না।
তিন: পবিত্র ও মুক্ত থাকা: হযরত ইউসুফ (আঃ) তাদের সকল মূর্তি প্রতিমা এবং উপাস্য মূক্ত ছিলেন। এর প্রমাণ হচ্ছে আল্লাহ তায়ালার বাণীঃ إِنِّي تَرَكْتُ مِلَّةَ قَوْمٍ لَا يُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَهُمْ بِالْآخِرَةِ هُمْ كَفِرُونَ وَاتَّبَعْتُ مِلَّةَ آبَانِي ابْرَاهِيمَ وَاسْحَقَ وَيَعْقُوبَ ، مَا كَانَ لَنَا أَنْ نَّشْرِكَ بِاللَّهِ مِنْ شَيْءٍ ، ذَلِكَ مِنْ فَضْلِ اللَّهِ عَلَيْنَا وَعَلَى النَّاسِ وَلَكِنَّ أَكْثَرَ النَّاسِ لَا يَشْكُرُونَ يُصَاحِبَي السجْنِ أَرْبَابٌ مُّتَفَرِّقُونَ خَيْرٌ أَم ام اللهُ الْوَاحِدُ الْقَهَّارُ - مَا تَعْبُdُونَ مِنْ دُونِهِ إِلَّا أَسْمَاءُ سَمَّيْتُمُوهَا أَنتُمْ وَآبَاءَكُمْ مَّا أَنْزَلَ اللَّهُ بِهَا مِنْ سُلْطَنِ إِنِ الْحُكْمُ ذلِكَ الدِّينُ الْقَيِّمِ وَلَكِنَّ أَكْثَرَ النَّاسِ لَا يَعْلَمُونَ إِلا اللهِ ، اَمَرَ أَلَّا تَعْبُdُوا إِلَّا إِيَّاهُ ، ذَلِك
"আমি ঐ সব লোকের ধর্ম পরিত্যাগ করেছি, যারা আল্লাহকে বিশ্বাস করে না এবং পরকালে তারা অবিশ্বাসী। আমি আপন পিতৃ পুরুষ ইব্রাহীম, ইসহাক এবং ইয়াকুবের ধর্ম অনুসরণ করছি। কোনো বস্তুকে আল্লাহর অংশীদার করা আমাদের জন্য শোভা পায়না। এটা আমাদের প্রতি এবং অন্যসব লোকের জন্য আল্লাহ তায়ালার অনুগ্রহ। কিন্তু অধিকাংশ লোকই অনুগ্রহের কথা স্বীকার করেনা। হে কারাগারের সঙ্গীরা। পৃথক পৃথক অনেক উপাস্য ভাল, নাকি পরাক্রমশালী এক আল্লাহ? তোমরা আল্লাহকে ছেড়ে নিছক কতগুলো নামের ইবাদত করছো, সেগুলো তোমরাও তোমাদের পিতৃপুরুষরা সাব্যস্ত করে নিয়েছো। আল্লাহ এ গুলোর কোনো প্রমাণ নাযিল করেননি। আল্লাহ ছাড়া কারো বিধান দেয়ার অধিকার নেই। তিনি নির্দেশ নিয়েছেন যে, তিনি ছাড়া আর কারো ইবাদত করোনা। এটাই সঠিক দ্বীন। কিন্তু অধিকাংশ লোক তা জানে না।" (ইউসূফ: ৩৯-৪০)
আইন প্রণয়নকারী সদস্যদের অবস্থা হচ্ছে এই যে তারা তাদের মূর্তি, তাদের প্রতিমা, তাদের উপাস্য, তাদের তাগুত এবং তাদের সংবিধানকে সম্মান করার জন্য শপথ গ্রহণ করেছে এর প্রমাণ একটি সাংবিধানিক ধারা, যাতে বলা হয়েছে: জাতীয় সংসদের সদস্য তার সংশ্লিষ্ট পরিষদ ও কমিটির কর্মভার গ্রহণ করার পূর্বে একটি প্রকাশ্য অধিবেশনে পরিষদের সামনে নিম্মোক্ত শপথ বাক্য পাঠ করবেন: আমি মহান আল্লাহর নামে শপথ করছি যে, আমি আমার দেশ ও আমীরের প্রতি একনিষ্ঠ হবো। আমি সংবিধান ও রাষ্ট্রের আইন কানুনকে শ্রদ্ধা করবো। আমি জনগনের স্বাধীনতা, তাদের স্বার্থ এবং তাদের সম্পদ রক্ষা করবো। আমি আমার দায়িত্ব আমানতদারী এবং সততার সাথে আদায় করবো।
চার: শক্তি ও স্থিরতার মাধ্যম : হযরত ইউসূফ (আঃ) শক্তি ও স্থিতিশীলতা অর্জন করেছিলেন মু'জেযার মাধ্যমে। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন: يَأْكُلُهُنَّ سَبْعٌ عِجَافٌ وَسَبْعِ يُوسُفُ أَيُّهَا الصِّدِّيقُ افْتِنَا فِي سَبْعِ بَقَرَتِ سِمَانِ يَأْكُلُهُنَّ سُنُبُلَتٍ خُضْرٍ وَأُخَرُ يُبِسْتِ لَعَلَّى أَرْجِعُ إِلَى النَّاسِ لَعَلَّهُمْ يَعْلَمُونَ قَلِيلًا مِّمَّا قَالَ تَزْرَعُوْنَ سَبْعَ سِنِينَ دَابًا ، فَمَا حَصَدْتُمْ فَذَرُوهُ فِي سُنُبُلِهِ إِلَّا قَدَّمْتُمْ لَهُنَّ إِلَّا قَلِيلًا مِّمَّا تَأْكُلُونَ ثُمَّ يَأْتِي مِنْ بَعْدِ ذَلِكَ سَبْعٌ شِدَادٌ يَأْكُلْنَ مَا قَدَّمْتُمْ لَهُنَّ تُحْصِنُونَ ثُمَّ يَأْتِي مِنْ بَعْدِ ذَلِكَ عَامٌ فِيْهِ يُغَاتُ النَّاسُ وَفِيهِ يَعْصِرُونَ
"হে ইউসূফ, হে সত্যবাদী! সাতটি জীর্ণ-শীর্ণ গাভী, সাতটি মোটা তাজা গাভীকে খাচ্ছে, আর সাতটি সবুজ শীষ ও অন্যান্যগুলো শুস্ক, আপনি আমাদেরকে এ স্বপ্নের ব্যাপারে দিক নির্দেশনা দিন যাতে আমি তাদের কাছে ফিরে গিয়ে তাদেরকে অবগত করাতে পারি। সে বললো: তোমরা সাত বছর উত্তমরূপে চাষাবাদ করবে। অতঃপর যা ফসল তোমরা কাটবে তা থেকে অল্প কিছু যা তোমাদের খোরাকীর জন্য প্রয়োজন-বের করে নিবে। আর বাকীগুলোকে তাদের গুচ্ছসহ রেখে দিবে। এরপর সাতটি বছর খুব কঠিন আসবে। এসময়ের জন্য তোমরা সে সব শস্য সঞ্চয় করে রাখবে, তা থেকে খেয়ে যাবে, কিন্তু অল্প পরিমান ব্যতীত যা তোমরা তুলে রাখবে, এর পরই একটি বছর, তখন রহমতের বৃষ্টি বর্ষিত হবে এবং এতে তারা রস নিংড়াবে।" (ইউসূফ: ৪৬-৪৯)
আল্লাহ তায়ালা আরো বলেন: وَقَالَ الْمَلِكُ ائْتُونِي بِهِ اسْتَخْلِصُهُ لِنَفْسِي ، فَلَمَّا كَلَّمَهُ قَالَ إِنَّكَ الْيَوْمَ لَدَيْنَا مَكِينَ آمِينَ قَالَ اجْعَلْنِي عَلَى خَزَائِنِ الْأَرْضِ إِنِّي حَفِيظٌ عَلِيمٌ وَكَذَلِكَ مَكَّنَّا لِيُوسُفَ فِي الْأَرْضِ : يَتَبُوا مِنْهَا حَيْثُ يَشَاءُ ، نَصِيبُ بِرَحْمَتِنَا مَنْ نشَاءُ وَلَا نُضِيعُ أَجْرَ الْمُحْسِنِينَ -
"বাদশাহ বললো: তাকে কাছে নিয়ে এসো, আমি তাকে নিজের বিশ্বস্ত সহচর করে রাখবো। অতঃপর যখন তার সাথে মত বিনিময় করলো, তখন বললোঃ নিশ্চয়ই আপনি আমার কাছে আজ থেকে বিশ্বস্ত হিসেবে মর্যাদার স্থান লাভ করেছেন। ইউসুফ বললো, আমাকে দেশের ধন- ভান্ডারে নিযুক্ত করুন। আমি বিশ্বস্ত রক্ষক ও অধিক জ্ঞানবান। এমনি ভাবে আমি ইউসুফকে সে দেশে প্রতিষ্ঠা দান করেছি। যেখানে ইচ্ছা সেখানে নিজের বাসস্থান বানিয়ে নেয়ার তার পূর্ণ ইখতিয়ার ছিলো। বস্তুতঃ আমি আমার রহমতের সাহায্যে যাকে ইচ্ছা ধন্য করে দেই। পণ্যবাণ লোকদের কর্মফল কখনোই আমার কাছে নষ্ট হয় না।" (ইউসুফ: ৫৪-৫৬)
এ ক্ষেত্রে আইন প্রণয়নকারী পরিষদের সদস্যদের অবস্থা হচ্ছে এই যে, তাদের কাছে শক্তি ও স্থিতিশীলতার মাধ্যম হচ্ছে বিভিন্ন দল ও জামায়াতের মধ্যে নির্বাচন। এটি মূলতঃ জাহেলী নিয়ম-নীতি। এর প্রমাণ হচ্ছে একটি সাংবিধানিক ধারা, যার বক্তব্য হচ্ছেঃ জাতীয় পরিষদ গঠিত হবে ৫০ জন সদস্যকে নিয়ে, যারা সরাসরি গোপন সাধারণ ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত হবে। এটা অবশ্যই সেই বিধান অনুযায়ী হতে হবে যা নির্বাচন সংক্রান্ত বিধিতে লেখা আছে।
পাচ: সিদ্ধান্ত জারী করাঃ হযরত ইউসুফ (আঃ) যে মন্ত্রী সভায় সিদ্ধান্ত জারি করেছিলেন তার সদস্য তিনি একাই ছিলেন। এর প্রশাসন হচ্ছে আল্লাহর তায়ালার বাণীঃ وَ قَالَ الْمَلِكُ ائْتُونِي بِهِ اسْتَخْلِصُهُ لِنَفْسِي فَلَمَّا كَلِمَةٌ قَالَ إِنَّكَ الْيَوْمَ لَدَيْنَا مَكِينٌ امين -
"বাদশাহ বললো: তাকে কাছে নিয়ে এসো, আমি তাকে নিজের বিশ্বস্ত সহচর করে রাখবো। অতঃপর যখন তার সাথে মত বিনিময় করলো, তখন বললোঃ নিশ্চয়ই আপনি আমার কাছে আজ থেকে বিশ্বস্ত হিসেবে মর্যাদার স্থান লাভ করেছেন।" (ইউসুফ: ৫৪)
এ ক্ষেত্রে আইন প্রণয়নকারী পরিষদের সদস্যদের অবস্থা হচ্ছে এই যে, তাদের কাছে পঞ্চাশটি মস্তিষ্কের পঞ্চাশটি দৃষ্টি ভঙ্গি। এর প্রশাসন হচ্ছে সেই সাংবিধানিক ধারা, যার বক্তব্য হচ্ছে: জাতীয় পরিষদের বৈঠক সহীহ হওয়ার জন্য প্রয়োজন পরিষদের অর্ধেকের বেশী সদস্যের উপস্থিতি। আর সিদ্ধান্ত জারি হবে উপস্থিত সংখ্যা গরিষ্ঠ সদস্যদের রায় ও মতামতের ভিত্তিতে।
মুসলমানের একথা জেনে রাখা উচিৎ যে, উপরোল্লিখিত ৫টি পার্থক্যকারী বিষয়ের যে কোনো একটি পাওয়া গেলেই কিয়াস বাতিল বলার জন্য যথেষ্ট। আর যদি ৫টি পার্থক্যকারী বিষয় পাওয়া যায় তাহলে নিঃসন্দেহে এটি (কেয়াস মাআল ফারিগ হওয়ার কারণে) বাতিল কেয়াস বলে গণ্য হবে।

📘 মিরাসুল আম্বিয়াঃ নাবীদের উত্তরাধিকার > 📄 তৃতীয় সংশয়

📄 তৃতীয় সংশয়


তারা বলে আমরা আইন প্রণয়নকারী পরিষদে অংশ গ্রহণ করি স্বার্থরক্ষা করার জন্য, অসুবিধা দূর করার জন্য এবং বাতিলপন্থীদের মোকাবেলা করার জন্য।

জবাব: আমরা বলবো: নিঃসন্দেহে এটি মহৎ উদ্দেশ্য, কিন্তু উদ্দেশ্য সাধনের মাধ্যম হচ্ছে শরীয়ত পরিপন্থী। মুসলমান হিসেবে আমাদের নীতির বক্তব্য, উদ্দেশ্য ও মাধ্যমের সততার প্রমাণ পেশ করে না। তোমাদের উদ্দেশ্য সাধনের মাধ্যম হচ্ছে শিরক এবং বিদআত মিশ্রিত যা আল্লাহ তায়ালার কর্মকে অস্বীকার করে।
আল্লাহর সাথে শিরক এবং কুফরী করা যে সবচেয়ে বড় বিপর্যয়, এ ব্যাপারে তাওহীদবাদী কোনো মুসলমানেরই সন্দেহ নেই। তাই শিরকী এবং কুফরীর চেয়ে বড় গুণাহও নেই। আল্লাহ তায়ালা বলেনঃ
إِنَّ اللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَنْ يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَلِكَ لِمَنْ يَشَاءُ ، وَمَنْ يُشْرِكْ بِاللَّهِ فَقَدِ افْتَرَى إِثْمًا عَظِيمًا -
"নিশ্চয় আল্লাহ তায়ালা তাঁর সাথে কাউকে শরীক করলে তা মাফ করেন না। এ ছাড়া অন্যান্য গুনাহ যাকে ইচ্ছা মাফ করে দেন। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করলো, সে বিরাট মিথ্যা রচনা করলো এবং কঠিন গুনাহর কাজ করলো।" (আন নিসা: ৪৮)
তিনি আরো বলেন:
وَلَقَدْ أُوحِيَ إِلَيْكَ وَ إِلَى الَّذِينَ مِن قَبْلِكَ لَئِنْ أَشْرَكْتَ لَيَحْبَطَنَّ عَمَلُكَ وَلَتَكُونَنَّ مِنَ الْخُسِرِينِ -
"আপনার প্রতি এবং আপনার পূর্ববর্তীদের প্রতি এ অহী নাযিল হয়েছে যে, যদি আপনি আল্লাহর সাথে শরীক সাব্যস্ত করেন তাহলে আপনার সমস্ত আমল নষ্ট হয়ে যাবে। আর আপনি ক্ষতিগ্রস্ত লোকদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবেন।" (আযঝুমার :৬৫)
তিনি আরো ইরশাদ করেন:
لَقَدْ كَفَرَ الَّذِينَ قَالُوا إِنَّ اللَّهَ هُوَ الْمَسِيحُ ابْنُ مَرْيَمَ ، وَ قَالَ الْمَسِيحُ يَا اللَّهَ رَبِّي وَ رَبُّكُمْ ، إِنَّهُ مَنْ يُشْرِكْ بِاللَّهِ فَقَدْ حَرَّمَ اللَّهُ بَنِي إِسْرَائِيلَ اعْبُدُوا اللَّهَ رَ عَلَيْهِ الْجَنَّةَ وَمَاؤُهُ النَّارُ ، وَمَا لِلظَّلِمِينَ مِنْ أَنْصَارِ
"তারা কাফের, যারা বলে যে, মরিয়ম তনয় মসীহ-ই আল্লাহ। অথচ মসীহ বলেন; হে বনী ইসরাইল, তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো, যিনি আমার রব, তোমাদেরও রব। নিশ্চয়ই যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে শরীক স্থির করে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাত হারাম করে দেন এবং তার বাসস্থান হয় জাহান্নাম। আর অত্যাচারীদের জন্য কোনো সাহায্যকারী নেই।" (মায়েদাহঃ ৭২)
মানুষ নিজেকে আল্লাহর সাথে আইন প্রণয়নকারী বানানো (সাব্যস্ত) করা শিরকের অন্তর্ভুক্ত। এরফলে সে আইন প্রণয়নকারীর চেয়ারে বসে এবং আইন প্রণয়নকারীর পদবী গ্রহণ করে। তাগুতের কাছে বিচার চাওয়া শিরকের অন্তর্ভুক্ত। বিচার-ফয়সালা চাওয়া বান্দার ইবাদত সংক্রান্ত কর্ম যা একমাত্র আল্লাহ ছাড়া আর কারো উদ্দেশ্য নিবেদন করা যায় না। যে ব্যক্তি এ ইবাদত (বিচার চাওয়া) কে তাগুতের উদ্দেশ্যে নিবেদন করবে, সে আল্লাহর সাথে শিরককারী (মুশরিক) হিসেবে গণ্য হবে।
আর যে তাগুতকে অস্বীকার করার জন্য আল্লাহ তায়াল নির্দেশ দিয়েছেন, সেই তাগুতের সম্মান রক্ষা করার জন্য শপথ গ্রহণ করা কুফরী।
আল্লাহর আইনকে প্রস্তাব আকারে বাছাই করার জন্য ভোটা- ভোটির উদ্দেশ্যে মানুষের সামনে পেশ করাও কুফরী। আল্লাহ তায়ালার আইনকে ভোটের মাধ্যমে বাছাই করার নীতি উদ্ভাবনের দ্বারা আল্লাহর সাথে কুফরী করার দ্বার উন্মুক্ত করা কুফরী।
উপরোক্ত চারটি বিষয়ের প্রত্যেকটিই মুরতাদ হওয়াকে অপরিহার্য করে তোলে। তাই তাদের সাবধান হওয়া উচিৎ, তারা কিসের সামনে দাড়ানো আছে। তাদের আরো জেনে রাখা দরকার যে, আল্লাহর সাথে শিরক এবং কুফরী হচ্ছে সবচেয়ে বড় বিপর্যয় সৃষ্টিকারী বিষয়। আর উদ্দেশ্য মাধ্যমেরও পথ ও পদ্ধতির সত্যতার প্রমাণ পেশ করে না। আর তাদের কাছে মাধ্যম হচ্ছে কুফরী ও শিরকী কর্ম, যা আল্লাহ তায়ালার পবিত্র কর্মকে অস্বীকার করে।

📘 মিরাসুল আম্বিয়াঃ নাবীদের উত্তরাধিকার > 📄 চতুর্থ সংশয়

📄 চতুর্থ সংশয়


কসম ও শপথ করার ব্যাপারে তারা বলেঃ আমরা যখন পরিষদে অংশ গ্রহণ করি সংবিধান এবং আইন কানুনের ব্যাপারে শপথ করে তখন সত্য ও হক বিষয়গুলোকে আমরা ব্যতিক্রম করে রাখি এবং নিয়তের মধ্যে আমরা বলি যে, এর (সংবিধানের) মধ্যে যে সব হক বিষয়াবলী আছে তার সম্মান রক্ষার জন্য আমরা শপথ গ্রহণ করি।

জবাব : আমরা বলতে চাই যে, যদি তারা জানতো, তাওহীদ কি, এবং মিল্লাতে ইব্রাহীম (আঃ) কি, তাহলে তারা এ ধরণের কথা বলতে পারতো না এবং দ্বীনের ব্যাপারে তারা এভাবে মোহাবিষ্ট হতে পারতো না, নিজেরাও গোমরাহ হতো না, অপরকেও গোমরাহ করতো না, তাদের এ সংশয়ের কয়েকটি জবাব রয়েছে।
এক : আমরা বলতে চাই, আল্লাহ তায়ালা যাকে ইসলাম সর্ম্পকে সামান্য জ্ঞান দান করেছেন, এমন প্রত্যেক ব্যক্তিই জানেন যে তাওহীদের ইতিবাচক এবং নেতিবাচক দুটি ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত সত্য বা হক যখন বাতিল ও শিরক দ্বারা মিশ্রিত হয়, তখন প্রথমেই মানুষের শিরক এবং কুফরীর মতো বাতিলকে পরিহার করে সত্যকে তা থেকে পৃথক করা অতঃপর তা প্রতিষ্ঠিত করা উচিৎ। যেমনটি তাওহীদবাদীদের ঈমান সম্পর্কে হযরত ইব্রাহীম (আঃ) তাঁর জাতিকে লক্ষ্য করে বলেছিলেন:
وَإِذْ قَالَ إِبْرَاهِيمُ لِأَبِيهِ وَقَوْمِهِ إِنَّنِي بَرَاءٌ مِّمَّا تَعْبُdُونَ ( إِلَّا الَّذِي ) إِلَّا الَّذِي فَطَرَنِي فَإِنَّهُ سَيَهْدِينِ -
"যখন ইব্রাহীম তাঁর পিতা ও তাঁর সম্প্রদায়কে বললো, তোমরা যাদের পূজা করো, তাদের সাথে আমার কোনো সম্পর্ক নেই। তবে আমার সম্পর্ক তাঁর সাথে যিনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর তিনি আমাকে সৎ পথ প্রদর্শন করবেন।" (আয যুখরুফ : ২৬-২৭)
হযরত ইব্রাহীম (আঃ) সর্ব প্রথম তাদের যাবতীয় মা'বুদ বা উপাস্যদের ব্যাপারে নিজেকে পবিত্র ও মুক্ত ঘোষণা করলেন, অতঃপর সত্যকে সেই পঙ্কিলতা থেকে পৃথক করলেন। আর সত্যটি হচ্ছে, এক আল্লাহর ইবাদত করা, এটাই হচ্ছে মিল্লাতে ইব্রাহীম যা থেকে বিমুখ হলে নিজেকে কলঙ্কিত করা হয়।
দুই : এটাতো জানা কথা যে, যে ব্যক্তি জবরদস্তি ছাড়া এবং হাকিকত সম্পর্কে অজ্ঞতা ছাড়া স্বেচ্ছায় তাগুতকে সম্মান করার জন্য শপথ করে, সে তাগুতকে অস্বীকার করলো না, অথচ অন্তর জবান ও অঙ্গ-প্রতঙ্গ দিয়ে তাগুতকে অস্বীকার করা অপরিহার্য। এ কথা জেনে রাখা উচিৎ যে, দ্বীনের স্থান হতে হবে অন্তরে বিশ্বাস, ভালবাসা এবং ঘৃণার (নাফরমানীর ক্ষেত্রে) মাধ্যমে। দ্বীনের স্থান জবানে হতে হবে সত্যের উচ্চারণ এবং কুফরী কথা পরিত্যাগের মাধ্যমে। এমনিভাবে দ্বীনের স্থান হতে হবে অঙ্গে প্রত্যঙ্গে ইসলামের মৌলিক বিষয়গুলোকে কার্যে পরিণত করার মাধ্যমে, কুফরী কর্ম পরিত্যাগ করার মাধ্যমে। এ তিনটি বিষয়ের যে কোনো একটি বিষয়ে বিনষ্ট হলে মানুষ কাফের ও মুরতাদ হয়ে যাবে। (আদ্দুরার আস সুন্নিয়া কিতাবু হুকমিল মুরতাদ ৮৭/৭ পৃঃ)
যে ব্যক্তি কুফরী কথা ও কর্মের প্রকাশ ঘটালো, সে ব্যক্তি মুরতাদ হয়ে যাওয়ার ফয়সালার ব্যাপারে এটা হচ্ছে সুস্পষ্ট কথা। অতএব যে ব্যক্তি একথা বলে যে, আমি শপথ করি এবং আমার নিয়তের মধ্যে হককে আলাদা করে রাখি। (অর্থাৎ নাফরমানীর কাছে শপথ করার সময় খারাপ কাজে তা ব্যবহার করবো না, এ নিয়ত করি) তাদের এ কথা সম্পূর্নরূপে বাতিল ও প্রত্যাখ্যাত। কেননা বাহ্যত: এটা কুফরী কথা। যেহেতু আল্লাহকে বাদ দিয়ে হাকিকত সম্পর্কে অজ্ঞতা ছাড়া কিংবা জবরদস্তি মূলক হত্যা অথবা শাস্তির আশংকা ছাড়াই তাগুতী আইনকে সম্মান করা গাইরুল্লাহর ইবাদত করার জন্য যেহেতু শপথ করা হয়েছে, সেহেতু তার কথা বাতিল ও প্রত্যাখ্যাত।
শাইখ মুহাম্মদ বিন আবদুল ওয়াহহাব (রহঃ) তাঁর কাশফুশ শুবহাত নামক পুস্তিকায় বলেন, "প্রত্যেক মাযহাবের ওলামায়ে কেরাম " মুরতাদের হুকুম সংক্রান্ত যে অধ্যায়ের কথা উল্লেখ করেছেন তার অর্থ কি? মুরতাদ হচ্ছে ঐ মুসলমান, যে ইসলামকে গ্রহণ করার পর ইসলামকে অস্বীকার করে। অতঃপর এর অনেক প্রকার ও শ্রেণীর কথা উল্লেখ করেছেন, উল্লেখিত সব বিষয়েই কুফরী সংক্রান্ত। এমনকি তারা অতিসামান্য বিষয়ের কথা ও হুকুম সহ উল্লেখ করেছেন। যেমন: এমন কথা যা মুখে বলা হয় অথচ অন্তরে নেই, অথবা এমন কথা, যা শুধুমাত্র ঠাট্টা ও খেলাচ্ছলে বলা হয়।
লক্ষ্য করুন, বলা হয়েছে, অতি সামান্য বিষয়ের কথাও তার হুকুম সহ উল্লেখ করা হয়েছে। যেমন এমন কথা যা মুখে আছে অথচ অন্তরে নেই। তিনি তাঁর পুস্তিকার শেষ দিকে বলেন: এটা যখন নিশ্চিত সত্য যে, যে সব মুনাফিক রাসুল (সঃ) এর সাথে রুমের যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেছিলো, তারা কাফের হিসেবে বিবেচিত হয়েছিলো কিছুকথা শুধুমাত্র খেলাচ্ছলে এবং ঠাট্টাচ্ছলে বলার কারণে তখন এটা সুস্পষ্ট যে, যে ব্যক্তি কুফরী কথা বলে অথবা কুফরী কর্ম করে সম্পদের স্বল্পতার আশংকায়, অথবা কারো দয়া বা সাহায্য লাভের আশায়, সে ব্যক্তির অপরাধ অবশ্যই তার চেয়ে জঘণ্য যে ব্যক্তি কুফরী কথা বলে শুধুমাত্র ঠাট্টাচ্ছলে।
আল্লামা শাইখ আবদুল্লাহ বিন আবদুর রহমান আবা বাতিন (রহঃ) বলেন: মুসলমান যখন এ কলেমার মহান মর্যাদার কথা এবং এর বাধ্যবাধকতার কথা জানতে পারলো, তখন তাকে এর প্রতিফলন ঘটাতে হবে আন্তরিক বিশ্বাসের মাধ্যমে, জবান দ্বারা উচ্চারণের মাধ্যমে এবং এর মৌলিক বিষয়গুলো আমলে পরিণত করার মাধ্যমে, এ তিনটি বিষয়ের কোনো একটিও যদি বাদ পড়ে যায় তাহলে কোনো ব্যক্তি আল্লাহ তায়ালার কিতাবের বর্ণনা মতে মুসলমান হতে পারবে না। ইসলামের মৌলিক বিষয়গুলো পালনের মাধ্যমে যদি একজন মানুষ মুসলমান হয়, অতঃপর তার মধ্যে যদি এমন কোনো কথা, কাজ এবং বিশ্বাসের সূত্রপাত হয়, যা ইসলামের বিপরীত, তাহলে, তার কোনো লাভ নেই। আল্লাহ তায়ালা তাবুক যুদ্ধের ব্যাপারে যারা কুফরী কথা বলেছে তাদের প্রসংগে বলেন:
لا تَعْتَذِرُوا قَدْ كَفَرْتُمْ بَعْدَ إِيْمَانِكُمْ - "তোমরা ছলনা করো না। তোমরা যে ঈমান গ্রহণ করার পর কুফরী করেছো।" (আত-তওবাহ: ৬৬) অন্যদের ব্যাপারে আল্লাহ বলেন:
يَحْلِفُونَ بِاللَّهِ مَا قَالُوا وَلَقَدْ قَالُوا كَلِمَةَ الْكُفْرِ وَكَفَرُوا بَعْدَ إِسْلَامِهِمْ - "এ সব লোকেরা আল্লাহর নামে শপথ করে বলে যে, তারা সে কথা বলেনি। অথচ তারা কুফরী কথা বলেছে এবং ইসলাম গ্রহণের পর কুফরী অবলম্বন করেছে।" (আত-তওবাহঃ৭৪)
শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়া (রহঃ) বলেনঃ মোদ্দা কথা হচ্ছে, যে ব্যক্তি এমন কথা বলে অথবা এমন কাজ করে যা কুফরী, সে এর দ্বারা কুফরী করলো, যদিও সে এর দ্বারা কাফের হওয়ার ইচ্ছা পোষণ করেনি। তবে ইল্লা-মাশাআল্লাহ কাফের হওয়ার ইচ্ছা কেউ পোষণ করেনা। এ প্রসংগে ওলামায়ে কেরামের কথা অনেক।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00