📄 এক : আইন পরিষদে অংশ গ্রহণ হারাম এবং তা শিরকের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার দলীল
১ম দলিল: আল্লাহ তায়ালা বলেন: أَمْ لَهُمْ شُرَكُوا شَرَعُوا لَهُمْ مِّنَ الدِّينِ مَالَمْ يَأْذَنْ بِهِ اللَّهُ
"তাদের কি এমন শরীক দেবতা আছে, যারা তাদের জন্য এমন দ্বীন ঠিক করে দিয়েছে, যার অনুমতি আল্লাহ তায়ালা দেননি।" (আশ-শুরাঃ ২১)
নিঃসন্দেহে জ্বিনা, চুরি, মিথ্যা অপবাদ ও মদ্যপান ইত্যাদির শাস্তি প্রদান দ্বীনি দায়িত্ব পালনেরই অংশ। আর এসব বিষয়ই তারা [আল্লাহর বিধানের ওপর আইন প্রণয়নে বিশ্বাসী এ সব বিষয়ে] আইন প্রণয়ন করে। অথচ এগুলো এমন দ্বীনি বিষয় যেগুলোতে একমাত্র আল্লাহ ছাড়া কারো জন্য বিধান রচনা করার বৈধ অধিকার নেই। অতএব যারা এসব বিষয়ে বিধান রচনা করার অধিকার রয়েছে বলে মনে প্রাণে বিশ্বাস করে, তারা উপরোক্ত আয়াত অনুযায়ী আল্লাহর সাথে শিরককারী। অতএব এ ক্ষেত্রে নিয়ত এবং কথার প্রতি কোনো দৃষ্টি দেয়া হবে না। বলা হবে না যে, এ সব চেয়ারগুলো [যেখানে বসে আল্লাহর আইন থাকা সত্ত্বেও একই বিষয়ে আইন রচনা করা হয়] আহবানের মঞ্চ হিসেবে বিবেচনা করা হবে না। আইন প্রণয়নকারীর চেয়ারে যেই বসবে সে রাজী থাকুক বা না থাকুক আইন প্রণয়নকারী হিসেবেই তার পরিচয়। সাংবিধানিক ধারা মোতাবেক সে আইন প্রণয়নকারী, এর ফলে সকল কতৃপক্ষই তার সাথে আইন প্রণয়নকারী হিসেবেই তার সাথে আচরণ করবে, শিরকী মাধ্যম শরীয়ত সম্মত নয়। মুসলমান হিসেবে এ ক্ষেত্রে আমাদের নীতি বলেঃ উদ্দেশ্য কখনো ওয়াসিলা বা মাধ্যমের সত্যতা প্রমাণ করে না। আর ওয়াসিলা (মাধ্যম) তাদের কাছে এমন শিরক যুক্ত, যা আল্লাহ তায়ালার কর্মের সাথে অন্যের সাদৃশ্য ও সমকক্ষতা প্রমাণ করে (যা শরীয়তে সম্পূর্নরূপে নিষিদ্ধ।]
২য় দলীল: এটা সকলের ভালভাবে জানা যে, আইন প্রণয়নকারী পরিষদের সদস্যদের মধ্যে বিবাদ, ঝগড়া ও মতানৈক্য হলে তারা বিবাদপূর্ণ বিষয়ের ফয়সালা বা নিষ্পত্তি করার জন্য তাগুতের কাছে তথা সংবিধানের কাছে সোপর্দ করে। সংবিধানই হচ্ছে তাদের বিবাদের ফয়সালার মধ্যমনি এবং সংবিধান হচ্ছে তাদের সকল বিবাদপূর্ণ বিষয়ে মীমাংসাকারী। এটা নিঃসন্দেহে ইসলাম ও ঈমানের সম্পূর্ণ বিপরীত ধর্মী বিষয়।
আল্লাহ তায়ালা বলেনঃ أَلَمْ تَرَ إِلَى الَّذِينَ يَزْعُمُونَ أَنَّهُمْ آمَنُوا بِمَا أُنْزِلَ إِلَيْكَ وَمَا أُنْزِلَ مِن قَبِلِكَ يُرِيدُونَ أَنْ يَتَحَاكَمُوا إِلَى الطَّاغُوتِ وَقَدْ أُمِرُوا أَنْ يَكْفُرُوا بِهِ ، وَيُرِيدُ الشَّيْطَانُ أَنْ يُضِلَّهُمْ ضَلَالًا بَعِيدًا (النساء (٦٠)
"আপনি কি তাদেরকে দেখেননি, যারা দাবী করে যে আপনার প্রতি যা নাযিল করা হয়েছে এবং আপনার পূর্বে যা নাযিল হয়েছে তার প্রতি তারা ঈমান এনেছে। তারা বিচার-ফয়সালাকে তাগুতের কাছে নিয়ে যেতে চায়। অথচ তাগুতর্কে অস্বীকার করার জন্য তাদেরকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। আর শয়তান তাদেরকে পথভ্রষ্ট করে গোমরাহীর চরমে নিয়ে যেতে চায়।" (আন নিসা: ৬০)
আল্লামা শাইখ সুলাইমান বিন আব্দুল্লাহ আল-শাইখ তাঁর تيسير العزيز الحميد এ أَلَمْ تَرَ إِلَى الَّذِينَ يَزْعُمُونَ আয়াত সম্পর্কে বলেন: তাগুতের কাছে কুরআন ও সুন্নাহ বাদ দিয়ে বিচার ফয়সালার জন্য না যাওয়া ফরজ। এ কথার দলিল এ আয়াতে রয়েছে। আর যে ব্যক্তি তাগুতের কাছে বিচার ফয়সালা নিয়ে যাবে সে মুসলমানও নয় মোমিনও নয়।
আল্লামা শাইখ আস-সালাফী মুহাম্মদ জামাল উদ্দীন আল-কাসেমী محاسن التأويل নামক তাফসীর গ্রন্থে এ আয়াতের তাফসীর করতে গিয়ে বলেন: আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন। يُرِيدُونَ أَنْ يَتَحَاكَمُوا إِلَى الطَّاغُوتِ وَقَدْ أُمِرُوا أَنْ يَكْفُرُوا بِهِ
"তারা বিচার-ফয়সালাকে তাগুতের কাছে নিয়ে যেতে চায়, অথচ তাকে অস্বীকার করার জন্য তাদেরকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।" (আন নিসা: ৬০)
এখানে তাগুতের কাছে বিচার নিয়ে যাওয়াকে তাগুতের প্রতি ঈমান আনয়ন করা বলা হয়েছে আর তাগুতের প্রতি ঈমান আনার অর্থই হচ্ছে আল্লাহর সাথে কুফরী করা। ঠিক যেমনি ভাবে তাগুতের প্রতি কুফরী করা মানেই আল্লাহর প্রতি ঈমান আনা।
দ্বিতীয় প্রবন্ধে তাগুতের কাছে বিচার-ফয়সালা চাওয়ার অর্থ যে তাগুতের প্রতি ঈমান আনা এ প্রসংগে কতিপয় আলেমের বক্তব্য পেশ করা হয়েছে।
৩য় দলীল: আল্লাহ তায়ালা বলেনঃ
يَـٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوٓا۟ أَطِيعُوا۟ ٱللَّهَ وَأَطِيعُوا۟ ٱلرَّسُولَ وَأُو۟لِى ٱلْأَمْرِ مِنكُمْ ۖ فَإِن تَنَـٰزَعْتُمْ فِى شَىْءٍ فَرُدُّوهُ إِلَى ٱللَّهِ وَٱلرَّسُولِ إِن كُنتُمْ تُؤْمِنُونَ بِٱللَّهِ وَٱلْيَوْمِ ٱلْـَٔاخِرِ ۚ ذَٰلِكَ خَيْرٌ وَأَحْسَنُ تَأْوِيلًا
"হে ঈমানদারগণ তোমরা আল্লাহর আনুগত্য করো, রাসুলের আনুগত্য করো এবং সে সব লোকদেরও আনুগত্য করো, যারা তোমাদের মধ্যে দায়িত্ব সম্পন্ন। আর যদি তোমাদের মধ্যে কোনো বিষয়ে মতবিরোধ দেখা দেয়, তাহলে মীমাংসার জন্য বিষয়টিকে আল্লাহর ও তাঁর রাসুলের নিকট প্রত্যার্পন করো যদি তোমরা আল্লাহর প্রতি এবং আখেরাতের প্রতি ঈমান এনে থাকো। এটাই মঙ্গলজনক এবং পরিণতির দিক দিয়ে এটাই উত্তম।" (আন নিসা-৫৯)
ইমাম ইবনে কায়্যিম এ আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেনঃ মানুষের মধ্যে বিবাদপূর্ণ সকল দ্বীনি বিষয়ের ফয়সালার জন্য বিষয়টিকে আল্লাহর ও তাঁর রাসুলের কাছে প্রত্যার্পন করা যে ওয়াজিব তার অকাট্য দলিল হচ্ছে এ আয়াত। আল্লাহ ও তাঁর রাসুল ছাড়া অন্য কারো নিকট তা প্রত্যার্পন করা যাবে না। আল্লাহ ও তাঁর রাসুল ছাড়া অন্য কারো কাছে প্রত্যার্পন করলে সে আল্লাহর নির্দেশের বিরোধিতা করলো। যে ব্যক্তিই বিরোধিতাপূর্ণ বিষয়ের বিচার-ফয়সালার জন্য আল্লাহ ও তাঁর রাসুল ব্যতীত অন্য কারো দিকে আহবান জানালো সে মুলতঃ জাহেলিয়াতের দিকে আহবান জানালো। যতক্ষণ পর্যন্ত বান্দারা বিরোধপূর্ণ বিষয়টিকে মীমাংসার জন্য আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের দিকে প্রত্যার্পন না করবে ততক্ষণ পর্যন্ত বান্দা ঈমানের আওতায় প্রবেশ করতে পারবে না। এ জন্যই আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেনঃ
إِن كُنتُمْ تُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ
"যদি তোমরা আল্লাহর প্রতি এবং আখেরাতের প্রতি ঈমান এনে থাকো।" একটি বিষয় আমরা আগেই আলোচনা করেছি তা হচ্ছে, শর্ত পাওয়া না গেলে শর্তকৃত বিষয়ও পাওয়া যায় না। অতএব প্রমাণিত হলো যে ব্যক্তি বিবাদপূর্ণ বিষয়ের মীমাংসার জন্য আল্লাহ ও তাঁর রাসুলকে (সঃ) বাদ দিয়ে অন্য কাউকে প্রত্যার্পন করলো, সে আল্লাহ এবং পরকালের প্রতি ঈমানের যে দাবী তা থেকে বের হয়ে গেলো। বর্ণনা ও সমাধানের দিক থেকে এ রক্ষাকারী ও অকাট্য আয়াতই যথেষ্ট। এটা অকাট্য হচ্ছে বিরোধিতাকারীদের ক্ষেত্রে, আর রক্ষাকারী হচ্ছে যারা এ আয়াতের নির্দেশাবলীকে মেনে চলে।
হাফেজ ইবনে কাছীর এ আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন: অর্থাৎ সমস্ত ঝগড়া এবং অজ্ঞতা জনিত বিবাদ তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের (সঃ) কাছে প্রত্যার্পন করো এবং তোমাদের মধ্যে বিরোধপূর্ণ বিষয়ের ফয়সালার জন্য আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের (সঃ) কাছে নিয়ে যাও।
اِنْ كُنْتُمْ تُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ - এ আয়াত প্রমাণ করে যে, যে ব্যক্তি বিবাদপূর্ণ বিষয়গুলোর মীমাংসার জন্য আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের (সঃ) কাছে প্রত্যার্পন না করলো, সে মূলতঃ আল্লাহ ও আখেরাতের প্রতি ঈমান আনতে পারলো না।
৪র্থ দলীল: আল্লাহ তায়ালা বলেন: وَاللَّهُ يَحْكُمُ لَا مُعْقِبَ لِحُكْمِهِ وَهُوَ سَرِيعُ الْحِسَابِ
আমরা যদি ধরে নেই যে, আইন প্রণয়নকারী পরিষদের কোনো একজন সদস্য এমন একটি প্রস্তাব পেশ করলেন, যা দ্বারা আল্লাহ তায়ালার কোনো একটি বিধানকে তিনি বাস্তবায়ন করতে চান। আর নিঃসন্দেহে তিনি এ বিধানটি আইন প্রণয়ন পরিষদের সদস্যদের সামনে ভোটের জন্য উপস্থাপন করতে যাচ্ছেন। অতঃপর তার ওপর আলোচনা হবে এবং ফলাফল সংখ্যা গরিষ্ঠ ভোটের ভিত্তিতে হয়তো প্রস্তাবটি পাসও হতে পারে আবার নাকচও হতে পারে। যদি আইন প্রণয়ন পরিষদের কাছে উপস্থাপিত আল্লাহর আইন সংক্রান্ত প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যাত হয়, তাহলে নিয়মানুযায়ী এক বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পূর্বে প্রস্তাবটি পূনরায় উপস্থাপন করা যাবে না। এমতাবস্থায় এ কুফরী কর্মের চেয়ে জঘণ্য আর কি কুফরী কর্ম হতে পারে? সমগ্র বিশ্বের প্রভু, রাজাধিরাজ, মহাপ্রভূ আল্লাহ তায়ালার আইন বিবেচনার জন্য পেশ করা হচ্ছে মানুষের কাছে। এ পরিস্থিতিতে আল্লাহর আইন কবুলকারী এবং প্রত্যাখ্যানকারী উভয়েই বিরাট বড় কুফরীতে নিপতিত হয়েছে। কবুলকারী কুফরীতে নিপতিত হওয়ার কারণ হচ্ছে আল্লাহর আইন বেছে নেয়ার জন্য বা বিবেচনার জন্য উপস্থাপনা করা হয়েছিলো [অথচ আল্লাহর আইন কখনো বিবেচনা করে কবুল বা প্রত্যাখ্যান করার বিষয় নয় বরং তা প্রয়োগ করাই হচ্ছে বান্দার ওপর ফরজ। আল্লাহর বিধানকে পরিষদে প্রস্তাব আকারে পেশ করার মাধ্যমে এবং আল্লাহর আইনকে বাছাই করার পথ উন্মুক্ত করার মাধ্যমে আল্লাহর সাথে কুফরী করার পথকে সুগম করা হয়েছে। নিঃসন্দেহে এটা কুফরী।
বিষয়টা ভাল করে অনুধাবন করার জন্য আমরা বলতে চাই, প্রস্তাব পেশকারী সদস্যের জন্য আইন প্রণয়নকারী পরিষদের কাছে ফরজ নামাজের রাকাত নির্ধারনের জন্য যেমন জোহরের নামাজ চার রাকাত নাকি তিন রাকাত অথবা আসরের নামাজ কি চার রাকাত নাকি পাঁচ রাকাত হবে এ প্রস্তাব আলোচনার জন্য পেশ করা হয়, অতঃপর তার চূড়ান্ত ফয়সালা যদি অধিকাংশ সদস্যের ভোটের ফলাফলের ভিত্তিতে হয়, তাহলে এ কাজটি কি জায়েয হবে? এটা আপনাদের কাছে কুফরী বলে গণ্য হবে? যদি জবাব হাঁ বোধক হয় তাহলে নামাজের ক্ষেত্রে আল্লাহর বিধান বিবেচনার জন্য আইন প্রণয়নকারী পরিষদের কাছে উপস্থাপন করলো তার মধ্যে আর যে যে ব্যক্তি আল্লাহর পক্ষ থেকে বিভিন্ন অপরাধের জন্য নির্ধারিত শাস্তি সহ কেসাসের (হত্যার বদলে হত্যার) ক্ষেত্রে আল্লাহর আইন বিবেচনা করার জন্য পেশ করলো তার মধ্যে কি পার্থক্য রয়েছে।
৫ম দলীল: আল্লাহ তায়ালা বলেন: فَمَنْ يَكْفُرْ بِالطَّاغُوْتِ وَيُؤْمِنُ بِاللَّهِ فَقَدِ اسْتَمْسَكَ بِالْعُرْوَةِ الْوُثْقَى -
"যে ব্যক্তি তাগুতকে অস্বীকার করলো এবং আল্লাহর প্রতি ঈমান আনলো সে এমন সুদৃঢ় হাতল (অবলম্বন) ধারণ করেছে যা কখনো ভাংবে না।" (আল বাকারাহ: ২৫৬)
নিঃসন্দেহে এসব মানব রচিত বিধান এবং আল্লাহর আইনের পরিপন্থী সকল আইন কানুন তাগুতের অর্ন্তভূক্ত। কারণ এ আইনের মাধ্যমে আল্লাহর আইনের সীমা লংঘন করা হচ্ছে এবং এ আইনের কাছে মানুষ বিচার-ফায়সালা নিয়ে যাচ্ছে। যার ফলে এ আইন পৃথিবীতে এমন প্রতিমারূপ নিচ্ছে যার ইবাদত ও উপাসনা করা হয়।
আমাদের জেনে রাখা প্রয়োজন যে, আল্লাহ তায়ালা ছাড়া যার ইবাদত করা হয় তাকে বলে মাবুদ বা উপাস্য। এ ধরনের মাবুদ বা উপাস্যের সংখ্যা হচ্ছে চার। যথাঃ সানাম (মুর্তি), ওয়াসান (প্রতিমা) ইলাহ (আল্লাহ ছাড়া যাকে ইলাহ মনে করে ইবাদত করা হয়) রব (আল্লাহ ছাড়া যাকে রব মনে করা হয়) এ চার উপাস্য যখন একত্রিত হয় তখন বিভিন্ন দৃষ্টিকোন থেকে তাদের মধ্যে পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। আবার যখন তারা আলাদা বা বিচ্ছিন্ন থাকে তখন অন্যদিক থেকে তাদের মধ্যে ঐক্য পরিলক্ষিত হয়। অতএব তারা যখন বিচ্ছিন্ন ভাবে আসে তখন তাদের "কারণ" পর্যালোচনা করলে একটি বিষয়ে তাদের মধ্যে ঐক্য পাওয়া যায় আর তা হচ্ছে তারা সকলেই (আল্লাহ ছাড়া) উপাস্য। তারা যখন একত্রে আসে তখন তাদের অর্থ ভিন্ন ভিন্ন হয়। এ দৃষ্টিকোন থেকে তারা বিচ্ছিন্ন
সানাম (মূর্তি) হচ্ছে ঐ সব খোদাই করা অচেতন পদার্থ, যা মানুষ কিংবা কোনো পশু বা অন্য কোনো কিছুর আকৃতিতে তৈরী করে (আল্লাহকে বাদ দিয়ে) উপাসনা করা হয়।
ওয়াছান (প্রতিমা) হচ্ছে ঐ সমস্ত বস্তু আল্লাহকে বাদ দিয়ে যার ইবাদত করা হয়। চাই তা চেতন পদার্থ হোক অথবা অচেতন পর্দাথ হোক, খোদাইকৃত হোক অথবা না হোক। যেমন গাছ, পাথর, কবর, মানব রচিত সংবিধান এবং এ সাদৃশ্যপূর্ণ যা কিছু আছে। এর প্রমাণ হচ্ছে রাসুল (সঃ) এর বাণী
اللهم لا تجعل قبرى و ثنا يعبد اشتد غضب الله على قوم اتخذوا قبور انبياء هم مساجد رواه مالك في موطنه
"হে আল্লাহ তুমি আমার কবরকে এমন প্রতিমাতে পরিনত করো না যার ইবাদত করা হয়। সেই জাতির ওপর আল্লাহর গজব তীব্র হয়েছে যারা তাদের নবীদের কবরকে মসজিদে পরিনত করেছে (অর্থাৎ কবর উপাসনালয় বানিয়েছে (মুওয়াত্তা মালেক)
খোদাই করে নির্মিত মূর্তি "ওয়াসান " (আল্লাহ ছাড়া যার ইবাদত করা হয়) হতে পারে। কারণ যে সব স্থবির ও অচেতন পদার্থের উপাসনা করা হয় সবই "ওয়াসান" এর অন্তর্ভূক্ত। প্রত্যেক মর্তি "ওয়াসান" কিন্তু প্রত্যেক "ওয়াসান" মূর্তি নাও হতে পারে। কেননা মূর্তি এবং অন্যান্য যে সব বস্তুকে আল্লাহ ব্যতিত ইবাদত করা হয় এর সবই ওয়াসানের অন্তর্ভুক্ত।
ইলাহ: আল্লাহর উলুহিয়াতের সাথে বিশেষভাবে সম্পৃক্ত ইবাদত যারই উদ্দেশ্যে নিবেদন করা হয় তাকেই 'ইলাহ' বলা হয়। চাই তা জ্যান্ত মানুষ হোক, অথবা খোদাই করা অথবা অখোদাইকৃত কোনো অচেতন পদার্থ হোক। এর দলিল বা প্রমাণ হচ্ছে আল্লাহ তায়ালা বলেন: وَقَالُوا لَا تَذَرُّنَّ الهَتَكُمْ وَلَا تَذَرْنَ وَدًّا وَلَا سُوَاعًا وَلَا يَغُوْثَ وَيَعُوقَ وَنَسْرًا -
"তারা বলে, তোমরা তোমাদের উপাস্যদেরকে ত্যাগ করো না এবং ত্যাগ করো না ওয়াদা সুয়া, ইয়াগুছ, ইয়াউক এবং নসরকে।" (নূহঃ২৩) আল্লাহ তায়ালা আরো বলেনঃ وَإِذْ قَالَ اللَّهُ يُعِيسَى ابْنَ مَرْيَمَ وَأَنْتَ قُلْتَ لِلنَّاسِ اتَّخِذُونِي وَأُمِّيَ الْهَيْنِ مِنْ دُونِ اللَّهِ ، قَالَ سُبْحَنَكَ -
"আল্লাহ তায়ালা যখন বলবেন, হে ঈসা ইবনে মরিয়াম, তুমি কি লোকদেরকে বলে দিয়েছিলে যে, আল্লাহকে বাদ দিয়ে তোমরা আমাকে' ও আমার মাতাকে উপাস্য সাব্যস্ত করো? ঈসা বলবেন আপনি পবিত্র।" (আল মায়েদাহ: ১১৬)
রব: আল্লাহ তায়ালার রুকবিয়্যতের সাথে সম্পৃক্ত কর্মসমূহের মধ্যে যে কোনো কর্ম যার দিকে সম্পৃক্ত করা হয় তাকে রব বলা হয় এর দলীল হচ্ছে, আল্লাহ তায়ালার বাণী: اتَّخَذُوا أَحْبَارَهُمْ وَرُهْبَانَهُمْ أَرْبَابًا مِنْ دُوْنِ اللَّهِ وَالْمَسِيحَ ابْنَ مَرْيَمَ : وَمَا أَمِرُوا إِلَّا لِيَعْبُدُوا إِلَهًا وَاحِدًا : لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ وَ سُبْحَنَهُ عَمَّا يُشْرِكُونَ -
"তারা তাদের পন্ডিত ও দরবেশদেরকে তাদের রব হিসেবে গ্রহণ করেছে আল্লাহ তায়ালাকে বাদ দিয়ে। এমনকি মরিয়াম তনয়কেও (রব বানিয়ে নিয়েছে) অথচ একমাত্র মাবুদের ইবাদত করার জন্য তারা আদিষ্ট ছিলো । তিনি ছাড়া কোনো মাবুদ নেই। তারা তাঁর সাথে যাকে শরীক করে তা থেকে তিনি সম্পূর্ণ পবিত্র।" (আত তাওবাহ: ৩১)
তাণ্ডত: মূর্তি, ওয়াসান, ইলাহ এবং রব সবই তাগুতের মধ্যে শামিল।
ইলাহ এবং রব থেকে ঐ সমস্ত আম্বিয়া কেরام এবং পূর্ণ্যবান ব্যক্তিরাই ব্যতিক্রম, আল্লাহ ব্যতীত যাদেরকে ইবাদত করা হয়। কিন্তু তারা এ ইবাদতে রাজি ও সন্তুষ্ট নয়। আল্লাহকে বাদ দিয়ে সৃষ্টির মধ্যে যাদেরই ইবাদত করা হয় তারা যদি এ ইবাদত সন্তুষ্ট না হন বা রাজী না হন তাহলে তারা তাগুত হওয়ার অন্যায় এবং গুনাহ থেকে রেহাই পেলেন। আক্বীদাগত দিক থেকে, কথার দিক থেকে এবং আমলের দিক থেকেও তারা এ অন্যায় নিষ্কৃতি পেলেন। আল্লাহ ব্যতীত এসব মাবুদ বা উপাস্যগুলোর কথা যখন সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে তখন অবশ্যই জেনে রাখা উচিৎ যে, সকল মূর্তিই তাগুত এবং সকল আওসান বা প্রতিমাও তাগুত। অতএব ঐসব সংবিধান এবং বিধি-বিধান আওসান নামক তাগুতের মধ্যে শামিল যেগুলো আল্লাহ তায়ালার বিধানের পরিপন্থী, এবং বিচার-ফয়সালার জন্য ও এগুলোর কাছে মানুষ যায়। এতে কোনো সন্দেই নেই যে, যে ব্যক্তি তাগুতের সম্মান করার শপথ করেছে, সে তাগুতকে অস্বীকার করতে পারেনি। অথচ তাগুতকে অস্বীকার করা তাওহীদের এমন একটি রুকন অর্থাৎ এমন একটি মৌলিক অপরিহার্য বিষয় যার দ্বারা একজন মানুষ এক আল্লাহর প্রতি ঈমান এনে মুসলমানে পরিণত হয়।
আল্লামা আবদুর রহমান বিন হাসান আল শাইখ বলেন: এটা وَقَدْ أُمِرُوا أَنْ يَكْفُرُوا بِهِ এ আয়াতকেই নিশ্চিত করে কেননা তাগুতকে অস্বীকার করা তাওহীদের রুকন (অপরিহার্য মৌলিক বিষয়) । (সূরা বাকারার) একটি আয়তের ব্যাখ্যায় এ কথা এসেছে: এ রুকন যদি অর্জিত না হয় তাহলে কেউ "মুওয়াহহিদ" (আল্লার একত্ববাদে বিশাসী) হতে পারবেনা (ফাতহুল মাজিদ ৩৪৫ পৃঃ)