📄 তৃতীয় সংশয়
ঐ ব্যক্তির কথাই হচ্ছে তৃতীয় সংশয় যে বলে, বিচার ফয়সালা [তাগুতের কাছে] চাওয়া শিরক হলেও তা শিরকে আসগার [ছোট শিরক] বড় শিরক বা শিরকে আকবরের পর্যায়ে তা ততক্ষণ পর্যন্ত উন্নীত হবে না যতক্ষণ না এটাকে মনে করা এবং আক্বীদার বিষয় সাথে সংযুক্ত হয়। যেমন গাইরুল্লাহর নামে কসম করা।
প্রথম জবাব: আমরা বলবো এটা তো জানা কথা যে, যে সব ইবাদত একমাত্র আল্লাহ ছাড়া আর কারো নয় অর্থাৎ অন্য কারো জন্য নিবেদন করা যায় না। তার মধ্যে রয়েছে, রুকু করা, সেজদা করা, সাহায্য চাওয়া, পশু জবাই করা, মানত করা, তাওয়াফ বা প্রদক্ষিণ করা, বিচার চাওয়া, ভয়, আশা, আকাংখা তাওবার মাধ্যমে প্রত্যাবর্তন করা, মুহাব্বত করা, সম্মান করা ইত্যাদি ইবাদতগুলি তিন ভাগে বিভক্ত। এর মধ্যে কিছু ইবাদতের সম্পর্ক আক্বীদার সাথে, কিছু ইবাদতের সম্পর্ক কথার সাথে এবং কিছু ইবাদতের সম্পর্ক হচ্ছে কর্মের সাথে। যে সব ইবাদতের সম্পর্ক কথা ও কাজের সাথে সম্পৃক্ত যেমন দোয়া করা, সাহায্য চাওয়া, রুকু করা, সেজদা করা, পশু জবাই করা, মানত করা, তাওয়াফ করা, বিচার চাওয়া ইত্যাদি এ সব ইবাদতের কোনো একটিকেও যদি গাইরুল্লাহর উদ্দেশ্যে নিবেদন করে যেমন: প্রতিমা অথবা, মৃত ব্যক্তি, অথবা তাগুত, তাহলে এর দ্বারা সে কাফের হবে এবং শিরকে আকবারে পতিত হবে। এ ক্ষেত্রে তার আক্বীদা এবং হারামকে হালাল মনে করার বিষয়টি তাকে কাফের বলার ক্ষেত্রে জরুরী নয়। কারণ সে প্রকাশ্যেই তার ইবাদতকে গাইরুল্লাহর উদ্দেশ্যে নিবেদন করেছে।
আর গোপন বা বাতেনী ইবাদত যা আক্বীদা বিশ্বাসের সাথে সম্পৃক্ত যেমন ভয়, আশা, ভালবাসা ভক্তি ইত্যাদির ক্ষেত্রে ইবাদতকারীর প্রতি কুফরী আরোপ করার জন্য তার ইবাদতকে মৌখিক উচ্চারণের মাধ্যমে বা কথার মাধ্যমে তার আক্বীদা বিশ্বাসের কথা প্রকাশ করা জরুরী। কেননা, এ জাতীয় ইবাদত অন্তরে সুপ্ত। অতএব কোনো ব্যক্তির পক্ষ থেকে প্রকাশ্যে কুফরী কর্ম পাওয়া গেলে তার প্রতি কুফরী আরোপ করার জন্য তার আক্বীদা বিশ্বাস প্রকাশ করা জরুরী বলে মনে করে, সে মূলতঃ একটি বাতিল যুক্তি প্রদর্শন করেছে। এটা হয়েছে তাওহীদের অর্থ এবং ইবাদতের অর্থ সম্পর্কে তার অজ্ঞতার কারণে। এর ফলে বিচার চাওয়ার বিষয়কে যা ইবাদত হিসেবে গণ্য গাইরুল্লাহর নামে কসম করার সাথে একীভূত করেছে, যা ইবাদত নয় বরং শিরকী শব্দ হিসেবে গণ্য।
কেউ হয়তো বলতে পারে, তাহলে আল্লাহর নামে কসম করাকে ওলামায়ে কেরام কেন ইবাদত হিসেবে আখ্যায়িত করেন? এর জবাবে আমরা বলবো, কেননা আল্লাহর নামে কসম করার সাথে আল্লাহকে তাজীম ও সম্মান করার মতো ইবাদতের বিষয় এর সাথে সংযুক্ত আছে। আল্লাহর নামে কসমকারী ব্যক্তি কসম করার সময় সে একথা জানে যে, আল্লাহ হচ্ছেন মহান। তাঁর নামে কসমের হকদার একমাত্র তিনিই। তাই তাঁর নামে সে কসম করে। এখন এ কসম করার আমলটি ইবাদত হিসেবে গণ্য। কেননা এর সাথে তা'জীম (আল্লাহর সম্মান) সংযুক্ত হয়েছে। এ জন্যই ওলামায়ে কেরام বলেনঃ যে ব্যক্তি গাইরুল্লাহর নামে কসম করলো সে ছোট শিরকের মধ্যে পতিত হলো। এ কসম তাকে মুসলিম মিল্লাত থেকে ততক্ষণ পর্যন্ত বের করবে না যতক্ষণ পর্যন্ত সে একথা বিশ্বাস না করে যে, যার নামে কসম করা হলো সে কসমের হকদার। তাকে কাফের বলার জন্য যার নামে কসম করা হলো, তার প্রতি সম্মান জাহির বা প্রকাশ করার শর্তারোপ করেছেন ওলামায়ে কেরام। এর অর্থ হচ্ছে, গাইরুল্লাহর নামে তা'জীম বা সম্মান করার সাথে সম্পৃক্ত ইবাদত নিবেদন করলো। এ ইবাদত গোপনীয় এবং অন্তরের সাথে সম্পৃক্ত। যদি কোনো ব্যক্তি গাইরুল্লাহর নামে কসম করে এবং যার নামে কসম করা হলো তার উদ্দেশ্যে তা'জীম বা সম্মান দেখায় তাহলে সে ব্যক্তি উলুহিয়্যাতের দিক থেকে আল্লাহর সাথে শরীক করেছে, তাই সে মুশরিক। তাহলে তাঁর মুশরিক হওয়ার কারণ হচ্ছে, সে ইবাদতকে প্রকাশ করেছে। তাই আমরা তাকে একথা জিজ্ঞেস করবো না যে তুমি কি এটা বিশ্বাস করো, নাকি বিশ্বাস কর না। তাই তাগুতের কাছে বিচার চাওয়া, সেজদা এবং তাওয়াফের মতোই প্রকাশ্য ইবাদত। এ ইবাদতকে যে গাইরুল্লাহর উদ্দেশ্য নিবেদন করে সে কাফের। এটা ইবাদতে কালবিয়া খাফিয়া (অর্থাৎ অন্তরের গোপনীয় ইবাদত নয়) যা মৌখিক উচ্চারণের মাধ্যমে প্রকাশ করতে হবে।
দ্বিতীয় জবাব: এ কথা তো সবারই জানা যে, গাইরুল্লাহর নামে কসম করার বিষয়টি প্রাক ইসলামী যুগে নিষিদ্ধ ছিলোনা। এর পর গাইরুল্লাহর নামে কসম খাওয়ার বিষয়টি কুরআন ও সুন্নাহর বক্তব্যর মাধ্যমে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। রাসূল (সঃ) পরবর্তিতে গাইরুল্লাহর নামে কসম করা নিষিদ্ধ করেছেন। তিনি বলেন: আল্লাহ তায়ালা তোমাদের বাপ-দাদার নামে কসম করা নিষিদ্ধ করেছেন (বুখারী)। অতএব যে বিষয়টি প্রাক ইসলামী যুগে আদৌ নিষিদ্ধ ছিলোনা সেটাকে কি ভাবে বা কোন যুক্তিতে এমন বিষয়ের ওপর কেয়াস করা হয়, যা ছাড়া বান্দার ইসলামই ছহীহ শুদ্ধ হয়না। আর তা হচ্ছে সকল তাগুতকে অস্বীকার করা এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের (সঃ) বিধান ব্যতীত সকল বিধান অস্বীকার করা। আর সেটা করতে হবে তাগুতের কাছে বিচার না চাওয়ার মাধ্যমে।
অতঃপর আমরা আরো বলতে চাই যে, এ বাতিল 'কিয়াস' যে বিষয়টিকে অপরিহার্য করে তোলে তা হচ্ছে, যে আয়াতে তাগুতের কাছে বিচার চাওয়াকে নিষেধ করা হয়েছে সে আয়াত নাযিল হওয়ার পূর্বে তাদের জন্য গণক, আহলে কিতাব এবং তাদের তাগুতদের কাছে বিচার- ফয়সালা নিয়ে যাওয়া জায়েয ছিলো। কেননা তাদের দাবী অনুযায়ী বিচার- ফয়সালা চাওয়ার বিষয়টি কসম করার মতোই একটি কাজ (অর্থাৎ উভয় কাজই একই মানের তাই গাইরুল্লাহর নামে কসম করলে যেমন কাফের হয়না তেমনি তাগুতের কাছে বিচার চাইলে ও কাফের হবেনা)।
📄 চতুর্থ সংশয়
কতিপয় লোক শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়া (রহঃ) এর নিম্মোক্ত কথাকে (ভুল বুঝে) দলীল হিসেবে গ্রহণ করেছে। তিনি তাঁর মাজমুআতুল ফাতাওয়া নামক গ্রন্থে বলেছেন: এ সব লোক (ইহুদী ও খৃষ্টান) বা তাদের ধর্মীয় গুরুদেরকে হারামকে হালাল আর হালালকে হারাম হিসেবে মেনে নেয়ার ক্ষেত্রে দুভাবে তাদের আনুগত্য করেছে।
প্রথমত: তারা (ধর্মীয় গুরুরা) আল্লাহর দ্বীনকে পরিবর্তন করেছে, এ পরিবর্তনের কথা জেনে শুনেই তারা (ইহুদী খৃষ্টানরা) তাদের আনুগত্য করতো। তাই তারা বিশ্বাস করতো যে, আল্লাহর হারামকৃত বিষয় হালাল করা আর আল্লাহর হালালকৃত বিষয়কে হারাম করার ক্ষমতা বা অধিকার তাদের নেতাদের রয়েছে। তারা এটাও জানতো যে তারা রাসূলের (সঃ) দ্বীনের বিরোধিতা করছে। এ রকম করা কুফরী।
দ্বিতীয়ত: তাদের (অনুসারীদের) এ বিশ্বাস ও ঈমান আছে যে, তাদের ধর্মীয় গুরুদের হালাল কে হারাম করা, আর হারামকে হালাল করার বিষয়টি (সম্পূর্ণরূপে অবৈধ কাজ এ কথা) ঠিক আছে তবে তারা তাদের ধর্মীয় গুরুদের আনুগত্য করেছে আল্লাহর নাফরমানীর ক্ষেত্রে, যেমন একজন মুসলমান পাপকে পাপ জেনেই করে থাকে। এসব লোক তাদের মতোই পাপী।
প্রথম জবাবঃ আমরা বলতে চাই যে, যারা শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়ার (রহঃ) কথা (তাদের সংশয়ের) দলীল হিসেবে গ্রহণ করেছে, তারা বিষয়টি বুঝতে পারেনি এবং শেরেকী আনুগত্য ও পাপ জনিত আনুগত্যের মধ্যে পার্থক্য করতে তারা সক্ষম হয়নি। পাপ জনিত আনুগত্য হচ্ছে কোনো মানুষ কোনো পাপ কাজে সৃষ্টির, আনুগত্য এ বিশ্বাস নিয়ে করবে, যে এটি গুনাহ এবং হারাম কাজ । এ ধরনের আনুগত্যই পাপ জনিত আনুগত্য হিসেবে গণ্য। এ ধরনের আনুগত্য মুসলিম মিল্লাত থেকে আনুগত্যকারীকে বের করে দেয়না। (ইসলাম থেকে খারিজ হয়ে যায়না) যতক্ষণ এর সাথে গুনাহকে হালাল মনে করার আক্বীদা সংযুক্ত হবে। আর শেরেকী আনুগত্য হচ্ছে কোনো মানুষ কোনো শেরেকীকাজ সৃষ্টির আনুগত্য করা যেমন: তাকে (মানুষকে) বলা হলো তুমি মূর্তিটিকে সেজদা করো, অতঃপর সে সেজদা করলো। অথবা বলা হলো জ্বিনের উদ্দেশ্যে পশু জবাই করো, সে তখন জবাই করলো। অথবা তাকে বলা হলো: যাও আল্লাহর বিধান ও শরীয়ত বাদ দিয়ে বিচার চাও, সে এভাবে বিচার চাইলো। এটাই হচ্ছে শেরেকী আনুগত্য। এ ধরনের আনুগত্যকারী আল্লাহর সাথে শিরককারী বা মুশরিক, যদি সে এধরনের আনুগত্য ও পাপকে হালাল মনে নাও করে। ইমাম ইবনে তাইমিয়া সে বিষয়টি তাঁর কথায় বুঝাতে চেয়েছেন তা হচ্ছে, এটা পাপ জনিত আনুগত্য শেরেকী আনুগত্য নয়। এটা হচ্ছে প্রথম জবাব।
দ্বিতীয় জবাবঃ আনুগত্য এবং বিচার-ফয়সালা চাওয়ার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। আনুগত্য কখনো পাপ জনিত হতে পারে, আবার কখনো শেরেকী আনুগত্যও হতে পারে। একথা আমরা প্রথম জবাবেই বর্ণনা করেছি। বিচার-ফয়সালা চাওয়ার কাজটি মানত এবং তাওয়াফের মতোই নিরেট ইবাদত হিসেবে গণ্য। তাই এসব ইবাদত গাইরুল্লাহর উদ্দেশ্যে নিবেদন করলে ইবাদতকারী আল্লাহর সাথে শিরককারী বা মুশরিক হিসেবে বিবেচিত হবে। ওলামায়ে কেরাম তাদের বই-পুস্তকে এ কথাই বর্ণনা করেছেন। শাইখ আবদুল লতিফ বিন আবদুর রাহমান বিন হাসান আল-শাইখ বলেন: যে ব্যক্তি জেনে-শুনে আল্লাহর কিতাব ও তাঁর রাসূলের (সঃ) সুন্নাতকে বাদ দিয়ে বিচার-ফয়সালা চাইবে সে কাফের। (আদ দুরার আস সুন্নিয়া ৪৭৬/১০)
📄 পঞ্চম সংশয়
৫ম সংশয় হচ্ছে ঐ বক্তির কথা, যে বলেঃ যে আইনের কাছে বিচার চাওয়া হবে তা যদি আল্লাহর আইনের বিরোধী হয় তাহলে ঐ আইনের কাছে বিচারফয়সালা নিয়ে যাওয়া জায়েয নেই। আর যদি ঐ আইন আল্লাহর আইনের সাথে সামঞ্জস্য পূর্ণ হয় যেমন সম্পত্তি ফিরে পাওয়ার জন্য ইনসাফপূর্ণ আইন, তাহলে ঐ আইনের কাছে বিচার চাওয়া জায়েয আছে। নিঃসন্দেহে এ কথাটিও দুটি দৃষ্টি কোন থেকে বাতিল।
প্রথমত: আমরা আইন বা বিধানের দিকে দৃষ্টিপাত করবোনা। আমরা দেখবোনা, আইনটি কি ন্যায় সঙ্গত, নাকি জুলুমপূর্ণ বরং আমরা দেখবো কর্ম এবং প্রত্যার্পনের বিষয়টি। মূল ঘটনা হচ্ছে ন্যায় বিচারটি প্রার্থনা করা হচ্ছে তাগুতের মাধ্যমে। তাই আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেনঃ يُرِيدُونَ أَنْ يَتَحَاكَمُوا إِلَى الطَّاغُوتِ
"তারা তাগুতের কাছে বিচার নিয়ে যেতে চায়"
এর দ্বারা কা'ব বিন আশরাফ (ইহুদী) কে উদ্দেশ্য করা হয়েছে। তার কাছে বিচার নিয়ে যাওয়া এবং বিবাদ মীমংসা করাকে কুফরী বলা হয়েছে। কুফরীর কারণ হিসেবে এখানে একথা বলা হয়নি যে, সে ন্যায় বিচার করেনা, সে ঘুষ গ্রহণ করে।
দ্বিতীয়ত: আমরা বান্দার ব্যাপারে এটা দেখবোনা যে, তার প্রতি ন্যায় বিচার করা হবে, নাকি অন্যায় করা হবে। বরং আমরা দেখবো মা'বূদ অর্থাৎ আল্লাহর তায়ালার ব্যাপার, অর্থাৎ তাগুতকে অস্বীকার করার মাধ্যমে, তাগুতের কাছে বিচার না নিয়ে তাকে অস্বীকার করার মাধ্যমে এবং তাগুত থেকে মানুষকে সতর্ক করে দেয়ার মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালার একত্ববাদ। আপনারা যেহেতু তাগুতের কাছে বিচার নিয়ে যাওয়ার মধ্যে প্রথম, সেহেতু আপনারা লোকদেরকে তাগুত থেকে কিভাবে সর্তক থাকতে বলবেন।
📄 ষষ্ঠ সংশয়
ঐ ব্যক্তির কথা যে বলে: শরীয়ত সম্মত এমন ব্যবস্থা নেই, যে আমার অধিকার ফিরিয়ে দিতে পারে তাই আমি বাধ্য হয়েই এমন কাজ করছি।
জবাব: এ কথারও দুটি জবাব।
প্রথম বিষয়ঃ এই যে, যে ব্যক্তি উপরোক্ত কথা বলে, আমরা তাকে আল্লাহ তায়ালার এ বাণীর মাধ্যমে শর্তক করতে চাই:
ذلِكَ بِأَنَّهُمُ اسْتَحَبُّوا الْحَيُوةَ الدُّنْيَا عَلَى الْآخِرَةِ ، وَأَنَّ اللَّهَ لَا يَهْدِي الْقَوْمُ الْكَفِرِينَ
"এটা এজন্য যে, তারা পার্থিব জীবনকে পরকালের চাইতে প্রিয় মনে করেছে এবং আল্লাহ কাফেরদেরকে হেদায়াত করেননা।" (নাহল : ১০৭)
শাইখ মুহাম্মদ বিন আবদুল ওয়াহহাব (রহঃ) তার 'কাশফুল শুবহাত' নামক পুস্তিকায় এ আয়াত প্রসংগে বলেন: এখানে সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা করা হয়েছে যে, এ কুফরী ও শাস্তির কারণ বিশ্বাস কিংবা অজ্ঞতা, কিংবা ধর্মের প্রতি আক্রোশ অথবা কুফরীর প্রতি মুহাব্বত ছিলোনা। বরং কারণ ছিলো দুনিয়ার স্বার্থ। দ্বীনের ওপর দুনিয়ার স্বার্থকে প্রাধান্য দেয়া হয়েছিল।
তাই আল্লাহ ও আখেরাতের প্রতি যে মুসলমানের ঈমান আছে তার জন্য দুনিয়ার কোনো স্বার্থকে দ্বীনের কোনো স্বার্থের ওপর অগ্রাধিকার দেয়া জায়েয নেই। চাই সে স্বার্থ কোনো পদবী অথবা নেতৃত্ব চাওয়ার মাধ্যমেই হোক, অথবা দুনিয়া ও সম্পদ নষ্ট না হওয়ার বাসনা চরিতার্থ করার মাধ্যমে হোক। কেননা দ্বীন হেফাজতের বিষয়টি সম্পদ হেফাজতের ওপর অবশ্যই অগ্রাধিকার পাবে। রাসুল (সঃ) ইরশাদ করেছেন:
تعس عبد الدينار والدرهم و عبد الخميصة ان اعطى رضى وان لم يعط سخط (رواه البخاري)
"দিনার, দিরহাম এবং পেট পূজারী ধ্বংস হোক, যদি তাকে কিছু দেয়া হয় তাহলে খুশী, আর কিছু না দিতে পারলে ক্রোধান্বিত হয়।" (বুখারী)
আল্লাহ তায়ালা সূরায়ে আত-তাওবাহর্তে ইরশাদ করেনঃ قُلْ إِنْ كَانَ آبَاءَكُمْ وَأَبْنَاءَكُمْ وَإِخْوَانُكُمْ وَأَزْوَاجُكُمْ وَعَشِيرَتَكُمْ وَأَمْوَالُ . اقْتَرَفْتُمُوهَا وَتِجَارَةً تَخْشَوْنَ كَسَادَهَا وَ مِسْكِنْ تَرَضُونَهَا أَحَبَّ إِلَيْكُمُ مِنَ اللَّهِ وَرَسُولِهِ وَجِهَادٍ فِي سَبِيلِهِ فَتَرَبَّصُوا حَتَّى يَأْتِيَ اللَّهُ بِأَمْرِهِ ، وَاللَّهُ لَا يَهْدِي الْقَوْمُ الْفُسِقِينَ -
"আপনি বলে দিন, তোমাদের নিকট যদি তোমাদের পিতা, তোমাদের সন্তান, তোমাদের ভাই, তোমাদের পত্নী, তোমাদের গোত্র, তোমাদের অর্জিত ধন-সম্পদ, তোমাদের ব্যবসা যা তোমরা উপার্জন করিয়াছ, সে ব্যবসা যা বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশংকা তোমরা করো, এবং তোমাদের বাসস্থান যা তোমরা পছন্দ করো- তোমাদের নিকট আল্লাহ, তাঁর রাসূল (সঃ) এবং তাঁর রাস্তায় জেহাদ করা থেকে অধিকতর প্রিয় হয়, তবে আল্লাহর বিধান আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করো। আল্লাহ ফাসেক সম্প্রদায়কে হেদায়াত করেন না।" (আত তাওবাহ ২৪)
লক্ষ্য করুন আল্লাহ তায়ালা কিভাবে ঐ সব পার্থিব উপকরণের নিন্দা করেছেন, যে গুলোর সাথে তারা সম্পৃক্ত হয়ে জিহাদকে পরিত্যাগ করেছে। এখানে প্রশ্ন হচ্ছে, আয়াতে উল্লেখিত (পার্থিব) আটটি জিনিসের (ভালবাসার) কারণে যে ব্যক্তি তাওহীদ পরিত্যাগ করে সে কি বেশী অন্যায় করলো, না কি একই কারণে যে ব্যক্তি জিহাদ পরিত্যাগ করলো সে বেশী অন্যায় করলো? এ আটটি বিষয় কি আল্লাহ তায়ালা যখন জিহাদ পরিত্যাগ করার ওযর (অযুহাত) হিসেবে গ্রহণ করেন নি, তখন কিভাবে এ বিষয়গুলোকে তাওহীদ পরিত্যাগ করার ওযর হিসেবে গ্রহণ করবেন? কুফরী কথা উচ্চারণ করার জন্য একমাত্র জবরদস্তি ছাড়া অন্য কোনো ওযর আল্লাহ তায়ালা গ্রহণ করেননি। আর জবরদস্তির বিষয়টি হচ্ছে এমন কর্ম সম্পাদন করা, যা বাধ্য হয়ে হযরত আম্মার বিন ইয়াসীর (রাঃ) করেছেন। (অর্থাৎ অত্যাধিক অমানুষিক নির্যাতন থেকে বাঁচার জন্য নিজের অন্তরকে ঠিক রেখে শুধু মৌখিক ভাবে আল্লাহকে অস্বীকার করা) শুধু জীবন বাঁচানোর জন্য এর অনুমতি দেয়া হয়েছে তবে এমতাবস্থায় আজিমত অর্থাৎ জীবনের বিনিময়ে আল্লাহর প্রতি ঈমান রক্ষা করার বিষয়টিকে অতি উত্তম কাজ বলে গণ্য করা হয়েছে। হাদীসে এ ব্যাপারে বক্তব্য এসেছে। শাইখ আবদুর রহমান বিন হাসান আল-শাইখ (রহঃ) হেজাজের আল্লামা শাইখ মুহাম্মদ বিন আহমাদ আল-হিফজী বলেন: হে বিজ্ঞ ব্যক্তিবর্গ, আপনারা শতর্ক হোন, শতর্কতা অবলম্বন করুণ। হে উদাসীন ব্যক্তিরা আপনাদের জন্য রয়েছে তাওবা আপনারা তাওবার পথ অবলম্বন করুন। কেননা দ্বীনের মূল বিষয়েই ফেতনা (পরীক্ষা) হয়েছে প্রাসংগিক বিষয়ের ফেতনা হয়নি, দুনিয়াবী বিষয়ও ফেতনা হয়নি। তাই অপরিহার্য বিষয় হচ্ছে পরিবার পরিজন, স্ত্রী, সম্পদ ব্যবসা-বাণিজ্য ও বাড়ী-ঘর সবকিছুই থাকবে শুধু দ্বীন রক্ষার স্বার্থে। এ গুলো উৎসর্গিত হবে দ্বীনের জন্য। এগুলোর হেফাজতের জন্য কখনো দ্বীন উৎসর্গিত হবেনা।
আল্লাহ তায়ালা বলেন: قُلْ إِنْ كَانَ أَبَاءَكُمْ وَأَبْنَاءَكُمْ وَإِخْوَانُكُمْ وَأَزْوَاجُكُمْ وَعَشِيرَتِكُمْ وَأَمْوَالٌ رِ اقْتَرَفْتُمُوهَا وَتِجَارَةٌ تَخْشَوْنَ كَسَادَهَا وَ مُسْكِنُ تَرْضَوْنَهَا أَحَبِّ الَيكُم مِّنَ اللَّهِ وَرَسُولِهِ وَجَهَادِ فِي سَبيلِهِ فَتَرَبَّصُوا حَتَّى يَأْتِيَ اللَّهُ بِأَمْرِهِ ، وَاللَّهُ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الْفَسِقِينَ
"আপনি বলে দিন, তোমাদের নিকট যদি তোমাদের পিতা, তোমাদের সন্তান, তোমাদের ভাই, তোমাদের পত্নী, তোমাদের গোত্র, তোমাদের অর্জিত ধন-সম্পদ, তোমাদের ব্যবসা যা তোমরা উপার্জন করিয়াছ, সে ব্যবসা যা বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশংকা তোমরা করো, এবং তোমাদের বাসস্থান যা তোমরা পছন্দ করো, তোমাদের নিকট আল্লাহ, তাঁর রাসূল (সঃ) এবং তাঁর রাস্তায় জেহাদ করা থেকে অধিকতর প্রিয় হয়, তবে আল্লাহর বিধান আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করো। আল্লাহ ফাসেক সম্প্রদায়কে হেফাজত করেন না।" (আত তাওবাহ ২৪)
প্রজ্ঞা সম্পন্ন মস্তিষ্কে ভেবে দেখুন, দেখবেন যে, আল্লাহ তায়ালা' আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ) এবং জিহাদের মুহাব্বত উল্লেখিত আটটি বিষয়ের মুহাব্বতের চেয়ে অধিক হওয়া ওয়াজিব বা আপরিহার্য করেছেন। ইহা ছাড়া এগুলোর যে কোনো একটি কিংবা একাধিক এবং এ ছাড়া যা এর চেয়ে বেশী মুহাব্বতের হকদার তার চেয়েও বেশী মুহাব্বত হতে হবে আল্লাহ, তাঁর রাসূল (সঃ) এবং জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহর জন্য। তাই তোমার কাছে দ্বীন হতে হবে সবচেয়ে মূল্যবান এবং মর্যদা সম্পন্ন। তোমার কাছে তাওবা হবে গুরুত্বপূর্ণ ও সর্বোত্তম বিষয়।
দ্বিতীয় বিষয়: এ কথা যারা বলে তাদেরকে আমরা আল্লাহর এ বাণীর মাধ্যমে স্মরণ করিয়ে দিতে চাইঃ وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنْسَ إِلَّا لِيَعْبُdُونَ مَا يُرِيدُ مِنْهُمْ مِنْ رِزْقٍ وَمَا أُرِيدُ أَنْ يُطْعِمُونِ إِنَّ اللَّهَ هُوَ الرَّزَّاقُ ذُو الْقُوَّةِ الْمَتِينُ
"মানব এবং জ্বিন জাতিকে একমাত্র আমার ইবাদত করার জন্যই সৃষ্টি করেছি। আমি তাদের কাছে জীবিকা চাইনা, এবং এটাও চাইনা যে তারা আমাকে আহার্য যোগাবে। আল্লাহ তায়ালাই তো রিযিক দাতা, শক্তির আধার পরাক্রান্ত।" (আয-যারিয়াত: ৫৬-৫৮)
আল্লাহ তায়ালা এ আয়াতে বান্দা সৃষ্টির উদ্দেশ্য বর্ণনা করেছেন। আর সে উদ্দেশ্য হচ্ছে "ইবাদত"। এর সাথে এটাও বর্ণনা করেছেন, তিনি তাদের রিযিকের দায়িত্ব নিয়েছেন।
রাসূল (সঃ) ইরশাদ করেছেন যে, আল্লাহ তায়ালা বলেনঃ يا ابن ادم تفرغ لعبادتي املأ صدرك غنى واسد فقرك وان لا تفعل ملأت يدك شغلا ولم اسد فقرك -
"হে আদম সন্তান, তুমি আমার ইবাদতে আত্ম নিয়োগ করো, আমি তোমার বক্ষকে মুখাপেক্ষীহীনতা দিয়ে ভরে দিবো এবং তোমার দারিদ্র বিমোচন করে দিবো। যদি তুমি তা না করো, তাহলে তোমার হাতকে কাজে ব্যস্ত রাখবো, অথচ তোমার দারিদ্র বিমোচন করবোনা।" (আহমদ)
আর সে যে বলেছে যে, সে এ কাজ (তাগুতের কাছে বিচার চাওয়া) বাধ্য হয়ে করেছে এ কথা ও দু'দিক থেকে বাতিল।
এক : লোকটি দু'টি বিষয়কে মিশ্রিত করে ফেলেছে। সে অনন্যোপায় হওয়া আর জোর জবরদস্তীর শিকার হওয়ার মধ্যে কোনো পার্থক্য করতে সক্ষম হয়নি। সে মানুষের জন্য ওযর বা অজুহাত তালাশ করেছে যখন কুফরী করার জন্য সে অনন্যোপায় হয়েছে। নিঃসন্দেহে তার এ যুক্তি বাতিল, কেননা অনন্যোপায় মা'সিয়াত বা গুণাহের কাজের মাধ্যমে, কিন্তু কুফরীটা এ যুক্তিতে জায়েয হবে না যে, সে অনন্যোপায় অবশ্যই কুফরী কাজের জন্য তাকে হত্যা, নির্যাতন ইত্যাদির সম্মুখীন হতে হবে। আর অনন্যোপায় হওয়ার অর্থ হচ্ছে, কোনো মানুষ দুটি বিপর্যয় সৃষ্টিকারী বিষয়ের মধ্যে অপেক্ষাকৃত বিপর্যয় সৃষ্টির বিষয়ের অবসানের জন্য অপেক্ষাকৃত ছোট অন্যায় কাজটি সম্পাদন করা।
আল্লাহ তায়ালা বলেন: فَمَنِ اضْطَرَ غَيْرَ بَاغِ وَلَا عَادٍ فَلَا إِثْمَ عَلَيْهِ إِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَحِيمٌ
"যে লোক অনন্যোপায় হয়ে পড়ে এবং নাফরমানী ও সীমা লংঘনকারী না হয়, তার জন্য কোনো পাপ নেই নিশ্চয় আল্লাহ মহান ক্ষমাশীল, অত্যন্ত দয়ালু।" (আল-বাকারাহ: ১৭৩)
জবর দস্তির অর্থ হচ্ছে, এমন শাস্তি ও কষ্ট প্রদান যা জীবনকে ধ্বংস করে দেয়। এমতাবস্থায় আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে কুফরী কথা বলার অনুমতি দিয়েছেন। তাই যদি আমরা অনন্যোপায় এবং জবর দস্তি মূলক নিয়মটি একত্রিত করে দেখি, তাহলে দেখতে পাবো যে, একটির মধ্যে বিশেষ অবস্থা আর একটির মধ্যে সাধারণ অবস্থার একটি ব্যাপার নিহিত আছে। [ অর্থাৎ এক অবস্থায় কুফরী কথা বলার সুযোগ আছে আরেক অবস্থায় এ সুযোগ নেই।
শাইখ হামাদ বিন আতীক (রহঃ) বলেন: যদি বলা হয়, যে অবস্থায় কুফরী কথা বলা যায় এমন জরবদস্তির পরিচয় কি? এর জবাবে আমরা বলতে চাই, যে কারণে এতদসংক্রান্ত আয়াত নাযিল হয়েছে সেটিই জবরদস্তির সবচেয়ে সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা। ইমাম বাগাভী (রহঃ) বলেন যে, হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) আল্লাহ তায়ালা হযরত আম্মার (রাঃ) এর ব্যাপারে বলেছেনঃ مَنْ كَفَرَ بِاللَّهِ مِنْ بَعْدِ إِيْمَانِهِ إِلَّا مَنْ أُكْرِهَ وَقَلْبُهُ مُطْمَئِنَّ بِالْإِيْمَانِ -
"যার ওপর জবরদস্তি করা হয় এবং তার অন্তর বিশ্বাসে অটল থাকে, সে ব্যতীত যে কেউ ঈমান গ্রহণ করার পর আল্লাহকে অস্বীকার করে।” (নাহল:১০৬)
মুশরিকরা হযরত আম্মার, তাঁর পিতা ইয়াছির তাঁর মাতা সুমাইয়া, হযরত ছোহাইর বিলাল, খাব্বাব, সালেম (রাঃ) কে ধরে নিয়ে গিয়ে প্রচন্ড শাস্তি দিচ্ছিলো। হযরত সুমাইয়া (রাঃ) কে দু'টি পশুর মাঝখানে বেঁধে ধারালো অস্ত্রের সাহায্য তাঁর গুপ্তাঙ্গ আঘাত করে হত্যা করা হয়। তাঁর স্বামী ইয়াসিরকেও হত্যা করা হয়। দু'জনই ইসলামের পথে প্রথম শাহাদত বরণ কারী নারী ও পুরুষ। অতঃপর হযরত আম্মার (রাঃ) কে মাইমুন নামক কুপের মধ্যে ফেলে তার মুখ বন্ধ করে মুশরিকরা বললোঃ মুহাম্মদকে (সঃ) অস্বীকার করো, এ চরম সংকটময় মূহুর্তে অন্তরে ঈমান ঠিক রেখে শুধু মৌখিক ভাবে তাদের কথানুয়ারী মুহাম্মদ (সঃ) কে অস্বীকার করেছেন। অর্থাৎ জবরদস্তির শিকার হয়ে মন ও ইচ্ছার বিরুদ্ধে মুশরিকরা তার জবান থেকে যা বের করতে চাইলো তাই তিনি মুখে উচ্চারণ করেছেন। তারপর রাসূল (সঃ) কে এ খবর দেয়া হলো যে, আম্মার কুফরী করেছে, তখন রাসূল (সঃ) বললেন, কখনো না, আম্মারের মাথা থেকে পা পর্যন্ত পূরোটাই ঈমানে ভরপুর। ঈমান তার রক্ত মাংসের সাথে মিশে আছে। অতঃপর আম্মারকে রাসূল (সঃ) এর কাছে আনা হলো। তখন আম্মার অঝোরে কাঁদছিলেন। রাসূল (সঃ) বললেন: কি হয়েছে তোমার, আম্মার বললেন : হে আল্লাহর রাসূল, আমার সর্বনাশ হয়ে গিয়েছে। মুশরিকদের খোদাদের আমি ভাল বলেছি। রাসূল (সঃ) বললেন : তোমার অন্তরের অবস্থা তখন কেমন ছিলো? নিশ্চিত ভাবে ঈমানে পরিপূর্ণ ছিলো, তখন আল্লাহর রাসূল (সঃ) আম্মারের দুচোখের পানি মুছে দিলেন, যদি তারা তোমার ওপর জুলুম করে থাকে, তাহলে তুমি তোমার পূর্বের কথা (ঈমানের দিকে) ফিরে যাও এবং তাদের কথা তাদেরকে ফিরিয়ে দাও। এ ঘটনার পরই উপরোক্ত আয়াত নাযিল হয়। হযরত মুজাহিদ (যিনি উচ্চ পর্যায়ের একজন মুফাসসির ছিলেন) থেকে বর্ণনা করা হয়েছে যে, একদল লোক মদিনা হিজরতের উদেশ্যে মক্কা থেকে বের হওয়ার পর রাস্তায় মক্কায় কাফেরেরা তাদেরকে ধরে ফেলে। ফলে জীবন রক্ষার্থে মন ও ইচ্ছার বিরুদ্ধে ঐ মুসলমানরা কুফরী কথা বলতে জবরদস্তী মূলক ভাবে বাধ্য হয়। তখন এ আয়াত নাযিল হয়। হযরত মুকাতিলের (রহঃ) এর বর্ণনা মতে একজন ক্রীতদাসের ব্যাপারে এ আয়াত নাযিল হয়। এ ক্রীতদাসের মনিব তাকে কুফরী করতে বাধ্য করেছিলো। অতএব এসব ব্যক্তিগণের জীবনে যা ঘটেছে তা যদি কোনো ব্যক্তির ওপর দিয়ে ঘটে যায়, তাহলে তাদের জন্য যা জায়েয ছিলো, তার জন্য তাই জায়েয। হযরত আম্মার (রাঃ) কুফরী কথা তখনই বলতে বাধ্য হয়েছেন, যখন তার মাকে হত্যা করা হয়েছে, তাঁর পিতাকেও হত্যা করা হয়েছে, তাকে আঘাত করা হয়েছে, তাকে কুয়ার মধ্যে ফেলে মুখ বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। একই নির্মম পরিস্থিতির শিকার হয়েছিলেন ঐসব মুসলমানরা যাদেরকে মুশরিকরা আটক করেছিলো। একই পরিস্থিতির শিকার হয়েছিলো ঐ ক্রীতদাস যার মনিব তার ওপর কুফরী করার জন্য জবরদস্তি করেছিলো। এ ছাড়া সালফে সালেহীন (নেককার পূর্বসূরী) এমন অনেক মাজলুম মানুষের কথা উল্লেখ করেছেন, যারা কুফরী কথা বলছে অনেক কষ্ট ও অনেক নির্যাতনের পর। তাই যখনই কিছু সংখ্যক লোক ইমাম আহমাদ (রহঃ) এর কাছে হযরত আম্মার (রাঃ) এর ঘটনা দ্বারা কষ্ট ও নির্যাতনের ব্যাপারে অজুহাত পেশ করতো, তখন ইমাম আহমাদ (রহঃ) বলতেন হযরত আম্মারকে তারা (মুশরিকরা) তাকে অনেক নির্যাতন করেছিলো, আর তোমাদেরকে বলা হয়েছে আমরা তোমাদেরকে আঘাত করতে চাই। (অর্থাৎ তোমাদেরকে নির্যাতনের কথা শুধু বলাতেই বিভিন্ন অযুহাত পেশ করছো, এতটুকু দুর্বল ঈমান তোমাদের)।
দুই: যে ব্যক্তি বলে যে, আমি বাধ্য হয়েই কুফরী করি, তার একথা বাতিল হওয়ার দ্বিতীয় দিক তার কাছে উপস্থাপন করার মাধ্যমেই বলে দিতে চাই। যদি এমন কোনো শক্তি বা কর্তৃপক্ষ থাকে যার পূজা করা হয়। সে শক্তি যদি কোনো মানুষের ওপর চড়াও হয়ে তার সম্পদ কেড়ে নেয়, সম্পদ ফেরত দিতে যদি অস্বীকার করে, যদি বলে যতক্ষণ পর্যন্ত এ কবরকে কিছু উপহার না দিবে আর যতক্ষণ পর্যন্ত এ কবরকে তাওয়াফ (প্রদক্ষিণ) না করবে, ততক্ষণ পর্যন্ত তোমার সম্পদ ফেরত দেয়া হবে না। এখানে প্রশ্ন হচ্ছে এমতাবস্থায় প্রতিমার উদ্দেশ্যে কোরবানী করা অথবা প্রতিমার চার পাশে তাওয়াফ করা অথবা মুর্তিকে সেজদা করা কি তার সম্পদ ফিরিয়ে আনার জন্য অনন্যোপায়ের অজুহাতে জায়েয হবে? তার এ কাজটি কি তার ওপর যে শেরেকী ফতোয়া অর্পিত হবে এর গ্লানি থেকে তাকে বাঁচাতে পারবে? এ প্রশ্নের জবাব আমরা তার কাছে চাই।
তিন: যদি ধরা হয়, যে সম্পদ ধ্বংস হওয়ার বিষয়টি জবরদস্তিরই অন্তর্ভুক্ত। এটা নিঃসন্দেই বলতে পারি যে, যখন আমরা কুরআন ও সুন্নাহর উদ্ধতিগুলি একত্র করি, তখন এটা সুস্পষ্ট ভাবেই আমরা বুঝাতে পারবো যে, জবরদস্তি করে কুফরী কথা বললে কার ওজর গ্রহণ করা হবে আর কার ওজর গ্রহণ করা হবেনা প্রথম উদ্ধৃতাংশে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন:
مَنْ كَفَرَ بِاللَّهِ مِنْ بَعْدِ إِيْمَانِهِ إِلَّا مَنْ أُكْرِهَ وَقَلْبُهُ مُطْمَئِنَّ بِالْإِيْمَانِ -
"যার ওপর জবরদস্তি করা হয় এবং তার অন্তর বিশ্বাসে অটল থাকে, সে ব্যতীত যে কেউ ঈমান গ্রহণ করার পর আল্লাহকে অস্বীকার করে।” (নাহল:১০৬)
এ আয়াত নাযিল হয়েছে হযরত আম্মার বিন ইয়াসিরের ব্যাপারে যখন মুশরিকরা তাকে ধরে নিয়ে গিয়ে অমানুষিক নির্যাতন করেছিল। এর ফলে তিনি অনন্যোপায় হয়ে বাধ্য হয়েই কুফরী কথা বলেছেন।
দ্বিতীয় উদ্ধৃতি হচ্ছে আল্লাহ তায়ালার বাণী:
إِنَّ الَّذِينَ تَوَقَّهُمُ الْمُلْئِكَةُ ظَالِمِي أَنْفُسِهِمْ قَالُوا فِيمَ كُنتُمْ ، قَالُوا كُنَّا مُسْتَضْعَفِينَ فِي الْأَرْضِ ، قَالُوالَمْ تَكُنْ أَرْضُ اللَّهِ وَاسِعَةً فَتَهَاجِرُوا فِيْهَا ، فَأُولَئِكَ مَاوَاهُمْ جَهَنَّمُ ، وَسَاءَتْ مَصِيرًا -
"যারা নিজেদের আত্মার প্রতি জুলুম করে, এই অবস্থায় ফেরেস্তারা তাদের প্রাণ হরণ করে বলে তোমরা কি অবস্থায় ছিলে? তারা বলে: এ ভূখন্ডে আমরা অসহায় ছিলাম। ফেরেস্তারা বলেঃ আল্লাহর পৃথিবী কি প্রশস্ত ছিলনা যে, দেশ ত্যাগ করে সেখানে চলে যেতে? অতএব, এদের বাসস্থান হলো জাহান্নাম এবং তা অত্যন্ত খারাপ স্থান।" (আন নিসা: ৯৭)
ইমাম বুখারী (রহঃ) তাঁর সহীহ বুখারীতে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি এ আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন যে, এই আয়াতটি ঐ সব مسلمانوں ব্যাপারে নাযিল হয়েছে যারা (মুসলমান হয়ে ও ঈমানী দুর্বলতার কারণে হিজরত না করে কাফেরদের সাথে মক্কাতেই ছিলো) বদরের যুদ্ধে মুশরিকদের সাথে মুসলমানদের বিরুদ্ধে লড়তে এবং তাদের সংখ্যা বৃদ্ধি করেছিলো তাদের কতিপয় লোক বদর যুদ্ধে মারা গিয়েছিলো, বাকীরা মুশরিকদের সাথে مسلمانوں হাতে বন্দী হয়েছিলো। রাসূল (সঃ) তাদের সাথে কাফেরদের প্রতি তিনি যে আচরণ করেছেন, সেই আচরণই করেছেন। অর্থাৎ কাফেরদের মতো তাদের কাছ থেকেও মুক্তিপন হিসেবে অর্থ গ্রহণের মাধ্যমে বন্দী দশা থেকে মুক্তি দিয়েছেন।
ইমাম বুখারী (রহঃ) তাঁর সহীহ বুখারীতে মুহাম্মদ বিন আবদুর রহমান আবুল আসওয়াদের একটি হাদীস বর্ণনা করেছেন। তিনি (মুহাম্মদ বিন আবদুর রহমান) বলেন: শামবাসীদের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য মদিনা বাসীদেরকে নিয়ে একটি সেনাদল গঠন করা হয়। এতে আমার নামও তালিকাভূক্ত করা হয়। আমি তখন আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাসের আযাদকৃত গোলাম ইকরামার কাছে গিয়ে সব কিছু বললাম। তিনি আমাকে সেনা দলে যোগদান করতে কঠোরভাবে নিষেধ করলেন। তার পর বললেনঃ আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস আমাকে বলেছেন: मुसलमानों কিছু লোক মুশরিকদের সাথে থেকে রাসূল (সঃ) এর বিরুদ্ধে মুশরিকদের দল ভারী করেছিলো। যুদ্ধের ময়দানে নিক্ষিপ্ত তীর এসে তাদের কারো শরীরে বিদ্ধ হলে সে মারা যেতো অথবা আহত হয়ে পরে মারা যেতো। তারপর আল্লাহ তায়ালা এ আয়াত নাযিল করেছেনঃ
إِنَّ الَّذِينَ تَوَفَّهُمُ الْمَلَائِكَةُ ظَالِمِي أَنْفُسِهِمْ قَالُوا فِيمَ كُنتُمْ ، قَالُوا كُنَّا مُسْتَضْعَفِينَ فِي الْأَرْضِ ، قَالُوا أَلَمْ تَكُنْ أَرْضُ اللَّهِ وَاسِعَةً فَتُهَاجِرُوا فِيهَا ، فَأُولَئِكَ مَا وَهُمْ جَهَنَّمَ ، وَسَاءَتْ مَصِيرًا -
"যারা নিজেদের প্রতি জুলুম করে, ফেরেস্তারা তাদের প্রাণ হরণ করে বলেঃ তোমরা কি অবস্থায় ছিলে? তারা বলে: এ ভূখন্ডে আমরা অসহায় ছিলাম, ফেরেস্তারা বলেঃ আল্লাহর পৃথিবী কি প্রশন্ত ছিলোনা যে, দেশ ত্যাগ করে সেখানে চলে যেতে? অতএব, এদের বাসস্থান হলো জাহান্নাম এবং তা অত্যন্ত খারাপ স্থান।" (আন নিসা: ৯৭)
ইবনে আবি হাতেম এবং ইবনে জারীর হযরত ছুদ্দী থেকে এর তাফসীর প্রসংঙ্গে বর্ণনা করেন যে, তিনি ছুদ্দী (রহঃ) বলেছেন: যখন হযরত আব্বাস, আকীল এবং নওফেল বন্দী হয়ে রাসূল (সঃ) এর কাছে নীত হলেন, তখন রাসূল (সঃ) আব্বাসের উদ্দেশ্যে বললেনঃ তুমি তোমার এবং তোমার ভ্রাতুস্পুত্রের পক্ষ থেকে ফেদিয়া মুক্তি পনের (অর্থ দাও)। তখন আব্বাস বললেন: হে আল্লাহর রাসূল, আমরা কি আপনার কেবলার দিকে ফিরে নামাজ পড়িনা? এবং আপনি যার সাক্ষ্য প্রদান করেন আমরা কি তাঁরই সাক্ষ্য দেইনা? তিনি বললেন: হে আব্বাস নিশ্চয়ই তোমরা পরস্পরে ঝগড়া করো, তাই ঝগড়া করছো। অতঃপর তিনি তেলাওয়াত করলেন
" أَلَمْ تَكُنْ أَرْضُ اللَّهِ وَاسِعَةً "
ইমাম বুখারী (রহঃ) তাঁর সহীহ বুখারীতে আল-জিহাদ অধ্যায়ে মুশরিকদের মুক্তিপন সংক্রান্ত বিষয়ে হযরত আনাস (রাঃ) এর হাদীস বর্ণনা করেন। তিনি [হযরত আনাস (রাঃ)] বলেন: রাসূল (সঃ) এর কাছে যখন বাহরাইনের মাল আনা হলো, তখন হযরত আব্বাস (রাঃ) নবী (সঃ) এর কাছে এসে বললেন: হে আল্লাহর রাসূল, আমাকে কিছু মাল (সম্পদ) দিন। কেননা আমি আমার নিজের পক্ষ থেকে এবং অকীলের পক্ষ থেকে মুক্তি পনের অর্থ দিয়েছি। রাসূল (সাঃ) বললেন, লও, তখন রাসুল (সাঃ) তাঁর কাপড়ে কিছু মাল দিলেন।
কুরআন ও সুন্নাহর এসব উদ্ধৃতির মাধ্যমে আমরা বুঝতে পারছি যে, যে ব্যক্তি কুফরী কথার ব্যাপারে তাকে জবরদস্তি করা হবে বলে পর্বেই জানতে পারে বা ধারনা করতে পারে এবং যদি মহা পরীক্ষা বা বিপদে পতিত হওয়ার পূর্বে তার শহর ও এলাকা থেকে হিজরত করা কিংবা পালিয়ে যাওয়ার মতো শক্তি থাকে অথচ সে (পলিয়ে গেলোনা) বা হিজরত করলোনা তাহলে তার ওপর জবরদস্তি মূলক আচরণ কে তার কুফরী কথা বা কাজের ওযর হিসেবে গ্রহণ (যোগ্য) হবে না। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তির ওপর কাফেররা চড়াও হয়েছে অথচ উক্ত অবস্থা থেকে নিস্কৃতি লাভের কোনো শক্তি তাদের নেই। যার ফলে কাফেররা তাদেরকে কুফরী করতে বাধ্য করেছে, তাদের ওযর বা অজুহাত গ্রহণ যোগ্য। এ ব্যাপারে খুবই সতর্ক হওয়া উচিৎ এবং জ্ঞান বুদ্ধি দিয়ে বিচার করা উচিৎ। আল্লামা শাইখ সুলাইমান বিন আবদুল্লাহ বিন শাইখ মুহাম্মদ বিন আবদুল ওয়াহহাব (রহঃ) তার লিখিত حكم موالاة اهل الاشراك নাম পুস্তিকায় বলেন:
৬ষ্ঠ দলীল হচ্ছে আল্লাহ তায়ালার বাণী: إِنَّ الَّذِينَ تَوَفَّهُمُ الْمَلَئِكَةُ ظَالِمِي أَنْفُسِهِمْ قَالُوا فِيمَ كُنتُمْ ، قَالُوا كُنَّا مُسْتَضْعَفِينَ فِي الْأَرْضِ ، قَالَوْ أَلَمْ تَكُنْ أَرَضُ اللَّهِ وَاسِعَةً فَتُهَاجِرُوا فِيهَا ، فَأُولَئِكَ مَأْوَاهُمْ جَهَنَّمَ ، وَسَاءَتْ مَصِيرًا -
"যারা নিজেদের আত্মার প্রতি জুলুম করে, এই অবস্থায় ফেরেস্তারা তাদের প্রাণ হরণ করে বলে, তোমরা কি অবস্থায় ছিলে? তারা বলে: এ ভূখন্ডে আমরা অসহায় ছিলাম। ফেরেস্তারা বলেঃ আল্লাহর পৃথিবী কি প্রশন্ত ছিলনা যে, দেশ ত্যাগ করে সেখানে চলে যেতে? অতএব, এদের বাসস্থান হলো জাহান্নাম এবং তা অত্যন্ত খারাপ স্থান।" (আন নিসা: ৯৭) অর্থাৎ তোমরা কোন দলে ছিলে? তোমরা কি मुसलमानों দলে ছিলে? নাকি মুশরিকদের দলে ছিলে? তারা তখন ওযর বা অজুহাত পেশ করেছিলো যে, তারা দুর্বল হওয়ার কারণে তারা مسلمانوں দলে থাকতে পারেনি। ফেরেস্তারা কিন্তু তাদের এ ওজর গ্রহণ করেনি বরং তাদের কে লক্ষ্য করে বললোঃ
أَلَمْ تَكُنْ أَرْضُ اللَّهِ وَاسِعَةً فَتَهَاجِرُوا فِيهَا فَأُولَئِكَ مَاوُ هُمْ جَهَنَّمَ وَسَاءَتْ مَصِيرًا "তোমাদের হিজরত করার জন্য কি আল্লাহর যমীন প্রশস্ত ছিলোনা? এদের বাসস্থান হলো জাহান্নাম। এটা খুব খারাপ স্থান।"
কোনো জ্ঞানী ব্যক্তি এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ পোষণ করবে না যে, যারা مسلمانوں দল থেকে চলে গিয়ে মুশরিকদের সাথে মিশে গিয়েছেলো তারা তাদেরই (মুশরিকদেরই) দল ও জামায়াতের অন্তর্ভুক্ত হিসেবে গণ্য হয়েছিলো। অথচ এখানে আয়াত নাযিল হয়েছে এ সব লোকদের ব্যাপারে যারা ছিলো মক্কাবাসী, তারা ঈমান এনেছিলো তবে তারা হিজরত থেকে বিরত ছিলো। যখন মুশরিকরা বদর যুদ্ধের উদ্দেশ্যে বের হলো তখন তাদের সাথে যুদ্ধে যাওয়ার জন্য তাদেরকে (মক্কার مسلمانوںকে) জবরদস্তি করেছিলো। অগত্যা তারা ভয়ে ভয়ে তাদের সাথে বের হয়েছিলো। অবশেষে তারা বদর যুদ্ধে مسلمانوںই হাতে নিহত হয়। যখন (নবীর সংগী) মুসলমানরা তাদের (নিহত মুসলমান) কথা জানতে পারলো, তখন তারা আফসোস করলো আর বলতে লাগলো, আমরা আমাদের ভাইদেরকেই হত্যা করলাম। তাদের ব্যাপারেই আল্লাহ তায়ালা এ আয়াত নাযিল করেন। তাহলে ঐ সব লোকদের অবস্থা বা হুকুম কি হতে পারে যারা ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত ছিলো, অতঃপর ইসলামের রজ্জুকে আপন স্কন্ধ থেকে খুলে ফেলেছে, মুশরিকদের দ্বীনের প্রতি তাদের সমর্থন জ্ঞাপন করেছে, তাদের অনুগত্য করেছে, তাদেরকে সাহায্য ও সহযোগিতা করেছে, তাওহীদে বিশ্বাসী লোকদেরকে আপমানিত করেছে, তাওহীদে বিশ্বাসী লোকদের পথ পরিহার করেছে, তাদেরকে দোষারোপ করেছে, তাদেরকে গালি-গালাজ করেছে, বদনাম করেছে, তাদেরকে উপহাস করেছে, বদনাম করেছে, তাদেরকে উপহাস করেছে, তাওহীদের ওপর অবিচল থাকাকে মন্দ হিসেবে চিহ্নিত করেছে, জিহাদের ক্ষেত্রে তাদের ধৈর্যকে অপমানিত করেছে। জবরদস্তির ফলে নয় বরং ইচ্ছাকৃত ভাবে তাদের বিরুদ্ধে সাহায্য করেছে, তারা ঐ সব লোকদের চেয়ে কাফের হওয়ার বেশী যোগ্য বা হকদার যারা হিজরত পরিত্যাগ করেছে সামান্য পার্থিব স্বার্থের কারণে। কাফেরদের কারণে বাধ্যহয়ে মুশরিক সৈন্যদের সাথে ভয়ে, ভয়ে বের হয়েছিলো मुसलमानों বিরুদ্ধে। যদি কেউ বলে : मुसलमानों বিরুদ্ধে কাফেরদের জবরদস্তিতে মক্কা থেকে বের হয়ে যারা বদর যুদ্ধে মারা গিয়েছিলো, কাফের কর্তৃক তাদের ওপর জবরদস্তি কি ওজর হিসেবে গ্রহণ যোগ্য হবে না? তখন উত্তর হবে না, গ্রহণ যোগ্য হবেনা। কেননা প্রাথমিক পর্যায়ে যখন তারা কাফেরদের সাথে অবস্থান করছিলো তখন তাদের কোনো ওজর বা অযুহাত ছিলোনা। তাই পরবর্তীতে জবরদস্তির কারণে ওজর গ্রহণ যোগ্য হবে না, তার মূল কারণ হচ্ছে হিজরত পরিত্যাগ করে কাফেরদের সাথে তাদের থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত। (মাজমুআতুত তাওহিদ ৩০৫/১)
কাজী আইয়ায (রহঃ) আল-মাদারেক এর ২/৭১৯ পৃষ্টায় বলেন: আবু মুহাম্মদ বিন আল-কারবানীকে ঐ ব্যক্তি সম্পর্কে প্রশ্ন করা হয়েছিলো যাকে বনু ওবায়েদ। (নামক একটি গোত্র) তাদের আহবানে সাড়া দেয়া অথবা মৃত্যু বেছে নেয়ার ব্যাপারে জবরদস্তি করা হয়েছিলো। তিনি জবাবে বললেন: মৃত্যুকেই বেছে নিবে, তবু অন্যায় আহবানকে ওযর হিসেবে গ্রহণ করা যাবেনা। তবে প্রথম থেকেই যদি সে (অন্যায় আহবানকারী লোকদের) শহরে প্রবেশ করে থাকে এবং তাদের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করে থাকে এবং ঈমানের জন্য ভয়ের কোনো কারণ না থাকে, তাহলে ভিন্ন কথা। পরবর্তীতে ঈমানের ওপর হুমকি প্রকাশ পেলে সেখান থেকে পালিয়ে যাওয়া ওয়াজিব। কিন্তু কাফের মুশরিকদের সাথে সব কিছু জেনে- শুনে অবস্থান করতে থাকলে ভীতি বা জবরদস্তির কোনো অযুহাত গ্রহণ যোগ্য হবেনা। কেননা যে অবস্থান অধিবাসীদের কাছে শরীয়ত বাতিলের দাবী করে, সে অবস্থানে থাকা (শরীয়ত বাতিলের আহবানে সাড়া দেয়া) কিছুতেই জায়েয নয়। এ থেকে ওলামায়ে কেরাম সুস্পষ্ট প্রমাণ পেয়েছেন, ওযর مسلمانوں জন্য তাদের শত্রুদের মাঝে এমন অবস্থায় বসবাস করা অনুচিৎ, যে আবস্থায় তাদের শত্রুরা তাদেরকে তাদের দ্বীনের ব্যাপারে কঠিন পরীক্ষায় ফেলে দেয়।
চতুর্থ দিক: ইতিপূর্বে পেশকৃত প্রশ্ন ও উদাহরণের এখানে প্রশ্ন করতে চাই, যদি অসংখ্য মুসলমান এমন কোনো শহরে বাস করে, সেখানে কুফরী শাসন চলে। এক সময় مسلمانوں ওপর যদি কাফেররা চড়াও হয়, আর তাদের সম্পত্তি হরণ করে নেয়, আর নগরের প্রশাসন একথা বলে: তোমাদের ধন-সম্পদ আমরা ততক্ষণ পর্যন্ত ফেরত দিবনা যতক্ষণ না তোমরা আল্লাহকে গালি দাও অথবা তোমাদের রাসূলকে (সঃ) গালি দাও, অথবা তোমাদের দ্বীন ইসলামকে গালি দাও, অথবা গাইরুল্লাহর নৈকট্য লাভের জন্য তোমরা পশু জবাই করো ইত্যাদি ইত্যাদি। তারপর তারা (মুসলমানরা) তাদের ডাকে সাড়া দিলো এবং কাফেদের সাথে তারা বেশ কিছু বছর অতিবহিত করলো? তারপর তারা কুফরী শক্তির বিচারালয়ে ততদিন পর্যন্ত নিজেদের সম্পদ ফিরে পাওয়ার জন্য গেলোনা, যতদিন না তারা আল্লাহকে গালি দিলো। এটাকে জবরদস্তি গণ্য করে তাদের ওজর হিসেবে গণ্য করা যাবে? নিঃসন্দেহে এর জবাব হবে 'না,। অতএব আমরা বলতে চাই, সে জাতির সকলেই প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত সুস্পষ্টভাবে আল্লাহকে ইচ্ছা মতো গালমন্দ করে এবং যে কুফরী কাজ ইসলামের গন্ডি থেকে মানুষকে বের করে দেয়, এমন কাজ করে তার মধ্যে আর যে জাতির সবাই তাগুতের কাছে বিচার ফয়সালা নিয়ে যায় আর এমন কাজ করে, যা ইসলামের গন্ডি থেকে কোনো ব্যক্তি বের করে দেয় তার মধ্যে কি পার্থক্য আছে?
পরিশেষে আমরা একথা বলতে চাই, যদি কেউ প্রশ্ন করে, তাহলে এ ফেৎনা আর বিপদ থেকে বাঁচার উপায় কি? এর উত্তরে ফেৎনা থেকে বাঁচার নিম্মোক্ত উপায়ের কথা বলবো।
প্রথম উপায়: আল্লাহ তায়ালা বলেনঃ
إِنَّ الَّذِينَ آمَنُوا وَالَّذِينَ هَاجَرُوا وَجْهَدُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ أُولَئِكَ يَرْجُونَ رَحْمَتَ اللَّهِ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَحِيمٌ
"যারা ঈমান এনেছে এবং হিজরত করেছে আর আল্লাহর পথে জিহাদ করেছে, তারা আল্লাহর রহমতের প্রত্যাশী। আর আল্লাহ হচ্ছেন ক্ষমাকারী করুণাময়।" (আল-বাকারাহ: ২১৮)
আল্লাহ তায়ালা আরো বলেন:
وَالَّذِينَ هَاجَرُوا فِي اللَّهِ مِنْ بَعْدِ مَا ظُلِمُوا لَنُبَوَنَنَّهُمْ فِي الدُّنْيَا حَسَنَةٌ وَلَأَجْرُ الْآخِرَةِ أَكْبَرُ لَوْ كَانُوا يَعْلَمُونَ (النحل (٤١)
"যারা নির্যাতিত হওয়ার পর আল্লাহর উদ্দেশ্যে গৃহ ত্যাগ (হিজরত) করেছে, আমি অবশ্যই তাদেরকে দুনিয়াতে উত্তম আবাস দিবো, আর পরকালের পুরস্কার তো সর্বাধিক; হায়! যদি তারা জানতো।" (নাহল: ৪১)
আল্লাহ তায়ালা আরো বলেন: ثُمَّ إِنَّ رَبَّكَ لِلَّذِينَ هَاجَرُوا مِنْ بَعْدِ مَا فَتِنُوا ثُمَّ جَهَدُوا وَصَبَرُوا « إِنَّ رَبَّكَ مِنْ بَعْدِهَا لَغَفُورٌ رَّحِيمِ (النحل - ۱۱۰)
"যারা দুঃখ কষ্ট ভোগের পর হিজরত করেছে, অতঃপর জিহাদ করেছে, এবং ধৈর্য ধারন করেছে। নিশ্চয় আপনার রব এ সব বিষয়ে অবশ্যই ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।” (নাহল: ১১০)
আল্লাহ তায়ালা আরো বলেন: وَمَنْ يُهَاجِرُ فِي سَبِيلِ اللَّهِ يَجِدُ فِي الْأَرْضِ مَرْغَمًا كَثِيرًا وَسَعَةً
"যে কেউ আল্লাহর পথে হিজরত করে, সে এর বিনিময়ে অনেক স্থান ও স্বাচ্ছলতা প্রাপ্ত হবে।" (আন নিসাঃ ১০০)
হাফেজ ইবনে কাসীর তাঁর তাফসীরে বলেন: سعة শব্দের অর্থ হলো রিযিক এটা একাধিক আলেমের কথা। এদের মধ্যে রয়েছেন হযরত কাতাদাহ (রহঃ)। তিনি বলেন: يَجِدُ فِي الْأَرْضِ مِّرْغَمًا كَثِيرًا وَسَعَةً গোমরাহী থেকে হেদায়াত এবং দৈন্যতা থেকে সমৃদ্ধিকে বুঝানো হয়েছে। এটা হলো এ ধরনের ফেতনা থেকে বাঁচার প্রথম উপায় আর এ উপায়টির নাম হচ্ছে হিজরত। হিজরত হতে হবে দারুল কুফুর থেকে দারুল ইসলামের দিকে। দারুল কুফর বলতে ওলামায়ে কেরাম ঐ দেশকেই বুঝিয়েছেন যেখানে কুফরী শাসনের কর্তৃত্ব ও প্রধান্য বিরাজমান।
ইমাম ইবনুল কয়্যিম (রহঃ) আহলে জিম্মাহর হুকুম আহকাম বা বিধান বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন: অধিকাংশ ওলামায়ে কেরام বলেন: দারুল ইসলাম বলতে ঐ স্থানকেই বলে যেখানে مسلمانরা অবস্থান বা বসবাস করে এবং ইসলামের বিধান সেখানে জারি রয়েছে। যতক্ষণ পর্যন্ত সেখানে ইসলামের বিধান জারি না হবে ততক্ষণ পর্যন্ত সে স্থানকে দারুল ইসলাম বলা যাবে না। এর সাথে যদি ইসলামের নাম সংযোগ করাও হয় তবুও নয়। দাওয়াতে নাজদিয়ার ওলামায়ে কেরام বলেন: যে শহর বা স্থান কুফরী বিধান দ্বারা পরিচালিত সে স্থানই দারুল কুফর। ইবনু মফলিহ বলেন: যে স্থান ইসলামের বিধানে কর্তৃত্বশীল সেটাই হলো দারুল ইসলাম। আর যদি সে স্থানে কুফরী বিধান কর্তৃত্বশীল হয় তাহলে সেটাই হলো দারুন কুফর। এ দু অবস্থা ছাড়া অন্য কোনো অবস্থার স্থান নেই।
শাইখ সুলাইমান বিন সামহান আননাজদী (রহঃ) তাঁর এক বর্ণনায় বলেন : দারুল ইসলামে যদি কুফরী শক্তি বিজয়ী হয়, আর সেখানে কুফরী বিধান জারি করে, তাহলে সে স্থান দারুল কুফরে পরিণত হয়ে যাবে।
তিনি বলেনঃ যদি কোনো কাফের চড়াও হয় কোনো দারুল ইসলামে, আর সেখানে যদি স্থান নেয় ভয় ভীতি আর শঙ্কা, যদি চালু করে কুফরী বিধান নির্বিঘ্নে প্রকাশ পায় কুফরী আইন রহিত করে দেয় সেখানে নবী মুহাম্মদ (সঃ) এর বিধান সেখানে প্রকশিত হয়না ইসলাম, গৃহীত হয়না তথা ইসলামী বিধান সে স্থান হয় দারুল কুফর সকল গুণী ও বিজ্ঞ জনের কাছে। তবে কাফের নহে যে সবাই, যারা আছে সেই খানে। হয়তো বা আছে সেথা পূণ্যবান স্বীয় নেক কর্ম ও গুণে।
শাইখ মুহাম্মদ বিন ইবরাহীম আল-শাইখকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিলো, যে مسلم মানব রচিত বিধান দ্বারা শাসিত হয়, সেখান থেকে হিজরত করা কি ওয়াজিব? জবাবে তিনি বলেন, যে দেশ মানব রচিত বিধানের মাধ্যমে শাসিত হয়, সে দেশ ইসলামের দেশ নয়। এ দেশ থেকে হিজরত করা ওয়াজিব। এমনিভাবে যখন সেখানে নির্দ্বিধায় পৌত্তলিকতার উম্মেষ ঘটে, সেখান থেকে হিজরত করা ওয়াজিব। কেননা কুফরী শাসন সর্বদাই কুফরীর প্রচারও প্রসার ঘটায়, তাই এমন দেশকে কুফরীর দেশ হিসেবে গণ্য করা হবে।
দ্বিতীয় উপায়: ইমাম বুখারী (রহঃ) তাঁর সহীহ আল বুখারীতে 'ঈমান অধ্যায়ের ফেতনা থেকে পালায়ন করা, দ্বীনি কাজের অন্তর্ভূক্ত, অনুচ্ছেদে হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রঃ) এর একটি হাদীছ বর্ণনা করেছেন। হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রঃ) বলেন: রাসুল (সঃ) ইরশাদ করেছেনঃ
يوشك ان يكون خير مال المسلم غنما يتبع بها شعف الجبال ومواقع القطر يفر بدينه من الفتن
"অতি শীঘ্রই সে দিন আসবে যখন মুসলমানের সর্বোত্তম সম্পদ হবে ছাগল। তা নিয়ে সে পাহাড়ের চুড়ায় উঠবে আর বৃষ্টির স্থানে যাবে। ফেতনা থেকে বাঁচার জন্য তার দ্বীন নিয়ে সে পালিয়ে বেড়াবে।"
তৃতীয় উপায় : তৃতীয় উপায় হচ্ছে একজন তাওহীদবাদী মুসলিম এমন একটি শহর কিংবা গ্রাম অনুসন্ধান করবে এবং বেছে নিবে, যেখানে কুফরী রীতিনীতি ও বিধানের কর্তৃত্ব নেই। সে তার দ্বীন এবং দুনিয়া রক্ষার জন্য এবং জীবন যাপন করার জন্য সেখানে যাবে।
চতুর্থ উপায় : চতুর্থ উপায় হচ্ছে ঐ জনসমষ্টির জন্য যারা হিজরত করেনি এবং ইসলাম থেকেও বিচ্ছিন্ন হয়নি, যেমন দারুল কুফরের কোন গ্রাম বা শহরবাসী। তারা তাদের মধ্য থেকে এমন একজন আলেম, অথবা একজন বিজ্ঞ লোক অথবা একজন বিচারককে বাছাই করে নিবে, যে ব্যক্তি তাঁদের মধ্যে ইসলামী শরীয়তের বিধান দ্বারা বিচার-ফয়সালা করবে এবং তারা এমন পারস্পরিক চুক্তি ও ওয়াদায় আবদ্ধ হবে যে, তারা তাদের সমস্ত বিষয় ও ঝগড়া বিবাদ সবই ঐ বাছাইকৃত ব্যক্তির কাছে ইসলামের বিধান মোতাবেক ফয়সালা করার জন্য নিয়ে যাবে। তাদের এ অনুসরণ হবে ইমাম বা তার পক্ষ থেকে দায়িত্ব প্রাপ্ত কোনো ব্যক্তির।
ইমাম নববী (রহঃ) বলেন : ইমামের (মুসলমানদের নেতার) অপরিহার্য কর্তব্য হচ্ছে প্রত্যেক শহরে এবং যে এলাকায় কাজী (শরিয়তের বিধান অনুযায়ী বিচার ফয়সালাকারী) নেই সেই সব এলাকায় কাজী নিয়োগ করা। কোনো প্রদেশের গর্ভনর অথবা কোনো শহরের আমীরকে ও ইমাম (মুসলমান সমাজের সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী ব্যক্তি) কাজী (বিচারক) পদের জন্য নিয়োগ দিতে পারেন যদি সেখানে শরীয়তের বিধান মোতাবেক বিচার কার্য চালাবার জন্য কোনো লোক না থাকে। কেননা তিনিই হচ্ছে, ওয়াকিল বা দায়িত্বশীল প্রতিনিধি, এমনি ভাবে যদি মুসলমানদের কাউকে কাজী বা বিচারক বেছে নেয়ার বিষয় ন্যাস্ত করা হয়, কোনো পিতার অধিকার নেই তার সন্তানকে বিচারক হিসেবে বেছে নেয়া বা নিয়োগ দেয়া। যেমনিভাবে নিজের জন্য বেছে নেয়া যায় না। যদি শহরবাসীকে বলা হয় : তোমরা তোমাদের মধ্য থেকে কোনো ব্যক্তিকে বেছে নাও এবং বিচার-ফয়সালার জন্য তার ওপর দায়িত্ব অর্পন করো। ইবনু কাজ বলেনঃ সহীহ মতানুযায়ী এটা জায়েয আছে।
ইমাম ইবনে কুদামা তাঁর 'আল মুগনী' নামক কিতাবে বলেন : যদি ইমাম কোনো মানুষকে বিচারকের দায়িত্ব গ্রহণ করার জন্য ক্ষমতা প্রদান করে, তাহলে তা গ্রহণ করা তার জন্য জায়েয আছে অতএব তার জন্য কাউকে উকিল বা প্রতিনিধি বানানোও জায়েয আছে, যেমনটি ক্রয়-বিক্রয়ের ক্ষেত্রে জায়েয আছে। যদি তাকে বিচারক বাছাই করার জন্য ক্ষমতা প্রদান করে তাহলে সেটাও তার জন্য জায়েয আছে তবে নিজেকে বিচারক হিসেবে বাছাই করা তার জন্য জায়েয হবে না। এমনি ভাবে নিজ পিতাকে কিংবা নিজ সন্তানকে বিচারক হিসেবে বাছাই করতে পারবে না। ঠিক যেমনিভাবে, ছদকা বা যাকাতের মালের ব্যাপারে তাকে ক্ষমতা অর্পন করলে তা গ্রহণ করা এবং পিতা ও সন্তানকে প্রদান করা জায়েয হতো না। তবে যদি তার পিতা ও ছেলে নেতৃত্বের যোগ্যতায় সক্ষম হয়, তাহলে তাদেরকে বিচারক নিয়োগ করা ঐ ক্ষমতা প্রাপ্ত ব্যক্তির জন্য জায়েয হওয়ার সম্ভাবনা আছে। কেননা এ নির্বাচন বা বাচাই সাধারণ ভাবে যোগ্য ব্যক্তিকে বাছাই করার যে ক্ষমতা ও অনুমতি তাকে দেয়া হয়েছে তার মধ্যে এটা শামিল। আল্লাহ চাহে তো খুব শীঘ্রই এ অধ্যায়ের আলোচনা শেষ হলেই এ ব্যাপারে ওলামায়ে কেরামের মতামত এবং শরীয়তের কাজী বা বিচারক কোনো শহরে না পাওয়া গেলে কি করতে হবে এ ব্যাপারে ও ওলামায়ে কেরামের মতামত আসবে। এ ফেতনা থেকে বাঁচার উল্লেখিত ৪টি উপায় বর্ণনা করা হলো। আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে প্রকাশ্য ও গোপন ফেতনা থেকে রক্ষা করুন এবং মুক্তিদান করুন। আল্লাহ হচ্ছেন সর্ব শক্তিমান। আল্লামা শাইখ সুলাইমন বিন ছামহান (রহঃ) যিনি তাঁর যুগের সবচেয়ে বেশী জ্ঞানী আলেম ছিলেন, তাঁকে যখন প্রশ্ন করা হলো যে, অনন্যোপায় হয়ে যদি কেউ তাগুতের কাছে বিচার নিয়ে যায়, তাহলে তার হুকুম কি? এ প্রশ্নের জবাবে তিনি যা বলেছেন তা বলেই এতদসংক্রান্ত প্রবন্ধটি শেষ করছি।
দ্বিতীয় অবস্থান: দ্বিতীয় অবস্থান হচ্ছে এ কথা বলা, অতএব তুমি জানতে পারলে যে, তাগুতের কাছে বিচার নিয়ে যাওয়া হচ্ছে কুফরী। আল্লাহ তায়ালা তাঁর কিতাবে উল্লেখ করেছেন যে কুফরী হচ্ছে হত্যার চেয়ে জঘন্য। আল্লাহ তায়ালা বলেন: وَالْفِتْنَةُ أَكْبَرُ مِنَ الْقَتْلِ “ফেতনা হচ্ছে হত্যার চেয়েও জঘণ্য।” (আল বাকারা ২১৭)
وَالْفِتْنَةُ أَشَدَّ مِنَ الْقَتْلِ তিনি আরো বলেন: “ফেতনা হচ্ছে হত্যার চেয়েও কঠিন (গুনাহ)।" (আল বাকারা ১৯১)
" কুফরীই হচ্ছে ফেতনা"। শহুরে আর গ্রাম্য দু জনের মধ্যে যদি খুনা খুনী শুরু হয়ে যায়, আর তারা মারা যায় সেটা আল্লাহর জমীনে তাগুতকে প্রশাসক নিয়োগ করার চেয়ে অনেক সহজ কেননা তাগুত আল্লাহর যমীনে সেই ইসলামী শরীয়তের বিরুদ্ধে শাসন করবে, যে শরীয়ত দিয়ে আল্লাহ তাঁর রাসুলকে (সঃ) পাঠিয়েছেন।
তৃতীয় অবস্থান: আমরা বলতে চাই, তাগুতের কাছে বিচার চাওয়া যদি কুফরী হয় আর ঝগড়া বিবাদ যদি একমাত্র দুনিয়ার জন্যই হয়ে থাকে, তাহলে কিভাবে কুফরী করা তোমার জন্য জায়েয হতে পারে? কেননা মানুষ প্রকৃত পক্ষে ততক্ষণ পর্যন্ত মুমিন হতে পারে না যতক্ষণ পর্যন্ত না আল্লাহ ও তাঁর রাসুল (সঃ) তার কাছে সবচেয়ে প্রিয় জিনিসে পরিণত হবে এবং যতক্ষণ পর্যন্ত না আল্লাহর রাসুল (সঃ) তার কাছে তার সন্তান, তার পিতা এবং সমস্ত মানুষের চেয়ে বেশী মুহাব্বাতের বস্তু হবে। তোমার দুনিয়ার সকল স্বার্থও যদি নষ্ট হয়ে যায়, তবু দুনিয়ার স্বার্থ রক্ষা করার জন্য তাগুতের কাছে বিচার চাওয়া তোমার জন্য জায়েয নেই। যদি কোনো জালেম ব্যক্তি তোমার ওপর চড়াও হয়ে তাগুতের কাছে বিচার নিয়ে যাওয়া আর তোমার দুনিয়ার সমস্ত স্বার্থ জলাঞ্জলি দেয়ার মাঝে কোনো একটিকে বেছে নিতে তোমাকে বাধ্য করে, তাহলে দুনিয়া বাদ দেয়া তোমার জন্য ওয়াজিব, তবু তাগুতের কাছে বিচার চাওয়া জায়েয নেই।
তাই প্রত্যেক মুসলমান নর-নারী প্রত্যেক মুমিন, মুমেনা যে তার দ্বীন ও তাওহীদের হেফাজত চায়, তার জন্য উচিৎ হচ্ছে তাদের সমস্ত বিবাদপূর্ন ও বিতর্কিত বিষয়ের ফয়সালার জন্য ঐ সব ওলামায়ে কেরামের কাছে বিচার চাওয়া যার, তাঁদের রবের কিতাব আর তাদের নবীর সুন্নত মোতাবেক বিচার ফয়সালা করে। আর তাগুতের কাছে বিচার নিয়ে যাওয়া তাদের অনুচিৎ। কেননা তাগুতের কাছে বিচার নিয়ে যাওয়ার অর্থই হচেছ তাগুতের প্রতি ঈমান আনা এবং তারই উদ্দেশ্যে ইবাদত নিবেদন করা। অবশ্যই কেয়ামতের দিন তাগুতের অনুসারী হয়ে উঠাকে ভয় করা উচিত। রাসুল (সঃ) ইরশাদ করেছেন : আল্লাহ তায়ালা সমস্ত মানুষকে কিয়ামতের দিন একত্রিত করে বলবেন : যে ব্যক্তি যে জিনিসের এবাদত করতো দুনিয়াতে, সে যেনো তারই অনুসরণ করে। এরপর যে ব্যক্তি সূর্যের ইবাদত করতো সে সূর্যের ইবাদত করবে, আর যে ব্যক্তি চন্দ্রের ইবাদত করতো সে চাঁদের অনুসরণ করবে। যে ব্যক্তি তাগুতের ইবাদত করতো সে তাগুতের অনুসরণ করবে। (বুখারী)
হে আল্লাহ, মুসলমান হিসেবে আমাদেরকে জীবিত রাখো, আর মুসলমান করে মৃত্যু দান করো, আমরা যেনো নেককারদের সাথে হাশরে মিলিত হতে পারি। আমরা যেনো আপমানিত না হই, কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন না হই। দুরূদ ও সালাম নবী মুহাম্মদ (সঃ) এর ওপর, তাঁর পরিবার ও সকল সাহাবায়ে কেরামের ওপর।