📄 প্রথম সংশয়
এটা হচ্ছে সবচেয়ে খারাপ সংশয়। আর তা হচ্ছে ঐ ব্যক্তির কথা, যে বলে যে, এ কাজটি তাগুতের কাছে বিচার চাওয়া নয়। বরং এটা হচ্ছে যে অধিকার খুব শীঘ্রই নষ্ট হয়ে যাবে, তার জন্য যাওয়া এবং চাওয়া।
জবাব: আমরা বলতে চাই যে, মানুষ কখনো এমন কথা বলে, যা বিবেক সম্মত (বা যথার্থ) নয়। যদি এ কথা সমূদ্রের পানির সাথে মিশিয়ে দেয়া হয়, তাহলে তা মিশ্রিত হয়ে যায়। এ ধরনের কথা রাসল (সাঃ) হযরত আয়েশা (রাঃ)-কে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন, যা তিরমিজি ও আবু দাউদেও এসেছে। এধরণের কথা মূলতঃ আল্লাহর দ্বীনের সাথে, এবং আল্লাহ তায়ালার নিষিদ্ধ জিনিসের সাথে বাহানা ছাড়া আর কিছুই নয়। এটাতো সকল জ্ঞানী ব্যক্তিরই জানা যে, নামের পরিবর্তনের কারনে কোন জিনিসের হাকিকত বা আসল নষ্ট হয়ে যায়না। আল্লামা আবদুল্লাহ বিন আবদুর রহমান আবা বাতিন বলেন: যে ব্যক্তি যে কোনো ধরনের ইবাদত গাইরুল্লাহর উদ্দেশ্যে নিবেদন করলো সে মূলত: ঐ গাইরুল্লাহরই ইবাদত করলো, তাকে ইলাহ হিসেবে গ্রহণ করলো এবং আল্লাহর সাথে তার খাস অধিকারের ক্ষেত্রে গাইরুল্লাহকে শরীক করলো, যদিও সে উলুহিয়্যাত, ইবাদত এবং শিরকের দিক থেকে তার কাজের নামকরণ থেকে দূরে ছিলো। জ্ঞান ও বিবেক সম্পন্ন প্রত্যেক ব্যক্তিই অবগত আছেন যে, জিনিসের হাকিকত (আসলরূপ) নাম পরিবর্তনের দ্বারা পরিবর্তিত হয়না। (মাজমুআতুত তাওহীদ আর রিসালাত আস সাবেয়াহ)
কোনো মুসলমানই এ ব্যাপারে সন্দেহ পোষণ করতে পারেনা যে, বিচার-ফয়সালা চাওয়ার অর্থ হচ্ছে বিবাদ মীমাংসা করার জন্য বিবাদপূর্ণ বিষয়টি যার কাছে মীমাংসিত হবে তার কাছে প্রত্যার্পন করা। এ বিষয়টি অন্তর দিয়ে সমাধা হয়না, এর জন্য শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ প্রত্যঙ্গকে কাজে লাগাতে হয় (অর্থাৎ এটা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের কাজ, অন্তরের নয়)। অতএব যারা বলে যে বিচার-ফয়সালা চাওয়ার বিষয়টিও যতক্ষণ পর্যন্ত তাগুতের নিকট বিচার-ফয়সালার জন্য যাওয়ার নিয়ত না করবে এবং তাগুতের বিধান আল্লাহর বিধানের চেয়ে উত্তম বলে বিশ্বাস না করবে ততক্ষণ পর্যন্ত তাগুতের কাছে বিচার নিয়ে যাওয়ার অপরাধে অপরাধী হবেনা, তাদের কথা আসলে ঐ ব্যক্তির মতোই যে বলে: সেজদা করার কাজটি ততক্ষণ পর্যন্ত শেরেকী সেজদা হিসেবে গণ্য হবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত সেজদাকারী ব্যক্তি সেজদা গ্রহনকারী ব্যাক্তিকে সেজদার অধিকারী বলে মনে প্রাণে বিশ্বাস না করবে। ইমাম ইবনে কায়্যিম এ ধরনের কথার জবাব দিয়েছেন। একথাটা ঠিক ঐ ব্যক্তির মতোই যে ব্যক্তি এ দাবী করে যে, যতক্ষণ পর্যন্ত ইবাদতকারী ইবাদতকে ইবাদত হিসেবে বিশ্বাস না করবে, ততক্ষণ পর্যন্ত তা ইবাদত হিসেবে গণ্য হবে না। তিনি বলেন: পীরের উদ্দেশ্যে মুরীদের সেজদা শিরকের অন্তর্ভুক্ত। সেজদাকারী এবং সেজদা গ্রহণকারী উভয়ের পক্ষ থেকেই এটা শিরক। সবচেয়ে বিস্ময়ের ব্যাপার হচ্ছে এই যে, তারা বলেঃ এটা আসলে সেজদা নয়, এটা হচ্ছে পীরের সামনে তারই সম্মান রক্ষার্থে এবং বিনয় প্রকাশের উদ্দেশ্যে শুধুমাত্র মস্তক অবনত করা। তাদেরকে একথা বলা হচ্ছে যে, আপনারা যদিও এর নাম যা দেয়ার তাই দিয়েছেন। সেজদার হাকিকত বা মূলকথা হচ্ছে সেজদা গ্রহণকারীর সামনে মস্তক অবনত করা। (আল মুদারেজ৩৭৪/১)
অতঃপর আমরা বলতে চাই যে, রাসূল (সঃ) থেকে বর্ণিত একটি ঘটনা কারো কাছে সমস্যা বা প্রশ্ন হয়ে দাড়াতে পারে, আর তা হচ্ছে রাসূল (সঃ) মাতআম বিন আদীর (যে একজন মুশরিক ছিলো) আশ্রয়ে গিয়েছিলেন। (অর্থাৎ নবী হয়ে কি ভাবে তিনি একজন মুশরিকের কাছে আশ্রয় নিয়েছিলেন? এর জবাবে আমরা বলবো। যদি একজন মানুষ বিচার-ফয়সালা চাওয়ার অর্থ কি তা বুঝতে পারে তাহলে এ ধরনের প্রশ্ন তার কাছে উদিত হতে পারতো না। ইতিপূর্বে বিচার-ফয়সালা চাওয়ার যা অর্থ বর্ণনা করা হয়েছে তা হচ্ছে যার কাছে বিবাদের মীমাংসা হবে তার কাছে বিচার-ফয়সালার বিষয়টি প্রত্যার্পন করা।
আল্লাহ তায়ালা বলেনঃ فَإِنْ تَنَازَعْتُمْ فِي شَيْءٍ فَرُدُّوهُ إِلَى اللَّهِ وَالرَّسُولِ إِنْ كُنْتُمْ تُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ ، ذَلِكَ خَيْرٌ وَأَحْسَنُ تَأْوِيلًا -
"তোমরা যদি কোনো বিষয়ে বিবাদে জড়িয়ে পড়, তাহলে মীমাংসার জন্য বিষয়টিকে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের (সঃ) দিকে প্রত্যার্পন করো, যদি তোমরা আল্লাহর প্রতি এবং আখেরাতের প্রতি বিশ্বাসী হও।" (আন-নিসা: ৫৯)
এটাই হচ্ছে বিচার ফয়সালা চাওয়ার স্বরূপ। এর উদাহরণ হচ্ছে দু'জন লোকের মধ্যে ঝগড়া বিবাদ সংঘটিত হওয়া এবং দু'জনের মধ্যে বিবাদপূর্ণ বিষয়টিকে ফায়সালা করে দেয়ার জন্য উভয়েই মীমাংসাকারীর কাছে যাওয়া। যদি এ বিচার প্রার্থনা তাগুতের কাছে হয়ে থাকে, তাহলে নিঃসন্দেহে এটা কুফরী এবং বড় ধরণের শিরক। আর কোনো কাফেরের কাছে [আদর্শকে জলাঞ্জলী না দিয়ে নিরাপত্তার প্রয়োজনে] আশ্রয় চাওয়া হারাম, এর কোনো দলীল বা প্রমাণ পাওয়া যায় না। এ ধরণের আশ্রয় হযরত আবু বকর (রাঃ) ইবনুদ্দাগনার কাছে চেয়েছিলেন এবং ইসলামের প্রাথমিক পর্যায়ের মুশরিকদের জুলুম ও নির্যাতনের ভয়ে সাহাবায়ে কেরام খৃষ্টান রাজা নাজ্জাসীর আশ্রয়ে গিয়েছিলেন।
আমাদের কাছে যারা হিলফুল ফুজুলের ঘটনাকে (যা জাহেলী যুগে ইবনুজুদআনের সংঘঠিত হয়েছিলো) তাগুতী বিচারালয়ের কাছে যাওয়া এবং তাগুতী বিধানের কাছে বিচার-ফয়সালা চাওয়ার দলীল হিসেবে পেশ করার ক্ষেত্রে তাদের ভুলটা সুস্পষ্ট রূপে প্রতিয়মান হচ্ছে। এ ঘটনাকে প্রমাণ হিসেবে পেশ করার যুক্তিটি সম্পূর্নরূপে ভুল। কেননা হিলফুল ফুজুলের লোকজন [ধারক বাহকেরা] কাহান জুহাইনা এবং কাআববিন আশরাফের মতো তাগুত ছিলোনা। কাআব বিন আশরাফ ও তার সংগীরা তাগুতী বিধানের মাধ্যমে মানুষের মধ্যে বিচার-ফয়সালা করতো। হিলফুল ফুজুলের লোকেরা ছিলো এমন মুশরিক যারা শুধুমাত্র মাজলুম ব্যক্তিকে সাহায্য করার জন্য সমবেত হয়েছিলো। এটা একটি প্রশংসনীয় কাজ, এ ধরণের কাজের প্রতি ইসলাম মানুষকে উৎসাহিত করে।
আপনারা যারা এ ঘটনা থেকে প্রমাণ পেশ করতে চান, তাদেরকে প্রশ্ন করতে চাই, আল্লাহর নবীর (সঃ) উপরোক্ত কথা কি কা'আব বিন আশরাফ ও কাহান জুহাইনার এবং অন্যান্য তাগুতদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য বলতে চান? যাদের কাছে জাহেলী যুগের লোকেরা বিচার-ফয়সালা নিয়ে যেতো? আপনারা যদি বলেন, না, আমরা একথা বলতে চাইনা। তাহলে আমরা বলবো: কেন? এর উত্তরে আপনারা যদি বলেন: কারণ তারা ন্যায় বিচার করতোনা, মাজলুমের অধিকার ফিরিয়ে দিতো না, তদুপরি তারা ঘুষ গ্রহণ করতো। তখন আমরা বলবোঃ তাগুতকে অস্বীকার করার জন্য এবং তাদের কাছে বিচার-ফয়সালা না চাওয়ার জন্য যখন আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে নির্দেশ দেয়ার সময় কি এ কথা বলেছিলেন যে তারা ন্যায় বিচার করেনা, এবং তারা ঘুষ গ্রহণ করে? নাকি কারণ হিসেবে এ কথা বলেছিলেন যে তারা হচ্ছে তাগুত, তাদেরকে অস্বীকার করা ছাড়া আর তাদের কাছে বিচার-ফয়সালা চাওয়া পরিত্যাগ করা ছাড়া কোন ব্যক্তির ইসলাম শুদ্ধ হবে না? এটি হচ্ছে প্রথম প্রশ্ন।
দ্বিতীয় প্রশ্ন হচ্ছে আপনারা বলেছেন : আমরা তো ঐ সব ব্যাপারেই তাদের কাছে বিচার-ফয়সালা চাই, যে ব্যাপারে তারা ন্যায় বিচার করবে। জুলুমের ব্যাপার হলে আমরা বিচার চাইনা। আমরা বলবো : এ পার্থক্যের কি প্রমাণ আপনাদের কাছে আছে? তাদের কাছে বিচার-ফয়সালা চাইতে আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে নিষেধ করেছেন এবং এটাও বর্ণনা করেছেন যে, যে ব্যক্তি তাদের (তাগুতের) কাছে বিচার নিয়ে গেলো সে তাদেরকে (তাগুতকে) অস্বীকার করে না। এখানে আল্লাহ তায়ালা কোন ব্যক্তি ন্যায় সংক্রান্ত বিষয়ে তাগুতের কাছে বিচার চাইলো আর কোনো ব্যক্তি অন্যায়ের ব্যাপারে বিচার চাইলো, এর মধ্যে কোনো পার্থক্য করেননি। যে ব্যক্তি হিলফুলফুজুলের ঘটনাকে দলীল হিসেবে পেশ করে, তার দলীল শুদ্ধ ও যথার্থ নয়। কেননা হিলফুলফুজুলের লোকজন তাগুত ছিলোনা। তারা তাগুতী বিধানে মানুষের মধ্যে বিচার-ফয়সালাও করেনি। তারা ছিলো কতিপয় মুশরিক ব্যক্তি যারা শুধুমাত্র মাজলুমের সাহায্যার্থে সমবেত হয়েছিলো। এখানে আমাদেরকে অবশ্যই ঐ দু'ব্যক্তির মাঝে পার্থক্য করার মতো জ্ঞান থাকতে হবে, যে ব্যক্তি মর্যাদাবান ও ক্ষমতাবান ব্যক্তির কাছে যারা তাগুত নয় মাজলুমের অধিকার ফিরিয়ে দিতে সাহায্য চাওয়ার জন্য গিয়েছে, আর যে ব্যক্তি ঐ সব তাগুতী বিচারকদের কাছে-যারা পৃথিবীতে নিজেদেরকে মাবুদ বানিয়ে নিয়েছে এবং তাগুতী বিধান মোতাবেক মানুষের মাঝে বিচার-ফয়সালা করে, বিচার নিয়ে যায়। এর ফলে তাদের কাছে লোকেরা বিচার নিয়ে যায়, অতঃপর তাগুতী বিধানে তাদের বিবাদ মীমাংসা হয়। এ ধরনের কাজ কুফরী। একমাত্র জবরদস্তী মূলক অবস্থা ব্যতীত এ কাজ জায়েয নয়। আর জবরদস্তীর শিকার হচ্ছে ঐ ব্যক্তি যে ব্যক্তির জীবন নিশ্চিত ভাবে হত্যা, জুলুম নির্যাতন জীবনের বিরাট ক্ষতির আশংকায় পতিত হয়েছে।
📄 দ্বিতীয় সংশয়
ঐ সব লোকদের কথা যারা বলে : যাদের ব্যাপারে এ আয়াত নাযিল হয়েছে তারাতো তাগুতের কাছে বিচার নিয়ে যায়, এর কারণ হচ্ছে, তারা আল্লাহ তায়ালা তাঁর রাসূলের (সঃ) ফয়সালায় সন্তুষ্ট ছিলো না, আর আমরা তো তাদের মতো নই। আমরা বিচার তাগুতের কাছে নিয়ে গেলেও আমরা তা চাইনা।
বিভিন্ন দৃষ্টি কোন থেকে এ প্রশ্নের জবাব দেয়া যায়ঃ ১। আল্লাহ তায়ালা যখন বলেছেন: يُرِيدُونَ أَنْ يَتَحَاكَمُوا إِلَى الطَّاغُوتِ “তারা বিচার-ফয়সালার বিষয়কে তাগুতের কাছে নিয়ে যেতে চায়।” তখন আল্লাহ তায়ালা তাগুতের কাছে বিচার-ফয়সালা প্রার্থনা কারীকে তাদের বলার ক্ষেত্রে ইচ্ছাকে শর্ত করেননি। বরং যারা উপরোক্ত কথা বলে তারাই ইচ্ছাকে শর্ত বানিয়ে নিয়েছে। আল্লাহ তায়ালা যখন (তারা তাগুতের কাছে বিচার নিয়ে যেতে চায়) বলেছেন তখন দু'ব্যক্তি অর্থাৎ ইহুদী এবং মোনাফিকের অবস্থা বর্ণনা করছিলেন। তারা কা'ব বিন আশরাফ তথা তাগুতের কাছে বিচার নিয়ে যেতে চেয়েছিলো কিন্তু ইহুদী কা'ব বিন আশরাফের কাছে যেতে অস্বীকার করেছিলো এ জন্য যে, সে জানতো, সে কাব বিন আশরাফ ঘুষ খায়। অতঃপর তারা উভয়ই নবীর (সঃ) কাছে গিয়ে বিচার চাইলো। মূলকথা হলো, আল্লাহ তায়ালা যখন يُرِيدُونَ (তারা চায়) বলেছেন তখন এর দ্বারা তিনি ইহুদী ও মুনাফিকের চারিত্রিক অবস্থার কথা বলেছেন। এখানে ইচ্ছাকে কুফরীর জন্য শর্ত করা হয়নি। অবস্থাটা ঠিক কারো উদ্দেশ্যে যদি বলা হয়, লোকটি এমন এমন করেছে অথচ তার ইচ্ছা ছিলো এমন করার, অতএব ইচ্ছা করে কথাটা যদি এ ধরনের বাক্যে বলা হয় তার দ্বারা তখন অবস্থা বুঝানো হয়।
২। তারা বলেছে যে, তারা তাগুতের কাছে বিচারের জন্য যায়, কিন্তু এমন কাজ করতে তাদের ইচ্ছা নেই। তাদের এ কথা নিঃসন্দেহে অশূদ্ধ বা ঠিক নয়। কেননা, এমন কোনো মানুষ নেই যে, সে কোনো না কোন কাজ করবে অথচ কাজের ইচ্ছা করবেনা । এটা হতে পারেনা। কেননা ক্রিয়া কখনো ইচ্ছার সম্পৃক্তি ছাড়া সংঘটিত হয়না। তবে ইচ্ছার বিষয়্টা ভিন্ন। কেননা ইচ্ছার সাথে কাজ বা ক্রিয়া কখনো সম্পৃক্ত হতেও পারে আবার নাও হতে পারে। সম্ভবতঃ তারা তাদের কথার দ্বারা এ কথা বুঝাতে চায় এবং তাদের উদ্দেশ্য হচ্ছে যে, তারা তাগুতের কাছে বিচার নিয়ে যায় বটে কিন্তু তারা এরকম হোক তা চায়না অর্থাৎ শিরকী এবং কুফরী তারা চায়না এবং তাদের উদ্দেশ্যও এটা নয়। তাদের কথা অনুযায়ী যদি এটাই তাদের উদ্দেশ্য হয়ে থাকে, তাহলে অন্য কথা। এর জবাবে আল্লাহ চাহে তো সামনে ৬ নম্বরে বিবরণ আসছে।
৩। ইমাম আবুস সুউদ (রহঃ) أَلَمْ تَرَ إِلَى الَّذِينَ يَزْعُمُونَ أَنَّهُمْ اُمَنُوا بِمَا أُنْزِلَ إِلَيْكَ وَمَا أُنْزِلَ مِنْ قَبِلِكَ يُرِيدُونَ أَنْ يَتَحَاكَمُوا إِلَى الطَّاغُوتِ
এ আয়াতের তাফসীর করতে গিয়ে বলেন: এখানে তাগুতের কাছে বিচার নিয়ে যাওয়ার ইচ্ছাকেই খারাপ এবং বিস্ময়কর বলা হয়েছে, বিচারের ফয়সালাকে নয়; এ বিষয়ে শতর্ক করে দেয়ার জন্য যে ইচ্ছেটাই হচ্ছে, তা যে বিষয়ে ফয়সালা করা হবে তারই অংশ। তাই ইচ্ছাই না হওয়া উচিৎ। তাহলে তাগুতের কাছে বিচার নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে তোমার কি ধারনা? (অর্থাৎ যে কাজের ইচ্ছা করাই অন্যায়, তার মূল কাজটা কত বড় অন্যায় তা ভেবে দেখতে বলা হয়েছে)
তাহলে প্রিয় পাঠক, তাঁর (ইমাম আবুস সুউদ এর) কথা ভেবে দেখুন। তিনি বলেছেন: তাহলে মূল বিষয় অর্থাৎ "তাগুতের কাছে বিচার নিয়ে যাওয়া" এর ব্যাপারে তোমার কি ধারনা।
81 উম্মতে মুসলিমা এ ব্যাপারে একমত যে ইবাদত একমাত্র আল্লাহর জন্যই হতে হবে। যদি তা গাইরুল্লাহর জন্য হয়, তাহলে ইবাদতকারী এমন জঘণ্য মুশরিক (শিরককারী) হিসেবে গণ্য হবে যা তাকে মুসলিম উম্মাহ থেকে বের করে দিবে, চাই সে (শিরক করার) ইচ্ছা করুক বা নাই করুক, চাই এতে সে রাজী থাকুক বা নাই থাকুক। তবে যদি কেউ বাধ্য হয়ে উক্ত কাজ করে তাহলে তার ব্যাপার আলাদা।
৫। এ কথা 'অসপষ্টতা' (মুশাবাহাত) এর দৃষ্টি কোন থেকে গ্রহণ করা হয়েছে, আর সুস্পষ্টতার দৃষ্টি ভঙ্গি যেমনটি আল্লাহ তায়ালা বর্ণনা করেছেন পরিত্যাগ করা হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেনঃ وَقَدْ أَمِرُوا أَن يكفروا به "অথচ তাদেরকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে তাকে (তাগুতকে) অস্বীকার করার জন্য।"
আল্লাহ তায়ালা আরো বলেন: وَاجْتَنِبُوا الطَّاغُوتِ “তামরা তাগুত থেকে দূরে থাকো।"
আল্লামা শাইখ সুলাইমান বিন আবদুল্লাহ আল- শাইখ (রহঃ) বলেন: আল্লাহ তায়ালার বাণী: وَقَدْ أَمِرُوا أَنْ يَكْفُرُو بِهِ অথচ তাদেরকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে তাকে অর্থাৎ তাগুতকে অস্বীকার করার জন্য)। তাগুতের কাছে বিচার নিয়ে যাওয়া ঈমানের বিপরীত ও পরিপন্থী কাজ। তাই তাগুতকে অস্বীকার করা ব্যতীত ঈমান শুদ্ধ হবে না। এমনি ভাবে তাগুতের কাছে বিচার নিয়ে যাওয়া বাদ দিতে হবে। যে ব্যক্তি তাগুতকে অস্বীকার করতে পারবেনা সে মুমিন আল্লাহর প্রতিও ঈমান আনতে পারবেনা। আমরা যখন মুহকাম (সুস্পষ্ট) আয়াতের মর্ম জানতে পারলাম তখন মুতাশাবিহকে (অস্পষ্ট থাকে) মুহাকামের দিকেই প্রত্যার্পন করবো। ইমাম মুহাম্মদ, বিন আবদুল ওয়াহহাব কুফরীর صفات বা প্রকৃতি ও ধরণের কথা বলতে গিয়ে বলেন যে তাগুতকে অস্বীকারের প্রকৃতি হচ্ছে যে গাইরুল্লাহর ইবাদত বাতিল এ বিশ্বাস থাকতে হবে। তা পরিত্যাগ করতে হবে, গাইরুল্লাহর ইবাদতকে ঘৃনা করতে হবে। গাইরুল্লাহর ইবাদতকারীদেরকে কাফের বলে গণ্য করতে হবে এবং তাদের বিরোধীতা করতে হবে। (তাইসীরুল আজীজিল হামীদ فی বায়ান তাওহীদ)
মানুষ যদি গাইরুল্লাহর ইবাদত বাতিল বলে বিশ্বাস করলো, অথচ তা ত্যাগ করতে পারলো না, তাহলে সে তাগুতকে অস্বীকারকারী বলে গণ্য হবে না আর যদি গাইরুল্লাহর ইবাদতকে বাতিল বলে বিশ্বাস করলো এবং তা পরিত্যাগ করলো, কিন্তু সে গাইরুল্লাহর ইবাদতকে সে মুহাব্বত করে, এবং এর প্রতি তার কোনো ক্রোধ নেই, ক্ষোভ নেই, তাহলেও সে তাগুতকে অস্বীকার করতে পারলোনা।
৬। ইচ্ছা দ্বারা আপনারা যদি নিয়ত বুঝিয়ে থাকেন, আর কাজ বাদ দিয়ে কথা বুঝিয়ে থাকেন, তাহলে এটা তো তাদের মতোই হলো, যারা কবর পূজা করে কবর প্রদক্ষিণ করে (তাওয়াফ করে) অথচ মূখে বলে: হা, আমরা কবরের চারদিকে তাওয়াফ (প্রদক্ষিণ) করি এবং আমরা তাদের জন্য এ কাজ (ইবাদত) ও করি, তবে আমরা শিরক কখনোই চাইনা। তাওহীদে বিশ্বাসী প্রতিটি মানুষই জানেন যে তাদের কথা সম্পূর্ণ রূপে বাতিল।
শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া (রহঃ) বলেন: মোদ্দাকথা হচ্ছে, যে ব্যক্তি এমন কথা বললো বা এমন করলো যা কুফরী, সে কাফের হওয়ার ইচ্ছা না করলেও সে উক্ত কথা ও কর্মের দ্বারা কুফরী করলো। কারণ কেউ উদ্দেশ্য করে বা ইচ্ছা করে কুফরী করেনা। অর্থাৎ কাফের হওয়ার নিয়তে কেউ কুফরী করে না ইল্লা মাশা আল্লাহ। (আচ্ছারেমু আলমাছলুল ১৮৭-১৮৮পৃঃ)
ইমাম তাবারী (রহঃ) قُلْ هَلْ نُنَبِّئُكُمْ بِالْأَخْسَرِينَ أَعْمَالاً ، الَّذِينَ ضَلَّ سَعْيُهُمْ فِي الْحَيوة الدُّنْيَا وَهُمْ يَحْسَبُونَ أَنَّهُمْ يُحْسِنُونَ صُنَعًا -
"বলুন, আমি কি তোমাদেরকে সেসব লোকের সংবাদ দিব, যারা কর্মের দিক দিয়ে খুবই ক্ষতিগ্রস্ত? তারাই সে লোক, যাদের সকল প্রচেষ্টা পার্থিব জীবনে সঠিক পথ হতে বিভ্রান্ত হয়ে গিয়েছে অথচ তারা মনে করে যে তারা সঠিক কাজই করছে।” (কাহফঃ১০৩,১০৪)
এ আয়াতের তাফসীর করতে গিয়ে বলেনঃ যারা এ কথা দাবী করে যে, ওয়াহদানিয়্যাত (আল্লাহর একত্ববাদ) সম্পর্কে জ্ঞান লাভের পর কুফরীর উদ্দেশ্য ছাড়া কুফরী না করলে সেটা আল্লাহকে অস্বীকার করা হবেনা, তাদের এ দাবীও যে সমপূর্ণ ভুল অত্র আয়াতটি এর সবচেয়ে বড় দলীল। এ আয়াতে আল্লাহ তায়ালা ঐসব লোকদের খবর দিয়েছেন এবং গুনাগুণ (খারাপ অর্থে) বর্ণনা করেছেন যাদের সকল পার্থিব চেষ্টা সাধনা গোমরাহীতে পর্যবসিত হয়েছে, অথচ তারা কাজ করার সময় মনে করতো যে তারা খুব ভাল কাজ করছে।
হাফেজ ইবনে হাজার তাঁর গ্রন্থে বলেন: এখানে একথার ইঙ্গিত রয়েছে যে, মুসলমানদের মধ্যে এমন লোকও রয়েছে, যে দ্বীন থেকে বের হয়ে যাওয়ার ইচ্ছা ছাড়াই দ্বীন থেকে বের হয়ে যায় এবং ইসলামের ওপর অন্য কোনো দ্বীনকে প্রাধান্য দেয়া কিংবা বাছাই করা ছাড়াই ইসলাম থেকে বের হয়ে যাচ্ছে।
তিনি আরো বলেন: এ কথার দিকে যাদের ঝোঁক প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়, তাদের মধ্যে ইমাম তাবারীও রয়েছেন। তিনি তাঁর তাহজীর গ্রন্থে এতদসংক্রান্ত হাদীসসমূহ উদ্ধৃত করার পর বলেন: এ বক্তব্যে ঐ ব্যক্তির কথাকে খন্ডন করা হয়েছে যে বলে, আহলে কেবলার (কাবা ঘরের দিকে ফিরে যারা নামাজ পড়ে) কাউকে ইসলাম থেকে বের হয়ে যাওয়া, যাবতীয় অবস্থা প্রাপ্তির পরও তাকে ইসলাম থেকে বের হয়ে যাওয়ার রায় দেয়া যাবেনা, যদি না সে ইসলাম থেকে বের হয়ে যাওয়ার ইচ্ছা সজ্ঞানে পোষণ করে। তারা হক কথা বলে, তারা কুরআন পড়ে, অথচ তারা ইসলাম থেকে বিচ্ছিন্ন, ইসলামের সাথে তাদের কোনো সম্পর্ক নেই।
ইবনে কুদামা তাঁর আল-কাফীতে বলেনঃ মুরতাদ বিষয়টি অধিকন্তু হয়ে থাকে এমন সন্দেহ ও সংশয়ের কারণে, যা মুরতাদের কাছে প্রতিভাত হয়। (আল কাফি ইবনে কুদামা)
ইমাম মুহাম্মদ বিন আবদুল ওয়াহহাব (রহঃ) বলেন: ইচ্ছা ও মনোনিবেশের সাথে আহবানে সাড়া দেয়ার জন্য, প্রয়োজন পূরণের জন্য, দুঃখ ও বেদনায় সাহায্য করার জন্য তারা এ কাজ করে, ঠিক একাজটাই আরবের মুশরিকেরা রাসুল (সঃ) এর নবুয়ত লাভের পূর্বে করতো? না কি করতো না?
চতুর্থতঃ যে ব্যক্তি এমন কাজ করলো, সে কি মুমিন মুসলিম? তাকে কি কাফের বলা যাবে? এ কাজ দ্বারা তার আমল কি বরবাদ হয়ে যাবে, নাকি বরবাদ হবে না, যদি প্রথম বিষয়টি তোমার কাছে জটিল মনে হয়, তাহলে কবরে প্রশ্নকারী দু'ফেরেস্তার প্রশ্নের প্রতি এবং এর প্রতিউত্তরে তার (মৃত ব্যক্তির) কথা হায়! হায়!! আমি কিছুই জানি না, লোকেরা দুনিয়াতে যা বলতো আমি তাদের মতোই বলতাম " এর প্রতি তুমি দৃষ্টি দাও। আর যদি দ্বিতীয় বিষয়টি তুমি গ্রহণ করো (অর্থাৎ শিরকী ও কুফরী কর্মে লিপ্ত ব্যক্তিকে যদি কাফের বলো, তার আমল বাতিল বলে মনে করো) তাহলে তোমার এ সিদ্ধান্তে অটল থাকা উচিৎ। আর যদি তৃতীয় মত হিসেবে তুমি এ কথা বলো যে, এ উদ্দেশ্য হচ্ছে অন্য রকম উদ্দেশ্য। তাহলে তোমাকে দু' উদ্দেশ্যের মধ্যে যে পার্থক্য রয়েছে তা কুরআন অথবা সুন্নাহ অথবা ইজমা (সর্ব সম্মত রায়) ইত্যাদি দলীলের মাধ্যমে প্রমাণ করতে হবে। চতুর্থ মত হিসেবে যদি তুমি বলতে চাও যে, সে যাই করুক না কেনো ইসলাম তাকে কুফরী থেকে হেফাজত করেছে তাহলে ভাল করে মুরতাদের হুকুম সংক্রান্ত বিষয় পড়াশুনা করে নিও। (মাজমুআতুল ফাতাওয়া ওয়াররাসায়েলে ওয়াল আজওইবা লিল ইমাম আবদুল ওহাব পৃঃ ৮৮)
তিনি আরো বলেন: আর রিসালা অছছুন্নিয়াতে শাইখ বলেছেন: যখন খাওয়ারেজদের [ ইসলাম থেকে বের হয়ে যাওয়া একটি গোমরাহ দল। সর্ম্পকে এবং তাদের ইসলাম থেকে বের হয়ে যাওয়া, তাদের বিশ্বাসঘাতকতা সর্ম্পকে এবং রাসুল (সঃ) এর পক্ষ থেকে তাদেরকে হত্যা করার নির্দেশ সর্ম্পকে বলা হলো, তখন তিনি বলেন: রাসুল (সঃ) এবং তাঁর খলীফাগণের যমানায় যদি ইসলামের সাথে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের মধ্যে এমন লোক থাকে যে, মর্যাদাকর ইবাদত সত্ত্বেও ইসলামের সাথে বিশ্বাস ঘাতকতা করে ইসলাম থেকে বের হয়ে গিয়েছে' যার ফলে রাসুল (সঃ) তাদেরকে হত্যার নির্দেশ দিয়েছেন; তাহলে এটা তো অবশ্যই জানা গেলো যে, বর্তমান যমানায় ইসলাম ও সুন্নাহর সাথে সম্পৃক্ত থেকেও ইসলাম থেকে কেউ বের হয়ে যাওয়া খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার। (তারিখে নজদ ৩৬৭পৃঃ)
ইমাম সানআনী (রহঃ) তাঁর তাতহীরুল "ই'তিকাদ আন আদরানিশ শিরক ওয়াল ইলহাদ" নামক পুস্তিকায় বলেনঃ তুমি যদি বলো, তারা মূর্খ, তাদের কর্মে তারা মুশরিক। আমি বলবো, সমস্ত ফিকাহর কিতাবে ফকীহগণ মুরতাদ হওয়া সংক্রান্ত অধ্যায়ে একথা বলেছেন যে, যে ব্যক্তি কুফরী কথা বলবে, কথা তার উদ্দেশ্য না হলেও সে কাফের বলে গণ্য হবে। একথা এটারই প্রমাণ পেশ করে যে, তারা ইসলামের হাকীকত [আসল কথা] এবং তাওহীদের মর্মকথা সম্পর্কে জানে না। এতদসত্ত্বেও তারা মৌলিক দিক থেকে কাফের। (মাজমুআতুল ফাতাওয়া ওয়াররাসায়েলে ওয়াল আজওইবা পৃঃ ৮৮)
নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে কাফের বলার বিষয়ে ভুল পথ অবলম্বন করেছেন। এর ফলে তারা মনে করেন, যে ব্যক্তি বড় বা জঘণ্য শিরকের কাজ করে, ব্যাখ্যা সাপেক্ষে তাদেরকে কাফের বলা যাবে না এবং তারা ইসলাম থেকেও খারিজ হবে না। তারা কতিপয় বিষয়কে প্রমাণ হিসাবে পেশ করেন যেমন খলীফা মামুনের ঘটনা। [ব্যাখ্যা সাপেক্ষে তিনি খালকে কুরআনের পক্ষ অবলম্বন করেন। অর্থ্যাৎ কুরআনকে খলীফা মামুন আল্লাহর সৃষ্টি বলে স্বীকার করতেন অথচ আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের ইমাম ওলামায়ে কেরام কুরআনকে আল্লাহর মাখলুক বা সৃষ্টি বলে স্বীকার করেন না। এমতাবস্থায় ইমাম, আহমাদ বিন হাম্মল তাকে কাফের বলে আখ্যা দেননি। নিঃসন্দেহে এটা একটা জঘণ্য রকমের ভুল। কেননা শিরক এবং কুফরে জলী, (অর্থাৎ সুস্পষ্ট বড় ধরনের প্রকাশ্য কুফরীর মধ্যে) যেমন ইবাদতের মধ্যে শিরক করা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে (সঃ) নিয়ে উপহাস করা ইত্যাদি এবং কুফরে খফী বা গোপনীয় কুফরী, অপ্রকাশ্য কুফরী যেমন কুফরী খফী সংক্রান্ত কথা বা প্রবন্ধ ইত্যাদির মধ্যে পাথ্য রয়েছে এবং আল্লাহ তায়ালা কতিপয় সিফাতের বা গুণ বাচক নামের ব্যাখ্যাও এর অন্তর্ভুক্ত যা কিছু সংখ্যক লোকের মধ্যে সুপ্ত বা অস্পষ্ট রয়েছে। যেমন আল্লাহ তায়ালার কালাম বা কথা সংক্রান্ত সিফাত বা গুণ। এ বর্ণনার প্রতি যাদের ঝোঁক বা সমর্থন রয়েছে তাদের মধ্যে রয়েছেন ইমাম মুহাম্মাদ বিন আবদুল ওয়াহহাব। এটা লক্ষ্য করা যায় শাইখ হুসাইন বিন গানামের নজদের ইতিহাস সংক্রান্ত গ্রন্থে সংরক্ষিত কয়েকটি প্রবন্ধের মধ্যে শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়া (রহঃ) যে মত গ্রহণ করেছেন তা উল্লেখ করেন। তাঁর মতে ইবাদতের মধ্যে শিরক এবং অপ্রকাশ্য কুফরী সংক্রান্ত কথার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। শাইখ আব্দুল্লাহ বিন আবদুর রহমান আবা বাতীন এবং শাইখ ইসহাক বিন আবদুর রহমান বিন হাসান আল-শাইখ হুকমু তাকফীবিল মুআইয্যান নামক পুস্তিকায় এর বিষদ বর্ণনা দিয়েছেন। এ ছাড়া বড় বড় ওলামায়ে কেরাম ও এর বর্ণনা দিয়েছেন।
📄 তৃতীয় সংশয়
ঐ ব্যক্তির কথাই হচ্ছে তৃতীয় সংশয় যে বলে, বিচার ফয়সালা [তাগুতের কাছে] চাওয়া শিরক হলেও তা শিরকে আসগার [ছোট শিরক] বড় শিরক বা শিরকে আকবরের পর্যায়ে তা ততক্ষণ পর্যন্ত উন্নীত হবে না যতক্ষণ না এটাকে মনে করা এবং আক্বীদার বিষয় সাথে সংযুক্ত হয়। যেমন গাইরুল্লাহর নামে কসম করা।
প্রথম জবাব: আমরা বলবো এটা তো জানা কথা যে, যে সব ইবাদত একমাত্র আল্লাহ ছাড়া আর কারো নয় অর্থাৎ অন্য কারো জন্য নিবেদন করা যায় না। তার মধ্যে রয়েছে, রুকু করা, সেজদা করা, সাহায্য চাওয়া, পশু জবাই করা, মানত করা, তাওয়াফ বা প্রদক্ষিণ করা, বিচার চাওয়া, ভয়, আশা, আকাংখা তাওবার মাধ্যমে প্রত্যাবর্তন করা, মুহাব্বত করা, সম্মান করা ইত্যাদি ইবাদতগুলি তিন ভাগে বিভক্ত। এর মধ্যে কিছু ইবাদতের সম্পর্ক আক্বীদার সাথে, কিছু ইবাদতের সম্পর্ক কথার সাথে এবং কিছু ইবাদতের সম্পর্ক হচ্ছে কর্মের সাথে। যে সব ইবাদতের সম্পর্ক কথা ও কাজের সাথে সম্পৃক্ত যেমন দোয়া করা, সাহায্য চাওয়া, রুকু করা, সেজদা করা, পশু জবাই করা, মানত করা, তাওয়াফ করা, বিচার চাওয়া ইত্যাদি এ সব ইবাদতের কোনো একটিকেও যদি গাইরুল্লাহর উদ্দেশ্যে নিবেদন করে যেমন: প্রতিমা অথবা, মৃত ব্যক্তি, অথবা তাগুত, তাহলে এর দ্বারা সে কাফের হবে এবং শিরকে আকবারে পতিত হবে। এ ক্ষেত্রে তার আক্বীদা এবং হারামকে হালাল মনে করার বিষয়টি তাকে কাফের বলার ক্ষেত্রে জরুরী নয়। কারণ সে প্রকাশ্যেই তার ইবাদতকে গাইরুল্লাহর উদ্দেশ্যে নিবেদন করেছে।
আর গোপন বা বাতেনী ইবাদত যা আক্বীদা বিশ্বাসের সাথে সম্পৃক্ত যেমন ভয়, আশা, ভালবাসা ভক্তি ইত্যাদির ক্ষেত্রে ইবাদতকারীর প্রতি কুফরী আরোপ করার জন্য তার ইবাদতকে মৌখিক উচ্চারণের মাধ্যমে বা কথার মাধ্যমে তার আক্বীদা বিশ্বাসের কথা প্রকাশ করা জরুরী। কেননা, এ জাতীয় ইবাদত অন্তরে সুপ্ত। অতএব কোনো ব্যক্তির পক্ষ থেকে প্রকাশ্যে কুফরী কর্ম পাওয়া গেলে তার প্রতি কুফরী আরোপ করার জন্য তার আক্বীদা বিশ্বাস প্রকাশ করা জরুরী বলে মনে করে, সে মূলতঃ একটি বাতিল যুক্তি প্রদর্শন করেছে। এটা হয়েছে তাওহীদের অর্থ এবং ইবাদতের অর্থ সম্পর্কে তার অজ্ঞতার কারণে। এর ফলে বিচার চাওয়ার বিষয়কে যা ইবাদত হিসেবে গণ্য গাইরুল্লাহর নামে কসম করার সাথে একীভূত করেছে, যা ইবাদত নয় বরং শিরকী শব্দ হিসেবে গণ্য।
কেউ হয়তো বলতে পারে, তাহলে আল্লাহর নামে কসম করাকে ওলামায়ে কেরام কেন ইবাদত হিসেবে আখ্যায়িত করেন? এর জবাবে আমরা বলবো, কেননা আল্লাহর নামে কসম করার সাথে আল্লাহকে তাজীম ও সম্মান করার মতো ইবাদতের বিষয় এর সাথে সংযুক্ত আছে। আল্লাহর নামে কসমকারী ব্যক্তি কসম করার সময় সে একথা জানে যে, আল্লাহ হচ্ছেন মহান। তাঁর নামে কসমের হকদার একমাত্র তিনিই। তাই তাঁর নামে সে কসম করে। এখন এ কসম করার আমলটি ইবাদত হিসেবে গণ্য। কেননা এর সাথে তা'জীম (আল্লাহর সম্মান) সংযুক্ত হয়েছে। এ জন্যই ওলামায়ে কেরام বলেনঃ যে ব্যক্তি গাইরুল্লাহর নামে কসম করলো সে ছোট শিরকের মধ্যে পতিত হলো। এ কসম তাকে মুসলিম মিল্লাত থেকে ততক্ষণ পর্যন্ত বের করবে না যতক্ষণ পর্যন্ত সে একথা বিশ্বাস না করে যে, যার নামে কসম করা হলো সে কসমের হকদার। তাকে কাফের বলার জন্য যার নামে কসম করা হলো, তার প্রতি সম্মান জাহির বা প্রকাশ করার শর্তারোপ করেছেন ওলামায়ে কেরام। এর অর্থ হচ্ছে, গাইরুল্লাহর নামে তা'জীম বা সম্মান করার সাথে সম্পৃক্ত ইবাদত নিবেদন করলো। এ ইবাদত গোপনীয় এবং অন্তরের সাথে সম্পৃক্ত। যদি কোনো ব্যক্তি গাইরুল্লাহর নামে কসম করে এবং যার নামে কসম করা হলো তার উদ্দেশ্যে তা'জীম বা সম্মান দেখায় তাহলে সে ব্যক্তি উলুহিয়্যাতের দিক থেকে আল্লাহর সাথে শরীক করেছে, তাই সে মুশরিক। তাহলে তাঁর মুশরিক হওয়ার কারণ হচ্ছে, সে ইবাদতকে প্রকাশ করেছে। তাই আমরা তাকে একথা জিজ্ঞেস করবো না যে তুমি কি এটা বিশ্বাস করো, নাকি বিশ্বাস কর না। তাই তাগুতের কাছে বিচার চাওয়া, সেজদা এবং তাওয়াফের মতোই প্রকাশ্য ইবাদত। এ ইবাদতকে যে গাইরুল্লাহর উদ্দেশ্য নিবেদন করে সে কাফের। এটা ইবাদতে কালবিয়া খাফিয়া (অর্থাৎ অন্তরের গোপনীয় ইবাদত নয়) যা মৌখিক উচ্চারণের মাধ্যমে প্রকাশ করতে হবে।
দ্বিতীয় জবাব: এ কথা তো সবারই জানা যে, গাইরুল্লাহর নামে কসম করার বিষয়টি প্রাক ইসলামী যুগে নিষিদ্ধ ছিলোনা। এর পর গাইরুল্লাহর নামে কসম খাওয়ার বিষয়টি কুরআন ও সুন্নাহর বক্তব্যর মাধ্যমে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। রাসূল (সঃ) পরবর্তিতে গাইরুল্লাহর নামে কসম করা নিষিদ্ধ করেছেন। তিনি বলেন: আল্লাহ তায়ালা তোমাদের বাপ-দাদার নামে কসম করা নিষিদ্ধ করেছেন (বুখারী)। অতএব যে বিষয়টি প্রাক ইসলামী যুগে আদৌ নিষিদ্ধ ছিলোনা সেটাকে কি ভাবে বা কোন যুক্তিতে এমন বিষয়ের ওপর কেয়াস করা হয়, যা ছাড়া বান্দার ইসলামই ছহীহ শুদ্ধ হয়না। আর তা হচ্ছে সকল তাগুতকে অস্বীকার করা এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের (সঃ) বিধান ব্যতীত সকল বিধান অস্বীকার করা। আর সেটা করতে হবে তাগুতের কাছে বিচার না চাওয়ার মাধ্যমে।
অতঃপর আমরা আরো বলতে চাই যে, এ বাতিল 'কিয়াস' যে বিষয়টিকে অপরিহার্য করে তোলে তা হচ্ছে, যে আয়াতে তাগুতের কাছে বিচার চাওয়াকে নিষেধ করা হয়েছে সে আয়াত নাযিল হওয়ার পূর্বে তাদের জন্য গণক, আহলে কিতাব এবং তাদের তাগুতদের কাছে বিচার- ফয়সালা নিয়ে যাওয়া জায়েয ছিলো। কেননা তাদের দাবী অনুযায়ী বিচার- ফয়সালা চাওয়ার বিষয়টি কসম করার মতোই একটি কাজ (অর্থাৎ উভয় কাজই একই মানের তাই গাইরুল্লাহর নামে কসম করলে যেমন কাফের হয়না তেমনি তাগুতের কাছে বিচার চাইলে ও কাফের হবেনা)।
📄 চতুর্থ সংশয়
কতিপয় লোক শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়া (রহঃ) এর নিম্মোক্ত কথাকে (ভুল বুঝে) দলীল হিসেবে গ্রহণ করেছে। তিনি তাঁর মাজমুআতুল ফাতাওয়া নামক গ্রন্থে বলেছেন: এ সব লোক (ইহুদী ও খৃষ্টান) বা তাদের ধর্মীয় গুরুদেরকে হারামকে হালাল আর হালালকে হারাম হিসেবে মেনে নেয়ার ক্ষেত্রে দুভাবে তাদের আনুগত্য করেছে।
প্রথমত: তারা (ধর্মীয় গুরুরা) আল্লাহর দ্বীনকে পরিবর্তন করেছে, এ পরিবর্তনের কথা জেনে শুনেই তারা (ইহুদী খৃষ্টানরা) তাদের আনুগত্য করতো। তাই তারা বিশ্বাস করতো যে, আল্লাহর হারামকৃত বিষয় হালাল করা আর আল্লাহর হালালকৃত বিষয়কে হারাম করার ক্ষমতা বা অধিকার তাদের নেতাদের রয়েছে। তারা এটাও জানতো যে তারা রাসূলের (সঃ) দ্বীনের বিরোধিতা করছে। এ রকম করা কুফরী।
দ্বিতীয়ত: তাদের (অনুসারীদের) এ বিশ্বাস ও ঈমান আছে যে, তাদের ধর্মীয় গুরুদের হালাল কে হারাম করা, আর হারামকে হালাল করার বিষয়টি (সম্পূর্ণরূপে অবৈধ কাজ এ কথা) ঠিক আছে তবে তারা তাদের ধর্মীয় গুরুদের আনুগত্য করেছে আল্লাহর নাফরমানীর ক্ষেত্রে, যেমন একজন মুসলমান পাপকে পাপ জেনেই করে থাকে। এসব লোক তাদের মতোই পাপী।
প্রথম জবাবঃ আমরা বলতে চাই যে, যারা শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়ার (রহঃ) কথা (তাদের সংশয়ের) দলীল হিসেবে গ্রহণ করেছে, তারা বিষয়টি বুঝতে পারেনি এবং শেরেকী আনুগত্য ও পাপ জনিত আনুগত্যের মধ্যে পার্থক্য করতে তারা সক্ষম হয়নি। পাপ জনিত আনুগত্য হচ্ছে কোনো মানুষ কোনো পাপ কাজে সৃষ্টির, আনুগত্য এ বিশ্বাস নিয়ে করবে, যে এটি গুনাহ এবং হারাম কাজ । এ ধরনের আনুগত্যই পাপ জনিত আনুগত্য হিসেবে গণ্য। এ ধরনের আনুগত্য মুসলিম মিল্লাত থেকে আনুগত্যকারীকে বের করে দেয়না। (ইসলাম থেকে খারিজ হয়ে যায়না) যতক্ষণ এর সাথে গুনাহকে হালাল মনে করার আক্বীদা সংযুক্ত হবে। আর শেরেকী আনুগত্য হচ্ছে কোনো মানুষ কোনো শেরেকীকাজ সৃষ্টির আনুগত্য করা যেমন: তাকে (মানুষকে) বলা হলো তুমি মূর্তিটিকে সেজদা করো, অতঃপর সে সেজদা করলো। অথবা বলা হলো জ্বিনের উদ্দেশ্যে পশু জবাই করো, সে তখন জবাই করলো। অথবা তাকে বলা হলো: যাও আল্লাহর বিধান ও শরীয়ত বাদ দিয়ে বিচার চাও, সে এভাবে বিচার চাইলো। এটাই হচ্ছে শেরেকী আনুগত্য। এ ধরনের আনুগত্যকারী আল্লাহর সাথে শিরককারী বা মুশরিক, যদি সে এধরনের আনুগত্য ও পাপকে হালাল মনে নাও করে। ইমাম ইবনে তাইমিয়া সে বিষয়টি তাঁর কথায় বুঝাতে চেয়েছেন তা হচ্ছে, এটা পাপ জনিত আনুগত্য শেরেকী আনুগত্য নয়। এটা হচ্ছে প্রথম জবাব।
দ্বিতীয় জবাবঃ আনুগত্য এবং বিচার-ফয়সালা চাওয়ার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। আনুগত্য কখনো পাপ জনিত হতে পারে, আবার কখনো শেরেকী আনুগত্যও হতে পারে। একথা আমরা প্রথম জবাবেই বর্ণনা করেছি। বিচার-ফয়সালা চাওয়ার কাজটি মানত এবং তাওয়াফের মতোই নিরেট ইবাদত হিসেবে গণ্য। তাই এসব ইবাদত গাইরুল্লাহর উদ্দেশ্যে নিবেদন করলে ইবাদতকারী আল্লাহর সাথে শিরককারী বা মুশরিক হিসেবে বিবেচিত হবে। ওলামায়ে কেরাম তাদের বই-পুস্তকে এ কথাই বর্ণনা করেছেন। শাইখ আবদুল লতিফ বিন আবদুর রাহমান বিন হাসান আল-শাইখ বলেন: যে ব্যক্তি জেনে-শুনে আল্লাহর কিতাব ও তাঁর রাসূলের (সঃ) সুন্নাতকে বাদ দিয়ে বিচার-ফয়সালা চাইবে সে কাফের। (আদ দুরার আস সুন্নিয়া ৪৭৬/১০)